Robbar

মিষ্টি জলের বাঘ

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 22, 2026 5:58 pm
  • Updated:April 22, 2026 5:58 pm  

১৯৭০ সালের পর থেকেই এদের সংখ্যা ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। তারও প্রায় ১৫-২০ বছর পর এদের নিয়ে গবেষণার কাজে মানুষের আগ্রহ জন্মায় এবং এদের বিপন্ন হওয়ার কারণগুলি খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু হয়। মূলত যেসব কারণে এদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে– জলদূষণ, নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ, নদীতে গড়ে ওঠা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, মোটর-চালিত বোটের সংখ্যা বৃদ্ধি, নদী থেকে অতিরিক্ত বালি উত্তোলন, নদী থেকে অতিরিক্ত মাছ তুলে খাদ্যাভাব সৃষ্টি করা, মাংস ও তেলের লোভে শিকার করা, জেলেদের জালে আটকে ও নৌকার প্রপেলারের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া বা মৃত্যু এবং সবশেষে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা বাড়ায় মানুষের নদীতে সক্রিয়তা বৃদ্ধি হওয়া।

অমর কুমার নায়ক

জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝি বাড়ি থেকে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দূরে, নয়াচর গিয়েছিলাম, প্রকৃতির খোলা আঙিনায় কিছুটা সময় কাটাব বলে। এই রথ দেখার সঙ্গে কলা বেচা হিসাবে ছিল ‘নয়াচর ইকো ভিলেজ’-এ গণেশ চৌধুরীর আতিথ্যে থেকে গঙ্গাবুকে গাঙ্গেয় শুশুক ও মেছো বিড়ালের দর্শন লাভ করা। অবশ্য পাখি দেখা তো উপরি পাওনা। সারাদিন বোটে ঘুরে মাঝগঙ্গায় ভেসে ওঠা জাতীয় জলজ প্রাণীটি চাক্ষুষ করে যে অভিভূত হয়েছিলাম, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখে না। কখনও একাকী, কখনও বাচ্চা-সহ মা– কয়েক সেকেন্ডের জন্য জলতলের উপরে ভেসে আসছে, আবার ডুব দিচ্ছে জলের অতলে। এইভাবে এদের সঙ্গে কিছুটা মুহূর্ত কাটিয়ে দিয়েছিলাম। যদিও একটা পিঠের ছবি ছাড়া তেমন কিছু তুলতে পারিনি। তবে দু’চোখের লেন্সে দেখে মনের ক্যামেরায় বন্দি করে নিয়েছি এই অপূর্ব সাক্ষৎকার।

আজ থেকে প্রায় ছয় কোটি বছর আগে আবির্ভাব হওয়া সিটাসিয়ান বর্গের একটা সম্পূর্ণ জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীকে দেখে, মনে হয়েছিল, যেন ফিরে গিয়েছি সেই প্রাগৈতিহাসিক জগতের দোরগোড়ায়। জলজ প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও এরা মাছেদের থেকে স্বতন্ত্র বিশেষ কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের জন্য। অনুভূমিক তল বরাবর চ্যাপ্টা লেজ, সামনের পা বিবর্তিত হয়েছে ফ্লিপারে এবং পেছনের পা অনুপস্থিত। এছাড়া মাথার উপর থাকা ‘ব্লো হোল’ কাজ করে নাসিকাছিদ্রের। ফুসফুস দিয়ে চালায় শ্বাসকার্য। প্রায় ৮ থেকে ১০ মাস গর্ভে ধারণ করার পর জন্ম হয় একটি বাচ্চার। বাচ্চা বড় হয় মায়ের দুধ খেয়ে। ভাবতে অবাক লাগে কী অদ্ভুত এক জীব এরা।

গাঙ্গেয় শুশুক

গাঙ্গেয় শুশুক ভারতে প্রাপ্ত মিষ্টি জলের শুশুক। গাঙ্গেয় শুশুকের বিজ্ঞানসম্মত নাম প্ল্যাটানিস্টা গ্যানজেটিকা এবং সাধারণ নাম গ্যানজেটিক ডলফিন বা গ্যাঞ্জেস রিভার ডলফিন। স্বাদু জলে পাওয়া যায় এমন চারটি ডলফিনের একটি গাঙ্গেয় শুশুক। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও কর্ণফুলি-সাঙ্গু অববাহিকা অঞ্চলে এদের দেখা পাওয়া যায়। এরা মূলত এই প্রধান নদীগুলো এবং তাদের শাখানদীগুলোতে বিচরণ করে। ভারত ছাড়া নেপাল আর বাংলাদেশেও এদের দেখা মেলে। ভারত ও বাংলাদেশে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা ও কর্ণফুলি-সাঙ্গু অববাহিকায়, এবং নেপালে সপ্তকোশী ও কার্নালি নদীতে দেখা যায়। ১৭৯৭-এর শেষদিকে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদী থেকে উইলিয়াম রক্সব্রো সাহেব প্রথম এদের অস্তিত্ব খুঁজে পান। এদের বাংলা নাম ‘শুশুক’ হলেও, হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থমতে স্থানবিশেষে এদের ‘ভাগীরথ’ নামেও ডাকা হয়। নদীর একটি নির্দিষ্ট অংশে অনেকগুলি থাকলেও, একাকী বা জোড়ায় বিচরণ করতে পছন্দ করে এরা। দিনেরবেলা সক্রিয়। সাঁতার কাটার সময় জলের বাইরে মাথা তুলে পুরো শরীরকে পালটে দেয়। প্রতি দু’ মিনিট অন্তর এরা শ্বাস নিতে জলতলের উপর আসে। মাথা থেকে দেহ দৈর্ঘে ২০০-২৬০ সেমি এবং ওজন ৭০-৯০ কেজি। মোটামুটি ৩০ বছর অবধি বাঁচে। লম্বা সূচালো চঞ্চু এবং উপর-নিচে ধারালো দাঁতের সারি। পুরুষদের সামনের প্রলম্বিত অংশ স্ত্রীদের তুলনায় ছোট। গোল মাথা, পিঠের উপরে সামান্য কুঁজের মতো অংশ থাকে। শরীরের রং কালচে নীল, ধূসর নীল বা কালো। চোখ আকারে খুবই ছোট, লেন্স থাকে না। যদিও এরা চোখে দেখতে পায় না, শুধুমাত্র আলো বা অন্ধকার বুঝতে পারে। বেশ সক্রিয় এই প্রজাতিটি সবসময় ‘শু শু’ আওয়াজ করে। এরা মূলত ইকো-লোকেশনের মাধ্যমে দিকনির্ণয় এবং খাবারের সন্ধান চালায়। মূল খাবার মাছ হলেও, অন্যান্য জলজ প্রাণী, এমনকী পাখি ও কচ্ছপ খাওয়ার তথ্যও রয়েছে। ২-৩ বছর অন্তর গর্ভধারণ করে এরা এবং ৯-১০ মাস পরে একটি সন্তানের জন্ম দেয়। নিম্ন জন্মহার এদের বিপন্ন হওয়ার জন্য কিছুটা দায়ী। বাচ্চারা সাধারণত মায়ের সঙ্গে এক বছর অবধি থাকে। মায়ের সামনের পাখনা ধরে জলের মধ্যে সাঁতার কাটে, কিছুটা মায়ের হাত ধরে হাঁটতে শেখার মতো।

সাঁতার কাটার সময় জলের বাইরে মাথা তুলে পুরো শরীরকে পালটে দেয়

১৯৭০ সালের পর থেকেই এদের সংখ্যা ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি নজরে আসে। তারও প্রায় ১৫-২০ বছর পর এদের নিয়ে গবেষণার কাজে মানুষের আগ্রহ জন্মায় এবং এদের বিপন্ন হওয়ার কারণগুলি খুঁজে বের করার চেষ্টা শুরু হয়। মূলত যেসব কারণে এদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে– জলদূষণ, নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ, নদীতে গড়ে ওঠা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, মোটর-চালিত বোটের সংখ্যা বৃদ্ধি, নদী থেকে অতিরিক্ত বালি উত্তোলন, নদী থেকে অতিরিক্ত মাছ তুলে খাদ্যাভাব সৃষ্টি করা, মাংস ও তেলের লোভে শিকার করা, জেলেদের জালে আটকে ও নৌকার প্রপেলারের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া বা মৃত্যু এবং সবশেষে নদীকেন্দ্রিক সভ্যতা বাড়ায় মানুষের নদীতে সক্রিয়তা বৃদ্ধি হওয়া।

এই সময়ে দাঁড়িয়ে কারণগুলি নিয়ে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। নদীর চারপাশে মানব সভ্যতা গড়ে ওঠার পর থেকেই নদীতে দূষণ শুরু হয়। এই দূষণ আরও বাড়ে, যখন কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত রাসায়নিক ও পেস্টিসাইড ব্যবহার করা হয়। নদীর মধ্যে সরাসরি মেশে বিভিন্ন কারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, মিশছে মোটর বোটের ইঞ্জিনের তেল। সভ্যতার জয়যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রকৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছি। বিভিন্ন কারণে নদীর উপর ড্যাম ও ব্যারেজ নির্মাণ হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়। বাঁধের বাধায় এক নদী থেকে অন্য নদীতে, বা নদীর এক অংশ থেকে অন্য অংশে জল চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সেইসঙ্গে ব্যাহত হয়েছে ডলফিনের যাওয়া-আসা। এর ফলে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে ডলফিনের পপুলেশনে।

১৮৯৪ সালের বইয়ের অলংকরণে গাঙ্গেয় শুশুক

বাঁধ নির্মাণের মতোই, নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলি বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধি করেছে, সুগম করেছে আমাদের জীবন, কিন্তু বিঘ্নিত হয়েছে জলজ প্রাণীদের জীবনযাত্রা। নদীতে মোটরবোটের সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ার কারণে নদীতে ডলফিনের স্বাভাবিক চলাফেরা ব্যাহত হয়েছে। সেইসঙ্গে এদের ইকো-লোকেশনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে মোটরবোটের আওয়াজ। নদী থেকে অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় বালি উত্তোলন, নদীর স্বাভাবিক নাব্যতা ও গতিপথকে বিঘ্নিত করেছে। এতে প্রভাবিত হয়েছে শুশুকের জীবনযাত্রা। মাছ, ডলফিনের স্বাভাবিক আহার্যবস্তু, অতিরিক্ত মাছ তোলার ফলে সৃষ্ট খাদ্যাভাব ক্ষতি করছে ডলফিনের। সবক্ষেত্রে ঠিক ইচ্ছাকৃতভাবে না-হলেও মাংস ও ডলফিনের চর্বি থেকে তৈরি তেলের চাহিদা এদের মৃত্যুমুখে পতিত করে। অনেকসময় জেলেদের জালে উঠে আসে ডলফিন, খুব কমক্ষেত্রেই ফিরে যায় তাদের আবাসে। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী মাত্র তিন শতাংশ ডলফিন উদ্ধার হয় এবং স্বাভাবিক বাসভূমিতে ফিরে যায়। জালে আটকে অনেকসময় জখম হয়, তাছাড়া প্রপেলারের আঘাতে জখম হয়েও মৃত্যু ঘটে।

মিষ্টি জলের বাস্তুতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে ডলফিন। বাঘের সঙ্গে এদের তুলনা করা হয়, কারণ স্বাদু জলের বাস্তুতন্ত্রে এরাই সর্বোচ্চ শিকারি হিসাবে বাস করে। তাই জীববিজ্ঞানী ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এদের বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য নির্ধারণের একটি নিয়ামক বা সূচক হিসাবে ব্যবহার করেন। একটি নদীতে প্রাপ্ত ডলফিনের সংখ্যাই বলে দেয় সেই নদীর স্বাস্থ্য কেমন। তাই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এই প্রাণীটির। এছাড়াও ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে এরা। পুরাণে এদের গঙ্গাদেবীর বাহন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এমনকী সম্রাট অশোকের পঞ্চম শিলালেখে উল্লেখিত আছে ‘গঙ্গাপুপুটাকা’, যা নিঃসন্দেহে গঙ্গার ডলফিনের সুরক্ষার প্রতি। সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবে এই প্রাণীটির গুরুত্ব বোঝা যাচ্ছে। শুধু বাস্তুতন্ত্র বা পরিবেশগত দিকে নয়, ভারতীয় সংস্কৃতির অঙ্গ হিসেবেও সুরক্ষার দাবিদার গাঙ্গেয় শুশুক।

কালীঘাট পটে গঙ্গা ও মকর, ১৮৭৫

ভারতের প্রধান নদী গঙ্গার স্বচ্ছতার জন্য ‘গঙ্গা অ্যাকশন প্ল্যান’-এর সূচনা হয়েছিল। এই প্ল্যানের প্রথম পর্বে (১৯৮৫-২০০০) প্রথম গ্যাঞ্জেটিক রিভার ডলফিন ভারত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং এই জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণীটিকে ভারতের জাতীয় জলজ প্রাণীর স্বীকৃতি প্রদান করেন। যদিও ১৯৯৬ সাল থেকেই IUCN-এর লাল তালিকায় বিপন্ন (এনডেঞ্জার্ড) প্রজাতি হিসাবে তালিকাভুক্ত গাঙ্গেয় শুশুক। ২০১০ সাল থেকে এদের সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চালু হয়। ভারতীয় বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইন, ১৯৭২ অনুসারে এদের তফশিল ১-এ সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় (MOEFCC) ও ওয়াইল্ডলাইফ ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া (WII) ‘প্রোজেক্ট ডলফিন’ নামাঙ্কিত একটি পাঁচ বছরের প্রকল্প সূচনা করে, যার মূল উদ্দেশ্য হল ডলফিনের প্রজাতিগুলিকে (নদী ও সাগর উভয়ের) ফিরিয়ে আনা ও তাদের স্বাভাবিক বাসস্থান ফিরিয়ে দেওয়া। পাশাপাশি অন্য একটি প্রকল্প হল ভারতের নদী-বাস্তুতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন। বর্তমানে ডলফিন প্রসঙ্গে বিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক মহলে উৎসাহ থাকলেও, এখনও সাধারণ মানুষ এবং ছাত্রছাত্রীরা এই জীবটি সম্পর্কে তেমন জানে না। সমগ্র স্তরে এই বিষয়টি তুলে ধরা প্রয়োজন, বিশেষ করে যাদের জীবনযাত্রা নদীকেন্দ্রিক। ১৪ এপ্রিল দিনটি জাতীয় ডলফিন দিবস হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। তবে শুধু খাতায়-কলমে নয়, প্রতি বছর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে পালন করতে হবে এই দিনটিকে। আশার কথা হল, আগের থেকে ডলফিনের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। ভারতের দশটি রাজ্যের ৫৮টি নদীতে ২০২১-২০২৩ সাল অবধি ব্যাপক নিরীক্ষা চালিয়ে, ২০২৫ সালে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয় যে, ভারতে ৬৩২৪টি গ্যাঞ্জেস রিভার ডলফিন পাওয়া যায়। তবে এখনও নদীদূষণ বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়নি বালি চুরি এবং নদীর উপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণ। তাই এই বিষয়ে প্রশাসনকে আরও সতর্ক হতে হবে এবং এই প্রাচীন প্রাণীটিকে রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে প্রতিটি সাধারণ ভারতীয়কে।