


১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই, ধরায় আগমন থেকে ২০২৬ সালের ১৭ই জুলাই– শেষের দিনটা আসার বহুকাল আগেই, আজ থেকে প্রায় ৫২ বছর আগে, ক্রিকেট-মঞ্চ থেকে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। আজ বিদায় নিলেন ইহজীবনের মঞ্চ থেকে। ভালো থাকবেন স্যর গ্যারি। কৈশোরে পুলিশ-ব্যান্ডের বাদ্যকর, যৌবনে ক্রিকেটার, অবসর-জীবনে ভাষ্যকার ও প্রশিক্ষক, সর্বোপরি ক্রিকেট-খেলার সেরা ব্র্যান্ড-রাষ্ট্রদূতদের অন্যতম– আমার প্রিয় গ্যারি!
‘জয় জয়ন্তী’ ছবির সেই গানটা মনে পড়ে? ১৯৭১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত উত্তম-অপর্ণা জুটির জনপ্রিয় ছবির বিখ্যাত সেই গানের গীতিকার শ্যামল গুপ্ত, সুরকার মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, গায়িকা সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়– কেউ-ই আজ পৃথিবীতে নেই। চলে গিয়েছেন গানের কথার (তৎকালীন জীবিত) চরিত্ররাও– নিল আর্মস্ট্রং, তেনজিং নোরগে, ব্রাজিলের পেলে– এবার চলে গেলেন গারফিল্ড সোবার্সও, নড়বড়ে ৯০ ছোঁয়ার থেকে মাত্র ১১টা দিন আগেই।

১৯৩৬ সালের ২৮ জুলাই, ধরায় আগমন থেকে ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই– শেষের দিনটা আসার বহুকাল আগেই, আজ থেকে প্রায় ৫২ বছর আগে, ক্রিকেট-মঞ্চ থেকে অবসর নিয়েছিলেন তিনি। আজ বিদায় নিলেন ইহজীবনের মঞ্চ থেকে। ভালো থাকবেন স্যর গ্যারি। কৈশোরে পুলিশ-ব্যান্ডের বাদ্যকর, যৌবনে ক্রিকেটার, অবসর-জীবনে ভাষ্যকার ও প্রশিক্ষক, সর্বোপরি ক্রিকেট-খেলার সেরা ব্র্যান্ড-রাষ্ট্রদূতদের অন্যতম– আমার প্রিয় গ্যারি!
ক্রিকেটার সোবার্সকে নিয়ে, তাঁর দক্ষতা, তাঁর কীর্তি, তাঁর পরিসংখ্যান নিয়ে বহু চর্চা হয়েছে, হবেও, হওয়াটাই দরকার। কিন্তু এখানে আজ আমি বলব ‘আমার স্বচক্ষে দেখা’ সোবার্সকে নিয়ে।

‘চল, তোকে আজ একটা দারুণ জিনিস দেখিয়ে আনি’, ছুটির দিন সক্কাল-সক্কাল চা খেতে খেতে বলল মানসদা। আমার এলাহাবাদ-প্রবাসী মেজপিসিমার এই ছেলেটি তখন কলকাতায় আমাদের সঙ্গেই থাকত, আর কাজ করত এক ওষুধ কোম্পানিতে। খুব হই-চই করতে পারত, আমাকে খুব ভালোবাসত, আর ছিল ক্রিকেট-পাগল। ছুটির দিন তার সঙ্গে বাড়ির গায়ের সরু গলিতে প্রায়ই আমার ‘পতৌদি’ হওয়ার ব্যাটিং-সাধনা চলত টেনিস বল দিয়ে– টাইগার তখন আমার ‘ক্রিকেটীয় আইডল’, আজও আছেন!

যাই হোক, কথা শুনেই তো আমি চোঁ-চোঁ করে হাতের বোর্নভিটার কাপটা শেষ করে একপায়ে খাড়া। চটপট স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে একটা কালো-হলুদ অ্যাম্বাসাডর ট্যাক্সি ধরে সোজা ইডেন গার্ডেন্স; ওর লাগোয়া সুন্দর বাগানটায় আমি বাবার সঙ্গে আগে একবার গিয়েছি, প্যাগোডা দেখেছি, আইসক্রিম খেয়েছি; কিন্তু এবার এক সম্পূর্ণ অন্য অভিজ্ঞতা।
সেটা ১৯৬৪ সাল, এপ্রিল মাস। গরম পড়তে শুরু করেছে। খোলা গ্যালারিতে রোদ বেশ কড়কড়ে হচ্ছে। কিন্তু আমার সামনে ‘সবুজ দিগন্তে এখন ম্যাজিক’– খেলা যে শুরু! কোন খেলা? জেনে নিন।
‘E W Swanton, a famous British journalist and sportswriter, organized and managed a Commonwealth XI, including Sobers, Benaud, the Nawab of Pataudi, Sonny Ramadhin, Seymour Nurse, Richard Hutton (son of Sir Len), etc. that played against an Indian XI (led by Chandu Borde) at Calcutta in April 1964.’

ঘণ্টাদুয়েক বাদে ক্রিকেটের সেই ম্যাজিক-আবেশ ভেঙে দিয়ে মানসদা বলল, ‘চল, তোকে এবার বাড়ি দিয়ে আসি। ভাত খেয়ে তো আসিসনি আর এই চড়চড়ে রোদ। আর দেরি করলে ছোটমামা রাগ করবে, মামি খুব চিন্তা করবে, তোর শরীর খারাপও করতে পারে।’ ‘ছোটমামা’, অর্থাৎ আমার পিতৃদেব, একটু নিয়মনিষ্ঠ মানুষ।
আমার তো মাথায় বজ্রাঘাত! ওই ‘উল্টোহাতে’ ব্যাটসম্যানটার (তখনও ‘রাজনৈতিকভাবে সঠিক’ ‘ব্যাটার’ কথাটা চালু হয়নি!) খেলা শেষতক না-দেখে ‘পাদমেকং ন গচ্ছামি’। পরের মিনিট-দশেক ধরে মানসদার অনুনয়-বকাবকি-ভয় দেখানো সব বিফল। কেন যে ছাই সবাই দ্রাবিড় বা পূজারাকে ‘দ্য ওয়াল’ বলেন! আমার সেই স্টোন-ওয়ালিং তো আর দেখেননি মশাই! অতএব গ্যালারির পিছনের স্টল থেকে কেনা দু’টি শশার স্যান্ডউইচ আর একটি ডিমসেদ্ধর সঙ্গে কলের ‘বিশুদ্ধ পানীয় জল’ দিয়ে আমার লাঞ্চ; তারপর…
দিনের শেষ অবধি খেলা দেখে সেই ‘উল্টোহাতে’ ব্যাটসম্যানটার সেঞ্চুরিতে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে আনন্দে ভাসতে ভাসতে চৈত্রের কড়া রোদে-ঝলসানো চেহারা নিয়ে শেষ বিকেলে বাড়ি ফেরা।
বাড়ি ফিরে বাবার বকুনি, মায়ের অনুযোগ,আর মানসদার কৈফিয়তের মাঝে আমার বাকি জীবনটার মনের খোরাক জোগাড়ের একটা ভিত গেঁথে দিল ইডেনের সবুজ ঘাসে জাদু-দেখানো সেই ‘উল্টোহাতে’ ব্যাটসম্যান– বাঁ-হাতি গ্যারি সোবার্স! আমি পেয়ে গেলাম আমার আরেক ‘ক্রিকেটীয় আইডল’, যিনি আজও ওই ভূমিকায় রয়ে গিয়েছেন এই ৬২ বছর পরেও, পরবর্তীকালের এতজন মহান ক্রিকেটারদের দর্শন পাওয়া সত্ত্বেও।

আমার ক্রিকেট-প্রেম যে এত প্রগাঢ় হবে তাতে আর আশ্চর্য কোথায়? জীবনে প্রথম সত্যিকারের ক্রিকেট ম্যাচ আমি দেখি ইডেন গার্ডেন্সে, আর সেঞ্চুরি করে সেখানে আমাকে স্বাগত জানান গ্যারি সোবার্স– আর কোনও কথা আছে! ‘থ্যাঙ্ক ইউ, মানসদা অ্যান্ড গ্যারি’!
চলে আসি ১৯৬৭ সালের ৫ জানুয়ারির ইডেনে। ১ জানুয়ারির সেই লঙ্কাকাণ্ডের পর দু’দিন বাদে আবার ম্যাচ চালু। ভারত ফলো-অন করে শেষদিন ব্যাট করতে নেমেছে, ১৩৩/৫, তখনও ৯০ রানে পিছিয়ে– সাজঘরে ফিরে গিয়েছেন বুধি কুন্দেরন, রুসি সুর্তি, এম এল জয়সিমহা, টাইগার পতৌদি ও চান্দু বোরদে, আহত-অসুস্থ আব্বাস আলি বেগ ব্যাট করবেন কি না, তা অনিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে উইকেটে লড়ে যাচ্ছেন হনুমন্ত সিং ও ভেঙ্কটরমন সুব্রহ্মণ্য, ১০৮/৫ থেকে দলকে টেনে তুলেছেন ১৫৫-তে।

কিছুটা পুরনো বল হাতে সোবার্স স্পিন-বোলিং করতে শুরু করেছেন, মুখোমুখি ব্যাট হাতে ডান-হাতি হনুমন্ত। একটা ডেলিভারি লেগ-স্টাম্পের বেশ কিছুটা বাইরে, হনুমন্ত ছেড়ে দিলেন, কিপার হেনড্রিক্সের হাতে গেল। পরের ডেলিভারিটাও লেগ-স্টাম্পের খানিক বাইরে, হনুমন্ত এবারও ছেড়ে দিলেন, বল গেল হেনড্রিক্সের হাতে। পরের ডেলিভারিটা লেগ-স্টাম্পের একটু বাইরে, হনুমন্ত খেলতে গিয়েও ছেড়ে দিলেন, হেনড্রিক্স ধরলেন। এর পরেরটা লেগ-স্টাম্পের সামান্য বাইরে, হনুমন্ত ছাড়লেন আর বলটা ঢুকে এসে উইকেট ভেঙে দিল– হনুমন্ত বোল্ড সোবার্স ৩৭, গ্যারির বোলিং-চাতুরিতে। বলটা ছাড়ার সময় কোণ-বদল, বলের লাইনে সূক্ষ্ম হেরফের, লেংথের পারিপাট্য আর স্পিনের নিয়ন্ত্রণ– তখন সেই ছোটবেলায় তো আর অত কিছু বুঝতাম না, তবে এটুকু বুঝেছিলাম ‘বোকা বানিয়ে আউট করা’ কাকে বলে!

এরপর ২৩ রানের মধ্যে ইনিংস শেষ! ভারত হারল এক ইনিংস ও ৪৫ রানে, তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ০-২ পিছিয়ে গেল। সেই ম্যাচে গ্যারির অবদান ৮৫ মিনিটে ৭০ রান এবং বোলিংয়ে দু’ইনিংস মিলিয়ে ৪৮.৫-১৮-৯৮-৭, দু’বারই পেস দিয়ে (চার্লি গ্রিফিথের সঙ্গে) বোলিং ওপেন করে পরে স্পিনের খেলা, ক্যাচ অবশ্য একটাও ধরেননি। তখন তো ‘ম্যাচ সেরা’ পুরস্কার দেওয়ার চল ছিল না, কিন্তু বুঝতে অসুবিধে নেই, সেটা কে ছিলেন।
কেমন ছিলেন গ্যারি সোবার্স? এর উত্তর দেওয়ার মতো অনেকেই আছেন। ভারতীয়দের মধ্যে চান্দু বোরদে, ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার, এরাপল্লি প্রসন্ন, সুনীল গাভাসকর এবং রাজু মুখোপাধ্যায়ের নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। তাঁরা অবশ্যই অনেক ভালো জানেন এবং বোঝেন।

এমসিজি-তে ১৯৭১-’৭২ মরশুমে অবশিষ্ট বিশ্ব একাদশের হয়ে অজিদের বিরুদ্ধে খেলা ওঁর সেই ২৫৪ রানের ইনিংসটার ভিডিও হাইলাইটস বা ১৯৬৮-তে ইংলিশ কাউন্টি মরশুমে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামারগনের বিরুদ্ধে এক ওভারে ছ’বলে ছ’টা ছয় মারার ভিডিও নিশ্চয়ই কিছু ক্রিকেটপ্রেমী দেখেছেন। তাঁরা হয়তো কিছুটা আভাস পাবেন, যদিও হাইলাইটস দেখে খেলোয়াড় বিচার করাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়, বরং অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রত্যক্ষদর্শীদের লেখা অনেক বেশি নির্ভরযোগ্য, তবে পুরো ইনিংসের ভিডিও হলে তো কথাই নেই।
নিজেকে সেই ‘অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রত্যক্ষদর্শী’র দলে রাখার মতো ঔদ্ধত্য বা দুঃসাহস বা নির্বুদ্ধিতা কোনওটাই আমার নেই, তবে একজন ক্রিকেট-রসিক হিসেবে ‘সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার’ বলতে আমার চোখে ওই ‘ফাইভ-ইন-ওয়ান’ (বাঁ-হাতি ব্যাটার, ক্লোজ-ইন ফিল্ডার, বাঁ-হাতি পেসার, বাঁ-হাতি অর্থোডক্স স্পিনার, বাঁ-হাতি চায়নাম্যান বোলার) ক্রিকেটার ভদ্রলোকটিই রয়ে যাবেন, একমেবাদ্বিতীয়ম সেই স্যর গারফিল্ড সেন্ট অব্রান সোবার্স।
খেয়াল করুন, লেখার শুরুতে উল্লেখ করা গানটার সেই লাইন, ‘…লোকে মনে রাখবে, ইতিহাসে নাম লেখা থাকবে।’
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved