Cricket’s Biggest Battle India vs Pakistan। Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যুদ্ধ নয়, ক্রিকেট চাই

একসময় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ছিল মূলত ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি স্বাভাবিক পরিণতি। দুই দলের খেলোয়াড়রা মাঠে লড়তেন, ম্যাচ শেষে হাত মেলাতেন, কখনও হাসি-ঠাট্টাও করতেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দর্শকের কাছে ছিল আন্তরিক এবং বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ম্যাচ ক্রমশ রাজনৈতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ম্যাচ হবে কি, হবে না, কোথায় হবে, কোন মঞ্চে হবে– এইসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় ক্রিকেটীয় যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে এই ধারণা তৈরি হচ্ছে যে, খেলার পরিসরটি আর সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, বরং একটি বৃহত্তর ক্ষমতার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ২১:০৬   
Facebook WhatsApp Messenger

হার্দিক পান্ডিয়ার শেষ বল গিয়ে লাগল উইকেটে। যদিও ততক্ষণে ভারতের জয় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে। ড্রেসিংরুমে ছড়িয়ে পড়েছে শান্তির হাসি। সদা গম্ভীর থাকা গম্ভীরের মুখেও মুচকি হাসির ঝিলিক। গ্যালারি তখনও পূর্ণ। স্টেডিয়ামে উপস্থিত দুই দেশের ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। ক্যামেরায় বারবার ধরা পড়ছিল রোহিত শর্মা আর জয় শাহের হাসিমুখের ছবি। উল্টোদিকে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান মহসিন নকভিকে বেশ কয়েকবার দেখা গেলেও, ম্যাচ শেষের আগে তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান! যদিও ছিলেন ওয়াসিম আক্রম। ম্যাচের শুরুতে তাঁকে রোহিত শর্মার সঙ্গে খোশমেজাজে দেখা গিয়েছিল। একে অন্যকে জড়িয়েও ধরেন। কিন্তু ম্যাচ জুড়ে নিরুত্তাপের ছবি। দেখে বোঝার উপায় নেই, এটা একটা হাইভোল্টেজ ম্যাচ। ভারত জিতল, তবুও বুকের ভেতরে সেই উচ্ছ্বাসটা এল না। মনে হল, কী যেন একটা নেই। হু হু করে উঠল মাথার ভেতরটা, মনে পড়ে গেল, ২০০৩ সালের বিশ্বকাপের ভারত-পাক ম্যাচের কথা। তখন আমার বয়স দু’সংখ্যার ঘরে যায়নি। ক্রিকেট বোঝার মতো দক্ষতা আসেনি। ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে কিছুই জানি না। কিন্তু ততদিনে এ-টুকু বুঝে গিয়েছি, ভারত-পাকিস্তান মানে একটা উত্তেজনাপূর্ণ খেলা। তখন শচীন, সৌরভ, শেহবাগ, যুবরাজের দাপট। উল্টোদিকে, ইনজামাম-উল-হক, শোয়েব আখতার, আফ্রিদির হুংকার। তখনও সব বাড়িতে টিভিও নেই। যে গুটিকয়েক বাড়িতে টিভির সংযোগ ছিল, তাদের বাড়ির চৌহদ্দিটা লোকে লোকে পূর্ণ হয়ে যেত। বাড়ির বাইরেও ভিড় করত উৎসাহীদের দল। ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কেউ উঠত না। ম্যাচ জিতলে গোটা পাড়ায় আলোর ফোয়ারা, উৎসব।

zoom
বিশ্বকাপে শচীন-ঝড়। সেঞ্চুরিয়ন, ২০০৩

তখনও তো ভারত-পাক সম্পর্ক তলানিতে। কিন্তু কোনও দিন তার প্রভাব সরাসরি ক্রিকেটে পড়েনি। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের খেলা মানেই ছিল ডোপামিন নিঃসরণ। খেলার আগে এবং পরে খবরের চ্যানেলে চুলচেরা বিশ্লেষণ হত। খেয়াল আছে, একবার ভারত-পাকিস্তানের ম্যাচের পরে এক বিএসএফ জওয়ান সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘এমন দিনে ভারত জিতলে জওয়ানরা খুশি হয়ে যায়। আমরা সেদিন রাতে শিকারে বেরই।’ এর থেকেই চিত্রটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারত-পাক মহারণ কোনও দিনই শুধু ২২ গজের খেলা ছিল না। যতবারই ভারত-পাক ম্যাচ হয়েছে, ততবারই রাজনীতি গরম হয়েছে। বাক্যবিনিময় হয়েছে। খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে দু’দেশের রাজনীতিকরা। সমাজমাধ্যমের যুগে দু’দেশেরই খেলোয়াড়রা ট্রোলিংয়ের শিকার হয়েছেন। তবুও খেলার মাঠের যে শৃঙ্খল ছিল, সেই শৃঙ্খল কিন্তু কোনও দিনই কেউ ভাঙেনি। খেলার শেষে হাতও মেলিয়েছেন দু’দেশের খেলোয়াড়রা। কিন্তু এখন? হাত মেলানো তো বহুদূরের ব্যাপার, ম্যাচ হবে কি হবে না– সেই নিয়ে শুরু হয়েছে কূটনৈতিক চাল। আসরে নামে ক্ষমতায় থাকা বিজ্ঞজনেরা। তারপর কোনও অদৃশ্য ক্ষমতায় পাল্টে যায় খেলার জায়গা। বদলে যায় নিয়ম। খেলা হলেও সেই খেলায় উত্তাপ থাকে না। সেই খেলায় মোহ থাকে না। জীবনানন্দের মতো ধূসর হয়ে থাকে সবটুকু। কোথায় যাচ্ছি আমরা? জাতীয় স্তরের একটা ক্রীড়াকে আমরা ক্রমশ সংকুচিত করে দিচ্ছি। খেলার মাঠেও রাজনীতির রং ঢোকাচ্ছি। যখন দুটো দল একই মাঠে খেলতে পারছে, তাহলে কেন তারা খেলার শেষে হাত মেলাবে না? কেন তারা আগের মতো উত্তেজনাপূর্ণ একটা ম্যাচ উপহার দেবে না অসংখ্য ক্রিকেট ভক্তদের?

zoom
করমর্দনহীন ভারত-পাক মহারণ, টসের সময় দুই দলের অধিনায়ক

অনেকে বলতে পারেন, আগের মতো সেই পাকিস্তানের টিম নেই। সেই ভয়ংকর লাইন আপ নেই। ভারত এখন শক্তিশালী দল। বিগত দুটো আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত তার প্রমাণ দিয়েছে। ম্যাচ একতরফা হয়েছে। শাহিন আফ্রিদি থেকে বাবর আজম– কেউই দাগ কাটতে পারেনি। কোহলি, রোহিতবিহীন ভারত সাবালক হয়েছে। কিন্তু এর মধ্যেই নাবালক রাজনীতির ছোঁয়া রয়ে গিয়েছে। ম্যাচ খেলতে পারলে কেন তারা হাত মেলাতে পারবে না? মাঠের বাইরে হিংসা থাকতেই পারে, তা বলে সেই হিংসার আঁচ কেন ২২ গজের ভিতরে আসবে? রবিবার ভারত-পাক ম্যাচ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, কিছু একটা নেই। বড্ড শূন্যতায় ভরা চারিদিক।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হল সমষ্টিগত আবেগ এবং অভিজ্ঞতার ভাঙন। সামাজিক মনোবিজ্ঞানে ‘ইমোশানাল কনটাজিওন’ (emotional contagion) নামে একটি ধারণা আছে, যার অর্থ হল আবেগের সংক্রমণ। অর্থাৎ, যখন বহু মানুষ একই জায়গায় বসে একই ঘটনার সাক্ষী হন, তখন একজনের উত্তেজনা, আনন্দ বা হতাশা দ্রুত অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়ায় মানুষের স্নায়ুতন্ত্র প্রতিক্রিয়া জানায় এবং মস্তিষ্কে ডোপামিন ও অ্যাড্রেনালিনের নিঃসরণ বাড়ে, ফলে আবেগের তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একসময় ক্রিকেট দেখার অভিজ্ঞতা ছিল এমনই একটি সমষ্টিগত পরিসর– যেখানে খেলার প্রতিটি মুহূর্ত ব্যক্তিগত অনুভূতির পেরিয়ে পরিণত হত সামাজিক আবেগে। কিন্তু এখন ব্যক্তিগত মোবাইল ও একাকী দেখার অভ্যাস সেই যৌথ আবেগের পরিসরকে ভেঙে দিয়েছে। ফলে উত্তেজনা তৈরি হলেও তা আর অন্যের প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে না, বরং ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই কারণেই খেলার ফলাফল একই থাকলেও, তার আবেগের অভিঘাত আগের মতো তীব্র হয়ে ওঠে না।

zoom
পাকিস্তানকে হারিয়ে টিম ইন্ডিয়ার উচ্ছ্বাস

একসময় ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ছিল মূলত ক্রিকেটীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি স্বাভাবিক পরিণতি। দুই দলের খেলোয়াড়রা মাঠে লড়তেন, ম্যাচ শেষে হাত মেলাতেন, কখনও হাসি-ঠাট্টাও করতেন। এই পুরো প্রক্রিয়াটি দর্শকের কাছে ছিল আন্তরিক এবং বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ম্যাচ ক্রমশ রাজনৈতিক সম্পর্ক, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। ম্যাচ হবে কি, হবে না, কোথায় হবে, কোন মঞ্চে হবে– এইসব সিদ্ধান্ত অনেক সময় ক্রিকেটীয় যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। ফলে দর্শকের মনে এই ধারণা তৈরি হয় যে, খেলার পরিসরটি আর সম্পূর্ণ স্বাধীন নয়, বরং একটি বৃহত্তর ক্ষমতার কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

একসময় এই ম্যাচকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হত ধীরে ধীরে। সংবাদপত্রের শিরোনাম, টেলিভিশনে আলোচনা এবং মানুষের মুখে মুখে ঘোরা গল্পের মাধ্যমে। সেই প্রতীক্ষার মধ্যে ছিল এক ধরনের আবেগের সঞ্চয়। কিন্তু এখন ২৪ ঘণ্টার সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমের যুগে সেই বিশেষত্ব অনেকটাই ম্লান। ম্যাচের আগে, পরে এবং মাঝখানে অবিরাম বিশ্লেষণ, বিতর্ক এবং কনটেন্ট এই খেলাকে এক অনবরত উপস্থিত ঘটনায় পরিণত করেছে। ফলে ম্যাচটি আর আলাদা কোনও মুহূর্ত বলে মনে হয় না, বরং একটি চলমান মিডিয়া চক্রের অংশ হয়ে ওঠে। এই অতিরিক্ত উপস্থিতিই ধীরে ধীরে উত্তেজনার তীব্রতাকে ভোঁতা করে দিয়েছে।

zoom
গ্যালারির প্রতিদ্বন্দ্বিতা উধাও ২২ গজের লড়াইয়ে

১৯৯৯ সালের চেন্নাই টেস্টের সেই ঘটনা বারবার মনে পড়ছিল। সেই ম্যাচে নাটকীয়ভাবে জিতেছিল পাকিস্তান। ভারতের পরাজয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল চিপক স্টেডিয়াম। কিন্তু খেলা শেষে যা ঘটেছিল, তা ক্রিকেটের ইতিহাসে বিরল। প্রায় গোটা স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে পাকিস্তান দলকে অভিবাদন জানিয়েছিল। প্রতিপক্ষ জিতেছে, তবুও তাকে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করেননি দর্শকরা। সেই দৃশ্য প্রমাণ করেছিল, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যতই তীব্র হোক, ক্রিকেট শেষপর্যন্ত ছিল একটি মানবিক সম্পর্কের জায়গা। আজ, যখন হাত মেলানো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই চেন্নাইয়ের বিকেল যেন আরও দূরের কোনও সময়ের গল্প বলে মনে হয়। এইভাবে চলতে থাকলে ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ ধীরে ধীরে একটি স্বতঃস্ফূর্ত ক্রীড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রতীকী ইভেন্টে পরিণত হবে। খেলা হয়তো চলবে, কিন্তু তার আবেগ, তীব্রতা আর আগের মতো থাকবে না।

zoom
সৌজন্যের এই ছবিটাই হারিয়ে যেতে বসেছে ভারত-পাক দ্বৈরথ থেকে

তাহলে ভারত-পাক ম্যাচের উত্তেজনা কি নেই? আছে। সে উত্তেজনা ভাগ হয়ে গিয়েছে দু’দলের দর্শকে। একদল, যাঁরা পাকিস্তান ক্রিকেটের সুসময় দেখেছেন। যাঁরা দেখেছেন ওয়াকার ইউনিস, ইনজামাম-উল-হক, আব্দুল রজ্জাক কিংবা শোয়েব আখতারদের। নস্টালজিয়ার চোটেই হয়তো তাঁদের বুক ধুকপুক করে খানিক বেশি। আরেক দল, তাঁরা ঠিক ক্রিকেটীয় বিচারে পাকিস্তানকে দেখেন না। তাঁরা যেনতেন প্রকারেণ জিততে চান। ভারতীয় ক্রিকেট তাঁদের আস্ফালনের অঙ্গমাত্র, তাঁরা ক্রিকেট দর্শক নন।

এখন প্রশ্ন, ভারতীয় ক্রিকেট এখন ঠিক কোন দর্শক আশা করে? তার উত্তর আপনারা নিশ্চিতভাবেই জানেন।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন আদিত্য ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

………………………

Hardik Pandya india vs pakistan No Handshake Rivalry SachinTendulkar Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar T20 World Cup Wasim Akram world cup

Share this article on