Robbar

প্রসূনের উত্তর কোলকাতা কোনও বিশেষ স্থান নয়, একটা অন্তর্লীন জীবন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 31, 2026 4:50 pm
  • Updated:March 31, 2026 4:50 pm  

প্রসূন একদা তাঁর প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অবস্থান থেকে রসিকতা করে লিখেছিলেন: “তা আমার পাড়ায় আছেন এক প্রবীণ জ্ঞানী সংস্কৃতিব্যবস্থাপক মানুষ। কবি তাঁর চোখে দুই শ্রেণীর। ‘কবি’ ও ‘লোকাল কবি’। একদা আমাকে বলেছিলেন, লোকাল কবিদের নিয়ে একটা পোগ্রাম করছেন, আমিও তো লিখি-টিখি, অবশ্যই যেন গিয়ে দুটি পড়ে আসি।” এও কিন্তু প্রসূনের ওই জেলেপাড়ার লোকেরই কথা, যা একশ্রেণির পুঁজির ফলে আশ্রয়ে গেঁজে-ওঠা বৃহত্তর সমাজভঙ্গিরও পূর্ণ সমর্থন পাবে। ওই ব্যক্তি প্রসূনের সঙ্গে একই ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও আসলে রয়েছেন যোজন-যোজনব্যাপী দূরে। সেই কারণেই কি পুরোহিত, রিকশাচালক, পতিতা, পাড়ার উঠতি মাস্তান, ধাঙ্গড় বস্তির ক্যাকোফোনি, বইলেখা ভজনবাবু, আঁশগন্ধে ভরপুর জেলেদের জীবন কি প্রসূনের একেকটা তির– যা তিনি ছুঁড়ে মারেন কলকাতা শহরের গেঁজে-ওঠা এলিটিজমের মুখে?

রাজদীপ রায়

খাতায়-কলমে নব্বই দশক পেরিয়ে যখন নতুন শতাব্দীতে পড়লাম আমরা, তখন বিশ্বায়ন রীতিমতো জীবনের ও মননের রন্ধ্রে-রন্ধ্রে প্রবেশ করেছে। এই সময় প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ প্রকাশিত হচ্ছে ২০০৫ সালে। অর্থাৎ নতুন সহস্রাব্দের প্রথম ভাগেই। উদারনীতির সর্বগ্রাসী প্রভাব ও গবেষণা ঘোষণা করেছে এমন বার্তা– বিশ্বব্যাপী চিন্তা করুন, স্থানীয়ভাবে কাজ করুন। বিশ্বায়নের গ্রাসে যখন ডুবে যাচ্ছে স্থানীয় সমাজবোধ, ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বাংলা কবিতায় স্বস্থানের ভূমিকা নিয়ে এলেন প্রসূন– ‘লোকাল কবি’ হিসেবেই। বহির্মুখী সময়ে তুমুল আত্মমুখী দর্শনে নিজের ভেতরে নিষ্ঠ হতে চাইল তাঁর কবিতা। এই বৈপরীত্যই প্রসূনের কাব্যচর্চার অন্যতম কার্য ও কারণ। ‘যৌথখামার’ পত্রিকায় ২০০৯ সালে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে প্রসূন নিজেই জানিয়েছিলেন: 

“…যখন আমি ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ লিখেছি সেই পর্যায়ে আমি একেবারেই উত্তর-কোলকাতার মানুষ ছাড়া অন্য কোনওভাবে নিজেকে দেখতে পারিনি।” 

কোন উত্তর কলকাতাকে নিজের বলে মনে করছেন বাগবাজারের জেলেপাড়ার নিবাসী প্রসূন? যে উত্তর কলকাতা তার প্রাচীনত্ব নিয়ে মিলেনিয়ামের উত্তর পর্বেও সক্রিয়, সেটাই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্বস্থান’। বিশ্বায়নের এই সর্বগ্রাসী সময়ে যখন সবাই সোশিও-ইকোনোমিক ক্যাওসে মত্ত, সেই সময় প্রসূন নিজেকে সচেতনভাবেই কেন্দ্রীভূত করতে চাইছেন তাঁর একান্ত সামাজিক পরিসরে। পরিসরটি অবশ্য শুধুই কোনও আলটপকা আঞ্চলিক বৃত্ত নয়, প্রসূনের সাধনবৃত্তের স্বস্থানও বটে। উত্তর কোলকাতার পরিসর প্রসূনের রাজনৈতিক, সামাজিক সর্বোপরি আত্মিক অবস্থান। কলকাতা তাঁর কাছে বিশ্বায়ন অধ্যুষিত কোনও মুক্ত অর্থনীতির লীলাক্ষেত্র নয়, বরং রাঢ়বঙ্গের সেই সুপ্রাচীন প্রতিকৃতি, যা ক্রমাগত হারিয়ে যেতে বসেছে চারপাশ থেকে। প্রসূনের তাই প্রয়োজন হয় কোনও অতিকালের, যার নিশ্ছিদ্র বলয় তাঁর স্বেচ্ছানির্মিত। অতিকালের বিপুল বলয়ে তিনি ইতিহাস, সমাজ, চরিত্র, রাজনীতি ও সমাজনীতিকেও জড়িয়ে নেন। ফলে ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ শুধু কাব্যগ্রন্থ নয়, বরং অস্তিত্বের উৎসব। এই উৎসবে শামিল যে প্রসূনের আত্মন, সে কোথাও পালায় না; বরং পরিস্থিতির সঙ্গে সংঘাতে গিয়ে সময়ের বিরুদ্ধে সময় তৈরি করে। প্রসূন যেন বোঝাতে চান, ভোগবাদের চরম ফুর্তির মধ্যেও ভাষা-চরিত্র ও অবস্থানের মধুর এক অধ্যাত্ম-ফুর্তি রয়ে গেছে, যাকে কেবলমাত্র কোনও স্থানিক বিন্দুতে পাওয়াই সম্ভব। বিশ্বায়নের তত্ত্ব নির্মাণ করতে গিয়েও জোসেফ স্ট্রিংলিজ, থমাস ফ্রিডম্যানরা যে লোকালের অবলুপ্তির কথা বারবার নির্দেশ করেছেন, সেই লোকাল কগনিটিভ সাংস্কৃতিক ভ্যালুই প্রসূনের কাব্যজগৎ। একেই তিনি অতিকালের মাধ্যমে বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার উপস্থিতি হিসেবে খাড়া করতে চান। 

অবশ্য প্রসূন নিজেকে নির্দিষ্ট কোনও অবস্থানে স্থায়ী করতে চান না। সাক্ষাৎকারে প্রসূন জানান:

“ব্যক্তির সঙ্গে তত্ত্বের আন্তঃসম্পর্কের ব্যাপারটা তো ‘বালি ও তরমুজ’ থেকে ‘আনন্দ ভিখিরি’ পর্যন্ত এবং ভবিষ্যতে আমার যে-ক’টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হবে, আমি কোনোটিকেই ‘আমার অবস্থান’ এভাবে বলব না। একেক সময়ে একটা দৃষ্টিভঙ্গি সারফেস করে এবং সেটাকে আঁকড়ে ধরতে হয়। সেটার উৎকর্ষের জন্য আমি যাবতীয় রকম চেষ্টা করেছি।” 

তাই এমন নয়, সারাজীবনের জন্য প্রসূন উত্তর কোলকাতার কবি। এটা বলা হলে প্রসূনের কবিমনের অখণ্ডতাকে অস্বীকার করা হয়। তাহলে অনিবার্য প্রশ্ন এবার এই, প্রসূনের এই পরিবর্তমান কবিজীবনে ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ কীভাবে বিশেষ এবং কেন? কেন এই গ্রন্থ শুধু গ্রন্থ না-হয়ে হয়ে উঠল প্রসূনের গ্রন্থবীজ কিংবা আরও সঠিকভাবে বলতে গেলে– কাব্যবীজ যা তার কবিতাজগতের নিয়ন্ত্রকভূমি। এ-কারণেই, সত্তরে কবিতা লিখতে আসা প্রসূন কিন্তু সময়ের ধর্ম মেনেই বামপন্থার বস্তুবাদী জগতে নিজেকে স্থিত করেছিলেন কিছুকাল। ‘বালি ও তরমুজ’, ‘উন্মেষ গোধূলি’-র (১৯৯৬) মধ্যে যে মার্কসবাদী তত্ত্ব ও দর্শনের পারিবারিক ও ব্যক্তিক চর্চা উঁকি মেরে যায়, তা সময়, রুচি, বাংলা কবিতার ঐতিহ্যকে মেনেই। এর পরেই ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’-র (২০০২) মধ্যেও বিপ্লবের অসমাপ্ত ও অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলোকে ট্রিগার করবার অভিপ্রায়ের সঙ্গে বজায় থেকেছে বাঙালির জাতিসত্তার প্রসঙ্গ। প্রসূনের মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে এর পরেই, আর সেটাই তাঁর কবিজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিফ্‌ট। বস্তুবাদের দর্শন থেকে প্রসূন সোজা প্রবেশ করেন স্বস্থানের অধ্যাত্ম-মহিমায়। যে-মহিমা পরে আরও জোরালো ও বৈচিত্রময় হয়ে ওঠে। কিন্তু বঙ্গীয় অধ্যাত্মচেতনার বাইরে যায় না। ‘অতিকাল’ নির্মাণ সেই দূরবর্তী ভাবজগতের প্রথম প্রবেশ দ্বার। ‘ক্ষমতার বচনে ঘেরা সমসত্ত্বা থেকে দূরে’ অপর এই গঙ্গার ধারে যে বাঁকুড়ার গোলাপি গামছা পাতা হয়েছে, তা হয়তো টকটকে লাল থেকে ব্যবহৃত হতে হতে রং চটে গোলাপি হয়ে আসা ‘যাবতীয় সময়ের উদ্বেজনা থেকে দূরে’ শান্ত ও সমাহিত জীবনে ফিরে যাওয়ার গামছা। আর এভাবেই প্রসূন উত্তর কলকাতার যে সমাজপ্রকৃতি নির্মাণ করে ফেলেন, মিলেনিয়াম পার করা কলকাতার মন তাকে অতিদূরে প্রায় বর্জন করে ফেলেছে। শ্যামবাজারের ব্যস্ত পাঁচমাথা মোড় নয়, প্রসূন তাই স্থিত হতে চেয়েছেন ‘বাগবাজারের গঙ্গাধধারে পক্ষীবিষ্ঠাময় কোনো বটমূলে বাঁধানো চাতালে’। প্রণাম করতে চেয়েছেন ওই গোলাপি গামছাটিকে। কে প্রণাম করছে? প্রসূনের অপর। বস্তুবাদী প্রসূনকে ভাববাদী প্রসূন দীক্ষা দিচ্ছে অবিনশ্বর কোনও অতিকালের সমীপে। সে কারণেই এই উত্তর কলকাতায় স্থিত হওয়ার দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রসূন দিচ্ছেন এভাবে: ‘সাঁতারই না জানলুম আমি পড়লাম নেমে জল/ বাঁচবেন হে গুরুমুর্শিদ হাজির অকুস্থল’। কে গুরু? তিনি নিজেই। নিজেই তিনি নিজেকে এই পথে নিয়ে এসেছেন। সবকিছু জেনে কোনও পথে হাঁটা যায় না। পথের সমস্ত খুঁটিনাটি জানা যায় পথ চলতে চলতেই। পথের ও-প্রান্তে কী আছে– এই মৌলিক প্রশ্নই প্রসূনের চালিকাশক্তি। তিনি প্রশ্ন রাখেন, উত্তরের সন্ধানে আত্মনকে বিশ্লিষ্ট করে নতুন এক সম্ভাবনার পথে নিয়ে যান। কী আছে শেষে পথে– তিনি তা জানেন না, সেই শেষেই যেতে চান– ‘গহীন গাঙের ওপার যাবো জানি না সাঁতার’। এই গহীন গাঙই প্রসূনের জ্ঞানতত্ত্বের পলিভূমি। তার পাড়ে বসেই তাই কাব্যজাল বিস্তার করতে শুরু করেন তিনি। সাধনক্ষেত্রে নিমজ্জিত তিনি ঘোষণা করেন: ‘জেনে কলকেতা উত্তরে/ কেমন বসে আছি জুত করে/ আমায় ডেকো না কেউ আর/ আমার চার চরাচর ব্যেপে/ এবার বয়স এলো কেঁপে/ আমার একলা ভেজাবার’। এর আগে প্রসূন নিজেকে এইভাবে একাকী আবিষ্কার করেননি। ‘পুরুলিয়া কবিসম্মেলন’-এ শহর থেকে যে-কবিটি কবিতা পড়তে গিয়েছিল, তার শ্রেণি অবস্থান দেখেছিল, ওই কবিদের চলে যাওয়া জিপের পেছনে ধাবমান এক মাহাতো যুবককে, দেখছিল রাজনৈতিক গভীর ডামাডোলের সময়। প্রিয় ইউরোপকে খোলা চিঠি দিয়ে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, আসলে ইউরোপ আমাদের ভেঙে ফেলেছে প্রতিনিয়ত; আমরা আসলে পরস্পরের চেয়ে অনেক দূরে ছড়িয়ে পড়ছি। ‘বালি ও তরমুজ’ বইতে তাঁর কাছে প্রেম বলতে: ‘এই গূঢ় বাণিজ্য শেষ হলে, আগামী শ্রাবণে/ তোমাকে প্রশ্রয় দেবো আরও বেশী…’। সেই শ্রেণি সচেতন প্রসূনের ভিত্তিমূল উপরে গিয়ে প্রোথিত হল গাঙ্গেয় সমভূমির ভাবসাগরের বৃত্তান্তে। তখন প্রসূন লিখছেন: ‘অনেক ভাব ঘুরছে মাথায় কিন্তু যুৎসই ভাষা/ পাচ্ছি না…’। কখন মনে হচ্ছে? নিজের চতুর্থ বইতে পৌঁছে। নিম্ন-মধ্যবিত্তের নীতিবোধসম্পন্ন ক্রাইসিস থেকে বোধবিহীন ভোগমুগ্ধ সময়ে পৌঁছে। সেই ভাষা তিনি খুঁজতে চাইছেন বৌদ্ধ তন্ত্রে, সহজিয়া ধর্মে, বৈষ্ণব প্রকরণে, রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত ভট্টাচার্য এবং এক সর্বগ্রাসী বেদান্তদর্শনে। প্রসূন সরাসরি সাধক নন। তিনি গৃহী। তাই আরোপতত্ত্বের মধ্যে দিয়েই যাত্রাপথ খুঁজে নিয়েছেন অধ্যাত্মর ভাববাদী মজায়। তবে প্রসূনের কাছে ঈশ্বর নিশ্চয়ই কেবলই ভাব নয়, অবশ্যই প্রশ্ন ও উত্তরের সন্ধান। ‘উত্তর কোলকাতা’ প্রসূনের কাছে ‘লেস স্পেস-স্পেসিফিক’ এবং ‘মোর কালচার-স্পেসিফিক’। বিষয়টা ঠিক কীরকম? কথাবার্তায় প্রসূন জানিয়েছিলেন: 

‘আমার মনে হয়েছিল যে উত্তর কলকাতা কোনো বিশেষ স্থান নয়, একটা অন্তর্লীন জীবন। কেউ বর্ধমানেও থাকতে পারে। আমাদের প্রত্যেকের জীবনে একটা কোথাও উত্তর কলকাতা আছে। প্রত্যেকটা মানুষের পরম প্রিয় স্বস্থানই হয়তো উত্তর কলকাতা নামে পরিচিত।’

কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়

কালচার স্পেসিফিক বলেই এই স্থানিকতার অবস্থান মননে-আত্মনে-জীবনযাপনের ধরনে। যে ধরন কিছুতেই শ্যামবাজার কিংবা অন্যত্র যে-কোনও কলকাতায় ‘কাঁচ ঘেরা দোকান দ্বারা স্পর্শিত’ এমন কোনও জায়গাকে মন থেকে বর্জন করে। এখানেই এসে আমরা প্রসূনের কবিসত্তা ও চিন্তকসত্তার একটা অভিনব দ্বিবেণীসঙ্গমে উপস্থিত হই। প্রসূন নিজেকে সরাসরি মার্কসবাদী বলেননি, কিন্তু মার্ক্সীয় তত্ত্ব নিয়ে প্রথম কবিতাজীবনে চর্চার কথা নিজে মুখেই বলেছেন। এই চর্চাও কিন্তু নীতিগতভাবে ওই ‘কাঁচ ঘেরা দোকান দ্বারা স্পর্শিত’ শপিং মলের বিভা থেকে, ভোগবাদের চূড়ান্ত উল্লাস থেকে নিজেকে মুক্ত হবার কথাই বলে। তাই বস্তুবাদী ওই দর্শনচর্চা থেকে যখন প্রসূন সোজা শিফ্‌ট করছেন অধ্যাত্মবাদের ফুর্তিতে, সেই মরমী অপরোক্ষ দর্শনও তাঁকে বিশ্বায়িত কলকাতা থেকে এড়িয়ে থাকবার জীবনবোধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ তাই এক অর্থে প্রতিষ্ঠান-বিরোধী কাব্যগ্রন্থ, হ্যাঁ, বামপন্থার চিরপরিচিত এনকাউন্টার থেকে বেরিয়ে ভাববাদের দর্শন দ্বারাও যে বিশ্বায়নকে কোণঠাসা করা যেতে পারে, প্রসূনের অবস্থান সেইটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। 

বাস্তবতা এটাই নয় যা চারপাশে দেখা যাচ্ছে, যা নেই, যা ছিল কিংবা যা জীবনের কিনার ঘেঁষে চলেছে, সেই সত্যও কিন্তু বাস্তব। নব্বইয়ের পরবর্তী সময়ে জন্মানো প্রজন্মের কাছে উত্তর কলকাতা যে টাইমপিস, প্রসূন তা ভালোভাবেই জানতেন। বিশ্বায়ন একসময় মধ্যবিত্তকে ক্লান্ত করবেই। সেই অপরিমেয় ক্লান্তির মধ্যে দিয়ে এক্সটিক প্লেজারের মতো জেগে উঠবে একটুকরো উত্তর কলকাতা– হয়তো শ্যামবাজার নয়, হয়তো বর্ধমান, হয়তো কৃষ্ণনগরের বেশে। একই ছাঁচে যখন আমাদের চারপাশের দৃশ্যকল্প ও অনুভূতি ক্রমশ চিন্তার সম্ভাবনাগুলোকে একমুখী করে প্রশ্নহীন ভোঁতা করে ফেলবে, তখন অনিবার্য হয়ে উঠবে স্থানিক বৈচিত্র, ইন্ডিভিজুয়ালিটির অপূর্ণনীয় ও নির্বিকল্প বিষাদ ও স্ফূর্তির ডেকামেরন। মধ্যবিত্ত দশা থেকে অর্থের দাপটে মুক্তি পাওয়ার জন্য এলোমেলো সোচ্চার মনকে খানিক থিতু করবে তার অপসৃয়মান হয়ে আসা চিন্তার গিঁটে। এই গিঁট আর টানকেই প্রসূন খুঁজে গেছেন গঙ্গার ধারে। কখনও তিনি আত্মকে বিশ্লিষ্ট করে দেন চরিত্রে, তারাও হারিয়ে যাওয়া কোনও সময়েরই বাসিন্দা। এই যেমন ধনঞ্জয়, যাকে প্রসূন প্রশ্ন করেন:

‘গঙ্গাধধারে একা-একা সূর্যাস্তের ভেতরে
কী খুঁজিস
ওর মধ্যে কি দুঃখের মানে লেখা আছে
মানে লেখা আছে বয়ে যাওয়া জলের মধ্যে…
বসে থাকতে থাকতে… বসে থাকতে থাকতে
তাই কি ঘাটের সিঁড়ির মতো
তুইও কি একদিন বেমালুম ঢেকে যাবি
জোয়ারের জলে’ 

এই বিষণ্ণতা জীবনের প্রাতিষ্ঠানিক হুল্লোড় থেকে নির্বাণ লাভের। দুঃখের মানে খোঁজার। কিন্তু এই স্নায়ুর আঁধারে ঢেকে যাওয়া অবলুপ্ত সময়ে বাগবাজার ঘাটের ওই সিঁড়িটির মতো এই সময় এই দুঃখবোধও তো সময় গ্রাস করে নেবে। ধনঞ্জয় সেই না-থাকা, যে থাকবার জন্য আমাদের দুঃখবোধ, কষ্টের অভীপ্সাগুলো জড়ো হয় শ্যাওলার মতো ঘাটের তীরে। এ-কারণে স্পেস স্পেসিফিক মনে হলেও আসলে স্পেস বিষয়টাই এখানে থাকছে না। বরং তুমুল শূন্যর মধ্যে ঢুকে পড়া এক অতিব্যক্তিগত জায়গাকে খুঁজে পাওয়ার প্রবণতা একে কালচারাল স্পেসিফিকই করে তুলতে চাইছে। সেইজন্য স্বর্ণবেনের ঐতিহাসিক রেফারেন্সের সঙ্গে ধাঙ্গর বস্তির হোলির সাংস্কৃতিক ক্রসওভার অনায়াসে একটি স্পেসের মধ্যে চলে আসতে চায়। অতুলপ্রসাদের গানের কলি এসে প্রবেশ করে হেঁশেলে। আসলে তখন এ-সমস্তই একই পরিসরের মধ্যে অনায়াসে এসে এমন ভৌগোলিক স্বক্ষেত্র গড়ে তুলেছে, যার সঙ্গে পূর্ববর্তী বাংলা কবিতার আধুনিকতার স্বরূপ প্রতি পদে খণ্ডিত হচ্ছে। অস্তিবাদী দর্শনের প্রভা থেকে বাংলা কবিতার একটি ধারা প্রবাহিত হতে চাইছে বাঙালি গার্হস্থ্য রূপে, আঞ্চলিক ইতিহাসে, চরিত্রের সঙ্গে লগ্নতায়। তা-বলে কি উত্তর কলকাতার দ্রষ্টা বিষণ্ন নন? অবশ্যই বিষণ্ন, কিন্তু সেই বিষণ্নতার মাপকাঠি কখনওই প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ঔপনিবেশিক বিষণ্নতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তবু এই বিষণ্নতার স্বরূপ আলাদা হলেও একটা সেতুবন্ধ নির্মাণ হয়। বিষাদের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় স্থানীয় সময়বৃত্তে। চেনা প্রতিবেশ হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতিরক্ষার; মানভাষার আত্তীকরণের মধ্যে দিয়ে স্বস্তির কোনও পরিমণ্ডলে বেঁচে থাকবার যাপনক্রিয়া শুরু হয়। সেকারণেই লেখা হয়: ‘গভীর গাঙ্গেয়দেশে ঢুকে পড়ি চলো/ পুঁটুলিতে চিঁড়ে গুড় বেঁধে নিয়ে নেমে পড়ি ধুলোবাংলায়’– এই কবিতা প্রসূন লিখছেন নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাঙালি ভাবুক মধ্যবিত্তের গড় রুচিবোধকে মেনেই। কিন্তু এই রুচি যে আস্তে আস্তে পালটে যাচ্ছে, সেকথা কি সময় বলেনি? ১৯৯৬, যা ‘উন্মেষ গোধূলি’-র প্রকাশকাল; ২০০২, যা ‘বঙ্গীয় চতুর্দশপদী’-র প্রকাশকাল; তাদের পেরিয়ে ২০০৫-এ এসে যখন ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ বেরচ্ছে, তখন সময়ের চরিত্র খুব বেশি না-পালটালেও, প্রসূনের চিন্তাজগত অনেকটাই পালটে গেছে। প্রসূনের সেই পালটানো চিন্তার পাশাপাশি সমাজে একশ্রেণির মানুষ এমন চিন্তাও পোষণ করছেন, বিশ্বায়ন আদৌ কোনও থ্রেট নয়। উদার অর্থনীতিকে বন্দিত করা সাম্রাজ্যবাদের সমর্থনকারী সেই মানুষ কি প্রসূনের কলকাতায় নেই? অবশ্যই আছে। সদলবলে আছে। সংঘাত তাই আর শুধু রাষ্ট্রের বিপক্ষে নয়, বরং আত্মক্ষয়ী বাঙালির বিরুদ্ধেও। তাই টাইমমেশিন বাগবাজার, শ্যামবাজার, শোভাবাজার, আহিরীটোলা, নিমতলা, বরাহনগরে প্রসূন খুঁজে বেড়ান অতীত কোনও সময়ের আবর্তে আটকে পড়া চরিত্রদের। নাটকীয় ফ্ল্যাশব্যাকের মতোই আঞ্চলিক সংলাপে তারা ঝলসে ওঠেন তাদের কৃতকর্ম নিয়ে বিভিন্ন কবিতায়। ঝলসে ওঠে তাদের প্রাত্যহিক মানভাষা:

দৃষ্টান্ত ১

‘মেজবাবুই তো আশ্রয় দিলেন… নিজে দাঁড়ালেন
সদর দরজায়… গুন্ডারা মাথা চুলকে ফিরে গেল…
একবার বিজয়ার দিন চাদ্দিকে যখন ঢাকের বাদ্যি
গোয়ালের পেছনে আমার মাইয়ে… ওমা কী বলব
তখনও দেশ স্বাধীন হয়নি… আর আমি ভরযুবতী…
কী ভয় কী ভয়… ভাবলে এখনও গাটা শিউরে ওঠে
                                  চলে গেলেন?’

দৃষ্টান্ত ২

‘শিককাবাব… খুশবুখাস দিল চুরাইস হ্যারিসন রোড
সাথসুবাস জুইফুলের… হাওড়াশ্যালদা হুল্লাগুল্লা যান–
বাহন চেঁচিয়ে বলে কালো বোরখা হাঁটছে… তিলককামোদ
মেহবুব না আবদুল্লা কৌন বাজাইস… সারা কলাবাগান’

প্রথমটি বিগত-যৌবনা বাড়ির অন্তর্গত পরিসরে কোনও নিম্নবিত্ত মহিলার, দ্বিতীয়টি বারমুখী কোনও পুরুষের, হ্যারিসন রোড-সংলগ্ন ব্যান্ডের দোকান, কাবাবের দোকান দেখে যার মানভাষা উপচে উপচে উঠছে ফুর্তির চোটে। প্রথমটি মহিলামহলের অন্তর্গূঢ় ভাষা, দ্বিতীয়টি রাস্তায় ভাসমান পুরুষমহলের তুমুল হই-হল্লা। এভাবে প্রসূন শুধু নারী ও পুরুষের মানভাষাই প্রস্তুত করে ফেলেন না, তার সঙ্গে জড়িয়ে নেন সময়ের সঙ্গে ক্রমশ অপ্রস্তুত হয়ে আসা এক মান্য স্মৃতির বোধকে। এই ভাষাপ্রয়োগ জীবনের সঙ্গে তুমুল লগ্ন বলেই এর সঙ্গে মিশে যায় নাটকীয়তা। এই নাটকীয়তাও বাগবাজার সংশ্লিষ্ট গিরিশ মঞ্চের নাট্যচর্চার বিপুলাকৃতি রেডিয়াস। স্বয়ং গিরিশ ঘোষও তো গণমুখী ও ভক্তিরসাপ্লুত সংলাপই লিখে গেছেন সারাজীবন এই উত্তর কলকাতায় বসে। তাই এ-কোনও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক স্মৃতিমাত্র নয়। এর পরিধি আরও ব্যাপক ও বিস্তৃত। প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘কাব্যসংগ্রহ’-র ভূমিকায় অনির্বাণ মুখোপাধ্যায় লিখছেন: “কবি বর্ণিত ‘উত্তর কলকাতা’ আমাদের চেনা শ্যামবাজার-বাগবাজার-শোভাবাজার-আহিরীটোলায় আবদ্ধ নয়। শ্যাম এখানে বাঁশি বাজান, বাগিচায় শ্রীরাধিকার প্রবেশ ঘটে, কবিতা শোভা পায় ময়ূরপুচ্ছের মতো আহিরবালকের চূড়া করে বাঁধা কেশদামে। এ যেন হৃদিবৃন্দাবন।” মিলেনিয়াম-উত্তর পর্বে প্রসূন ব্যাপৃত ছিলেন ‘আত্মপরিচয়’-সংক্রান্ত তত্ত্বচর্চায়। ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দীর্ঘ বিতর্কে জড়িয়ে পড়বার সূত্রেই অনির্বাণের মতে ‘এমন সময়েই উত্তর আধুনিক ভাষাতত্ত্ব থেকে তিনি প্রবেশ করেন ভারতীয় ভাষাদর্শনের আঙিনায়।’ কোন আঙিনা? যেখানে সংশয়, প্রশ্নময় অস্তিত্ব নিয়ে উত্তর খোঁজার আকুতি তৈরি হচ্ছে। অতিকাল তাঁকে নিয়ে যাচ্ছে পরম বিশ্বাসের আনন্দ-উপলব্ধির দিকে। এই যাত্রার অন্যতম অবলম্বন ভাষা। কীভাবে?

বইমেলা ২০১৪-য় প্রকাশিত প্রসূনের দর্শন-বিষয়ক প্রবন্ধ সংকলন ‘ভাষাত্মদর্শন’-এর প্রথম প্রবন্ধ ‘ভাষা, মানভাষা, প্রান্তভাষা’ শুরুই হচ্ছে এইভাবে: “যদিও অনেকদিনই হল আমি ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’ পার করে এসেছি, তবু এই বইটার দিকে আমাকে ফিরে ফিরে তাকাতেই হয়। এই বইয়ের কবিতাগুলিতেই ধরা আছে আমার ভাব ও ভাবনার একটা বড় বাঁকবদল।” 

জীবনে কোনও দার্শনিক অবস্থানে থিতু হতে না-চাওয়া প্রসূন ন’ বছর পরে প্রকাশিত বইয়ের প্রথম লেখায় আবার ‘উত্তর কোলকাতার কবিতা’-র কথাই বলতে চাইলেন। বলতে চাইলেন প্রবাস থেকে স্বস্থানে ফেরার আত্মস্ফূর্তির কথা। বলতে চাইলেন, যেখানে সত্তার কোনও প্রকার বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি হয় না, সেটাই তার স্বস্থান। মানভাষা প্রসূনের কাছে কী? মান অর্থে মানে-ব্যবস্থা। কীসের মানে-ব্যবস্থা? এমন এক স্কুলিং যা পলিটিক্স ও কালচারের জগঝম্প থেকে স্বতন্ত্র। যেখানে যেমন খুশি তেমনভাবে তিনি অনায়াসে থাকতে পারেন। এই মানভাষাই প্রসূনের কাছে ‘অতিকাল’, যে-শব্দব্রহ্ম দিয়ে শুরু হয়েছে উত্তর কোলকাতার বিভাব কবিতা। বাউনের ছেলে হলেও হিঁদুয়ানী, মোছনমানী, কেরেস্তানী বলে আসলে কিছুই মেনে নিতে চান না কবি। ভাষা তাঁর কাছে মূল। ‘নচেৎ জগতে ভাবের সার্বজনীনতা প্রতিষ্ঠা হতে পারত না।’ এই ভাষাই অতিকাল। যার স্থানিক একাগ্রতায় জমিয়ে রেখেছে লোকাল জীবনের কলার তোলা ঔদ্ধত্য। প্রসূন একদা তাঁর প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার অবস্থান থেকে রসিকতা করে লিখেছিলেন: “তা আমার পাড়ায় আছেন এক প্রবীণ জ্ঞানী সংস্কৃতিব্যবস্থাপক মানুষ। কবি তাঁর চোখে দুই শ্রেণীর। ‘কবি’ ও ‘লোকাল কবি’। একদা আমাকে বলেছিলেন, লোকাল কবিদের নিয়ে একটা পোগ্রাম করছেন, আমিও তো লিখি-টিখি, অবশ্যই যেন গিয়ে দুটি পড়ে আসি।” এও কিন্তু প্রসূনের ওই জেলেপাড়ার লোকেরই কথা, যা একশ্রেণির পুঁজির ফলে আশ্রয়ে গেঁজে-ওঠা বৃহত্তর সমাজভঙ্গিরও পূর্ণ সমর্থন পাবে। ওই ব্যক্তি প্রসূনের সঙ্গে একই ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও আসলে রয়েছেন যোজন-যোজনব্যাপী দূরে। সেই কারণেই কি পুরোহিত, রিকশাচালক, পতিতা, পাড়ার উঠতি মাস্তান, ধাঙ্গড় বস্তির ক্যাকোফোনি, বইলেখা ভজনবাবু, আঁশগন্ধে ভরপুর জেলেদের জীবন কি প্রসূনের একেকটা তির– যা তিনি ছুঁড়ে মারেন কলকাতা শহরের গেঁজে-ওঠা এলিটিজমের মুখে? তাদের মুখের ভাষাকে কবিতায় এনে বানানের সিনট্যাক্স ভেঙেচুরে সেই অস্ত্রকে আরও শাণিত করে তোলেন ইচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্য-প্রণোদিতভাবে। দুগ্গা, মাগী, দুঃখু, লোচচা, ছাওয়াল, থেটার, মাইরি, শালা, মিনসে, গববোযন্তনা, চেম্বার, সাজুনী-র পাশাপাশি অনায়াসে একীভূত হয় অতিকাল, পন্থা, মসীবিলাস, পতঞ্জল, ক্ষণকাল, ভাটিয়াল, বেদনাম্বুরাশি, নাদব্রহ্ম, অনেকান্ত, অভিজ্ঞানের মতো শব্দেরা। বিশ্বায়িত কলকাতার এপিসেন্টারে বসে উত্তরের প্রাচীনতাকে সম্বল করে লিখে ফেলেন: 

‘দেখতে কিন্তু শহরপানা এই আমাদের গাঁ
গুটির বাড়ি সুতার বাসা সুতানুটির ছা
খাই দাই গান গাই বাগবাজারের ঘাটে
তাইরে নাইরে না… আমার সকল বেলা কাটে’

নগরজীবনকে নিয়ে কবিতা লেখা প্রসূনের কাছে ‘দুঃসাধ্য’। তাই নগরজীবন নিয়ে কবিতাকে ‘আধুনিক’ বলে আসলে আধুনিক কবিতার চিরায়ত ঘাড়ে-চেপে-বসা ভূতটিকে ছাড়াতে চান। রবীন্দ্রনাথ-পরবর্তী সময়ে উত্তর-ঔপনিবেশিক পর্বে যাকে ‘আধুনিকতা’ বলে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল তার গূঢ় ভিত্তি নগরজীবনই। আর আধুনিক কবিতা মানেই অস্তিবাদী, নেতিবাদী, নৈরাশ্যবাদী। এই প্যাটার্ন এত সুপরিকল্পিতভাবে ও সযত্নে গড়ে তোলা, তাকে ভেঙে অন্য কোনও দর্শনের কিংবা জীবনভঙ্গিকে নিয়ে আসা খুব সহজ ছিল না। এভাবেই লিখে যেতে হবে– এটাই কমফোর্ট জোন। প্রসূনের উত্তর কলকাতার কেন্দ্রে বসে লেখা কবিতাজগৎ বঙ্গীয় আধুনিকতার সেই দীর্ঘ প্রতিষ্ঠিত প্রতিমার সুতো সন্তর্পণে কেটে বেরিয়ে আসে। এমন নয়, এই কাজটা প্রসূনই একমাত্র করেছিলেন। বরং কবিতা থেকে বহু ব্যবহারে জরাজীর্ণ ও অপ্রাসঙ্গিক ও স্থানবিশেষে মেকি আধুনিকতার খোলসটা ছিঁড়ে ফেলা বাংলা কবিতার জন্য খুব জরুরি ছিল। প্রসূনের কবিতা তাই আধুনিকতা-উত্তর বাঙালি কবিতা। প্রসূনকে তাই সোচ্চারভাবেই লিখতে হয়:

‘তাই নগরের জীবন যন্ত্রণা
একাকিত্ব অবসাদ আত্মহত্যা ইন্টেলেক্ট প্রগতি
প্রতিবাদ রাষ্ট্রচিন্তা মতাদর্শ বিশ্বদৃষ্টি এই সকল
আমার হইতে পারে না বলিয়াই জ্ঞান করি। আমি
কলকাতার উত্তরে বাগবাজার অঞ্চলে জেলিয়াপাড়া
নামক এক প্রাচীন গ্রামে বাস করি।’

এই কবিতার শেষে প্রসূন বীরদর্পে জানাচ্ছেন, তিনি ‘বঙ্গকাব্য’ লিখবেন বলে মনস্থ করেছেন। যার অবলম্বন ভাষা নয়, ‘মানবজনমের ভক্তি’। মানভাষার অস্বস্তি দূর করে শেষমেষ নাছোড় প্রসূন বোধহয় সংশয় দূর করতে সেই বিশ্বাসের অতল সমুদ্রেই ঝাঁপ দিতে চেয়েছেন। উঠতে চেয়েছেন ‘আনন্দ ভিখিরি’-র সংশয়মুক্ত বিশ্বাসের জগতে। অনেকান্ত ও আধ্যাত্মিক যে পৃথিবীর অস্তিত্ব তিনি পেয়েছেন, তা শুধুমাত্র যে তাঁর একার নয়, একথা বলেছেন নিশ্চিতভাবে: ‘অগণিত প্রাণ প্রবাস ভেঙে ফিরতে চাইছে স্বস্থানে’। গোপন অন্তর্ঘাতের মতো এই মরিয়া দর্শনাকাঙক্ষাই প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপরোক্ষ অনুভূতি, তাঁর কবিতা-চর্চার নিরন্তর সাধন-প্রয়াস।