Robbar

পতাকা তিনরঙা, মানুষ একরঙা?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 18, 2026 9:49 pm
  • Updated:August 18, 2026 9:51 pm  

ভারতের জাতীয় পতাকায় তিন-তিনটে রঙের উপস্থিতি। মানুষ হিসেবে আমরা একরঙা হয়ে উঠলেও, বহুরঙা দেশের তাতে কিছু আসে যায় না। তাহলে কি ধনতন্ত্রই পথ? জানা নেই। কিন্তু একথা স্বীকার করতে দ্বিধাও নেই,  ভারতের যে রাজ্যগুলি ধনতন্ত্রের পথে লজ্জাহীন এগিয়েছে, শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে-শিল্পে  তারা অনেক অগ্রণী। 

বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়

‘আমা হইতে ভিন্ন কেহ যখন নাই, তখন কাহা হইতে ভয় পাইতেছি।’

(প্রথমাধ্যায়, চতুর্থব্রাহ্মণ: বৃহদারণ্যক উপনিষদ) 

সম্প্রতি রং দেওয়া, মুছে দেওয়া, আবার দেওয়ার বাক এবং সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ ভারতীয়রা হয়তো ভুলে গিয়েছে যে, প্রত্যেকটি আদর্শের ওপর ভর করে পথ চলাই শেষমেশ ‘লাল রং’-এর সঙ্গে পরিচয় ঘটায়, কারণ আদর্শের ঋজুতা রক্তপাত ঘটিয়েই থাকে। তাই বলে, ‘লাল’কে রং হিসেবে সবাই মেনে নেবেন, এমনটা তো হতে পারে না! ভারতের জাতীয় পতাকায় তিন-তিনটে রঙের উপস্থিতির কারণে আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, মানুষ হিসেবে আমরা একরঙা হয়ে উঠলেও, বহুরঙা দেশের তাতে কিছু আসে যায় না। সে যতটা পবিত্রতায় ‘গৈরিক’কে ধারণ করে, ততটাই স্বতঃস্ফূর্ততায় ধারণ করে, ‘সবুজ’কে। মধ্যে থেকে কিছু লোক, মানে এই আমরাই যে-কোনও একটি রঙের ওপর মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করে, একই প্যালেটে অনেক রং ভেসে থাকার মজা থেকে বঞ্চিত করি নিজেদের।

উত্তোলিত দেশের ত্রিবর্ণ পতাকা, বক্তব্য রাখছেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু

ভারতীয় বংশোদ্ভুত এক বিখ্যাত ঔপন্যাসিক বলেছিলেন যে, ভারত ব্যতিরেকে তাঁর কোনও বৃত্তই সম্পূর্ণ হয় না। নিজের প্রতিটি যাত্রাকে পূর্বপুরুষ ও পূর্বনারীর চলাচলের আলোয় দেখলেই একমাত্র বিন্দুগুলো জোড়া লাগে তাঁর কলমে। কথাগুলো পড়তে পড়তে মাথায় অনেক রঙের ছবি খেলে যায়। তার কোনওটা যদি হয় লন্ডন বা শিকাগোর ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে পাঁপড় থেকে জিলিপির সগর্ব উপস্থিতি, তাহলে অন্যটা জার্মানির স্কুল-কলেজে ছাত্রছাত্রীদের সংস্কৃত শেখার ব্যাকুলতা। আবার কোনওটা হয়তো পৃথিবীর যে-কোনও প্রান্তে আফ্রিকান ট্যাক্সিচালকের গলায় প্রাণ-পাওয়া বলিউডের কোনও জনপ্রিয় গান। এইসব খণ্ডচিত্র মিলিয়ে যে ভারত, তার একটি ক্যানভাসে দাঁড়িয়ে আছে সিলিকন ভ্যালিতে মোটা মাইনের চাকরি করা কলকাতা-দিল্লি বা বেঙ্গালুরুর যুবক-যুবতীরা, নিজেদের ছাড়া অন্য কারও কথা ভাবার অবকাশ নেই যাদের; আর অন্য একটি ক্যানভাসে, দেবরাজ ইন্দ্রের রথে একা উঠতে অস্বীকার করে সম্রাট যুধিষ্ঠির বলছেন, ‘এই কুকুরটি আমাকে অনুগমন করেছে, এও আমার সঙ্গে স্বর্গে চলুক তা নইলে নির্দয়তা প্রকাশ পাবে।’ আজ এই মুহূর্তে সময় আমাদের মাথার পিছনে যে আয়না ধরেছে, সেখানেও সামনের রাস্তাটাকে দু’ভাগে ভাগ হয়ে যেতে দেখছি; একদিকে আমি, অন্যদিকে আমরা।

এই ‘আমি’ যে কেবলমাত্র একটি ব্যক্তি, তা নয়, উত্তর-সত্য যুগে এক-একটি গোষ্ঠী এক-একটি জাতি কখন যেন ‘আমি’ হয়ে উঠছে। আর অন্য যে কাউকেই ‘তুমি’ ঠাউরে তির ছুড়ছে। স্বাধীনতার ৮০ বছর হতে যখন আর একটি বছরই বাকি তখন কী পাইনি তার হিসেব মেলাতে না বসলেও অনেক ঘটনা হুড়মুড়িয়ে মাথায় এসে পড়ে। আর তার মধ্যে প্রধান কথাটা হল, একই ঘরের বাসিন্দারা যদি পরস্পর পরস্পরকে প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করে, তাহলে দেশের অখণ্ডতা একটা প্রশ্নচিহ্নের মুখে পড়ে যায়। আবার সেই অখণ্ডতাকে পাথেয় করে রাতদিন, ‘এই দেশ, এই দেশ, আমার এই দেশ’ হাঁক পাড়লেও কাজের কাজ কিছুই হয় না।

দেশের অখণ্ডতা ত্রিবর্ণে রঞ্জিত

মুশকিলটা অন্য জায়গায়। বার্নার্ড শ’র কথা ধার করে বলি, একটি সবল দেশ নিজের জাতীয়তা নিয়ে ততটাই উদাসীন, একটি সুস্থ শরীর তার অন্তর্গত হাড়গুলো সম্পর্কে যতটা। কিন্তু সেই জাতীয়তা যদি একবার ভাঙে তাহলে সেই দেশ আর কোনও পণ্ডিত, কোনও প্রচারক, সংস্কারক বা দার্শনিকের কথায় কান দেয় না, যতক্ষণ না জাতীয়তাবাদীর দাবি মানা হচ্ছে। সব কাজের ওপরে সে ঠাঁই দেয় একীভবনকে। আর তা করতে গিয়ে অনেক সময় ভুলে যায় যে, ‘বড়’ জাতীয়তাবাদই ‘ছোট’ জাতীয়তাবাদের দরজা খুলে দেয়। আজ যাকে শেলি-বায়রন বাদ দিয়ে কেবল রবীন্দ্রনাথ পড়তে বলছি, কাল সে মৈথিলী হলে, রবীন্দ্রনাথের জায়গায় বিদ্যাপতি পড়বে শুধু, মারাঠি হলে, রামদাস বা তুকারাম। উত্তরপ্রদেশ বা বিহারের মানুষ নিজের নিজের এলাকায় সেচের সুবিধা পেতে গঙ্গার বুক থেকে অজস্র ক্যানাল কেটে নিয়ে যাবে, বাংলা শুকিয়ে মরল কি না, তার পরোয়া না করে; কর্নাটক আর তামিলনাডু অনন্তকাল ঝগড়া করে যাবে কাবেরীর জলধারা নিয়ে, কিছুতেই বুঝবে না যে বাঁচতে হলে দু’জনকে একসঙ্গেই বাঁচতে হবে।

 কেন এই বোধের অভাব? এই দেশেই তো সেই শ্যামবর্ণ রাখালের আবির্ভাব ঘটেছিল, যে নিজেকে একপক্ষে রেখে, অন্যপক্ষকে দিয়েছিল তার সেনা, এই মাটিতেই তো সেই চোখে কাপড়-বাঁধা মা’র জীবন কেটেছে, যিনি যুদ্ধ চলাকালীন যতবার নিজের সন্তান বিজয়াশীর্বাদ চেয়েছে, ততবারই বলেছেন, ‘যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ’, এখানেই তো সেই স্ত্রী ছিলেন, যিনি পরিত্যক্তা হয়েও অনুভব করেছেন যে, তাঁর যন্ত্রণার ওপরেই গড়ে উঠেছে অগণিত মানুষের সুখ, তার একাকিত্বই লক্ষ মানুষকে বলার সুযোগ দিয়েছে, ‘বুদ্ধং শরণং গচ্ছামি।’

অবন ঠাকুরের ‘ভারতমাতা’

আসলে, বিগত বেশ কিছুদিন ধরে বিশ্বায়ন আমাদের বুঝিয়েছে যে, একটি ভালো জীবন চাইলে খরিদ করে নেওয়া যায়। আর আমরা নিজেদের অজান্তে সেটা বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। দু’দশক আগেও আমাদের যে পাড়াগুলো সব ‘মালগুডি’ ছিল, যেখানে সন্ধেবেলা ছেলে-মেয়েদের পড়ার আওয়াজ, গানের রেওয়াজ শোনা যেত, শ্যামলকাকুর দোকানে ধারে চকোলেট বিস্কুট পাওয়া যেত, কোচিং ক্লাসের নাম করে গাছের আড়ালে আধো-অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা যেত অনেকক্ষণ, তারা অধিকাংশই কোন এক আলাদিনের চিরাগের ছোঁয়ায় ‘মায়ামি’ হয়ে গিয়েছে আজ। সেখানে সারাক্ষণই গন্ধ-রসের বিপুল আয়োজন, আলোয় ছয়লাপ শপিং-মল আর মাল্টিপ্লেক্স,  একতলা, দেড়তলা বাড়ির জায়গায় ১৩-১৪ তলা অ্যাপার্টমেন্টের রাজকীয় উপস্থিতি। কেবল সেই অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে বাসনমাজা কাপড়কাচা মহিলাটি দিনের শেষে যে বস্তিতে ফিরে যাবে, সেখানে এখনও একটা পরিষ্কার শৌচাগার নেই। 

১৯৪৭ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত হেঁটে এসে কেন এইটুকু নেই, সেই প্রশ্ন তো উঠবেই। স্বাধীন ভারতের ‘নাগরিক’ যখন সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের পরিষেবা পেতে পারেন (অবশ্যই গলাকাটা দামে) তখন স্বাধীন ভারতের ‘গ্রামীণ’ কেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে আন্ত্রিক কিংবা সাপে-কাটার ওষুধ অবধি পান না সকল সময়, সেই বিতর্ক ওঠাও জরুরি। আর সেই বিতর্কের শুরুতেই কেউ কেউ সর্বরোগহর সমাজতন্ত্রের কথা তুলবেন। তুলুন। সমাজতন্ত্র যদি সবার জন্য বিদ্যালয়, বাসস্থান, সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে, নদীর নাব্যতা বাড়ায়, বনসম্পদকে সংরক্ষণ করে, ব্যক্তিগত সম্পদের গৌরবের বিপ্রতীপে সম্মিলিত কণ্ঠস্বরে তুলে ধরে, সেই সম্পদের কথা যা আমরা ভাগ করে নিতে পারি, তাহলে সমাজতন্ত্র মন্দ কীসে! কিন্তু ভাগীরথীকে মাথায় নেবেন কোন ভগীরথ?

শিল্পী: তয়েব মেহতা, ১৯৭৫

প্রশ্নটা জাগে, কারণ চিনের একটি প্রত্যন্ত শহরে গিয়ে এই প্রতিবেদকের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানকার সাহিত্যসভায় লেখকদের একজন জানিয়েছিলেন যে, তাদের শহরে একসময় সবার ঘরে সিলিং-ফ্যান ছিল না, কিন্তু তাঁরা সেই সমস্যার সমাধান করে ফেলেছেন। কীভাবে এই কাজটা সম্ভব হয়েছিল জানতে চেয়ে যা শুনেছিলাম, জীবনে ভুলব না। ওই শহরে যেসব বাড়িতে এসি মেশিন ছিল, সেগুলো সব খুলে নিয়ে না কি নিকটবর্তী বড় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই টাকায় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সিলিং-ফ্যান কিনে ফেলা গিয়েছিল। এহেন হাতে-গরম সমাধান শুনে ভাবছিলাম যে, ভারতে কি এমন একজন সমাজতন্ত্রী নেতাও আছেন যিনি নিজের বাড়ির এসি-মেশিন খুলে দিতে প্রস্তুত? কয়েক বছর পরে উত্তর পেয়েছিলাম। ভারতের এতাবৎ সর্বাধিক জনপ্রিয় বামপন্থী যুগপুরুষের ছেলে যখন কালীঘাটে কালীর হাতে সোনার খাঁড়া তুলে দিয়েছিলেন মানত রক্ষার্থে তখনই করালবদনী মা স্বয়ং দৈববাণী করেছিলেন যে, আর যে পথেই হোক সমাজতন্ত্রের পথে ভারতের বস্তির ঘরে-ঘরে সিলিং-ফ্যান বসবে না।

দেশভাগের যন্ত্রণার ক্ষত, ৮০ বছর পরেও যা বহন করেছে স্বাধীন ভারত

তাহলে কি ধনতন্ত্রই পথ? জানা নেই। কিন্তু একথা স্বীকার করতে দ্বিধাও নেই,  ভারতের যে রাজ্যগুলি ধনতন্ত্রের পথে লজ্জাহীন এগিয়েছে, শিক্ষায়-স্বাস্থ্যে-শিল্পে  তারা অনেক অগ্রণী। আর যারা আর্থিক সংস্কার এবং বাজার অর্থনীতিকে গাল না-দিয়ে জলস্পর্শ করেনি, তাদের নকল বুঁদিগড়ে না হয়েছে চাকরি, না উন্নয়ন, সকলই গরল ভেল। 

সিন্ডিকেট নয় শিল্প, স্বজনপোষণ নয় সমবণ্টন, এই স্লোগান আগেও ছিল, পরেও থাকবে। কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিকালে মানুষ চাইছে জ্যান্ত নিদর্শন, স্পষ্ট কথা।

ধর্ম নিয়ে হানাহানি শয়তান ছাড়া কেউ চায় না, কিন্তু তা বন্ধ করতে গেলে ধর্মের নামে স্কুল-কলেজ চালানো বন্ধ করতে হবে। ‘মনুবাদ সে আজাদি’ বলে স্লোগান দিলে, ‘শরিয়া সে আজাদি’ স্লোগানও দিতে হবে। তা নইলে একদিকের দেওয়ালের রং এত ক্যাটক্যাটে হয়ে যাবে যে, অন্যদিকের দেওয়ালে কোনও রং লাগিয়েই তা মেক-আপ করা যাবে না। আর ‘মেক-আপ’এর বাইরে গিয়ে ভিতর থেকে যারা ব্যবস্থাকে সারাতে চায় তাদের আগে আপন সামর্থ্যে সহাবস্থান রচনা করে দেখাতে হবে। প্রাণ এবং পরিচয় রক্ষার তাগিদে বাংলাদেশ থেকে জল-জঙ্গল-কাঁটাতার পেরিয়ে এসে অচেনা ভূখণ্ডে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন বা হচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের মুখে সম্প্রীতির গল্প শুনবেই বা কে? তাই বলে তাঁদের বুকের ভিতর যে শুধু ক্ষোভই রয়েছে তা কিন্তু নয়, অন্য অনেক রং তাঁদের মনে ঘুরে বেড়ায়। একরাত্রির ভিতরে ভিটেমাটি চাঁটি হয়ে যাওয়া এক কাশ্মীরি পণ্ডিত আমায় বলেছিলেন যে, ফেলে আসা ঘরের কথা আর তত মনে পড়ে না, যত মনে পড়ে চলে আসার সময় বাড়ির পোষা টিয়াপাখিটার ডাক।

পিকাসোর ছবিতে সম্প্রীতির বার্তা

আমরা হয়তো কোথাও না কোথাও গিয়ে সেই টিয়াপাখি, যারা অচেনা-অজানা মালিকের ভাষায় কথা বলে। আবার অনেক টিয়া ভিতরে-ভিতরে বিদ্রোহ পুষে রাখতে রাখতে বার্স্ট করে একদিন। তখন তার ভিতরের রঙের সঙ্গে মেলানো যায় না তার বাইরের রং। আমরাও ভিতর আর বাইরের ওই জটিল খেলায় আমাদের মন আর মানসে কিলবিল করা হাজারও রঙের ঘূর্ণিকে একটি না ভেবে নিই, জাতীয় পতাকার তিনটি রঙের তিন সহস্রাধিক বিচ্ছুরণেও দিশা না-হারাই, স্বাধীনতার ৮০ বছরের প্রাক্কালে, সেইটুকুই প্রার্থনা।