Robbar

প্রেমহীন যৌনতায় আমরাই আমাদের প্রতিযোগী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 23, 2026 7:38 pm
  • Updated:February 23, 2026 7:49 pm  

ভারত ব্যতীত বিশ্বের বাকি যে দেশগুলির যুগলরা ভালোবাসা ও ভালো থাকার নিরিখে সবথেকে পিছিয়ে আছে, তার মধ্যে মূলত এশীয় দেশগুলিই রয়েছে। সর্বনিম্ন তিনটি স্থানে রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারত। এর মধ্যে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যুগলদের সম্পর্কের গ্রাফটি বেশ একমাত্রিক। তারা পার্টনারের সঙ্গে আনন্দে নেই, সামগ্রিকভাবে ভালো নেই, যৌন সম্পর্কেও সুখী নেই। ব্যতিক্রম কেবল ভারত। যেখানে মানুষ প্রেমের সম্পর্কে সুখী না হয়েও যৌনসম্পর্কে দিব্য সুখী!

প্রচ্ছদ শিল্পী: দীপঙ্কর ভৌমিক

প্রহেলী ধর চৌধুরী

‘একটা গোপন কথা বলি শোনো… আসলে মানবজীবন আগাপাশতলা প্যাশনে ভরপুর। আর এই প্যাশনটাই মানবজাতির সম্পদ। চিকিৎসা, আইন, ব্যবসা, ইঞ্জিনিয়ারিং– এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আর সভ্যতার জন্য অনিবার্য হলেও, আসলে কিন্তু আমরা বেঁচে থাকি কবিতার জন্য; সুন্দরের জন্য; ভালোবাসা, প্রেম আর প্রতীক্ষার জন্য। বস্তুত সেই সবকিছুর জন্য, যা আমাদের আবেগ দ্বারা নির্ধারিত।

ডেড পোয়েট সোসাইটি, ১৯৮৯

জন কিটিং স্যরের ইংরেজি পড়ানোর ধরনটি ছিল দস্তুরমতো ভিন্ন। ওয়েলটন অ্যাকাডেমির বয়ঃসন্ধিকালের ছাত্রদের তিনি ইংরেজি পড়াতেন কম, দর্শন শেখাতেন বেশি। সাহিত্যের দর্শন নয়, জীবনের দর্শন। তিনি চাইতেন যে, জীবন তাঁর ছাত্রদের যতই দাঁত-নখ বের করে ধাওয়া করুক না কেন, যতই বাস্তবের মাটিতে আছড়ে ফেলুক না কেন, জীবন থেকে কখনও যেন তারা নিজের প্যাশনটাকে হারিয়ে না ফেলে। তারা যতটা বাঁচবে, যতটুকু যা করবে– তা কাজ হোক বা আড্ডা, বিপ্লব হোক, প্রেম কিংবা যৌনতা; দীর্ঘদিনের হোক বা এক লহমার, মেটাফিজিক্যাল হোক বা বাস্তব; জীবনটাকে মারকাটারি বাঁচতে হলে, সত্যিকারের বাঁচার মতো বাঁচতে হলে, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কাজ করতে হবে ভালোবেসে; পাগলের মতো ভালোবেসে। এই উথালপাথাল ভালোবাসারই আরেক নাম প্যাশন। হৃদয়ে যার কমতি এক অমার্জনীয় দৈন্য। লুডভিগ ভন বিটোফেন যেমন বলেছেন, ‘To play a wrong note is insignificant, To play without passion is inexcusable.’

‘ডেড পোয়েট সোসাইটি’ সিনেমায় জন কিটিং-এর ভূমিকায় রবিন উইলিয়ামস

আমরাও তো তাই জানতাম বরাবর। জানতাম যে, প্রেমের কোনও প্যারামিটার থাকবে না, ব্যালেন্স শিট থাকবে না; থাকবে বেহিসাবি আবেগ আর অঙ্কের ১০৮টা ভুল। আমরা জানতাম যে, কোনও বাঁশির সুর নয়; প্যাশনেট প্রেমের বর্ণ, গন্ধ, আলোই রাধিকাকে ব্রজের পথ দেখায়। পৃথিবীর কোনও ভূগোল সিলেবাস বা গুগুল ম্যাপের সাধ্য নেই সেই নির্ভুল অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশের মিলনক্ষেত্র খুঁজে দেওয়ার; কোনও যন্তরমন্তর ঘরের সাধ্যি নেই মগজাস্ত্র দিয়ে হৃদয় থেকে এই প্যাশনটাকে উপড়ে ফেলে। আমাদের আবেগের কাছে তাই আমরা আত্মসমর্পণ করি ফিরে ফিরে। কারণ ওটাই সব। রাধা-কৃষ্ণ থেকে রোমিও-জুলিয়েট, লয়লা-মজনু থেকে হির-রাঞ্ঝার মধ্যেই আমরা প্রত্যেকে আছি। সমাজের নিয়ম থেকে, আইনের লম্বা হাত থেকে যেমন রোমিওদের নিস্তার নেই, তেমন আমাদের প্রেম নজিরের রোমন্থন থেকেও তাঁদের মুক্তি নেই। প্যাশনেট প্রেমের কাছে, ভালোবাসার ব্যাকুলতার কাছে, দিনশেষে তাই আমাদের অনন্ত সালাম জমা পড়ে। প্রেমের আদালতে সব ‘জায়েজ’ হয়… সব।

ইতিহাসে এমনতর যে জীবন আমরা বাঁচতাম, তেমন আরও হাজার ইতিহাস বাঁচার কথা ছিল আমাদের। তবু কবে থেকে, ঠিক কবে থেকে যে আমরা এমন সম্পর্ক বাঁচতে শুরু করলাম, যেখানে হিসেব আছে, দায় আছে, দায়িত্ববোধ, নিয়ম সব আছে; শুধু পাগলপারা প্রেম নেই, ভালো থাকার মারকাটারি উদযাপন নেই, কে জানে!

কবে থেকে বলা মুশকিল। কিন্তু ২০২৫ সালে বিশ্বের ৩০টি দেশের ওপর করা ‘আইপিএসওএস লাভ লাইফ স্যাটিসফেকশন সার্ভে’ বলছে যে, কোনও একটি যৌথ সম্পর্কে সামগ্রিক ভালো থাকা এবং পরস্পরের প্রতি প্রেমবোধের নিরিখে এদেশের যুগলদের অবস্থান গোটা বিশ্বের মধ্যে শেষের দিক থেকে যথাক্রমে দুই এবং তিন নম্বরে। এই যৌথ সম্পর্কগুলি বৈবাহিক, একত্রবাসের না প্রেমের– সমীক্ষার রিপোর্টে তা স্পষ্ট করা হয়নি। স্পষ্ট করার প্রয়োজনও নেই অবশ্য। কারণ যে সম্পর্ক প্রেমের, প্যাশনের, প্রতীক্ষার, তার তো ‘বৈবাহিক স্ট্যাম্প’ লাগে না; তা সদাই নিত্য, নিত্যই সত্য। তাই এই যৌথ সম্পর্কের পোশাকি নাম যাই হোক না কেন, এদেশের যুগলদের ভালোবাসার, ভালো-থাকার সুখানুভূতির ঘাটতি যে হচ্ছে, সেটাই বড় কথা। আরও এক বিচিত্র কথা, সমীক্ষাটি দেখাচ্ছে যে, ভারতীয় যুগলরা তাদের পার্টনারের সঙ্গে যৌথযাপনে সুখী না হলেও, যৌন সম্পর্কে যথেষ্ট সন্তুষ্ট।

আর কোনও দেশের বাস্তবতা কিন্তু এমনটা নয়। ভারত ব্যতীত বিশ্বের বাকি যে দেশগুলির যুগলরা ভালোবাসা ও ভালো থাকার নিরিখে সবথেকে পিছিয়ে আছে, তার মধ্যে মূলত এশীয় দেশগুলিই রয়েছে। সর্বনিম্ন তিনটি স্থানে রয়েছে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারত। এর মধ্যে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার যুগলদের সম্পর্কের গ্রাফটি বেশ একমাত্রিক। তারা পার্টনারের সঙ্গে আনন্দে নেই, সামগ্রিকভাবে ভালো নেই, যৌন সম্পর্কেও সুখী নেই। ব্যতিক্রম কেবল ভারত। যেখানে মানুষ প্রেমের সম্পর্কে সুখী না হয়েও যৌনসম্পর্কে দিব্য সুখী!

কিন্তু তা হয় কী করে? প্রেমাবেগ ছাড়া কি যৌনসম্পর্ক সুখের হতে পারে? প্রেমের বোধ আর প্যাশনের উষ্ণতাই কি আমাদের বাকি সকল জীবের থেকে উন্নত করে না? তাহলে কি বলতে হয় যে, আমরা, দক্ষিণ-এশীয় মানুষরা, বিশেষ করে ভারতবাসীরা– ক্রমশই এক প্রেমহীন, প্যাশনহীন, যৌনতা সর্বস্ব সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি? যা আমাদের শারীরিক সন্তুষ্টি জোগাচ্ছে, কিন্তু আবেগহীন সেই শরীরের নিয়মে জাগা-শরীরে, ভালোবাসার আর ভালো থাকার উপায় নেই কোনওখানে?

প্রতীকী চিত্র

হয়তো তাই হবে। এক তরুণ সিভিল সারভেন্ট প্রাক্তন বসের কাছে শুনেছিলাম যে, আইএএস পরীক্ষা পাশ করেই নাকি এদেশের ভবিষ্যতের আমলারা জীবনসঙ্গী খোঁজার কাজে লেগে পড়ে। আইএএস অফিসারদের বর-বউকেও হতে হবে আইএএস; আইএফএস বা আইপিএস। তাই ‘লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং’-এর প্রথম দিন থেকেই হাতে হাতে ম্যাচমেকিং-এর ফর্দ তৈরি হয়। প্রথমেই আবিষ্কৃত হন সিঙ্গলরা; তারপর বয়স, কমিউনিটি এবং অবশ্যই কোনও রাজ্যে বাড়ি ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ চাকরিতে ‘স্পাউস পোস্টিং’-এর বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায়। অর্থাৎ, স্বামী ও স্ত্রী যাতে একসঙ্গে একই রাজ্যে থাকতে পারেন, তার নানা শর্তাধীন সুবিধা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আপনার দিল্লিতে সেটল করার ইচ্ছে থাকলে, আপনার ফর্দে কেবল দিল্লি-ক্যাডারের মহিলারাই স্থান পাবে (স্পাউস পোস্টিং-এ মহিলাদের কিছু বাড়তি সুবিধা থাকে)। এমন ধারার প্রেমহীন কাগুজে বিয়ে এবং পোস্টিং পাওয়ার পরই ডিভোর্স সাম্প্রতিক সময়ে এদেশে এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, ২০১৭ সালে আলাদা করে আদেশনামা জারি করা হয়– তিন বছরের কম বিয়ে টিকলে ‘স্পাউস পোস্টিং’-এর মাধ্যমে প্রাপ্ত পোস্টিং ফিরিয়ে নেওয়া হবে!

হিসেব-নিকেশের এই আবেগহীন কাগুজে প্রেম ডাক্তারি মহলেও ভারি জনপ্রিয়। ‘ওয়েল সেটল্ড’ ডাক্তার-পার্টনার নির্বাচন এ-যুগের ভাষায় যে ‘পাওয়ার কাপল’ তৈরি করে, তাতে প্যাশনের থেকে পাওয়ারের গুরুত্ব বেশি। এর অবশ্য এক পোশাকি ন্যারেটিভ আছে। ডাক্তার না-হলে নাকি ডাক্তারি প্রফেশনে থাকা পার্টনারের কাজের চাপ, সময় ইত্যাদি বোঝা যায় না। আচ্ছা তাই যদি হবে সত্যি, তাহলে সরকারি চাকুরেরা পার্টনার হিসেবে নিদেনপক্ষে সরকারি চাকুরে খোঁজেন কেন? আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বাজার খারাপ হওয়ার পর থেকে ইঞ্জিনিয়াররা ইঞ্জিনিয়ার বাদে অন্যান্য প্রফেশনের পার্টনার খোঁজেন কেন?

প্রতীকী চিত্র

দেখুন, যৌথ যাপনে অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন অবাঞ্ছিত নয়। একটা উদাহরণ দিই। একবার হাজরার ফুটপাতে বাস ধরার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় শুনেছিলাম, ওই ফুটপাতের মেয়েটির নাকি বিয়ে ঠিক হচ্ছে টালিগঞ্জের দিকের এক ফুটপাতবাসী পরিবারে। কারণ, টালিগঞ্জের ফুটপাতটি অপেক্ষাকৃত নির্ঝঞ্ঝাট, যখন তখন খেদিয়ে দেওয়ার ভয় নেই! এখানে অস্বীকার করতে চাইলেও না মেনে উপায় নেই যে, বাস্তবতার কাছে এক্ষেত্রে আবেগকে খানিক ব্যাকফুটে খেলতেই হবে। কিন্তু যে সম্পর্ক এমন অভাগা নয়, যে সম্পর্কে এই অস্তিত্ব-সংকট নেই, তা কেন ক্রমাগত জড়িয়ে পড়বে হাইপারগ্যামির আবর্তে আর হিসেবের নিক্তিতে? সেই হিসেব, যা একটা সময় ক্লাস সিস্টেমের আবর্তে জড়িয়ে ছিল, আজ খানিক হাওয়া বদলে আরও বেশি পরিব্যাপ্ত অন্য কোন খাতে?

কিন্তু এমন সম্পর্ক, যা জীবনের আপাত সামাজিক ও শারীরিক চাহিদা মিটিয়ে দিলেও আবেগের ঘরে বাষ্পটুকু জমতে দেয় না; ঝকঝকে জীবনের আড়ালে, হিসেবের আবডালে জীবনের প্যাশনগুলোকে মারতে মারতে ভালোবাসা আর ভালো থাকাই যখন অবাস্তব হয়ে ওঠে, তখন তাকে আদৌ আর জীবন বলা যায় কি?

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন প্রহেলী ধর চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা

……………………..