Robbar

অমরত্বের ২৯ জুলাই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 28, 2026 9:31 pm
  • Updated:July 28, 2026 9:43 pm  

২৯ জুলাই, ১৯১১। সেদিন শিল্ডের ফাইনালে ক্যালকাটা মাঠে প্রায় এক লক্ষের মতো লোকের উপস্থিতি ছিল। চারদিকে হাজার হাজার মানুষের কালো মাথা। পথের ধারে, মাঠের কাছাকাছি গাছের ডালেও মানুষের ভিড় ছিল অবাক করা। এই জনসমুদ্র যে শুধু ‘নেটিভ’দের ছিল, তা নয়, গোরা-সাহেবমহলেও এই ফাইনাল খেলা নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে গিয়েছিল। তবে বাংলা ও বাঙালির একটাই আকাঙ্ক্ষা সেদিন আবর্তিত হচ্ছিল শহর জুড়ে, তা হল– গোরা-পল্টনদের হারিয়ে মোহনবাগানের জয়।

অর্ঘ্য দে

জুলাই মাসের ২৯ তারিখ। সময় সকাল ১১টা। ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবের মাঠে, মাঠের আশেপাশে অগুনতি মানুষের ভিড়। এমন অবিশ্বাস্য জমায়েতের কারণ কোনও ব্রিটিশ-বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিবাদ কিংবা স্বদেশি আন্দোলন নয়। বিকেল পাঁচটায় শুরু হবে আইএফএ শিল্ডের ফাইনাল! অথচ খেলা শুরুর অনেক আগে থেকেই হাজার হাজার দর্শকের মাঠে সমাগম চোখে পড়ার মতো।

মোহনবাগানের অমর একাদশ

ভিড় না বলে জনসমুদ্র বলাই ভালো। তা ঠেলে স্ট্র্যান্ড রোড থেকে ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র ক্রীড়াসাংবাদিক গণেন মল্লিক আর এগতেই পারেননি! তাঁর সাংবাদিকতার জীবনে এ-ছিল অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা। সারি সারি গাড়ি দাঁড়িয়ে। ফাইনাল বলে কথা! শুধু যে কলকাতা বা তার কলকাতা-সংলগ্ন জেলা, মফস্‌সল থেকে উৎসাহী দর্শক ভিড় জমিয়েছিল, তা নয়। পাটনা, পূর্ণিয়া এমনকী অসম এবং পূর্ববঙ্গের ঢাকা-সহ অন্যান্য জেলা থেকেও হাজির ছিল বহু দর্শক।

সেদিন সন্ধ্যায় বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ আয়োজন করতে চলেছিল ইন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণসভা। ফাইনাল খেলা দেখার উদ্দীপনা, উৎসাহ এতটাই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, কর্তৃপক্ষ সেই অনুষ্ঠান স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছিল। নজিরবিহীন এমন ঘটনার আসল স্থপতি পরাধীন ভারতের সংকল্পবদ্ধ ১১ জন বাঙালি ও তাঁদের ফুটবল ক্লাব। সেই ক্লাব– মোহনবাগান!

মোহনবাগান ক্লাব

১৮৯০ সালে মন্মথ গাঙ্গুলির ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন’ চারবার কোচবিহার কাপ জিতে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। এরপর ১৯০০ সালে প্রথম ভারতীয় দল হিসেবে ট্রেডস কাপ জেতে তারা। ক্লাবটির এই ময়দানি সাফল্য ছিল পরাধীন জাতির একটি স্পষ্ট প্রতিবাদী বার্তা। ১৮৮৯ সালে ১৫ আগস্ট, মোহনবাগান ভিলার মাঠে জন্ম নিয়েছিল মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব।

ময়দানি বিভিন্ন ক্লাবের ভাঙাগড়া, পরিবর্তন বা বিবর্তনের আবহে, ১৯০৫ সালের ২০ জুলাই, বড়লাট বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করলেন। লর্ড কার্জনের দাম্ভিক কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হল– ‘The partition of Bengal is settled fact’ বড়লাটের এই উক্তির বিরোধিতা করলেন রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রতিবাদ জানিয়ে বললেন, ‘We shall make the settled fact unsettled.’

বাংলা তথা ভারতে অগ্নিযুগের সূচনা হল। পরাধীন ভারতের তৎকালীন রাজধানী বাংলা ছিল বিপ্লবের আঁতুড়ঘর। প্রশাসনিক অসুবিধার কারণ দেখিয়ে বাংলাকে ভাগ করার পিছনে বড়লাটের অভিসন্ধি ছিল ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’। বড়লাটের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে বাংলা-জুড়ে শুরু হল বয়কট আন্দোলন, অরন্ধন কর্মসূচি। হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি মজবুত করতে কবিগুরু আয়োজন করলেন ‘রাখিবন্ধন’ উৎসবের। লাগাতার প্রতিবাদ আন্দোলনের মাধ্যেই ১৯০৮ সালে ঘটল মুজফ্ফরপুর বোমা হামলা। অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডের গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছুঁড়লেন ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকী। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত কেঁপে উঠল।ঘটনার তদন্তে আলিপুর বোমা মামলায় গ্রেফতার হলেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, কানাইলাল দত্ত, সত্যেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ বিপ্লবীরা।

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে মুখর বাংলা

এই আবহের মধ্যে দিয়েই ক্রমশ ইতিহাসের দিকে এগিয়ে চলেছিল মোহনবাগান। ১৮৮৯-তে তৈরি হওয়া মোহনবাগান ক্লাবের উত্থান কিন্তু ১৯০৪ ও ১৯০৫-এ দু’বার কোচবিহার কাপ জয়ের পর। সময়ের নিরিখে বিচার করলে স্বদেশি আন্দোলনের সূচনা আর মোহনবাগান ক্লাবের উত্থানের শুভারম্ভ ঘটেছিল একই সময়ে। এ এক অদ্ভুত সমাপতন! সেই বছর চুঁচুড়ায় অনুষ্ঠিত গ্ল্যাডস্টোন কাপের ফাইনালে ডালহৌসি দলের মুখোমুখি হয়েছিল মোহনবাগান। ট্রেনপথে নৈহাটি থেকে চুঁচুড়া আসার পথে ট্রেনে যুযুধান দুই পক্ষের দেখা হয়। মোহনবাগানের সচিব শৈলেন বসু ট্রেনের কামড়ায় ডালহৌসি ক্লাবের সাতজন খেলোয়াড়কে দেখতে পান। শোনা যায়, কৌতূহলবশত শৈলেন বসু বাকি খেলোয়াড়দের ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রতিপক্ষ ক্লাব না কি উত্তরে বলেছিল যে, নেটিভ মোহনবাগানকে হারাতে তারা সাতজনই যথেষ্ট। আত্মতুষ্টির ফল অবশ্য ভোগ করেছিল ডালহৌসি। অপমানের যোগ্য জবাব দিয়ে চুঁচুড়া মাঠে সেদিন ইতিহাস লিখেছিল মোহনবাগান। ডালহৌসি ক্লাবকে ৬-১ গোলে হারিয়ে তাদের যাবতীয় অহংকার ধূলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।

১৯০৬ থেকে ১৯১১– স্বদেশি যুগের সূচনা থেকে শুরু করে বঙ্গভঙ্গ রদ, এই সময়টা ছিল ময়দানের ইতিহাসে ‘মোহনবাগান যুগ’। ১৯০৬-১৯০৮, মোহনবাগান ক্লাব পরপর তিনবার ট্রেডস কাপ জয় করে। যা ছিল ফুটবল মাঠে বাঙালির প্রত্যয়ের যথার্থ প্রকাশ। এই জয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে মোহনবাগান ক্লাব আইএফএ শিল্ডে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

স্বদেশি যুগের সশস্ত্র বিপ্লব, ইংরেজ সরকারের বিদ্রোহ দমন, কিংবা পরাধীন জাতির ওপর ইংরেজদের একচ্ছত্র শাসনে বাঙালিদের মনে ক্ষোভ জমছিল। জেলবন্দি বিপ্লবীদের ওপর অকথ্য অত্যাচার, আলিপুর বোমা মামলায় অরবিন্দ ঘোষের গ্রেফতারি, কয়েকজন বিপ্লবীর ফাঁসি থেকে শুরু করে মামলায় উল্লাসকর দত্ত, বারীন্দ্রকুমার ঘোষের মতো মূল অভিযুক্তদের দ্বীপান্তর– এইসব ঘটনায় বাঙালিদের মনে তীব্র ব্রিটিশ-বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়। বঙ্গসমাজ তখন সমস্ত ক্ষোভ উগড়ে দেওয়ার মঞ্চ খুঁজছিল। ময়দানি লড়াই আর মনোরঞ্জনের নেপথ্যে বাঙালির মনে অজান্তেই গড়ে উঠছিল জাতীয়তাবোধ।

……………………………

ফাইনাল খেলা শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল পাঁচটায়। কিন্তু দুপুর দুটো নাগাদই মাঠে জনপ্লাবন! ভাবতে অবাক লাগে টিকিটের চাহিদা ছিল এতটাই যে, দু’টাকার টিকিট ১৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল! সে-যুগে ১৫ টাকার মূল্য কত ছিল, তা আন্দাজ করতে ভিরমি খেতে হয়। খেলা শুরুর আগেই টিকিট নিয়ে এমন কালোবাজারি ইতিপূর্বে কেউ দেখেছিল কি না সন্দেহ।

……………………………

আগের দু’দশকে ইংরেজদের বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বাঙালির একজোট হয়ে লড়াইয়ের মানসিকতা দেখা যায়নি। নিজেদের মধ্যে দলাদলি, ঈর্ষাই ছিল তাদের ঐক্যের পথে অন্তরায়। তবে নতুন শতাব্দীতে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছিল– ‘আমরা’ বনাম ‘ওরা’র দ্বন্দ্ব, জাতি এবং শ্রেণির বৈষম্য।

আইএফএ শিল্ডের খেলায় প্রথম রাউন্ডে মোহনবাগান সেন্ট জেভিয়ার্সকে ৩-০ গোলে হারায়। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় রাউন্ডে রেঞ্জার্স আর রাইফেল ব্রিগেডকে ২-১ এবং ১-০ গোলে পরাজিত করে। প্রথম সেমিফাইনাল মোহনবাগানের সঙ্গে ফার্স্ট মিডলসেক্স রেজিমেন্টের খেলা ১-১ গোলে অমীমাংসীতভাবে শেষ হয়েছিল। ফলত আরেকবার এই দুই দলের মধ্যে সেমিফাইনাল খেলা হয়। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মোহনবাগান ৩-০ গোলে জিতে যায়।

শিল্ডে মোহনবাগানের অপরাজিত থাকার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে দেরি হয়নি। স্বদেশি আন্দোলন বাঙালির মনের গভীরে কতটা যে শিকড় বিস্তার করেছিল, তার প্রমাণ আইএফএ শিল্ডের ফাইনালের দিন। ক্যালকাটা ফুটবল ক্লাবের মাঠে এই অনিয়ন্ত্রিত ভিড় এবং দর্শকদের লাগামছাড়া উচ্ছ্বাস ছিল স্বাদেশিকতার বেনজির দৃষ্টান্ত।

এর আগে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন বা মোহনবাগান ট্রফি জিতলেও সেসব টুর্নামেন্টে ইংরেজ রেজিমেন্টের দাপুটে দলগুলো খেলেনি। তাই শিল্ডের মেজাজ এবং মর্যাদা ছিল মোহনবাগানের মতো যে কোনও দেশীয় দলগুলির কাছে একেবারেই আলাদা। শিল্ডের ফাইনালকে কেন্দ্র করে গোটা শহর সেজে উঠেছিল। অলিতে-গলিতে বয়ে যাচ্ছিল উত্তেজনার চোরাস্রোত। দর্শক সমাগম আঁচ করতে পেরে ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ে খেলার দিন বর্ধমান এবং রানাঘাট থেকে বিশেষ ট্রেন চলানোর ব্যবস্থা করে। রায়গঞ্জ ও বরানগর থেকে জলপথে পরিবহনের জন্যে অতিরিক্ত স্টিমার চলাচলের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল ’১১-র ২৯ জুলাই। শুধু ট্রেন বা জলপথ নয়, শ্যামবাজার এবং চিৎপুর থেকে ময়দানগামী ট্রামগুলিতেও ছিল বাদুরঝোলা ভিড়। মানুষ থেকে মানুষে সঞ্চারিত হচ্ছিল ফুটবলের জোয়ার।

ফাইনাল খেলা শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল পাঁচটায়। কিন্তু দুপুর দুটো নাগাদই মাঠে জনপ্লাবন! ভাবতে অবাক লাগে টিকিটের চাহিদা ছিল এতটাই যে, দু’টাকার টিকিট ১৫ টাকায় বিক্রি হয়েছিল! সে-যুগে ১৫ টাকার মূল্য কত ছিল, তা আন্দাজ করতে ভিরমি খেতে হয়। খেলা শুরুর আগেই টিকিট নিয়ে এমন কালোবাজারি ইতিপূর্বে কেউ দেখেছিল কি না সন্দেহ।

বাংলার ফুটবলকে ঘিরে সেদিনের এই উন্মাদনা শুধু টিকিটের দামেই থেমে ছিল না। মাঠের ধারে বসে খেলা দেখার জন্য জোগানদাররা আট আনা থেকে শুরু করে দু’ টাকার বিনিময়ে বাক্স, টুল, টেবিল, পাটাতন ভাড়া দিয়েছিল। এই তালিকায় ইটও বাদ যায়নি! ‘ইংলিশম্যান’, ‘স্টেটসম্যান’-এর মতো দৈনিক সংবাদপত্র থেকে জানা যায়, সেদিন শিল্ডের ফাইনালে ক্যালকাটা মাঠে প্রায় এক লক্ষের মতো লোকের উপস্থিতি ছিল। চারদিকে হাজার হাজার মানুষের কালো মাথা। পথের ধারে, মাঠের কাছাকাছি গাছের ডালেও মানুষের ভিড় ছিল অবাক করা। এই জনসমুদ্র যে শুধু ‘নেটিভ’দের ছিল, তা নয়, গোরা-সাহেবমহলেও এই ফাইনাল খেলা নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে গিয়েছিল। তবে বাংলা ও বাঙালির একটাই আকাঙ্ক্ষা সেদিন আবর্তিত হচ্ছিল শহর জুড়ে, তা হল– গোরা-পল্টনদের হারিয়ে মোহনবাগানের জয়।

আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত নিষ্পেষিত বাঙালি কায়মনোবাক্যে পেতে চেয়েছিল মুক্তির স্বাদ। ফুটবল ছিল তাঁদের এই চাহিদাপূরণের একমাত্র উপায়। স্বামীজি মনে করতেন, যুবকদের গীতাপাঠের চেয়ে ফুটবল খেলা শ্রেয়। কারণ, এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক ও শারীরিক বিকাশ আরও ভালোভাবে হতে পারে। সংকল্পবদ্ধ ১১ জন বাঙালির ফুটবল অভিযান দেখে বাঙালিজাতি এ-ও বুঝেছিল যে, পদাঘাতের বদলে পদাঘাত একমাত্র ফুটবলেই সম্ভব। ফুটবল খেলায় বাঙালিদের অনীহার কারণ প্রসঙ্গে ইংরেজ সাংবাদিক স্টিভেনস বাঙালিদের শারীরিক দুর্বলতা, নমনীয় পা এবং অলসতার যে-কথা বলেছিলেন, ১১ জন বাঙালি খালি-পায়ে খেলতে নেমে, সে-কথাকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে দিয়েছিল।

১৯১১-এর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচের মুহূর্ত

ফাইনালের দিন মাঠের বাইরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষারত ফুটবল অনুরাগীদের খেলার ফলাফল জানানোর জন্য ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যবস্থা ছিল। খেলা শুরু হবার পরেই প্রথম গোলটি করে ইস্ট ইয়র্কশায়ার। মাঠে সেই শ্মশানের নিস্তব্ধতার মধ্যেই আকাশে উড়েছিল কালো ঘুড়ি। অর্থাৎ, ইস্ট ইয়র্কশায়ার গোল করেছে এই বার্তা পৌঁছে দিতে। সেদিন মাঠে অস্থায়ী টেলিফোন এক্সচেঞ্জ বসিয়ে ‘দ্য এম্পায়ার’ পত্রিকা কলকাতা শহরে খেলার খবর পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। এছাড়া বিভিন্ন দর্শক এবং স্বেচ্ছাসেবকরা খেলার বিবরণ প্রচার করছিল প্রতি মুহূর্তে।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মধ্যেই মোহনবাগান অধিনায়ক শিবদাস ভাদুড়ির সমতাসূচক গোলে গোটা মাঠ প্রাণ ফিরে পায়। ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে তখন মাঠ মুখরিত। আকাশে উড়ছে সবুজ-মেরুন ঘুড়ি। মাঠের আশপাশে তখন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। আর খেলা শেষে হওয়ার মিনিট দুই আগে অভিলাষের জয়সূচক গোল, যার মাধ্যমে ঐতিহাসিক জয় ছিনিয়ে আনে ১১ জন বাঙালি। তার দরুন ব্রিটিশদের রাজনৈতিক এবং ফুটবল আভিজাত্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ফুটবল হোক কিংবা দেশশাসন, ব্রিটিশরা যে অপ্রতিরোধ্য এবং সেরা– এই ধারণাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিল মোহনবাগানের ওই এগারো-যোদ্ধা।

শিল্ড-ফাইনালে পরাজিত ইস্ট ইয়র্কশায়ার

অমর একাদশের এই জয় বীরগাথার চেয়ে কোনও অংশে কম ছিল না। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এই জয়ের বিবরণ যেন ছিল এক বিস্ফোরণ। সেই সময়ে না-ছিল বেতার সম্প্রসারণ, না-ছিল বিমান চলাচলের সুবিধা। কোনও সংবাদ সংস্থার সর্বভারতীয় প্রচার ছিল না। জনসংযোগের অভাব থাকা সত্ত্বেও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‘নেটিভ’ ভারতের এই ঐতিহাসিক জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়েছিল আগুনের মতো। শিল্ডের ফাইনাল নিয়ে বিখ্যাত লেখক পরেশ নন্দীর লেখায় ধরা দিয়েছিল নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য।

মোহনবাগানের এই জয় সংবাদ-জগতকেও প্রভাবিত করেছিল। ফুটবল-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের গুরুত্ব এক ধাক্কায় বেড়ে গিয়েছিল। ফাইনালের দু’দিন পর ৩১ জুলাই, ইংরাজি দৈনিক ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’ ফাইনালের সম্পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ‘ইন্ডিয়ান ডেইলি নিউজ’ সংবাদপত্র মোহনবাগানের আইএফএ শিল্ড জয়কে ‘অসাধারণ ও যুগান্তকারী’ এবং ‘জাতীয় গৌরব’ বলে অভিহিত করেছিল। লন্ডনের বিখ্যাত ‘টাইমস’ পত্রিকায় মোহনবাগান নামক ভারতীয় দলের আইএফএ শিল্ডে রাইফেল ব্রিগেড, মিডলসেক্স এবং ইস্ট ইয়র্কশায়ার দলের মতো সৈনিক দলের বিরুদ্ধে সাফল্যের খবর প্রকাশিত হয়।

শিল্ড জয়ের উদ্দীপনার ঢেউ আছড়ে পড়েছিল বায়োস্কোপেও। ফাইনাল খেলা সরাসরি ক্যামেরাবন্দি করেছিল ‘এলফিনস্টোন বায়োস্কোপ কোম্পানি’। পরিচালনা, সম্পাদনা করে ছবিটি দেখানো হয় ময়দানের তাঁবু সিনেমায়। পরে স্টার থিয়েটারে।

১৯১১-তে মোহনবাগানের ঐতিহাসিক আইএফএ শিল্ড-জয় অনেকের কাছে পলাশীর প্রতিশোধ, অনেকের কাছে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ময়দানি-রূপ। স্বাদেশিকতার বর্ণপরিচয়। তবে একথা অনস্বীকার্য, ১৯১১-য় মোহনবাগানের এই সাড়া জাগানো জয় স্বদেশি আন্দোলন এবং ফুটবলকে যেন এক সুতোয় গেঁথে ফেলেছিল। সে-বছরই ১২ ডিসেম্বর ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ দিল্লির দরবারে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত রদ করার ঘোষণা করেন।

’১১-র পর মোহনবাগান আবার আইএফএ শিল্ড জয় করেছিল ১৯৪৭ সালে। সবুজ-মেরুনের শিল্ড জয় এবং ঘটে যাওয়া এই দু’টি বিষয় নিছক ঐতিহাসিক ঘটনা, না কি কাকতালীয় ব্যাপার, সেই তর্কে যাচ্ছি না। তবে একথা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই যে, সেদিন শিল্ডের ফাইনালে এক পরাধীন জাতির প্রাদেশিকতার সংকীর্ণতা থেকে স্বাদেশিকতায় উত্তরণ ঘটেছিল। ক্যালকাটা ফুটবল মাঠ সেদিন সত্যি হয়ে উঠেছিল রূপকধর্মী যুদ্ধক্ষেত্র।