Robbar

টেবিলই মধুসূদনের নেমেসিস, আত্মদহনের আয়না

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 28, 2026 2:37 pm
  • Updated:April 28, 2026 2:37 pm  

মাইকেল মধুসূদন দত্ত আধো অন্ধকারে চেয়ারে বসে। সামনে তাঁর সমস্ত জীবনটার সাক্ষী সেই টেবিল। তুমি আমার বন্ধু না শত্রু? টেবিলটাকে নিস্পৃহ উচ্চারণে প্রশ্ন করেন কবি। তারপর পায়ের কাছে শুয়ে থাকা হেনরিয়েটার পানে তাকিয়ে বলতে থাকেন, এই ৪৩ বছরের সুন্দরী আমার বউ নয়। যদিও আমার সন্তানদের মা। প্রশ্ন হল, আমি ৪৯ বছর বয়সের আগে মরব, না এই মেয়ে ৪৩ বছর বয়সে আগে যাবে?

প্রচ্ছদে ব্যবহৃত স্কেচ: অতুল বসু 

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

৯১.

লেখক অসুস্থ। বেশ অসুস্থ। তবু তিনি শেষ করতে পারলেন তাঁর শেষ নাটক, ‘মায়াকানন’। এটাই তাঁর শেষ লেখা! নাটকের নায়ক সুরথ নিজে। কেউ কি জানবে কোনওদিন, তিনি হাজার ছুরি মেরেছেন নিজেকে! বিক্ষত করেছেন তাঁর প্রত্যয়, মূল্যবোধ, ফ্যান্টাসি, মোহ। সুরথ-কে, অর্থাৎ নিজেকে, জীর্ণ কাপড়ের মতো তিনি এবার ত্যাগ করে যেতে চান। নিজের প্রতি আর কোনও দুর্বলতা নেই তাঁর মনে। ক্ষমা নেই এতটুকু!

তিনি তাকান তাঁর লেখার টেবিলটার দিকে। এই টেবিলটাকে তিনি আজীবন বয়ে চলেছেন। তাঁর নাছোড় উন্মাদনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, দিবাস্বপ্ন, বেপরোয়া বিলাসিতা আর অপ্সরাপ্রীতি, সব কিছুর আঁতুড়, তাঁর সব সর্বনাশ ও নেমেসিসের উৎস ওই টেবিল। কতবার টেবিলটাকে, শান-দেওয়া শাবলের তোলপাড়ে টুকরো টুকরো করতে চেয়েছেন তিনি। পারেননি! ২২, বেনিয়াপুকুরের ভাড়াবাড়িতে, চূড়ান্ত দারিদ্রের মধ্যে শুরু করলেন ওই টেবিলটার বুকে, তারই প্ররোচনায়, আত্মজৈবনিক রূপক, ‘মায়াকানন’। শেষ লাইনটা লেখার পর, তাঁর হাত অবশ হয়ে এল। তিনি কোনওরকমে কলমটা গুঁজে দিলেন দোয়াতের মধ্যে।

‘মায়াকানন’ বইয়ের আখ্যাপত্র

তিনি তখনও জানতেন না, ভাড়া না-দিতে পারায় তাঁকে ছেড়ে যেতে হবে বেনিয়াপুকুরের এই বাড়ি, উত্তরপাড়ার জমিদারদের দয়ার আশ্রয় হবে তাঁদের লাইব্রেরি ঘরের কোনায়, সমান-অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে। তিনি এখনও জানেন না, আর কিছুদিনের মধ্যেই আলিপুরে বিনাপয়সার জেনারেল হাসপাতালে তাঁর স্ত্রী ও তাঁর জীবন শেষ হবে। এবং তিনি জানেন না, তাঁর ‘মায়াকানন’ প্রকাশিত হবে তাঁর মৃত্যুর পরে, বন্ধুদের সৌজন্যে। এবং তিনি আরও একটি মর্মান্তিক সত্য জানেন না। তাঁর লেখা বাংলা মহাকাব্য ‘মেঘনাদবধ’ ২০২৬-এর প্রাত্যহিক কেজো বাঙালিদের আর কেউ পড়বে না, বাড়িতেও রাখবে না, সন্তানদের পড়তেও বলবে না!

‘মেঘনাদবধ কাব্য’ বইয়ের প্রচ্ছদ

মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাঁর মৃত্যুর বছর, ১৮৭৩-এ ভাবতে পারেননি, সারা ভারতে আর একটি কণ্ঠও থাকবে না যে, চিৎকার করে রাতের তারাদের শুনিয়ে বলবে এই কসমিক ঘোষণা, ‘Ravana fires me with enthusiasm!’ এবং এই বাঙালি মহাকবি জানেন না, একদিন কোনও বাঙালিই জানবে না মাইকেল মধুসূদন দত্ত অন্তিমে একটি আত্মজৈবনিক শোচনাবিদ্ধ নাটক লিখেছিলেন, ‘মায়াকানন’, যার নায়ক সুরথ, তিনি নিজে! যে নায়ক নদী বলতে বোঝে রুপোর স্রোত, গাছ বলতে সোনার ডাল-পাতা-ফুল আর ভালোবাসার নারী তো অপ্সরা। মধু-র স্ত্রী হেনরিয়েটা এই নাটকের সুলোচনা, কতবার বলেছেন– মাইকেল, ত্যাগ করো অলীকের মোহ। কবি কান দেননি সেই উপদেশে। ওই টেবিলের প্ররোচনা মাইকেলকে বারবার ঠেলে দিয়েছে রোম্যান্টিক কুহকে, তাঁর স্বপ্নের দৌড়ে, অনিবার্য দহনে! তিনি জানিয়ে গেলেন তাঁর শেষ লেখায়, তাঁর জীবনের হাজার মোহ ও মায়ার কথা।

শিল্পী অতুল বসুর আঁকা মাইকেল মধুসূদনের তৈলচিত্র। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের আর্কাইভে সংরক্ষিত

মোহ, মেয়েমানুষ, না মদ– কোনটা ধ্বংস করল আমাকে, নিয়ে গেল ভুল পথে, আমার প্রতিভাকে লোভ দেখাল গর্হিত গ্ল্যামারের, যার দমে কুলয় না লম্বা দৌড়! কেন আমি কবিতাকে ত্যাগ করে ব্যারিস্টার হওয়ার জন্য সর্বস্ব খুইয়ে বিলেতে গেলাম? নিজেকে প্রশ্ন করেন কবি। ততদিনে তো আমার জ্ঞানচক্ষু খোলা উচিত ছিল! আমি এক সময়ে ছিলাম হিন্দু কলেজের তরুণ তারা। ইংরেজি লিখতাম আমার ইংরেজ শিক্ষকদের মতো, না না, তাঁদের থেকে অনেক ভালো লিখতাম। লিখতাম কোলরিজের মতো গভীর গদ্য, কখনও মিলটন, কখনও বায়রনের মতো কবিতা। আর মদের নেশা, বাহার, উড়ান মেশাতে শিখলাম আমার লেখায়।

মধুর মনে পড়ে, তার মুখেমদের প্রথম সন্ধে। ফরাসি কনিয়াকে প্রথম চুমুক গঙ্গার ওপর ভাসতে ভাসতে। তারিখটা স্পষ্ট মনে আছে। ২০ অক্টোবর, সোমবার, ১৮৪১। ১৮২৪-এ জন্মানো মধু ঠিক ১৭। আর দেরি করা যায় না– কনিয়াক, শেরি, শ্যাম্পেন। তাছাড়া তেষ্টা পেলেই বিয়ার। দিনরাত এই স্বর্গসুখ ছাড়া কবি হওয়া, বিশেষ করে ইংরেজ কবি, অসম্ভব!

সবে তৈরি হয়েছে গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল। সাহেবদের ভিড়ে উপচে পড়ছে। কলকাতার নামকরা উকিলদের একজন হয়ে উঠেছেন মধুর বাবা রাজনারায়ণ দত্ত। খিদিরপুরে প্রাসাদের মতো বাড়ি করেছেন। ভালোবাসেন বই, মদ, নারী, বিলাস। মধু ক্রিশ্চান হওয়ার পরে আরও দু’বার বিয়ে করবেন প্রৌঢ় রাজনারায়ণ! পুত্রের বুদ্ধিমত্তার তারিফ করেন তিনি। মধু হিন্দু স্কুলে ইংরেজি ভাষায় তার আলো ছড়িয়ে সাহেবদের এবং বাবাকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে ১৭ বছরের মধুর ইংরেজি কবিতা ও প্রবন্ধ বেরিয়েছে ‘ক্যালকাটা লিটারারি গেজেট’, ‘বেঙ্গল স্পেক্টেটর’, ‘লিটারারি ব্লসম’, এবং বিপ্লবী ‘কমেট’ পত্রিকাতেও। এরপর মধু গঙ্গাবক্ষে উৎসবের পানতরণি না ভাসালে তো মান থাকে না!

বেঙ্গল স্পেকটেটর-এর একটি সংখ্যা (১৮৪৩)

এই টেবিলটাই যেন তরতর করে লিখে দিয়েছিল মধুসূদনের আমন্ত্রণপত্র, বন্ধু গৌরদাসকে এই ভাষায়: If you take any friend of yours with you that day, mind it, it must be a liberal set of friends. Because I intend on that day, most noble Gaur, to worship Bacchus with you, a pleasure which I have not yet enjoyed. গ্রিক পুরাণে ব্যাকাস শুধু সুরার দেবতাই নয়, দেবতা সুরের, সম্ভোগের, সৃষ্টি ও সেক্সুয়ালিটির। উদ্দাম অর্থখরচে মধুর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া, মধুর বয়সি কোনও তরুণের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মধু গঙ্গার বুকে সেদিন সন্ধ্যায় বন্ধুবান্ধব নিয়ে বিপুল পানের পাল তুলেছিলেন। সঙ্গে ছিল গ্রেট ইস্টার্ন হোটেলের কাছেই, ৪, ওল্ড কোর্ট স্ট্রিট হাউসে সেই সময়ে অতি অভিজাত ‘মার্স অ্যান্ড স্টোন’ রেস্তোরাঁ থেকে নিয়ে আসা থরে থরে সুখাদ্য। গৌরের হাতে কনিয়াক ধরিয়ে দিয়েই প্লেট-ভর্তি চপ এগিয়ে দিলেন মধু। সুবাসে মুগ্ধ গৌরদাস দিলেন কামড়। আহা! যেমন সুবাস, তেমন স্বাদ, কীসের চপ মধু? কনিয়াকে গলা ভিজিয়ে প্রশ্ন করলেন পরম বৈষ্ণব বন্ধু গৌরদাস। মধুর ছোট্ট উত্তর, flesh, forbidden flesh, নিষিদ্ধ মাংস!

মাইকেলের পরম বন্ধু, গৌরদাস বসাক

নিষিদ্ধ মাংস থেকে ম্লেচ্ছ ধর্ম থেকে অবৈধ সম্পর্ক থেকে অসামাজিক জীবন– সব কিছুর প্রতি আজীবন অমোঘ টান অনুভব করেছেন মধু। সবকিছুর জন্য কি দায়ী নয় তাঁর ভাবনা এবং সৃষ্টির টেবিলটা? ওই টেবিলটা কি তাঁকে নিয়ে যায়নি একটার পর একটা তাড়নায়?


বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছে। বিকেলের আলো আর জীবনের আলো, একই রকম, মনে হয় মধুর। চেয়ারে বসে টেবিলটার ওপরে হাত রাখেন তিনি। এই টেবিল, কী উর্বর টেবিল, তাঁকে একে একে, কত কষ্টের মধ্যে, দিয়েছে সৃজনের সমারোহ: এই টেবিলেই তো তিনি সারারাত শেরি আর ব্র‍্যান্ডির সঙ্গে কিশোরীর বিনুনির মতো অনর্গল বেঁধেছেন ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ। আর এই সূত্রেই এই পুরনো বন্ধু টেবিলই তো ঘটিয়ে দিল, বেলগাছিয়ার রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, মধু নিশ্চিত। এরপর এই টেবিল তাঁকে দিয়েছে ‘শর্মিষ্ঠা’, ‘পদ্মাবতী’, ‘কৃষ্ণকুমারী’। আর ‘পদ্মাবতী’ ঘটাল ‘দ্যাট সাডেন স্ট্রোক অফ জিনিয়াস’– ‘অমিত্রাক্ষর’ ছন্দের প্রথম প্রকাশ।

‘শর্মিষ্ঠা নাটক’ বইয়ের আখ্যাপত্র (দ্বিতীয় মুদ্রণ)

অনেক পরে এই টেবিল অমিত্রাক্ষরকে নিয়ে এল পূর্ণ প্রকাশের মহত্বে– মেঘনাদবধ কাব্যে। মধুসূদনের মনে পড়ে, বিদ্যাসাগরের বিদ্রুপ গোপনে, আড়ালে, এই ছন্দের প্রতি, যা জল এনেছিল তাঁর চোখে। নিজেকে বুঝিয়েছিলেন, দুঃখ পেও না মধু, বিদ্যাসাগরের কান তৈরি এখনও হয়নি। হয়তো হবে কোনওদিন। মধুর মনে পড়ে, এই টেবিল তাঁকে দিয়েছে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’, ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’, ‘আত্মবিলাপ’। দিয়েছে ‘ব্রজাঙ্গনা কাব্য’। তারপর ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক। ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ আর ‘বুড়সালিকের ঘাড়ে রোঁ’-র মতো ধারালো চলতি বাংলার স্যাটায়ার। আর দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীল-দর্পণ’-এর ইংরেজি অনুবাদ এক রাত্তিরে! সেও তো এই টেবিলে।

তারপর এই টেবিলের প্ররোচনায় আমি হঠাৎ নিলাম সিদ্ধান্ত: No more Madhu the কবি! But Michael M.S. Dutt Esquire of the Inner Temple Barrister at Law! কবিতার কাছে আমি আর ফিরে যেতে পারিনি। ব্যারিস্টার হিসেবে ফেল করার পরে চেষ্টা করেছিলাম কবিতার কাছে ফিরে যাওয়ার। ‘But Muse said adieu to me!’ এর পর মদ, আমি আর পাতাল, আর কিচ্ছু নেই আমার ৪৯ বছরের জীবনে। আর মাত্র ক’টা দিন পড়ে আছে!

তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ বইয়ের আখ্যাপত্র

মাইকেল মধুসূদন দত্ত আধো অন্ধকারে চেয়ারে বসে। সামনে তাঁর সমস্ত জীবনটার সাক্ষী সেই টেবিল। তুমি আমার বন্ধু না শত্রু? টেবিলটাকে নিস্পৃহ উচ্চারণে প্রশ্ন করেন কবি। তারপর পায়ের কাছে শুয়ে থাকা হেনরিয়েটার পানে তাকিয়ে বলতে থাকেন, এই ৪৩ বছরের সুন্দরী আমার বউ নয়। যদিও আমার সন্তানদের মা। প্রশ্ন হল, আমি ৪৯ বছর বয়সের আগে মরব, না এই মেয়ে ৪৩ বছর বয়সে আগে যাবে? আমি ওর কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না। আমি চাই হেনরিয়েটা আগে চলে যাক। আমার আত্মা শান্তি পাবে। আমি ওকে একলা ফেলে যেতে পারব না। অথচ আমি ওকে একলা মাদ্রাজে ফেলে চলে এসেছিলাম। পালিয়ে এসেছিলাম!

সাগরদাঁড়ি গ্রামে (অধুনা বাংলাদেশে) মধুসূদন দত্তের বাড়ি

১৮৪৯ থেকে ১৮৫৫: আমি মাদ্রাজে স্কুলে ইংরেজি পড়াই। এবং নানা পত্রপত্রিকায় ইংরেজিতে লিখি। সেটাকেই মনে করি মাতৃভাষা! আমার ‘ক্যাপটিভ লেডি’ ইংরেজি কাব্য সেই সময়ের লেখা। ভেবেছিলাম রাতারাতি মহাকবি হয়ে যাব। সেটা হল না, তবে আমার কাব্য পড়ে এবং আমার বিদ্যাবুদ্ধিতে প্রবল আকৃষ্ট হল এক নেহাত কিশোরী। বাঙালি মেয়েতে আমার রুচি ছিল না। রেবেকা আমার ইংরেজ ছাত্রী, গায়ের রঙে, মুখের ভাষায় ইংরেজ তো বটেই। আমার প্রেমে পড়ল। আর আমি সাঁতার ভালোবাসি। নারীতে নদীতে সমান। রেবেকাও তাই। তাছাড়া ও আমার প্রেমে হাবুডুবু। পরে জানলাম, রেবেকা অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান। বাবা খাস ইংরেজ। মা ক্যাথলিন নাগপুরের মেয়ে। খুব তাড়াতাড়ি রেবেকার সঙ্গে আমার এক মেয়ে ফিবি, আর দুই ছেলে, জর্জ আর মাইকেল।

ক্রিশ্চানদের মধ্যে এটা হয়। রেবেকা আবার রোমান ক্যাথলিক। ডিভোর্সে বিশ্বাস করে না। কিন্তু মাদ্রাজে তিন সন্তানের বাপ হওয়ার পরে আমি আবার এক সুন্দরীর লোভ সামলাতে পারিনি। সেও আমার প্রেমে পড়ল। এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া হোয়াইট খাঁটি ইংরেজ। অন্তত সেটাই আমাকে বলেছে। খাঁটি ইংরেজ হল কি না হল, আমার কী এসে যায়? আমি বায়রনিক প্রেমে বিশ্বাসী। হেনরিয়েটা বিশুদ্ধ ইংরেজি বলে। আমার গায়ের রং যত কালো, ও তত ফর্সা। ও আমার মতোই শরীরী প্রেমে বিশ্বাসী। রেবেকাকে আমার একটু একঘেয়ে লাগছিল। আমি ওকে ছেড়ে নতুন নারীর কাছে চলে এলাম। তারপর ওকেও ছেড়ে আমি ভিন্ন নামে জাহাজে চেপে কলকাতায় চলে এলাম। রেবেকা এবং হেনরিয়েটা দু’জনেই পড়ে রইল মাদ্রাজে!

শুনেছি, তবে ঠিক শুনেছি কি না জানি না, রেবেকার জীবন অ্যাসাইলামে শেষ হয়। বাচ্চাদের কী হয়, আমি জানি না। হেনরিয়েটা আমাকে খুঁজতে খুঁজতে আড়াই বছর পরে ঠিক কলকাতায় চলে আসে। এবং আবার আমরা পরস্পরের প্রেমে পড়ি। তিন সন্তানের মা হয় ও। এবং আমরা দারিদ্রের নরক দেখি। ইংল্যান্ডে। ফ্রান্সে। এবং কলকাতায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর না থাকলে আমি আমি ধার শোধ করতে না-পারার জন্য ফ্রান্সে জেলে যেতাম। আমার জীবনের একটা বড় আচিভমেন্ট, হেনরিয়েটা আর আমি একসঙ্গে মরছি। আমি সত্যি চাই, হেনরিয়েটা আগে যাক।

কলকাতায় লোয়ার সার্কুলার রোডে অবস্থিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত ও তাঁর স্ত্রী হেনরিয়েটার সমাধিস্থল

আমার লিভার সিরোসিসের লাস্ট-স্টেজ। সারাক্ষণ মুখ দিয়ে রক্ত ওঠে। আমাদের দু’জনকেই পরম বন্ধু গৌর ভর্তি করে দিয়েছে আলিপুরের হাসপাতালে। দু’দিন আগে হেনরিয়েটা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছে। বিদ্যাসাগর ওকে ভালোবাসা জানিয়ে সমাধিতে ফুল দিতে আসেনি।

আমি জানি, আমার মৃত্যুদিন। আমি চোখ বুঝলে দেখতে পাই, আমার টেবিলের বুকে ফুটে উঠেছে একটা তারিখ ২৯ মে, ১৮৭৩। হেনরিয়েটার মৃত্যুর তিনদিন পরে। কেন এত কষ্ট পেলাম জানেন? অন্যদের কি কম কষ্ট দিয়েছি?

…………………….. পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব  ……………………

পর্ব ৯১: সমর্পণ নয়, ব্যাড গার্লের প্রতিস্পর্ধা

পর্ব ৮৯: রঙে রসে অফুরান রবি বর্মার তুলির টান

পর্ব ৮৮: ন্যুড মডেলই মাতিসের ভাবনার টেবিল

পর্ব ৮৭: চণ্ডীমঙ্গল না পড়লে সে কীসের বাঙালি!

পর্ব ৮৬: সাধারণের জীবন রাজনীতির বিষয়, শিখিয়েছে মনুর সংহিতা

পর্ব ৮৫: চিঠির মোড়কে নষ্ট প্রেমের গোপন অভিসার

পর্ব ৮৪: চা নয়, চায়ের বই যখন প্রেমের অনুঘটক

পর্ব ৮৩: আধ্যাত্মিক বিরহ দিয়ে গড়া প্রেমের মহাকাব্য

পর্ব ৮২: এক মৃত্যুহীন ক্লাসিক কিংবা যৌনতার সহজপাঠ

পর্ব ৮১: দেশহীন, ভাষাহীন ঝুম্পা

পর্ব ৮০: সাহসী প্রেমের চিঠি লেখা শিখিয়েছিল যে বাঙালি যুগল

পর্ব ৭৯: সুরানিলয়ের টেবিল থেকেই জন্ম নিয়েছিল উপন্যাসের ভাবনা

পর্ব ৭৮: একবিন্দু আত্মকরুণা নেই অঞ্জনের আত্মজীবনীতে

পর্ব ৭৭: অ্যানির ‘দ্য ইয়ার্স’ শেখায় অন্তহীন ইরোটিসিজম-ই জীবনের পরমপ্রাপ্তি

পর্ব ৭৬: জয় গোস্বামীর সাজেশনে মুগ্ধতা জাগাল ‘সিম্পল প্যাশন’

পর্ব ৭৫: যে নারীর শেষপাতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি লেখক

পর্ব ৭৪: সেই তরুণীর জন্য বেঁচে আছে বোকা মনকেমন!

পর্ব ৭৩: কাফকার ভয়-ধরানো প্রেমপত্র!

পর্ব ৭২: থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, কলকাতা বইমেলায় শ্রেষ্ঠাংশে তবে রবীন্দ্র-ওকাম্পো?

পর্ব ৭১: একশো বছরের নৈরাজ্য ও একটি লেখার টেবিল

পর্ব ৭০: আত্মজীবনী নয়, মার্গারেটের ব্রতভ্রষ্ট স্মৃতিকথা

পর্ব ৬৯: রুশদির ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’ শেষ প্রহরের, অনিবার্য অন্তিমের দ্যোতক

পর্ব ৬৮: মাংসও টেবিলের কাছে ঋণী

পর্ব ৬৭: ভ্রমণ-সাহিত্যকে লাজলো নিয়ে গেছেন নতুন পারমিতায়

পর্ব ৬৬: নরম পায়রার জন্ম

পর্ব ৬৫: যে বইয়ের যে কোনও পাতাই প্রথম পাতা  

পর্ব ৬৪: খেলা শেষ করার জন্য শেষ শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন জেফ্রি আর্চার

পর্ব ৬৩: সহজ ভাষার ম্যাজিক ও অবিকল্প মুরাকামি

পর্ব ৬২: জীবন তিক্ত এবং আশা করা ভুল, এই দর্শনই বিশ্বাস করেন ক্রাজনাহরকাই

পর্ব ৬১: লন্ডনে ফিরে এলেন অস্কার ওয়াইল্ড!

পর্ব ৬০: পাপ ও পুণ্যের যৌথ মাস্টারপিস

পর্ব ৫৯: মাতৃভক্তির দেশে, মাকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মকথন

পর্ব ৫৮: চিঠিহীন এই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়লিপি

পর্ব ৫৭: লেখার টেবিল কি জানে, কবিতা কার দান– শয়তান না ঈশ্বরের?

পর্ব ৫৬: প্রেমের নিশ্চিত বধ্যভূমি বিয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার টেবিল জানে সেই নির্মম সত্য

পর্ব ৫৫: জুলিয়া রবার্টসকে হিন্দুধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল একটি বই, একটি সিনেমা

পর্ব ৫৪: আপনার লেখার টেবিল নেই কেন মানিকদা?

পর্ব ৫৩: পুরুষরা যে কতদূর অপদার্থ, ড্রেসিং টেবিলের দেখানো পথে মেয়েরা প্রমাণ করে দেবে

পর্ব ৫২: একটাও অরিজিনাল গল্প লেখেননি শেক্সপিয়র!

পর্ব ৫১: প্রমথ-ইন্দিরার মতো প্রেমের চিঠি-চালাচালি কি আজও হয়?

পর্ব ৫০: হাজার হাজার বছর আগের পুরুষের ভিক্ষা এখনও থামেনি

পর্ব ৪৯: কুকথার রাজনীতিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন জর্জ অরওয়েল 

পর্ব ৪৮: টেবিলই ওকাম্পোর স্মৃতি, আত্মজীবনীর ছেঁড়া আদর

পর্ব ৪৭: শেষ বলে কিছু কি থাকতে পারে যদি না থাকে শুরু?

পর্ব ৪৬: যে টেবিলে দেবদূত আসে না, আসে শিল্পের অপূর্ব শয়তান

পর্ব ৪৫: ফ্রেডরিক ফোরসাইথকে ফকির থেকে রাজা করেছিল অপরাধের পৃথিবী

পর্ব ৪৪: আম-বাঙালি যেভাবে আমকে বোঝে, দুই আমেরিকান লেখিকা সেভাবেই বুঝতে চেয়েছেন

পর্ব ৪৩: দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে মা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, ইবতিসম্‌-এর উপন্যাসের শুরু এমনই আকস্মিক

পর্ব ৪২: অন্ধকার ভারতে যে সিঁড়িটেবিলের সান্নিধ্যে রামমোহন রায় মুক্তিসূর্য দেখেছিলেন

পর্ব ৪১: বানু মুশতাকের টেবিল ল্যাম্পটির আলো পড়েছে মুসলমান মেয়েদের একাকিত্বের হৃদয়ে

পর্ব ৪০: গোয়েটের ভালোবাসার চিঠিই বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের সুইসাইড প্রবণতা

পর্ব ৩৯: লেখার টেবিল বাঙালির লাজ ভেঙে পর্নোগ্রাফিও লিখিয়েছে

পর্ব ৩৮: বঙ্গীয় সমাজে বোভেয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর ভাবনার বিচ্ছুরণ কতটুকু?

পর্ব ৩৭: ভক্তদের স্তাবকতাই পাশ্চাত্যে রবীন্দ্র-কীর্তি স্থায়ী হতে দেয়নি, মনে করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী

পর্ব ৩৬: একাকিত্বের নিঃসঙ্গ জলসাঘরে মারিও ভার্গাস লোসা যেন ছবি বিশ্বাস!

পর্ব ৩৫: জীবনের বাইশ গজে যে নারী শচীনের পরম প্রাপ্তি

পর্ব ৩৪: যা যা লেখোনি আত্মজীবনীতেও, এইবার লেখো, রাস্কিন বন্ডকে বলেছিল লেখার টেবিল

পর্ব ৩৩: ফিওনার সেই লেখার টেবিল মুছে দিয়েছিল মেয়েদের যৌনতা উপভোগের লজ্জারেখা

পর্ব ৩২: বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক বাঙালির সংজ্ঞায় স্পিভাক এসে পড়বেনই

পর্ব ৩১: প্রতিভাপাগল একটি বই, যাকে দিনলিপি বলে সামান্য করব না

পর্ব ৩০: পতিতালয়ের সেই লেখার টেবিল জাগিয়ে তুলেছিল ইসাবেলের হৃদয়-চেতনা

পর্ব ২৯: পাথরে প্রাণ আনে যে টেবিলের স্পর্শ

পর্ব ২৮: নিজের টেবিলকে কটাক্ষ করি, কেন অ্যানে মাইকেলসের মতো লিখতে পারি না?

পর্ব ২৭: নারীর রাগ-মোচনের কৌশল জানে মিলান কুন্দেরার লেখার টেবিল!

পর্ব ২৬: ভালোবাসা প্রকাশের সমস্ত শব্দ পেরিয়ে গিয়েছিল এলিয়টের লেখার টেবিল

পর্ব ২৫: যে টেবিলে জন্ম নেয় নগ্নতা আর যৌনতার নতুন আলো

পর্ব ২৪: প্রেমের কবিতার ভূত জন ডানকে ধরেছিল তাঁর উন্মাদ টেবিলে, মোমবাতির আলোয়

পর্ব ২৩: যে টেবিল আসলে বৈদগ্ধ আর অশ্লীলতার আব্রুহীন আঁতুড়ঘর!

পর্ব ২২: মহাবিশ্বের রহস্য নেমে এসেছিল যে টেবিলে

পর্ব ২১: গাছ আমাদের পূর্বপুরুষ, লেখার টেবিল বলেছিল হোসে সারামাগোকে

পর্ব ২০: টেবিলের কথায় নিজের ‘হত্যার মঞ্চে’ ফিরেছিলেন সলমন রুশদি

পর্ব ১৯: প্রতিভা প্রশ্রয় দেয় অপরাধকে, দস্তয়েভস্কিকে শেখায় তাঁর লেখার টেবিল

পর্ব ১৮: বিবেকানন্দের মনের কথা বুঝতে পারে যে টেবিল

পর্ব ১৭: ‘গীতাঞ্জলি’ হয়ে উঠুক উভপ্রার্থনা ও উভকামনার গান, অঁদ্রে জিদকে বলেছিল তাঁর টেবিল

পর্ব ১৬: যে লেখার টেবিল ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে গেছে শয়তানির অতল গভীরে

পর্ব ১৫: যে অপরাধবোধ লেখার টেবিলে টেনে এনেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে

পর্ব ১৪: লেখার টেবিল গিলে নিচ্ছে ভার্জিনিয়া উলফের লেখা ও ভাবনা, বাঁচার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা

পর্ব ১৩: হ্যামনেট ‘হ্যামলেট’ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, জানে সেই লেখার টেবিল

পর্ব ১২: রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিল চিনতে চায় না তাঁর আঁকার টেবিলকে

পর্ব ১১: আর কোনও কাঠের টেবিলের গায়ে ফুটে উঠেছে কি এমন মৃত্যুর ছবি?

পর্ব ১০: অন্ধ বিনোদবিহারীর জীবনে টেবিলের দান অন্ধকারের নতুন রূপ ও বন্ধুত্ব

পর্ব ৯: বুড়ো টেবিল কিয়ের্কেগার্দকে দিয়েছিল নারীর মন জয়ের চাবিকাঠি

পর্ব ৮: অন্ধকারই হয়ে উঠলো মিল্টনের লেখার টেবিল

পর্ব ৭: কুন্দেরার টেবিলে বসে কুন্দেরাকে চিঠি

পর্ব ৬: মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের দাগ লেগে রয়েছে কুন্দেরার লেখার টেবিলে

পর্ব ৫: বিয়ের ও আত্মহত্যার চিঠি– রবীন্দ্রনাথকে যা দান করেছিল লেখার টেবিল

পর্ব ৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের টেবিল আর তারাপদ রায়ের খাট, দুই-ই ছিল থইথই বইভরা

পর্ব ৩: টেবিলের গায়ে খোদাই-করা এক মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা

পর্ব ২: লেখার টেবিল ভয় দেখিয়েছিল টি এস এলিয়টকে

পর্ব ১: একটি দুর্গ ও অনেক দিনের পুরনো নির্জন এক টেবিল