


সুন্দরবনে জীবনের এক বিশেষ চরিত্র আছে। মানুষ এখানে অর্থাভাবে ও খাদ্যাভাবে প্রায়শই জঙ্গল করতে যায়। মোম, মধু, মাছ, কাঁকড়া, কাঠ সংগ্রহ করে এনে বাজারে বিক্রি করে। অনেকেই বেশিরভাগ সময়ই ফরেস্ট অফিসের অনুমতি ছাড়াই জঙ্গলে যান। পাছে অফিসে গেলে যদি অনুমতি না-পাওয়া যায়; তাও অনুমতি ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করলে হয়তো পুলিশ তাদের ওপরে বেশি নজর রাখবে, অনুমতি বের করতেই হয়তো অনেক টাকা লাগবে। অতএব, যারা অনুমতি ছাড়া জঙ্গলে যান, তাঁদের দলের মধ্যে কেউ জঙ্গল করার সময় বাঘের মুখে পড়লে, দলের বাকি লোকেরা গ্রামে ফিরে এসে পুলিশকে জানান না।
কলকাতাকে বাঁচিয়ে রেখেছে সুন্দরবন। ঝড়, জল, ঝাপটা সব থেকে। কলকাতার বহু মানুষ, জীবনে একবার হলেও সুন্দরবন গিয়েছেন। প্রকৃতির টানে। জঙ্গল, বাঘ, কুমির, মাছ, ম্যানগ্রোভ দেখতে। পশুপাখি, গাছপালা দেখার উদ্যমে; বারবার ঢাকা পড়েছে সুন্দরবনের মানুষকে চেনার ও বোঝার ইচ্ছে। সেই কারণেই মানুষের বোঝা হয়ে ওঠেনি, সুন্দরবনে সময় কীরকম তার অস্থির ভূদৃশ্যের মতো স্তরায়িত, সরলরৈখিক নয়। নদীর চাপে সুন্দরবনের জমি ভাঙাগড়ার খেলায় জর্জরিত। জল তার ইচ্ছেমতো জমি খাচ্ছে, সেই জলই আবার পলি এনে অবশিষ্ট জমিতে এসে স্তরের পর স্তর জমা করে নতুন জমি গড়ছে।
যদিও আমার সে ইচ্ছেতে ছোটবেলা থেকে এক ফোঁটা ত্রুটি ঘটেনি। কলকাতা থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের দুলকি গ্রাম। গদখালি থেকে একটি নৌকা করে প্রথমে পৌঁছতে হয় আশ্রমঘাট, গোসাবা ব্লক। সেখান থেকে একটি ভ্যানে চেপে দুলকি। এখন দুলকি অনেক পালটে গিয়েছে। ২০১৪ সালে সেখানে পেল্লায় দামি হোটেল ছিল না। ছোট ক’টা রিসর্ট ছিল, কিন্তু বেশিরভাগটাই গ্রাম। সে-গ্রামের প্রত্যেকটি বাড়িতেই একই দুর্ভাগ্য। জঙ্গল করার সময় কোনও এক মর্মান্তিক দিনে, তাদের কারও ছেলে, কারও স্বামী, কারও বাবা কিংবা ভাই বাঘের মুখে পড়েছে। বাঘ তাদের জঙ্গলে টেনে নিয়ে গিয়েছে। কিছু মৃতদেহ ফেরত আনা গিয়েছে, অনেক বেশি খুঁজেই পাওয়া যায়নি। যে পুরুষ মানুষরা বাঘের হাতে প্রাণ হারান, তাদের স্ত্রীদের স্থানীয়রা ‘বাঘবিধবা’ বলে চিহ্নিত করে। এই বিধবাদের জীবন বিশেষ সুন্দর নয়। প্রায়শই সমাজের খোঁটা শুনতে হয়।

২০১৪ সালের গোড়ার দিকে, আমি এই গ্রামের কিছু বাঘবিধবাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। বিধবাদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে সময় এবং কালানুক্রমের এক অনন্য ধারণা প্রকাশ পায়। রুকমাদি আমার সমস্ত প্রশ্নের উত্তর একভাবে দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর জীবনের সময়রেখা তাঁর নিজস্ব উপায়ে সাজিয়েছিলেন। তাঁর স্বামীর মৃত্যুর দিনটিকে কেন্দ্রবিন্দু করে সময়কে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছিলেন। তিনি সময়ের রৈখিকতা অনুসরণ করতে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনার সময় উল্লেখ করতে গেলেই, তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর দিনটিকে উল্লেখ করে তা করতেন। রুকমাদি তাঁর স্বামীর মৃত্যুর আগের বছরগুলিতে এবং তার পরবর্তী বছরগুলিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি এইভাবে বর্ণনা করেছিলেন:
‘যেদিন আমার স্বামী বাঘের মুখে পড়ল, তার চারমাস আগে আমার মেয়ে ইশকুল যাওয়া শুরু করেছে।’
‘যেদিন আমার স্বামী বাঘের মুখে পড়ল, তার সাত বছর আগে আমাদের বিয়ে হয়। আমার মামা ওর সম্বন্ধ আনে।’
‘যেদিন আমার স্বামী বাঘের মুখে পড়ল, তার একমাস পরেই এই যেখানে আপনি উঠেছেন, সেই জায়গার কাজ শুরু হয়।’

রুকমাদির স্বামী ২০০৯ সালে, আয়লার বছর মারা যান। দিদির কাছে ২০০৯ ‘যে বছর আমার স্বামী মারা গেল’ হিসেবে স্মরণীয়। সুন্দরবনের অন্য মানুষরা ২০০৯-কে ‘যেবার আয়লা হয়েছিল’ বলে মনে রেখেছে। আয়লা ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষয়ক্ষতিও ভোলার মতো নয়। সুন্দরবনে জীবনের এক বিশেষ চরিত্র আছে। মানুষ এখানে অর্থাভাবে ও খাদ্যাভাবে প্রায়শই জঙ্গল করতে যায়। মোম, মধু, মাছ, কাঁকড়া, কাঠ সংগ্রহ করে এনে বাজারে বিক্রি করে। অনেকেই বেশিরভাগ সময়ই ফরেস্ট অফিসের অনুমতি ছাড়াই জঙ্গলে যান। পাছে অফিসে গেলে যদি অনুমতি না-পাওয়া যায়; তাও অনুমতি ছাড়া যাওয়ার চেষ্টা করলে হয়তো পুলিশ তাদের ওপরে বেশি নজর রাখবে, অনুমতি বের করতেই হয়তো অনেক টাকা লাগবে। অতএব, যারা অনুমতি ছাড়া জঙ্গলে যান, তাঁদের দলের মধ্যে কেউ জঙ্গল করার সময় বাঘের মুখে পড়লে, দলের বাকি লোকেরা গ্রামে ফিরে এসে পুলিশকে জানান না। এই ক্ষেত্রে, যদি তাঁরা পারেন, বন্ধুর দেহ উদ্ধার করেন। না-হলে ভয়ভীতি হয়ে সেই দেহ উদ্ধারের কাজে কেউ হামলার স্থানে আর ফেরত যেতে চান না। পুলিশকে জানালে যে পুলিশও সবসময় দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়, তা নয়। বাঘে জঙ্গলে দেহ টেনে নিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে অনেক দিন ধরে সেই দেহ খায়। মরদেহের গন্ধে আশপাশের অন্য বাঘও এসে জুড়ে বসে। এইসব কারণবশত দেহ উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। বেশিরভাগ সময় বোঝাই যায় না যে, বাঘ দেহ কোথায় টেনে নিয়ে গিয়েছে!

রুকমাদির সময় ও কালক্রমের ধারণা আমাদের সময়ের রৈখিকতা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। আধুনিক সমাজ সময়কে একমুখী সরলরেখা হিসেবে কল্পনা করে। আমরা সব ঘটনাকেই তারিখ অনুযায়ী সাজাই। এই ধারণা এতটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয় যে, কেউ সময়ের রৈখিকতাকে প্রশ্নই করে না। আধুনিক ঘড়ি, ক্যালেন্ডার, প্রশাসনিক রেকর্ড সবই এই কল্পনার ফল। এই কল্পনার ভিতরে, সবকিছু অতীত থেকে বর্তমান, বর্তমান থেকে ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর। ইতিহাসচর্চাতেও ঘটনাবলিকে ক্রমানুসারে সাজানো হয়। এভাবেই প্রগতি ও অবক্ষয়ের গপ্প বলা হয়। কিন্তু ঘটনাগুলিকে সময়ক্রমের নিয়মে সাজালেও তার অর্থ ব্যাখ্যা করা যায় না।

সময়ের ধারাবাহিকতায় কিছু সমস্যা আছে। এই ধারাবাহিকতা সময়কে ‘আদিম’, ‘প্রথাগত’, ‘আধুনিক’ বলে চিহ্নিত করে। এই ধারাবাহিকতা একটি ভিন্নতা তৈরি করে এবং এই ভিন্নতাই পশ্চাদপদতা হয়ে ওঠে। যারা শিল্পায়িত আধুনিকতার সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে পারে না, তাদের মনে করা হয় যে তারা পিছিয়ে পড়েছে। এই ক্ষেত্রে, সময়ের রৈখিকতা নৈতিক মাপকাঠি হয়ে ওঠে। এ-কারণেই, সময় হয়ে ওঠে রাজনৈতিক নির্মাণ। ক্ষমতা প্রদর্শনের অস্ত্র।

সময়কে মাপা যায়, সে বিভাজ্য, এবং মনে করা হয় সময় সবার জন্য একইভাবে প্রযোজ্য। যাতে করে মনে হয় সবাই একই বর্তমানের অংশ। তাও, সবাই একই সময়ে বাস করলেও সবাইকে একই স্তরের ভাবা যায় না। এই ক্ষেত্রে আদিম ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই মনে করে, আদিম মানে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন, কিন্তু তার আরেকটি মানে এটা যে, এক গোষ্ঠী যারা সময়ের দিক দিয়েও পিছিয়ে পড়েছে। তারা একই বর্তমানের অংশ, কিন্তু তারা বর্তমানেই বাস করছে না। এরকম গোষ্ঠীদের বর্তমানের জন্য তৈরি না-হওয়ার কারণে তাদের থেকে অনেক অধিকার কেড়ে নেওয়া সম্ভব। পিছিয়ে পড়ার কারণে তাদের নাগরিকত্ব, ভোটাধিকারের পরিপক্বতা নেই। এই পরিপক্বতা, একমাত্র বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেই, অর্জন করা সম্ভব। এই ভিন্নতা হয়ে দাঁড়ায় বিলম্বের কারণ। এবং এটি অসমতাকে স্বাভাবিক বলে স্থাপন করে।

কিন্তু মানুষের বাস্তব কি একরৈখিক? মানুষের সত্য অনেক অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি। যেমন আচার-অনুষ্ঠানের চক্রাকার সময়, কৃষিকাজের ঋতুচক্র, স্মৃতির সময়কাল, বিপ্লবের বা প্রশাসনিক সময়– সব একসঙ্গে একত্রিত হয়ে আমাদের বর্তমানকে তৈরি করে। বর্তমানের মধ্যে অতীতের স্তর লুকিয়ে থাকে। পুরনো আইন, কাঠামো, কল্পনা সবই নতুনের সঙ্গে সহাবস্থান করে। তাই সময় স্তরায়িত। তাকে সরলরেখা ধরা অসম্ভব। সময় শুধু ঘটনাকে সাজায় না, সময় মানুষকেও সাজায়। কাকে আমরা আধুনিক বলব, কাকে আদিম ও কাকে পরিপক্ব– সবই সময়ের ভাষায় পরিচয় পায়। যখন আমরা সময়ের রৈখিকতাকে প্রশ্ন করি, তখন ইতিহাস তার অনিবার্য গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হয় না; বরং সংঘর্ষ ও সহাবস্থানের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
অনেকেই রুকমাদির বক্তব্য শুনে ভেবেছিলেন, তিনি আটকে আছেন। এক পুরনো ঘটে যাওয়া ঘটনাকে মনে করে এগিয়ে যেতে পারছেন না। কিন্তু আদতে তিনি সময়ের রৈখিকতাকে প্রশ্ন করছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন সময়ও মানুষ গড়ে। এবং মানুষের গড়াভাঙার খেলায়, বহু সময়ের ঘটে যাওয়া বহু ঘটনা একটি স্মরণীয় ঘটনার প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। রুকমাদির মেয়ে ছোট্ট, সে সবে স্কুলে যাচ্ছে। তার বাবা মারা গিয়েছে, তার কী হবে? রুকমাদি তাঁর বরের ওপর নির্ভরশীল। তাঁর কী হবে? তাঁর বর মারা গেলেন, কারও মনেও নেই! সুন্দরবনে প্রগতি হচ্ছে। রিসর্ট বানানো হচ্ছে। কিন্তু তাঁর যা গেল, তা গেল। আর ফিরবে না! তাঁর জীবন ও অস্তিস্ত্ব একটি দুর্ঘটনার জন্যে পুরোটাই পালটে গেল।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved