


প্রকৃতি, ঋতু, বিড়াল, পাখি, ব্যাঙ, মানবমনের নানা মাত্রা এই খোদাইচিত্রে অনন্তের সমীপে নিয়ে আসে। যেন বুদ্ধের সমীপে এক একটি দীপমালা, যেখানে ফুটে ওঠে দার্শনিকের বিস্ময়! অসীমকে ছুঁয়ে থাকা এই তিনটি করে পঙ্ক্তি যেন আমাদের তুচ্ছতাগ্রস্ত জীবনকে প্রসারিত করে! একটি মুহূর্তের অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয় নিরপেক্ষ এক দৃশ্যপট। ‘আমি’ সেখানে নাক গলায় না। রোববার.ইন-এর তৃতীয় জন্মদিনে ‘হাইকু’ নিয়ে বিশেষ লেখা।
১.
‘ঘন কুয়াশায়
কী কথা চেঁচিয়ে বলছে
পাহাড় আর নৌকো?’ [কিতো]
২.
‘শূন্য গৃহের দরজায়
একটি কুকুর ঘুমিয়ে আছে।
ছড়িয়ে পড়ছে উইলো গাছের পাতা।’ [শিকি]
[আমার ‘এক আকাশ হাইকু’ থেকে]
যখন মন খারাপ হয়, দুয়ারে রহি একা, আমি হাইকুর কাছে যাই। শিশিরের মতো তিন লাইনের জাপানি অণুকবিতা। যেন ইমনকল্যাণ বাজে। যেন স্বর্ণরেণুতে ভরা বুদ্ধের আরতিপাত্র! ন্যূনতম শব্দে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সংযোগের এক হারিয়ে যাওয়া বয়ান যেন সেখানে আঁকা হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের উক্তি: ‘জাপানি পাঠকের মনটা চোখে ভরা’। প্রত্যেকটি যেন বাঙ্ময় ছবি, যেন সরোবরের মধ্যে এক আকাশ সুপ্তিশান্ত আলো।
সতেরো শতকে বাশোর (১৬৪৪-’৯৪) হাতে প্রথম রচিত এই তিন লাইনের অণুকবিতাগুলি একেকটি এপিগ্রামের মতো। সবচেয়ে কম কথায় সবচেয়ে বেশি অনুরণনের এমন উদাহরণ দুর্লভ। কলমের দু’-চারটি সূক্ষ্ম টানে চিনে ড্রয়িংইয়ের বিরাট বিরাট দৃশ্যপটের কথা মনে পড়তে পারে কারও। শ্রেষ্ঠ হাইকু একই সঙ্গে ইশারা আর স্বচ্ছতার মিশ্রণ।

জাপানিতে ১৭টি ‘মোরা’ বা সিলেবলের তিন পঙ্ক্তির কবিতার বিন্যাস ৫-৭-৫। সূক্ষ্মতা, দ্যোতনা, পরিমিতি এবং প্রাকরণিক দক্ষতার এ এক সমবেত শক্তি। অনুবাদে অবশ্য তিন লাইন বজায় রাখা সম্ভব, কিন্তু সিলেবল নয়। যে প্রকৃতি থেকে আমরা বহু দূরে সরে গিয়েছি, তা আবার তার সমস্ত পরিপূর্ণতা নিয়ে নতুন করে ‘ক্ষান্তকূজন শান্তবিজন সন্ধ্যাবেলায়’ আমাদের কাছে সুরের ঢেউয়ের মতো ফিরে ফিরে আসে।
সারা বিশ্বে তার স্বতন্ত্র মর্যাদা পাওয়া এই হাইকু আঙ্গিকটি সতেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে (যখন ফরাসি দেশে নাটক লিখছেন মলিয়ের, ইংল্যান্ডে জন মিলটন লিখছেন ‘প্যারাডাইস লস্ট’, প্রকৃতি ও জীবন নিয়ে হল্যান্ডে বসে নতুন করে ভাবছেন স্পিনোজা, মুঘল সাম্রাজ্যে ঔরঙ্গজেবের সময়), কবি মাৎসুও বাশোর (১৬৪৪-’৯৪) হাতে এক সূক্ষ্ম কবিতাকারুশিল্প হিসেবে আবিষ্কৃত হয়, এবং সঙ্গে সঙ্গে জনপ্রিয় হয়। এ যেন মিনিয়েচার পেইন্টিং, অক্ষরের মিনিমালিস্ট আর্ট। এই হাইকু আঙ্গিকের পুরনো ইতিহাস আমি ‘এক আকাশ হাইকু’ সংকলনে লিখেছি।

প্রকৃতি, ঋতু, বিড়াল, পাখি, ব্যাঙ, মানবমনের নানা মাত্রা এই খোদাইচিত্রে অনন্তের সমীপে নিয়ে আসে। যেন বুদ্ধের সমীপে এক একটি দীপমালা, যেখানে ফুটে ওঠে দার্শনিকের বিস্ময়! অসীমকে ছুঁয়ে থাকা এই তিনটি করে পঙ্ক্তি যেন আমাদের তুচ্ছতাগ্রস্ত জীবনকে প্রসারিত করে! একটি মুহূর্তের অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয় নিরপেক্ষ এক দৃশ্যপট। ‘আমি’ সেখানে নাক গলায় না।
হাইকু শুধু শিল্প নয়, জেন বৌদ্ধধর্মের একটি প্রগাঢ় রূপ, একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া, যা যোগ ও ধ্যানের সঙ্গে তুলনীয়। ‘পারো তো ছুটে গিয়ে ওই প্রবহমান জীবনকে ধরো’, এ যেন জেন চিন্তার সারাৎসার। তাওবাদী, শিন্তো ও বৌদ্ধ প্রভাব জাপানি মনে গ্রথিত হয়ে আছে। ১৯৬৮ সালে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের সময় ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা জাপানি ছবি ও সাহিত্যের ওপর জেন বৌদ্ধধর্মের প্রভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। জেন বৌদ্ধধর্ম নিছক শব্দের খেলা থেকে আধ্যাত্মিকতায় উত্তীর্ণ করেছে হাইকুকে। রবীন্দ্রনাথ ‘জাপানযাত্রী’-তে লিখেছেন:
‘এদের অনেকের কাছেই শুনেছি যে, ‘‘এটা আমরা বৌদ্ধধর্মের প্রসাদে পেয়েছি। অর্থাৎ বৌদ্ধধর্মের এক দিকে সংযম আর-এক দিকে মৈত্রী এই-যে সামঞ্জস্যের সাধনা আছে, এতেই আমরা মিতাচারের দ্বারাই অমিত শক্তির অধিকার পাই।’’’

রবীন্দ্রনাথের ‘জাপানযাত্রী’-তে আছে:
‘তিন লাইনই ওদের কবি, পাঠক, উভয়ের পক্ষে যথেষ্ট। এদের হৃদয় ঝরনার জলের মতো শব্দ করে না, সরোবরের জলের মতো স্তব্ধ। এ পর্যন্ত ওদের যত কবিতা শুনেছি সবগুলি হচ্ছে ছবি দেখার কবিতা, গান গাওয়ার কবিতা নয়। এদের অন্তরের প্রকাশ সৌন্দর্যবোধে। সৌন্দর্যবোধ ব্যাপারটা স্বার্থনিরপেক্ষ। ফুল, পাখি, চাঁদ এদের দ্বারা আমাদের জীবনে কোথাও ক্ষয় ঘটে না। সেইজন্যেই তিন লাইনেই এদের কুলোয়, এবং কল্পনাটাতেও এরা শান্তির ব্যাঘাত করে না।’
অনুবাদে প্রথম ‘হাইকু’-র স্বাদ পায় বাঙালি। বাশোর–
‘পুরনো পুকুর
ব্যাঙের লাফ
জলের শব্দ।
[‘ফুরু ইকে ইয়া
কাওয়াজু তোবিকোমু
মিজু না ওতো।’]
অথবা
‘পচা ডাল
একটা কাক
শরৎ কাল’
[কারে এদা-নি
কারাসু তোমারিতারু ইয়া
আক-নো কুরে।’]

এই হাইকুগুলির কথা মনে পড়বে অনেকের। এই পাঠ সম্পর্কে ইনু কেঙ্কাবো-র একটি হাইকু-তে আছে:
‘রবীন্দ্রনাথ
বাশো পড়ার সময়
কানে এক ঘণ্টাধ্বনি শুনেছিলেন।’
পর্যবেক্ষণ যে কত তীব্র অনুপুঙ্খময় হতে পারে, তার নান্দনিক উপস্থাপনা কত দ্যোতনাময়, তার একটি নমুনা:
‘সাপটি চলে গেছে,
যে-চোখ আমার দিকে চেয়েছিল
এখনও ঘাসের ভেতর জ্বলছে।’ [কিওশি]
‘বারান্দায় চড়ুইটি
ভেজা পায়ে
নাচছে।’ [বুসন]
‘পাহাড়ের ওপর একটি মন্দির
ঘণ্টার শব্দ থেমে থেমে বাজতে বাজতে
ধোঁয়াশায় মিশে যায়।’ [বুসন]
প্রকৃতি বিষয়ে নানা ওলটপালট করে দেওয়া দুঃসাহসিক বাকপ্রতিমার একটি উদাহরণ দিই। যা ধাক্কা দেয়, বুঝিয়ে দেয় ইমেজ কত শক্তিশালী হতে পারে।
‘রাগী সমুদ্র
ডেক থেকে নীচে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে
জমাট বরফের রাশি।’ [চোহা]

ঋতু ও পশুপাখি কখনও কবিতায় এত বাঙ্ময় হয়েছে কি না, আমরা জানি না। সব মিলে এক-একটি চলচ্চিত্রীয় মুহূর্ত। যেখানে মিশে আছে ছবি আর ম্যাজিক। এই মিনিমালিস্ট আর্টের দর্শক জানেন বিন্দু কী করে এক মুহূর্তে সিন্ধু হয়ে ওঠে!
‘বিড়ালছানাটি
এক মুহূর্তের জন্য
পাতাটিকে ছুঁল।’ [ইসা]
‘একটি ঝরা ফুল
শাখায় ফিরে এলো!
নাহ্– একটি প্রজাপতি।’ [মরিতাকে]
এ যেন ‘তৈত্তিরীয়’ উপনিষদের উক্তির অনুরণন: ‘আনন্দের দ্বারাই জীবগণ জীবনধারণ করে।’ মন্দিরের ঘণ্টার গায়ে মেঘে ভিজে থাকে চেরিফুল। রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষণিকা’ বা ‘স্ফুলিঙ্গ’-র কথা মনে পড়বে। ‘ছিন্নপত্র’-তে রবীন্দ্রনাথ ইন্দিরা দেবীকে লিখেছেন: ‘অনাদি অনন্ত আকাশ-পূর্ণ নিত্য স্পন্দমান ঘূর্ণ্যমান অণুপরমাণুর সঙ্গে আমাদের একটা নিগূঢ় আনন্দময় আত্মীয়তার বন্ধন আছে।’ মহাবিশ্বকে এমন আপন করে চেনাবে কে? একে কী বলব? ‘Chemistry of the sublime?’

প্রেম ও যৌনতা নিয়ে হাইকু কবির কোনও সংস্কার নেই। তা অনায়াসে জীবনের আঁশের মধ্যে মিশে থাকে। বিড়ালেরা প্রেম করতে গিয়ে ভেঙে ফেলছে পাথরের দেওয়াল, অথবা–
‘বসন্ত-সন্ধ্যায়
অবিবাহিত যুবকটি
কেন বই পড়ছে?’
কিংবা
‘সুন্দরী নারীটির
এমনকি
যোনিও সুন্দর!’
এই মৃদু হাস্যরস হাইকুর নৈর্ব্যক্তিকতার অঙ্গ। বাতকর্ম নিয়ে উগ্র রসিকতাময় হাইকুগুলি পড়লে জাপানিদের কান লাল হয় না।
হাইকুর আড়াল থেকে বুদ্ধমূর্তিটি মনে করিয়ে দেয় যে, পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়। সেইসঙ্গে আরেকটি বার্তা হল গ্যোয়েটের উক্তি, যেটিকে ‘ছিন্নপত্র’-তে উদ্ধৃত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ: ‘Entbehren sollst du, sollst entbehren.’ (‘Thou must do without, do without.’) ‘আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া।’

‘শামুক, তুমি
একটু একটু করে ওঠো,
ফুজি পাহাড়ে।’ [ইসা]
বিশ্বব্যাপী এই স্বর্ণিল সমন্বয়ের মাঝে মৃত্যুর চেয়ে আধ্যাত্মিক আর কী হতে পারে? কয়েক শতাব্দী ধরে মৃত্যু নিয়ে জেন-প্রভাবিত অসংখ্য হাইকুর দু’-একটি শোনাতে চাই। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও সর্ব অবস্থাতেই ঋতু ও প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অবিচ্ছেদ্য সংযোগ মহাপ্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায়। শব্দ মিশে যায় শব্দোত্তরে।
‘সাদা চন্দ্রমল্লিকা গো
মানুষেরও
বয়স হয়ে যায়।’ [ওৎসুচি]
‘আমার শেষ আশ্রয়
কি তবে
এই সাড়ে চার হাত তুষার?’ [ইসা]
জীবনমৃত্যুর মাঝে দাঁড়িয়ে এমন ‘জীবনখনিজ গলানো খাঁটি সোনা’, ‘দুঃখ কষ্ট বেদনার অমৃতশস্য’ (আপন সৃষ্টির লক্ষ্য সম্পর্কে ছিন্নপত্রে রবীন্দ্রনাথ, ৫ অক্টোবর ১৮৯৫) তো আমরা শুধু স্বপ্নে খুঁজে পাই।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved