Robbar

ওধারে এক আগন্তুক

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 17, 2026 9:08 pm
  • Updated:April 17, 2026 9:08 pm  

অনেক বয়স বাড়ার পরে, এই আয়নার অনুষঙ্গে একটা বিচিত্র কথা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, আমার মনটাও একটা সুবৃহৎ আয়না। মনের ভিতরে যেন ওই আয়নার ওধারের জগৎটা রয়েছে। অথবা, ঠিক উল্টোটা। আমার মনের ভেতরে যা আছে, সেটাই আসল জগৎ। বাইরের জগৎটা আসলে ওই ভিতরের জগতেরই প্রতিবিম্ব। মনের ভিতর সুপ্ত সেই জগৎ নিয়েই সন্মাত্রানন্দের ‘আয়নার ওপারে’। আজ প্রথম পর্ব

সন্মাত্রানন্দ

১.

আমার জন্মশহর, মেদিনীপুর, এখন যেমন হয়েছে, আমাদের ছোটবেলায় অমন ছিল না। তখনও পুরনো শহরটির গায়ের ওপর নতুন শহরের বাহার জাঁকিয়ে বসেনি। বেশ কিছুটা ব্রিটিশ আমলের ছাপ তখনও লেগেছিল শহরের অবয়বে। সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে প্রবলভাবে জড়িত মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল তার পুরনো সব বৈভব নিয়ে, বারুদের গন্ধ মেখে, তখনও এমনভাবে বিরাজ করছিল যে, মুহূর্তে বলে দেওয়া যেত স্কুলের কোন ঘরে কুখ্যাত জেলাশাসক জেমস পেডি বার্ষিক প্রদর্শনী দেখতে এসে বিপ্লবী বিমল দাশগুপ্ত ও যতিজীবন ঘোষের হাতে নিহত হয়েছিলেন। সে এক অদ্ভুত শহর ছিল, মনে আছে। অজস্র ছোটবড় গলিপথ, এখানে ওখানে সুড়ঙ্গের ধ্বংসাবশেষ, বিপ্লবীদের গোপন জমায়েতের স্থান কাকাতুয়া বাড়ি, তাঁদের শপথ নেওয়ার কালীমন্দির, পুরনো জমিদার মল্লিকদের প্রাসাদ, রাসমঞ্চ, দেবদেউল– ঠিক যেন একটা অদ্ভুত কল্পভুবন চোখের সামনে সজীব প্রত্যক্ষ মূর্তি ধরে আমাকে চোখ টিপে ইশারা দিয়ে অস্ফুটে ডাক দিত– আয়, আয়, আয় না!

আমাদের বাড়ির কাছেই ছিল একটা অত্যন্ত বৃহৎ শস্যাগার বা গোলা। নীলের গোলা কি না বলতে পারব না। তবে শুনতাম, এই গোলার মালিক ছিলেন না কি কোনও এক কর্নেল সাহেব। গোলাটার গঠন ছিল ভারি অদ্ভুত! ধরা যাক, একজন প্রমাণ সাইজের মানুষ হাত-পা গুটিয়ে বসল, তাহলে যতটা দৈর্ঘ্য হল, তার সমপরিমাণ ব্যাসার্ধযুক্ত একেকটা বেলন বা সিলিন্ডার। এবার ওরকম ১০-১২টা সিলিন্ডার পাশাপাশি সমান্তরালভাবে শুইয়ে দেওয়া হল। আর সবটা মিলে বেশ কয়েক কাঠা জায়গা জুড়ে রইল। পাথরের তৈরি এই সিলিন্ডারগুলোর দু’-মুখ খোলা। এরই মধ্যে শস্য রাখা হত ঠেসে। কর্নেল সাহেব এই গোলার মালিক বলে, জায়গাটার নাম ‘কর্নেলগোলা’ হয়ে যায়। কত দুপুরে আমরা এই বেলনগুলোর মধ্যে ঢুকে লুকোচুরি খেলেছি। খুব দুরন্ত ছিলাম বলে বুঝতে পারিনি, ওরকম নির্জন দুপুরে শতাব্দী-প্রাচীন কর্নেল সাহেবের গোলার আশপাশে, নিভৃত গুলঞ্চ গাছটির তলায় টুপটাপ খসে পড়া সুগন্ধি ফুলের মাঝখানে গা-ছমছম করারই কথা!       

স্টেশনের কাছে পুরনো সেন্ট জনস্‌ চার্চ; তার সামনের কোর্টইয়ার্ডে তিন অত্যাচারী ব্রিটিশ জেলাশাসক পেডি, ডগলাস, বার্জ সাহেব কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। এঁরা প্রত্যেকেই পরপর তিন বছর ১৯৩১, ’৩২, ’৩৩-এ বিপ্লবীদের হাতে নিহত হয়েছিলেন। বিপ্লবীদের সেই আত্মপ্রত্যয়ী ঘোষণা, মিডনাপুর উইল নট টলারেট ওয়ান মোর হোয়াইট রুলার’– তখনও যেন এই শহরের বাতাসে কান পাতলেই শোনা যেত।

মেদিনীপুরের সেন্ট জনস্‌ চার্চ

শহরের থেকে একটু দূরে নাড়াজোলের রাজা নরেন্দ্রলাল খানের নামে প্রতিষ্ঠিত মেয়েদের কলেজ। এই নরেন্দ্রলাল খান ছিলেন প্রজাহিতৈষী, বিশেষত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সবিশেষ আশ্রয়স্থল। কলেজটার ডাকনাম গোপ কলেজ। এখানে আমার মা পড়েছেন, এক দিদি পড়েছেন, আমাদের পরিবারের আরও অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তাঁদের কথা এখন আর আমার অত মনে নেই।    

আমার যখন জন্ম হয়, তখন আমার মায়ের বয়স ১৯-২০, তখনও তিনি কলেজেরই ছাত্রী। আসলে কলেজটা আগে ছিল নাড়াজোল-রাজার প্রাসাদ, পরে মেয়েদের কলেজে পরিবর্তিত হয়েছে। বিবিধ গাছগাছালিতে ঢাকা, পাখিদের কলকাকলিতে মুখর সেই কলেজের চত্বর। কলেজটির বেশ কিছু ঘর তালাবন্ধ; সেখানে মেয়েদের ঢোকা নিষেধ। শোনা যায়, একতলার কোনও তালাবন্ধ ঘরের ভিতরে নাকি আছে একটি লুকনো সুড়ঙ্গ, সেই সুড়ঙ্গ মাটির নিচ দিয়ে কত দূরে যেন চলে গিয়েছে… শহরের বাইরে এক শালগাছের জঙ্গলে ঢাকা নির্জন মসজিদের নিচে গিয়ে নাকি শেষ হয়েছে সেই বিশীর্ণ সুড়ঙ্গটি। এই পথ দিয়েও বিপ্লবীরা উধাও হয়ে যেতেন, বিশেষত হঠাৎ যদি পুলিশ-রেইড হত।

আমি তো আর এসব নিজের চোখে দেখিনি, বাপু। নিশ্চয়ই অনিচ্ছুক আমাকে খাওয়ানোর সময়ে আমার কমবয়সি মা এসব গল্প বলে বলে ভুলিয়ে খাওয়াতেন। ফলত, আমি খাবার খেতাম নাকি গল্প খেতাম– ব্যাপারটা আমার কাছে এখনও ঠিক পরিষ্কার নয়।      

তো মায়ের মুখেই শোনা কথাটা। এই প্রাসাদোপম কলেজটিতে ওরকমই কোনও একটা তালাবন্ধ হলঘর ছিল। ঘরটার সমস্ত দেওয়াল জুড়ে ছিল বড় বড় আয়না। এমনকী, ছাদেও নাকি আয়না লাগানো ছিল। লোকের মুখে মুখে ঘরটার নাম হয়ে গিয়েছিল– আয়না-মহল। কিন্তু সেই ঘরের ধারেকাছেও মেয়েদের উঁকিঝুঁকি দেওয়া নিষেধ!

সম্ভবত, প্রাচীন জমিদারবাড়ির নাচঘর। সেখানে হয়তো একদা আসতেন ভারতপ্রখ্যাত নর্তকীরা, তাঁদের গীতবাদ্যকুশল সঙ্গী-সঙ্গিনীরা। নাচের তাল, বাদ্যের বোল, ঘুঙুরের ঝংকার, সংগীতের মূর্ছনা, দর্শকদের উচ্চকিত সাধুবাদে মুখরিত হয়ে উঠত একদিন সেই হলঘর। এখন সেখানে সব শব্দ থেমে গিয়েছে! তালাবন্ধ দরজার সামনে এসে পড়ে এখন শুধু একাকী দুপুরের রোদ।

ইতিহাস বিজরিত সেন্ট জনস্‌ চার্চ

কোনও এক বিশেষ দিনে, হয়তো কলেজের প্রতিষ্ঠাদিবসে, সেই আয়নাঘরটা খুলে ঝাড়পোছ করা হচ্ছিল। যাঁরা ঘর পরিষ্কার করছিলেন, কাজ সেরে বেরিয়ে যাওয়ার সময়ে ঘরটায় তালা দিতে ভুলে গিয়েছিলেন, মনে হয়। কলেজের সভাঙ্গনে মেয়েদের অনুষ্ঠান চলছে, সেই ভিড় থেকে আলগা হয়ে অন্যমনস্ক আমার মা হাঁটছিলেন উপরের তলার বারান্দা ধরে। এমন সময় হঠাৎ তাঁর চোখ গিয়ে পড়ল আয়নাঘরের খোলা দরজার দিকে! বিস্ফারিত চোখে তরুণী মেয়েটি এদিক-ওদিক তাকিয়ে কেউ আসছে কি না দেখে নিয়ে, পা-টিপে টিপে দরজাখোলা আয়নাঘরে গিয়ে ঢুকলেন।

ঘরের মধ্যে ছাদ থেকে ঝোলানো ঝাড়বাতিতে আলো জ্বলছিল। সুপ্রশস্ত হলঘর। সাহসভরে ঘরটার ঠিক মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াতেই মা অবাক হয়ে গেলেন। দেওয়ালের গায়ে অজস্র বৃহদাকার দর্পণ ঝাড়বাতির আলোতে ঝলমল করে উঠছে। তাঁর নিজেরই অজস্র প্রতিবিম্ব গোটা ঘরের চারিদিকে ঝকমক করছে। একটা হাত নেড়ে কাউকে ডাকার অভিনয় করলেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর নিজেরই শত শত প্রতিবিম্ব হাত নেড়ে তাঁকে ডাকতে লাগল। সামনে, পিছনে, ডাইনে, বামে, মাথার উপরে গণনাতীত তিনি তাঁকে ঘিরে আছেন। হা-হা-হা করে হাসলেন। হলঘরটার এমনই অদ্ভুত স্থাপত্য যে, অমনি সামনে, পিছনে, বামে, দক্ষিণে, এমনকী, ছাদ থেকেও হা-হা-হা প্রতিধ্বনি উঠতে লাগল, যেন হাজার হাজার মেয়ে একসঙ্গে অট্টহাস্য করে উঠল।

খুবই বাস্তববোধসম্পন্না তরুণী ছিলেন বলতেই হবে, তৎক্ষণাৎ তিনি হলঘর ছেড়ে বাইরের পরিচিত জগতে চলে এলেন। আমি যদি তাঁর জায়গায় থাকতাম, মোটেই অত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসতাম না। যাই হোক, একটা অদ্ভুত ত্রাসে, শঙ্কায় তাঁর বুক দুরুদুরু করছিল। এটাও বুঝতে পেরেছিলেন, কেন ওই ঘর থেকে মেয়েদের দূরে রাখার ব্যবস্থা। শুধু নাচঘর থেকে তরুণীদের দূরে রাখার মধ্যবিত্তসুলভ মূল্যবোধই এর কারণ নয়। হয়তো আরও কিছু। হঠাৎ অপ্রস্তুত অবস্থায় কেউ ও ঘরে একা ঢুকে পড়লে ভয় পেতে পারে, হয়তো শারীরিক বা মানসিক বিপর্যয়ও হতে পারে। 

এই গল্পটা শোনার পরে আয়না সম্পর্কে আমার মনে একটা অদম্য কৌতূহল জেগে উঠেছিল। আমার মনের তখন ভাব, বাড়ির প্রত্যেকটা আয়নাকে ভেঙে দেখি, ওদের পিছনে আসলে কী আছে। আয়নার ওধারে কি আছে আরেকটা অন্যরকমের জগৎ? তখনকার দিনে স্নানের ঘরে জলভরা চৌবাচ্চা থাকত। আমি ওই চৌবাচ্চার পাড়ে বসে মুখ বাড়িয়ে দেখতাম, জলের অনেক নিচে ঠিক আমার মতোই একটা ছেলে তাদের চৌবাচ্চার পাড়ে বসে মুখ বাড়িয়ে আমাকেই দেখছে। আমি মুখে জল নিয়ে ফু-উ-ৎ করে কুলকুচি করলে সেই ছেলেটাও আমার দিকে তাকিয়ে ঠিক অমনই ভঙ্গিতে কুলকুচি করে।

আয়না ভাঙার অপকর্মে সফল হইনি ঠিকই, তবে ছোটখাট একটা হাত-আয়নাকে মেঝেতে ঠুকে ভেঙে ফেলেছিলাম। আয়নার চারিপাশে প্লাস্টিকের ফ্রেমটা ভেঙে গেল, পিছনের কার্ডবোর্ড খুলে এল। আমি দারুণ আগ্রহ নিয়ে আয়নার পিছনদিকে কী আছে, দেখতে গেলাম। কিন্তু যা দেখলাম, তাতে বড়ই হতাশ হলাম আমি। সামান্য মেটে সিঁদুরের মতো লাল রঙের একটা নীরস প্রলেপ, পরে শুনলাম, একে নাকি বলে পারদ, ধুস্‌!    

কিন্তু যেটা অবাক লাগল, বিশ্বাস করুন, এখনও অবাকই লাগে আমার এই বয়সে এসেও এই কথাটা ভেবে যে, একটা বিশেষভাবে পালিশ করা কাচের পিছনে পারদের প্রলেপ লাগিয়ে দিলে, সেটা আয়না হয়ে যায়। তখন তার দিকে চাইলে ভিতর থেকে কে যেন আমার দিকে চেয়ে থাকে। একটা গোটা অন্য জগৎ আয়নার ওধারে যেন আমারই অপেক্ষায় আছে। সেখানে দিন হচ্ছে, রাত হচ্ছে, কত মানুষ চলাচল করছে, তাদের একটা অন্য পৃথিবী, অন্য আকাশ, অন্য ঘর, অন্য পথঘাট, অন্য শহর; অথচ সেখানে কেউ কথা বলে না। তাদের ঠোঁট নড়ে, অথচ আওয়াজ ওঠে না। তারা গান গায়, অথচ সেই গানে সুর নেই, শব্দ নেই, কিচ্ছুটি নেই।

অনেক বয়স বাড়ার পরে, এই আয়নার অনুষঙ্গে একটা বিচিত্র কথা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল, আমার মনটাও একটা সুবৃহৎ আয়না। মনের ভিতরে যেন ওই আয়নার ওধারের জগৎটা রয়েছে। অথবা, ঠিক উল্টোটা। আমার মনের ভেতরে যা আছে, সেটাই আসল জগৎ। বাইরের জগৎটা আসলে ওই ভিতরের জগতেরই প্রতিবিম্ব। যেমন আমার মনের ভেতরে সত্যিকারের গাছ আছে। বাইরে যে-গাছটা দেখছি, সেটা আসল নয়। সেটা ওই মনের ভিতরের গাছটার ছায়া বা প্রতিবিম্ব। মজার ব্যাপার, পরে বইতে পড়েছি, শাহেনশাহ শাহাজানের প্রথম পুত্র দারাশুকোরও নাকি এরকম অনুভব হয়েছিল। হবেও বা! তিনি অবশ্য বিপুল পড়ুয়া মানুষ। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে কেউ কেউ যে এমন বিশ্বাস করতেন, যেমন প্লেটো, অথবা আমাদের দেশেও বিজ্ঞানবাদী বৌদ্ধরা, সেসব কথা শাহজাদা দারাশুকো তাঁর যমুনাতীরে নির্মিত নিগমবোধ-মঞ্জিলের গ্রন্থাগারে বসে, প্রাচীন নাস্তালিক লিপিতে লিখে রেখে গিয়েছেন।

নাস্তালিক লিপি

আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরও জমে উঠেছিল, যখন আমি ত্রিপুরায় ছিলাম। জনবিরল ঘুমন্ত একটা গ্রাম– আমতলি। তারই এক প্রান্তে টিলা আর খাদে ভরা অসমতল একটা জায়গা। কত যে গাছ সেখানে! গামার গাছের গভীর জঙ্গল। সেই বনের মধ্যে ছোট্ট একটা ঘর– যেখানে আমি ১২-১৩ বছর ছিলাম। পাখপাখালির ডাকই বেশি, মানুষের আওয়াজ খুব কমই শোনা যায়। সন্ধে হলেই ঝিঁঝির ডাকে ভরে ওঠে অন্ধকার। জোনাকির ইতস্তত ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে অন্যমনস্ক হয়ে যাই রোজ। ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে সাপ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে জঙ্গলে ফিরে চলে যায়। রাত আটটা বাজলেই তক্ষক যেন কালজ্ঞাপক ধ্বনি দেয়– তক্‌-খক্‌, তক্‌-খক্‌, তক-খক্‌!

ঘরের মধ্যে বইয়ের র‍্যাক, একটা খাট, চেয়ার-টেবিল। টেবিলের উপর সন্ধেবেলা একটা ল্যাম্প জ্বলে। এখানে প্রায়ই লোডশেডিং হয়। মোমবাতিই ভরসা তখন।

একদিন মধ্যনিশীথ। কেন জানি ঘুম ভেঙে গেল। সুইচ টিপে দেখলাম, কারেন্ট গিয়েছে। একটা টর্চ হাতে নিয়ে কুঠিয়ার বাইরে এলাম। চারিদিকে বুকফাটা জ্যোৎস্না উঠেছে। জঙ্গলে গামার গাছগুলো বিভগ্ন মন্দিরের স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলো গাছের ডালপালা ভেদ করে ইতস্তত মাটির ওপর আলগোছে এসে পড়েছে। কোথাও গাঢ় অন্ধকার, কোথাও আলোর আবছা আভাস।

আমি সেই বনের মধ্যে যেন স্বপ্নচালিতের মতো হাঁটতে লাগলাম। জ্যোৎস্নায়, কুয়াশায় মাখামাখি সেই অস্ফুট মায়াকুহক… যেন এই পৃথিবী এখনকার নয়… যেন সুদূর কালের একটি অবসিত খণ্ড গামারবনের ভেতরে এসে আটকে পড়েছে। মনে হল, এই হয়তো সেই আয়নার ওধারের জগৎ, যাকে আমি আশৈশব খুঁজে চলেছি।

কিছুক্ষণ ওইভাবে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম, কে যেন জ্যোৎস্না আর অন্ধকার ঠেলে বনের সুঁড়িপথ বেয়ে এদিকেই আসছে। এত রাত্রে এদিকে কে আসতে পারে? টর্চ নিবিয়ে, একটা গাছের মোটা গুঁড়ির আড়ালে লুকিয়ে থেকে আগন্তুক ব্যক্তিটিকে আমি ভালোভাবে ঠাহর করে দেখতে লাগলাম। কে হতে পারে লোকটা?  

যা দেখলাম, তাতে আমার সর্বাঙ্গ কী এক অজানা ভয়ে, বিস্ময়ে শিউরে উঠল! এ আমি কী দেখছি চোখের সামনে!