Robbar

আড্ডা আর সরষে ইলিশের জন্যই কলকাতাকে ভালোবেসে ফেললাম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 26, 2026 7:42 pm
  • Updated:April 26, 2026 8:02 pm  

২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বর, রঘু রাইয়ের ৮০তম জন্মদিনে ‘রোববার’ পত্রিকা ‌তাঁকে নিয়ে সংখ্যা করে ‘রাই আমাদের’। সেই সংখ্যায় চিরাচরিত ‘অকিঞ্চিৎ’ লেখেননি রোববার সম্পাদক অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়। অকিঞ্চিৎ-এর চারপাতা জুড়ে ছাপা হয়েছিল রঘু রাইয়ের ছবি আর এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার। রঘু রাইয়ের মৃত্যুদিনে সেই সাক্ষাৎকারটির পুনর্মুদ্রণ রইল।

 

অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়

রঘু রাই-এর সঙ্গে আলাপ মহার্ঘ‌ বইয়ের দোকানে। যেমন জগজিৎ সিং-এর গজলের অনুষ্ঠান টিকিট কেটে দেখতে পারিনি কোনও দিন, তেমনই রঘু রাইও পকেটের ধরাছোঁয়ার বাইরে চিরকাল। ঠান্ডা বইয়ের দোকানে ‘বারাণসী’ বা ‘কলকাতা’ লেখা ডাবল ক্রাউন বইগুলোর পাতা ওল্টাতাম। ঝিমধরানো সব ছবির সারি, চোখ কপালে তুলে দেখতাম। তিনি ছিলেন দূরের মানুষ, কিন্তু মনের ঘরের কাছে ওই একটিই নাম। আন্তর্জাতিক প‌্যানোরামায় একটিই নাম। ছবি তুলে তারকা হয়ে যাওয়া একজনই– শ্রী রঘু রাই। ক‌্যামেরা নিয়ে বন্ধুদের কেউ যদি কিছু পাঁয়তারা কষে, একটাই কমন আওয়াজ– এ তো দেখি রঘু রাইয়ের ভাই, ঘুঘু রাই রে! আমাদের সমার্থকোষে, কোন অবচেতনে ‘ফোটোগ্রাফি’ শব্দটার সঙ্গে তিনি জড়িয়ে গেলেন।

এর অনেক বছর পরের ঘটনা। বেট্‌স বিজ্ঞাপন সংস্থার ভাইস প্রেসিডেন্ট আবির চক্রবর্তী একদিন ফোন করলেন। জানালেন, ‘লা রিপাবলিকা’ নামের এক ইটালিয়ান প্রোজেক্টে কাজ করতে কলকাতায় এসেছেন রঘু রাই। উনি তোমাদের ব‌্যান্ডের একটা ছবি তুলতে চান। তোমরা অনুষ্ঠানে গান গাইছ, এমন মোমেন্ট। পরদিন ‘চন্দ্রবিন্দু’র প্রোগ্রাম ছিল ক‌্যালকাটা ইউনিভার্সিটি হল-এ। ঠিক হল, ওখানেই উনি আসবেন। সংগঠকদের বলে রাখা হল সেইমতো। ভেবেছিলাম, মঞ্চে ওঠার আগে, ওঁর সঙ্গে আলাপ হবে, কিন্তু সে গুড়ে বালি! স্টেজে ওঠার সময় হয়ে গিয়েছে। ফলে গান গাইতে গাইতে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে রইলাম দর্শকদের দিকে। শেষ পর্যন্ত উনি এলেন। আশপাশে যারা নাচছে, তাদের পাত্তা না দিয়ে নিজের পোজিশন নিলেন। ভেবেছিলাম, অনেক সাজ-সরঞ্জাম থাকবে। ও হরি, হাতে একটা পুঁচকে ক‌্যামেরা! বিশালদেহী, রূপবান মানুষটির হাতে খেলনা মনে হচ্ছিল সেটিকে। ছবি তুললেন নিজের মতো। আমি গান গাইতে গাইতে একবার হাত তুললাম। উনি নড করলেন। ব‌্যস, ওটুকুই আলাপ এবং ইতি। আমরা মঞ্চে রইলাম। উনি রাজকীয় ভঙ্গিতে মঞ্চ ছেড়ে গেলেন। ওঁকেও আর দেখিনি কোনও দিন, ছবিটিকেও।

ভাস্কর যেদিন জানাল, রঘু রাই নিয়ে একটা ‘রোববার’ করলে কেমন হয়? সাঁ করে মনে পড়ল এই ঘটনাটা। দেশের সেরা এই আলোকচিত্রী ৮০ ছোঁবেন আজকের দিনটায়। এমন স্মরণীয় মুহূর্ত ফ্রিজ করে রাখার কিছু দায়িত্ব বর্তায় বইকি আমাদের! রঘু রাইয়ের যোগাযোগ ফের ঘটিয়ে দিলেন আবির। ফোন করলাম। রিংটোনে পুরনো দিনের হিন্দি গান। নিজস্ব মেজাজে রাজি হয়ে গেলেন কথা বলতে।

…………………………………………………

রঘু রাই

ফোটোগ্রাফি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হল কোন বয়সে?
ছবি তুলতাম, দেখতাম। কিন্তু পেশা হিসেবে সিরিয়াসলি যখন নিলাম, তখন আমার ২৪ বছর বয়স।

বাড়িতে কেউ…
দাদা ছিলেন। ওঁকে দেখে কিছুটা। শরমপাল চৌধুরী সেই সময়ের নামকরা ফোটোগ্রাফার। এস. পল লিখতেন।

শরমপাল চৌধুরী

প্রথম ক‌্যামেরা? প্রথম ফোটো?
আলফা সুপার সিলেট। প্রকৃতির ছবি তুলব ঠিক করেছিলাম। শেষমেশ তুললাম নিসর্গের মাঝে এক বাচ্চা গাধার ছবি। সে ছবিও কাগজে বেরিয়েছিল ভালোভাবে।

ভালো ছবি তোলার জন‌্য কী ধরনের ক‌্যামেরা সঙ্গে থাকা উচিত?
ভালো ছবির সঙ্গে ক‌্যামেরার কোনও সম্পর্ক নেই তো! চোখ আর মনের সংযোগ– এই তো ঘটনা। ফলে ক‌্যামেরা কেমন, এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দৃষ্টিটা কেমন? ওটা আগে, যন্ত্রপাতি অনেক পরে।

’৭১ মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনি ফ্রন্টিয়ার থেকে কভার করেছিলেন…
যেদিন পাকিস্তান সারেন্ডার করে আমি ছিলাম জেনারেল নিয়াজির ঠিক পাশে। আত্মসমর্পণের ব‌্যাপারটা যে হজম হচ্ছে না আদপেই, সে তার চোখেমুখে পরিষ্কার ছিল। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের এমন বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তেরই আমি সাক্ষী।

বিদেশে আপনার প্রথম এগজিবিশনও তো…
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিন্তু নয়। শরণার্থী নিয়ে। বাংলাদেশ থেকে আসা শরণার্থীদের নিয়ে অনেক দিন কাজ করেছি আমি। ভীষণভাবে টানত বিষয়টা।

রঘু রাইয়ের তোলা শরণার্থীদের ছবি।

সেভাবেই কার্টিয়ের ব্রেসো-র সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল?
হ্যাঁ, উনি এসেছিলেন প‌্যারিসের প্রদর্শনীতে। অত বরেণ‌্য এক মানুষ, টেনশনে ছিলাম। ওঁর খুব ভালো লাগে আমার কাজের ধরন। উনি আমাকে ‘ম‌্যাগনাম’-এর জন‌্য কাজ করার অফার দেন। ম‌্যাগনামের হয়ে ভারতীয় ফোটোগ্রাফার হিসেবে আমিই প্রথম কাজ শুরু করি।

আপনার স্মরণীয় কাজগুলোর মধ্যে ভোপাল গ‌্যাস ট্র‌্যাজেডি অন‌্যতম, ব‌্যক্তিগতভাবে কতটা নাড়া দিয়েছিল আপনাকে…
ভয়ংকর এক ঘটনা! ভাবা যায় না, যা ঘটেছিল। আমি যে-সময় পৌঁছই, গোটা শহর তখন আতঙ্কে কাঁপছে। তার সঙ্গে কাজ করছে এক তীব্র ঘৃণা, রাগ, স্বজন হারানোর শোক। অনেক শব্দ লিখে যা বোঝানো যায় না, মাত্র একটা মুখের এক্সপ্রেশন তা বলে দিতে পারে। ওই অসহায় মুখগুলো এখনও আমার স্বপ্নে আসে।

ভোপাল গ্যাস ট্র্যাজেডি, আলোকচিত্র: রঘু রাই

সবসময়ই চ‌্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন। তাও যদি এমন কোনও অ‌্যাসাইনমেন্টের কথা বলেন, যেখানে ছবি পেতে মুশকিল হয়েছিল খুব।
‘বিটল্‌স’-এর ছবি– ওরে বাবা, সেটা একটা দুরন্ত অ‌্যাডভেঞ্চার! আমি আর সৈয়দ গিয়েছি ‘দ্য স্টেটসম‌্যান’ থেকে। মহেশ যোগীর আশ্রমে পৌঁছে দেখি, সব প্রেস সেখানে হাজির। কিন্তু বিটল্‌স-এর ছবির কপিরাইট এক বিদেশি চ‌্যানেলের, ফলে আমাদের আশ্রমের মূল জায়গায় ঢোকা বারণ। সব প্রেসকে তারা ঢুকিয়ে দিয়েছে একটা গেস্ট হাউসে। বোঝারই উপায় নেই সেখান থেকে, লেনন, ম‌্যাকার্টনি, জর্জ– কোথায় তাঁরা! সৈয়দ এর মধ্যে করেছে কী, মহেশ যোগীর শিষ‌্য সেজে ঢোকার চেষ্টা করে ধরা পড়ে গিয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে ও আমাকে জানাতে পেরেছে, ওঁরা কোন গাছের তলায় বসে। আমি পরেছিলাম বিরাট ঢোলা একটা পোশাক। জুম লেন্স লাগিয়ে ক‌্যামেরাটা লুকিয়ে ওইদিকে হাঁটতে শুরু করলাম। এক সন্ন‌্যাসী আটকালেন। মুখটা করুণ করে বললাম, তেষ্টা পেয়েছে। তিনি জল আনতে চলে গেলে, আমি ক‌্যামেরা বের করে তাক করলাম। তখন তো আর অটোফোকাস নেই। সময় লাগত একটু। তার মধ্যে তিনি জল নিয়ে ফিরে এলেন। একঢোকে খেয়ে বললাম, আরও এক গ্লাস। পরের জল আসার আগে আমার একটা শট হয়ে গিয়েছে। বাকিদের যথারীতি জানাইনি কিছু। কপট রাগ দেখিয়ে ওখান থেকে কেটে সোজা গাড়ি চেপে দিল্লি। পরদিন ফ্রন্ট পেজ হয়েছিল অবশ‌্যই। আর ওই ছবিটা ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পরে ছাপে।

আলোকচিত্র: রঘু রাই

আমাদের দেশের শহরগুলো নিয়ে আপনার দুর্দান্ত সব বই রয়েছে। আপনার চোখে কোন কোন শহর সবচেয়ে ফোটোজেনিক?
বারাণসী, কলকাতা, ক‌ন‌্যাকুমারী। আমার এদের ক্যারেকটারিস্টিক সবচেয়ে পছন্দ। আলাদা একটা মেজাজ আছে শহরগুলোর।

শেষ কবে কলকাতা শুট করেছেন?
প‌্যানডেমিকের সময়। কলকাতার তখন সম্পূর্ণ আলাদা একটা চেহারা। না এলে জানতেই পারতাম না। মানুষের ভিড়ে যে স্থাপত‌্যগুলো আর চোখে পড়ে না, সেগুলো যেন বাইরে বেরিয়ে এল শহরের।

কলকাতার কোন দিকটা সবচেয়ে টানে?
গঙ্গার পাড়। ঘাটগুলো। টানা হেঁটে যাওয়া। বাচ্চাদের ইচ্ছেমতো জলে লাফ। সিঁদুরমাখা প্রতিমা পড়ে থাকা। সকালবেলা পুণ‌্যস্নান। হাওড়া ব্রিজের নিচে ফুলের বাজার। ফ‌্যাবিউলাস সব ভিস্যুয়াল!

গঙ্গার পাড়, রঘু রাইয়ের চোখে

কোন ম‌্যাজিকে এত ভালবেসে ফেললেন কলকাতাকে?
বোধহয় আড্ডা আর সরষে ইলিশের জন‌্য। কলকাতা মানেই প্রোডাক্টিভ সব আড্ডা– কী সব মানুষজন! সারাজীবনেও আফশোস যাবে না, সত‌্যজিৎ রায়কে আলাদা করে শুট করতে না পারার জন‌্য।

মাদার টেরেসাকে তো করেছেন?
ওহ্‌ মাদার? ‘মিশনারিজ অফ চ‌্যারিটি’তে দিনের পর দিন কাটিয়েছি। আমি যে-সময় থেকে মাদারের ছবি তুলছি, সে-সময় দেশি তো দূরস্থান, বিদেশি প্রেসও মাদারকে নজর করেনি। অসম্ভব প্রশ্রয় পেয়েছি তাঁর কাছে। ওই হাসি আর মানুষকে ভালবাসার ক্ষমতা– কখনও ভুলব না।

নিজ বাসভবনে মাদার টেরেজা, আলোকচিত্র: রঘু রাই

কাজের মধ্যে ছবি তুলতেন, কখনও বিরক্ত হননি?
একবার হয়েছিলেন। আসলে হয়েছে কী, আমি কনফেসন চেম্বারে ঢুকে ছবি তুলছিলাম। তারা তো রেগেমেগে আমাকে মাদারের কাছে নিয়ে গেল। আমি মাদারকে বললাম, মানুষ যখন কনফেস করে কোনও কিছু– সে-সময়টা সে সবচেয়ে পিওর। এমন একটা মোমেন্ট তুলব না? মাদার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় স্মিত হেসেছিলেন। তার মধ্যেই ‘হ্যাঁ’ লুকিয়ে ছিল।

শুধু মাদার কেন, রাজনীতিবিদদের কাছেও আপনি প্রিয়পাত্র ছিলেন। বিশেষ করে ইন্দিরা গান্ধী…
ইন্দিরাজি আমাকে অ‌্যালাউ করেছিলেন তাঁর সারাদিনের কাজের ছবি তোলার জন‌্য। আমি গোটা দিন ছবি তুলে গিয়েছিলাম। সেদিন গুজরাত কংগ্রেস থেকে দেখা করতে এসেছে ডেলিগেট টিম। হাতে তাদের মেমোর‌্যান্ডাম। ইন্দিরাজি তাতে সই করবেন। এদিকে আমি ছবি তুলতে তুলতে চলে গিয়েছি তাঁর পিছনে। কেউ একজন সেটা ওঁকে বললে, উনি ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, রঘু, এগুলো খুবই কনফিডেন্সিয়াল কাগজ। পড়ার চেষ্টা কোরো না যেন! আমি বললাম, ইন্দিরাজি, যখন ছবি তুলি আমি, তখন ভিউ-ফাইন্ডার ছাড়া আর কিছু দেখি না কখনও।

ইন্দিরা গান্ধী এবং মাদার টেরেজা, রঘু রাইয়ের ক্যামেরায়

ফিল্ম ক‌্যামেরার মানুষ আপনি। ডিজিটাল ক‌্যামেরায় অসুবিধে হয় না?
অন্তত আমার তো হয় না। টেকনোলজি তো চিরকাল বদলে বদলে যায়। কেন আর ফিল্ম নেই বলে গোঁসা করে যদি কেউ ছবি তোলা ছেড়ে দেয়, তবে তো তারই ক্ষতি! আমার এই চেঞ্জ ওভারটায় অসুবিধে হয়নি।

কখনও সেলফি তুলেছেন?
সেলফি বলতে আমি সেল্‌ফ পোর্ট্রেটই বুঝি। সেটা প্রথম আমায় দিয়ে তোলান ডেসমন্ড ডয়েগ। জুনিয়র স্টেটসম‌্যান কাগজের জন‌্য তুলেছিলাম ওই সেল্‌ফ পোর্ট্রেট। এখনও অনেক সেলফি তুলি। তবে একটু অন‌্যভাবে। সে-ছবিগুলো কিছুদিন পর প্রকাশিত হবে।

মহাবলীপুরমে বীণকার এস বালচন্দর, রঘু রাইয়ের তোলা ছবি, ১৯৮৮

রোববার’-এর পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই শুভ জন্মদিন। আপনি আরও দীর্ঘদিন কর্মক্ষম থাকুন, আপনার নতুন ছবি যেন আমাদের মনে নতুন ভাবনার জন্ম দিতে পারে। 

থ‌্যাঙ্ক ইউ। তোমরা ফোটোগুলো একটু যত্ন করে ছেপো।

আর একটা অনুরোধ আছে আপনার কাছে। আমাদের গানের দলের একটা ছবি আপনি প্রায় বছর পনেরো আগে তুলেছিলেন কলকাতায়। আপনার কি মনে আছে এমন কোনও ছবির কথা?

না, মনে নেই একেবারে। তবে ওই ছবিটা আমি খুঁজে দেখব অবশ‌্যই।

রঘু রাই, রাই আমাদের, কথা দিয়েছেন, সেই হারিয়ে যাওয়া ছবিটা খুঁজে দেখবেন। চলুন, এবার আমরা খুঁজে দেখি রঘু রাই নামক এক বটবৃক্ষ, এক ইনস্টিটিউশন, এক বোহেমিয়ান কিংবা এক ছবি বিশ্বাসকে।