Robbar

স্মৃতির প্রোজেক্টরে হারানো সময়ের ঢেউ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 25, 2026 7:16 pm
  • Updated:March 25, 2026 7:16 pm  

এই বইয়ের প্রথম রচনা ‘আমার শেকড়-বাকড়’। যা শুরু হয় চমৎকার সরস ভঙ্গিতে। কিছুটা মজলিশি, পাঠকের হাত ধরে অক্ষরের ভিতরে ডুব দিয়ে স্মৃতির পলি তুলে আনার মতো করে হারানো দেশকাল চোখের সামনে ফুটে ওঠে। বইয়ের দ্বিতীয় অংশ ‘নেম ড্রপিং’। এখানে রয়েছে নানা গুণী মানুষের সঙ্গে লেখিকার সাহচর্যের কথা। যা শুরু হয় স্বপ্না দেবের বাবাকে দিয়ে।

বিশ্বদীপ দে

স্মৃতি কি সত্যিই ব্যক্তিগত? ব্যক্তির স্মৃতির ভিতরে সমষ্টির ইতিবৃত্তের জলছাপই কি থেকে যায় না? স্বপ্না দেবের ‘আমার শেকড়-বাকড় অথবা নেম ড্রপিং’ বইটি পড়তে পড়তে এই কথাই মনে হচ্ছিল।

রাষ্ট্র যে ইতিহাস লেখে তাতে নানা নির্দিষ্ট ফ্রেম থাকে। কিন্তু কারও ব্যক্তিগত স্মৃতির ভিতরে এসে পড়া পুরনো সময়ের ঝলকে সেই উদ্দেশ্য থাকে না। হয়তো তাতে নিজস্ব মত, নিজস্ব বিশ্বাস থাকে। কিন্তু সেটাকে খুঁড়ে ভিতর থেকে গভীরে লুকিয়ে রাখা সত্যিটার দিকে তাকানো খুব কঠিন নয়। যে সময়ে আমি ছিলাম না, সেই সময়টা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। স্মৃতিকথা বা মেমোয়ার্স সারা পৃথিবীতে বহু লেখা হয়েছে। যেগুলি টিকে গিয়েছে, সেগুলি আসলে এই অন্তর্নিহিত সত্যের জোরেই রয়ে যেতে পেরেছে। স্বপ্না দেবের এই বইটিও সেই গোত্রীয়।

বইয়ের মুখবন্ধ থেকে জানতে পারলাম, এই বইয়ের দু’টি রচনা আসলে একটি পত্রিকার জন্য লেখা। ২০১১ ও ২০১২ সালে লিখিত চমৎকার দুই স্বাদু গদ্য। কিন্তু দু’মলাটের ভিতরে তাদের সহাবস্থান একে সম্পূর্ণ করেছে। করে তুলেছে একটি বই। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রয়াত হয়েছেন তিনি। প্রুফ দেখেছেন, সংশোধন করেছেন‌। কিন্তু বইটি দেখে যেতে পারেননি। আমরা, পাঠকেরা এবার ওঁর মুখোমুখি বসেছি, ওঁর জীবনের গল্প শুনতে। এক নশ্বর জীবনের সমাপ্তিতে তার ছায়া থেকে যায় এভাবেই, বাক্য হয়ে, স্মৃতি হয়ে… যতিচিহ্ন যা থামিয়ে দিতে পারে না। বরং একটি বাক্যের সঙ্গে অন্যটিকে জুড়ে প্রকৃত প্রস্তাবে যাকে করে তুলতে থাকে সম্প্রসারিত এক জীবনানুভূতি।

স্বপ্না দেব ছিলেন খ্যাতনামা সাংবাদিক। বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী সত্যনিষ্ঠ এক মানুষ। সারা জীবনে এসেছেন অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে। তাঁদের মধ্যে বহু মানুষই কৃতী। সেই সব অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনবোধকে আরও পরিপুষ্ট করেছে। এই বইয়ে লিখিত নানা ঘটনার ভিতর দিয়ে আমরা তা বুঝতে পারি। আমি তাঁকে প্রতিক্ষণ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক হিসেবেই জানতাম। কিন্তু সেটা অনেক পরের ব্যাপার। ১৯৮৩ সালে শুরু হয় সেই পত্রিকা। এর অনেক আগেই তিনি সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। যার সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল শৈশব থেকে। মাঝে অবশ্য একটা সময় জড়িয়ে পড়েছিলেন সাক্ষরতা আন্দোলনের সঙ্গে।

লেখিকা স্বপ্না দেব

এই বইয়ের প্রথম রচনা ‘আমার শেকড়-বাকড়’। যা শুরু হয় চমৎকার সরস ভঙ্গিতে। কিছুটা মজলিশি, পাঠকের হাত ধরে অক্ষরের ভিতরে ডুব দিয়ে স্মৃতির পলি তুলে আনার মতো করে– ‘স্বপ্নে দেখি, বাড়ি যাচ্ছি। স্টিমারঘাটায় নেমেছি। রাস্তাটা কী সুন্দর! কীর্তনখোলা নদীর পাড়ে গাছগাছালি ভরা এই রাস্তায় বিকেলে কত লোক বেড়াতে আসেন। আমিও আসতাম।’ এরপর বিস্তৃত বর্ণনার মধ্যে দিয়ে হারানো দেশকাল চোখের সামনে ফুটে ওঠে। যেন একটা উপন্যাসের সূচনা। পরে তাঁর সঙ্গে আমরা বরিশাল থেকে এসে পড়ি কলকাতায়। ‘সেই সময় সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ সন্ধ্যে হলেই নির্জন হয়ে যেত। একটু এগোলেই অবশ্য ঝলমলে এসপ্ল্যানেড। সেখানে আলোয় আলোয় বিজ্ঞাপনের কী বাহার! একটা কেটলি থেকে বড়ো বড়ো কাপে চা ঢালা হচ্ছে, আর আলোর কারসাজিতে কাপগুলো ভরে উঠছে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে ঘাড় ব্যথা হয়ে যেত।’ এমনই গতিময় গদ্যে যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো করে সেই সময়টা আমাদের দেখাতে থাকেন তিনি। এবং তখন সেটা আর ওঁর ব্যক্তিগত স্মৃতি থাকে না। যেন একটা অলীক প্রোজেক্টর মেশিন চলতে শুরু করে। মনের সাদা পর্দায় ফুটে ওঠে কবেকার সব ছবি!

তিনি কেবল দেশকালের কথা বলেননি। বলেছেন মানুষের কথাও। বইয়ের প্রথম রচনাটি টানা স্মৃতিচারণ, অনেকটাই আখ্যানের মতো মেজাজ। কেবলই নদীর সৌন্দর্য বা শহরের আলো ঝলমলে রূপবর্ণনা নয়। বরং সেই সময়কে কুড়ে কুড়ে তুলে এনেছেন আগ্নেয় সব মুহূর্ত। দেশের স্বাধীনতা, দেশভাগ, ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়’, ক্রমশ গায়ে যেন আগুনের আঁচ এসে লাগে। “একদিন মধ্যরাত্রে একদঙ্গল মানুষ রোগশয্যার ঘুম তছনছ করে ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর’ ধ্বনি দিতে দিতে, লাঠি-শড়কি নিয়ে আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়লেন। তারা দ্রুত এ-ঘর ও-ঘরে ছড়িয়ে পড়লেন, দুমদুম করে উপরে উঠে গেলেন।” কিন্তু এরপর জানা যায়, আসলে ওই লুটপাট ছিল অভিনয়! বাইরের মুসলমানরা গ্রামে ঢুকে পড়লে স্থানীয় মুসলিমরা স্বপ্নার পরিবারকে বাঁচাতেই এই অভিনয় করেছিলেন। পরে সমস্ত চুরির মাল অর্থাৎ, ট্রাঙ্ক ফিরিয়ে দিয়ে যান! এই সময়ের ভারতে এমন ঘটনার বর্ণনা যে দারুণভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা বোধহয় বলাই বাহুল্য।

মানুষে মানুষে বিশ্বাস, ভালোবাসা সেই আগুনে সময়েও বেঁচেছিল বলেই সভ্যতা এগতে পেরেছে। তত্ত্বকথা নয়, এমন সব ঘটনার বর্ণনাই যেন তা বোঝাতে পারে আমাদের। পরের পরিচ্ছদেই অবশ্য আমরা জানতে পারি, গাঙ্গুলিবাড়িতে আগুন লাগিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়ার গল্পও। কোনও নির্দিষ্ট সত্যি নয়, বরং বহুবর্ণিল এক সত্যকে আমাদের সামনে তুলে ধরেন গ্রন্থকার। তা কখনও বরিশাল, কখনও কলকাতা হয়ে অসংখ্য ঘটনা, মানুষের স্মৃতির কোলাজ হয়ে আমাদের কাছে এক সমষ্টির স্মৃতিই যেন হয়ে ওঠে।

বইয়ের দ্বিতীয় অংশ ‘নেম ড্রপিং’। এখানে রয়েছে নানা গুণী মানুষের সঙ্গে লেখিকার সাহচর্যের কথা। যা শুরু হয় তাঁর বাবাকে দিয়ে। “জীবনে শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি আমার বাবা সুধীররঞ্জন চক্রবর্তী। তাঁর কন্যা হয়ে জন্মগ্রহণই আমার পরবর্তী জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করেছে।’ বাবার অসামান্য জীবনচর্যা তাঁকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে, সেকথা বলতে বলতেই তিনি আমাদের সঙ্গে পরিচয় করান আরও অসাধারণ মানুষের সঙ্গে। যাঁদের অন্যতম বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়। যাঁর লেখা ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস’ কে পড়েনি? সেই মানুষটির হাতেই সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি স্বপ্নার। তাঁরই সম্পাদিত ‘দৈনিক বসুমতী’তে বিভাগীয় সম্পাদক হয়েছিলেন। ‘তিনি আমাকে প্রথম দিনেই ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ সম্পাদনার দায়িত্ব দিলেন। সপ্তাহে একদিন মঙ্গলবার, শেষের পাতাটি ছিল বরাদ্দ। রান্নাবান্না, সেলাই-ফোঁড়াই, ঘরকন্নার হাজার টুকিটাকি-এতদিন চলছিল একরকম।” কিন্তু এমন সব বিষয় থেকে সরিয়ে এনে অন্যধারার লেখা ছাপার সিদ্ধান্ত নেন স্বপ্না। এবং সেখান থেকে শুরু হয় বিতর্ক। মালিকপক্ষ পছন্দ করেনি পাতাটির এহেন পরিবর্তন। মূলত রাজনৈতিক কারণেই এই আপত্তি। সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায় পড়লেন আতান্তরে। সেই সব প্রসঙ্গের পাশাপাশি ওঁর লেখালেখির প্রসঙ্গও ছুঁয়ে যাই আমরা। জানতামই না তিনি ‘অগ্নিবর্ষী’ কবিতাও লিখতেন।

এমনই নানা মানুষের ওপরে আলো ফেলে স্মৃতির প্রোজেক্টর চলতে থাকে। এর মধ্যে আলাদা করে উল্লেখ করা যাক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গটি। “সুভাষদা ছিলেন আমাদের কবি। কবে, কিশোর বয়সে, অটোগ্রাফ খাতায় লিখে দিয়েছিলেন, ‘আনতে চলেছি লাল টুকটুকে সকাল’। সেই অরুণোদয়ের প্রভাতের স্বপ্নে আমরাও তো বিভোর ছিলাম! তবু তাঁর কাছে পৌঁছতে চল্লিশ বছর দেরি হয়ে গেল। লাল রং যখন ফিকে হয়ে গিয়েছে।” লেখাটি চার পাতারও নয়। কিন্তু তারই মধ্যে কত কিছু দেখতে পাই আমরা। ‘একবার তাঁর লেখাটিকে এক পাতায় কিছুতেই আঁটানো যাচ্ছে না। সুভাষদাকে ফোন করলাম। …বললেন, তুমিই একটু এডিট করে দাও না। সে কী কথা! সুভাষদা বললেন, আরে দাও, দাও। কিচ্ছু মুশকিলের কাজ নয়। ছত্রিশ লাইন ছাঁটতে হয়েছিল। …সুভাষদা হেসে বললেন, কেমন সুন্দর এডিট করেছ। আমি তো বুঝতেই পারছি না, কী বাদ গেল।’ এভাবেই অল্পের ভিতরে এক আকাশস্পর্শী মানুষকে ছুঁতে পারি আমরা।

এমন উদাহরণ অজস্র। বইজুড়ে মহৎ মানুষ, অসামান্য সব স্মৃতি আমাদের ঘিরে পাক খেতে থাকে। আয়তনে খুব বড় না হলেও একটা কালখণ্ডকে স্বপ্না বুনে দিয়েছেন অক্ষরে অক্ষরে। গদ্যের এমন অনায়াস চলন, যেন সামনে বসে কেউ চমৎকার ভঙ্গিতে হারানো সময়ের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ছাপা, বাঁধাই চমৎকার। ছাপার ভুলও চোখে পড়ে না। এমন বই সঙ্গে করে ঘুরে বেড়ানো যায়। মাঝে চোখ বুলিয়ে যা থেকে তুলে আনতে ইচ্ছে করে স্মৃতির পুঁতি। যা জুড়ে জুড়ে মালা বানানো যায়, আবার ফেলে ছড়িয়ে রাখলেও আশ্চর্য আনন্দের ঢেউ ওঠে মনের ভিতরে।

বহু তিক্ত, কটু স্মৃতিও রয়েছে। কিন্তু সময়ের অনেকটা দূরবর্তী কোনও এক অংশ থেকে দেখলে সবটাই অলীক মনে হয়। যে সময় ফেলে চলে এসেছে আমরা। যে সময় আমাদের সঙ্গেই বয়ে চলেছে। এই বইয়ের পাতায় পাতায় তারই ঢেউয়ের শব্দ।

আমার শেকড়-বাকড় অথবা নেম ড্রপিং
স্বপ্না দেব
প্রতিক্ষণ
৩০০ টাকা