Robbar

দু’চোখ যথেষ্ট নয়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 18, 2026 12:55 pm
  • Updated:August 18, 2026 12:55 pm  

ত্রিনয়ন শব্দটা আমাদের বড় চেনা। ‘ত্রিনয়ন’ আর ‘তৃতীয় নয়ন’– এ দুইয়ের মধ্যে কিছু ফারাক আছে বইকি। অভিধান ঘাঁটলে ‘ত্রিনয়ন’ বলতে বুঝি মহাদেব। পাশাপাশি অন্তত পক্ষে শ’দুয়েক সমার্থক শব্দ এসে ভিড় করে। সেখান থেকে খানিকটা সরে এসে পৌরাণিক আখ্যান অবলম্বনে অঙ্কিত ত্রিনয়নধারী দেবতাদের দিকে তাকাই। বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা ছবিতে দেবতাদের কপালে চিত্রিত এই তৃতীয় নয়ন– যা কিনা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্রোধের রুদ্র মুহূর্তে গর্জে ওঠে। রোববার.ইন-এর তৃতীয় জন্মদিনে, ত্রিনয়ন নিয়ে বিশেষ লেখা।

সুশোভন অধিকারী

সেদিন এক আর্ট গ্যালারিতে চিত্রপ্রদর্শনী দেখতে গিয়েছি। সুদৃশ্য আলোর নিচে সাজানো সারি সারি ছবি। বিখ্যাত শিল্পীর প্রদর্শনী, সযত্ন বিন্যাস। ছবি তো বটেই– সেই সঙ্গে ছবির ফ্রেম, দেওয়ালের রং, আলোকের নাটকীয়তা মিলে শিল্পীর চিত্রমালা যেন এক মায়ালোক রচনা করেছে। একের পর এক ছবির সামনে বিস্ময়ে চেয়ে আছি। দেখা ছবিতেও প্রথম দেখার মাধুর্য, পলক পড়ে না চোখের। ছবি সাজিয়ে দেওয়ার মধ্যেও এক আশ্চর্য মুগ্ধতা। আচ্ছন্নের মতো ছবি দেখতে দেখতে একটা থেকে আরেকটার দিকে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ একটা ছবির সামনে এসে বুঝি তালভঙ্গ হল। থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম। বলা উচিত, চমকে উঠলাম! চমকে ওঠার কারণ, প্রদর্শিত ছবি এবং তার নিচে দেওয়া শিল্পীর নামের মধ্যে মিল নেই।

শিল্পী: বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

একটু খোলসা করে বলি। উদাহরণের আশ্রয় নিয়ে বললে, ছবির নিচে শিল্পীর নাম ও ছবির বিবরণযুক্ত লেবেলটি যদি নন্দলাল বসুর নামাঙ্কিত হয়, তাহলে দেওয়ালে টাঙানো ছবিটা তাঁর আঁকা কি না, বলা কঠিন। ফলে প্রখ্যাত চিত্রীর প্রদর্শনীর বিশ্বাসযোগ্যতা এক প্রশ্নচিহ্নের মুখে। এখানেও ঠিক তাই। এক্ষেত্রে অবশ্য শিল্পীর নাম আলাদা করে ঘোষণার প্রয়োজন নেই। কারণ সমগ্র গ্যালারি জুড়ে একজন শিল্পীর চিত্রপ্রদর্শনী। ফলে প্রত্যেকটি ছবির নিচে স্বতন্ত্রভাবে চিত্রকরের নাম লেখার প্রয়োজন নেই। এবারে আমার মূল বক্তব্যে ফিরে যাই। প্রদর্শনীতে অত্যন্ত খ্যাতিমান এক শিল্পীর কাজ দেখানো হচ্ছে, যিনি ভারতের আধুনিক শিল্পকলার অন্যতম অগ্রপথিক। এমন প্রদর্শনীতে অনবধানবশত শিল্পীর কোনও ভুল ছবি কি প্রার্থিত? তা কখনওই হওয়া উচিত নয়। বিপুল আয়োজনে নির্মিত এমন প্রদর্শনীতে এ বিভ্রান্তি অনভিপ্রেত, অমার্জনীয়। প্রদর্শনীর একটি তেলরঙের ছবি প্রসঙ্গে আমার প্রশ্ন। যাঁর ছবি দেখানো হচ্ছে, তিনি সচেতনভাবে তেলরঙের মাধ্যমে কখনও চিত্রচর্চা করেননি। এর অন্যতম কারণ ইংরেজ-শাসিত ভারতের শিল্প-প্রেক্ষাপটে তেলরঙের মাধ্যম বর্জন করা তাঁর শিল্পীমনের দুর্মর স্বদেশিয়ানার পরিচায়ক। এই কারণে কখনও সমসাময়িক শিল্পীদের কাছে নিন্দিত হলেও নিজের প্রতিজ্ঞায় সর্বদা অবিচল থেকেছেন। মহাত্মা গান্ধীর স্বদেশি-মন্ত্রে স্নাত এবং তাঁর পরম স্নেহধন্য ছিলেন এই শিল্পী। স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছেন, গভীর অন্তরে গ্রহণ করেছেন জাতীয়তাবাদী আদর্শ– যা তাঁর ছবিতে প্রতিফলিত। প্রদর্শিত তেলরঙের ছবিটি তাঁর আঁকা হতে পারে না। আর কেবল চিত্রের আঙ্গিক নয়, ছবির অঙ্কনশৈলীও অত্যন্ত নিম্নমানের। এমন একটি লঘু কাজ প্রদর্শনের অর্থ ভারতীয় শিল্পের সেই মহান স্বর্ণস্তম্ভের গায়ে কালিমা লেপন নয় কি?

শিল্পী: নন্দলাল বসু

এই ধরনের আয়োজনে নির্ধারিত বিশেষজ্ঞ কমিটি এবং কিউরেটর থাকেন, প্রদর্শনী নির্মাণ ও সজ্জার দিকটি তত্ত্ববধানের উদ্দেশ্যে। দেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের কাজে এই সচেতনতা আরও জরুরি। এখানে ক্ষমাহীন শিথিলতা কীভাবে দেখা দিল– তাই ভাবছি। সে কি পরিকল্পকের ভাবনার সীমাবদ্ধতা? না একাধিক প্রকৃত ছবির মধ্যে দু’-একটা বেঠিক ছবি মেলে দিয়ে তাদেরও মূল ছবি হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার সচেতন প্রয়াস! ভাবতে গিয়ে মনটা ভারী হয়ে উঠল। দেশের প্রথিতযশা শিল্পীর কাজ এমন লঘুভাবে গ্রহণ যায়? দর্শকের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এই সুনিপুণ প্রয়াস– এ কি অপরাধ নয়?

শিল্পী: যামিনী রায়

একইসঙ্গে ভাবছিলাম, আমার চোখ দুটো এমন করে জাগিয়ে দিল কে? কে আমার হৃদয়টাকে এমন আন্দোলিত করে তুলল? সে কি আমার পূর্বস্মৃতি, জীবনের অভিজ্ঞতা, শিল্পবোধ? ঠিক কী বলতে পারি একে? দিব্যদৃষ্টি? অন্তর্দৃষ্টি? তৃতীয় নয়ন? জানি না, এমন উপলব্ধিকে কোন গোত্রে ফেলা চলে। ভেবে দেখলে এই দৃষ্টি, এই ‘তৃতীয় নয়ন’ আসলে এমন এক অনুভব– যা বিশেষ দেখার কথা বলে। এক প্রখর অনুভূতিশীল দেখা। গভীর থেকে গভীরতর দেখা, চোখে দেখার মধ্যে দিয়ে মনের দেখা। এইসব আকাশ-পাতাল ভাবতে গিয়ে মনে পড়ছিল দেখা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কী তীব্র অবসেশন!

রবীন্দ্রনাথের অন্তর্দৃষ্টি

কখনও তাঁর দেখা উপনিষদের ছায়ায় দার্শনিক বিস্তারে আচ্ছন্ন, কখনও সে ধ্যানের মধ্যে দিয়ে অনুভব, যা কবিতার ভাষায় বারবার ‘ধেয়ান’ বলে অভিহিত হয়েছে। আবার কোথাও তিনি বলেন ‘এক সহজ দৃষ্টি’ অর্জন করার কথা– যা ঠিক চোখের দেখা নয়, আবার চোখের দেখার মতোও বটে। ‘…আমাদের চক্ষুর স্বভাবই হচ্ছে সে কোনো জিনিসকে ভেঙে ভেঙে দেখে না, একেবারে সমগ্র করে দেখে। সে স্পেকট্রস্কোপ যন্ত্র দিয়ে দেখার মতো করে দেখে না, সে আপনার সমস্তকে বেঁধে নিয়ে আপন করে দেখতে জানে। আমাদের আত্মবোধের দৃষ্টি যখন খুলে যায় তখন সেও তেমনি অত্যন্ত সহজেই আপনাকে এক করে এবং একের সঙ্গে আনন্দে সম্মিলিত করে দেখতে পায়। সেইরকম করে দেখাই তার সহজ ধর্ম।’ আবার অন্য কোনও লেখায় অনায়াসে এই ভাবনার বিপরীতে হেঁটে চলেন। যেমন, ‘আমাদের মনই আমাদের চোখকে চেপে ধরেছে… তার যে কত বাঁধা শব্দ আছে, কত বাঁধা মত আছে তার সীমা নেই, সে কাকে যে বলে শরীর কাকে যে বলে আত্মা, কাকে যে বলে হেয় কাকে যে বলে শ্রেয়, কাকে যে বলে সীমা কাকে যে বলে অসীম তার ঠিকানা নেই– এই সমস্ত সংস্কারের দ্বারা চাপা দেওয়াতে আমাদের দৃষ্টি নির্মল নির্মুক্ত ভাবে জগতের সংস্রব লাভ করতেই পারে না।’ রবীন্দ্রনাথের এই দেখা, আত্মার দৃষ্টির অভিমুখ বড় বিচিত্রগামী। যেমন মাঝেমাঝে তিনি বলে ওঠেন: ‘কেবলমাত্র দৃশ্যের মধ্যে নয়, ভাবের মধ্যেও যে ভেসে চলেছে সেও সেই দ্রষ্টা আমি।… বাহিরের বিশ্বের রূপধারার দিকেও আমি যেমন তাকাতে তাকাতে চলেছি, আমার অন্তরের চিন্তাধারা ভাবধারার দিকেও আমি তেমনি চিত্তদৃষ্টি দিয়ে তাকাতে তাকাতে চলেছি।’ তাহলে এখানে চোখের দেখা, মনের দেখা, ভাবের দেখা ইত্যাদির সঙ্গে আমরা যে ‘চিত্তদৃষ্টি’র দেখা পেলাম, একেই বলব ত্রিনয়ন? সেখানেই কি লুকিয়ে আছে দেখার যথার্থ আকুতি?

দেবাদিদেব এবং দুর্ভিক্ষের অন্নপূর্ণা, শিল্পী: নন্দলাল বসু

‘ত্রিনয়ন’ শব্দটা আমাদের বড় চেনা। ‘ত্রিনয়ন’ আর ‘তৃতীয় নয়ন’– এ দুইয়ের মধ্যে কিছু ফারাক আছে বইকি। অভিধান ঘাঁটলে ‘ত্রিনয়ন’ বলতে বুঝি মহাদেব। পাশাপাশি অন্তত পক্ষে শ’দুয়েক সমার্থক শব্দ এসে ভিড় করে। তিনি ত্রিলোচন, ত্রিপুরারি, ত্রিপুরান্তক, ত্রিপুরঘ্ন, ত্রিশূলী ইত্যাদি ইত্যাদি। সেখান থেকে খানিকটা সরে এসে পৌরাণিক আখ্যান অবলম্বনে অঙ্কিত ত্রিনয়নধারী দেবতাদের দিকে তাকাই। বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা ছবিতে দেবতাদের কপালে চিত্রিত এই তৃতীয় নয়ন– যা কি না অন্যায়ের বিরুদ্ধে ক্রোধের রুদ্র মুহূর্তে গর্জে ওঠে। তখন সেই ত্রিনয়নে ঝরে অগ্নি। আমাদের চোখের সামনে কুমোরপাড়ার প্রতিমা-শিল্পীদের গড়া মূর্তিতেও তার প্রতিফলন। তবে চিত্রকরের ছবি হোক বা মূর্তিকারের প্রতিমা– সব দেবতার কপালে ত্রিনয়ন আঁকা দেখি না। দেবী চণ্ডিকা ত্রিনয়নী। ওদিকে আমাদের আটপৌরে বাঙালির ঘরে মা দুর্গা যখন ছেলেপুলে নিয়ে বছরান্তে বাপের বাড়ি আসেন, তখন দেবীর অসুরনিধনের মূর্তি পূজিত হলেও তিনি আটপৌরে বাঙালি মেয়েই। তবে দেবীর কপালে জ্বলজ্বল করে তাঁর ত্রিনয়ন। সঙ্গে সিদ্ধিদাতা গণপতির কপালেও তৃতীয় চক্ষু। কিন্তু লক্ষ্মী, সরস্বতীর কপালে তৃতীয় চক্ষু দেখতে পাই না। এমনকী, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়ও ত্রিনয়ন চিহ্নিত নয়। তবে কি দেবতাদের মধ্যেও এই তৃতীয় চক্ষুর প্রসঙ্গে স্তরবিন্যাস আছে? সাধারণভাবে লক্ষ্মী হলেন বিত্তবৈভবের দেবী, তাঁর ডান হাতের নবীন ধানের গুচ্ছে তিনি কৃষিকর্মের দেবী হিসেবে চিহ্নিত।

দেবী দুর্গা ও দেবী সরস্বতী, শিল্পী: নন্দলাল বসু

দেবী সরস্বতীর কাছে বাণীর নিয়ত আরাধনা আমাদের। তাঁর কপালেও ত্রিনয়ন আঁকা নেই। দেবী কালিকার রুদ্র মুখমণ্ডলে তৃতীয় নয়ন, পদতলে শায়িত দেবাদিদেবের নিদ্রালু চক্ষুযুগলের সঙ্গে কপালে আঁকা ত্রিলোচন তাঁকে সদা জাগ্রত রেখেছে। তবে কি ত্রিনয়নের সঙ্গে সর্বাগ্রে ক্রোধের গ্রন্থিবন্ধন? দেবী চণ্ডিকা, রুদ্রভৈরব তাঁদের তেজ দ্বারা দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনে ব্যাপৃত, সেই অর্থেই কি তাঁরা ত্রিনয়ন দ্বারা চিহ্নিত? আর দেবী সরস্বতী, যিনি বিদ্যা তথা শিল্পকলার অধিষ্ঠাত্রী দেবী– তিনি সেই বিশেষ নয়নের অধিকারিণী নন? তবে কি সাধারণ অর্থে ধরে নিতে হবে বাহুবলের শক্তির কাছে বিদ্যার বৈভব পরাজিত! অস্ত্রের কাছে জ্ঞানের পরাজয়?

প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, বিদ্যা তথা জ্ঞানের আরাধনা ব্যতিরেকে আমরা কি ত্রিনয়নের প্রতীকস্বরূপ অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎকে উপলব্ধি করতে পারব? হয়তো এমনটাই ঠিক যে, দেবী সরস্বতীর কপালে আঁকা সেই অদৃশ্য ত্রিনয়ন আমাদের অন্তরের মূঢ়তা জড়ানো দৃষ্টিতে ধরা দেয় না। আর আজ, আমরা তো প্রতি মুহূর্তে তাঁর জ্ঞানের অমৃত প্রসাদ থেকে নিজেদের বঞ্চিত করে চলেছি। তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষাতেই বলি, আমাদের ‘আত্মবোধের দৃষ্টি’ উন্মীলিত হোক– দেবীর কাছে করজোড়ে এই প্রার্থনা রইল।