Robbar

মুক্তচিন্তা কি দেশদ্রোহের সমার্থক?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 25, 2026 8:44 pm
  • Updated:April 25, 2026 9:10 pm  

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘দেশবিরোধী’ তকমায় সেঁটে দিয়ে জনসাধারণকে মননচর্চা বিমুখ বা মননচর্চার কেন্দ্রগুলির শত্রু বানিয়ে দেওয়ার যে-কৌশল, তার নেপথ্যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলিকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো এমন হতেই পারে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকে প্রাচুর্যময় গোষ্ঠীর হাতে সমর্পণ করে তাকে ‘প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটি’ অর্থাৎ, সম্পূর্ণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার অভিসন্ধি রয়েছে।

রোববার ডিজিটাল ডেস্ক

১৯৪৭ সাল, ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতার দিন। গুরুতর দিন। কিন্তু এই দিনের ৪১ বছর আগের একটা ঘটনার স্মরণ করে নেওয়া দরকার– ১৫ আগস্ট, ১৯০৬। কী ঘটছে সেই দিন? প্রতিষ্ঠা হয়েছিল জাতীয় শিক্ষা পরিষদ। যে-পরিষদ ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার অভিপ্রায় তৈরি করেছিল গোটা দেশে। যে-প্রতিষ্ঠান আজকের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাত্রীভূমি।

জাতীয় শিক্ষা পরিষদের জন্মলগ্নে, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়– প্রমুখ বরেণ্য বাঙালি, যাঁদের প্রত্যক্ষ অবস্থান ছিল ব্রিটিশ শাসন-বিরোধী। কাজেই শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধতার রেওয়াজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্মগত। যেমন, রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বভারতী’ জন্ম নিয়েছিল ১৯০১ সালে, তাঁর শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মচর্য আশ্রম থেকে। এই ব্রহ্মচর্য আশ্রম সম্পূর্ণ ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে, দেশজ শিকড়কে আত্মীকৃত করার মন্ত্র নিয়ে জন্ম নেওয়া, ঠিক তেমনই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছিল জাতীয় শিক্ষা পরিষদ অর্থাৎ, ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশন’ (NCE)। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এমন একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান, তার সম্পর্কে দেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সেখানে দেশবিরোধী শ্লোগান লেখা হয়!

ছবি: সংবাদ প্রতিদিন আর্কাইভ

আপাতদৃষ্টিতে এমন ভিত্তিহীন মন্তব্য তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়াই যেতে পারে। কিন্তু যেখানে প্রধানমন্ত্রী এ-কথা বলছেন এবং ‘দেশবিরোধী’– এই শব্দচয়ন করছেন, তখন বুঝতে হবে, এর নেপথ্যে সুচতুর একটি রাজনৈতিক কৌশল রয়েছে।

কেমন সেই কৌশল?

এই রাজনৈতিক কৌশল আসলে ‘দেশ’ আর ‘সরকার’– এই ধারণাকে গুলিয়ে দেওয়ার। এই যে আমাদের দেশ, তাকে ভালোবেসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম। সরকারের বিভিন্ন নীতি ও ভূমিকা নিয়ে যে-প্রশ্ন তোলা, তার মধ্যেও নিগূঢ় দেশপ্রেম আছে। তাকে উপলব্ধি করে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে চিরকাল মননচর্চা করেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, সেই ইতিহাস অত্যন্ত গভীর এবং দৃঢ়।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কেন্দ্রের এই অসূয়া মনোভাব নতুন নয়। দিনের পর দিন কেন্দ্রীয় অনুদান কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। মানবীবিদ্যা থেকে শুরু করে রবীন্দ্রচর্চা, পাশাপাশি ‘সেন্টার ফর অল্টারনেটিভ টেক্সট চর্চার’ যে-কেন্দ্রগুলি এই প্রতিষ্ঠানে আছে, সেগুলি সাম্য, মৈত্রী এবং মননের ক্ষেত্রে ভারতীয় সংবিধানের প্রতিশ্রুতিগুলিকেই রক্ষা করার চেষ্টা করে চলেছে দায়বদ্ধভাবে। অথচ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইসব অগ্রগণ্য ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করেই কেন্দ্রীয় অনুদান কমিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ক্রমাগত দেখা যাচ্ছে। কেন্দ্রের এমন ভূমিকায় শিক্ষাবিদ-সহ বিশিষ্টজনরা বারবার সোচ্চার হয়েছেন। আসলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘দেশবিরোধী’ তকমায় সেঁটে দিয়ে জনসাধারণকে মননচর্চা বিমুখ বা মননচর্চার কেন্দ্রগুলির শত্রু বানিয়ে দেওয়ার যে-কৌশল, তার নেপথ্যে শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলিকে বেসরকারিকরণের দিকে ঠেলে দেওয়ার ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হয়তো এমন হতেই পারে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানকে প্রাচুর্যময় গোষ্ঠীর হাতে সমর্পণ করে তাকে ‘প্রাইভেট ইউনির্ভাসিটি’ অর্থাৎ, সম্পূর্ণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার অভিসন্ধি রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর মাথাব্যথা যাদবপুর-সংস্কৃতি

মনে রাখা দরকার, এই মূল্যবৃদ্ধি ও বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র খরচে পড়াশোনা করার সুযোগ মেলে শিক্ষার্থীদের। গ্রামগঞ্জ থেকে উঠে এসে পড়াশোনা করার পরিসর এবং স্বাধীন মুক্তচিন্তার যে পরিবেশ– তা আজও রয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেশের প্রধানমন্ত্রীর মতো যে বা যাঁরা মনে করেন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা হয় না, কেবল দেশবিরোধী কার্যকলাপ হয়, তাহলে তাঁদের মনে রাখা প্রয়োজন, এনআরআইএফ (NRIF)– মননের মান-নির্ধারক যে জাতীয় সংস্থা, তাদের সমীক্ষায় যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান একেবারে প্রথম সারিতে। কখনও প্রথম, কখনও দ্বিতীয়, কখনও তৃতীয়।

এনআরআইএফ-এর ক্রমতালিকায় ধারাবাহিকভাবে এই অবস্থান ধরে রেখেছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, বিজ্ঞানচর্চা, সারস্বত চর্চায় এশীয় ও বিশ্বস্তরেও যাদবপুর বিভিন্ন সংস্থার বিচারে প্রথম সারিতে অবস্থান করছে। এহেন প্রতিষ্ঠানে ‘পড়াশোনা হয় না, দেশবিরোধী কথা হয়’– এসব বলে সত্যের অপলাপ ঘটাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি গুলিয়ে দিচ্ছেন দেশ আর সরকার– এই ফারাককেও। সরকার জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, অথচ সেই সরকার রামমন্দির নির্মাণ করছে, হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে তাদের নীতি মনে করছে। সরকার সেনাবলে বাংলা দখল করতে চায়, এই দখলদারির বিরুদ্ধে যে কথা বলবে, সে ব্যক্তিস্বর হোক কিংবা গৌরী লঙ্কেশ, কিংবা এমএম কালবুর্গি হোক, অথবা কোনও প্রতিষ্ঠান, তার বিরুদ্ধে জনগণকে খেপিয়ে তোলাই হবে সরকারের কাজ।

ভোট আবহে বাংলায় এখন এটাই পরিচিত দৃশ্য

‘মুক্তধারা’য় ধনঞ্জয় বৈরাগী যখন প্রতিবাদের স্বর তৈরি করছেন, তখন রাজা বলছেন, ‘এবার কণ্ঠীসুদ্ধ তার কণ্ঠটা চেপে ধরতে হবে।’ ঠিক একইভাবে যাদবপুরের মতো উৎকর্ষ শিক্ষাকেন্দ্রের ‘কণ্ঠীসুদ্ধ কণ্ঠ’ চেপে ধরার জন্যই ছেলেভোলানো কথা, রাজনৈতিক অভিপ্রায়-যুক্ত কৌশল আমদানি করে বিরুদ্ধ-প্রচার করা হচ্ছে। সেই অপপ্রচারকে আমল না-দিয়ে মনে রাখতে হবে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাংলার গর্ব, বাঙালির মননসত্তার গর্ব। এর মর্যাদারক্ষা করা বাঙালির কর্তব্য। এই প্রতিষ্ঠান যখন প্রতীক হয়ে উঠেছে মুক্তচিন্তার, কিংবা দেশে যেখানে মুক্তচিন্তার কথা হচ্ছে, সেখানেই তাকে ‘দেশদ্রোহিতা’র তকমায় দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে নানারকমভাবে।

অপরদিকে, ‘দেশ’ একটি অতি বড় ধারণা। দেশ মানে কেবল সরকার নয়, শাসকের নীতি-নির্ধারণকারী একটি সংসদ নয়। দেশ মানে, সেই গরিব মানুষ, যারা ক্ষুধাপেটে ভোট দিতে আসেন। ‘দেশ’ মানে সেই ভূখণ্ড, যার শিকড়ের সঙ্গে আমাদের গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, দেশপ্রেম ও উগ্র জাতীয়তাবাদ এক নয়। যে-দেশপ্রেমে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা থাকে, সেই দেশ আর সরকার কখনও এক হতে পারে না। বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা ভারতের বিরুদ্ধে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় কখনও কোনও কথা বলেনি। বরং তাদের অবস্থান ভারতের সপক্ষে, ভারতের হিতার্থ চিন্তায়, ভারতের সংবিধান রক্ষায়। সেখানে এই আক্রমণ, বেঠিক কথা বলা যে, একপ্রকার রাজনৈতিক অপকৌশল, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট।