Robbar

রুচির সঙ্গে মিলছে না, তাই ‘ছাপরি’?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 19, 2026 6:27 pm
  • Updated:March 19, 2026 6:31 pm  

১৮৭১ সালের ক্রিমিনাল ট্রাইবস্ অ্যাক্টের আওতায় ছাপরবন্দদের মতো বহু ঘূর্ণমান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আইনত ‘অপরাধী উপজাতি’ হিসেবে ঘোষণা করে, তাদের চলাচল, বসবাস ও পেশার ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি আরোপ করা হয়। এই আইনি শ্রেণিবিভাগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কলঙ্ক আরোপ তাদের সামাজিক মর্যাদা, জীবনযাপন এবং আত্মপরিচয়কে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। স্বাধীনতার পর এই জনগোষ্ঠীগুলো ‘ডিনোটিফায়েড’ হলেও ঔপনিবেশিক কলঙ্কের বংশানুক্রমিক বোঝা তাঁরা নামাতে পারেনি আজও। এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পেশাগত পরিচয়সূচক ‘ছাপরি’ শব্দটি উত্তরোত্তর সামাজিক তাচ্ছিল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। 

সৈয়দ তৌশিফ আহমেদ

ছাপরি শব্দটি কি কেবল ডিজিটাল ও সামাজিক পরিসরে অবলীলায় চলমান একখানা স্ল্যাংনা কি তা ক্লাসিসিজম-আক্রান্ত, এক অনড় সামাজিক মনোভঙ্গির জোরালো প্রকাশ?

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা ইউটিউবের মন্তব্যঘরে শব্দটির নির্বিকার ঘোরাফেরা দেখে প্রথম দৃষ্টিতে মনে হতে পারে– এটা নেহাতই কিছু অসমঞ্জস্য পোশাক, চুলের বেখাপ্পা ছাঁট এবং কিছু আচরণগত ভঙ্গি; অর্থাৎ রুচির সমালোচনা করতে গিয়ে ছুড়ে দেওয়া একটি মামুলি টিপ্পনী মাত্র। যদিও এই অপমানসূচক বিশেষণটি যে আদপে শ্রেণি-অহংকারের একটি স্পষ্ট নির্দেশক, তা নিয়ে মোটামুটি নিশ্চিত থাকা যায়। শব্দটির সামাজিক ও ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে ধরা পড়ে এর প্রেক্ষাপটে থাকা সুদীর্ঘ জাতিভেদ-ইতিহাস, শ্রেণিবৈষম্যের অভ্যাস এবং নব্য-উদারবাদী অর্থনীতির ফলে সৃষ্ট সাংস্কৃতিক সংঘাতের খতিয়ান।

আমাদের সামাজিক অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট, উচ্চবর্ণীয় শাসকবলয় নিম্নবর্ণের মানুষদের পদবি, কিংবা পেশাকে অতীতেও কিছুটা ইচ্ছাকৃতই গালাগালের মতো ব্যবহার করেছে। চামার, ভঙ্গিএই ধরনের শব্দ তার পরিচিত নমুনা। এখানে লক্ষণীয়, ‘চামার’ একটি জাতিবাচক বিশেষ্য হয়েও ব্যবহারে তা কিন্তু এখন নঞর্থক বিশেষণ, একটি জাতিগত সংকেতবাহী গালিগালাজ। ছাপরিও, কাঠামোগতভাবে, সেই একই জমির ফসল। ছাপরি শব্দটির শিকড় অনুসন্ধানে পাওয়া যাবে, এই ভারতীয় উপমহাদেশেরই একটি নির্দিষ্ট পেশাভিত্তিক জনগোষ্ঠীর নাম।

হিন্দি, মারাঠি ও কন্নড় ভাষায় ছাপর (অর্থাৎ, ছাদ বা ছাউনি) শব্দ থেকে গঠিত ছাপরবন্দ বা ছাপরবান্দ নামে এক জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক অস্তিত্বের কথা জানা যায়। এরা মূলত কাঁচা ঘরবাড়ির অস্থায়ী ছাউনি নির্মাণ ও মেরামতের পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। লোককথা ও কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, মোঘল যুগে (প্রায় ১৬৭৭-’৮৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে) পঞ্জাব অঞ্চল থেকে আগত এই জনগোষ্ঠীর একাংশ দক্ষিণ ভারতের ডেকান অঞ্চলে তাঁবু ও ঝুপড়ি নির্মাণের কাজে নিযুক্ত হয়। পরবর্তীকালে মারাঠা শাসন আমলে এবং বিশেষত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে, তাদের একটি বড় অংশ পেশাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়। এই সময়ে ছাপনাঅর্থাৎ, নকল মুদ্রা তৈরির মতো ঝুঁকিপূর্ণ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাদের নাম জড়িয়ে পড়ে। পরিণতিতে ইংরেজরা ছাপরবন্দদের ওপর জন্মগত অপরাধী তকমা আরোপ করে।

১৮৭১ সালের ক্রিমিনাল ট্রাইবস্ অ্যাক্টের আওতায় ছাপরবন্দদের মতো বহু ঘূর্ণমান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আইনত অপরাধী উপজাতি হিসেবে ঘোষণা করে, তাদের চলাচল, বসবাস ও পেশার ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি আরোপ করা হয়। এই আইনি শ্রেণিবিভাগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কলঙ্ক আরোপ তাদের সামাজিক মর্যাদা, জীবনযাপন এবং আত্মপরিচয়কে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করেছিল। স্বাধীনতার পর এই জনগোষ্ঠীগুলো ডিনোটিফায়েড হলেও ঔপনিবেশিক কলঙ্কের বংশানুক্রমিক বোঝা তাঁরা নামাতে পারেনি আজও। এই দীর্ঘ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে পেশাগত পরিচয়সূচক ছাপরি শব্দটি উত্তরোত্তর সামাজিক তাচ্ছিল্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। 

এ তো গেল ইতিহাস। তাহলে এই মুহূর্তের সামাজিক প্রেক্ষিতে ছাপরি কে?

ছাপরি হল সেই তরুণ বা তরুণী, যে উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্তের প্রতিষ্ঠিত রুচির নির্ধারিত মানদণ্ডে নিজেকে বাঁধতে অনাগ্রহী। যার পোশাক উজ্জ্বল, উচ্চারণে ব্যাকরণসুলভ রীতিনীতির অভাব, আর আচরণ জুড়ে একধরনের বেপরোয়া অতিরঞ্জন। কাজেই ছাপরি নামক এই বিশেষণের প্রয়োগ আদতে নিম্নরুচির সিলমোহর। কিন্তু কোন রুচি গ্রহণযোগ্য বা উচ্চ, আর কোনটাই বা নিম্নএই মানদণ্ড কে স্থির করবে?

ভাবার বিষয় হল, অকুণ্ঠ চিত্তে এই যে আমরা এত ঘনঘন ছাপরি উচ্চারণ করছি, তা ঠিক কী নির্ণয় করে? আচরণ, রুচি না কি অবস্থান? কারণ, ছাপরি বলামাত্রই এক অমোঘ অনিবার্যতায় মগজ জুড়ে শ্রেণিবিভাজন বলবৎ হয়। তখন এই শব্দটি কি আর নিছক বিশেষণ, না কি তা শ্রেণি-ঘৃণারই সংক্ষিপ্ত, সামাজিক অনুমোদন? মূলত কারওর অবস্থানগত উচ্চতা, সীমা ও গণ্ডি সংক্রান্ত একটা হুঁশিয়ারি।

আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে রুচিকে রাজনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে ভাবার চর্চা নেই। অথচ রুচি ব্যাপারটা অত্যন্ত আপেক্ষিক। কোনও নিরপেক্ষ মানদণ্ডে এর পরিমাপ অসম্ভব। রুচি গড়ে ওঠে পরিস্থিতি, সুযোগ, শিক্ষা, ভাষা, সময়, শ্রেণি, ভৌগোলিক অবস্থান, পারিবারিক অভ্যাস, অর্থনৈতিক অবস্থানের মতো অজস্র নির্ণায়কের সম্মিলিত মিথস্ক্রিয়ায়। কাজেই উন্নত রুচি প্রমাণযোগ্য নয়। আর খাতায়-কলমে যার প্রমাণ নেই, সেখানে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি নৈতিকভাবে দুর্বল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিচারে সন্দেহজনক। এক পরিসরে যা পরিশীলিত হিসেবে স্বীকৃত, অন্য পরিসরে ঠিক সেটাই হাস্যকর বলে পর্যবসিত। এই পরিবর্তনশীলতাই বুঝিয়ে দেয়, রুচি সামাজিকভাবে নির্মিত এক বিচারব্যবস্থা, যার মানদণ্ড বদলায় ক্ষমতা ও অবস্থানের ভিত্তিতে। কাজেই রুচি সংক্রান্ত তাচ্ছিল্য শুধু অশালীন নয়, নিছক মূর্খামিও। নান্দনিকতার বিচার করছি, না কি নিজের সামাজিক অবস্থানকে স্বাভাবিক ও শ্রেষ্ঠ বলে প্রতিপন্ন করছি, ভেবে দেখার।

ভারতে ইন্টারনেট বিপ্লবের পর, সমাজের তৃণমূল স্তরেও আন্তর্জাল পৌঁছে যাওয়ায় অস্বাভাবিক গতিতে দৃশ্যমান হয়েছে নিম্নবর্গের মানুষের মুখাবয়বতাঁদের উচ্চারণভঙ্গি, পোশাক-আঙ্গিক, আনন্দ-প্রকাশের ধরন, উপস্থাপনার নিজস্ব স্বর ও রীতি। যা আগে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের নিয়ন্ত্রিত সাংস্কৃতিক ফ্রেমে তেমন ঠাঁই পেত না। এই নতুন দৃশ্যমানতাই স্বচ্ছলদের মধ্যে এক ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্বেগ জন্ম দিয়েছে, যাকে তারা ক্রিঞ্জ জাতীয় শব্দে প্রকাশ করে: অর্থাৎ, আমাদের রুচির পরিসরে ওদের উপস্থিতি বাড়ছেএই অস্বস্তি এবং সামাজিক মাধ্যমে কর্তৃত্ব-ক্ষয়ের আতঙ্ক। আর সেই উদ্বেগ থেকেই ছাপরির মতো শব্দের পুনরুত্থান ও ব্যাপক ব্যবহার।

উদ্বেগের বিষয় হল, আজকের প্রজন্ম, যারা সামাজিক মাধ্যমের পরিসরে নির্বিচারে অপরকে ছাপরি বলে সম্বোধন করছে, তাদের কাছে এটি মূলত একটি শ্রেণি-নির্দেশক ট্যাগ। এই শব্দ ব্যবহারের সময় অধিকাংশই নিজেদের নৈতিক দায় স্বীকার করে না; বরং ভাবতে ভালোবাসে, তারা ঠোঁটকাটা স্পষ্টভাষী। আমাদের সমষ্টিগত চেতনার চূড়ান্ত সংকট ঠিক এখানেই। শ্রেণি-বিদ্বেষকে আমরা এখনও ঘোর অন্যায় হিসেবে চিনতে শিখিনি। জাত বা ধর্ম নিয়ে কটাক্ষ করলে আপত্তি ওঠে; কিন্তু নিম্নবর্গের রুচি নিয়ে হাসাহাসি করাকে আমরা নির্দ্বিধায় নির্ভেজাল রসিকতা বলে চালিয়ে দিই। এই নৈতিক শৈথিল্যই ছাপরি শব্দকে সামাজিক বৈধতা দিয়েছে। আর সামাজিক মাধ্যম সেই বৈধতাকে শুধু বহনই করেনি, তাকে লাগামছাড়া ত্বরান্বিত করেছে।

আরও দুশ্চিন্তার বিষয় হল, রুচি নির্মাণের এই খেলায় নিপীড়িতরাও সমানভাবে শরিক। মধ্যবিত্ত নিম্নবর্গকে দেখে হাসে, উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্তকে দেখে নাক সিটকায়; আর নিম্নবর্গও নিজের চেয়ে আরও দুর্বল, আরও প্রান্তিক কাউকে খুঁজে নেয় তাচ্ছিল্যের খোরাক হিসেবে। কাজেই সার্বিক সচেতনতার ভাঁড়ার যে ঠনঠনে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবু সম্ভাবনা ও প্রতিরোধ যে একেবারেই অনুপস্থিত, তা নয়, কিন্তু এখনও তা উদাহরণ হিসেবে গ্রাহ্য নয়; নেহাতই ব্যতিক্রমের শামিল।

ছাপরি তকমায় ভাইরাল ইনফ্লুয়েন্সার

‘ছাপরি’ তকমা পাওয়া শিল্পী ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটাররা ইদানীং এই শব্দটিকে পুনর্দখল করার চেষ্টা করছেন। ছাপরি অপবাদ-তকমাকে তাঁরা স্বীকৃতি হিসেবে গ্রহণ করছেন। এটা সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই পুনর্দখল কি শ্রেণিগত বিচারব্যবস্থার ভাষাকে ভাঙতে পারছে, নাকি সেই কাঠামোর সঙ্গেই সমঝোতা করে গ্রহণযোগ্য হওয়ার নতুন কোনও রাস্তা খুঁজছে?

বৃহত্তর সমাজ যদি নিজের শ্রেণি-বিদ্বেষকে অন্যায় হিসেবে চিনতেই না শেখে, কেবল সহনশীলতার পাঠেই যদি দায় সারে, তবে উচ্চারণ নিষিদ্ধ হলেও মানুষের মন থেকে হেয়-জ্ঞানের অভ্যাস কি আদৌ ঘুচবে? শব্দের অন্তর্নিহিত ইতরতাকে নিকেশ না করা গেলে নতুন শব্দের জন্মসনদ পেতে সেক্ষেত্রে বেলা কাটবে না।

তথ্যসূত্র:
১. The Tribes and Castes of the Bombay Presidency (R. E. Enthoven, 1920-22) Vol 1-3
২. Castes and Tribes of Southern India (Edgar Thurston, 1909) Vol 1-7
৩. A Dictionary of Urdu, Classical Hindi, and English (1884), Platts, John T