Robbar

সংস্কৃতির গুরুচণ্ডালী

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 27, 2026 2:54 pm
  • Updated:April 27, 2026 4:30 pm  

অতি দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের মগজ সবসময় তাল মেলাতে পারছে না। ফলে বাড়ছে চঞ্চলতা, বিষণ্ণতা, আর এক ধরনের নিজস্বতা হারানো। আমরা অন্যের কৃত্রিম জীবনের সঙ্গে নিজের আসল জীবনের তুলনা করে ফেলছি। লক্ষ করবেন, সংস্কৃতি বদলাতে আগে যেখানে কয়েক দশক লাগত, এখন দু’-এক বছরেই সব বদলে যাচ্ছে। এখন আমরা অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। এই নিঃসঙ্গতায় আমাদের সংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে, আসছে ‘গুরুচণ্ডালী’ দশা।

সমীর মণ্ডল

৩০.

আগের পর্বে কুম্ভীলক-বৃত্তি প্রসঙ্গে আলোচনাটা ফেসবুকে পড়ে জনৈক পাঠক মন্তব্যে লিখেছেন– ‘আমি প্যারিসের ল্যুভরে আসল মোনালিসা দেখে এসেছি, তবে নকল দেখলেও কি বুঝতে পারতাম? বিশেষতঃ যদি আপনার মতো শিল্পী আঁকতেন!’ 

পাঠক এখানে মন্তব্যে ‘আপনাদের’ না লিখে ‘আপনার’ লিখেছেন। তাই এর প্রশংসা বা নিন্দা– যাই হোক খানিকটা আমার ঘাড়ে এসে পড়ে। ভাবছিলাম, আমি কি কখনও মোনা লিসা নকল করতে পারব? মানে আমার কি এইরকম বিখ্যাত ছবির নকল করার অভ্যাস এবং কৌশল জানা আছে? এমনিই এসব মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল ক’দিন।

মোনা লিসা, ভিঞ্চির আঁকা মূল প্রতিকৃতি

উক্ত পাঠককে ধন্যবাদ। উনি হয়তো ইঙ্গিত করতে চাইছেন, দক্ষ শিল্পীর নিপুণ অনুকরণে আসল-নকল ধরা মুশকিল হয়ে পড়ে। এইটার খেই ধরে আমি আলোচনার আর একটা শাখায় যেতে চাইছি। তার আগে একটা কথা পরিষ্কার করে দিই, শিল্পের মাধ্যম, সঠিক সরঞ্জাম এবং কারিগরি দক্ষতা বিষয়ে সুনিশ্চিত না-হতে পারলে, কোনও বিশেষ একটি ঐতিহাসিক ছবি নকল করা অত সহজ নয়। শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি একটি পাইন কাঠের টুকরোর ওপর তেলরঙে মোনা লিসার এই ছবিটি আঁকেন। রং লেপনের বেলায় এখানে তুলি চালনার আরও একটি বিশেষ আঙ্গিক ব্যবহার করেছেন দ্য ভিঞ্চি। শিল্পের পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘সুমাতো’। ব্যক্তিগতভাবে এই ছবিটি হুবহু নকল করতে পারব না ,কারণ আমি মূলত কাগজে জলরঙে ছবি আঁকি। তেলরঙের করণকৌশল আমার জানা নেই। যিনি তেলরঙে দক্ষ এবং এই ধরনের কাজ করতে অভ্যস্ত বা দক্ষতা অর্জন করেছেন, তিনিই মোনা লিসা আঁকতে পারবেন।

আলোচনার অন্য শাখায় যাওয়ার কথা বলছিলাম। কোনও ঐতিহাসিক চিত্রকলা যখন জগতের সমস্ত দর্শকের মনে একটা জায়গা জুড়ে বসে, তখন সেই জনপ্রিয়তাকে ভাঙিয়েও অনেক শিল্পী আরও আরও নানারকম কাজ করতে পারেন, নকল না-করেও বিখ্যাত হতে পারেন। আর প্রভূত উপার্জনের ব্যবস্থাও হতে পারে। যেমন পুরো মোনা লিসা নয়, মোনা লিসার ছবির অংশ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শিল্পীরা নানারকম মজা করে, আলাদা আলাদা শিল্পকর্ম তৈরি করে হইচই ফেলেছেন সারা বিশ্বে। ‘দাদা’ আন্দোলনের হিরো, আমেরিকান শিল্পী মার্সেল দুসাম্প, মোনা লিসার ছাপা ছবির ওপর দাড়ি-গোঁফ এঁকে তাকে অন্যরকম শিল্পকর্মে পরিণত করে ফেললেন। পরবর্তীতে শিল্পী সালভাদর দালি, তাঁর আত্মপ্রতিকৃতিতে মোনা লিসার মুখ মিশিয়ে ‘হাঁসজারু’ করে ছেড়েছেন। আমাদের শিল্পী যোগেন চৌধুরীও নিজের আঙ্গিকে এঁকেছেন মোনা লিসা-র ছবি। এমন অনেক। দীর্ঘকাল ধরে মানুষের মনে গড়ে ওঠা মোনা লিসার জনপ্রিয়তাকে আক্রমণ করাই হয়তো কারও উদ্দেশ্য ছিল, অথবা ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ।

দালির আত্মপ্রতিকৃতিতে মোনা লিসার মুখ

আবার ধরুন, মোনা লিসাকে আরও নানাভাবে সাজাতে গিয়ে কেউ তার পিছনের নিসর্গ আঁকলেন পল সেজানের আঙ্গিকে। আর লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির মোনা লিসা-র মাথার চুলে গুঁজে দিলেন ভ্যান গখের সূর্যমুখী ফুল। এইরকম যদি ঘটে, অর্থাৎ, আলাদা আলাদা শিল্পীর নিজস্ব চিত্রভাষাকে একই পটে রাখার যে অসঙ্গতি বা অসামঞ্জস্য, সেটাকে শিল্পীরা, কবিরা বা অন্য সৃজনশীল কাজের অনেকেই মানতে চান না। প্রথাভাঙা বা সমকালীন কনসেপ্ট বলতে চাইবেন তাঁরা।

আমাদের বাংলা ভাষায় লিখতে, পড়তে, এমনকী বলতে, যে বেমানান শব্দগুলো পাশাপাশি সহ্য করা যেত না আগে, আজকাল সেটাকে আর অত অসহ্য লাগে না অনেকের। যাকে আমরা বলি ‘গুরুচণ্ডালী’ দোষ। যেখানে সাধুভাষা বা চলতি ভাষার শব্দ একসঙ্গে বাক্যে ব্যবহার করা চলে না। এই সাধুভাষা আর চলতি ভাষা কী? এদের মধ্যে তফাত কোথায়, সেটা বোঝানোর ব্যাপারে আজকাল হিমসিম খাবেন আপনি।

অনেকদিন আগে, অর্থাৎ ব্যাকরণে আমাদের মাথাটা যখন অনেকটাই ঠান্ডা ছিল, তখন এই গুরুচণ্ডালী ব্যাপারটা, নিজের মতো করে ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে বোঝাপড়ার আয়োজন করেছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। সেই লেখা থেকে খানিকটা এখানে দেওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না।

শিবরাম চক্রবর্তী

‘সীতানাথবাবু ছিলেন সেকেণ্ড পণ্ডিত, বাংলা পড়াতেন। ভাষার দিকে তাঁর দৃষ্টি একটুও ভাসা-ভাসা ছিল না– ছিল বেশ প্রখর। ছেলেদের লেখার মধ্যে গুরুচণ্ডালী তিনি মোটেই সইতে পারতেন না।
সপ্তাহের একটা ঘণ্টা ছিল ছেলেদের রচনার জন্যে বাঁধা। ছেলেরা বাড়ি থেকে রচনা লিখে আনত– একেক সময়ে ক্লাসে বসেও লিখত। সীতানাথবাবু সেইসব রচনা পড়তেন, পড়ে-পড়ে আগুন হতেন। ছাত্রদের সেই রচনা পরীক্ষা করা, সীতার অগ্নিপরীক্ষার মতোই একটা উত্তপ্ত বিষয় ছিল সীতানাথবাবুর কাছে। যেমন তাঁর তেমনি আমাদেরও। এত করে বকেঝকেও গুরুচণ্ডালী দোষ যে কাকে বলে ছাত্রদের তিনি তা বুঝিয়ে উঠতে পারেননি– উক্ত দোষমুক্ত করা তো দূরে থাক।’

সেদিন ক্লাসে জগাখিচুড়ি ব্যাপারটা যা ঘটেছে, তা ছাত্র গণেশকে নিয়ে।

‘‘গণেশ বললে– ‘আমি সাধুভাষায় লিখেছি স্যার।’

‘এই তোমার সাধুভাষা? দুগ্ধফেননিভ শয্যায় সে ধপাস করিয়া বসিয়া পড়িল?’
‘দুগ্ধফেননিভের সঙ্গে– কেন স্যার, ‘করিয়া’ তো দিয়েছি আমি। করিয়া কি সাধুভাষা হয়নি স্যার?’
‘কিন্তু ধপাস? ধপাস কী ভাষা? দুগ্ধফেননিভের পরেই এই ধপাস?’
সীতানাথ বাবুর মুখখানা– উচ্ছের পায়েস খেলে যেমন হয় তেমনিধারা হয়ে উঠে: ‘ওহে বাপু! গুরুচণ্ডালী কাকে বলে তা কি তোমাদের মগজে ঢুকেছে? মনে করো, যে-চাঁড়ালটা আমাদের এই স্কুলে ঝাঁট দেয়, সে যদি হেডমাস্টার মশায়ের সঙ্গে একাসনে বসে, তাহলে সেটা দেখতে কেমন লাগে? সেটা যেমন দৃষ্টিকটু দেখাবে, কতকগুলি সাধু-শব্দের মধ্যে একটা অসাধু-শব্দ ঢুকলে ঠিক সেইরকম খারাপ দেখায়, তাই না? সাধুভাষার শব্দ যে কথ্যভাষার শব্দের সঙ্গে এক পঙক্তিতে বসতে পারে না, সেই কথাই আবার অন্যান্য সাধু-শব্দের সঙ্গে মিশ খেয়ে বেশ মানিয়ে যেতে পারে।’
দিনকয়েক পরে গণেশ রেশন আনতে গিয়ে দেখল যে, সেকেণ্ড পণ্ডিতমশাইও সেই সরকারি দোকানে এসেছেন। লম্বা লাইনের ফাঁকে সীতানাথবাবুও দাঁড়িয়ে। সেই কিউয়ের ভিতর মহল্লার ঝাড়ুদার। নিশ্চয়ই সেখানে চণ্ডাল যেমন রয়েছে, তেমনি আছে পাড়ার গুণ্ডারা। তারাও কিছু সাধু নয়। গুরুতর লোক। তাদের প্রচণ্ডালই বলা যায় বরং। প্রচণ্ড তাদের দাপট। পাড়ার সার এবং অসার– সবাই এক সারের মধ্যে খাড়া। একেবারে সমান সমান। রীতিমতোই গুরুচণ্ডালী। সীতানাথবাবু ছিলেন সারির মাঝামাঝি। গণেশ অনেক পরে এসে শেষের দিকে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সীতানাথবাবুকে। চণ্ডালদের মধ্যে গুরুদেব– ব্যাকরণ বিরুদ্ধ এই অভাবিত মিলনদৃশ্য দেখে সে অবাক হলো। সত্যি বলতে সে দৃশ্য অবাক হয়ে দেখবার মতোই।”

সুকুমার রায়ের খিচুড়ির ছবি

আমরা যারা পুরাতনী কিংবা সনাতনী অভ্যাসে বিশ্বাসী, তাদের কাছে এই অসঙ্গতি একটা যন্ত্রণার ব্যাপার হলেও এখন বোধহয় এটাকে আর ধরে রাখা যাবে না। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের চলায়-বলায়, আচার-আচরণে ওই জগাখিচুড়ির এখন দাপট। আসলে মানুষ যখন থেকে পরিযায়ী হয়েছে, তখনই শুরু হয়েছে এই মিশ্র ভাষা, মিশ্র সংস্কৃতি। এমনিতেই মানুষ অনুকরণপ্রিয়। শিশুকাল থেকেই অনুকরণ প্রক্রিয়ার ওপরে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন নির্ভর করে আসছে। এই প্রক্রিয়ায় পারস্পরিক জ্ঞান ও সৃজনশীল ক্ষমতা আপনা থেকেই একে অন্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। আধুনিক জীবনে সব কিছু হাতের নাগালে থাকলেও, মনের শান্তি বা শৃঙ্খলার যেন বড় অভাববোধ করছি আমরা। কারণটা কী?

আমাদের কাছে এখন প্রচুর তথ্য আছে, কিন্তু তথ্য ও গতির অসঙ্গতি। সঠিক জ্ঞানের অভাব। ইন্টারনেটের যুগে আমরা যেমন সব জানি, কিন্তু কোনও কিছুর গভীরে যাওয়ার ধৈর্য হারিয়ে ফেলছি। সব কিছু বড্ড দ্রুত ঘটছে। সেই তুলনায় মানুষ হিসেবে আমাদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বেশ মন্থর। ব্যক্তিগত জীবনে একাকিত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি, অথচ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে যুক্ত। ভার্চুয়াল জগতে ‘লাইক-কমেন্ট’ আছে, কিন্তু বাস্তব জীবনে ‘পাশে থাকা’ নেই।

আরও একটা ব্যাপারের খপ্পরে পড়েছি আমরা। এই অতি দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে আমাদের মগজ সবসময় তাল মেলাতে পারছে না। ফলে বাড়ছে চঞ্চলতা, বিষণ্ণতা, আর এক ধরনের নিজস্বতা হারানো। আমরা অন্যের কৃত্রিম জীবনের সঙ্গে নিজের আসল জীবনের তুলনা করে ফেলছি। লক্ষ করবেন, সংস্কৃতি বদলাতে আগে যেখানে কয়েক দশক লাগত, এখন দু’-এক বছরেই সব বদলে যাচ্ছে। এখন আমরা অনেক বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছি। এই নিঃসঙ্গতায় আমাদের সংস্কৃতি বদলে যাচ্ছে, আসছে ‘গুরুচণ্ডালী’ দশা।

তবে ইতিহাস বলে, কোনও বড় পরিবর্তনের সময় এমন অস্থিরতা আসে, সংস্কৃতি তার শিকড় হারায়। আবার সমাজ নিজেই নতুন কোনও ভারসাম্য খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে। ইতিহাসে এমনও দেখা গিয়েছে– শিল্প, সাহিত্য, সংগীত– এইসব এসে, এই সময়ে মানুষের অসহায়তার পাশে দাঁড়ায়। 

অনেকেই বলবেন, শিল্প যেন ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে ভোগের বস্তু, আর সাহিত্য হয়ে উঠছে দ্রুত বিনোদনের মাধ্যম। ফলে সৃষ্টির গভীরতা ক্ষীণ হয়ে গিয়ে কেবল বাহ্যিক আকর্ষণই মুখ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে, দর্শনের ক্ষেত্রে, যুক্তি ও তর্কের ক্ষেত্রেও এই একই অসঙ্গতি। যেখানে যুক্তির ধারাবাহিকতা ও শৃঙ্খলা থাকার কথা, সেখানে অনেক সময় আবেগ, পক্ষপাত ও ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলত সত্য অনুসন্ধানের পরিবর্তে তর্ক হয়ে উঠছে জয়-পরাজয়ের প্রতিযোগিতা।

আবারও বলছি, এই গুরুচণ্ডালী মেজাজের মূল কারণ হয়তো আমাদের সময়ের দ্রুততা ও পরিবর্তনের চাপ। আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু হতে চাই, অনেক কিছু পেতে চাই, কিন্তু সেই প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য হারিয়ে ফেলি। ফলত সৃষ্টি হয় এক অদ্ভুত অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবেশের। যেখানে অনেক কিছু আছে, কিন্তু সবকিছুই যেন অসম্পূর্ণ।

প্রাজ্ঞ ও পুরাতনের ধারণা: পরগাছা যেমন সুদীর্ঘ সময় ধরে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে শেষপর্যন্ত মূল গাছের অস্তিত্বকে ধবংস করে দেয়, তেমনই অবচেতন মনে অনুসরণ-অনুকরণ প্রক্রিয়ায় প্রভাবশালী সংস্কৃতি, দুর্বল সংস্কৃতিকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। এই প্রক্রিয়ার প্রবাহ এতই শক্তিশালী যে, কেবল কর্মসংস্থান ও সৌখিন ভোগবাদী চেতনার শিক্ষা দিয়ে তা উপলদ্ধি করা মোটেই সম্ভব নয়।

পণ্ডিতরা আরও বলছেন– যে জাতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিকশিত হতে পারেনি, সে জাতির সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড অতিশয় দুর্বল। এই দুর্বল জনগোষ্ঠীকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করা বা বিভিন্ন প্রবঞ্চনায় প্রলুদ্ধ করা যে-কোনও শক্তিশালী ও আগ্রাসী জনগোষ্ঠীর পক্ষে খুবই সহজ একটা ব্যাপার। এই দুর্বল জনগোষ্ঠীর একটা প্রভাবশালী অংশের ভাবনাচিন্তাকে যে-কোনওভাবে বিকৃত করে দিতে পারলেই, সে জাতির সাংস্কৃতিক বিকৃতি বা বিপর্যয় যখন-তখন।

স্বার্থপরতা ও সৌখিনতা মানুষের স্বভাবজাত অন্য একটা প্রভাবশালী বৈশিষ্ট্য। যে ব্যক্তি বা জাতির মেধা, প্রজ্ঞা ও সৃজনশীলতা যত বেশি ব্যপ্তিময়, তত বেশি মানুষ সেটিকে অনুকরণ ও অনুসরণ করে থাকে। মানসিকভাবে দুর্বল, অসচেতন, উদাসীন আর পরশ্রীকাতর মানুষ অন্যের দ্বারা সহজেই প্রভাবিত হবে, সে আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অতএব, কথায়-বার্তায়, খাওয়া-দাওয়ায়, পোশাকে-আশাকে, আচরণে, এমনকী সাহিত্য-শিল্প আর যুক্তি-তর্কের ক্ষেত্রেও এক ধরনের গুরুচণ্ডালী মেজাজ আমাদের চারপাশে এখন ঘন হয়ে উঠছে। তবে এটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না যে, অসঙ্গতি একটা সংঘাত। ধাক্কা। কখনও তা আবার আমাদের অলসতা বা একঘেয়েমিকে সতেজ করে তোলে। তাই এই অবস্থাকে শুধু নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। হয়তো এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে নতুন সম্ভাবনার বীজ, শৃঙ্খলার আভাস। হতে পারে ‘হ য ব র ল’ থেকে ‘সা রে গা মা’। তাই নতুন দিশার খোঁজে আমরা বরং (উদ্‌)যাপন করি এই ‘গুরুচণ্ডালী জীবন’।

 

…পড়ুন অল্পবিজ্ঞান-এর অন্যান্য পর্ব…

পর্ব ২৯: চুরি হোক শিল্পসম্মত

পর্ব ২৮: মশা নিয়ে মশকরা

পর্ব ২৭: কাণ্ডজ্ঞানগম্যি

পর্ব ২৬: আয় ঘুম যায় ঘুম

পর্ব ২৫: ধুলোবালির পর বালিধুলো

পর্ব ২৪: তালাচাবির বন্ধুত্ব

পর্ব ২৩: বেঁধে থাকা বেঁধে রাখা

পর্ব ২২: এই দুনিয়া ঘোরে বনবন বনবন

পর্ব ২১: শরীরের ক্যানভাসে আঁকা শিল্প

পর্ব ২০: বিজ্ঞান পরিবেশনা ও মিউজিয়ামের অজানা গল্প

পর্ব ১৯: মরণের পরেও, এই পৃথিবীর জন্য আপনি রইলেন

পর্ব ১৮: মন রে কৃষিকাজ জানো না

পর্ব ১৭: গুপ্তধন কিম্বা লুপ্তধন

পর্ব ১৬: ছবির শরীর, শরীরের ছবি

পর্ব ১৫: মাপ করুন, সৃষ্টিশীলভাবে!

পর্ব ১৪: মাপের ভুলভাল, পাগলের মাপজোখ

পর্ব ১৩: শব্দ কল্প দ্রুম

পর্ব ১২: হ্যালো, তুমি শুনতে পাচ্ছ কি?

পর্ব ১১: ‘শব্দ’ শুধুই আওয়াজ নয়

পর্ব ১০: শিল্পকলায় বিষ্ঠা মানে ব‍্যঙ্গ, বিদ্রুপ অথবা প্রতিবাদ

পর্ব ৯: বাস্তব আর ভার্চুয়ালের সীমান্তে দাঁড়িয়ে হাইব্রিড আর্ট প্রশ্ন করতে শেখায়– শিল্প কী?

পর্ব ৮: মগজে না ঢুকলে শিল্পও আবর্জনা

পর্ব ৭: ছবির অসুখ-বিসুখ, ছবির ডাক্তার

পর্ব ৬: বিসর্জনের মতোই একটু একটু করে ফিকে হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর রং ও রূপ

পর্ব ৫: জীবন আসলে ক্যালাইডোস্কোপ, সামান্য ঘোরালেই বদলে যায় একঘেয়ে নকশা

পর্ব ৪: কুকুরেরই জাত ভাই, অথচ শিয়াল সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি?

পর্ব ৩: অন্ধকারে অল্প আলোর মায়া, ফুরয় না কোনওদিন!

পর্ব ২: বজ্রবিদ্যুৎ ভর্তি আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে আমাদের চিরকালের নায়ক হয়ে আছেন বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন

পর্ব ১: বস্তু নাকি ভাবনা, শিল্পকলায় কী খোঁজেন?