


ভারতীয় রেলে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে চলেছে এই হাইড্রোজেন ট্রেন। বিশ্বে কেবলমাত্র আমেরিকা, চিন, জার্মানি এবং জাপানে হাতেগোনা কয়েকটি এমন ট্রেন চলে। ভারতে এই ট্রেনের বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু হলে হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেন পরিচালনাকারী দেশের তালিকায় পঞ্চম হিসেবে নাম তুলে ফেলবে ভারত। চিরাচরিত ডিজেল বা বিদ্যুৎ-চালিত ট্রেনের তুলনায় এই হাইড্রোজেন ট্রেনের কার্যপদ্ধতি একেবারেই আলাদা। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির সাহায্যে চলার কারণে এই ট্রেন থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা অন্য কোনও বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হবে না। বায়ুদূষণ রোধে এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ট্রেন ভারতীয় রেলের এক মাস্টারস্ট্রোক হতে চলেছে।
ভারতীয় রেলে বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন চালু হয়েছিল প্রায় ১০০ বছর আগে। কিন্ত, ভারতের রেল ব্যবস্থার সাথে বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্ক সর্বস্তরে জুড়ে দেওয়ার মতো পরিকাঠামো সেই সময়ে ছিল না। সেই কারণেই, সারা ভারত জুড়ে ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছিল– প্রথমে বাষ্পীয় ইঞ্জিন, পরে ডিজেল-চালিত ইঞ্জিনের মাধ্যমে। ১৯৫৪-’৫৫ সালে যুক্তরাজ্যের ‘নর্থ ব্রিটিশ লোকোমোটিভ কোম্পানি’ থেকে প্রথম মিটারগেজ ট্রেনের জন্য প্রধান লাইনের ডিজেল ইঞ্জিন আনা হয়, যেটি পশ্চিম রেলওয়ের গুজরাট অঞ্চলে মেল ও এক্সপ্রেস ট্রেনে ব্যবহার করা হয়েছিল। ভারতের দূরপাল্লার ও ভারী মালবাহী ট্রেনের জন্য ১৯৫৭-’৫৮ সালে আমেরিকার অ্যালকো (ALCO) কোম্পানি থেকে ১০০টি শক্তিশালী ব্রডগেজ ডিজেল ইঞ্জিন আমদানি করা হয়, যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘WDM-1’। মূলত এখান থেকেই ভারতীয় রেলে ডিজেল যুগের প্রকৃত বিপ্লব শুরু হয়। কিন্ত, বাষ্পীয় ইঞ্জিনের তুলনায় ডিজেল ইঞ্জিন বেশি শক্তিশালী হলেও আধুনিক পরিবেশগত মানদণ্ডে এটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ডিজেলের দহনে প্রচুর পরিমাণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড এবং নাইট্রোজেন-অক্সাইড নির্গত হতে শুরু করে। এই গ্যাসগুলো বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রেখে বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করছিল। ডিজেল ইঞ্জিনের ধোঁয়া পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গে জনস্বাস্থ্যের ওপরেও প্রভাব ফেলে। ডিজেল ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও ছিল অনেক বেশি। এর সঙ্গে অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার কারণে ডিজেল-চালিত ইঞ্জিনের পরিচালন খরচ সবসময়ই অনিশ্চিত ছিল।

ডিজেল-জনিত পরিবেশ দূষণের হাত থেকে পরিবেশ রক্ষা এবং পরিচালন খরচ সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে প্রায় সমস্ত ব্রডগেজ ট্র্যাকে ভারতীয় রেল ধীরে ধীরে বৈদ্যুতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে শুরু করে। ১৯৮৬ সালে সেই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে ট্রেনের নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছিল এইচওজি বা হেড অন জেনারেশনের (Head-On-Generation) হাত ধরে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রেনের এসি, লাইট ও ফ্যান চালানোর জন্য আলাদা জেনারেটর কার ব্যবহার না করে, সরাসরি ওভারহেড তার (OHE) থেকে ইঞ্জিন বা লোকোমোটিভের মাধ্যমে বিদ্যুৎ কোচে সরবরাহ করা শুরু হয়। ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে পশ্চিম রেলওয়ের মুম্বই সেন্ট্রাল ডিভিশনে প্রথমবারের জন্য এই প্রযুক্তির বাণিজ্যিকভাবে সফল প্রয়োগ ঘটানো হয়েছিল। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রেলমন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেয় যে সমস্ত আধুনিক এলএইচবি (LHB) কোচ-চালিত ট্রেনকে দ্রুত এই সিস্টেমে নিয়ে আসা হবে।
এর পরেই সারা ভারতের ট্রেন চলাচল ব্যবস্থার ছবিটা আমূল বদলে যায় উন্নত প্রযুক্তির এলএইচবি কোচ ও এইচওজি-তে রূপান্তরিত হওয়া জেনারেটর কারের মাধ্যমে। ডিজেল বা বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতো বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন সরাসরি কোনও কার্বন বা ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত করে না। অন্যদিকে, বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনের কারণে ট্রেনের লাইট-ফ্যান চালানোর জন্য ক্ষতিকারক ডিজেল জেনারেটর ব্যবহার করতে হয় না। এটি স্টেশনের শব্দ এবং কালো ধোঁয়াকেও সম্পূর্ণ দূর করেছে।
ভারতের রেলব্যবস্থায় দ্রুত বিকাশের অঙ্গ হিসেবে এবার আসছে হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন। দু’ মাসের মহড়া শেষে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ড সম্প্রতি পরিবেশবান্ধব জ্বালানি-নির্ভর এই ট্রেন চলাচলের সবুজ সংকেত দিয়েছে। হরিয়ানার ঝিন্দ-শোনপথ রুটে ১০ কোচের এই হাইড্রোজেন ট্রেন চলবে প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ প্রতি ঘণ্টায় ৭৫ কিমি গতিতে। এই ট্রেনের উন্নয়নের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রিসার্চ ডিজাইনস অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন (আরডিএসও) কর্তৃক ট্রেনটির নকশা চূড়ান্ত করার মাধ্যমে। চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরি (আইসিএফ) ট্রেনের কোচ উৎপাদনের দায়িত্ব নেয়। ট্রেনটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যেখানে ট্রেনটি সর্বোচ্চ ২,৬৩৮ জন যাত্রী বহন করতে পারবে এবং ঘণ্টায় ১১০ কিমি গতিতে চলতে সক্ষম হবে।

রেল বোর্ড জানিয়েছে, এই ট্রেনটিই বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন-চালিত ব্রডগেজ ট্রেন। এর ইঞ্জিন ২৪০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন। আসলে এই ট্রেনে দু’টি ১২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ড্রাইভিং পাওয়ার কার (ডিপিসি) থাকছে। যার মোট চালিকাশক্তি ২৪০০ কিলোওয়াট। সঙ্গে থাকছে আটটি যাত্রিবাহী কোচ।
গত মার্চ মাসেই এই ট্রেনের ‘অসিলেশন ট্রায়াল রান’ সম্পন্ন হয়েছিল। এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল ট্রেনটির কর্মক্ষমতা, নিরাপত্তা মান এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা মূল্যায়ন করে দেখা। গত মাসের ২২ তারিখে লক্ষ্ণৌ-এর আরডিএসও এবং নর্দার্ন রেলওয়েকে পাঠানো একটি চিঠিতে রেল বোর্ড ১০টি বগিবিশিষ্ট এই হাইড্রোজেন ট্রেন চালানোর অনুমোদন দিয়েছে।

ভারতীয় রেলে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করতে চলেছে এই হাইড্রোজেন ট্রেন। বিশ্বে কেবলমাত্র আমেরিকা, চিন, জার্মানি এবং জাপানে হাতেগোনা কয়েকটি এমন ট্রেন চলে। ভারতে এই ট্রেনের বাণিজ্যিক পরিষেবা চালু হলে হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেন পরিচালনাকারী দেশের তালিকায় পঞ্চম হিসেবে নাম তুলে ফেলবে ভারত। চিরাচরিত ডিজেল বা বিদ্যুৎ-চালিত ট্রেনের তুলনায় এই হাইড্রোজেন ট্রেনের কার্যপদ্ধতি একেবারেই আলাদা। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রযুক্তির সাহায্যে চলার কারণে এই ট্রেন থেকে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা অন্য কোনও বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হবে না। বায়ুদূষণ রোধে এবং গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই ট্রেন ভারতীয় রেলের এক মাস্টারস্ট্রোক হতে চলেছে। ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে অত্যাধুনিক হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল সংযোজনের মাধ্যমে ভারত কেবল পরিবেশগত উদ্বেগেরই সমাধান করছে না, বরং বিদ্যুতায়ন করা কঠিন এমন অঞ্চলগুলিতেও টেকসই পরিবহন ব্যবস্থার সমাধানের পথও প্রশস্ত করছে। একইসঙ্গে, পরিবেশ রক্ষায় যে জিরো কার্বন এমিশন বা কার্বন নির্গমন একদম শূন্যে পৌঁছনোর চেষ্টা চলছে, হাইড্রোজেন ট্রেন সেই পথে দেশকে অনেকটাই এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।
হরিয়ানার এই পাইলট ট্রেনের জন্য হাইড্রোজেন সরবরাহ করা হবে একটি ১-মেগাওয়াট (MW) পলিমার ইলেক্ট্রোলাইট মেমব্রেন (PEM) ইলেক্ট্রোলাইজার থেকে, যা জিন্দে স্থাপন করা হচ্ছে। ইলেক্ট্রোলাইজারটি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা চালু থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪৩০ কেজি হাইড্রোজেন উৎপাদন করতে সক্ষম। জিন্দ-এর রিফুয়েলিং পরিকাঠামোতে ৩,০০০ কেজি হাইড্রোজেন স্টোরেজ, একটি হাইড্রোজেন কম্প্রেসার এবং প্রি-কুলার ইন্টিগ্রেশন-সহ দু’টি হাইড্রোজেন ডিসপেনসারও থাকবে, যা ট্রেনগুলিতে দ্রুত রিফুয়েলিং-এর সুযোগ করে দেবে।

ভারতীয় রেলে হাইড্রোজেন ট্রেনের প্রবেশ শুধুমাত্র একটি নতুন প্রযুক্তির সংযোজন নয়, বরং এটি দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থার এক সবুজ ও টেকসই রূপান্তরও। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি দূষণমুক্ত, শান্ত এবং গতিশীল রেল পরিষেবা উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সবুজ প্রযুক্তি ভারতের বুকে এক নতুন যুগের সূচনা করতে চলেছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved