Robbar

ইশতেহারে জোর রোগ নিরাময়ে, রোগ প্রতিরোধে নয়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 21, 2026 9:04 pm
  • Updated:April 21, 2026 9:18 pm  

সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে উন্নত হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার কথাই বলা হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য তো শুধু রোগ নিরাময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যাটা আজকের নয়। চিরকালই শাসক রোগ প্রতিকারে জোর দিয়েছে, রোগ প্রতিরোধে নয়। কতজন হাসপাতালে এসে বা দুয়ারে চিকিৎসা ক্যাম্পে গিয়ে চিকিৎসার সুযোগ নিয়েছে, সে পরিসংখ্যান দেখিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানে সরকারের সাফল্য প্রমাণ করা যায়। কিন্তু কত কম লোকের হাসপাতালের চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে একথা বলে, রাজ্যে জনস্বাস্থ্য বিকাশের কৃতিত্ব প্রমাণ করা যায় না।

প্রচ্ছদের ছবি: সংবাদ প্রতিদিন আর্কাইভ

নটরাজ মালাকার

সব্যসাচী চট্টোপাধ্যায়

শিয়রে নির্বাচন। নির্বাচন এক অর্থে গণতন্ত্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষা। কিন্তু নির্বাচকদের স্বাস্থ্য? তার কথা কি ভাবছে রাজনৈতিক দলগুলো?

গত ১৫ বছর যারা এ রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে সেই তৃণমূল কংগ্রেস তার ইশতেহারে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলির ওপর বিশেষ জোর দিয়ে স্বাস্থ্যসাথী হাসপাতাল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি ‘প্রতিটি ব্লক এবং শহরে বছরে একবার করে দুয়ারে চিকিৎসা শিবির করা হবে। উন্নতমানের স্বাস্থ্য পরিষেবা, কেস-বাই-কেস রেফারেল, ওষুধ এবং একটি সুনির্দিষ্ট রোগী ট্র্যাকিং ও সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে পরবর্তী চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে, যাতে কোনও রোগীই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হন।’ প্রশ্ন হচ্ছে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উন্নতির কথা না-বলে দুয়ারে চিকিৎসা শিবির কেন? এই প্রকল্প সহজে পরিমাপ করা যায় বলেই কি? তাদের আরও প্রতিশ্রুতি, আধুনিক চিকিৎসার পরিকাঠামো-সমেত প্রতি জেলায় একটা করে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল তৈরি করার।

অন্যদিকে, বিজেপি বলেছে, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্যের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ‘আয়ুষ্মান ভারত’ যোজনা কার্যকর করবে। ২০১৯-এর নির্বাচনের আগে বিজেপি প্রথম ‘আয়ুষ্মান ভারত’ যোজনার সূচনা করে, যা তৃণমূল সরকার এ-রাজ্যে চালু করেনি। বিজেপির বড় জোর উত্তরবঙ্গে। তাদের প্রতিশ্রুতি, উত্তরবঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘এইমস’ নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বিজেপি এইমসের আদলে ‘অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ আয়ুষ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় চিকিৎসা-পদ্ধতির প্রসার ঘটানোর অঙ্গীকার করেছে। লক্ষণীয়, অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি জোর দেওয়া হচ্ছে প্রথাগত চিকিৎসা-পদ্ধতিতে। এছাড়া সুন্দরবন ও জঙ্গলমহলের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে গেরুয়া দলের ইশতেহারে।

এ-রাজ্যে ৩৪ বছর ক্ষমতায় থেকেছে বামফ্রন্ট। তারা ফের ক্ষমতায় এলে কী করবে? তাদের প্রতিশ্রুতি, তারা ক্ষমতায় এলে রাজ্য বাজেটের ১০ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ করবে, স্বচ্ছতার সঙ্গে সব শূন্যপদে নিয়োগ করবে। তৃণমূলের মতো তারাও চায়– জেলায় জেলায় মেডিকেল কলেজ গড়ে তুলতে; উত্তরবঙ্গে মেডিকেল কলেজ থাকলেও তাদের প্রতিশ্রুতি, পাহাড়েও মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলার। বামেদের ইশতেহারে হাসপাতালে স্বল্পমূল্যে চিকিৎসার ওপর জোর দেওয়া হলেও পাশাপাশি তারা পিপিপি মডেলে অর্থাৎ, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে নতুন মেডিকেল কলেজ আর বহুমুখী হাসপাতাল নির্মাণ করতে চায়। ফলে দেখা যাচ্ছে, মুখে বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে কথা বললেও বামেদেরও বেসরকারি উদ্যোগের সঙ্গে হাত মেলাতে কোনও আপত্তি নেই। অবশ্য পিপিপি মডেলে যুক্ত হওয়ার ইতিহাস বামেদের ৩৪ বছরের শাসনেও আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এরাজ্যে ক্ষমতায় নেই কংগ্রেস। কোনও জোট নয়, তারা এবার একাই ২৯৪টা আসনে লড়ছে। ইশতেহারে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পিপিপি মডেলের কথা বলেছে কংগ্রেসও। কংগ্রেসের প্রতিশ্রুতি, মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালের আদলে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে একটি ‘প্রাইভেট ওয়ার্ড’ এবং একটি ‘সেমি-প্রাইভেট ওয়ার্ড’ চালু করা হবে; যেখানে বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় অনেক কম খরচে রোগীরা ভর্তি হতে পারবেন। এই ওয়ার্ডগুলো থেকে অর্জিত আয় সাধারণ ওয়ার্ডের রোগীদের চিকিৎসার খরচ বাবদ ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করা হবে। কংগ্রেস বলেছে, ‘প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ন্যূনতম ১০ শয্যাবিশিষ্ট অন্তঃবিভাগীয় চিকিৎসার সুবিধা থাকবে এবং সেখানে অন্তত একজন এমবিবিএস চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।’ কংগ্রেস তার ইশতেহারে চিকিৎসক-মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের স্মৃতি মনে করিয়েছে আর অঙ্গীকার করেছে– ‘সর্বজনীন, সহজলভ্য এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের’।

খেয়াল করে দেখুন, সব রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে উন্নত হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার কথাই বলা হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য তো শুধু রোগ নিরাময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যাটা আজকের নয়। চিরকালই শাসক রোগ প্রতিকারে জোর দিয়েছে, রোগ প্রতিরোধে নয়। কতজন হাসপাতালে এসে বা দুয়ারে চিকিৎসা ক্যাম্পে গিয়ে চিকিৎসার সুযোগ নিয়েছে, সে পরিসংখ্যান দেখিয়ে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানে সরকারের সাফল্য প্রমাণ করা যায়। কিন্তু কত কম লোকের হাসপাতালের চিকিৎসা নেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে একথা বলে, রাজ্যে জনস্বাস্থ্য বিকাশের কৃতিত্ব প্রমাণ করা যায় না। 

স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সরকার প্লেগ ও কলেরার মতো কিছু রোগ নিরাময়ের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিল, কারণ এই রোগগুলো ব্রিটিশ সেনা আর আধিকারিকদের কাছে বিপদের কারণ হয়ে উঠেছিল। এমন সব মহামারিকে নিয়ন্ত্রণ করাই ছিল শাসকের উদ্দেশ্য, সাধারণ জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটানো নয়। স্বাধীনতার পরে ভারত সরকারও একই পথে হেঁটেছে। জোর পড়েছে রোগ নিরাময়ে, রোগ প্রতিরোধে নয়।

স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বৈষম্য বেড়েছে। একটা পর্যায় অবধি এই বৈষম্য দূর করার চেষ্টা করা হত সরকারি কাঠামোর মধ্যে থেকে। কিন্তু ১৯৯০-এর দশক থেকে স্বাস্থ্যকে পুরোপুরি বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বাজারকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য মডেলে রোগী হয়ে গিয়েছে ‘ক্লায়েন্ট’। নয়া-উদারনীতির ফলে বৈষম্য আরও বেড়েছে। আমাদের মতো দেশে এক বড় সংখ্যক মানুষ স্বাস্থ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত। তারা কাঠামোগত উৎপীড়নের শিকার। পল ফার্মার তাঁর ‘প্যাথলজিস অফ পাওয়ার’ বইতে এই কাঠামোগত উৎপীড়ন ব্যাখ্যা করে বলেছেন, এটা এমন এক ধরনের উৎপীড়ন, যার ফলে মানুষ সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা কাঠামোর কারণে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। এই কাঠামোগত উৎপীড়ন নাগরিক অধিকারের উপলব্ধি সীমিত করে; সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের সুরক্ষার অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। কাজেই স্বাস্থ্যের অধিকার মানে শুধু অসুখ থেকে বাঁচা নয়, দারিদ্র আর শোষণের হাত থেকে বাঁচা-ও।

আপনি হয়তো ভাবছেন, এ-রাজ্যে ২০২৪ সালে আরজি করের ঘটনা ঘটে যাওয়ার ফলেই স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নৈরাজ্য আর অনাচারের ছবি সামনে এসেছে, তাই সব রাজনৈতিক দল স্বাস্থ্য নিয়ে এত কথা বলেছে তাদের ইশতেহারে। তা কিন্তু নয়। সারা বিশ্বেই সাম্প্রতিককালে স্বাস্থ্য গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী ইস্যু। ২০২৪ সালে ব্রিটেনের সাধারণ নির্বাচনে স্বাস্থ্য ছিল জরুরি বিষয়। কনজারভেটিভ দলের দীর্ঘ শাসন-আমলের স্বাস্থ্য সংকট লেবার পার্টিকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করে। নির্বাচনে ‘রিফর্ম ইউকে’ নামে রাজনৈতিক দলটি ১৪% ভোট পায়, যারা স্বাস্থ্যে জোর দিয়েছিল। তারা যে পাঁচটি আসনে জিতেছিল, সেই সব জায়গায় স্বাস্থ্যসূচক ছিল অত্যন্ত খারাপ। এখানেই শেষ নয়, ২০২৫ সালের মে মাসে, এই দলটি স্থানীয় কাউন্সিল নির্বাচনেও অনেক আসন জিতেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও রিপাবলিকান দলের নির্বাচনী সাফল্যের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে, এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের।

ছবি: সংবাদ প্রতিদিন আর্কাইভ

ক’দিন আগেই ১২ এপ্রিল ভোট হল হাঙ্গেরিতে। সেখানেও স্বাস্থ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু। পিটার ম্যাগিয়ার-এর নেতৃত্বাধীন তিজা পার্টি তাদের নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রে নিয়ে আসে দেশের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য-ব্যবস্থাকে। তারা দাবি করে যে, দেশের মোট যোগ্য ভোটারের প্রায় ৫৮ শতাংশ মনে করেন, গত ১৬ বছরে ভিক্টর ওরবান-এর শাসনামলে স্বাস্থ্যসেবার উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই অসন্তুষ্টর দলে ওরবানের ‘ফিদেজ’ দলের সমর্থকদেরও একটি বড় অংশ ছিল। ১৩ এপ্রিল ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, পিটার ম্যাগিয়ারের নেতৃত্বে তিজা পার্টি ১৩৫টিরও বেশি আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মাইকেল মারমোট একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, স্বাস্থ্য একটি রাজনৈতিক বিষয়। কোনও দেশ বা রাজ্যের স্বাস্থ্যসূচক, মানুষের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভোটাধিকার প্রয়োগের আচরণকে প্রভাবিত করে। সেজন্যই স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

ছবি: সংবাদ প্রতিদিন আর্কাইভ

বিগত দু’বছরে ‘জাস্টিস ফর আরজি কর’ এরাজ্যের সমাজ-রাজনীতিকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। বিজেপি-র হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েছেন অভয়ার মা। কিন্তু এই প্রসঙ্গে নারীসুরক্ষার কথা যতটা উঠে এসেছে, ভোটের সময়ে ইশতেহারের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যের অব্যবস্থার কথা ততটা নেই। আসলে কোভিড আমলে সরকারি হাসপাতালের অসামান্য অবদান সত্ত্বেও আমরা বিমানির্ভর বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাতেই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসাক্ষেত্রে নিজের পকেট থেকে খরচের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে মাথাপিছু ব্যয় দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০২১-’২২ অর্থবর্ষে বাংলায় এই ব্যয়ের পরিমাণ ছিল বছরে ৪,০১০ টাকা। প্রশ্ন হল, নিজের পকেট থেকে এই খরচ কি রাজ্যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অপ্রাপ্যতার সূচক, না কি ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’-এ আমাদের অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার প্রমাণ?

স্বাস্থ্যখাতে ব্যক্তিগত খরচের সমস্যা সমাধানের উপায় হল বিমা। আর তাই সামনে আসে বিভিন্ন বিমাপ্রকল্প। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে এমন প্রকল্পগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়, যা সহজে দেখা যায়। এই অবস্থায় স্বাস্থ্যে বিমা আর চিকিৎসাই যে মূল ইস্যু হবে, সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?