


পুঁজিবাদের মুখে এহেন পেচ্ছাপ করে দিল কারা? প্রতিবাদে? প্রতিরোধে? ইংল্যান্ডের একটি রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট দল। নাম, ‘এভরিওয়ান হেটস ইলন’। জেফ বেজোসের ইমেজ এবং মেট গালার রোশনাই-মঞ্চ ব্যবহার করে, তারা দুনিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল একটি মাত্র বার্তা: অ্যামাজনের ওয়্যার-হাউসগুলো ক্রমে ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠছে। কর্মসংস্কৃতি শূন্য। কর্পোরেট পুঁজি আর শ্রমিকের যেটুকু কল্যাণ– উভয়ের মধ্যে যোজন দূরত্ব। কর্মচারীদের শৃঙ্খল হারিয়ে যাওয়ার পরে, শোষণ ছাড়া হারানোর কিছু নেই।
কবি পুরন্দর ভাট আত্মহত্যা করেছেন। ডেডবডি হাওয়া! ঘরের ভিতরে পাওয়া গিয়েছে শুধু মরা ইঁদুর। বিকট গন্ধ! দেওয়ালে টাঙানো পুরন্দর ভাটের ছবি। গলায় মালা। আর পাওয়া গিয়েছে, একটা কবিতা! পুরন্দর লিখেছেন:
‘আমার জীবনে নাই কেন কোনো ড্রিম
টিকটিকি আমি, পোকা খাই, পাড়ি ডিম
আমার মরণে হয় না তো হেডলাইন
প্রাসাদ গাত্রে মুতিয়া ভাঙিব আইন…’

পুরন্দর ভাট কি একজন পরিযায়ী শ্রমিক? খেতমজুর? ডেলিভারি বয়? নৈহাটি-শিয়ালদা লোকালে ঝুরিভাজা বিক্রি করেন প্রতিদিন? নামমাত্র বেতনের বিনিময়ে নিজের শ্রম এবং আত্মা– উভয়ই বিক্রি করেছেন কলকারখানার মালিক অথবা কোনও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির কাছে? জন্মাবধি ছুটছেন। অক্লান্ত। অনর্গল। নিয়তি আসলে ১২ ঘণ্টার শিফট। বাকিটুকু নির্জীবের মতো ঘুম অথবা ঘুম নেই। তাই স্বপ্নের ফুরসত নেই।
দিনকয়েক আগেই, উত্তরপ্রদেশের নয়ডা শহর শ্রমিক আন্দোলনে উথালপাতাল হয়েছে! লাখো শ্রমিক চিৎকার করে বলছিলেন: এখনও একটি সাইকেল কেনার জন্য আমাদের সংসারের সাত-পাঁচ আর দীর্ঘ অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। অথচ আমাদের বস? বিএমডব্লিউ চড়ছে! কোনও জাদুবাস্তব পৃথিবী থেকে নেমে এসে, সেই বিএমডব্লিউ গাড়ির ওপরে পেচ্ছাপ করে দিলেন পুরন্দর ভাট। কী রেলায়! ভবিষ্যতেও দেবেন। টায়ার পোড়া গন্ধ, শ্রমিকের শেষ সঞ্চয়ের চিৎকারটুকু আর লাঠিচার্জের ভিতরে দাঁড়িয়ে লিখবেন আরও কবিতা।
অথবা হাজির হবেন, নিউ ইয়র্কে। ‘মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট’-এ। যে মিউজিয়ামের প্রাসাদসম গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত হয় মেট গালা– পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং চমকপ্রদ ফ্যাশন উৎসব! এ-বছর, সেই উৎসবের ‘গালা হোস্ট’ অর্থাৎ, শো রানার হয়েছেন জেফ বেজোস। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, কোনও ক্লাসিক ভাস্কর্যের পাশে, কখনও-বা ভ্যান গঘের পেইন্টিংসের নিচে ছোট ছোট বোতল। বোতলে পেচ্ছাপে। অ্যামাজনের অসংখ্য কর্মচারীর। গায়ে একটি স্টিকার সাঁটানো: বয়কট দ্য বেজোস মেট গালা। নিচে জেফ বেজোসের মুখে দারুণ হাসি। এই বোধহয় প্রথম, একজন শ্রমিকের পেচ্ছাপের ছিটেয়, সম্পূর্ণ ম্লান হয়ে গিয়েছে একজন কোটিপতির অট্টহাসির ছিটে। বহুকাল যাবৎ ওই হাসি থেকে দুর্গন্ধ বেরচ্ছে, হে পাঠক। মাছিও উড়ছে। স্মাইলিও। তাই কোনটা পেচ্ছাপ আর কোনটা হাসি– কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্কে। স্পষ্ট করে বলতে পারি না। পুরন্দর লিখেছিলেন:
‘চারদিকে ছনছন
সারা গায়ে ঘিন ঘিন
থই থই, ছপ ছপ
ইউরিন! ইউরিন!’

কিন্তু, হঠাৎ পেচ্ছাপ কেন? তাহলে বলি। অ্যামাজনের বিভিন্ন ওয়্যার-হাউসে কর্মরত যে-সমস্ত শ্রমিক, যারা এ-সমাজে উৎপাদন-ক্ষম, প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে ছোট একটি বোতল। ‘বাথরুম ব্রেক’ বলে আর কিছু নেই। যদি পেচ্ছাপ পায়, সেরে নিতে হবে বোতলেই। অর্থ হয়, অ্যামাজন মনে করে, আপনি একটি পণ্য। কমোডিটি। না-মানুষ। যেমন ইচ্ছে হবে, শুষে নেব। নিংড়ে নেব। ছিবড়ে করে ফেলে দেব বাজারে। তারপর আপন-সত্তা থেকে বিচ্ছিন্ন আপনি এবং আপনার অনন্ত অসাড়তার চারধারে পড়ে থাকবে শুধু টাকা। অথচ ছুঁতে পারবেন না! শ্রমের এহেন মূল্যের তত্ত্বকথাই লিখেছিলেন কার্ল মার্কস?
মেট্রোপলিটান মিউজিয়ামের বাইরে একটি সাইনবোর্ড। কয়েকটি ছোট বোতলের ছবি। পাশে লেখা: ভিআইপি টয়লেট। এ-বছরের গালা হোস্ট, জেফ বেজোসের সম্মানে নির্মিত। ছোট বোতল দেখামাত্র অযথা ঘাবড়াবেন না, নিশ্চিন্তে ব্যবহার করুন। যেভাবে তাঁর কর্মচারীরা ব্যবহার করছে। অন্তত শ্রেণিহীন একটা পেচ্ছাপ-স্থলের স্বপ্ন দেখতে আপত্তি কী? দেখব, পৃথিবীর তাবড় তাবড় ধনকুবেরের হাতে ছোট্ট বোতল। বোতলে পেচ্ছাপ। হলদেটে রং। মেট গালার রেড কার্পেট ধরে হেঁটে আসছে। অসংখ্য ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। ‘থই থই, ছপ ছপ/ ইউরিন, ইউরিন…’।

পুঁজিবাদের মুখে এহেন পেচ্ছাপ করে দিল কারা? প্রতিবাদে? প্রতিরোধে? ইংল্যান্ডের একটি রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট দল। নাম, ‘এভরিওয়ান হেটস ইলন’। জেফ বেজোসের ইমেজ এবং মেট গালার রোশনাই-মঞ্চ ব্যবহার করে, তারা দুনিয়ার কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল একটি মাত্র বার্তা: অ্যামাজনের ওয়্যার-হাউসগুলো ক্রমে ক্রমে অসহনীয় হয়ে উঠছে। কর্মসংস্কৃতি শূন্য। কর্পোরেট পুঁজি আর শ্রমিকের যেটুকু কল্যাণ– উভয়ের মধ্যে যোজন দূরত্ব। কর্মচারীদের শৃঙ্খল হারিয়ে যাওয়ার পরে, শোষণ ছাড়া হারানোর কিছু নেই। তারা এ-ও বলেছে, কিম কার্ডেশিয়ানকেও নিশ্চয়ই বাধ্য করা হবে ছোট বোতল ব্যবহারে? এ-যেন সেই দ্বন্দ্বেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। সাইকেল আর বিএমডব্লিউ। হায়াত রিজেন্সি আর মা কালী রোল সেন্টার। ঘুম অথবা ঘুম নেই। সবশেষে, শ্রেণি। যে-ধারণার ওপরে প্রতিদিন পেচ্ছাপ করে যাচ্ছে ইলন মাস্ক। জেফ বেজোস। বিল গেটস।
প্রবুদ্ধসুন্দর কর লিখেছিলেন:
‘আমাদের কোনও অস্ত্র নেই, সংগঠন নেই, ম্যানিফেস্টো নেই, কর্মসূচি নেই
বৃক্ক, আমাদের একমাত্র অস্ত্র…’

নৈহাটি-শিয়ালদা লোকালে সিট না-পেলেও, বাংলা সিনেমার পাশে না-দাঁড়ালেও, কর্মক্ষেত্রে বাথরুমে যাওয়ার অনুমতি না-পেলেও, শ্রমের উপযুক্ত মূল্য না-পেলেও, ধর্মনিরপেক্ষতার কথা কেউ না-শুনলেও, ধর্ষকেরা বিচার না-পেলেও, একটা প্রজন্ম চাকরি না-পেলেও, ভালোবাসা বিলিয়ে দিতে না-পারলেও, ইতিহাসের সিলেবাস বদলে গেলেও, আমাদের মনে রাখতে হবে বৃক্ক সচল রাখার কথা। ‘ভুলে যাবেন না, অনেক কিছুর ওপরই পেচ্ছাপ করে যেতে হবে আমাদের।’
………………………
রোববার.ইন–এ পড়ুন রোদ্দুর মিত্র-র অন্যান্য লেখা
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved