Robbar

বাংলা ভাষার থেকে আমি কী পেলাম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:February 27, 2026 9:29 pm
  • Updated:February 27, 2026 9:29 pm  

এত মানুষ এ দেশে! চাকরির অভাব! ভাষাগুলো নিয়ে আমরা খালি বক্তিমে দিচ্ছি, খালি গেল-গেল রব। কেউ বাংলা পড়ছে না, কেউ তামিল, তেলুগুকে মান্যতা দিচ্ছে না। আরে বাবা, শুধু ভাষাভিমান দিয়ে কী হবে? বাজার, গ্রাসাচ্ছাদনের উপায়– এইগুলো গোড়ার কথা। রাষ্ট্র যদি ভাষার উপযোগিতাকে তুলে না ধরে, তা হলে হাজার কান্না কেঁদেও বাংলার মান বাড়বে না।

প্রচ্ছদ ও স্কেচ: দীপঙ্কর ভৌমিক

বাণী বসু

ভাষা নিয়ে সারা পৃথিবীতেই একটা চোরা আবেগ কাজ করে যাচ্ছে। ‘চোরা’– এই জন্য বললাম যে, এত দিনে ঝগড়া করার মতো যথেষ্ট জটিল সব কার্যকারণ আমাদের প্রতিনিয়ত বিব্রত করে যাচ্ছে, ভাষা নিয়ে ঝগড়াটা পিছনে চলে গিয়েছে।

ইংরেজি তার কলোনির কল্যাণে এখন পয়লা আসনটা দখল করে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় বাজারটা এখন তারই। ফরাসি তার কালচারের গর্ব ছাড়বে না। অন্যান্য পশ্চিম গোলার্ধীয় নানা ভাষা– জার্মান, স্প্যানিশ, রাশিয়ান বা চেক, পর্তুগিজ আর সুইডিশ, নানা বৈজ্ঞানিক অবদান ও সাহিত্য-সৃষ্টির সৌজন্যে অর্জন করে নিয়েছে সুনাম। এ সহস্রাব্দে জাপানি, চিনা, তুর্কি, হিন্দি, বাংলাও পিছিয়ে নেই। যে-আফ্রিকাকে চিরকাল ‘অন্ধকার মহাদেশ’ বলে ধরে নেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেও সংগীত, ক্রীড়া আর সাহিত্যের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তাও কিছু কম দিন হল না।

কলকাতার শহর জুড়ে বিজ্ঞাপন, যেখানে বাংলা সাইনবোর্ডের আধিক্য

এখন মানুষের ভাষাগত অস্মিতা রীতিমতো মান্যতা পেয়ে গিয়েছে। একটা সময় ছিল, যখন ইংরেজির প্রেমে হাবুডুবু খেয়েছি। কষ্ট করেছি তাকে আয়ত্ত করতে, আর তখন আমাদের হিন্দির প্রতি কীরকম একটা অপ্রীতি ছিল। তাকে জোর করে আমাদের ওপর ‘রাষ্ট্রভাষা’ বলে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল বলে আরও। ভারতের উত্তরে অনেকগুলি রাজ্যেই হিন্দি চলে। মাতৃভাষা না-হলেও। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, গুজরাত, মুম্বই-কেন্দ্রিক মহারাষ্ট্র– সর্বত্রই লোকে হিন্দি বোঝে, বলতে পারে। হিন্দির নানা শ্রেণিভেদ আছে অবশ্য। আমরা যে-হিন্দিটা শুনতাম, সেটা ওই ‘ফুটানি কা ডিব্বা, কণ্ঠ ন্যাঙ্গট’ জাতীয়। আমাদের বিরাগটা কেন, বুঝে নিন।

ঠিক আছে। হিন্দি বেশি সংখ্যক ভারতীয়র বোধগম্য। কিন্তু পুবে যে ওড়িয়া-অসমিয়া, সাত বোনের সাত ভাষা ‘আমার কথা শোনো’, ‘আমার কথা শোনো’ বলে কান্নাকাটি করছে, তারা কী দোষ করল? আর দক্ষিণীরা তো হিন্দিতে কথা কইলে জবাবই দেবে না!

বহুভাষী এই দেশের কি তাহলে ‘রাষ্ট্রভাষা’ বলে কিছু থাকবে না?

বাণী বসু

থাকবে, থাকবে। দেশে চারটে সুস্পষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চল রয়েছে তো? প্রত্যেক অঞ্চল থেকে একটা কি দুটো ভাষা নেওয়া হোক। বাংলা থাকবে পুবের ভাষা। অর্থাৎ, সর্বনিম্ন চারটে ভাষায় রাষ্ট্রের কাজকর্ম হতে থাকবে। এতে করে অনেক অনুবাদকের চাকরি হবে, অনেক দোভাষীও লাগবে ওইসব ভাষার। এত মানুষ এদেশে! চাকরির অভাব! ভাষাগুলো নিয়ে আমরা খালি বক্তিমে দিচ্ছি, খালি গেল-গেল রব। কেউ বাংলা পড়ছে না, কেউ তামিল, তেলুগুকে মান্যতা দিচ্ছে না। আরে বাবা, শুধু ভাষাভিমান দিয়ে কী হবে? বাজার, গ্রাসাচ্ছাদনের উপায়– এইগুলো গোড়ার কথা। রাষ্ট্র যদি ভাষার উপযোগিতাকে তুলে না-ধরে, তা হলে হাজার কান্না কেঁদেও বাংলার মান বাড়বে না। রবিঠাকুর নোবেলটা পেয়েছিলেন বলে সর্বভারতীয় স্তরে বাংলার এখনও এত মান। নইলে কে দেখতে যাচ্ছে নজরুল, মধুসূদন, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ কী লিখেছিলেন, তাঁদের কী প্রতিভা ছিল! এঁরা প্রত্যেকেই নোবেলের যোগ্য। আমরা কোন্দল করতে গিয়ে তাঁদের ঠিকমতো তুলে ধরতে পারিনি। এখনও যদি কাছাকোঁচা হাতে করে বসে থাকি, তাহলে ভাষার জন্য কান্নাকাটি যেন আর না-করি। বাংলাদেশ ভাষার জন্য প্রাণ দিতে পারল, আমাদের শিলচর শহিদ হতে পারল, আর আমরা একটা মরণান্তক আন্দোলন করতে পারি না?

যখন জন্মেছিলাম, ভাষাহীন অবোলা শিশু হয়েই তো জন্মাই! একটা বাঁদরছানার সঙ্গে কোনও তফাত ছিল না। মুখে মা-বাবা ফুটল, আস্তে আস্তে খই ফুটতে শুরু করল। মুখের ভাষার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের ভাষাও তৈরি হল। মানবেতর প্রাণীর থেকে তফাতটা ধরা পড়ল।

নিজের প্রথম শৈশব-ছবি মনে পড়ে, উপুড় হয়ে মেঝের ওপর একটা বই নিয়ে শুয়ে। মহা গর্বভরে জোরে জোরে পড়ছি– ‘ক রাজা। তার সাত রানি।’ সাত রানি তো বুঝলুম, কিন্তু ‘ক রাজাটা’ কী রে বাবা? দিদি পাশ থেকে বলল, ‘কী উল্টোপাল্টা বকছিস? ক রাজা আবার কী? ক-এর আগে একটা ছবির মধ্যে এ-টা দেওয়া আছে, দেখ্।’ ওমা! তাই তো! এক রাজা, এক যে ছিল বামুন আর তার ছিল এক বামনি। এক যে ছিল শেয়াল তার বাপ দিয়েছিল দেওয়াল। এক যে রাজা, থাম না দাদা, রাজা নয় সে রাজপেয়াদা। কান টানলে যেমন মাথা আসে, এক টানেতে তেমন অনেক কিছু বেরিয়ে এল। বামন-বামনি আর ধোপার গাধাটা, আর এদের নিয়ে কুলকুণ্ডুলি কাণ্ড। এল ছোট্ট ছেলে, যে না কি হয়ে গিয়েছে বাবার মতো বড়, চলেছে রাঙা ঘোড়ায় চড়ে, টগবগিয়ে মায়ের পাশে পাশে, এল রামায়ণের সীতা মা অগ্নিকুণ্ডের সামনে। এসে গেল জ্যা-তে প্রবল টান দিয়ে অর্জুন আর বুড়ো আঙুলছেদী একলব্য। খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওই আসছে সুবচনীর খোঁড়া হাঁস, আর তার পিছন পিছন ছোট্ট যক হয়ে যাওয়া বুড়ো আংলা। শোভাযাত্রা চলেছেই চলেছেই। শীত-বসন্ত, আর তাদের সাতটি মাছ ভাই– কেটো না কেটো না মাসি, রাজা মোদের ভাই– ক্ষীণ স্বরে বলে উঠছে। এই রূপকথার ভাষা হল, প্রথম বাংলা ভাষায় হাতেখড়ি, এক মায়াবী বাংলা ভাষা, দক্ষিণারঞ্জনের কোল বেয়ে রবীন্দ্র-অবনীন্দ্রর কলমের কালি বেয়ে টুপ টুপ করে ঝরে পড়েছিল। কী যে তার বিস্ময়! কী যে তার মাধুর্য!

মা-ঠাকুরমার মুখের এই তৎসম, তদ্ভব, দেশি মেশানো আদর ঢলানো ভাষা– এটা বাংলার বাঁশের বাঁশির এক মায়াবী টান। এতে যেমন আছে রূপতরাসি ভয়, তেমনই আছে আবার দিলখোলা অ্যাং-ব্যাং-চ্যাং কৌতুক। সে কৌতুক বয়ে যায় বামুন-বামনি, শেয়াল-কুমির থেকে শুরু করে হবুচন্দ্র রাজা আর গবুচন্দ্র মন্ত্রীর কাণ্ডকারখানা পর্যন্ত।

এই ভাষা চলতে চলতে যখন মিশে যায় ‘বন্দি আমার প্রাণেশ্বর’ কিংবা ‘পথিক তুমি পথ হারাইয়াছ’, বা ‘প্রদীপ নিবিয়া গেল’র নাটকে, ‘বিষবৃক্ষ’র অন্ধকার ঝড়ের রাত, ‘কপালকুণ্ডলা’র রূপবর্ণনা বা ‘রাজসিংহ’-র যুদ্ধ, ‘আনন্দমঠ’-এ দেশমাতৃকার তিন রূপবন্দনার ধ্রুপদি গাম্ভীর্যে তখন সে আবার দ্বিতীয় বিস্ময়! এই দুস্তর বৈচিত্রে মুগ্ধ না-হয়ে থাকা যায়! এই ভাষাকে মাটির তালের মতো দু’-হাতে নিয়ে কত প্রতিভাধর যে কত মূর্তি গড়লেন!

রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলি এই ভাষার ঐশ্বর্যে অনন্য হয়ে যায়। ‘গোরা’-তে যখন ধর্মের পক্ষে, দেশজ সংস্কারের পক্ষে গোরা সওয়াল করে, তখন তার তীক্ষ্ণ যুক্তি ধারণ করে ভাষা হয়ে ওঠে আগুনের মতো; আবার যখন সে মা আনন্দময়ীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, তখন তার উপলব্ধিসমৃদ্ধ আবেগের ভাষার মহিমা আলাদা। উপন্যাস কেমন, তার জাত কী– এসব প্রশ্ন তখন গৌণ হয়ে যায়, শুধু ভাব প্রকাশের সেই অনুপম রূপে মগ্ন হয়ে থাকি।

গোরা কহিল– মা, তুমিই আমার মা। যে-মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলুম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসেছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই– শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা।

বুদ্ধদেব বসুতে এসে ভাষার চলনটা আবার অন্যরকম হয়ে গেল। তিনি ইংরেজি ইডিয়ম কিছু কিছু ঢোকালেন। অনেক শব্দ আক্ষরিক অনুবাদ করলেন, যেমন ‘বোতল সবুজ’, একটা আলাদা স্বাদ এল। বাংলা প্রবন্ধের ভাষা সৃষ্টিতেও তাঁর অবদান অনেক। একই সময়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত-ও কবিতার সঙ্গে সঙ্গে প্রবন্ধের ভাষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন।

এই নবীকরণ-পুনর্নবীকরণ বাংলা গদ্যের ভাষাকে তরুণ রেখেছে। এই অপরূপ আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। ভাষাকে সরিয়ে নিলে আমি একজন সৃষ্টিশীল মানব হিসেবে কতটা বাঁচব, তা বলা শক্ত।