


এই বাবা-মার মেয়ে হয়ে, আশা, কী করে গেয়েছিলে তুমি অমন মনপ্রাণ ঢেলে, গলায় এনে মদের নেশা, ‘রাত আকেলি হ্যায়’-এর মতো গান? ভারতের কোন পুরুষ পাগল হয়নি এই গান শুনে? তুমি তো জানো, আশা, ‘জুয়েল থিফ’ ছবির সব হিট গান লতার গাওয়া। শচীন দেববর্মন কিন্তু এই একটি গান, যে গানে একা রাতের নারী নেশারু ডাক দিচ্ছে পুরুষকে, সেই গানের জন্যে বেছে নিলেন তোমার মধ্যেকার দুষ্টু মেয়েটাকেই। জেনে রাখো, আশা, বাধা দিয়েছিলেন লতা, তোমার প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ তোমার দিদি চাননি। কিন্তু শচীনকর্তা লতার বাধা টপকে তোমার কণ্ঠে ঠিক গানটা বসিয়ে বাজিমাত করে দিলেন।
৯০.
আশা ভোঁসলের মনে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহের জায়গা নেই। ঘটনাটা ঘটেছিল শচীন তেন্ডুলকরের ছেলের বিয়ের নেমন্তন্নতে যাওয়ার আগের মুহূর্তে। আশা তাঁর খাটের সাইড টেবিলটাকে দক্ষিণ-পশ্চিম কর্নার থেকে উত্তর-পশ্চিম কর্নারে রিসেট করলেন। ব্যস, তারপর থেকে কাশ্মীরি কাঠের ওপর ঝিনুকের ফুলতোলা এই শৌখিন আসবাবটি তাঁর জীবনে ক্রমশ হয়ে উঠছে একটা চরিত্র। প্রথম প্রথম অনুরোধ করত। এখন রীতিমতো হুকুম করছে এই টেবিল: আশা, তোমাকে লিখতেই হবে। তোমার পালাবার পথ নেই। পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়ার আগে এই কাজটা তুমি করে যাও।
শচীনের ছেলে অর্জুন আর বউমা সানিয়াকে আশীর্বাদ করতে এগিয়ে যাচ্ছেন আশা, সেই মুহূর্তে ঘটল ঘটনাটা। তিনি তার মনের মধ্যে শুনতে পেলেন তাঁর কাশ্মীরি টেবিলের কণ্ঠ, সেই প্রথম: আশা, তুমি জানো না, কিন্তু আমি জানি, এটাই তোমার শেষ পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স। আর সময় নষ্ট করার সময় নেই। তোমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা দুষ্টু মেয়েটাই তোমাকে করেছে আশা ভোঁসলে। এই কথাটুকু জানিয়ে যেও পৃথিবীকে। না হলে তার প্রতি, মানে ওই দুষ্টু মেয়েটার প্রতি, অবিচার হবে। এমন একটা মারাত্মক কথা এই বছরে পৃথিবীর সেরা বিয়ের উৎসবের মাঝখানে! আর সময় পেল না আহাম্মক টেবিল!

মুম্বইয়ের বান্দ্রা এলাকায় পেরি ক্রস রোডে শচীনের স্বপ্নপুরী ‘ডোরব ভিলা’ থেকে লোয়ার পারেলে নিজের বাড়ি কাসা গ্রান্ডেতে ফেরার পথে, শীতল লিমোজিনে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায়, আশা আবার শুনতে পেলেন তাঁর কাশ্মীরি টেবিলের কণ্ঠস্বর: তোমার মধ্যেকার ওই কালজয়ী দুষ্টু কন্যাটির সব কথা না-লিখে তোমার কোথাও যাওয়া চলবে না। এই অবিচার তুমি সেই মেয়েটার প্রতি করতে পারো না, যে তোমাকে নিয়ে গেছে তোমার ভুবনজোড়া খ্যাতি এবং অবিশ্বাস্য দারিদ্র থেকে অফুরন্ত ঐশ্বর্যে!
আশার তন্দ্রা ছুটে যায়। তিনি মনে মনে টেবিলকে বলেন, তুমি তো জানো। আমি লেখক নই। আমি লিখতে পারি না। এই লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া…
তাছাড়া কী? টেবিলটার ছোট্ট প্রশ্ন।
তাছাড়া, যাকে তুমি দুষ্টু মেয়ে বলছ, যার গান আমি বারবার গেয়েছি, সেই মেয়ে, সেইসব গান, জড়িয়ে আছে আমার গহন ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে। কী করে লিখব? সম্ভব?
সম্ভব যে করতেই হবে, আশা। তোমার কথা তুমি বলবে না তো বলবে কে? এছাড়া, আরও একটা কথা। ওই দুষ্টু মেয়েই তোমাকে পথ দেখিয়েছিল, তোমার দিদি লতা মঙ্গেশকরের ছায়া থেকে মুক্তির পথ। আশা, তুমিই ভারতের প্রথম নারী যার কণ্ঠে অন্যায়ের গান, পাপের গান, শরীর তাতানো গান পৃথিবীকে মাতিয়ে দিল। আপাতভাবে যা সামাজিক অন্যায়, যার ডাক আমাদের নিয়ে যায় চেনা মূল্যবোধ, মধ্যবিত্ত রীতিনীতির বাইরে, যার কুহক আমাদের লোভ দেখায় সমাজ-সংসারের সীমানা পেরতে, তার সঙ্গে শিল্প আর সৃজনের সংযোগ তো যুগ-যুগান্তরের, আশা। তোমার গান যা করেছে, লতার গান তা পারেনি। লতার গানে আছে পূজা। তোমার গানে শরীরের ডাক ও প্রকাশ। লতার গানে আধ্যাত্মিকতা। তোমার গানে মত্ততা। লতার গান অন্তর্মুখী। তোমার গানে মাতোয়ারা। মনে রেখো, আশা, ওই দুষ্টু মেয়ে ছাড়া তোমার লতামুক্তি হত না। তুমি হয়ে থাকতে চিরদিনের মেঘে ঢাকা তারা।

কিন্তু ওই দুষ্টু মেয়েকে আমি কৈশোরে সামলাতে পারিনি। বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম। আর যন্ত্রণাও পেয়েছি সেই পাপের ফলে। নরক যন্ত্রণা। সেসব কথা বলব কী করে?
সেসব কথা না বললে কী করে বলবে তোমার উত্তরণের আখ্যান? তোমার জীবনে মেহেরবানকে ডাক দেওয়ার কথা? সমস্ত পৃথিবীকে ‘দম মারো দম’ বলে মাতিয়ে দেবার গল্প? মনে আছে তোমার, স্বয়ং দেবানন্দ এই গানটাকে বিপজ্জনক বলে বাদ দিতে চেয়েছিলেন। আর তুমি দাপটের সঙ্গে বলেছিলে, এই গান হবে জগৎ জুড়ে সুপারহিট! সেটা ছিল হিপিদের যুগ। আর সেই সময়ে এই গান! কী কাণ্ড বলো তো! তখন যদি তোমার দিদি লতার অবস্থা দেখতে। ওই দুষ্টু মেয়েটা তোমার কণ্ঠে, তোমার মনে, তোমার ভালোবাসায় না-থাকলে এমন অপরাজেয় অ-পূজার গান গাইতে পারতে আশা? ওই দুষ্টু মেয়েটাকে নিয়ে তোমাকে লিখতেই হবে। শোধ করতে হবে তার কাছে তোমার ঋণ!
কী করে আমি ভুলে যাব আমার মারাঠি-কোঙ্কনি বাবা দীননাথকে? কী করে ভুলে যাব গুজরাটি মা সেবন্তীকে? আমার বাবা ছিলেন ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাধক। আর আমার মা রক্ষনশীল গুজরাটি নারী। তাঁদের মেয়ে হয়ে আমি কী করে লিখব যে, আমার মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ব্যাড গার্লের কথা?

এই বাবা-মার মেয়ে হয়ে, আশা, কী করে গেয়েছিলে তুমি অমন মনপ্রাণ ঢেলে, গলায় এনে মদের নেশা, ‘রাত আকেলি হ্যায়’-এর মতো গান? ভারতের কোন পুরুষ পাগল হয়নি এই গান শুনে? তুমি তো জানো, আশা, ‘জুয়েল থিফ’ ছবির সব হিট গান লতার গাওয়া। শচীন দেববর্মন কিন্তু এই একটি গান, যে গানে একা রাতের নারী নেশারু ডাক দিচ্ছে পুরুষকে, সেই গানের জন্যে বেছে নিলেন তোমার মধ্যেকার দুষ্টু মেয়েটাকেই। জেনে রাখো, আশা, বাধা দিয়েছিলেন লতা, তোমার প্রতিভার পূর্ণ প্রকাশ তোমার দিদি চাননি। কিন্তু শচীনকর্তা লতার বাধা টপকে তোমার কণ্ঠে ঠিক গানটা বসিয়ে বাজিমাত করে দিলেন। তখন তুমি শচীন দেবকে বললে না কেন, তোমার সাংগীতিক ঐতিহ্যের কথা? তোমার পারিবারিক ভাবধারার কথা? ভারতীয় রাগসংগীত নিয়ে তোমার নিয়মিত সাধনার কথা? বলোনি তার কারণ, তোমার কণ্ঠের ওই দুষ্টু মেয়েটার তাড়নায় তুমিই একদিন হয়ে উঠবে মুজরার রানি! তোমার কণ্ঠে বেঁচে থাকবে নারীর পবিত্র পূজা ও সমর্পণ নয়, বেঁচে থাকবে ব্যাড গার্লের প্রতিস্পর্ধা, চ্যালেঞ্জ, কিংবা তার মদালো আকুতি, আর্তি, তরঙ্গ।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙার পর বেশ কিছুক্ষণ চোখ বুজে শুয়ে থাকলেন আশা। টেবিলের কথাগুলো মেঘের মতো ভেসে যাচ্ছে তাঁর মনের আকাশে। মেঘ একটি জায়গায় ঘন হয়ে থামল। রাঙা হয়ে উঠল তাঁর বুকটা। ঝড় ওঠার আগে যেমন হয়। কিংবা মেঘের গায়ে সূর্য ডোবার পরে। আশার মনে হল, বুকের মধ্যে বিন্দু বিন্দু রক্ত পড়ছে: আশা ভুলতে পারছেন না কিছুতেই, লতার বিরোধিতা, বাধা, মারপ্যাঁচ, আড়াল থেকে ছুরি।

আশা তাড়াতাড়ি বিছানা ছাড়েন। শরীরের জোর ক্রমশ কমছে। কেমন যেন বুঝতে পারেন পুজোর আসনে বসে, বড্ড ক্লান্ত তিনি, তাঁর দীর্ঘ যাত্রা প্রায় শেষ, তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন কিনারে। শুধু একটি কাজ বাকি। তাঁর ভিতর থেকে ভীতিহীন ওই দুষ্টু মেয়েটার কথা এবার বার করে আনতেই হবে। ঝিনুকের কাজকরা কাশ্মীরি টেবিলটার ওপরে একটা আনকোরা লেখার প্যাডে লিখতে শুরু করেন আশা:
আমার জন্ম ১৯৩৩-এর ৮ সেপ্টেম্বর। তখন তো ইন্ডিয়া ব্রিটিশদের অধীনে। আমি জন্মালাম সাংলির গোয়ারে। যে জায়গাটা এখন মহারাষ্ট্রে। বাবা-মা সেখানেই থাকতেন। আমরা চার বোন এক ভাই। এই অর্ডারে: লতা, মিনা, আমি, ঊষা এবং হৃদয়নাথ। চার বোনের দু’ অক্ষরের নাম। কিন্তু ভাই হঠাৎ পাঁচ অক্ষরে! এই বাড়াবাড়ির কারণ হয়তো, পরপর চারটে মেয়ে হওয়ার পর পুত্রসন্তান লাভের পুলক।
আগেই বলেছি, বাবা ছিলেন মার্গসংগীতের সাধক। এবং নাটক-পাগল মানুষ। সুতরাং আমরা একেবারে খুদে অবস্থা থেকেই উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং অভিনয়ের তালিম নিতে লাগলাম বাবার কাছে। আমার স্বপ্ন, উচ্চাঙ্গ সংগীতের শিল্পী হওয়া।

ভাবি এক। ভাগ্য চলে তার খুশিতে। বাবা দীননাথ দুম করে মারা গেলেন ১৯৪২-এ। আমার বয়েস ৯। আমরা পড়লাম অথৈ জলে। পেটের দায়ে কাজে নামলাম ওই বয়সেই। ১৯৪৩-এ ‘মাঝা বল’ নামের একটা মারাঠি সিনেমায় প্লে-ব্যাকে গান করলাম। পাঁচ বছরের মধ্যে সত্যিই আমি বম্বেতে (তখন কিন্তু মুম্বই নয়) হিন্দি ছবির প্লে-ব্যাক সিঙ্গার হয়ে গেলাম। সাল ১৯৪৮। ছবি ‘চুনারিয়া’। গান ‘শাওন আয়া’। তবে একা গাইনি। পরের বছর, ১৬ বছর বয়েসে, হিন্দি ছবিতে আমার প্রথম সোলো। ছবির নাম কী জানেন? ‘রাত কি রানি’! তখনই কি ধরা দিয়েছে আমার কণ্ঠে দুষ্টু মেয়ের প্রথম আঁচ?
আমার ১৬ বছর বয়সে সত্যিই আমার ভেতরের দুষ্টু মেয়ে আমাকে কেমন যেন আচ্ছন্ন করে আমার জীবনের লাগামটা হাতে তুলে নিল। গণপতরাও ভোঁসলে নামের এক পুরুষের হাবুডুবু প্রণয়ে পড়লাম আমি। পিছন ফিরে তাকিয়ে আজ মনে হচ্ছে– প্রেমে পড়ে ছিলাম, না পাল্লায়? সে যাই হোক, তখন তো মনে হয়েছিল, গণপত ছাড়া বাঁচব না। মনে হয়েছিল, গান গেয়ে আমার তেমন কিছু হবে না। দিদি লতা তখন নামে-ডাকে-রোজকারে থৈথৈ। আমি ডুবে যাচ্ছিলাম অনিশ্চয়তায়, হতাশায়। হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের কণ্ঠের গানে দিদি। আমাকে দেওয়া হয় পার্শ্ব চরিত্রের গান। কিংবা নষ্ট বা শয়তান মেয়ের গান। কেউ কেউ বলতে লাগল, আমি তো নকল গীতা দত্ত। বুঝতেই পারছিলাম এই যুদ্ধে আমি হেরে যাচ্ছি। এবং কারও অদৃশ্য হাত কাজ করছে আমাকে ধ্বংসের পিছনে। সেই সময়ে গণপতি এল আমার জীবনে। আমি ওকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। বুঝতে পারিনি, কী দীর্ঘ, অসম্ভবকে সম্ভব করা এক জীবনযুদ্ধ আমার জন্য অপেক্ষা করছে, যে যুদ্ধ আমাকে পৌঁছে দেবে সাফল্যের শিখরে।
কিছুদিনের মধ্যে বুঝতে পারলাম, গণপতের সঙ্গে আমার বিবাহিত জীবন ক্রমশ নরক! বেরতেই হবে এই বিয়ে থেকে। সেই গল্পে গিয়ে কাজ নেই। শুধু এইটুকু বলি, গণপতের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। যদিও আমি ওর পদবি বয়ে বেড়ালাম আজীবন।

কিন্তু আবার আমি প্রেমে পড়লাম। আমি তার। সে আমার। সুরের ঈশ্বর সে। এবং সে আমাকে ভেবেছিল আমি তার সুরের সরস্বতী। সে তখন বলিউডের কোহিনুর। সুরকার ওঙ্কারপ্রসাদ নায়ার। সবাই তাকে চেনে ওপি নামে। আমাদের গাঁটছড়া বাঁধা হল একটি শর্তে। এই প্রেমের কোনও প্রকাশ ঘটবে না কোথাও। কেউ পাবে না, জানবে না আমাদের প্রণয় সংবাদ। কারণ, ওপি বিবাহিত। এবং চার ছেলেমেয়ের বাবা। সংসার থেকে বেরিয়ে আসতে সে পারবে না। তাই আমাকে প্রতিশ্রুত হতে হল ওপির কাছে, আমি এমন কিছু বাড়াবাড়ি কোনওদিন করব না যাতে তার বউ সরোজমোহিনী ওপির জীবনে আমার অস্তিত্বের এতটুকু আঁচ পায়।
১৯৫৮। আমার জীবনে ওপি এল, তোলপাড়! অসামান্য সুন্দরী নায়িকা মধুবালার ঠোঁটে আমি গাইলাম ওপির সুরে ‘আইয়ে মেহেরবান’। রাতারাতি ভারত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আমার কণ্ঠের রতিস্নান। আমি বুঝলাম এই গানের সবটুকু, সব মায়া ও মাদক, আমার কণ্ঠের জন্য রচনা করেছে ওপি।

এরপর আমার সুরের ঈশ্বরের কাছ থেকে এল এই নোট: আশা, মনে রেখো, তুমি হচ্ছ আমার জেদি, দেশি, মুখরা, চোপায় তুলনাহীন, টাঙ্গাওয়ালি (অনেকের মনে পড়তে পারে ‘শোলে’র হেমা মালিনীকে)। তোমাকে দিয়ে আমি আগুন ধরাব। আশা, তোমার কণ্ঠে সুরের চলনের মধ্যে ঘোড়ার দৌড়ের শব্দ পেয়েছি আমি। তোমার গান আমার সুরে ছুটবে সারা ভারত জুড়ে। তোমাকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হবে না।
১৯৫২ সালের ‘ছম ছমা ছম’ থেকে ১৬ বছর একটানা ওপি শুধু আমার কণ্ঠের গানেই সুর দিয়েছে। আর ঢেলে দিয়েছে আমার প্রতি তার হৃদয়ের ভালোবাসা। কিন্তু আমাদের প্রেম আড়ালে থাকল না। হয়ে উঠল বলিউডের সব থেকে চর্চিত গোপন। ফলে ওপির দাম্পত্যজীবন হয়ে উঠেছিল অসহনীয়। সে জানাল, আমার সঙ্গে সে আর কাজ করতে পারবে না। তার শেষ কাজ আমার সঙ্গে: ‘প্রাণ যায় পার বচন না যায়’। এরপর সে আর কারও কণ্ঠের গানেই সুর বসায়নি। শত অনুরোধ সে ফিরিয়ে দিয়েছে, আমার সুর গান সব মরেছে, এই কথা বলে। সংসার ছেড়ে থাকত মুম্বইয়ের ঠানেতে, একা ফ্ল্যাটে। ২০০৭-এর ২৮ জানুয়ারি খবর পেলাম ওপি আর নেই।

ইতিমধ্যে ১৯৮০-তে আমি অবশ্য রাহুল দেববর্মনকে বিয়ে করেছি। এবং রাহুলও আমার কণ্ঠে খুঁজে পেয়েছে এক দুষ্টু মেয়েকেই। কিন্তু সেই মেয়ে ওপির রোম্যান্টিক দেশি মুখরা স্ট্রিট-স্মার্ট টাঙ্গাওয়ালি নয়। সে শহুরে ভ্যাম্প, সে নাইট ক্লাবের গায়িকা, সে সর্বাঙ্গে মুখর নিশিপদ্ম হেলেন। রাহুল গড়িয়ে দিল আমার কণ্ঠে তার ক্যাবারে জ্যাজ-মেশানো শহুরে রাতের রতি ও রমণ অনন্য হেলেন তারল্যে। আমার কণ্ঠের দুষ্টুমির দুই ধারা। একটির ঈশ্বর ওপি। অন্যটির সৃজক রাহুল দেববর্মন। দু’জনের কেউ নেই এই পৃথিবীতে। আমি আছি একা। অপেক্ষায়। তবে আর বেশিদিন নয়। একটা বাংলা গান অনেকদিন আগে রেকর্ড করেছিলাম। আজকাল গুনগুন করি: হয়তো কোনওদিন ভুলে যাবে তুমি/ ভুলতে কি পারব তোমায়?
…………………….. পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য পর্ব ……………………
পর্ব ৮৯: রঙে রসে অফুরান রবি বর্মার তুলির টান
পর্ব ৮৮: ন্যুড মডেলই মাতিসের ভাবনার টেবিল
পর্ব ৮৭: চণ্ডীমঙ্গল না পড়লে সে কীসের বাঙালি!
পর্ব ৮৬: সাধারণের জীবন রাজনীতির বিষয়, শিখিয়েছে মনুর সংহিতা
পর্ব ৮৫: চিঠির মোড়কে নষ্ট প্রেমের গোপন অভিসার
পর্ব ৮৪: চা নয়, চায়ের বই যখন প্রেমের অনুঘটক
পর্ব ৮৩: আধ্যাত্মিক বিরহ দিয়ে গড়া প্রেমের মহাকাব্য
পর্ব ৮২: এক মৃত্যুহীন ক্লাসিক কিংবা যৌনতার সহজপাঠ
পর্ব ৮১: দেশহীন, ভাষাহীন ঝুম্পা
পর্ব ৮০: সাহসী প্রেমের চিঠি লেখা শিখিয়েছিল যে বাঙালি যুগল
পর্ব ৭৯: সুরানিলয়ের টেবিল থেকেই জন্ম নিয়েছিল উপন্যাসের ভাবনা
পর্ব ৭৮: একবিন্দু আত্মকরুণা নেই অঞ্জনের আত্মজীবনীতে
পর্ব ৭৭: অ্যানির ‘দ্য ইয়ার্স’ শেখায় অন্তহীন ইরোটিসিজম-ই জীবনের পরমপ্রাপ্তি
পর্ব ৭৬: জয় গোস্বামীর সাজেশনে মুগ্ধতা জাগাল ‘সিম্পল প্যাশন’
পর্ব ৭৫: যে নারীর শেষপাতা পর্যন্ত পৌঁছতে পারেননি লেখক
পর্ব ৭৪: সেই তরুণীর জন্য বেঁচে আছে বোকা মনকেমন!
পর্ব ৭৩: কাফকার ভয়-ধরানো প্রেমপত্র!
পর্ব ৭২: থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, কলকাতা বইমেলায় শ্রেষ্ঠাংশে তবে রবীন্দ্র-ওকাম্পো?
পর্ব ৭১: একশো বছরের নৈরাজ্য ও একটি লেখার টেবিল
পর্ব ৭০: আত্মজীবনী নয়, মার্গারেটের ব্রতভ্রষ্ট স্মৃতিকথা
পর্ব ৬৯: রুশদির ‘দ্য ইলেভেনথ আওয়ার’ শেষ প্রহরের, অনিবার্য অন্তিমের দ্যোতক
পর্ব ৬৮: মাংসও টেবিলের কাছে ঋণী
পর্ব ৬৭: ভ্রমণ-সাহিত্যকে লাজলো নিয়ে গেছেন নতুন পারমিতায়
পর্ব ৬৬: নরম পায়রার জন্ম
পর্ব ৬৫: যে বইয়ের যে কোনও পাতাই প্রথম পাতা
পর্ব ৬৪: খেলা শেষ করার জন্য শেষ শব্দ পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন জেফ্রি আর্চার
পর্ব ৬৩: সহজ ভাষার ম্যাজিক ও অবিকল্প মুরাকামি
পর্ব ৬২: জীবন তিক্ত এবং আশা করা ভুল, এই দর্শনই বিশ্বাস করেন ক্রাজনাহরকাই
পর্ব ৬১: লন্ডনে ফিরে এলেন অস্কার ওয়াইল্ড!
পর্ব ৬০: পাপ ও পুণ্যের যৌথ মাস্টারপিস
পর্ব ৫৯: মাতৃভক্তির দেশে, মাকে ছেড়ে যাওয়ার আত্মকথন
পর্ব ৫৮: চিঠিহীন এই যুগের শ্রেষ্ঠ প্রণয়লিপি
পর্ব ৫৭: লেখার টেবিল কি জানে, কবিতা কার দান– শয়তান না ঈশ্বরের?
পর্ব ৫৬: প্রেমের নিশ্চিত বধ্যভূমি বিয়ে, বার্ট্রান্ড রাসেলের লেখার টেবিল জানে সেই নির্মম সত্য
পর্ব ৫৫: জুলিয়া রবার্টসকে হিন্দুধর্মে দীক্ষা দিয়েছিল একটি বই, একটি সিনেমা
পর্ব ৫৪: আপনার লেখার টেবিল নেই কেন মানিকদা?
পর্ব ৫৩: পুরুষরা যে কতদূর অপদার্থ, ড্রেসিং টেবিলের দেখানো পথে মেয়েরা প্রমাণ করে দেবে
পর্ব ৫২: একটাও অরিজিনাল গল্প লেখেননি শেক্সপিয়র!
পর্ব ৫১: প্রমথ-ইন্দিরার মতো প্রেমের চিঠি-চালাচালি কি আজও হয়?
পর্ব ৫০: হাজার হাজার বছর আগের পুরুষের ভিক্ষা এখনও থামেনি
পর্ব ৪৯: কুকথার রাজনীতিতে অমরত্বের স্বাদ পেয়েছেন জর্জ অরওয়েল
পর্ব ৪৮: টেবিলই ওকাম্পোর স্মৃতি, আত্মজীবনীর ছেঁড়া আদর
পর্ব ৪৭: শেষ বলে কিছু কি থাকতে পারে যদি না থাকে শুরু?
পর্ব ৪৬: যে টেবিলে দেবদূত আসে না, আসে শিল্পের অপূর্ব শয়তান
পর্ব ৪৫: ফ্রেডরিক ফোরসাইথকে ফকির থেকে রাজা করেছিল অপরাধের পৃথিবী
পর্ব ৪৪: আম-বাঙালি যেভাবে আমকে বোঝে, দুই আমেরিকান লেখিকা সেভাবেই বুঝতে চেয়েছেন
পর্ব ৪৩: দু’পায়ে দু’রকম জুতো পরে মা দৌড়ে বেরিয়ে গেল, ইবতিসম্-এর উপন্যাসের শুরু এমনই আকস্মিক
পর্ব ৪২: অন্ধকার ভারতে যে সিঁড়িটেবিলের সান্নিধ্যে রামমোহন রায় মুক্তিসূর্য দেখেছিলেন
পর্ব ৪১: বানু মুশতাকের টেবিল ল্যাম্পটির আলো পড়েছে মুসলমান মেয়েদের একাকিত্বের হৃদয়ে
পর্ব ৪০: গোয়েটের ভালোবাসার চিঠিই বাড়িয়ে দিয়েছিল ইউরোপের সুইসাইড প্রবণতা
পর্ব ৩৯: লেখার টেবিল বাঙালির লাজ ভেঙে পর্নোগ্রাফিও লিখিয়েছে
পর্ব ৩৮: বঙ্গীয় সমাজে বোভেয়ার ‘সেকেন্ড সেক্স’-এর ভাবনার বিচ্ছুরণ কতটুকু?
পর্ব ৩৭: ভক্তদের স্তাবকতাই পাশ্চাত্যে রবীন্দ্র-কীর্তি স্থায়ী হতে দেয়নি, মনে করতেন নীরদচন্দ্র চৌধুরী
পর্ব ৩৬: একাকিত্বের নিঃসঙ্গ জলসাঘরে মারিও ভার্গাস লোসা যেন ছবি বিশ্বাস!
পর্ব ৩৫: জীবনের বাইশ গজে যে নারী শচীনের পরম প্রাপ্তি
পর্ব ৩৪: যা যা লেখোনি আত্মজীবনীতেও, এইবার লেখো, রাস্কিন বন্ডকে বলেছিল লেখার টেবিল
পর্ব ৩৩: ফিওনার সেই লেখার টেবিল মুছে দিয়েছিল মেয়েদের যৌনতা উপভোগের লজ্জারেখা
পর্ব ৩২: বাঙালি নয়, আন্তর্জাতিক বাঙালির সংজ্ঞায় স্পিভাক এসে পড়বেনই
পর্ব ৩১: প্রতিভাপাগল একটি বই, যাকে দিনলিপি বলে সামান্য করব না
পর্ব ৩০: পতিতালয়ের সেই লেখার টেবিল জাগিয়ে তুলেছিল ইসাবেলের হৃদয়-চেতনা
পর্ব ২৯: পাথরে প্রাণ আনে যে টেবিলের স্পর্শ
পর্ব ২৮: নিজের টেবিলকে কটাক্ষ করি, কেন অ্যানে মাইকেলসের মতো লিখতে পারি না?
পর্ব ২৭: নারীর রাগ-মোচনের কৌশল জানে মিলান কুন্দেরার লেখার টেবিল!
পর্ব ২৬: ভালোবাসা প্রকাশের সমস্ত শব্দ পেরিয়ে গিয়েছিল এলিয়টের লেখার টেবিল
পর্ব ২৫: যে টেবিলে জন্ম নেয় নগ্নতা আর যৌনতার নতুন আলো
পর্ব ২৪: প্রেমের কবিতার ভূত জন ডানকে ধরেছিল তাঁর উন্মাদ টেবিলে, মোমবাতির আলোয়
পর্ব ২৩: যে টেবিল আসলে বৈদগ্ধ আর অশ্লীলতার আব্রুহীন আঁতুড়ঘর!
পর্ব ২২: মহাবিশ্বের রহস্য নেমে এসেছিল যে টেবিলে
পর্ব ২১: গাছ আমাদের পূর্বপুরুষ, লেখার টেবিল বলেছিল হোসে সারামাগোকে
পর্ব ২০: টেবিলের কথায় নিজের ‘হত্যার মঞ্চে’ ফিরেছিলেন সলমন রুশদি
পর্ব ১৯: প্রতিভা প্রশ্রয় দেয় অপরাধকে, দস্তয়েভস্কিকে শেখায় তাঁর লেখার টেবিল
পর্ব ১৮: বিবেকানন্দের মনের কথা বুঝতে পারে যে টেবিল
পর্ব ১৭: ‘গীতাঞ্জলি’ হয়ে উঠুক উভপ্রার্থনা ও উভকামনার গান, অঁদ্রে জিদকে বলেছিল তাঁর টেবিল
পর্ব ১৬: যে লেখার টেবিল ম্যাকিয়াভেলিকে নিয়ে গেছে শয়তানির অতল গভীরে
পর্ব ১৫: যে অপরাধবোধ লেখার টেবিলে টেনে এনেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে
পর্ব ১৪: লেখার টেবিল গিলে নিচ্ছে ভার্জিনিয়া উলফের লেখা ও ভাবনা, বাঁচার একমাত্র উপায় আত্মহত্যা
পর্ব ১৩: হ্যামনেট ‘হ্যামলেট’ হয়ে বেঁচে থাকবে অনন্তকাল, জানে সেই লেখার টেবিল
পর্ব ১২: রবীন্দ্রনাথের লেখার টেবিল চিনতে চায় না তাঁর আঁকার টেবিলকে
পর্ব ১১: আর কোনও কাঠের টেবিলের গায়ে ফুটে উঠেছে কি এমন মৃত্যুর ছবি?
পর্ব ১০: অন্ধ বিনোদবিহারীর জীবনে টেবিলের দান অন্ধকারের নতুন রূপ ও বন্ধুত্ব
পর্ব ৯: বুড়ো টেবিল কিয়ের্কেগার্দকে দিয়েছিল নারীর মন জয়ের চাবিকাঠি
পর্ব ৮: অন্ধকারই হয়ে উঠলো মিল্টনের লেখার টেবিল
পর্ব ৭: কুন্দেরার টেবিলে বসে কুন্দেরাকে চিঠি
পর্ব ৬: মানব-মানবীর যৌন সম্পর্কের দাগ লেগে রয়েছে কুন্দেরার লেখার টেবিলে
পর্ব ৫: বিয়ের ও আত্মহত্যার চিঠি– রবীন্দ্রনাথকে যা দান করেছিল লেখার টেবিল
পর্ব ৪: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের টেবিল আর তারাপদ রায়ের খাট, দুই-ই ছিল থইথই বইভরা
পর্ব ৩: টেবিলের গায়ে খোদাই-করা এক মৃত্যুহীন প্রেমের কবিতা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved