Robbar

বাংলা কবিতার মাথা ভেঙে দিয়েছিলেন শক্তি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 22, 2026 7:55 pm
  • Updated:March 22, 2026 7:55 pm  

‘ভালোবাসার দীঘিতে কতো করেছো অবগাহন/ পেয়েছ সুখদুঃখ আর ছলে ভোলানো দাহ’– এরকম কয়েকশ জোড়ালাইন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে সেই ছুটন্ত আবহমান বাসের টিকিট দিয়ে দিয়েছে যে বাসের নাম ‘অমরত্ব’। সেই বাস থেকে আর শক্তিকে নামানো যাবে না। এ বাস তো আর হঠাৎ পান খেতে গিয়ে লাফ মেরে ভুটানের বাসে উঠে পড়া নয়। এই দু’টি লাইন এবং সমতুল্য কয়েকশ দ্বিপদী লাইন তাঁকে অক্টাভিও পাজ এবং মিরজা গালিবের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শক্তির কোনও টেরিটরি নেই, এথনিসিটি নেই, বর্ডার নেই। যে ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি, সেই অসমাপ্ত ঘুম থেকে, পড়ে থাকা সরস্বতী থেকে যে মেয়েটি উঠে আসে কালচিনির চা বাগান থেকে– আমি কি তাকে অক্টাভিও পাজের কবিতায় দেখিনি?

সুবোধ সরকার

শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটা টানেলের ভেতর দাঁড়িয়ে জেদি এবং অহংকারী প্রমিথিউসকে বলেছিলেন, ‘তোর হাতের আগুনটা দে আমাকে, আমি পৃথিবীতে গিয়ে বাংলা কবিতায় আগুন ধরিয়ে দেব’। জেদি এবং অহংকারী প্রমিথিউস ফুটেজ খেতে ভালোবাসতেন, সে অবশ্য কে না খেতে চান, তিনি ভাবলেন ইংল্যান্ডের ছোকরাটা, কী একটা নাম শেলি, সে একটা আমাকে নিয়ে মহাকাব্য লিখেছে, ‘প্রমিথিউস আনবাউন্ড’, এবার বাংলায় এই ছোকরাটা আমাকে নিয়ে আর একটা মহাকাব্য লিখবে, টিআরপি বেড়ে যাবে।

সে গুড়ে বালি, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে ‘কমিশনড কাব্য’ লেখানো যায় নাকি। শক্তি প্রমিথিউসের হাত থেকে আগুনটা নিয়ে এসে বাংলা কবিতার বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দিলেন।

আমি যতবার শক্তিদা-কে দেখেছি, ততবার মনে হয়েছে শক্তিদা অত বেপরোয়া নন। গল্প সবাইকে নিয়েই থাকে, কিন্তু বড় প্রতিভা হলে তাঁর গল্পও বড় হয়, মিথ আরও বড় হয়ে ওঠে। তাঁর কবিতার গভীরতা, উচ্চতা ও দিগন্তস্নান যত উদ্দাম হয়েছে, ততই তাঁকে নিয়ে মিথ আর মিথ্যা বহুতল রজনীর মতো প্রগাঢ় হয়েছে। জীবনানন্দকে দু’ হাতে মেখে, দু’ হাত দিয়ে সরিয়ে রেখে পঞ্চাশ দশককে ঘাড়ে নিয়ে পাঁচিল টপকেছেন। তিনি বাংলা কবিতার ঐতিহ্যের হাড়ে দুব্বো গজিয়ে তবে ঘুমোতে গেছেন। ‘আমাকে তুই আনলি কেন ফিরিয়ে নে’– একথা যেদিন বললেন, সেদিন তিনি সবে এসেছেন। তিনি বাংলা কবিতার বিবেক হতে আসেননি। এসেছিলেন ভাঙতে। মাথা ভাঙতে। যে মাথাকে বিজ্ঞরা বলেন প্রথা। কিন্তু তাঁর কবিতার ঘাড়ে তিনি নিজেই যুক্ত করেছেন নৃমুণ্ড, যার ভেতরে একটা নক্ষত্র প্রতিদিন জন্ম নিচ্ছে, প্রতিদিন মারা যাচ্ছে। ভেঙেছেন গড়েছেন, ভেঙেছেন আবার গড়েছেন। কবিতায় তিনি বেপরোয়া। কবিতায় তিনি বিধ্বংসী। কবিতায় তিনি কীর্তিনাশা। আমি যতবার তাঁকে দেখেছি, ততবার দেখেছি শান্ত নীরব। হয়তো তাঁর নীরবতার ভেতর সংহত গ্লেসিয়ার ছিল তা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি। কীসের বেপরোয়া তিনি? র‌্যাবোর মতো আফ্রিকায় পালিয়ে গেছেন? মায়াকভস্কির মতো গুলি চালিয়েছেন? অ্যালেন গিনসবার্গের মতো রাসবিহারিতে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছেন? (সে ছবি আমাকে দেখিয়েছিলেন বব রোসেনথেল নিউ ইয়র্কের অফিসে)। শক্তিদা পান করতেন। সে তো উপাচার্যরাও করে। দুমদাম করে সত্যি কথা বলে দিতেন। মেয়েরা আবার কবিতা লিখতে পারে? এরকম একটি বোমা ফেললেন যেদিন, অর্থাৎ বড় কাগজে পোস্ট-এডিট লিখে বোমাটি ফাটিয়ে দিলেন যেদিন, ওরে বাবা, সেদিনই ঘটনাচক্রে একটি মহিলা কবি ও লেখক সম্মেলন ছিল শহরে, সেখানে গিয়ে আমি টিকতে পারিনি, ১৫ মিনিট থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। বেশিক্ষণ থাকলে মেয়েরা আমাকেই পিটিয়ে দিত। ভাগ্যিস নীরেনদা ছিলেন, অনেক বুঝিয়ে বিজয়াদিকে শান্ত করলেন, বললেন, ‘শোন্ বাবা, আজ তুই বাড়ি যা, রাতে আমি শরৎ-কে ফোন করব’। এক ফোনেই কাজ হয়েছিল। এখন আর কোনও কবির এক ফোনে কাজ হয় না।

‘ভালোবাসার দীঘিতে কতো করেছো অবগাহন/ পেয়েছ সুখদুঃখ আর ছলে ভোলানো দাহ’– এরকম কয়েকশ জোড়ালাইন শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে সেই ছুটন্ত আবহমান বাসের টিকিট দিয়ে দিয়েছে যে বাসের নাম ‘অমরত্ব’। সেই বাস থেকে আর শক্তিকে নামানো যাবে না। এ বাস তো আর হঠাৎ পান খেতে গিয়ে লাফ মেরে ভুটানের বাসে উঠে পড়া নয়। এই দু’টি লাইন এবং সমতুল্য কয়েকশ দ্বিপদী লাইন তাঁকে অক্টাভিও পাজ এবং মিরজা গালিবের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শক্তির কোনও টেরিটরি নেই, এথনিসিটি নেই, বর্ডার নেই। যে ব্যথার মাঝে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি, সেই অসমাপ্ত ঘুম থেকে, পড়ে থাকা সরস্বতী থেকে যে মেয়েটি উঠে আসে কালচিনির চা বাগান থেকে– আমি কি তাকে অক্টাভিও পাজের কবিতায় দেখিনি? কালচিনিতে না মেক্সিকোর উপকূলে সে দাঁড়িয়ে আছে? ঐতিহ্যের হাড়ে দুব্বো গজিয়ে দিয়ে তিনি বাংলা কবিতার মাথা ভেঙে দিয়েছিলেন। তার বদলে কবিতার ঘাড়ে একটা নৃমুণ্ড বসিয়ে চাইবাসা জুড়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এমন এক নৃমুণ্ড যার ভেতরে দু’টি নক্ষত্র এ ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

মধ্যপ্রদেশের ভারত ভবন থেকে তাঁর হিন্দি অনুবাদ বেরিয়েছিল। তাঁকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অশোক বাজপেয়ি। তাঁকে বলা হল, আপনার হিন্দি অনুবাদগুলো শোনানো হবে, আর আপনি মূল বাংলা কবিতাগুলো শোনাবেন আপনার মতো করে। এটাই ছিল সহজতম অনুবাদ কর্মশালা। অনুবাদকের মুখোমুখি বসে অনুবাদ শোনা। প্রয়োজনে পরামর্শ দেওয়া। সবাই ভেবেছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় ওয়র্কশপ থেকে পালিয়ে যাবেন। পালিয়ে যাননি। শান্ত হয়ে বসে নিজের কবিতার হিন্দি অনুবাদ শুনেছেন। পরামর্শ দিয়েছেন। শুধু একদিন তাঁকে পাওয়া যায়নি। সন্ধেবেলায় তাঁকে ভারতবিখ্যাত চিত্রকর স্বামীনাথনের সঙ্গে ভারত ভবনের ছাদে মুখোমুখি বসে থাকতে দেখা গিয়েছিল। কিন্তু শিশির মঞ্চে ঘটেছিল উল্টো। সেবার ১০-১২ জন রুশ কবি এসেছিলেন, তার মধ্যে একমাত্র রসুল গমজাতভের নাম কলকাতা শুনেছিল। কয়েকজন বাঙালি কবিকে ডাকা হয়েছিল । সুভাষদাকে ডাকা হয়নি। কেননা সুভাষদা আর পার্টি মেম্বারশিপ রিনিউ করেননি। কয়েকজন কার্ড হোল্ডার ‘দায়বদ্ধ’ কবিকে ডাকা হয়েছিল। শক্তিদাই ছিলেন একমাত্র বড় কবি যিনি ডাক পেয়েছিলেন। মঞ্চে অনেক পরে এলেন শক্তিদা। দেখেই বোঝা গেল মুড অফ। বাঙালি কবিরা একটা করে কবিতা পড়লেন, আর তার স্পট-অনুবাদ হচ্ছে রাশিয়ানে। আমরা একটা আত্মহত্যার মহড়া দেখছিলাম। শক্তিদার নাম ডাকা হল। তিনি মাইকে দাঁড়িয়ে তাঁর অসামান্য ব্যারিটোন ভয়েসে বললেন, এমন কবিতা পড়ব, অনুবাদ করা বেরিয়ে যাবে। ‘চুম্বন করিনি আগে, ভুল হয়ে গেছে’ অত বছর আগে তাঁর গলায় এই অসামান্য কবিতাটা শুনে আমার ভেতরে যে উল্কা প্রবেশ করে, সেই উল্কা আজও বেরিয়ে আসেনি। কবিতাটা পড়ে তিনি তৎক্ষণাৎ মঞ্চ পরিত্যাগ করেন। আমি তাঁকে সেদিন আর খুঁজে পাইনি। খুঁজে পাই বহু পরে বেকবাগানের বাড়িতে। গিয়েছিলাম তাঁকে এই কথাটা বলতে যে, সেদিন যেভাবে কবিতাটা পড়লেন, এভাবে কেউ কবিতা পড়তে পারে আমার জানা ছিল না। বললাম সে কথা। শুনে চুপ করে থাকলেন।

কোনও হ্যাঁ-না কিচ্ছু বললেন না। চুপ করে বসে থাকলেন। একটা চেক-চেক লুঙ্গি পায়ের পাতার একটু ওপরে উঠে যেখানে থেমে গেছে, সেই খোলা পা দুটোকে নাড়াতে দেখলাম। সন্দীপনদার কাছে শুনেছিলাম শক্তি পা নাড়ালে বুঝবে ভেতরে ভেতরে কবিতা লেখা হচ্ছে। আমি সময় নষ্ট না করে বললাম, শক্তিদা উঠি। হঠাৎই বললেন, ‘তুমি যেন কোন কলেজে পড়াও? আমি বললাম, ধূপগুড়ি কলেজে, ১১ মাস চলছে। উনি বললেন, ‘এতদিন হয়ে গেছে, কলকাতায় আসবে কবে?’ আমি বললাম, ‘ভালোই লাগছে উত্তরবঙ্গে’। এক বছরের মাথাতেই আমি কলকাতায় এসেছিলাম। আমি জানি, শক্তিদা কাউকে কাউকে বলেছিলেন। আমি শক্তিদা-কে কখনও বলতে বলিনি। শক্তিদার ভেতরে যে নিজস্ব রকমের মহত্ব ছিল তা আমি ভুলি কী করে?

শক্তি চট্টোপাধ্যায় নামে যে নক্ষত্র এসে পড়েছিল বহড়ুর গ্রামে, সেই নক্ষত্র নিজেকে পুড়িয়ে সারাজীবন কবিতা লিখে গেছে। মার্কিন কবিতায় অ্যালেন গিনসবার্গের যে ভূমি, রাশিয়ান কবিতায় ইয়েভতশঙ্কুর যে রেডিও তরঙ্গ, পোলিশ কবিতায় তাদেউস রুজেভিজের যে মরুদ্যান, বাংলা কবিতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় হলেন সেইরকম এক গর্ভগৃহ– যেখানে জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্ম ত্রিবেণীর মতো জড়িয়ে ধরে আছে সংকেত ও ছন্দ। তিনি বাংলা কবিতার অন্তিম নিউক্লিয়ার জাংশন যার পরে বাংলা কবিতাকে মনে হয়, স্পর্ধা গেছে, বিনয় এসেছে। 

অ্যালেন গিনসবার্গ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং পিটার অরলভস্কি

একটা মজার স্মৃতি দিয়ে শেষ করি। ঘটনাস্থল সেই মধ্যপ্রদেশের ভারত ভবন। সেবার ভারত ভবনে দু’জনে একসঙ্গে। শক্তি-সুনীল। শক্তি তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছেন সুনীলদাকে। কোথাও নেই, কোথাও নেই। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। তখনও মোবাইলের ম আসেনি ভারতে। উন্মাদ হয়ে খুঁজতে খুঁজতে বড়ে তালাও-এর পারে এসে দাঁড়িয়ে গেলেন শক্তিদা। সেই বিশাল হ্রদের ধারে, বিশাল জলরাশির সামনে সুনীলদা বসে আছেন হিন্দি কবিতার এলিয়ট অজ্ঞেয়-র সঙ্গে। গভীর আলোচনায় দু’জনে মগ্ন। অজ্ঞেয়জির আধুনিক ঋষির মতো চেহারা, সবাই তাঁকে সম্মান করে, উপাচার্যরা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ান, প্রধানমন্ত্রীরা তাঁর লাইন কোট করেন, শক্তিদা কবি অজ্ঞেয়-কে পাত্তা না দিয়ে কথা বলতে লাগলেন, ‘সুনীল এখানে হিন্দিঅলার সঙ্গে কী কথা? কী কথা তাহার সাথে? ওঠো, একে জলে ফেলে দিয়ে চলো আমরা যাই, সূর্য ঢলে পড়েছে।’

এবার অজ্ঞেয়জি কথা বললেন। পরিষ্কার বাংলায়, শক্তি, কোথায় যাবে, কবিতা শোনাও, তোমার কবিতা আমার খুব ভালো লাগে, দারুণ লেখো তুমি, ওই কবিতাটা শোনাও না, ‘ফুটপাথ বদল হয় মধ্যরাতে’। এরপর শক্তি চট্টোপাধ্যায় স্তব্ধ হয়ে বসে পড়লেন সূর্যাস্তের নীচে।

আশ্চর্যজনকভাবে বৃষ্টি নেমে এল তখন। বৃষ্টির ভেতর তিন কবি উঠে দাঁড়ালেন। আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় বলতে শুরু করলেন: ‘হয়তো মেঘে বৃষ্টিতে বা শিউলি গাছের তলে/ আজানুকেশ ভিজিয়ে নিচ্ছ আকাশ ছেঁচা জলে।’ মধ্যপ্রদেশের ভোপাল এরকম কবিতা আগেও শোনেনি, পরেও শোনেনি আর।

শেষ হল না। এই গল্পটা না বললে শেষ হবে না। মল্লিকা তখন শক্তিদার সদ্য প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, ‘সন্ধ্যার সে শান্ত উপহার’ রিভিউ করেছিল। মল্লিকা মেয়েদের হয়ে অগ্নিময় লেখায় মগ্ন হয়ে আছে। শক্তিদার বইটিকে আচ্ছাসে ঠুকে লিখল। যে কবি হিরে লেখেন তিনি কেন কাচ লিখলেন এখানে। যেখানে লিখেছিল, সেই পত্রিকার অফিস করিডোরে দেখা হল আমাদের সঙ্গে। বললেন, এসো । মল্লিকাকে বসালেন। চা এল। আমাকে সিগারেট দিলেন। তারপর অফিসের সবাইকে ২৮ বছরের মল্লিকাকে দেখিয়ে বললেন, ‘এই সেই মল্লিকা (বেচারা কাঁদো কাঁদো) যে আমার কাগজে আমার বিরুদ্ধে রিভিউ লিখেছে। সাহস আছে মেয়েটার। কুর্নিশ তোমাকে, মেয়ে। চা খাও, চা খাও।’ এই বিচক্ষণ উদারতা বাংলা কবিতায় আমি আর ঘটতে দেখিনি।