Robbar

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার ক্লাস

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 23, 2026 6:33 pm
  • Updated:March 23, 2026 6:41 pm  

এহেন দিনকালে ‘সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে’! কাব্যসাহিত্যের পাঠদানে সাময়িকভাবে বিভাগে আসছেন মধ্যরাতের কলকাতা শাসনকারী তিন চিরযুবক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-শক্তি চট্টোপাধ্যায়-শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। আমরা তো তাথৈ তাথৈ, মাস্টারমশাইরাও চেপেচুপে আহ্লাদ ঢাকতে পারছেন না। অবশেষে বিস্তর জল্পনা সার্থক করে আমাদের সমবেত গদগদচিত্তসম্বল বিভাগের একটেরে ঘরখানায় আসন পাতলেন তাঁরা। নীরার কবি সুনীল আর কলকাতা শাসনের জার্নাল-লেখক শরৎকুমারকে নিয়ে অতঃপর মুগ্ধতার রেশ তৈরি হতে থাকল বলাই বাহুল্য, কেবল শাক্ত কবিকে বিশুদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের ছাঁদে দেখে বিস্ময়ের বলয় ঘিরতে লাগল রোজরোজই।

সংহিতা চক্রবর্তী

‘ইশকুল পাঠশালে গাই-হরিণেরা কাগজের ঘাস খায়, তোতা বনে, তোমার কাহিনী ছাপা হয়
রবীন্দ্রনাথের নামে মিছিমিছি শান্তিনিকেতনে!’

প্রথম পড়ে চমকে উঠেছিলাম! তখন ইশকুলে পড়ি। বারো ক্লাস। সব বুঝি টাইপ মনোভাব। বাবাকে লুকিয়ে প্রায় ভবিতব্য ভূগোল পড়ায় গোল দিয়ে মায়ের আঁচল ধরে শান্তিনিকেতনের বাংলা বিভাগের স্বপ্ন দেখি। রবীন্দ্র ঠাকুরটি নির্ঘাত অনন্তে মুচকি দিয়েছিলেন!

কালেদিনে সেই বাংলা বিভাগের ছাত্রদশায় শোরগোল পড়ে গেল– চমকের পর চমক আসছে। তৈয়ার হোওওওওও!

খুলি তবে সে গল্পের মতো সত্যিকথার ঝাঁপি?

সেটা গত শতকের নয়ের দশক। পাঠভবনের মুখোমুখি বিশ্বভারতী বাংলা বিভাগের পুরনো ঘরবসত। কখনও গৌরপ্রাঙ্গণের ঘাসে, কখনও-বা বিভাগের সিমেন্টের ছাতার নীচে তখন চলছে আমাদের নিয়মিত পাঠপরিক্রমণ। রবীন্দ্রকবিতায় সোমেনদা (অধ্যাপক সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়), সুতপা ভট্টাচার্য, আধুনিক কবিতায় আশিসদাদের পাশাপাশিই ছন্দের পাঠ দেন অধ্যাপক রামবহাল তেওয়ারি কিংবা ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেনের কন্যা সংঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায় (নোটনদি)।

কোনওদিন সোনামুখ করে শুনি, লিখি নোটস, উত্তর দিই টকাটক আর বেশিরভাগ দিনই বোবার শত্তুর নেই মুখ করে পাশ কাটাই। সহৃদয় অধ্যাপকের সহজাত ক্ষমার কমা, দাঁড়িতে দিন কাটে। কবিতাকে ভালোবাসার সঙ্গে তার কঙ্কালের কোনও যোগ নেই, এমত বেবোধ সুবিধাবাদী আঁতেলপনায় উদ্ধত দিন পরীক্ষার আগের রাতে বিধিবদ্ধ ফাঁকি সারাইয়ে গুমরে ওঠে।

এহেন দিনকালে ‘সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে’! কাব্যসাহিত্যের পাঠদানে সাময়িকভাবে বিভাগে আসছেন মধ্যরাতের কলকাতা শাসনকারী তিন চিরযুবক: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-শক্তি চট্টোপাধ্যায়-শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়। আমরা তো তাথৈ তাথৈ, মাস্টারমশাইরাও চেপেচুপে আহ্লাদ ঢাকতে পারছেন না। অবশেষে বিস্তর জল্পনা সার্থক করে আমাদের সমবেত গদগদচিত্তসম্বল বিভাগের একটেরে ঘরখানায় আসন পাতলেন তাঁরা। নীরার কবি সুনীল আর কলকাতা শাসনের জার্নাল-লেখক শরৎকুমারকে নিয়ে অতঃপর মুগ্ধতার রেশ তৈরি হতে থাকল বলাই বাহুল্য, কেবল শাক্ত কবিকে বিশুদ্ধ মাস্টারমশাইয়ের ছাঁদে দেখে বিস্ময়ের বলয় ঘিরতে লাগল রোজরোজই।

শক্তি ও সুনীল

এযাবৎ শুনে এসেছি, তিনি না কি বোহেমিয়ানের চরম, নিয়মের বাঁধ ভাঙার মানুষ, অতএব– আশায় আশায় থাকি, দু’কান ভরে কবিতা শুনব আর দিন যাবে আড্ডার গতে। যথাকালে দেখা গেল সে গুড়ে বড় বড় পাথর! কবিমানুষটি যেমনই হোন, মাস্টারমশাই শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্লাসে দেরি করার জো নেই, রীতিমত কারণ দর্শাতে হয় এবং সে ‘কৈফৎ’ মাস্টারমশাইয়ের মনঃপূত না হলে তিনি ঠাট্টার ছদ্মবেশে বেশ একটু বকুনিও দিয়ে থাকেন। আমাদের মধ্যে যারা এক কান কাটা, তারা খানিক সমঝে চলি অপর কানের অস্তিত্বটি, আর যারা জন্মগতভাবেই হি হি হাসির তবলা লহরা জানে তারা পার পায় ওইটে সম্বল করে– তবে ক্লাসের টানেই ক্লাস এগয়– দেরির ব্যাজ সয় না।

এইখানে আরও একটু মজা আছে, বাংলা বিভাগের আয়োজনে এই ক্লাসটুকুর গণ্ডি ভালোবাসার ঘায়ে ঘ্যাচাং ফুঁ করে এসে জোটেন সব বিভাগের কবিতাখোরের দল। প্রথম প্রথম আমরা একটু কলার তুলেছি ঠিকই, তবে ভালো ছাত্তরের জয় চিরদিনই অকাট্য, অতএব কবি-স্যরের নেকনজরে তাঁরাই দিব্যপ্রসাদ পান।

মনে পড়ে তেমনই দু’টি উজ্জ্বল চোখের এক প্রায়-বালকের কথা, ইংরেজি বিভাগ থেকে মেলার মাঠ পেরিয়ে উড়ে আসত। কবিতা লিখত যে, প্রশ্নের ধরনেই মালুম হত। পড়াশোনার মাঝেই ছেলেবেলার বহড়ুর গল্পে বিভোর কবিকে তুমুল একটা জিজ্ঞাসায় তুলে আনার ক্ষমতা ছিল সেই নীলাঞ্জন নামের ঈর্ষণীয় তরুণের। কিছু ঈর্ষা যে আরামপ্রদ লালনের বস্তুও বটে, শক্তিদার ক্লাস নইলে জানা হত না। হ্যাঁ, আমরা সেই সেকালের বিশ্বভারতীর ছেলেমেয়ে, মাস্টারমশাইদের ‘দা’, ‘দি’ জুড়েই ডাকার চলনে ছিলাম। আজ ভাবি, সেইসবও কেমন পদ্মপাতার জল হয়ে রয়ে গেছে!

সে জলের ভিতর অশ্রুসংকেতের মতো রয়ে গেছে আরও এক ঝলোমলো মুখ। বাংলা বিভাগের শিমুলতলার ক্লাসে তাকে তেমন লক্ষ করিনি, গানের ভুবনডাঙায় যদিও তার বিক্রম অনিবার্য হয়ে উঠছিল বলে জানা যাচ্ছিল, সে এল এই ক্লাসে ঝোড়ো কবিতার মতো। যতই কেননা বজ্র আঁটুনির কবিতার ক্লাসে বসি, সেই বিশুদ্ধ বিশুপাগল দিক ভুলিয়ে নিয়ে যায় আমাদের পদ্যপাঠের কেন্দ্রাভিগ শক্তিকে। শালবীথির উলুকঝুলুক রোদ্দুরে ছায়া ছায়া মায়া ওড়ে– শক্তি চট্টোপাধ্যায়…বিক্রম সিংহ খাঙ্গুরা…নীলাঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়…

শালবীথির প্রান্তে চোখ রেখে এই পরিযায়ীবেলায় চেয়ে দেখি– ‘পদ্য লেখা শেখার ক্লাস’-এ যেতে সেই দুই প্রিয় ছাত্রের কাঁধে হাত রেখে হাঁটছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। হাঁটতে হাঁটতে দুই তরুণ কবি তাঁর কাছে জেনে নিচ্ছেন ছন্দ-মিলের কথা। শক্তিদা উদাসভাবে তাকিয়ে আছেন গাছগুলোর দিকে। রোজ পথ থেকে কুড়িয়ে নিচ্ছেন একটা করে আমলকী।

পদ্য লেখা শেখা যায় কি না এ বিষয়ে বহু কুতর্ক করেছি আগে-পরে নিজেরা, ক্লাসেও গোঁজ হয়ে বসে ভেবেছি, ‘যে পারে সে আপনি পারে’– আমরা ভেবে করব কী? তবু কী যে এক অমোঘ টানে রুটিনের বাইরের সেই ক্লাসে হাজিরা দিয়েছি দিনের পরে দিন, তা সেদিন স্পষ্ট করে না বুঝলেও আজ খানিক বুঝি।

বুঝি, আর কিচ্ছুই না পারি, অন্তত কান তৈরির সুযোগ পেয়েছিলাম একটা। শুধু যে একে অপরের কবিতার কাটাকুটি সামলানোর খেলায় মেতে তাইতেই নয়, এমনকী ওই বহড়ুর গল্প যে অচিন কিশোরের ধরতাই চিনিয়েছিল, সেইখানেও। মনে পড়ে নুনমরিচ চুলের শক্তিদার সেই জানলার বাইরে চেয়ে বলা স্বগতোক্তির মতো কথাগুলি, যা আরও পরে ছাপার আখরে পেলেও তাঁর গমক-মারা স্বর আর নিতান্ত ‘একলষেঁড়ে’ উচ্চারণ রইল লেগে সেসব কথার গায়ে:

‘দাদুর গায়ে এক ধরনের চন্দনের গন্ধ ছিল– ভোরবেলাকার পুজো থেকেই লেগে থাকতো তা। দিনরাত্তির সব সময়েই এই সৌরভ তাঁকে ঘিরে থাকতো সুসংবাদের মতন। স্ত্রী গেলেন, একটি দুটি মেয়ের বর বাদে চার চারটি মেয়ের কপাল পুড়লো। তখনো তিনি সেই চিরন্তন সন্ন্যাসী, অপরকে নিয়ে ব্যস্ত, অসুখী– অসুস্থকে নিয়ে উন্মাদ-সন্ন্যাসীর মতন স্বার্থ নিয়েও নয়।
তিনি আমাকে স্বাভাবিক ভাবে মানুষ করে তুলবার জন্যে তাঁর কাছে রেখেছিলেন, আর আমি যাচ্ছিলাম ক্রমাগতই বেঁকে চুরে। আমার হওয়া হয়নি, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া হয়নি কিছুই। এক ঐ উদাসীনতা ছাড়া।
সারাজীবনটাই মনে হয়, খুব একা ছিলেন তিনি। আমিও অজ্ঞাতে ঐ একা থাকার দীক্ষা নিয়ে থাকতে পারি।’

হ্যাঁ, বিশ্বভারতীর সেকেলে বাংলা বিভাগের ঘরে কবিতার ‘ক্লাস’ নেওয়ার সেই দাপুটে কবি কেবলই চলে যেতেন তাঁর বড় আকাঙ্ক্ষিত কৈশোরের দুরন্ত বেলায়। ছটফট করে উঠত ঘোর লাগানো চাহনি, গৌরপ্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে শালবীথি– আম্রকুঞ্জের চেনা রোদ্দুর-ছায়ারা উধাও হত কোনও এক ফেলে আসা জংলিগন্ধপথে, নাম তার বহড়ু!

হাঁ করে ঊর্ধ্বমুখে তাকানো এই বালখিল্যের দল ভাবত, একদিন যাবেই যাবে কবির সেই ছেলেখেলার দেশে। সেই তাঁর দাদামশায়ের বাড়ি, সেই একটেরে কুয়োতলা, আম-জামের বাগান ঘেঁষে পাথুরে এক শিবমন্দির আর এই সব কিছুর ভেতর ‘একলষেঁড়ে’ এক উদাসীন বালক– বাংলা কবিতার জগৎ তাঁকে পদ্যকার ভেবেই ঘুমিয়ে রইল আজও!

শহরের অসুখ যখন আক্ষরিক অর্থেই হাঁ করে সবুজ খেয়ে চলেছে রাতদিন, সেই চরমতম অসুস্থতার দিনেদের মুখে ছাই দিয়ে একবার আমাদের পড়ুয়াবেলার ইচ্ছেটা ঝালিয়ে নিতে সম্প্রতি পাড়ি জমিয়েছিলাম বহরু (এমনটাই লেখা ইস্টিশানের নামে!)। কী সবুজ কী মায়াবী পথঘাট! এখানে সেখানে চুটুক জলাশয়েও সেই সবুজমায়া খেলছে ইতিউতি। জানা ছিল স্টেশনের গায়েই সে বাড়ি, কিন্তু… ঠিকানা?

সুনীল, শক্তি ও প্রকাশ কর্মকার

নাম বলতেই কেউ বললেন, ‘ফোন করে নিন’।

হায় রে!

অতঃপর স্থানীয় এক মিষ্টির দোকানের মালিক সহায় হলেন। গর্বিত স্বরে জানালেন, ‘এ তো তাঁর মামার বাড়ি, আমরা ধন্য তিনি এ গাঁয়ে ছোটবেলার দিনে আসতেন, একে মনে রেখেছেন’। মূলত তাঁরই নির্দেশে পায়ে পায়ে পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। মনে পড়ল নিশ্চিন্দিপুরে একাকী ফেরা অপুর কথা। ঠিক তেমনই কি লাগত কবির, যদি আজ স্বয়ং এখানে এসে দাঁড়াতেন?

জানি না, কেবল তাঁর কন্ঠস্বরের মধ্যে পাওয়া জমিটুকুনি অনুভব করলাম খোলা চোখের পাওয়া না পাওয়ায়। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়– চিরসবুজ হয়ে আছেন যে এখানে ।

ফিরে যাই ফের ফ্ল্যাশব্যাকে।

আর পাঁচজনের মুখের ঝাল খেয়ে নয়, নিছক কবিতার পাতার জোড়াতালি সয়ে নয়, কবিকে চেনার সুযোগ পেয়েছিলাম তাঁর স্বকন্ঠের আত্মকথনে– তাঁর কবিতাকেও। তাই অনায়াসে পড়ে চলি–

সোনা রূপো তামা থেকে ভয় পাই, ধূলাতে পাই না
প্রাসাদ পরিখা দেখে ভয় পাই, নিকটে যাই না
শুধু পথে পথে ঘুরি, সে কারো নিজস্ব নয় ব’লে
সে তোমার সে আমার, ভিখারির ঝুলিতে কম্বলে
মুখ ঢেকে শুধু থাকে, পড়ে থাকে, উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন।
রাত্রি তো সর্বদা সঙ্গী, তাই, মাঝে মাঝে আসে দিন–
কৃপা করে কাছে আসে বাল্যকাল স্মৃতির মতন
আমলকিতলা নিয়ে কাছে আসে স্মৃতির মতন
আলতামাখা পদচ্ছাপ নিয়ে আসে দূরস্থিত শোকে
প্রেমের মতন কাছে এসেছিলো– বলেছে কুলোকে!

কিংবা

বহুযুগ বাদে এই বৃষ্টি ও মেঘের দিনে শান্তিনিকেতনে আসা,
ভালোবাসা দিয়ে পরিপূর্ণ উধাও খোয়াই
এখনো বুকের কোনো গভীর প্রত্যন্তে দেয় টান
রক্তপাত হওয়া ছিল অনেক সহজ।

তার বদলে যন্ত্রণাকাতর হয় চক্ষুদুটি,
মাকড়সার জাল পাতায় পাতায় বাঁধে, দমকা বাতাসে ছিঁড়ে যেতে।
অভ্যাস এমনই, ভেবে কষ্ট পাওয়া, স্বচ্ছ সুখ নয়…
নিশ্চিত নিভৃত দুঃখে ভেসে যাওয়া, নিরুদ্দেশ ভাসা গোয়ালপাড়ার দিকে…

সুনীল-শক্তি

কোথায় কখন কতটুকু থামতে হবে, কেবল যতিচিহ্ন নয়, বোধ বলে দেয়, কবির কন্ঠ বলে দেয় ফিসফিসিয়ে। বহু মণিরতনের মাঝে অপূর্ব একা আমি পদ্য লেখার জাদু না শিখেও পদ্য পাঠের অমৃতযোগ প্রাপ্ত হই, সেই বা কম কী!

কিন্তু, অমৃত শব্দটির মাঝেই যেন মৃত্যুর অত্যাগসহন বাসা। তারই আভাস ক্ষণে ক্ষণে উতলা করে। শান্তিনিকেতনের কোপাই-খোয়াই, শালবীথি-বকুলবীথি-আম্রকুঞ্জে কীসের যেন এক যাই যাই ডাক, মনে হয় এ বাঁধনহারার সাধন যদি চিরদিনের হত! ক্লাসের বেলা তো দৌড়চ্ছে। স্নাতকস্তর পেরিয়েছি, সামনে খেলার মাঠের মতো ফুরচ্ছে স্নাতকোত্তরের দিনগুলি রাতগুলি আর ফুরচ্ছে ‘পদ্য লেখা শেখা’র ক্লাস।

সেবারের শিক্ষামূলক ভ্রমণে তাই ঢ্যাঁড়া দিতে চেয়েছিলাম। বন্ধুদের ঘ্যানরঘ্যান আর ইতিহাসের চারমিনার, গোলকুন্ডা দুর্গ আঁচল ধরে দিল জোর হ্যাঁচকা। ছিটকে গেলাম। সপ্তা শেষে ফের বসব পদ্যপাঠে, এই প্রথমবার সত্যিকারের কথা দিলাম নিজের ভেতরের পড়ুয়াটাকে।

হায় রে! তখন কী আর জানা ছিল, কবিতা আর ঝুঁটি ধরে কবিতা পড়াতে বসাবে না কোনও দিন এ তুচ্ছ জীবনে!

এখনও তুমুল মনে আছে সেই অ-বাক করা দিনের শুরু থেকে শেষ। ভোরের বেলায় ফিরছি চীনাভবনের পথ দিয়ে। দেখি, তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক পশুপতি শাসমল চলেছেন উল্টোদিকে হনহনিয়ে। উৎসুক মুখে এগিয়ে যেতেই সংক্ষিপ্ততম নির্দেশ দিলেন, ‘চলো’। ব্যাগপত্তর চেনা রিক্সাকাকুর জিম্মায় রেখে তাঁকে অনুসরণ করলাম নিঃশব্দে। জেনারেল লাইব্রেরি বাঁয়ে রেখে দর্শন ভবন পেরোচ্ছি, জানি না তখনও কিছুই, তবু কী এক অনিবার্য উৎকন্ঠায় জিভ শুকিয়ে আসছে। পূর্বপল্লী যাত্রীনিবাসের প্রবেশপথে প্রথম ঘুরে দাঁড়ালেন পশুপতিদা, যেন দুর্বল কন্যাটিকে আগে থেকে মন তৈরির জন্যই, প্রায় স্বরহীনতায় বাজলেন, ‘…আর শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ক্লাস করা হল না তোমাদের’।
শীত করে উঠল কেমন সেই তেইশে মার্চের ঝিমঝিমে সকালে। ১৯ নম্বর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম শক্তিদা সোজাসুজি ঘুমিয়ে আছেন, বুকের ওপরে উপুড় হয়ে আমার মতোই বেকুব আত্মজা তাঁর।

নাহ্‌, চোখে জল ছিল না সে শান্তিনিকেতনের, শুধু কেঠো চোখে তাকিয়ে দেখেছি: চীনাভবন চুপচাপ। শালবীথি পাথর পাথর। মেলার মাঠ ছাই ছাই। মাথা নামিয়ে ছায়ামানুষেরা হেঁটে গেলেও যে কোনও শব্দের হাঁটার পথে ঢ্যাঁরা। অথচ, শব্দ তো ছন্দ-শূন্যতা শিখতে চায় না, শিখতে চায় না– হেসে না ওঠার অসুখ, শিখতে চায় না ঝড় এলে নুইয়ে পড়ার হিসেব। তবু শব্দভেদী বাণখেকোর দল, যেই এসে দাঁড়ায়, ভেসে দাঁড়ায় এবং ভালোবেসে দাঁড়ায়, নৈঃশব্দ্যের ছবি জানান দেয়– শব্দেরা ছন্দের হাত বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

শিবরাম চক্রবর্তী ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়

বিকেলবেলায় কোনও কলকাতামুখী যান দেখতে ছুটিনি আর। দেখলে হয়তো অবিশ্বাসী চোখ গুমরত– ‘অই কপালে কী পরেছ?’

আমাদের পদ্যপাঠের কেন্দ্রমুখী শক্তি হারায়নি তবু আজও। পদ্য লেখা শেখাও চলেছে জীবনভর। কারণ, কবি যখন মাস্টারমশাই, তাঁর শাসন যে অপরূপ!
অক্ষরের ছাঁদে স্বীকারোক্তিটুকু ধরে দিতেই হয় তাই–

দিনের বেলা বাঁশি তোমার বাজে
তখন তোমায় কেউ ভাবে না কাজের
দুয়োরানি দুয়োর এঁটে ঘুরি
তোমার মতো দেখাই ওড়াউড়ি–
দিন কেটে যায় জলসাঘরের সাজে!

রাতবিরেতে নিশুত হলে পাড়া
অবনতির মুখস্থ চেহারা
গাভীর মতোই ইতস্ততঃ চিবাই
ঘাসবিচুলি রক্ষা করতে কী পণ
আপাতত এইটুকুই শিহরণ
নিজের ঘরের বাতি নিজেই নিভাই!

অবনী, তুমি বুঝতে পারছ না কি?
তোমায় দিলাম জলের মতো ফাঁকি!
চুঁইয়ে আসো তবুও আলোর ক্ষতে
দিন কেটে যায়, রাত কাটে না
ভিক্ষা-বারব্রতে! 

কন্যা তিতির সঙ্গে

আজও যে কোনও তেইশে মার্চ সকালবেলায় দুম করে তাঁর মুখ মনে পড়ে। জল আসে না চোখে, ঝাঁঝ আসে। মনে মনে ভুরু কুঁচকে ভাবি, তুমি তো এমন চুপ ছিলে না মাস্টারমশাই? আমাদের সব কথাই হো হো হাসির বানভাসিতে উড়নো যাঁর রীতি, আমাদের ঠান্ডা চা আর নেভানো বিস্কুটে যাঁকে থামানো যায়নি কোনওদিন, সোনাঝুরি-খোয়াই যাঁকে ঝড়ের আগে চিনত– সেই তিনি তিতির পাখি বুকে নিয়েও এমনি অবিচল?

নাহ্‌, ও তোমাকে চিনি না আমরা।

বহড়ুর গল্পবলা পদ্যকথক মাস্টারমশাই আমাদের, তোমাকে চিনে রাখি কেবল তোমার দমকা আসরে, তোমার ঈষৎ বাঁকানো তিরস্কারে আর তোমার স্বর চেনানো পদ্য-সহস্রারে…

তোমাকে কোনও তেইশে মার্চ চিনিনি, চিনব না কিছুতেই।