Robbar

অ-এ অন্ধকার, আ-এ আলো

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 8, 2026 2:00 pm
  • Updated:March 8, 2026 2:39 pm  

সাক্ষাৎকার নয়। কথোপকথন। শিল্পী অরুণিমা চৌধুরী এবং মানুষ অরুণিমা চৌধুরীর মধ্যবর্তী সেতুটাকে স্পর্শ করতে চাওয়া। জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা ছোট ছোট সুখদুঃখ আনন্দবেদনার কবিতাটিকে; তার অন্তর্গত সংবেদনশীল সত্তাটিকে তুলে আনা। যে সত্তা অবলীলায় বলতে পারে: ‘জগতের নিরবচ্ছিন্ন খেলার স্রোতে, বহুর মধ্যে এক হয়ে, খড়কুটো হয়ে ভেসে চলা একজন হিসেবে নিজেকে দেখি। খেলায় মেতে ছবি আঁকি। খেলায় মেতে গাছ লাগাই। আর সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই অনিশ্চিত, অনির্বচনীয়কে জেনে।’ কথায় কথা বেড়েছে, সময় বয়ে গিয়েছে। ক্রমশ দীর্ঘ হয়েছে বিনিময়। বাধাহীন, গতিনিরুদ্ধ সেই বাকপ্রবাহের সবটুকুই ধরা রইল, এ লেখায়। কারণ শিল্পের জন্য যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, এ কথোপকথন তার কণিকামাত্র। 

গৌরবকেতন লাহিড়ী

অরুণিমাদি, শেষ যেবার এ ঘরে এসেছিলাম, তখন আপনার রেট্রোস্পেকটিভ চলছে। ইমামি-তে। সেদিন এ চেয়ারখানায় একজন দীর্ঘদেহী নরম মনের মানুষ বসেছিলেন। মানুষটা আজ আর নেই। আশ্চর্য একটা মনখারাপ হচ্ছে– এই কথাবার্তায় তো ওঁরও থাকার কথা, অন্তত থাকলে অন্যরকম হতে পারত। 

হ্যাঁ। ‘আরণ্যক’-এর সময় থেকেই একটা ভয়ংকর টানাপোড়েন। অসুস্থতা। এ নিয়ে আর কী বলব। কী আর বলার থাকে! মানুষ অসুস্থ হলে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করে। ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়। আমরাও সেরকম হয়েছিলাম। কিন্তু সেটা কাজ করল না। গৌতম চলে গেল। ৬ নভেম্বর।
আমার খুব আক্ষেপ হয়, জানো। কারণ গৌতমের কাজ শেষ হয়নি। গৌতম কিন্তু খুব বড় মাপের শিল্পী। কিন্তু ওর যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি বলেই মনে হয়। গৌতম নিজেও খুব চাইত, আরও কয়েকটা দিন বেঁচে থেকে আরও কিছু কাজ করে যাবে। আরও কিছুদিন বাঁচতে চেয়েছিল মানুষটা। কিন্তু সেটা শেষ অবধি হল না। এটা আমারও খুব বড় দুর্ভাগ্য! 

আপনাদের আলাপ তো সেই ’৬৯ সাল থেকে?

হ্যাঁ, ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে একসঙ্গে ভর্তি হয়েছিলাম। সিক্সটি নাইনে। তখনকার গৌতম শান্তশিষ্ট। লেখে, ছবি আঁকে। কম কথা বলে। বন্ধুদের হই-হট্টগোলে ততটা থাকে না। এরকম একটা ছেলে। বাড়ির বড় ছেলে, তাই অনেক কিছু সামলে, বিভিন্ন কাজ করে তা থেকে আর্ট কলেজে পড়ার খরচ জোগাড় করত।
‘বিহান’ করতে গিয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ল। ’৭৪ সালে পাশ করে বেরিয়েই আমরা ‘বিহান’ শুরু করেছিলাম। ছোটদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার আগে আমাদের ছিল না। সেই শুরু হল। আর কাজ করতে করতে দেখলাম, কতকিছু শেখানো যায়, শেখা যায়।

গৌতম চৌধুরী। চিত্র-ঋণ: সিদ্ধার্থ শিবকুমার

সেটা তো গৌতমদার নৈহাটির বাড়িতে?

হ্যাঁ। নৈহাটিতে গৌতমের বাড়ির তেতলার ছাদে একখানা ঘর আর ঢাকা-বারান্দা ছিল। সেই জায়গাটায়। শুরুতে ‘বিহান’ ছিল ছোটদের ছবি আঁকা শেখানোর ইশকুল। কিন্তু শেখানোর থেকেও ‘বিহান’ হয়ে উঠেছিল আমাদের শেখার জায়গা। শিশুদের জগৎ আশ্চর্য জগৎ। নানা রকমের কচিকাঁচা, তাদের নানান স্বভাব, নানান প্রবণতা। সেই প্রবণতাটাকে চিনে নিয়ে, তাদের ভেতরের মানুষটাকে বের করে এনে, রঙে-তুলিতে প্রকাশ করা– সে এক মজার পরীক্ষা।
ওরা নিজেদের মতো ছবি আঁকত। আমরা আর্থ কালার গুলে বাবলা, শিরিষের আঠা মিশিয়ে ওদের ছবি আঁকতে দিতাম। আমি নিজেও ওদের সঙ্গে পড়েই প্রথম আর্থ কালার দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করি। তখন থেকেই আমি দেখেছি যে অয়েল আমার মিডিয়াম নয়। শুকোতে সময় লাগছে, নিজে যেটা করতে চাইছি সেটা করতে পারছি না। আর্থ কালারে কাজ করতে আমার খুব ভালো লাগছিল তখন। মিডিয়ামের মধ্যে দিয়েও তো নিজেকে এক্সপ্রেস করা যায়। মনে হল, সেটা করতে পারছি। তখন ওদের ছবি আঁকতে বসিয়ে দিয়ে আমি নিজেও আঁকতাম।

আপ অ্যান্ড ডাউন, প্রাকৃতিক রং, ২০২৫

খুব যত্ন করে সাজিয়েছিলাম ‘বিহান’কে, যাতে ছোটরা চোখের সামনে অনেক শিল্পসামগ্রী, অনেক সুন্দরকে একসঙ্গে দেখতে পায়। যাতে ওদের দেখার চোখ, মন, রুচি তৈরি হয়। লোকশিল্পের খোঁজে বিষ্ণুপুর গিয়েছি আমি আর গৌতম, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি মনসার ঝাড়ি, পোড়ামাটির হাতিঘোড়া। মেদিনীপুর থেকে বায়না দিয়ে নিয়ে এসেছি পটুয়াদের। ছেলেমেয়েদের পট তৈরি করা শেখাবে। গুসকরা থেকে ভ্রমর চিত্রকর এসে শিখিয়েছে ঢোকরা পুতুল বানানো।
একবার হল পুতুল-নাটক। রঘুদা, রঘুনাথ গোস্বামীর কাছে গ্লাভ্‌স পাপেট বানাতে শিখেছিলাম। সেই বিদ্যেই কাজে লাগালাম। গৌতম নাটক লিখল, আমি গানে সুর দিলাম। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা সেই পুতুল-নাটক করল। এরকমভাবে কখনও আবার সুকুমার রায়, সুনির্মল বসুর ছড়ায় সুর দিয়েও নাটক করা হয়েছে।

একবার পুজোর ছুটি পড়ার আগে, ঠিক হল, বিহানের ছেলেমেয়েদের কাজ নিয়ে প্রদর্শনী হবে। সঙ্গে হাতে-লেখা পত্রিকা। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, সুতপা ভট্টাচার্য, মণিভূষণ ভট্টাচার্য লেখা দিলেন। পত্রিকা হল। প্রদর্শনীও। দু’ দিন ধরে। হৈ হৈ করে কার্ড ছাপানো, বিলি করা হল। মনে আছে, সমরেশদা, বটুকদা (জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী) প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন।
তারপর আমার বড় মেয়ে বউলের যখন ইশকুলে পড়ার বয়েস হল, তখন তৈরি হল ‘বিহান পাঠশালা’। ছোটদের নার্সারি স্কুল…

বড় মেয়ে বউলের সঙ্গে অরুণিমা চৌধুরী, চিত্র-ঋণ: ইমামি

অ-এ অন্ধকার, আ-এ আলো?

হ্যাঁ। কী সুন্দর না? আমি যখন ছোটদের অক্ষর শেখানোর জন্য প্রথম চার্ট বানিয়েছিলাম– এ কথাটা আমার মাথায় এসেছিল। অ, আ শেখাতে হবে। কীভাবে শেখাব? দুটো গাছ আঁকলাম সাদা চার্ট পেপারে। একটা কালো গাছ, আর একটা সবুজ গাছ। কালো গাছটা হচ্ছে অ– অন্ধকার, আর সবুজ গাছটার মানে আ অর্থাৎ আলো। অন্ধকারকে পেরিয়ে গিয়ে আলোর দিকে যাওয়া। এই দিয়ে ওদের লেখাপড়া শুরু।

আশ্চর্য যে, সাদা-কালো আর আলো-অন্ধকারের যে প্রচলিত বাইনারির ধারণা, সেটাকে ভেঙে আপনার আলো হয়ে উঠল সবুজ। এবং যেটা, আপনার ছবির ক্ষেত্রেও সত্যি। আরও মজার যে, ছবিতে তারা আর বাইনারি নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক…

আলো-অন্ধকার তো সত্যিই একে অপরের পরিপূরক। অন্ধকার ভেদ করেই তো সূর্য ওঠে, চারদিক আলোকিত হয়। রবীন্দ্রনাথ– তাঁর গান, কবিতা আমার প্রাণে সর্বক্ষণ বাজে। এই যে, গানের ভেতরে– ‘নূতন প্রাণ দাও, প্রাণসখা, আজি সুপ্রভাতে/ বিষাদ সব করো দূর নবীন আনন্দে/ প্রাচীন রজনী নাশো নূতন উষালোকে’– এই যে উত্তরণ। আসলে আমাদের জীবনে দুঃখের পাশাপাশি আনন্দ, ভয়ের পাশাপাশি সাহস– একের সঙ্গে অন্যটা মিশে থাকে। সবসময়েই থাকে, পরস্পরকে জড়িয়ে।
আবার ‘অন্ধকার’ মানেই যে সবসময় দুঃখ, তা তো নয়। অন্ধকারেও আনন্দ রয়েছে। ‘অন্ধকারে আর রেখো না ভয়,/ আমার হাতে ঢাকো তোমার মুখ’। বিষ্ণু দে-র কবিতা। ‘আলো’ মানেই কি সবসময় ভালো, স্বচ্ছ, পবিত্র? আজকের পৃথিবীর সর্বত্র এই যে দুর্বৃত্তায়ন হচ্ছে, সে তো দিনের আলোর মধ্যেই হচ্ছে। এই যে ভয়ংকর একটা সময়ের ভেতর দিয়ে আমরা ক্রমশ যাচ্ছি, সেটা তো দৃশ্যমান আলোকিত জগতের ভেতরেই। প্রকাশ্য আলোয় মানুষ মানুষকে মেরে ফেলছে। বাঁচার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে। মেয়েদের ওপর এত অত্যাচার। আজকের খবরের কাগজে দেখলাম, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইজরায়েল ভ্রমণে গিয়ে নেতানিয়াহু নামে পৃথিবীর কদর্যতম একজন মানুষকে আলিঙ্গন করছে। যেন বোঝাতে চাইছে, ভারত ইজরায়েলকে কত সমর্থন করে। একটা শিশুহত্যাকারী, নারীহত্যাকারী, দেশ-ধ্বংসকারী মানুষকে এরকম প্রকাশ্য দিবালোকে সমর্থন করা হচ্ছে। বলতেও ঘৃণা হয়। আলো বোধহয় দিনে দিনে অন্ধকারের চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়ে উঠছে।

ইমামি আয়োজিত ‘আরণ্যক’ প্রদর্শনীর কার্ড

তবু অন্ধকারে কখনও কখনও একটা হাত এগিয়ে আসে– ধরবার মতো, মাথায় রাখবার মতো, আশ্রয় দেবার জন্য। আমরা যখন জলপাইগুড়িতে থাকতাম, বাবা ছিলেন সেখানকার এলআইসি-র ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। তখন তো নকশাল আন্দোলন চলছে। জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজটা ছিল শহর থেকে একটু বাইরে। সেখান থেকে একটা অল্পবয়েসি ছেলে– কোনও কারণে শহরে এসেছিল, ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছে। আর পুলিশ তাকে তাড়া করেছে। তখন তো তাড়া করা মানে গুলি করে মেরে ফেলত। রাতে একা ঘুরে বেড়াচ্ছ মানেই তুমি নকশাল।
তখন আমরা শুয়ে পড়েছি। ছেলেটি এসে দরজা ধাক্কাচ্ছে। বাবা দরজা খুলতেই সে বললে– আমাকে পুলিশ তাড়া করেছে, আজ রাতের মতো যদি একটু আশ্রয় দেন। বাবা সব শুনে তাকে সঙ্গে নিয়ে মিলিটারি ক্যাম্পে গেলেন। নিজের আত্মীয় বলে পরিচয় দিলেন, এবং ওঁরা যাতে সাবধানে ছেলেটিকে হোস্টেলে পৌঁছে দেন তার ব্যবস্থাও করলেন। সুতরাং অন্ধকারের মধ্যে থেকেও তো আশ্রয় আসে। আসে না কি? 

আপনার ছোটবেলার প্রায় সবটাই কেটেছে উত্তরবঙ্গে। শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, অসম, ডুয়ার্সের জঙ্গল। সেই সময়টা কেমন ছিল?

খুব ছোটবেলায়, আমরা শিলিগুড়ির মহানন্দাপাড়ায় থাকতাম। মুসলমান পাড়া। কাঠের দোতলা বাড়ি। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে ভোরের আজানের সুর শোনা যেত। বাড়ির বারান্দায় দাঁড়ালেই বিরাট কাঞ্চনজঙ্ঘা। অপূর্ব তার শোভা। সূর্যের আলোর দিক বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে তার রূপ পালটে পালটে যেত। শৈশবে আমার প্রথম স্বাভাবিক সৌন্দর্যবোধের ভিতটুকু গড়ে দিয়েছিল এই দৃশ্য। আর ছিল উত্তরবঙ্গের খরস্রোতা নদী, পাহাড়-জঙ্গল, ঘন বর্ষা বা কুয়াশাঘন শীত। একেবারে এই প্রকৃতির ভেতরেই বড় হয়েছি। সেই প্রকৃতি এতই সহজ যে, মা-বাবার স্নেহ-শাসনের মতোই তাকে পাওয়া যেত।
খুব বেড়াতাম। বাবা বেড়াতে নিয়ে যেতেন। তখন ইশকুল থেকেও খুব বেড়াতে নিয়ে যেত। গুলমার জঙ্গল, শুকনার জঙ্গল এইসব জায়গায় পিকনিক করতে নিয়ে যেত। এখন তো এই জায়গাগুলো ট্যুরিস্ট স্পট। অনেক ভদ্র হয়ে গিয়েছে। তখন কিন্তু সত্যিকারের জঙ্গল ছিল। অনেক পশু ছিল। হরিণ, শুয়োর তো অহরহ দেখা যেত। বাঘও বেরত। প্রকৃতি, গাছপালার সৌন্দর্যের মধ্যে বড় হলে এক ধরনের স্বাধীনতা অনুভব করা যায়।

শিল্পীর আয়ুধ

আমাদের বাড়ির সামনে ছিল একখানা মাঠ। আর মাঠের ওপারে ছিল চারু মজুমদারের একতলা বাড়ি। প্রত্যেকদিন বিকেলে আমরা মাঠে খেলতে যেতাম। লুকোচুরি খেলার সময় সেই বাড়ির বৈঠকখানা ঘরে আমরা লুকোতাম। আমার মনে আছে ছবিটা– প্রায় অন্ধকার ঘর, চৌকিতে বসে থাকতেন চারু মজুমদার। রোগা, ছুঁচলো নাক, ছুঁচলো থুতনি, গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে, দৃষ্টি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে। আমাদের খেলা দেখতেন। কখনও বলতেন না যে, গোলমাল কোরো না। অন্য জায়গায় গিয়ে খেল। লীলামাসি, চারু মজুমদারের স্ত্রী ছিলেন মায়ের বন্ধু। তিনি আমাদের খুবই স্নেহ করতেন।
বাবা বাঘাযতীন পার্কে বাড়ি করার পর সেই পাড়া থেকে আমরা ফিরে এলাম। বাবা যে সারাক্ষণ খুব বাড়িতে থাকতেন এমন নয়। কিন্তু থাকলে আমাদের দুই বোনের খুব খোঁজখবর রাখতেন। চাইতেন, আমরা যেন সারাক্ষণ খুব পড়াশোনা করি। আমাদের মোটেই সেটা ভালো লাগত না। ক্লাসে প্রথম হবার তো কোনও কারণ ছিল না। বরং চাপ ছিল। তাই বাবা বাড়িতে থাকলেই মনে হত সারাক্ষণ শাসন করবেন।
খুব বকাবকি করতেন তো! মাঝেমাঝেই ডেস্কে তালাচাবি লাগিয়ে দিয়ে বলতেন, কাল থেকে পড়াশোনা, ইশকুল যাওয়া বন্ধ। পরদিন সকালে মা কোত্থেকে দুটো বই এনে আমাদের হাতে দিয়ে বলতেন, জোরে জোরে পড়। আমরা ঘুম থেকে উঠে চিৎকার করে পড়তাম, যাতে বাবার মনটা একটু নরম হয়। তারপর বাবাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, ইশকুলে যাব কি না। তখন যেতে দিতেন।

দ্য ম্যাজিশিয়ান, প্রাকৃতিক রঙে ইকো-প্রিন্ট ও গুয়াশ, ২০২৫

কিন্তু অন্যরকম দৃশ্যও তো তৈরি হত। আপনার লেখায় পড়েছি, বাবা গান গাইছেন আর মা রান্না করছেন। বাবার গানের সুর আর মায়ের রান্নার গন্ধ মিলেমিশে ‘এক নিশ্চিন্ত নিরাপদ দাম্পত্যের ওম তৈরি হচ্ছে। … বাবাকে তখন ভয় করছে না।’

হ্যাঁ, এটা খুব নিশ্চিন্তির একটা দৃশ্য। বাবা মাঝেমধ্যে সন্ধেবেলা বসতেন। কোলে হারমোনিয়াম তুলে নিয়ে ভরাট গলায় গাইতেন ‘মন মোর মেঘের সঙ্গী’। মা-ও গাইতেন কখনও সখনও। ধুপধুনো জ্বেলে, দরজা-জানলা বন্ধ করে খুব মিহি গলায়, ‘আমার সকল দুখের প্রদীপ’। গুটিসুটি মেরে মায়ের পাশে বসে সেই গান শোনার যে কী সুখ!
আমার মা খুব অন্য রকমের মহিলা ছিলেন। প্রচুর সামাজিক কাজ করতেন। লীলামাসির সঙ্গে মহিলা সমিতির মিটিং-এ যেতেন। আমার মনে আছে, ‘ঘরে বাইরে’ পত্রিকা নিয়মিত পড়তেন মা। আরও নানারকম পত্রিকা। সব নামও মনে পড়ছে না। লাইব্রেরি থেকে আমাকে দিয়ে বই আনিয়ে পড়তেন। আমিও পড়তাম– নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, আশাপূর্ণা দেবী, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস। পড়তাম শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, তারাশঙ্কর, অচিন্ত্যকুমার, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। আরও একটু বড় হয়ে সমরেশ বসু, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী। তখনও কলকাতা আমার জীবনে আসেনি।

অরুণিমা চৌধুরী, স্টুডিও-তে। আলোকচিত্র: ভিভিয়ান সার্কি, কৃতজ্ঞতা: ইমামি

আর্ট কলেজের সূত্রেই কি প্রথম কলকাতা এলেন?

ঠিক আর্ট কলেজ নয়। বাবার তখন বদলির চাকরি। তখন সব জায়গায় যে এত কলেজ ছিল এমনও নয়। তাই হায়ার সেকেন্ডারি পাস করার পর, কলকাতার কলেজেই ভর্তি হলাম। বিএ, ফিলোজফি অনার্স। ভিক্টোরিয়া ইনস্টিটিউশন। মামার বাড়িতে থাকতাম, আর খুব ঘুরে বেড়াতাম। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যেতাম নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্লাস করতে। সেখান থেকে কফিহাউস। আড্ডা দিতাম। খুব সিনেমাও দেখতাম তখন।
আর ছিল লিটল ম্যাগাজিন। ছোটগল্প লিখতাম। লিটল ম্যাগে, আরও বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। একবার, থার্ড ইয়ারে, লেডি ব্রেবোর্ন কলেজের হলে ছোটগল্প পাঠ হবে। ইন্টারকলেজ কম্পিটিশন। বিচারক নরেন্দ্র দেব, রাধারানী দেবী আর আশাপূর্ণা দেবী। আমি একটা গল্প পড়ে দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়েছিলাম। ‘পরশুরামের কুঠার’। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও আনন্দের যেটা, আমার গল্প নিয়ে সেই আসরে আলোচনা করেছিলেন আশাপূর্ণা দেবী, যাঁর লেখা ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ তখন আমার প্রিয়তম উপন্যাস।
এরকম কত আনন্দের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে কলকাতার সঙ্গে। তখনও কিন্তু ছবি আঁকা আমায় অধিকার করে বসেনি। ছবি আঁকি, অল্পস্বল্প, কিন্তু সারাজীবন ছবিই আঁকব– এমনটা ভাবিনি।

অড মেন অফ দ্য জাঙ্গল ২, মিক্সড মিডিয়া, ২০২৫

ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজে এসে আপনারা দু’জনেই বিকাশ ভট্টাচার্যকে শিক্ষক হিসেবে পেলেন। ছবির প্রথম পাঠ যাকে বলে, সে তো ওঁর কাছ থেকেই। যদিও পরে সেই মাধ্যম, সেই ধারা থেকে অনেকটা সরে এসেছেন। কিন্তু একসময় তো আপনারা দু’জনেই বিকাশের ছবির খুব অনুরাগী ছিলেন? সেইসময় বিকাশ রীতিমতো বিখ্যাত, সেলিব্রেটেড ইয়ং আর্টিস্ট। 

বিকাশদার সঙ্গে আলাপটা খুব অদ্ভুতভাবে। সরকারি আর্ট কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে জানতে পারলাম, ডেট পেরিয়ে গিয়েছে। শুনলাম ধর্মতলায় না কি আরেকখানা আর্ট কলেজ আছে। ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজ। সেখানে গিয়ে দেখি এক বয়স্ক শিক্ষক বসে আছেন। সঙ্গে গৌরবর্ণ সুদর্শন এক তরুণ শিক্ষক, চশমা পরা। তখনও বিকাশদাকে চিনি না। আমার ছবি দেখে তিনি বললেন, আমি না কি যামিনী রায়ের নকল করে ছবি আঁকি। আমার মাথা গরম হল। তর্ক টেনে বললাম, ‘অনুকরণ’ কেন বলছেন? কেন ‘অনুসরণ’ নয়? কিন্তু শেষ অবধি সেই তরুণ শিক্ষকের ব্যক্তিত্বে, বাগ্মিতায় মুগ্ধ হয়েই সেই কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম। সেই আমার সঙ্গে বিকাশদার প্রথম আলাপ।
বিকাশদা তো অসম্ভব দক্ষ একজন শিল্পী। এবং শিক্ষক হিসেবেও তিনি অত্যন্ত ভালো। ড্রয়িং কীভাবে করতে হয় তা তো ওঁর কাছ থেকেই শেখা। জলরং, অয়েলও। তারপর ড্রাই প্যাস্টেল। বিকাশদা আমাদের কাজ করে করে দেখাতেন। আমরা যখন বিকাশদার সান্নিধ্য পেয়েছি, তখন বিকাশদা ওঁর শ্রেষ্ঠ সময়ে। একদিকে ইন্ডিয়ান আর্ট কলেজের নামকরা শিক্ষক, অন্যদিকে ওঁর সমস্ত বিখ্যাত সিরিজগুলো তখন আঁকা হচ্ছে। ডল সিরিজ। তারপরে নকশাল আন্দোলনের সময়কার ছবিগুলো। বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের লোহার প্যাঁচানো সিঁড়ি বেয়ে ওঠা একটা বড় ঘরে ওঁর স্টুডিও ছিল। সেখানে কাতায়ুন সাকলাতের ছবি, কেটিদির ছবি। আমাদের জন্য স্টুডিওর দরজা সারাদিন খোলা থাকত। আমার তখন ল কলেজে মর্নিং ক্লাস। তারপর আর্ট কলেজ। সেইসব সেরে প্রায়ই বিকাশদার স্টুডিওতে চলে যেতাম। কাজ দেখতাম। মনে আছে, আউটডোরে নিয়ে যেতেন, এসপ্ল্যানেড চত্বরে– ট্রামডিপোর আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে যেতাম আমরা। নিজেও কাজ করতেন আমাদের সঙ্গে। কাজ শেষ হলে অন্নপূর্ণা রেস্টুরেন্টে নিয়ে গিয়ে খাওয়াতেন। ভালো কাগজ, রং, ইনস্ট্রুমেন্ট যেমন বাছাই করতে শেখাতেন, তেমন চিনিয়ে দিতেন ভালো কাপড়– গরদ, সিল্ক, খাদি। ভালো ইংরেজি সিনেমা দেখাতেন, ভালো নাটক দেখাতেন। কোনওদিন টিকিটের টাকা নিতেন না। পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর– প্রাচীন লোকশিল্প থেকে শুরু করে আধুনিক শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি– যেন সমস্ত ক্ষেত্রেই ওঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। যেমন ভালোবাসতে জানতেন, ভালোবাসাতেও জানতেন।  মনে আছে, বিকাশদা, গৌতম, কমল তপাদার– তিনজনে একবার নৈহাটিতে নৌকো করে নদী পেরিয়ে হংসেশ্বরী মন্দির দেখতে গিয়েছিলেন। সে এক অদ্ভুত ভ্রমণ…

বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটের স্টুডিও-তে শিল্পী বিকাশ ভট্টাচার্য

নৈহাটিতে, সম্ভবত সমরেশ বসু, সত্যজিৎ চৌধুরীদের সঙ্গেও আপনাদের একটা সখ্য গড়ে উঠেছিল?

নৈহাটি তো গৌতমের পাড়া। সত্যজিৎ চৌধুরী তখন নৈহাটি ঋষি বঙ্কিম কলেজে পড়াতেন, গৌতমের মাস্টারমশাই ছিলেন। তখন তো আর্ট কলেজে ডিপ্লোমা হত। তাই গ্র্যাজুয়েশনের ডিগ্রির জন্য আমরা পাশাপাশি কোনও কলেজে পড়তাম। গৌতম পড়ত বি.কম। সত্যজিৎ চৌধুরী গৌতমকে খুব স্নেহ করতেন। গৌতম সারাজীবন ওঁর কাজ করেছে। প্রচ্ছদ, অলংকরণ। তারপর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা সংগ্রহ-র চার খণ্ডের কাজ। হরপ্রসাদের প্রতিকৃতি থেকে শুরু করে বাংলা ভাঙা-টাইপ, পুরনো বইয়ের নকশার আদলে গ্রন্থসজ্জা, নামলিপি। প্রায় সারা রাত জেগে কাজ করত সেই সময়ে।
সমরেশ বসুও খুব ভালোবাসতেন গৌতমকে। স্টেশনে বসে, ট্রেনে যাওয়া-আসার সময়ে ওঁদের প্রচুর আড্ডা হত। গৌতম, সমরেশ বসু, মণিভূষণ ভট্টাচার্য– এঁরা একসঙ্গে কত ঘুরেছেন, আড্ডা দিয়েছেন। স্টেশনের ওভারব্রিজের সিঁড়িতে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করেছেন। আমি যাওয়ার পর আমিও সেই আড্ডার অংশ হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও তখন সমরেশ বসু বেশিরভাগ সময় কলকাতাতেই থাকতেন। ‘বিহান’ শুরুর সময়েও সত্যজিৎ চৌধুরী, সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায়, মণিদা সকলেই যথাসাধ্য পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। নিজেদের বাড়ির কচিকাঁচাদের পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আঁকা শেখার জন্য।
গৌতম তো আসলে কবি। শিল্পীর থেকেও বেশি করে। তাই কবি-সাহিত্যিকদের সঙ্গে ওর বন্ধুত্বটা বেশি হয়েছিল। সেই সময়টা আমাদের বড় হওয়ার সময়। এঁরা সকলেই কিন্তু আমাদের থেকে অনেকটা বড়। মণিদা, সমরেশদা। এঁদের যে বিপুল অভিজ্ঞতা, তার অনেকটাই আমাদের বড় হওয়ার পথে এগিয়ে দিয়েছিল, কাজে লেগেছিল।

অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তো দীর্ঘদিন কাজ করেছেন গৌতমদা?

হ্যাঁ। ওর বাবার ইচ্ছে ছিল গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে গৌতম পুলিশের চাকরি করবে। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ই গৌতমের আঁকা দেখে ওর বাবাকে বলেছিলেন আর্ট কলেজে ভর্তি করার কথা। খুব স্নেহ করতেন গৌতমকে। নান্দীকারের নতুন নাটকের স্টেজ, প্ল্যাকার্ড, পোস্টার– সবেতেই ছিল গৌতম। বহুরূপী, পিএলটি-র দলেও গৌতমকে কাজ করতে পাঠিয়েছিলেন অজিতেশ।

মায়ের সঙ্গে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়

আচ্ছা, আপনার এবং গৌতমদার– খুব সূক্ষ্ম, খুব নীরব একটা চলাচল তো ছিল। আপনাদের কাজ কখনও একে অপরকে কোনওভাবে প্রভাবিত করেছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে?

সেভাবে প্রভাবিত করেছে কি না আমি বলতে পারব না। কারণ আমার কাজের ধরনটা একেবারে অন্যরকম। গৌতম কিন্তু আমার চেয়ে অনেক বেশি সচেতন শিল্পী। সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন। ভালো-মন্দ বোধ বিষয়ে দৃঢ় ধারণা নিয়ে চলত। অনেক পড়াশোনা করত। গৌতমের ছবি নকল করা খুব কঠিন। ওর প্রভাব আমার ছবির ওপরে পড়েছে খানিকটা অবচেতনের দিক থেকে। আসলে অনেক কিছু শিখেছি তো ওর কাছে। আমার কাছ থেকে ও কী পেয়েছে জানি না। আমাদের যোগসূত্রটা তো কাজের সূত্রেই। তবে আমার ওপর ওর এক ধরনের নির্ভরতা ছিল।
গৌতম খুব কবিতা পড়ত। আমার ছিল গল্প-উপন্যাস পড়ার অভ্যেস। খুব ছোটবেলা থেকে। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কারও কবিতা আমি সেই সময়ে পড়িনি। যখন আর্ট কলেজে পড়ি, একবার জন্মদিনে আমার এক বন্ধু বিষ্ণু দে-র ‘আলেখ্য’ উপহার দিয়েছিল। সেটা পড়তে গিয়ে, অভ্যেস নেই বলে খুব একটা বুঝতে পারিনি। আমি বইটা নিয়ে গিয়ে গৌতমকে দেখিয়েছিলাম। গৌতম ওঁর কবিতা খুব পছন্দ করত। আমি বলেছিলাম, আমায় বুঝিয়ে দিতে। তখন একদিন, শিয়ালদার ৫ নম্বর প্ল্যাটফর্ম তখন ফাঁকাই থাকত, সন্ধেবেলার দিকে সেখানে বেঞ্চের উপর বসে ও আমায় বিষ্ণু দে পড়াল। সেই শুরু। ক্রমে ‘আলেখ্য’ থেকে ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’। আমাদের কবিতার বিনিময়।  

অরুণিমা ও গৌতম, বিয়ের আগের দিন, উত্তরবঙ্গে

কবিতা কিন্তু আপনার চিত্রভাষাকে খুব প্রভাবিত করে। আমার মনে আছে, ‘দ্য ডার্ক এজ অফ গ্রিন’-এ, ন্যান্সি আপনাকে বলছে– ‘ডার্কনেস ইজ নেভার ফার অ্যাওয়ে ফ্রম ইয়োর ওয়ার্ক। দ্য ব্রুইজ, টরশন, দ্য ওয়ার্লপুল।’ আপনি উত্তর দিচ্ছেন– ‘শূন্যের ভেতরে এত ঢেউ। উইদিন দ্য ভয়েড, দ্য ওয়েভস।’…

এ তো শঙ্খদার লাইন। ‘শূন্যের ভিতরে এত ঢেউ আছে, সেকথা জানো না?’

হ্যাঁ। কিন্তু কবিতা যদি ছবির পাশাপাশি আপনার সঙ্গে জুড়ে না থাকত, তবে কি এমন উত্তর পাওয়া যেত?

আসলে শঙ্খদা, প্রদ্যুম্নদা এঁরা এতটাই বড় মাপের মানুষ ছিলেন, ওঁদের সঙ্গে সঙ্গে থাকলেই এমন অনেক কিছু না চাইতেই পাওয়া যেত। ছায়ার মতো। আশ্রয়ের মতো। আমার যেটুকু জানা, শেখা সে সবই এঁদের মতো মানুষদের কাছ থেকেই।

প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্যও তো আপনাদের নিকট বন্ধু ছিলেন?

প্রদ্যুম্নদা ছিলেন গৌতমের কলেজের ইংরেজির অধ্যাপক। আমার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল হগ মার্কেটের আর্ট ফেয়ারে। নিজে কম কথা বলতেন, কিন্তু নিরন্তর প্রশ্ন করে মানুষের ব্যক্তিসত্তার খোঁজটাকে উসকে দিতে পারতেন। শান্তিনিকেতনে সোমনাথ হোরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন প্রদ্যুম্নদাই। আবার আমাদের অজন্তা, ইলোরা যাওয়ার সময়ে পুরাতত্ত্ববিদ দেবলা মিত্রকে নিজেই চিঠি লিখেছিলেন, যাতে আমাদের পুরাতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের অনুমতিপত্র মেলে।
খুব ভ্রমণ-পাগল লোক ছিলেন। ১৯৮৩ সালের নভেম্বর মাসে এনসাইক্লোপিডিয়া বিষয়ে সর্বভারতীয় সেমিনার। এ রাজ্য থেকে যাবেন প্রদ্যুম্নদা এবং সুবীর রায়চৌধুরী। আমাদেরকেও নিয়ে চললেন, মহাবলীপুরমের ভাস্কর্য দেখাবেন। গভীর রাতে মোমের আলো জ্বেলে দেখালেন তটমন্দিরে বিষ্ণুর অনন্তশয়ান। রাতের নৈঃশব্দ্যের মাঝে জীবন্ত হয়ে উঠল সেই দৃশ্য। তাঁর দেখানোর গুণে। দেখালেন গোটা পাহাড় কেটে বানানো ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন।

আবার ’৮৩-তে রঁদ্যার প্রদর্শনী। বিড়লা অ্যাকাডেমিতে। আমাদের সঙ্গে প্রদ্যুম্নদাও দেখেছেন। পাশাপাশি ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে পড়াশোনা চলছে তাঁর। খুঁজে পেলেন চোলযুগের ব্রোঞ্জের নটরাজ মূর্তি নিয়ে রঁদ্যার একখানা লেখা। অনুবাদ করে ফেললেন। ’৮৬ সালে ‘বিহান’-এর হাতে-লেখা পত্রিকায় নিজে হাতে লিখে দিলেন সেই অনুবাদ। পরে সেই লেখা অনুষ্টুপ থেকে বই হয়ে বেরিয়েছিল। 

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও কি আপনাদের যোগাযোগ ছিল?

আমার ততটা ছিল না। তেমনভাবে আলাপ হওয়ার সুযোগ হয়নি। গৌতমের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু শক্তির কবিতা আমার অসম্ভব প্রিয়। 

শক্তির মৃত্যুর পরে আঁকা ‘ডেথ অফ এ পোয়েট’, ১৯৯৫

শক্তির মৃত্যুর পর আঁকা আপনার যে ছবিটা, ‘ডেথ অফ এ পোয়েট’– আমার মনে আছে, ‘দ্য ডার্ক এজ অফ গ্রিন’ যখন চলছে, দরজা দিয়ে ঢুকেই ডানদিকের দেওয়ালে সেই বিশাল ছবিখানা টাঙানো ছিল…

হ্যাঁ। বিশাল একখানা ছবি। এই ঘরের মেঝেতে বসেই এঁকেছিলাম। গৌতমরা তখন শক্তির শেষযাত্রায়। শ্মশানের দিকে। এত পাঠকের ভালোবাসা পেয়েছিলেন শক্তি। প্রচুর লোক। সকলে চলেছে শক্তির সঙ্গে। শেষবারের মতো। আমি যেতে পারিনি। খবর পেয়েছিলাম দেরিতে। সকালে ইশকুল ছিল, ফিরে এসে শুনলাম গৌতম গিয়েছে। সেদিন সারা দুপুর আমার মনখারাপ। কী করব! এই ছবিখানাই আঁকলাম বসে বসে। আঁকলাম– মৃত্যুর শোক নিয়ে একটি মেয়ে বসে রয়েছে। অথচ দেখো সারা ছবি জুড়ে কত জীবন, কত প্রাণ চলমান তার চারপাশে। কত সবুজ। রক্তকরবী ফুটে রয়েছে, মোরগ ডাকছে।
‘এবার হলো না তবু ছুটি

দুলে ওঠে মোরগের ঝুঁটি
বেলা গেল, বুকে রক্তপাত
বাগানে কি ধরেছিলে হাত?’

এই তো! ঠিক এই কথাটাই হচ্ছিল। দেখুন, আপনার চিত্রভাষার মধ্যে কবিতার উপাদান চলে আসছে…

এসেছে। কিন্তু খুব সরাসরি হয়তো নয়। মানে, একটা কবিতা পড়ে ছবি এঁকে ফেললাম, তেমন হয়নি। কিন্তু যা পড়া হয়, দেখা হয়, শোনা হয়– সবই তো আত্মস্থ করি, অবচেতনে তার একটা ছাপ থেকে যায়। সেইসব, খুব স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়, আমার বোধের মধ্যে যেভাবে জারিত হয়, তা হয়তো ছবিতে উঠে এসেছে। আসবেই। এখানে আমি বলব রবীন্দ্রনাথের কথা। জীবনানন্দের কথা। জীবনানন্দ আমার বড্ড প্রিয় কবি। ওঁর কবিতার ইমেজারি আমার মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত যে ছবি বুনে দেয়, তা কি আমার ছবিতে কখনও উঠে আসেনি? আমার ভেতরেই তো রয়ে গিয়েছে সেগুলো, বহু ছবিকে প্রভাবিত করেছে। হয়তো পরে ছবিটা দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে, ছবিটা কখন আমাকে ছাড়িয়ে জীবনানন্দের হয়ে উঠেছে।
গৌতম আমার সব ছবির প্রথম সমালোচক। প্রশংসা করত। আবার কখনও পেছন থেকে দেখতে দেখতে পাশে এসে বলত, ‘আরও করবে? এ ছবিটা এখানেই ছেড়ে দাও। একটু রেখে দেখো।’ সরাসরি কিছু বলত না। কিন্তু আমি বুঝতাম। আমি ওঁর কথা খুব মান্যও করতাম।
শঙ্খদার ‘বাবরের প্রার্থনা’ আমার খুব প্রিয় কবিতা। এই যে ‘ধ্বংস করে দাও আমায় যদি চাও আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক’– এ লেখা তো আমার ভেতরেই ছিল, প্রবাহিত হয়েছে। আমার মা ও সন্তানের যে এত ছবি, তার কোথাও কি এ কবিতা নেই? এই দেওয়া-নেওয়াটাই তো শিল্পীকে আরেক ধাপ এগিয়ে দেয়।

মা ও শিশু, প্রাকৃতিক রং, ২০১৮

কবিতার পাশাপাশি আপনার ছবির সঙ্গে লগ্ন হয়ে রয়েছে প্রকৃতি। সুজান সামার্ডের একটা কথা ছিল, ‘উড-ওয়াইড-ওয়েব’, গাছেদের নেটওয়ার্ক। আপনার সমস্ত কাজ, আমার মনে হয়, এই কথাটা যেন সেই সমস্ত কাজের ভূমা। একটা স্তরের মতো, গোপনে, অলক্ষে আপনার সমস্ত কাজকে গাইড করে চলেছে। 

প্রকৃতি, গাছপালা আমি খুব ভালোবাসি। একটা বীজ থেকে যখন একটা অঙ্কুর হয়– দেখতে কী যে ভালো লাগে! তারপর সেই গাছটাই বড় হয়ে যখন কুঁড়ি ধরে, ফুলফল হয়– এই সম্পূর্ণতা দেখি, খুব আনন্দ পাই। আগে অনেকটা সময় গাছের সঙ্গে কাটাতাম। আজকাল বয়সের জন্য খুব একটা নিজে হাতে পরিচর্যা করতে পারি না। খুব পরিশ্রম হয় তো। কয়েকজন পরিচারক আছেন, তাঁরা এইসব করেন এখন। কিন্তু আমি দেখাশোনা করি। এই যে দেখো, বসন্ত আসছে বলে কত কচি পাতা বেরিয়েছে! গাছ মরে গেলে আমার অসহনীয় দুঃখ হয়। এ নিয়ে পরিচারকদের ওপর কম রাগারাগি করিনি আমি! ওরা তো যন্ত্রের মতো কাজ করে, কিন্তু যন্ত্র দিয়ে তো আর লালনপালন হয় না।
আমার মা খুব বাগান করতে ভালোবাসতেন। শুধু ফুলের বাগান না, সবজির বাগানও। আর সেই কাজে আমরা দুই বোন ছিলাম মায়ের সঙ্গী। মায়ের থেকেই শিখেছি, গাছকে ভালোবাসার জন্য তো আলাদা করে কোনও কষ্ট করতে হয় না। চাইলেই ভালোবাসা যায়।
তাছাড়া যেখানে যেখানে বেড়াতে গিয়েছি, আউটডোর বলতে বাইরের ছবিই তো এঁকেছি। প্রকৃতির ছবি। গাছপালার ছবি। এমনকী অজন্তাতে গিয়েও, গুহার ভেতরের কারুকার্য স্টাডি না-করে, গুহার বাইরে বসে পাহাড়-জঙ্গল এঁকেছি। তখন হেমন্তকাল। পাকা ঘাসে পাহাড়গুলো হলুদ হয়ে রয়েছে। সেই ছবিই আমাকে বেশি টেনেছে। দেওঘরে বেড়াতে গিয়েও সকালে বেরিয়ে সারাদিন ধরে নেচার স্টাডি করতাম। বিহানের ছেলেমেয়েদের নিয়েও গিয়েছি অনেকবার। এরকম কাজ করতে করতে একটা আশ্চর্য বোধ অনেকবার উপলব্ধি করেছি আমি। একেবারে নাড়ির ভেতরে টের পেয়েছি। এরকম কোনও দৃশ্য অনেকক্ষণ ধরে আঁকতে আঁকতে, অনুভব করেছি, যেন আমি সর্বস্ব নিয়ে দৃশ্যটার মধ্যে ঢুকে গিয়েছি। আমার ভেতর দিয়ে তখন সমস্ত দৃশ্যটা প্রবাহিত হচ্ছে। এই অতীন্দ্রিয় বোধটা, আমি হয়তো কাউকে বোঝাতে পারব না, ব্যাখ্যাতীত– কেন যে এরকম হত! কিন্তু হত। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলে যেমন ঘোর লাগে, তেমন। আসলে প্রকৃতির একটা প্রভাব পড়ে আমার ওপর, সেটাই কোনও অজানা শক্তিতে আমার কাজের মধ্যে এসে যায়। প্রকৃতি আমার কাছে এভাবেই আসে, ধরা দেয়।

নেচার ২, মিক্সড মিডিয়া, ২০২৪

কেবল প্রকৃতি নয়। এক জায়গায়, মনে আছে, ইটের ভাটা, অনেক মেয়েরা কাজ করছে। কেউ মাটি মেখে মাথায় তুলে দিচ্ছে। কেউ সেই মাটি বয়ে নিয়ে গিয়ে আরেক জায়গায় ফেলছে। সেখানে আবার মাটি ডাইসে বসানো হচ্ছে। এই যে সামগ্রিক কাজটা হচ্ছে, তার মধ্যে কী আশ্চর্য একটা ঢেউয়ের মতো ছন্দ। অতগুলো মানুষ সেই ছন্দের মধ্যে যেন নাচ করছে। এই দৃশ্যও তো আমাকে দিয়ে ছবি আঁকিয়ে নিয়েছে।
আউটডোর স্টাডির অভিজ্ঞতা, আমার মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে পবিত্র, সবচেয়ে সুন্দর অভিজ্ঞতা। আরেকটা জিনিস, কেন জানি না, স্টাডি করতে গিয়ে মনে হয়। শিল্পী নয়, আগে শ্রমিক হয়ে উঠতে হয় একজন মানুষকে। শ্রমটাই তাকে ক্রমশ শিল্পের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এনামেলের কাজ যখন শিখেছি, সারা সপ্তাহ ইশকুল করে, রবিবার ছুটির দিনে আমি বরানগরে চলে যেতাম এনামেল করতে। 

গৌতম চৌধুরীর আঁকা অরুণিমা চৌধুরীর প্রতিকৃতি

কে জি সুব্রহ্মণ্যম বোধহয় আপনাকে এনামেলের কাজে অনেকটা সাহায্য করেছিলেন…

উদ্বুদ্ধ করেছিলেন বলা যায়। আমার কাজ দেখে মানিদা সাজেস্ট করেছিলেন, যাতে আমি এনামেলের কাজ করি। তখন বউল কলাভবনে পড়ত। ওর কাছ থেকেই আমি এনামেল শিখেছি। ও তারপর এনামেল নিয়ে আর সেভাবে এগয়নি। কিন্তু আমি প্রতি সপ্তাহে যেতাম। তখন শুধু এনামেলের কাজই করেছি।

নতুন মিডিয়াম শেখার প্রতি আপনার এই ঝোঁকটা কি চিরকালই ছিল? চুয়াত্তর থেকে ধরলে আজ অবধি, আপনি বারবার মিডিয়াম বদলে গিয়েছেন। এই যে বারবার শূন্য থেকে শুরু করে একটার পর একটা নতুন মিডিয়াম শিখছেন, সেই মিডিয়ামে কাজ করেছেন…

২০০১-এ আমার এনামেল শেখা। প্রাকৃতিক রং নিয়ে খেলা করার ইচ্ছেটাও সেই সময় থেকেই। মাঝে সেরামিকের কাজ করেছি। ২০১২-তে ইকো-প্রিন্ট শিখেছি। কয়েক বছর আগে শিখেছি স্ক্রলের কাজ।
সত্যি বলতে, আমার একটা খুব আফশোস রয়েছে যে, গ্রাফিক্‌সটা আমি ভালো করে শিখতে পারিনি। করেছি খুব অল্প কিছু কাজ। কিন্তু ভালোভাবে শেখাটা হয়নি। এখন আমার খুব ইচ্ছে আমি এচিং, ড্রাই পয়েন্ট, অ্যাকোয়া টিন্ট এইসব শিখব। নতুন করে। 

ধাতব পাতের উপর করা এনামেলের কাজ

প্রাকৃতিক রং নিয়ে বোধহয় আপনি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন। প্রাকৃতিক রং বানানো, কিংবা এই মিডিয়ামে কাজ করার ইচ্ছেটা ঠিক কেন হয়েছিল?

যখন বিহানের কচিকাঁচাদের সঙ্গে আর্থ কালারে কাজ করতাম, খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। তারপর তো অ্যাক্রেলিক ব্যবহার করা শুরু করলাম। কিন্তু একটা সময় পরে গিয়ে আর অ্যাক্রেলিক ভালো লাগল না। কারণ ওয়াটার কালারের যে এফেক্ট, সেটা তো সিন্থেটিক রঙে হয় না। আর্থ কালারের পিগমেন্টের যে গভীরতা– সেটা কিছুতেই আনা যাচ্ছিল না।
গৌতম তখন ইশকুলে পড়ায়। ক্লাস নাইন থেকে টুয়েলভ অবধি ছাত্রদের সিলেবাসে তখন বাটিক, লিনো, উডকাট, শ্লেটকাট এইসব শেখানো হত। তারপরে ভেজিটেবল ডাই ওদের সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হল। তখন ওরা ভেষজ রং দিয়ে কাজ করা শিখত ইশকুলে। একদম প্রাইমারি রংগুলো– হরিতকী, মঞ্জিষ্ঠা– এইসব ব্যবহার করে কীভাবে বানানো যায় তা গৌতম ওদের শিখিয়েছিল। সেটা করতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ছবি, রং বানানোর পদ্ধতি– এইসব নিয়ে আমার সঙ্গেও কথা বলত। তখন আমার এই বিষয়টার প্রতি খুব আগ্রহ তৈরি হল। কারণ রঙের ধরনটা একদম অন্যরকম। গভীরতা আছে। মিডিয়ামটা আমার খুব ভালো লেগেছিল। আমিও কাগজে সেই রং বানিয়ে ব্যবহার করতে শুরু করলাম।
প্রথমে একদম বেসিক রং দিয়েই করতাম। তারপর শুরু হল পরীক্ষা। দেখা গেল, হরিতকীর মধ্যে একটু ফেরাস সালফেট মেশালেই সেটা কালো রং হয়ে যায়। হরিতকী থেকে হলুদ, মঞ্জিষ্ঠা থেকে লাল। কিন্তু নীল কীভাবে পাওয়া যায়? খোঁজ খোঁজ খোঁজ। লাল নিয়েও ভুগেছি। মঞ্জিষ্ঠা থেকে যে রংটা পাওয়া যায়, সেটাকে ওরা লাল বললেও, রংটা ইন্ডিয়ান রেড আর বার্নট সায়নার কাছাকাছি একটা রং। হার্ড ডাই করলে গেরিমাটি। একেবারে টকটকে লাল কিন্তু নয়। লালের জন্য একবার একজনের বাড়ি থেকে জবাফুল পেড়ে আনলাম। ফোটালাম। তারপর যে রংটা পেলাম সেটা কাগজে লাগাতে গিয়ে দেখি সবুজ।
তখনও আমি রঙের সঙ্গে কোনও কেমিকাল এলিমেন্ট মেশাতাম না। মেশাতে হয় যে, সেটাই জানতাম না। কিন্তু মেশানো যায়, নন-হার্মফুল কিছু এলিমেন্ট– যেমন ফিটকিরি বা অ্যালাম, কিংবা কপার সালফেট, ফেরাস সালফেট। কপার সালফেট একটা নীলাভ রং দেয়। কোবাল্ট ব্লু-র মতো। তখনও এগুলোর ব্যবহার শিখিনি। অনেক সময় ফেরাস সালফেট ডায়রেক্ট না মিশিয়ে হরিতকী লোহার কড়াইতে ফুটিয়ে নিলেও কালো রং পাওয়া যায়। আর তার সঙ্গে একটু চিটে গুড় মিশিয়ে নিলে একেবারে মিশকালো। আবার মঞ্জিষ্ঠা ফুটিয়ে তার সঙ্গে চুন মিশিয়ে নিলে হালকা ভায়োলেট।

আরেকবার বাজারে এক ধরনের বড় জবা দেখে কিনে নিয়ে এসে ফোটালাম। ও বাবা, সেটা থেকে পাওয়া গেল প্রুশিয়ান ব্লু। ঘন নীল রং। ওই রংটা আমি বহু জায়গায় ব্যবহার করেছি। কিন্তু পরে দেখেছি, তখন অ্যালাম মেশাইনি বলে, অনেক ছবিতে ওই নীলটা আস্তে আস্তে আবছা হয়ে গিয়েছে। একবার লাল চন্দন বেটে মঞ্জিষ্ঠার সঙ্গে মিশিয়ে একটা গোলাপি রং পাওয়া গেল। লালের জন্য গোলাপও ফুটিয়েছি। গোলাপে একটা ম্যাজেন্টা রং পাওয়া যায়। রংটা সুন্দর, কিন্তু লাল নয়। এইসব রঙের সঙ্গে টেকসই করার জন্য আঠা মিশিয়ে নিতে হত।

প্রার্থনা, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২০

একদিন অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে ঢুকতে গিয়ে দেখি, সামনের জায়গাটা জুড়ে লঙ্কাজবার ঝাড়, ঝুমঝুম করছে। সেগুলো নিয়ে এসে বাড়িতে ফোটালাম। দেখি অপূর্ব একটা গোলাপি রং পাওয়া গেল। অ্যালাম না মিশিয়েও সেই রংটা বেশ সুন্দর থেকে গেল। পরে অ্যালাম মিশিয়ে দেখিয়ে দেখেছি খুব সুন্দর একটা লাল রং পাওয়া যায় তা থেকে। আবার লঙ্কাজবার সঙ্গে খয়ের ফুটিয়ে মিশিয়ে নিলে এক ধরনের কালচে লাল পাওয়া যায়। অনেকটা মেরুন। সেটাও ব্যবহার করেছি অনেক ছবিতে।
আসলে এইরকম এটার সঙ্গে ওটা মিশিয়ে পরীক্ষা করতে করতেই অনেক রং পেয়েছি। যখন যা পেয়েছি, খাতায় লিখে রেখেছি। গাঁদা ফুটিয়ে এক রকমের হলুদ পাওয়া যায়, সেটা কিন্তু হরিতকীর মতো নয়। হরিতকীর রংটা ইয়লো অকার; আর হলুদ গাঁদা থেকে পাওয়া যায় লেমন ইয়লো, কমলা গাঁদা থেকে ক্রোম ইয়লো। শীতকালে আরেক ধরনের গাঁদা পাওয়া যায়, রক্তগাঁদা বলে– সেটা ফুটিয়ে আবার দেখেছি, খুব উজ্জ্বল একটা সবুজ পাওয়া যায়। পলাশে খুব সুন্দর কমলা রং হয়। ডালিমের খোসা ফুটিয়ে দেখেছি চমৎকার হলুদ রং মেলে। আবার ডালিমের খোসার সঙ্গে যদি খানিক ইন্ডিগো বা কালো মিশিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে গাঢ় সবুজ হয়ে যায়। বেলপাতা ফুটিয়েও সবুজ পেয়েছি। অপরাজিতা ফুলের থেকে নীল। আবার রঙ্গন ফুটিয়ে দেখেছি, কোনও রংই পাওয়া যায় না। এই খুঁজে পাওয়ার ভেতরেও একটা অন্যরকম আনন্দ আছে।

পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ড বা মেদিনীপুরের সাঁওতালদের দেওয়ালচিত্র আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন?

প্রাকৃতিক রঙের জন্য বলছ তো! হ্যাঁ, দেখেছি। একটা সময় ছিল যখন এগুলো খুঁজে বেড়াতাম। পটশিল্পীদের দেখেছি বেলপাতা বেটে সবুজ, কাঁচা হলুদ ফুটিয়ে হলুদ, সিঁদুর গুলে লাল রং তৈরি করে নিতে। এইসব তো ওদের দেখে দেখেও শিখেছি। আমি নিজেও করেছি। ছোটবেলায় খেলতে খেলতে পা মচকে গেলে মা-কাকিমারা চুন-হলুদ লাগিয়ে দিতেন। সেই পেস্টটা শুকিয়ে গেলে একরকম লালচে বাদামি রং হত। সেটাও আমি ছবির ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছি।

হোয়াট দ্য গ্রেট গ্র্যান্ডমাদার সেড (অংশ), ইকো প্রিন্ট ও মিক্সড মিডিয়া, ২০২২

আপনি তো মূলত নেপালি হ্যান্ডমেড পেপারই ব্যবহার করেন?

হ্যাঁ। প্রাকৃতিক রং নেপালি হ্যান্ডমেডের উপর খুব ভালো ধরে। একেবারে প্রথমদিকে, ২০০৬-০৭ সালে আমি যে ছবি এঁকেছি, সেই ছবির রং একটুও বদলায়নি। আসলে রং, কাগজ এসবই তো উপকরণ। আসল কথা হল ছবি হচ্ছে কি না। এবং সেটা কতখানি ‘তোমার’ ছবি হয়ে উঠছে। তোমার নিজের কথা কতটা ছবিতে বলা হয়ে উঠছে। 

১৯৮৫-তে আপনার প্রথম এগজিবিশন। ‘অ-এ অন্ধকার, আ-এ আলো’। আর সদ্য এই ২০২৫ সালে হল ‘আরণ্যক’। ২০২২-এ ইমামি যে রেট্রোস্পেকটিভটা করেছিল, ১৯৯৫-২০২২ সময়কালের ছবি নিয়ে– সেটাও আমি দেখেছিলাম। গত ৫০ বছরে আপনি বারবার মাধ্যম বদলে ফেলেছেন। এবং সেটা খুবই স্বতঃস্ফূর্তভাবে।
কিন্তু আরণ্যকের ছবিগুলো দেখতে গিয়ে আমার বারবার মনে হচ্ছিল, মাধ্যম নিয়ে আপনার যে পরীক্ষানিরীক্ষা, সেটার আরও গভীরে গিয়ে আপনি প্রতিটি মাধ্যমের কনট্যুরকে ভেঙে ফেলছেন। ভেজিটেবিল ডাইয়ের সঙ্গে ইকো-প্রিন্ট, এমব্রয়ডারি মিলিয়ে মিশিয়ে দিচ্ছেন। সেটা আমাকে খুবই আশ্চর্য করেছে…

প্রথম এগজিবিশনটা অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ হয়েছিল। তখন আমি ছোট। সেই কার্ডটাও আমি স্টেনসিল করে বানিয়েছিলাম। তোমায় দেখাব, আমার কাছে রয়েছে।
‘আরণ্যক’ নিয়ে যেটা তুমি বললে, সেটা ঠিকই। তবে খুব সচেতনভাবে যে এসব করেছি তা নয়। নিজে থেকেই হয়ে গিয়েছে। আসলে ক্রমাগত এই নতুন নতুন মাধ্যম শেখাটা তো আমার থেমে থাকেনি। ২০২২ সালে আমি সবে ইকো-প্রিন্ট করছি। কোভিডের সময়ে নিজের মনে প্রচুর কাজ করার অবসর পেয়েছিলাম। সবকিছু বন্ধ থাকত। তখন সকালবেলা রাস্তায় বেরিয়ে কদমপাতা তুলে আনতাম। সবুজ কদমপাতা, পাকা কদমপাতা– আলাদা আলাদা করে কাপড়ের উপর ছাপ নিতাম। তখন সবাই জিজ্ঞেস করত, রাস্তায়, ‘এত পাতা নিয়ে কী করবেন, দিদি?’ আমি মজা করে বলতাম, ‘জ্বালিয়ে চা করে খাব!’ [হাসি] তো যাই হোক, ছাপ নিতে গিয়ে দেখলাম, কিছুর ছাপ আসে, কিছুর আসে না। আবার কাপড়ের উপরে সামনের দিকের ছাপ আসে না, পিছনের ছাপ নিতে হয়। এইসব করতে করতেই শিখেছি। একবার এতগুলো ফার্ন পেয়ে গেলাম। সেই দিয়ে নেপালি তুলট কাগজের উপরে প্রিন্ট নিয়ে ছবিতে ট্রান্সফার করলাম। নেপালি কটন পেপার আর রাইস পেপার দুটোতেই আমি ইকো-প্রিন্ট করেছি।
‘আরণ্যক’-এ আমার স্ক্রোলগুলো তুমি দেখেছ। বড় বড় স্ক্রোল। ওগুলোর ক্ষেত্রে কিন্তু আগে ইকো-প্রিন্ট নিয়েছি। তাঁর উপর স্টিচিং-এর কাজ করা।

‘স্টোরি অফ ডে’ আর ‘স্টোরি অফ নাইট’, স্ক্রোল, ২০২৫

‘স্টোরি অফ ডে’ আর ‘স্টোরি অফ নাইট’। স্ক্রোলগুলো দেখতে গিয়ে আমার যেটা মনে হচ্ছিল, সারাটা ক্ষেত্র জুড়ে একটা প্রবহমানতা রয়েছে। মানে, কোনও এলিমেন্টই জড়বস্তু নয়। সবটাই চলমান। জীবন্ত। মানুষকে বাদ দিয়ে আমাদের চারপাশের পৃথিবীটা যেরকম, সারাক্ষণই কিছু না কিছু ঘটে চলেছে– তেমন…

কখনও জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে চুপ করে বসে থাকবে। দেখবে, চারিদিকে কর্মযজ্ঞ চলেছে। গাছপালা, পশুপাখি, পোকামাকড় সবাই নিজের নিজের কাজ করে চলেছে। প্রজাপতি, মৌমাছি এক ফুল থেকে অন্য ফুলের দিকে যাচ্ছে, মাকড়সা জাল বুনে চলেছে, পাখি ডাকছে, গাছ ফুল ফোটাচ্ছে, পিঁপড়ে খাবার সংগ্রহ করে আনছে। কেউ কিন্তু ফাঁকি দিচ্ছে না। আর সবার কাজ একসঙ্গে মিলে গিয়ে একটা বিরাট সিস্টেম চলছে। ছোট ছোট কাজ সম্মিলিত হয়ে বিপুল একখানা পৃথিবীকে সচল রেখেছে। প্রকৃতির মধ্যে এরকম ‘ছোট আমি’ থেকে ‘বড় আমি’-র দিকে যাত্রা সারাক্ষণ হয়ে চলেছে।
যখন ইকো-প্রিন্ট করা শিখলাম, তখন মনে হল স্ক্রোল-ও তো করা যায়। যদিও আমার করা স্ক্রোলগুলো আকারে খুব বড় হয়ে গিয়েছে। কেন যে এত বড় স্ক্রোল করার কথা ভেবেছিলাম জানি না। হয়তো মনে হয়েছিল, আমার অনেক কিছু বলার রয়েছে। তাছাড়া এই বড় করে কাজ করার মধ্যে একটা শিল্পীসুলভ লোভও আছে। [হাসি]
আকাশ, জল, মাটি– এই স্ক্রোলটার তোমার কথা মনে পড়ছে?

হ্যাঁ। গতকালই দেখছিলাম।

উপরে ছিল নীল আকাশ। তখন মনে মনে ভেবেছিলাম, ভ্যান গখের মতো আকাশ আঁকব। এই ভেবে অপরাজিতা ফুলের মালা এনে ইকো-প্রিন্ট নিয়েছি। দেখলাম, অপরাজিতার খুব ফিকে একটা রং এল। কিন্তু আকাশটাকে তো আমি অনেকটা বড় করেছি। মাঝে মাটি আর নিচের দিকে জল। শেষ অবধি আকাশে ইন্ডিগো ব্যবহার করলাম। খুব বড় করার জন্য বেশ খাটনি হয়েছিল।
আসলে আমার করার ইচ্ছে ছিল দশটা স্ক্রোল। কিন্তু বড় হয়ে গেল বলে চারটের বেশি করে উঠতে পারিনি। পরে একটু ছোট আকারে আরও কয়েকটা করার ইচ্ছে রয়েছে।

স্কাই ল্যান্ড ওয়াটার (বাম) এবং কিপার্স অফ দ্য ফরেস্ট (ডান) স্ক্রোল, ২০২৫

আরেকটা স্ক্রোলের কথা বলতে ইচ্ছে করছে আমার। ‘কিপার্স অফ দ্য ফরেস্ট’।  এবং যে প্রসঙ্গে বলতে ইচ্ছে করছে সেটা হল, আপনার ছবি সম্পর্কে ন্যান্সির একটা মন্তব্য– ‘হেলিওট্রপিক’। অর্থাৎ আলোর পানে চলা, গাছের মতো…

ওই যে, অ-এ অন্ধকার থেকে আ-এ আলোর দিকে যাত্রা। [হাসি]

কিন্তু এই যে আলোর দিকে যাত্রাটা, সেখানে একটা সাবলাইম অন্ধকারও তো রয়েছে। আলোর চাদরের নিচে ঢাকা পড়া ক্ষত। ঢাকা পড়া বিষাদ।

রয়েছে তো। ক্ষত কি মানুষের জীবনের ভূষণ নয়? ক্ষত কিন্তু আমার ছবির ভেতরে খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। আমি যে খুব দুঃখের ছবি আঁকব এমন মনস্থির করে আঁকতে বসেছি তা নয়। কিন্তু নিজের যাপনের ভেতরে তো সবকিছুই থাকে– পাওয়ার আনন্দ, বিলাস, তার সঙ্গে ব্যথা বেদনা, ভয়ঙ্কর কষ্ট, বিচ্ছেদ সবই থাকে। আমাদের বাঁচাটাই তো এমন মিলিয়ে-মিশিয়ে বাঁচা। সেটা তো কাজের ভেতরে প্রকাশ পায়ই।

‘মড়া-কাটা-ঘর’ প্রথমবার পড়ে আমি এত শক্‌ড হয়েছিলাম। আপনার শৈশবের প্রথম গোলাপি ক্ষত, গল্পটা একবার শোনাবেন?

সেটা বাঘাযতীন পার্কে থাকার সময়কার ঘটনা। শিলিগুড়ির পুরনো পোস্টঅফিস থেকে খানিক এগিয়ে, কোর্টের সামনে ছিল শিলিগুড়ি জেল। খুব উঁচু পাঁচিলের বেড়া দেওয়া। তার পাশেই লাশ-কাটা ঘর। খড়ের ছাউনি দেওয়া, দোচালা। আমরা বলতাম ‘মড়া-কাটা ঘর’। খুব ভয় লাগত ওই জায়গাটা দিয়ে যেতে। চোখ বন্ধ করে মা-কে চেপে ধরে থাকতাম।
প্রায়ই নতুন নতুন লাশ আসত মড়া-কাটা ঘরে। আতঙ্ক যেমন ছিল, কৌতূহলও ছিল, নিষিদ্ধ ফলের মতো। কত গোপন হিংসা, কত দুর্ঘটনার খবর লাশের শরীর খুঁড়ে বের করা হত সেখানে।
একদিন সকালে ইশকুলে গিয়ে শুনি, ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ক্লাসের বীণা দাশ না কি আত্মহত্যা করেছে! কেন? কীভাবে? কেউ আমাকে কিছু বলল না। বীণা অষ্টম শ্রেণির ক্লাস মনিটর। কথাবার্তায় বড় বড় ভাব। খয়েরি পাড় সাদা শাড়ি পরে। সে আত্মহত্যা করল! কী মনে হল, বাড়ি না-ফিরে সোজা চলে গেলাম মড়া-কাটা ঘরের সামনে। বীণাকে নিশ্চয়ই সেখানে আনা হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইলাম। একা। ভয় করেনি। শেষে মামা দেখতে পেয়ে জোর করে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে মা খুব বকাবকিও করেছিল।

দ্য উওম্যান অ্যান্ড দ্য বার্ড ২, অ্যাক্রেলিক, ২০০৯

অনেক রাতে, শুনলাম, মা-বাবা ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। বীণার পাকস্থলি থেকে না কি সবুজ কলকে ফুলের বীজের একটা মণ্ড পাওয়া গিয়েছে। আর তলপেটের থলিতে একটা বড়সড় মানুষের বাচ্চা। সে রাত্রে ঘুম হল না। ঘুমের ভান করে কাঠ হয়ে শুয়ে থাকলাম।
বীণার আর বাঁচা হল না। সে নিজের প্রিয় শরীরকে হত্যা করল। কষ্ট হল আমার। খুব কষ্ট হল। কিন্তু ভয়টাও কেটে গেল। মৃত্যু নিয়ে, আরও অনেক কিছু নিয়ে।

[কিছুক্ষণের নীরবতা। সিনেমাহলের ভাষায় একেই কি ‘ইন্টারভ্যাল’ বলে…?] 

রবীন্দ্রনাথ আপনাকে শান্তি দেয়?

রবীন্দ্রনাথ শান্তি না দিলে আর কে দেবেন! ওঁর লেখা, ওঁর ছবি, কবিতা। রবীন্দ্রগান। আমি তো মনে করি, প্রতিটি ছেলেমেয়ের রবীন্দ্রসংগীত শেখা উচিত, গান গাইবার জন্য নয়, নিজের ভিতরে সুন্দরের প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

আপনি তো দীর্ঘদিন রবীন্দ্রনাথের গান শিখেছেন, ছোটদের শিখিয়েওছেন?

খুব ছোটবেলায়, একবার শিলিগুড়ির বাঘাযতীন পার্কে, একমাস ধরে অনুষ্ঠান হয়েছিল। সেখানে দেবব্রত বিশ্বাস আর সুচিত্রা মিত্র-র গান শুনে এত ভালো লেগেছিল! ওঁদের মতো করে গাইবার চেষ্টা করতাম। রেডিওতে গান শুনতাম প্রচুর। কিন্তু কোমর বেঁধে শিখতে শুরু করলাম কলকাতায় এসে। এক বন্ধু সঙ্গে করে নিয়ে গেল ‘সুরঙ্গমা’য়। তখনও জানি না, সেই সংস্থার প্রধান শৈলজারঞ্জন মজুমদার। আমার পরীক্ষা নিয়েছিলেন প্রফুল্ল দাস। ভর্তি হলাম দ্বিতীয় বর্ষে। সেখানকার গান শেখানোর পদ্ধতি আমার খুব ভালো লেগেছিল। আলাদা করে তানপুরোর সঙ্গে গলা মিলিয়ে শেখানো, ভুল হলে সংশোধন করে দেওয়া– এইসব। রবীন্দ্রসংগীতের পাশাপাশি রাগাশ্রয়ী গান, টপ্পা, রামপ্রসাদী, আগমনী। শেখাতেন চণ্ডীদাস মাল।

রেট্রোস্পেকটিভে গৌতম ও অরুণিমা চৌধুরী। আলোকচিত্র: ভিভিয়ান সার্কি, কৃতজ্ঞতা: ইমামি

তৃতীয় বর্ষে শেখাতে এলেন ঊর্মিলা ঘোষ। কী অপূর্ব অমায়িক ব্যবহার! খুব আনন্দ হত তাঁর কাছে শিখতে। চতুর্থ আর পঞ্চম বর্ষে শেখাতেন স্বয়ং শৈলজাদা। রবিবার সকালে ট্যাক্সি ভাড়া করে আমিই তাঁকে ‘সুরঙ্গমা’য় নিয়ে যেতাম। গম্ভীর, আত্মমগ্ন মানুষ। কিন্তু ক্লাসে একেবারে অন্যরকম। সুর ভুল হলে বকাঝকা করতেন, এসরাজের ছড় শতরঞ্চির ওপর বেতের মতো আছড়াতেন। গান সম্পূর্ণ নির্ভুল না হওয়া পর্যন্ত ছাড়তেন না। ভয় পেতাম, কিন্তু জেদও বাড়ত। এখন মনে হয়, প্রফুল্লদা, শৈলজাদা না থাকলে হয়তো এভাবে রবীন্দ্রনাথের গান শেখাই হত না।
আরও পরে শৈলজাদার দুই ছাত্র– সুবিনয় রায় এবং সুভাষ চৌধুরী– এঁদের কাছেও গান শিখেছি। চমৎকার শিক্ষক দু’জনেই। আর্ট কলেজ থেকে বেরিয়ে ছোটদের আঁকা শেখাতে যেতাম গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘সুশিক্ষণ’ বিদ্যালয়ে। সেখানে আসতেন বটুকদা, জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। পিয়ানো বাজাতেন। তাঁর কাছে শিখেছিলাম ‘অনেক পাথর ভেঙে আসি, গভীর খনির বুক ছুঁয়ে যাই’। সেখানে আমার গান শুনে রঘুদা, মানে রঘুনাথ গোস্বামী আমার বাড়ি চলে এসেছিলেন– গান শুনবেন বলে।
পরে নিজে যখন ছোটদের গান শেখাতে গিয়েছি, কেউ যখন একখানা গান নির্ভুল গেয়ে শুনিয়েছে, এত আনন্দ হয়েছে! তখন আমার এই শিক্ষকদের কথাই প্রথম মনে পড়েছে। কৃতজ্ঞ চিত্তে তাঁদের প্রণাম জানিয়েছি।

আর রবীন্দ্রনাথের লেখা?

আমার রবীন্দ্রনাথ পড়া শুরু ‘গল্পগুচ্ছ’ দিয়ে। চতুর্থ খণ্ড। জন্মদিনে কেউ একজন উপহার দিয়েছিলেন। তখন অতটা মজা পাইনি। অনেক পরে দ্বিতীয় খণ্ড পড়তে গিয়ে প্রথম রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের রস আমাকে স্পর্শ করে। কলেজে পড়ার সময় রবীন্দ্র-উপন্যাস পড়েছি, একটা একটা করে। ‘যোগাযোগ’, ‘চতুরঙ্গ’, ‘চোখের বালি’, ‘মালঞ্চ’, ‘দুই বোন’, ‘নৌকাডুবি’। আরও পরে ‘শেষের কবিতা’, ‘ঘরে বাইরে’, ‘চার অধ্যায়’, ‘গোরা’। ‘গোরা’ আমার খুব প্রিয়, একাধিকবার পড়েছি। এতকাল পরেও এখনও ‘গোরা’ এত প্রাসঙ্গিক মনে হয়! 

বসন্ত, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২১

‘এখন আমার আয়ুর জন্য রবীন্দ্রনাথ দরকার, শেষ পরিণতির জন্যেও।’ পঁচাত্তর পেরিয়ে এসে এ কথাটা কেন লিখলেন?

কেন লিখলাম বলতে পারব না। সব কেন-র তো উত্তর হয় না। উপলব্ধি হয়। অনুভূতি হয়। অব্যক্ত অনুভূতি।

আরেকটা জায়গা, আপনার লেখা থেকেই, আমি একটু পড়তে চাই। ইচ্ছে করছে। প্রেম সম্পর্কে বলতে গিয়ে কী অদ্ভুত কতগুলো পঙক্তি লিখেছেন:
‘ক্ষুধা যার আছে তার প্রেম আরও প্রেমের দিকে যায়। বিবাহ, মিলন, সন্তানের জন্ম এবং পালনেই তা শেষ হয়ে যায় না। বিরোধেও প্রেমের ফুল ফোটে। এ এক ক্রমপরিণত আত্মজিজ্ঞাসা; যন্ত্রণাদীর্ণ কিন্তু বোধিরূপা।’
এ কথাগুলো কি কেশব রাভাজি কুলকার্নি সম্পর্কে লেখা?

জানি না।
কেশব আশ্চর্য মানুষ। মহারাষ্ট্রের লোক। তখনকার দিনের সিএ। এলআইসি-র উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন। বাবার সহকর্মী। মুম্বই থেকে বদলি নিয়ে জলপাইগুড়িতে এসেছিলেন। শিল্প-সাহিত্য খুব ভালোবাসতেন। চমৎকার গান গাইতেন, ডি ভি পালুশকরের ভজন। আমি তখন কলকাতায়– একদিকে ল কলেজ, অন্যদিকে আর্ট কলেজ। একবার ছুটিতে বাড়ি গিয়েছি। বারান্দায় আমার গুনগুন শুনে বাড়িতে এলেন তিনি। গান শুনবেন। শুনলেনও। আমায় উপহার দিলেন হেমিংওয়ের ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’। তাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কলকাতায় ফেরার সময়ে বললেন, ‘চিঠি লিখো’।

আমাদের পত্রালাপ চলত। প্রথম প্রথম ইংরেজিতে হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই ভালো বাংলা শিখে গেলেন কেশব। ততদিনে বাবা বদলি হয়ে অসমে। আমার আর জলপাইগুড়ি যাওয়া হয় না। কেশবের সঙ্গে দেখাও হয় না। যেটুকু কথোপকথন, চিঠি মারফত। আমায় তিনি বার্গম্যান দেখতে বলেন, বলেন কুরোসাওয়া দেখতে। নানা বইপত্র পড়তে বলেন। অসম যাওয়ার পথে জলপাইগুড়িতে নামলে একবার দেখা হল। গান শুনলেন। এবার দিলেন তাঁর প্রিয় বই, কাহজানজকিসের ‘জোরবা, দ্য গ্রিক’। ওঁর দৌলতে বিদেশি সাহিত্য পড়া হতে থাকল আমার। সমারসেট মম পড়লাম। ‘অব হিউম্যান বন্ডেজ’। বরিস পাস্তেরনাকের ‘ডক্টর জিভাগো’।

খসড়া ছবি, আঁকবার ঘর

তিন বছর কেটে গেল। মুম্বই ফেরার সময় হয়ে এল ওঁর। জানালেন, কলকাতায় আসতে চান, ক’দিন থাকবেন, আমার সঙ্গে কলকাতা ঘুরে দেখবেন। এলেনও। ক’টা দিন ঝড়ের মতো কেটে গেল। ভিক্টোরিয়া, বেলুড় মঠ, দক্ষিণেশ্বর। বয়েস, পদমর্যাদা সব ভুলে প্রেমিকের মতো হাত ধরে ঘুরলেন। কত কথা। আমাকে বিকশিত হয়ে উঠতে হবে, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে, মুক্ত চিন্তায় নিজেকে গড়ে তুলতে হবে, সংস্কৃতির সমস্ত ক্ষেত্র থেকে শুষে নিতে হবে সুন্দরের নির্যাসটুকু। ঘোরের মধ্যে শুনে গেলাম। স্বপ্ন দেখলাম। কফিহাউসের তিনতলায় ‘রূপা’ থেকে কিনে দিলেন দস্তয়েভস্কি, তলস্তয়, বার্নার্ড শ।
পরদিন ভোরের ট্রেনে শান্তিনিকেতন। কী চমৎকার যে কাটল দিনটা! উত্তরায়নের বাগান থেকে কুর্চিফুল এনে গুঁজে দিলেন আমার চুলে। গান গাইলেন রামকিংকরের ভাস্কর্য দেখে। কোপাইয়ের জলে পা ডুবিয়ে একসঙ্গে হাঁটলাম খানিক। রাতে ফিরতে অনেক দেরি হল। বাড়ি ফেরা হল না। থাকলাম কুইন্স ম্যানসনে, জীবনবীমার অতিথিশালায়। একই বিছানায়। আমায় জড়িয়ে ধরে চুম্বন করলেন। সস্নেহে বললেন, আবার কখনও দেখা হবে, যখন তুমি পূর্ণ নারী হয়ে উঠবে।
আমাদের আর কখনও দেখা হয়নি। কেন হয়নি, জানি না। কিন্তু মধ্য-চল্লিশের একজন আবেগপ্রবণ সংসারী মানুষ আর কুড়ি-বাইশের উচ্ছল একটা মেয়ের ওই ক’দিনের প্লেটনিক প্রেম আমার মনে থেকে গিয়েছে। সে রাতে শরীর তার ভূমিকা পালন করতে পারত, কিন্তু তিনি সেই ইন্দ্রিয়সুখ চাননি। যাওয়ার আগে দিয়ে গিয়েছিলেন পুরুষোত্তম রেগে-র ‘সাবিত্রী’, বাংলা অনুবাদে, অনুবাদক– কেশব রাভাজি কুলকার্নি।

‘সব কেন-র তো উত্তর হয় না। উপলব্ধি হয়। অনুভূতি হয়। অব্যক্ত অনুভূতি।’

[হাসি। নীরবতা।]

লেডি ইন দ্য গার্ডেন, প্রাকৃতিক রং ও ইকো-প্রিন্ট, ২০২৪

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। একটা সময়ে, যখন আপনি নিজের ফর্ম, মিডিয়াম, ছবির ভাষা খুঁজে চলেছেন– তখন তো শান্তিনিকেতন আপনাকে একটা বড় বাঁক দিয়েছিল, না কি?

অবশ্যই। শান্তিনিকেতন আমায় নিজেকে চিনিয়েছে। নিজের প্রবণতাকে শনাক্ত করতে শিখিয়েছে। আটাত্তর সালে আমি আর গৌতম প্রথম শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলাম। তখন সোমনাথ হোর ছিলেন প্রিন্সিপাল। প্রদ্যুম্নদা আমাদের সম্পর্কে জানিয়েছিলেন ওঁকে। সোমনাথদা আমাদের এত স্বাধীনতা দিয়েছিলেন! আমরা পুরো শান্তিনিকেতন ঘুরে, রামকিংকর বেইজের সমস্ত স্কাল্পচার, বিনোদবিহারীর ম্যুরাল দেখেছি। এমনকী ওঁর বদান্যতায় আমরা রবীন্দ্রভবনে ঢুকে রবীন্দ্রনাথের প্রচুর অরিজিনাল ছবি দেখেছিলাম। তখন সুশোভন (অধিকারী) ছিল ছবির দায়িত্বে, ও আমাদের যত্ন নিয়ে দেখিয়েছিল। তারপর নন্দন মিউজিয়ামে তাঁদের সংগ্রহের ছবিও দেখেছিলাম। তখন না আমার মনে হয়েছিল, এই মিডিয়ামটা, আমার ভাবনাগুলো প্রকাশের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।
সেই ’৭৮ সালের পর থেকে ছুটি পড়লেই আমরা শান্তিনিকেতনে চলে যেতাম। আমাদের এক বন্ধু, সুতপা ভট্টাচার্য, থাকতেন রতনকুঠিতে, স্কলার্স ব্লকে। আমরা গিয়ে ওঁর বাড়িতে থাকতাম, আর সারাদিন আউটডোর করতাম। ক্যানালের পাড়ে গিয়ে, ‘শ্যামলী’ বাড়ির পেছনে গিয়ে। শ্যামলীর পেছনে একটা জায়গা রয়েছে, শুয়োরের বর্জ্য ভর্তি, সেখানে একটা এঁদো পুকুরের মধ্যে শাপলা ফুটত। সেখানে বসে যেতাম পুকুর ভরা শাপলা আঁকতে। বিভিন্ন মিডিয়ামে আমি যে ওয়াটার লিলি এঁকেছি, তার মধ্যে ওই পুকুরের স্মৃতিই খেলা করেছে। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকতাম।

ওয়াটার লিলি ১ ও ২, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০১৫

কিন্তু প্রচলিত শান্তিনিকেতনী যে ঘরানা, চিত্রশৈলীর কথা বলছি, তার সঙ্গে তো আপনার কাজের অনেকটা ফারাক… 

সে তো হবেই। আমি তো ছবি আঁকা শিখিনি ওখানে। আমি আমার মতো করেই এঁকেছি। শান্তিনিকেতনের পরিবেশ আমায় সেই স্পেসটা দিয়েছে। বুঝতে শিখিয়েছে– কোনটা আমার মাধ্যম, কোনটা নয়। যেমন বিকাশদা না থাকলে আমার ড্রয়িংটাই শেখা হত না।
শান্তিনিকেতন আমায় মানিদাকে দিয়েছে। মানিদার ছবি, কী চমৎকার! বারবার দেখলেও দেখা শেষ হয় না। ওঁর দেখা, ওঁর ছবির উইট– তার ধারেকাছেও আমি কখনও পৌঁছতে পারব না। কী অসম্ভব ক্ষমতাবান শিল্পী! প্রথম প্রথম মানিদাকে ছবি দেখাতাম। খুব পছন্দও করতেন আমার ছবি। কিন্তু ওঁর একটু সংশয় ছিল, এই যে ফুল-ফল-পাতা দিয়ে রং বানিয়ে কাজ করছি– তা আদৌ টেকসই হবে কি না! আমি মানিদার সরাসরি ছাত্রী নই, কিন্তু আমি ওঁকে আমার শিক্ষক বলেই মনে করি। রবীন্দ্রনাথের ছবি, মানিদার ছবি আমায় খুব ইন্সপায়ার করেছে। কিন্তু শেষ অবধি এঁকেছি নিজের ছবিই।

রবীন্দ্রনাথের ছবি আর আপনার ছবির আলোছায়া অনেকটা একইরকম। ইন্সপিরেশনটা বোঝা যায়।

খুব ভালোবাসি রবীন্দ্রনাথের ছবি। দেখি। বারবার দেখি। দেখে মুগ্ধ হই। কিন্তু সেই ছবি কপি করার ধৃষ্টতা হয়নি কখনও। আমার ধারণা, কেউ কোনওদিন ওই স্টাইল কপি করতে পারবেও না। বাইরে হলুদ পড়ন্ত রোদ্দুর, আর ভেতরে ঘন জঙ্গল। অন্ধকারের ভেতর থেকে আলো জেগে উঠছে। নেগেটিভ লাইন দিয়ে দিয়ে সেটাকে ধরছেন। কী অসামান্য!
আর কী বিষণ্ণ মেয়েদের এঁকেছেন। জন্তু জানোয়ার, গাছপালা যা এঁকেছেন সমস্ত ফর্মের ভেতরেই নিজস্ব একটা মৌলিক দেখা, স্বতন্ত্র বোধ। প্রকৃতিকেই আঁকছেন, কিন্তু দেখে দেখে হুবহু সদৃশ নিষ্প্রাণ মডেল তৈরি করছেন না। আঁকছেন নিজের দেখাটাকে। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি একান্তভাবে ওঁরই প্রকৃতি। অননুকরণীয়। 

ঊষা, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২৪

আপনি রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের বিষণ্ণ বললেন। আপনার মেয়েরা কিন্তু তা নয়, আপনার মেয়েদের মধ্যে একটা দার্ঢ্য রয়েছে বলে আমার মনে হয়…

কারণ আমি সেটা সর্বতোভাবেই চেয়ে এসেছি। সারা জীবন ধরে। মেয়েরা যেন নিজেদের চিনতে পারে। নিজেদের প্রতি বিশ্বাস রেখে যেন এগতে পারে। যে সূক্ষ্ম অবহেলা, অবিচার মেয়েদের সারাজীবন ধরে ভোগ করতে হয়, সেখান থেকে তারা বেরিয়ে আসুক। তারা যেন শক্তিরূপা হয়ে ওঠে। ‘শক্তিরূপ হের তার/ আনন্দিত অতন্দ্রিত’। একটা ছবি এঁকেছিলাম ২০১৪ সালে। এই শক্তিরূপ নিয়ে।
এবং শক্তিরূপ বলেই, আমার মেয়েরা আশ্রয় হয়ে ওঠে। কারণ তারাই তো জন্ম দেয়, পালন করে। মানুষের বাচ্চা– অত্যন্ত অসহায় একটা প্রাণী– সে নিজে নিজে কিচ্ছু করতে পারে না। বাঁচতেই পারবে না মা-কে ছাড়া। সেই অবস্থা থেকে একজন সন্তানকে বড় করে তোলা। একে আশ্রয় বলব না? শক্তি বলব না?

‘শক্তিরূপ হের তার/ আনন্দিত অতন্দ্রিত’, ধাতব পাতের উপর এনামেলের কাজ

সেজন্যেই কি আপনার ছবির মেয়েরা গাছ হয়ে উঠতে চায়, ফুল হয়ে উঠতে চায়? এই যে আপনার ছবি জুড়ে অংশত গাছ, অংশত মানুষের ফর্ম– এই সাঁকোটা তো আপনি বারবার তৈরি করেছেন…

আমার বারবারই মেয়েদের গাছ মনে হয়। কারণ গাছ এবং মেয়েরা– উভয়েই আশ্রয়দাতা, এবং উভয়েই চূড়ান্ত অবহেলিত। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ যে অনাচার করে চলেছে, মেয়েদের সঙ্গেও পুরুষপ্রধান সমাজ সেই ব্যবহারই করে চলেছে। নারীই তো প্রকৃতি। মা। আশ্রয়। কিন্তু মানুষের লোভ তো সেই প্রকৃতিকে ক্রমশ ছারখার করে দিচ্ছে।
তবে শুধু মেয়েরা নয়, আমার ছবির পুরুষরাও কিন্তু প্রকৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ‘অড ম্যান অফ দ্য জাঙ্গল’ বলে আমার যে সিরিজটা রয়েছে, দেখবে সেখানে সকলেই পুরুষ, এবং সকলেই প্রকৃতির অংশ হয়ে উঠছে। এঁরা আদিবাসী। ভারতের বিভিন্ন জঙ্গলের প্রাচীনতম বসবাসকারী। প্রকৃতির সমস্তটুকুর সঙ্গে এঁদের নিবিড় যোগ। আসলে পুরুষ-নারী নয়, মানুষ মাত্রেই প্রকৃতির অংশ, এই স্বীকৃতিটুকু যত নষ্ট হবে তত মানুষের এক্সিস্টেনশিয়াল ক্রাইসিস আরও দৃঢ় হবে। জাদুগোড়াকে কীভাবে নষ্ট করে ফেলেছে! লোভী মানুষ খালি সোনা খোঁজে, পেট্রোলিয়াম খোঁজে, ইউরেনিয়াম খোঁজে, লাভ খোঁজে, বিক্রির ফিকির খোঁজে। পারলে সারা পৃথিবীটাকেই খুঁড়ে ফেলে বিক্রি করে দেয়। 

দুই বোন, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২৫

আপনি কখনও দেবারতি মিত্র-র কবিতা পড়েছেন?

মণীন্দ্র গুপ্ত আমার ভীষণ প্রিয় লেখক। ‘অক্ষয় মালবেরি’। খুব প্রিয় বই। মণীন্দ্রবাবুর সঙ্গে আমাদের পরিচয়ও ছিল। কিন্তু দেবারতি মিত্রর সঙ্গে অতটা পরিচয় ছিল না। তবে পড়েছি। 

আমার মনে হয়, দেবারতিদির কবিতা আর আপনার ছবি– দুটোকে প্যারালাল টেক্সটের মতো পাশাপাশি রাখা যায়। ‘খোঁপা ভরে আছে তারার ধুলোয়’ কিংবা ‘ভূতেরা ও খুকি’ তো আপনারই না-হওয়া ছবি।
এখানে, এই প্রসঙ্গটা উঠল বলে একটা তাত্ত্বিক প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে। অনুভূতির এ ধরনের ছক কাটা বিভাজনে আমি খুব একটা বিশ্বাস করি না। তবু, কথা হচ্ছে তাই জিজ্ঞেস করা। আপনার ছবি কি কোথাও গিয়ে সচেতনভাবে ইকো-ফেমিনিজমের কথা বলতে চায়?

ইকো-ফেমিনিজম কাকে বলে আমি জানি না। আমি কিন্তু একেবারেই বিরাট তাত্ত্বিক, পড়াশোনা করা লোক নই। আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতে সারাক্ষণ এত কিছু ঘটে চলেছে, তা দেখতে আমার ভালো লাগে। এই যে বিরাট জগতের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত, এই যে বিপুল প্রাণ, সকলে মেতে রয়েছে নতুন নতুন খেলায়। তার জঙ্গম প্রকাশ সৃষ্টিতে, ধ্বংসেও। এই খেলার স্রোতে, বহুর মধ্যে এক হয়ে, খড়কুটো হয়ে ভেসে চলা একজন হিসেবে নিজেকে দেখি। খেলায় মেতে থাকি। আনন্দে মেতে থাকি। ছবি আঁকি। সেই খেলার আনন্দেই। গাছ লাগাই। সেই খেলার আনন্দেই। আর সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই অনিশ্চিত, অনির্বচনীয়কে জেনে।
যদি কিছুর কথা আমার ছবি সত্যিই বলতে চায়, তা হল মায়া মমতা ভালোবাসার কথা। আমাদের চারপাশের জগতটার একটা সর্বজনীন সত্তা রয়েছে। সেই সত্তার সঙ্গে আত্মিকভাবে মিলিত হওয়ার কথা। সেটা যদি ইকো-ফেমিনিজম হয়, তাহলে তাই।

আপনি কি জানেন, দেবারতিদি ঠিক এই উত্তরটাই দিয়েছিলেন, নিজের কবিতা ও ইকো-ফেমিনিজম প্রসঙ্গে?

তাই? [হাসি]
আমি কিন্তু সত্যিই কখনও খুব সচেতন হয়ে ছবি আঁকিনি। আমার শিল্পের বীজটা কিন্তু আমার ‘আমি’-র মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে। আমি যা, তা-ই আমার শিল্প। একটুও ক্রাফটেড নয়। একটা মেয়ের শরীর ক্রমশ সবুজ হয়ে উঠছে, তার দু’ বাহু শাখাপ্রশাখায় ভরে উঠছে, সেখানে পাখি এসে বসছে, তার শরীর ফুলে ফুলে ভরে উঠছে– এ ছবি তো আমারই। এ ছবির জন্য অনেক ভেবে আঁকতে হয় না কি!

অপরাহ্ন, হ্যান্ডমেড পেপারে ইকো-প্রিন্ট ও প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২৫

আপনি সুমনা রায়ের ‘হাউ আই বিকেম এ ট্রি’ পড়েছেন?

আমি এই বইটার নাম শুনেছি, কিন্তু পড়া হয়নি।

এই যে কথাটা আপনি বললেন– ‘এ ছবি তো আমারই’, সেই সূত্রেই বলি– আপনার ছবির মেয়েদের দেখতে গিয়ে বারবার আমার মনে হয়েছে, এ সবই আসলে আপনার আত্মপ্রতিকৃতি। এবং এই সমস্ত ছবিতেই ‘প্রতিকৃতি’-র চেয়ে ‘আত্ম’-টাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

[হাসি]
এটা তুমি ঠিকই বলেছ। আমার সব ছবিই হয়তো আমি। একেবারে ক্যামেরার মতো করে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফ-পোর্ট্রেট এঁকেছি অল্পবয়সে। সেগুলো খুঁজলে হয়তো এখনও পাওয়া যাবে। কিন্তু সত্যিকারের আত্মার প্রতিকৃতি বোধহয় হয়ে উঠেছে এগুলোই। এগুলোই আমার ছবি।
আসলে খুব ভেবেচিন্তে আমি কোনও কিছু করি না। যখন শুরু করি, একেবারে শূন্য থেকে শুরু করি। ধূ ধূ শূন্যতা। সেই শূন্যটা আস্তে আস্তে ভাঙচুর হয়। শূন্যে রং পড়ে। রেখা পড়ে। রেখা ঢেকে যায়। নতুন রঙে পুরনো রং ঢাকা পড়ে। এরকম করতে করতে একটা সময়ে গিয়ে মনে হয়, ছবিটা আমার হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। আর আমার নেই। তখন ছবিটাকে ছেড়ে দিই।
কিন্তু কেন জানি না মনে হয়, কোনও ছবিটাই হয়নি। আসলে দক্ষতা, মানে স্কিল তো আমার খুবই কম। আমি তো মানিদা বা রামচন্দ্রনের মতো দক্ষ নই। কিংবা ধরো হুসেন, বা তয়েব মেহতা। এঁরা সুদক্ষ শিল্পী। দক্ষতা না-থাকাটা আমার সীমাবদ্ধতা। সেটা আমি জানি।
তবু অনেকসময় কোনও দর্শক হয়তো এসে বললেন, ‘এ ছবিটা খুব ভালো লাগছে। কী এঁকেছেন একটু বলবেন?’ আমি মজা করে তাঁকে জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কী দেখছেন?’ কারণ আমার দেখা, আমার করা তো ছবিটার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গিয়েছে। দর্শককে ছবিটা কীভাবে স্পর্শ করছে, সেইটে জানতে আমার ইচ্ছে করে। কারণ তাঁর দেখাটা হয়তো অন্যরকম হতে পারে। সেই দেখাটা হয়তো আমাকে ঋদ্ধ করতে পারে। 

অবসর, বইপত্র, অরুণিমা চৌধুরীর স্টুডিও

শঙ্খবাবু লিখেছিলেন, জার্নালে সম্ভবত, শিল্পীর কাজ ওই সেতুটার মাঝ অবধি পৌঁছে দেওয়া। তার বেশি নয়। বাকি পথটুকু, পাঠক বা দর্শক যাই বলুন, তাঁকে নিজে হেঁটে যেতে হয়। 

হ্যাঁ, আমার ওই বাকি পথটুকুর বিষয়ে খুব কৌতূহল হয়। ওই একক পদচারণাটুকু দেখতে ইচ্ছে করে।
ঠিক সেই জন্যেই ছবির শিরোনাম দেওয়া আমি একদম সমর্থন করি না। দিতে হয়, এগজিবিশনের সময়ে, বাধ্য হয়ে। কারণ যাঁরা প্রদর্শনী করেন, তাঁরা চান সব ছবির টাইটেল থাকুক। কিন্তু আসলে সব ছবিই ‘আনটাইটেলড’ হওয়া উচিত। গৌতম তো কখনও কোনও ছবির নাম দিত না। আমি তবু দিয়েছি, কিছু কিছু। ছবিতে কেবল মাপজোক লেখা থাকবে, সময়কাল আর মাধ্যম। আর যা লেখার তা তো ছবির মধ্যেই লেখা রয়েছে। সেখান থেকেই পড়ে নিতে হবে। দর্শককে আমি এতটা হাত ধরে হাঁটাতে চাই না। না-হলে তার ভাবনার স্বাধীনতাটাকে অসম্মান করা হয়। নাম দিলেই দর্শক ওই পথেই হাঁটতে চাইবেন। সম্ভাব্য সমস্ত ইমাজিনেশনের পথগুলো তখন বন্ধ হয়ে যাবে।

কিন্তু কোনও কোনও ছবির তো একটা ঐতিহাসিক গুরুত্বও থাকে। সেক্ষেত্রে শিরোনাম না-থাকাটা সেই ইতিহাসটাকে গৌণ করে দিতে পারে। ধরুন, আপনার আঁকা ‘নির্ভয়া’ ছবিটা, আলাদা করে শিরোনাম না-দেওয়া থাকলে তো ছবিটার প্রেক্ষিত বোঝা সম্ভব না? 

সেটা হয়তো আংশিকভাবে সত্যি। অন্যভাবে দেখলে ‘নির্ভয়া’ তো একজন ব্যক্তি নয়। একটা ঘটনা হয়তো আমাকে দিয়ে ছবিটা আঁকিয়ে নিয়েছে। কিন্তু এই অত্যাচারটা তো এক নয়, বহু, স্থান-কাল নির্বিশেষে মেয়েদের ওপর এই অত্যাচার চলে আসছে। ‘নির্ভয়া’ সেই চিরাচরিত অত্যাচারিতের ছবি। নাম দিয়ে দাগিয়ে দিলে ছবিটার এই চিরকালীনতাটা কিন্তু সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

নির্ভয়া, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২০

এ ছবিখানায়, যে ধরনের সবুজ আপনি ব্যবহার করেন, তার চেয়ে অনেক পাংশু, অনেক বেরং একটা সবুজ দিয়ে ঘাসজমি এঁকেছিলেন আপনি, মেয়েটিকে যেখানে শোয়ানো রয়েছে…

হ্যাঁ।
[দীর্ঘশ্বাস]
কী ভয়ংকর পাশবিক মৃত্যু না! সহ্য করা যায় না।
[দীর্ঘশ্বাস]

‘ফুলগুলো সরিয়ে নাও আমার লাগছে’
[নীরবতা]
এই মালার জায়গাটায়, জানো, চুন, মার্বেল ডাস্ট এইসব দিয়ে একটু উঁচু করে করেছিলাম। যাতে একটা রাফ টেক্সচার তৈরি হয়।
[নীরবতা]

‘ম্যান হ্যাজ ডিস্যাক্রালাইজড নেচার’। জন রাসকিনের কথা। আপনার ছবি, ক্রমশ এই ‘ডিস্যাক্রালাইজেশন’-এর বিরুদ্ধ একটা স্বর, একটা উচ্চারণ হয়ে উঠেছে। না হলে কি ‘নির্ভয়া’ ছবিটা এভাবে আঁকতেন? 

আসলে আমরা তো মানুষ হয়ে জন্ম নিয়ে বড় হয়ে উঠি। সমাজের মধ্যে একজন মানুষ যেমন, সংসারের মধ্যে একজন মানুষ যেমন, তেমন প্রকৃতির মধ্যেও একজন মানুষ। মানুষ হয়ে ওঠার পথে আমাদের মনটা যদি উন্মুক্ত থাকে… প্রবণতা অনুযায়ী মানুষে মানুষে তফাত হলেও, ভালোবাসতে পারাটা তো মানুষের মধ্যেকার একটা স্বাভাবিক গুণ। ফুল, গাছপালা, পাখি, পশু আমরা সবাই ভালোবাসি। ভালোবাসার প্রকাশ হয়তো এক মানুষ থেকে অন্য মানুষে বদলে যায়। কিন্তু ভালোবাসার বোধটা সকলেরই থাকে। কুঁড়ির মতো। সুপ্ত অবস্থায়। তাতে জল সিঞ্চন করতে হয়। আমরা তো রবীন্দ্রনাথকে ভালোবেসে পড়ি না। যদি ছোট থেকে পড়তাম সেই বোধটা অনেক বিকশিত হত। যে মানুষ মন থেকে রবীন্দ্রসাহিত্য পড়েছে, আমি বিশ্বাস করি, সে কখনও সচেতনভাবে প্রকৃতি ধ্বংস করতে পারবে না। একটা বিরোধের জায়গা তৈরি হবেই। আমার আগামী প্রজন্মকে কি আমি এরকম একটা ছেঁড়াখোঁড়া খোবলানো পৃথিবী দিয়ে যাব? একবার কি ভেবে দেখব না, কী দিয়ে যাচ্ছি আমি? একটা প্যালেস্তাইন? মৃত, অর্ধমৃত, অঙ্গহীন, মৃতপ্রত্যয় শিশুদের একটা ধ্বংসস্তূপ? আমি তো সমসময়ের মানুষ। আই থিংক দেয়ারফোর আই অ্যাম। যা কিছু ঘটছে তা আমার ভেতরে একটা আন্দোলন তৈরি করছে। সেটার প্রকাশ আমার ছবিতে থাকবেই।

নতুন ছবি। অপ্রকাশিত ছবি। যা আঁকছেন আজকাল।

এই এথিকাল ডিসকমফর্টটাই তো একটা প্রতিবাদ জেনারেট করে…

সত্যি বলতে, প্রতিবাদ কতটা আছে আমি জানি না, থাকলেও তা অনেকাংশেই চিৎকৃত নয়, খুব সাইলেন্ট। কিন্তু বিষাদ আছে। আমি জানি আমার হাতে কোনও ক্ষমতাই নেই। এই মৃত্যুযজ্ঞ থেকে পৃথিবীকে বাঁচানোর কোনও মন্ত্র আমি জানি না। অথচ এই খবরগুলো যখন শুনি, নিয়তির মতো, গ্রাস করে আমাকে।

পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার ভয় হয়?

ভয় হবে না? খুব ভয় হয়। কিছু মানুষের লোভ যেভাবে পৃথিবীকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে! ব্রাজিলের আমাজন অরণ্য, পৃথিবীর ফুসফুস যাকে বলা হয়, সেই অরণ্যে হাত বসিয়েছে ভাবতে পারো! কত অরণ্যবাসী প্রাণী, মানুষ, তাদের জীবন বিপর্যয় করে পেট্রোলিয়াম তোলা হচ্ছে গাড়ি চালানোর জন্য। সেটা না কি বেশি দরকার! আমি ভাবতে পারি না। কোনও মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষই ভাবতে পারবে না। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার কত রেইন ফরেস্ট এইভাবে ধ্বংস হচ্ছে। সমুদ্রের জলস্তর বেড়ে চলেছে। যেভাবে বিভিন্ন স্থলদেশ সমুদ্রের নিচে চলে যাচ্ছে। সভ্যতা যদি সভ্যতার ধ্বংস ডেকে আনে তাকে কি সভ্যতা বলা চলে?
বরং এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাকে খুব ইন্সপায়ার করেন রাজস্থানের হিম্মতরাম, ভুবনেশ ওঝারা। ক্রমাগত ডেজার্টিফিকেশনের বিরুদ্ধে তাঁরা যেভাবে গাছ লাগিয়ে চলেছেন। অরণ্য তৈরি করে চলেছেন। জলের ক্রাইসিস মেটাবার চেষ্টা করে চলেছেন। এই ধরনের মানুষেরাই আমার মনকে, আমার ছবিকে সবচেয়ে বেশি উদ্বুদ্ধ করে।

অ্যান ইমেজ ইন স্টোন, হ্যান্ডমেড পেপারে প্রাকৃতিক রঙে আঁকা, ২০২৩

আপনার একটা সিরিজ আমার খুব অন্যরকম লাগে। আপনার ছবির যে চলন, তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ‘বিস্টি গেমস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ’। ন্যান্সি লিখেছিলেন, ‘বাউন্ডারি বিটুইন মাদার অ্যান্ড লাভার, উইমেন অ্যান্ড বিস্টস ইজ অ্যাট বেস্ট ফ্লুইড অ্যান্ড রিজেনারেটিভ’। মেয়েদের যৌনতা, মাতৃত্ব– তার এত সাহসী, প্রত্যয়ী উপস্থাপন…

এ ছবিগুলো অনেকদিন আগের আঁকা। ২০০৮ নাগাদ। তখন আমার বয়েস পাঁচের ঘরে। আসলে এ ছবিগুলো মানব-মানবীর সম্পর্কের গুহ্য দিকটা নিয়ে। ভালোবাসার শারীরিক প্রকাশ। সেখানে তো জোর থাকে, জবরদস্তি থাকে। ভালোবাসা, শারীরিক ভালোবাসা– রক্তাক্তও করে। কালিদাস যেমন নখক্ষতকে পলাশ ফুলের সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছিলেন। প্রণয়ের সেই ঘনিষ্ঠতম মুহূর্তে পুরুষ কখনও কাক, কখনও বাঘ, কখনও বা সাপ হয়ে ওঠে। তার ভেতরের পশুসত্তাগুলো বেরিয়ে আসে।
এ ছবিটায়, দেখো একটা কাক, মেয়েটার মাথা ঠুকরে একেবারে রক্তাক্ত করে দিচ্ছে। ভালোবাসাই তো জানাচ্ছে, কিন্তু সেই ফুলের আঘাতে মানবীর দেহ থেকে রক্ত ঝরছে। আবার আরেকটা ছবিতে, দেখো, মেয়েটি বাঘের মতো একটা পশুর উপরে চেপে বসেছে। এই যে চেপে ধরা, পীড়ন, এ-ও তো কামপ্রবৃত্তি। আবার এই পীড়িতক কামের মধ্যে নারী অবচেতনের একটা সাপ্রেশনও বেরিয়ে আসছে। সেই মেয়েটিই আবার আরেকটি ছবিতে বাঘকে স্তনদুগ্ধ পান করাচ্ছে। এ হল স্নেহ। বাৎসল্য।

বিস্টি গেমস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ ১২ (বাম) ও ২ (ডান), প্রাকৃতিক রং, ২০০৯

মানুষের ভেতরে পশু-প্রবৃত্তি তো থাকেই। এমনকী অবচেতনেও, আমরা পশুকাম লালন করি। সাপ দেখলে ভয় পাই, আবার সাপের অন্তর্গূঢ় লীলাভাবটুকুও সাবকনশাসে ধরে রাখি। বিভিন্ন পশুপাখির সঙ্গে মানুষের যৌন সম্পর্কের বহু প্রাচীন ইতিহাস আমাদের দেশে রয়েছে কিন্তু। বেস্টিয়ালিটি যাকে বলে। কেন জানি না মনে হয়, এ ছবিগুলো আমার খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ সময়টাও। এখন এখান থেকে অনেকটা সরে এসেছি। কিন্তু এই কাজগুলো একেবারে টপ নচ কাজ।

বিস্টি গেমস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ ৯ (বাম) ও ৮ (ডান), প্রাকৃতিক রং, ২০০৯

এই সিরিজের মধ্যেই প্রসবের একটা ছবি রয়েছে। এত স্ট্রাইকিং! এই ছবিটা দেখলে আমি বারবার বীণা দাশের গল্পে ফিরে যাই। একটা ডেডবডি, যার পেট থেকে বেরিয়ে আসছে একটা দলা-পাকানো এমব্রায়ো, আর একটা ধুতরো বীজের মণ্ড। একটা জন্ম, আর একটা মৃত্যু। একটা অমৃত, আর একটা গরল। আমার কাছে এই ইমেজারিটা তৈরি হয়।

এ ছবিগুলো একটা অদ্ভুত সময়ের ফসল। আসলে আমাদের বেঁচে থাকা, আমাদের যাপনের মধ্যে এটাও তো একখানা অংশ। তখন যে জগতটায় বেঁচে ছিলাম, মনে হয়েছিল, সেই জগতটা অসম্ভব জান্তব। জন্মের মতো সুন্দর, অপূর্ব অভিজ্ঞতা, মাতৃত্বের মতো ওমকেও মনে হয়েছিল পাশবিক।
আমি মেঘালয়ে গিয়েছিলাম, কংথং বলে একটা জায়গায়। সেখানে একটা গ্রামে, বেশিরভাগই খ্রিস্টান তারা, অদ্ভুত একটা রীতি রয়েছে। সেটা হচ্ছে, গ্রামের কোনও মেয়ে যখন জন্ম দেয়, তীব্র যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যখন তার সন্তান জন্মায়, মা যখন তার মুখখানা দেখে– প্রথম যে সুরটা তার মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়, সেটাই সদ্যোজাত শিশুটির নাম দেওয়া হয়। ফলে অনেকের মায়ের দেওয়া নামই একরকম শুনতে লাগে। ওরা কিন্তু শুনলে বুঝতে পারে, কোনটা কার নাম। কী সুন্দর মাতৃতান্ত্রিক একটা রীতি না?

বিস্টি গেমস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ ১০, প্রাকৃতিক রং, ২০০৯

চমৎকার!
আচ্ছা ‘লজ্জাগৌরী’ ছবিটা কি এই সিরিজেরই?

হরপ্পার মাদার গডেস তো? হ্যাঁ। এই সিরিজেই এঁকেছিলাম।

এ প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হচ্ছে, মাইথোলজি কিংবা ফোকলোর আপনার ছবিকে কতটা প্রভাবিত করে?

ফোকলোর বেশি করে। লোককথা, রূপকথা। আমাদের লোকসাহিত্যে তো গাছপালা, পশুপাখি একাকার। ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, সাত ভাই চম্পা তো আমাদের সাহিত্যেই ছিল। আবার মাইথোলজি যদি বলো, কালী কিংবা পূতনার ছবি আমি এঁকেছি। শালভঞ্জিকা যক্ষীর ছবি এঁকেছি।
ছোটবেলা থেকেই রূপকথার প্রতি আমার একটা আকর্ষণ ছিল। একবার ছোটবেলায় মায়ের ডাক্তার-মামা আর মামি বেড়াতে এসেছিলেন। আমরা দুই বোন সারাক্ষণ দিদার সঙ্গে থাকতাম। দিদা ন্যাকড়া দিয়ে পুতুল বানিয়ে দিতেন। সুর করে শোনাতেন রামায়ণের গল্প। সিন্ধুবধ, দশরথের পুত্রলাভ, হরধনু ভঙ্গ, রামসীতার বিয়ে, বনবাস, সোনার হরিণের গল্প, রাবণের সীতা অপহরণ, জটায়ু কত কী! চোখের পলকে সামান্য ন্যাকড়ার পুতুল হয়ে যেত রাম-লক্ষণ-সীতা। আমরা মগ্ন হয়ে শুনতাম।
সরাসরি না এলেও, এই স্মৃতিগুলো ছবিতে কখনও কখনও এসে পড়েছে। আসলে ছবির মধ্যে যখন ডুবতে থাকি, আমার এতদিনের যা কিছু পড়া, শোনা, যা কিছু সঞ্চয়, ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে। আমি নিজেও মাঝে মাঝে অবাক হয়ে যাই। ভাবি, এরকম দাঁতমুখ-খিঁচনো একটা গাছ কী করে আমি আঁকলাম! কিন্তু এঁকেছি। গাছের ভেতরে কিংবা ফুলের কোমলতার ভেতরেও তো দাঁতনখ আছে, হিংস্রতা আছে। দেখেছি। সেটাই চলে এসেছে। তবে এই আসাগুলো, দেখাগুলো যতদিন রয়েছে, মনে হয় বেঁচে আছি। এভাবে দেখতে ভুলে গেলে, তখন বুঝতে হবে আমার কল্পনা মৃত। আমি মৃত। আর কিছু নেই।

বিস্টি গেমস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ ৫ (লজ্জাগৌরী), প্রাকৃতিক রং, ২০০৯

এখন নিয়মিত ছবি, এগজিবিশন দেখেন? কনটেম্পোরারি কাদের কাজ ভালো লাগে?

নিয়মিত এগজিবিশন কমই দেখা হয় এখন। বয়সের জন্য ততটা দৌড়ঝাঁপ করতে পারি না আর। একসময় খুব এগজিবিশন দেখতাম। একবার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে পরিতোষ সেনের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আরেকবার, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে, শান্তিনিকেতনের প্রশান্ত রায়ের ছবি দেখে। সোমনাথ  হোর, রেবা হোর, যোগেন চৌধুরী, মীরা মুখোপাধ্যায়। বিকাশদা। কাকে বাদ দিই বলো? গণেশ পাইনকে ভালোবাসি না? গৌতম নিজে আমার খুব প্রিয় শিল্পী। আরও অনেক নাম আছে, যাঁদের ছবি দেখার জন্য আমরা উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকতাম সারা বছর।
এখন যাঁরা ছবি আঁকেন, বেশিরভাগই খুব স্কিলফুল, দক্ষ শিল্পী। কিন্তু ছবি, যা ধাক্কা দেয়, মানিদা কিংবা রবীন্দ্রনাথের ছবি যেমন, তেমন ছবি হয়ে ওঠে কি? তাছাড়া একঘেয়ে কাজ আমার ভালো লাগে না। তার মধ্যে জীবনের ছাপ খুঁজে পাই না। বরং যাঁরা বারবার পথ বদলে, নতুন নতুন মাধ্যম এক্সপ্লোর করতে ভালোবাসেন– তাঁদের কাজ আমার বেশি পছন্দের। সম্প্রতি অলকানন্দার এগজিবিশন হয়ে গেল। চমৎকার কাজ করে অলকানন্দা। আমার খুব ভালো লাগে। কনটেম্পোরারি কি না জানি না, তবে অরিন্দম চ্যাটার্জি, শ্রীকান্ত পাল, পার্থ দাশগুপ্ত, কার্তিক পাইন, পার্থপ্রতিম দেব– এঁদের কাজ আমার খুবই ভালো লাগে। খুব অল্পবয়সে চলে গেছেন সুরঞ্জন দাস, পিনাকী বড়ুয়া। এঁদের এগজিবিশন হলে আবার দেখতে যাব।
প্রদর্শনী বিষয়টা এখন এত ব্যবসাকেন্দ্রিক। কিন্তু ন্যান্সি ব্যতিক্রমী। ও যে এগজিবিশনটা কিউরেট করেছিল, ওর দৃষ্টিভঙ্গি, কীভাবে ও একজন শিল্পীর ছবি দেখাচ্ছে, একজন শিল্পীকে দেখাচ্ছে– সেটা এত ভালো, এত আলাদা অন্যদের থেকে!

‘দ্য ডার্ক এজ অফ গ্রিন’-এর কিউরেটর ন্যান্সি আদাজানিয়া এবং অরুণিমা চৌধুরী

এবং ন্যান্সির নিজের দেখাটাও খুব অন্যরকম। রেট্রোস্পেকটিভে ওঁর কিউরেটরস নোটটা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়েছি। এত ইনসাইটফুল! এবং সাজানোটাও। বড় গ্যালারির মাঝখানে একখানা ছ’-কোনা গর্ভগৃহের মতো ‘মড়া-কাটা-ঘর’-এর কনসেপ্টটা আমার অসাধারণ লেগেছিল। এবং তার গায়ে লাগানো ‘বিস্টি গেমস’-এর ছবিগুলো…

ওই ছবিগুলো একটাও বিক্রি হয়নি, জানো! সেজন্য দুঃখ হয়।
[দীর্ঘশ্বাস]

কিন্তু এ দুঃখটাকে কি আপনি ‘দুঃখ’ হিসেবে ধরেন? শিল্পীর তো আরও বৃহত্তর দুঃখ থাকে। প্রণবেন্দুর একটা কবিতা ছিল–
‘দুঃখ আরো বড় হলে
তাকে নিয়ে ঘর করা যায়।
কিন্তু এইসব ছোট ছোট যন্ত্রণার ছুঁচ
শুধুই বিরক্ত করে, তার বেশি নয়…’

হ্যাঁ, ঠিকই। এইসব দুঃখকে উদাসীন পদাঘাত করতে পারলে শান্তি পাওয়া যায়। কত রকমের দুঃখ থাকে। একটা কাজের মধ্যেকার যে টানাপোড়েন, তার দুঃখ। শিল্পের দক্ষতাগত জায়গাটা নিয়ে দুঃখ। মূল্যায়ন নিয়ে দুঃখ। এটা অবশ্য গৌতমের একদম ছিল না। ও খুবই স্ট্রং। কোনও কম্প্রোমাইজ করত না। বৃহত্তর দুঃখের কথা বললে, একটা দুঃখ হয় পৃথিবীটা বেহাত হয়ে যাওয়ার দুঃখ। এই যে ছবিটায় দেখবে আমার নাতনির সঙ্গে একটা কথোপকথন রয়েছে:
–কী করছ তুমি দিদুন?
–আমি কাপড়ে তালি দিচ্ছি সোনা।
–তোমার নতুন কাপড় নেই?
–না মণি, আমার একখানা কাপড়।

হোয়াট দ্য গ্রেট গ্র্যান্ডমাদার সেড (অংশ), ইকো প্রিন্ট ও মিক্সড মিডিয়া, ২০২২

তালি-দেওয়া কাপড়খানার নাম কি পৃথিবী, অরুণিমাদি?

তুমি কী করে জানলে!

[এ সাক্ষাৎকারের সঙ্গে ব্যবহৃত সমস্ত ছবি
ইমামি আয়োজিত প্রদর্শনীর ক্যাটালগ ও অরুণিমা চৌধুরীর সূত্রে প্রাপ্ত]