Robbar

গানের জগতে নারী-পুরুষের সংজ্ঞা ভেঙে দিয়েছিলেন গাঙ্গুবাই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 12, 2026 7:41 pm
  • Updated:March 12, 2026 8:47 pm  
Gangubai Hangal and her iconic manly voice

শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে সব ঘরানাতেই নারীকন্ঠ যদি মিহি না হয়, তবে শ্রুতিমধুর মনে করা হয় না। কেশরবাই, মগুবাই, রসুলানবাই, হীরাবাই, এম.এস সুব্বুলক্ষ্মী, কিশোরী আমোনকার, গিরিজা দেবী, প্রভা আত্রে, সুনন্দা পট্টনায়ক, মালবিকা কানন, মালিনী রাজুরকর, অশ্বিনী বিড়ে দেশপাণ্ডে, শ্রুতি সাডোলিকর– সকল শিল্পীর কন্ঠস্বর মিহি। এর সঙ্গে লতা মঙ্গেশকার আর আশা ভোঁসলের ভুবনবিজয়ী কন্ঠস্বর সেই নারীকন্ঠ-মানেই-মিহি-মোলায়েম-কন্ঠস্বরের ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে প্রায় সর্বকালের জন্য। একমাত্র ব্যতিক্রম গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল।

ভাস্কর মজুমদার

দীর্ঘ ট্রেনপথ নয়, তাও সময় লাগছে, কারণ ট্রেন দেরিতে চলছে। আগের দিন রেকর্ডিং ছিল। সারা রাত তেমন ঘুম হয়নি। মেয়ে কৃষ্ণা, তবলিয়া ভদ্রলোক এবং আরও কিছু লটবহর নিয়ে ট্রেনযাত্রা তাই ক্লান্তিকর। কিন্তু উপায় নেই। নিজের গাড়ি তাঁর তখনও নেই যে আরাম করে আসা যাবে। ভিড়ে ঠাসা ট্রেনেই তাই ফিরছেন সুরগঙ্গা। হঠাৎ একটা ট্রানজিস্টর রেডিওতে তাঁর আগের দিন রেকর্ড করা গানটা বেজে উঠল। একই কম্পার্টমেন্টে থাকা একটি বাচ্চা মেয়ে, তিনি লক্ষ করলেন, মন দিয়ে সেই গান শুনছে। ছোট কেউ তাঁর গান শুনছে গভীর মনোযোগে, ব্যাপারটি তাঁকে আগ্রহী করে তোলে। তিনি মেয়েটিকে খানিকক্ষণ নিরীক্ষণ করে জানতে চান, ‘কেমন লাগছে?’ মেয়েটি সপ্রতিভ উত্তর দেয়, ‘খুব ভালো। এই ভদ্রলোকের গান আমি আগে শুনিনি!’

গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল (৫ মার্চ ১৯১৩ – ২১ জুলাই ২০০৯)

গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলের এমন অভিজ্ঞতা সেই প্রথম নয়। নিজের পুরুষালি কন্ঠস্বর নিয়ে তাঁকে সারা জীবন কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু সেই কন্ঠস্বরেই তিনি বিধৃত করেছেন কঠিন কঠিন সব রাগ-রাগিনী। পেশাদার জীবনের তুঙ্গে তাঁর মতো কেবল খেয়াল-গাওয়া শিল্পী এবং এত জনপ্রিয়তা, খুব কম মানুষের ভাগ্যে জুটেছে। তাঁর কন্ঠস্বর যে মিহি নয়, মিষ্টি নয় এবং তথাকথিত মেয়েদের মতনও নয়, এটা উপলব্ধি করেও তিনি কখনও পিছপা হননি শিল্পের অনলস চর্চায়। সব থেকে বড় কথা এই কন্ঠস্বর তাঁর জন্মপ্রদত্ত নয়। তিনি যখন কেরিয়ার শুরু করেন– কংগ্রেস পার্টির সভায় অনুষ্ঠান করছেন; দেশে শাস্ত্রীয় সংগীতের তৎকালীন পীঠস্থান কলকাতায় নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করতে আসছেন নানা সম্মেলনে এবং রাগসংগীতের পাশাপাশি ‘লাইট ক্লাসিক্যাল’ও গাইছেন; তখন তাঁর কন্ঠস্বর তো সরু এবং চড়া। দুর্ভাগ্যবশত, টনসিল অপারেশনের জেরে তাঁর কন্ঠস্বর অমন ধ্বস্ত ও ভারী হয়ে উঠল। এখন ভাবলে অবাক লাগে, যে-মেয়েটি সবে কেরিয়ার শুরু করছে; আর যেখানে দর্শক-শ্রোতার একটা দুর্বলতা আছে নারী-শিল্পীদের কন্ঠস্বর তথাকথিত ‘মেয়েলি’ হবে এই মর্মে, তার কন্ঠস্বর যদি এতটা পালটে যায় তবে এতটুকু ভেঙে না-পড়ে, নিজেকে বিন্দুমাত্র বাধাপ্রাপ্ত না মনে করে, সে শিল্পের একইরকম চর্চা কী করে চালিয়ে যেতে পারে? মনের কোন জোরে?

গাঙ্গুবাই এই আত্মবিশ্বাস পেয়েছিলেন সম্পূর্ণ তাঁর মা অম্বাবাই-এর শিক্ষায়। অম্বাবাই কর্ণাটকী শাস্ত্রের গায়িকা ছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন দেবদাসী ঐতিহ্যের নারী। তিনি নিজে যতটুকু কন্যা গাঙ্গুবাইকে শিখিয়েছিলেন সে-শিক্ষার জুড়ি মেলা ভার। এমনকী, বলা হয় গাঙ্গুবাই-এর প্রথম জীবনের গুরু কৃষ্ণামাচার্য হুলুগুরুর থেকেও উৎকৃষ্ট শিক্ষক ছিলেন অম্বাবাই। কিন্তু দেবদাসী ঐতিহ্যের নারী বলে মেয়ের সংগীতের গুরু হওয়া তাঁর পক্ষে তখনকার সমাজে সম্ভব ছিল না। দারিদ্র তাঁদের সংসারে সমার্থক ছিল, কিন্তু সেই যুগে কৃষ্ণামাচার্যকে অম্বাবাই বেতন দিতেন ১২০ টাকা! একবার তার মধ্যে ২০ টাকা দিতে পারেননি বলে শতবার পায়ে ধরলেও কৃষ্ণামাচার্য গাঙ্গুকে শেখাতে অস্বীকার করেন। কিরানা ঘরানার জনক আব্দুল করিম খাঁ সাহেবের অন্যতম শিষ্য সওয়াই গন্ধর্ব পরবর্তীকালে গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলের গুরু হলেও, গাঙ্গুবাই তাঁর কাছে নিয়মিত শিখতে পেরেছিলেন মাত্র তিন বছর; যখন তাঁদের হুবলি-ধারওয়াড় এলাকায় সওয়াই গন্ধর্ব নিজের অবসরকালীন জীবনযাপন করতে আসেন। কৃষ্ণামাচার্যের ছেড়ে দেওয়া এবং সওয়াই গন্ধর্বের ‘গাণ্ডাবন্ধ শিষ্য’ হওয়ার মাঝখানের সময়টা গাঙ্গুবাইকে তৈরি করেছিলেন অম্বাবাই। সুর একবার কানে নিয়ে নির্ভুল নোটেশন লেখার ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা ছিল অম্বাবাই-এর। সেই শিল্প পরবর্তীকালে গাঙ্গুবাই-এর সংগীতে সুপ্রযুক্ত হয়েছিল। সংগীতশিল্পী হিসেবে নিজে কখনও প্রতিষ্ঠিত হতে না পারলেও, মেয়েকে তৈরি করতে অম্বাবাই নিজের সমস্তটুকু উৎসর্গ করেছিলেন। গয়না বেচে কৃষ্ণামাচার্যের বেতন যেমন দিতেন, নিজের শেষ সম্বলের অর্থও সওয়াই গন্ধর্বকে গুরুদক্ষিণা হিসেবে দিয়েছিলেন যাতে গাঙ্গুবাই আরও ভালোমতো তৈরি হতে পারেন। তখনকার দিনে সওয়াই গন্ধর্বকে অম্বাবাই দক্ষিণায় দিয়েছিলেন ১০০১ টাকা!

আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারীদিবস প্রতি বছর ৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। আবিশ্বের নারীর এ জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে যেরকম হেনস্থা-হিংসার শিকার হতে হয়, আজও তা ভাবা যায় না। প্রতিটি নারীদিবসে আমরা পর্যালোচনা করি নানা স্তরের নারীদের নিয়ে। ইতিহাস যে কত শত নারীকে তার প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত করেছে, সেসবের খতিয়ান আমাদের চোখের সামনেই আছে। অম্বাবাই তীব্র আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে গাঙ্গুবাইকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু কন্ঠস্বরের ভারিক্কি চালের জন্য গাঙ্গুবাইকে সমালোচিত হতে হয়েছে। আজকের বিচারে সেই সমালোচনা আসলে এক প্রকার লিঙ্গবৈষম্য। নারীকন্ঠ মানেই স্বর হবে মিহি-মোলায়েম আর পুরুষকন্ঠ জলদগম্ভীর হতে হবে– এমন বৈষম্য অনেক শিল্পীকেই সহ্য করতে হয়েছে। এখনও তা চলে। শাস্ত্রীয় সংগীতের জগতে সব ঘরানাতেই নারীকন্ঠ যদি মিহি না হয়, তবে শ্রুতিমধুর মনে করা হয় না। কেশরবাই কেরকার, মগুবাই কুর্দিকর, রসুলানবাই, হীরাবাই বারোদেকর, এম.এস সুব্বুলক্ষ্মী, কিশোরী আমোনকার, গিরিজা দেবী, প্রভা আত্রে, সুনন্দা পট্টনায়ক, মালবিকা কানন, মালিনী রাজুরকর, অশ্বিনী বিড়ে দেশপাণ্ডে, শ্রুতি সাডোলিকর থেকে হালের কৌশিকী চক্রবর্তী– সকল শিল্পীর কন্ঠস্বর মিহি। এর সঙ্গে লতা মঙ্গেশকার আর আশা ভোঁসলের ভুবনবিজয়ী কন্ঠস্বর সেই নারীকন্ঠ-মানেই-মিহি-মোলায়েম-কন্ঠস্বরের ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে প্রায় সর্বকালের জন্য। একমাত্র ব্যতিক্রম গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল। পুরুষালি কন্ঠস্বরের পাশাপাশি শ্রোতা-দর্শককে বেঁধে ফেলার মতো আবেগপ্রবণ, মোহময়ী অথচ গভীর সুরসাধনা ছিল তাঁর। টেনিসে ভেনাস উইলিয়ামসের সার্ভকে যেমন পিট সাম্প্রাসরা সমীহ করে চলতেন, গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলের জোরদার কন্ঠস্বর ও অনবদ্য রাগবিস্তারকে শ্রদ্ধা জানাতেন তাঁর সমসাময়িক সমস্ত পুরুষ-শিল্পী, বিশেষত তাঁর গুরুভ্রাতা ভীমসেন যোশী। গানের জগতে নারী-পুরুষের সংজ্ঞা ভেঙে দিয়েছিলেন গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল। আইসক্রিম খাওয়ার সময় অনেকসময় মজা করে বলতেন যে, ঠান্ডা লাগলে তাঁর গলার কিছু হবে না কারণ তাঁর কন্ঠস্বরের যে বহু আগেই বারোটা বেজে বসে আছে! শুধু তাই নয়, গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল নিজের জীবনে প্রত্যক্ষভাবে জাতিভেদের শিকার হয়েছেন। এমন অনেক অনুষ্ঠান হয়েছে, হয়তো কোনও ধনী মানুষের বৈঠকখানায়, যেখানে তিনি প্রধান শিল্পী, সেখানে তাঁর খেয়াল গানে মানুষ বাহবা দিয়ে শেষ করতে পারেনি; কিন্তু অনুষ্ঠান শেষে তাঁকে খেতে দেওয়া হয়েছে দূরে কারণ তিনি অচ্ছুত! তিনি দেবদাসীর সন্তান! তাঁর ব্রাহ্মণ স্বামী গুরুরাও কুলগির ঘর তিনি কোনওদিন করতে পারেননি এই জাতপাতের কারণেই। উচ্চজাতের শ্বশুরবাড়িতে গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল কখনও গৃহীত হননি।

একটি শাস্ত্রীয় সংগীতের আসরে গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল

নারীবাদ পুরুষতন্ত্রের ধ্বংস দাবি করে। যে রাষ্ট্রক্ষমতা ও সামাজিক পরিকাঠামো নারী ও পুরুষের নগণ্য শারীরিক বিভাজনকে যোজন দূরত্বে পর্যবসিত করে, নারীকে দ্বিতীয় শ্রেণির মানুষ বানিয়ে রাখতে চায়– সেই রীতি তো নিপাত যাওয়াই দরকার। কিন্তু পুরুষতন্ত্র অনেক সময় নারীদের মধ্যে দিয়েও কাজ করতে পারে। নারীর সাফল্যে অন্তরায় হতে পারে অন্য একজন নারী। অম্বাবাই নিজের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলেন কন্যা গাঙ্গুবাই-এর প্রতিষ্ঠার স্বার্থে। কিন্তু মা হিসেবে গাঙ্গুবাই সেই পরিচয় দেননি। এটা ঠিক গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলের মতো এত বড় মাপের শিল্পীর শিল্প ছাড়া আর কোনও পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। কিন্তু তাঁর কন্যা কৃষ্ণাবাই হাঙ্গেল ছিলেন একজন অনন্য-সাধারণ শিল্পী। মা-মেয়ের যে-কোনও রেকর্ডিং দেখলে বা শুনলে উপলব্ধি করা যায় কৃষ্ণা কোন মানের শিল্পী ছিলেন। অপূর্ব ছিল তাঁর কন্ঠস্বর এবং বহু সমালোচকের মতে তাঁর রাগবিস্তার, তানকারির প্রকৌশল শিল্পের দিক থেকে অনেক সময় তাঁর মা গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলকেও ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু কোন অজানা কারণে কৃষ্ণা মায়ের অনুষ্ঠানে কন্ঠসহযোগ ছাড়া কোনওদিন তেমন একক অনুষ্ঠান করলেন না? কৃষ্ণা বিবাহ করেননি, তাঁর নিজের সংসার বলতে ছিল মায়ের সাহচর্য আর ভাইদের ছেলেমেয়েরা। গাঙ্গুবাই হাঙ্গেলের কিছু বছর আগে তিনি পরলোকগত হন। প্রদীপের তলায় অন্ধকার বাসা বাঁধে কখনও কখনও, কিন্তু শিল্পী কি এত আত্মনিমজ্জিত হতে পারেন যে তাঁর ভীষণরকম সম্ভাবনাময় উত্তর-প্রজন্মের জন্য তাঁর কোনও কর্তব্য থাকে না? গাঙ্গুবাই হাঙ্গেল লিঙ্গবৈষম্যের সঙ্গে লড়েছিলেন। তিনি জাতপাতজনিত ঘৃণার শিকার হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁর সংগীতের সাধনাকে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেননি। ভারতের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পীদের মধ্যে তিনি অন্যতম। কিন্তু অম্বাবাই নিজ কন্যার জন্য যা করেছিলেন গাঙ্গুবাই তা পারলেন না কেন?