Robbar

হাঁসফাঁস গরম কি এবার বর্ষার বেস্টফ্রেন্ড?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 24, 2026 10:41 am
  • Updated:February 24, 2026 10:41 am  

২০২৬-এ কি বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় হতে পারে? নিরপেক্ষ বছর বলে ঘূর্ণিঝড় থাকবে না, একথা সঠিক নয়। যদি বঙ্গোপসাগর প্রাক্-বর্ষা এবং বর্ষার পরবর্তীকালে উষ্ণ থাকে, তাহলে দুই ক্ষেত্রেই বিশালাকার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। প্রারম্ভিক ঘূর্ণিঝড় বর্ষার আগমনকেও বিলম্বিত করতে পারে এবং বৃষ্টির ধীর আগমন সমুদ্রের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে নতুন ঘূর্ণাবর্তের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে বিশেষ সতর্কবার্তা ও নজরদারির আওতায় আনা বিশেষ প্রয়োজন।

দীপাঞ্জন মিশ্র

লা নিনার পর কি তাহলে প্রবল তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঝড় হবে? কী সম্ভাবনা নিয়ে শুরু হয়েছে এই বছর? অনেক প্রশ্ন আমাদের মনে। উত্তরও অনেক, কিন্তু সঠিক কোনটা? নানা বিভ্রান্তির মাঝে আমার মনে হল বিষয়টাকে একটু সহজ করে পরিবেশন করা দরকার। 

ENSO বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় উষ্ণ ও শীতল স্রোতের তিনটে রূপ হয়: একটি হল– এল নিনো, অন্য দু’টি লা নিনা এবং নিরপেক্ষ অবস্থা। 

এল নিনো মানে সমুদ্রের উষ্ণ অবস্থা, লা নিনা শীতল অবস্থা; এবং নিরপেক্ষ অবস্থা এই দুই অবস্থার মধ্যবর্তী একটা সময়কে নির্দেশ করে– যাকে দেখে বোঝা যায় ঠিক কোন অবস্থার দিকে যেতে চলেছে বিশ্ব আবহাওয়ার পরিস্থিতি। বিগত বছরগুলোর মতোই সব মতামতের ঊর্ধ্বে গিয়ে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের শুরু হতে চলেছে এক পরিবর্তনশীল প্রশান্ত মহাসাগরীয় অবস্থার মধ্য দিয়ে।

গত চার সপ্তাহে পূর্ব-মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্র-পৃষ্ঠ তাপমাত্রা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের নিচে ছিল, কিন্তু পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে তা সামান্য স্বাভাবিকের উপরে অবস্থান করেছিল।

গত কয়েকমাস ধরে মাঝারি মাত্রার লা নিনা পরিস্থিতি ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বছরের প্রথমার্ধ ENSO নিরপেক্ষ অবস্থার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৭৫ শতাংশ। প্রথম নজরে ‘নিরপেক্ষ’ শব্দটি আমাদের আশ্বস্ত করতে পারে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে এই শব্দের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটা অস্থির অবস্থার ছায়া।

ভারতের ক্ষেত্রে লা নিনার দুর্বল হয়ে পড়া প্রায়শই একটি অস্বস্তিকর গরমের সংকেত। বিগত বছরগুলোর দিকে নজর দিলে দেখা যাবে যে, লা নিনা দুর্বল হয়ে পড়লে তাপপ্রবাহের তীব্রতা বেড়ে যায় এবং আঞ্চলিক জলবায়ুগত সমস্যার সৃষ্টি হয়। যার ফলে প্রখর গ্রীষ্মের সূচনা ঘটে। গ্রীষ্ম শেষে বর্ষার সূচনা হলে আপাত দৃষ্টিতে সেটাকে ‘স্বাভাবিক’ বর্ষা মনে হলেও, তার আড়ালেও লুকিয়ে থাকে এক ভয়ংকর অনিশ্চয়তা।

গত চার সপ্তাহে বিশ্বের অধিকাংশ মহাসাগরে সমুদ্র-পৃষ্ঠ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের উপরে ছিল। উষ্ণমণ্ডলীয় আটলান্টিক মহাসাগরে তাপমাত্রা অধিকাংশ ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের কাছাকাছি ছিল, এবং মধ্য ভারত মহাসাগরে তা স্বাভাবিকের উপরে ছিল। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে তাপমাত্রা পূর্ব-মধ্য অংশের তুলনায় বেশি উষ্ণ ছিল।

আসল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায় যে, নিচ থেকে উষ্ণ হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগর। পূর্ব-মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিতলের তাপমাত্রা এখন স্বাভাবিকের নিচে কিন্তু সমুদ্রের তলদেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে ধীরে ধীরে, যা বিস্তার ঘটাচ্ছে পূর্বদিকে অর্থাৎ, চিলি উপকূলের দিকে। এই অবস্থাই লা নিনার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত। যখনই এরকম অবস্থা এপ্রিলের আগে ঘটে তখন ভারতের গ্রীষ্ম কাটে নিরপেক্ষ অবস্থার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ এল নিনোতে বর্ষা যেমন দমে যায় সেই ঘটনা এখানে ঘটে না। আবার শক্তিশালী লা নিনার মতো অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতও দেখা যায় না। কিন্তু এখানেই ঘটে একটা মজার ঘটনা। এরকম পরিস্থিতিতে জলবায়ুর নিয়ন্ত্রণ চলে আসে স্থানীয় উপাদানগুলির হাতে, যা স্থিতিশীলতার বদলে ডেকে আনে অস্থিরতাকে। উপাদানগুলি কী কী?

১. ভারত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা
২. ভূমির উত্তাপের তীব্রতা
৩. বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রাগত পার্থক্য
৪. অন্তর্বর্তী মৌসুমী চক্র

তাহলে বৃষ্টির আগে কি প্রবল গরম পড়বে? এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যার উত্তরে বলা যায় যে, যদি বর্তমান অবস্থা বজায় থাকে তাহলে এপ্রিল-মে ২০২৬ গত এক দশকের অন্যতম উষ্ণ প্রাক-বর্ষা মৌসুমী হতে পারে। এই যুক্তির পক্ষে কতগুলো কারণও জানিয়ে রাখা প্রয়োজন, যেগুলি হল:
লা নিনার ঠান্ডা অবস্থার ক্ষীণ হয়ে পড়া, ভারত মহাসাগরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে বেড়ে যাওয়া অতিরিক্ত তাপমাত্রা। ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম, মধ্য এবং গাঙ্গেয় অববাহিকা বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এই অবস্থা বিরাজ করলে তাপপ্রবাহ শুরু হবে অনেক আগে থেকে এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। দিল্লি, নাগপুর, আমেদাবাদ, কোলকাতার মতো শহরগুলিতে আরও জটিল উষ্ণ অবস্থার দেখা পাওয়া যাবে। যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে শ্রমিক স্বাস্থ্য, জলকষ্ট এবং উৎপাদনশীলতার ওপরে। 

নিম্নস্তরের ক্ষেত্রগত বায়ুপ্রবাহের বিচ্যুতি। এটি বায়ুমণ্ডলের প্রায় ১.৫ কিলোমিটার উচ্চতায় পূর্ব–পশ্চিমমুখী বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক মান থেকে বিচ্যুতির পরিমাপ। ধনাত্মক মান → পশ্চিমা বায়ুর আধিক্য, যা প্রমাণ করে লা-নিনা দুর্বল হবে ও নিরপেক্ষ অবস্থার সুচনা হবে, সঙ্গে এলনিনো অবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে। ঋণাত্মক মান → পূর্বালী (Trade Wind) বায়ুর আধিক্য, যা প্রমাণ করে এলনিনো দুর্বল হবে এবং লা-নিনা পরিস্থিতি আসবে।

এবারে আসি স্বাভাবিক বর্ষা কী? এ বছর কী ধরনের বর্ষা হবে বলে অনুমান করতে পারছে গোটা বিশ্বের জলবায়ু সংস্থাগুলি?

ENSO নিরপেক্ষ বছরগুলিতে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে থাকে, তবে পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ বছর স্বাভাবিকের থেকে একটু বেশি বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা আছে, এল নিনো বছরগুলোর মতো খরা অবস্থার সম্ভাবনা কিছুটা কম থাকবে, তবে জাতীয় গড় বৃষ্টিপাতের সমবণ্টন অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। ২০১৮ সালের মতো নিরপেক্ষ বছরগুলোতে দেখা গিয়েছে যে স্বল্পসময়ে অতিবৃষ্টির ফলে কিছু অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা হয়েছে অথচ অন্যত্র বৃষ্টির ব্যাপক ঘাটতি দেখা গিয়েছে। কেরলের বন্যা সেরকমই একটি উদাহরণ, যা প্রধানত স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টির জন্য হয়েছিল। ২০২৬ সালেও একই ঝুঁকি একদম উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ভারত মহাসাগরের উষ্ণ জলীয় বাষ্প সরবরাহ ও ভূমিভাগের অতিরিক্ত উত্তাপ মৌসুমী নিম্নচাপকে তীব্র করতে পারে। যার ফল হতে পারে অসম, বিহার, পূর্ব উত্তরপ্রদেশ ও পশ্চিমঘাট অঞ্চলের তীব্র বৃষ্টিপাত। হিমাচল অঞ্চলে ব্যাপক হড়পা বান। অর্থাৎ, জাতীয় স্তরে ‘স্বাভাবিক’ বর্ষা হলেও জেলা স্তরে তা চরম রূপ নিতে পারে। 

ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে জানুয়ারি ২০২৬-এর শেষ পর্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশীয় উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা।

এবারে আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, আমাদের কৃষিপ্রধান দেশের কৃষিব্যবস্থার সুযোগ ও সতর্কতা বার্তার দিকে। যদি বর্ষা সময়মতো উপস্থিত হয় তবে খারিফ শস্যের চাষ ভালোভাবে হবে। মাটির আর্দ্রতা পুনরুদ্ধারেও এই অবস্থা অনুকূল হয়ে উঠবে– ধান, ভুট্টা, তুলা চাষ উপকৃত হবে। কিন্তু শুরুতেই ঝুঁকির কথা মাথায় রাখা দরকার– এপ্রিল-মে মাসের তাপপ্রবাহের ফল পড়তে পারে গমের ফসল কাটার ওপরে, ডাল ও তৈলবীজে আর্দ্রতার প্রভাব পড়তে পারে এবং গবাদি পশুর ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহের জন্য তাদের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

২০২৬-এ কি বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় হতে পারে? নিরপেক্ষ বছর বলে ঘূর্ণিঝড় থাকবে না, একথা সঠিক নয়। যদি বঙ্গোপসাগর প্রাক্-বর্ষা এবং বর্ষার পরবর্তীকালে উষ্ণ থাকে, তাহলে দুই ক্ষেত্রেই বিশালাকার ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হতে পারে। প্রারম্ভিক ঘূর্ণিঝড় বর্ষার আগমনকেও বিলম্বিত করতে পারে এবং বৃষ্টির ধীর আগমন সমুদ্রের উষ্ণতা আরও বাড়িয়ে নতুন ঘূর্ণাবর্তের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। ওড়িশা, অন্ধ্রপ্রদেশ, সুন্দরবনের মতো উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে বিশেষ সতর্কবার্তা ও নজরদারির আওতায় আনা বিশেষ প্রয়োজন।

মার্চ ২০২৫ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে আপেক্ষিক সমুদ্র-পৃষ্ঠ তাপমাত্রার বিচ্যুতি। নীল রং স্বাভাবিকের নিচে তাপমাত্রা (শীতল অবস্থা) এবং হলুদ/কমলা রঙ স্বাভাবিকের উপরে তাপমাত্রা নির্দেশ করছে। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি থেকে পূর্ব-মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ধারাবাহিক শীতলতা লক্ষ করা যায়, যা লা নিনা পরিস্থিতির স্থায়িত্বের ইঙ্গিত বহন করে কিন্তু সেই অবস্থা ধীরে ধীরে দুর্বল হচ্ছে ২০২৬-এর জানুয়ারির শেষ ভাগে।

শাসনব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে কী কী করা যেতে পারে– এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। ভারতের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাগুলি প্রায়শই প্রতিক্রিয়ামূলক, প্রতিবার তাপমাত্রা বাড়লে তবেই হিট-প্ল্যানগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে, বাঁধ ভাঙলে বন্যা ব্যবস্থাপনা ত্বরান্বিত হয়। ২০২৬ সালে গ্রীষ্মের আগাম আগমন, প্রস্তুতির সুযোগ এনে দিয়েছে; কারণ, জলবায়ু পরিবর্তন অনেকটা আগেই চোখে পড়েছে প্রতিটা দেশে। তাই তাপপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা মার্চ থেকেই নেওয়া, জেলাস্তরে বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ জোরদার করা, জলাশয়গুলিকে পরিষ্কার করে জলধারণের উপযুক্ত করে তোলা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষিব্যবস্থার পরামর্শ প্রদান ও নতুন জলবায়ু-নির্ভর কৃষি ক্যালেন্ডার প্রদান, খরা, উষ্ণতা ও বৃষ্টি-সহনশীল দেশি বীজের বন্টন করা প্রয়োজন।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, নিরপেক্ষ ENSO মানেই আত্মতুষ্টি নয়, বরং সতর্ক হওয়ার সংকেত।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপাঞ্জন মিশ্র-র অন্যান্য লেখা

……………………..