


উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস এবং ওয়ালেস স্টিভেন্সের হাতে তৈরি মার্কিন কবিতার দু’টি ধারা, মহত্বের তখনও অবধি প্রচলিত সমস্ত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে শেখায়। গড়ে তোলে নতুন ধারণা। সেই ধারণার মধ্যে আসে দেখার গুরুত্ব। যাকে অ্যালেন গিনসবার্গের বৌদ্ধশিক্ষা গড়ে তোলে ‘contemplative poetry’ (‘contemplate’ শব্দটির লাতিন ব্যুৎপত্তি ধরে, তার এক বাংলা করা যায় দৃশ্য-ধ্যানের কবিতা) রূপে। এই চর্চা থেকে পরবর্তীকালে তিনি পান তিব্বতি বৌদ্ধ-দর্শন সঞ্জাত স্লোগান কবিতা।
অ্যালেন গিনসবার্গ বলতে, আমাদের কবিতা লেখার শুরুর দিনে মাথায় থাকত এক ড্রাগাসক্ত বাউন্ডুলে সমকামী কবি। আমাদের আরাধ্য দেবতা। আমাদের ভবিষ্যৎ যে পাঁচের দশকের কৃত্তিবাসী দ্রোহের ফোটোকপি হবে, তা কোথাও একটা স্থির হয়েছিল। বিশেষত কলকাতা শহর ও তার চারপাশ থেকে আসা তরুণ কবিদের মধ্যে। বলা যায় নিষিদ্ধের আকর্ষণ।
আমাদের সর্বগ্রাসী স্থবিরতার শান্ত সমাহিত পরিবেশে, শত সহস্র না-হওয়াগুলোর মধ্যে গিনসবার্গের যৌবন-পুরাণ প্রথমে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখার মাধ্যমে; তারপর লেখক জগতের প্রবেশিকা পরীক্ষায় উতরে যাওয়ার পর, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের শ্যামবাজার বায় নাইটের বর্ণনায়; এবং অবশ্যই মলয় রায়চৌধুরী লিখিত অ্যালেন গিনসবার্গের জীবনী পড়ে মনে হয়েছিল– হ্যাঁ, গিনসবার্গের জীবনটাই বাঁচার যোগ্য। আমাদের বোলতার চাকের মতো দলবদ্ধ পরিবারের শাসনের ঘেরাটোপে, সামন্ততান্ত্রিক বাঁধনে থাকা বেশিরভাগ কবি ও লেখকের বাবা-মায়ের সঙ্গে তাঁদেরই বাড়িতে কাটানো সাধারণ জীবনে সেটাই ছিল যৌবনোচিত।
আমাদের নিম্ন বা মধ্যবিত্ত ভারতীয় বাড়িতে ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিসর কখনওই স্পষ্ট নয়। যৌথ পরিবার মোটের ওপর ভেঙে গেলেও, বিরাট ঝগড়া না-হলে কেউ বাবা-মায়ের বাড়ি ছাড়ে না। সেখানে দাঁড়িয়ে কৃত্তিবাসী বিদ্রোহ হয়ে হাংরি এবং হাতফেরতা অ্যালেন গিনসবার্গ ছিলেন আমাদের যৌবনের রোম্যান্টিক ভাবনার এক মূর্ত প্রতীক।

আজ দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বাংলায় পুরুষ কবির আর্কিটাইপ নির্মাণ করেছিলেন এঁরা। কিন্তু মজা হল, গিনসবার্গের নেশা, মূলত এলএসডি সেবন, ছিল তাঁর ১৯৪৮ সালে উইলিয়াম ব্লেকের কণ্ঠস্বরের প্রায় দৈবী-শ্রবণ অভিজ্ঞতার পুনর্নির্মাণের চেষ্টা। যা তিনি কখনওই আর শুনতে পাননি। যৌবনের শুরুতে বিদ্রোহ মানুষের ধর্ম। অ্যালেন গিনসবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক, উইলিয়াম বারোজ নির্মিত বিট প্রজন্ম তাই শুরুতে নেশা ও তার প্রভাবে স্বয়ংক্রিয় লিখনের মধ্যে প্রবেশ করেন। বারোজ সারা জীবনে ছাড়তে পারেননি। কিন্তু গিনসবার্গের মধ্যে গোড়া থেকেই একটা দ্বিধা কাজ করে যেত। তাঁর সেই প্রবাদ হয়ে যাওয়া কবিতার লাইন– ‘I saw the best minds of my generation destroyed by madness’, যা দিয়ে তাঁর ‘হাউল’ কবিতাটির সূচনা, সেই সাক্ষ্য বহন করে।

গোড়া থেকেই তাঁর মধ্যে বৌদ্ধ-দর্শনের প্রতি টান ছিল। নিল ক্যাসাডিকে চিঠি লিখে জেন বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে বলেন। কিন্তু ভারতে আসা অবধি তাঁর সেই আগ্রহ সারাজীবন বহন করা চর্চায় পরিণত হয়নি। যদিও তাঁদের সান ফ্রান্সিসকো রেনেসাঁস-তুতো কবি-বন্ধু গ্যারি স্নাইডার বৌদ্ধ-দর্শনে মগ্ন ছিলেন, এবং সেই চর্চাই তাঁকে সারাজীবনের জন্য জাপানের সঙ্গে জুড়ে দেয়। গ্যারি স্নাইডারের হাত ধরেই অ্যালেন গিনসবার্গ প্রবেশ করেন সেই দর্শনের অতলে। নিরীশ্বর মানুষের মুক্ত হওয়ার দিকে আরেক পা বাড়ানো। ভারতে থাকাকালীন দুদজোম রিনপোচের সাক্ষাৎ তাঁকে এক নতুন রাস্তা দিয়েছিল। সেই তিব্বতি বৌদ্ধগুরু গিনসবার্গকে বলেছিলেন, নির্দিষ্ট কোনও দিব্যদর্শনে মজে না-যেতে। গ্যারি স্নাইডারের সংস্পর্শে, ঘোরতর ঈশ্বরহীন জাপানি বৌদ্ধ-দর্শন তাঁকে গিলে নেয়। কেরুয়াকের নামাঙ্কিত জ্যাক কেরুয়াক স্কুল অফ ডিজেমবডিড পোয়েটিক্স-কে তিনি বৌদ্ধ-দর্শন সঞ্জাত বিশেষত কবিতার এক গভীর চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করেন।

হয়তো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা মলয় রায়চৌধুরী কেউই অ্যালেন গিনসবার্গের এই দিকটা দেখতে চাননি। তাই আমাদের সামনে বাংলায় অ্যালেন গিনসবার্গের যে-চেহারাটা আসে, তা এক ড্রাগাসক্ত পুরুষ কবির আর্কেটাইপ। যদিও সে সমকামী। কিন্তু মার্কিন দেশের কাউন্টার কালচারের সূচনাবিন্দু যে কবি, তাঁর তাত্ত্বিক ভিত্তিভূমি আমাদের দেশজ দর্শনে। কোনও সহজ বাবাগিরি নয়, গভীর চর্চা, সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ‘contemplative poetry’ নামক আগুনের জন্মবিন্দু– সেকথা আমাদের জানা ছিল না। হয়তো বাঙালির কবিতাচর্চা গভীরতা পছন্দ করে না। হয়তো যেহেতু সবাই পারে, তাই এই শিল্পের যে নিরীক্ষার একটা দিক আছে– তার চর্চার প্রয়োজন পড়ে না। যা হোক করে আত্মজৈবনিক পীড়া মোটামুটি এলোমেলো ভাষায় লিখে দিলেই যদি কাজ চলে যায়, তাহলে আর গভীরতার কী প্রয়োজন?

অ্যালেন গিনসবার্গের ক্ষেত্রে তাঁর প্রাথমিক খ্যাতির কবিতা জগৎ থেকে বেরিয়ে আসতে, নিজেকে ভাঙতে, এক আদর্শের দরকার ছিল। প্রয়োজন ছিল ব্যক্তিগত বেদনার বাইরে বেরিয়ে দুনিয়ার সঙ্গে এক হওয়া। যেমনটা নেরুদার ক্ষেত্রে তাঁর মার্কসবাদ। নেরুদার মার্কসবাদ তাঁকে নিয়ে গিয়েছে লোকজীবনের গভীরে। দেখতে সাহায্য করেছে আমেরিকা মহাদেশের উপনিবেশ হওয়ার আগেকার অতীত। নেরুদা লিখেছিলেন, মাচ্চু পিচুর শিখর, অ্যালেন গিনসবার্গ লিখেছিলেন কসমোপলিটান গ্রিটিংস। লিখেছিলেন, ‘স্যাড ডাস্ট গ্লোরি’। সারাজীবনের মতো বর্জন করেছিলেন ভোগবাদী সমাজের নিয়মকানুন। দীর্ঘদিন ব্যবহার করেছেন হাতফেরতা জামাকাপড়। গভীরে যেতে গিয়ে আবিষ্কার করেছিলেন মার্কিন দেশের নিজস্ব রকমের ইংরেজি ভাষা, যার বস্তুত আবিষ্কর্তা ছিলেন উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস। অ্যালেন গিনসবার্গ ও গোটা বিট প্রজন্ম উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামসকে তাঁদের কাব্যিক গুরু বলে মেনেছিলেন। যেমনটা বা আমাদের পঞ্চাশের কবিদের কাছে জীবনানন্দ দাশ।

উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস, অ্যালেন গিনসবার্গের দেখায় এনে দিয়েছিলেন সেই ভাবনার ছাপ, যা বৌদ্ধ- দর্শনের সঙ্গে দ্বিরালাপে আরও ঋদ্ধ হল। তাঁকে নিয়ে গেল তাৎক্ষণিক দেখার কবিতা জগতে। যা খানিক নিকানোর পাররা প্রণীত প্রতি-কবিতা বা অ্যান্টি পোয়েট্রির সঙ্গে মেলে। গীতল নয়, বরং নিজের ভিতরকার অন্ধকার থেকে ঠিকরে বেরিয়ে দুনিয়ার অন্ধকারের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। এই সেই অ্যালেন গিনসবার্গ যিনি লিখলেন– ‘যশোর রোডে সেপ্টেম্বর’। বোধহয়, ১৯৭১-এর বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পৃষ্ঠভূমিতে লেখা সবচেয়ে মর্মভেদী কবিতা। না, সে কবিতা আমাদের আকাদেমিয়ার দেওয়া মহত্বের সংজ্ঞায় খাপ খায় না। কারণ, সে-কবিতায় আছে কেবল তথ্যচিত্রের মতো দেখা। নির্মোহ। কেবল মানুষের চোখে দেখা বিষাদগাথা।

আসলে উইলিয়াম কার্লোস উইলিয়ামস এবং ওয়ালেস স্টিভেন্সের হাতে তৈরি মার্কিন কবিতার দু’টি ধারা, মহত্বের তখনও অবধি প্রচলিত সমস্ত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে শেখায়। গড়ে তোলে নতুন ধারণা। সেই ধারণার মধ্যে আসে দেখার গুরুত্ব। যাকে অ্যালেন গিনসবার্গের বৌদ্ধশিক্ষা গড়ে তোলে ‘contemplative poetry’ (‘contemplate’ শব্দটির লাতিন ব্যুৎপত্তি ধরে, তার এক বাংলা করা যায় দৃশ্য-ধ্যানের কবিতা) রূপে। এই চর্চা থেকে পরবর্তীকালে তিনি পান তিব্বতি বৌদ্ধ-দর্শন সঞ্জাত স্লোগান কবিতা। তিনি ভিয়েনায় দেওয়া কাব্যতত্ত্ব-সংক্রান্ত এক ভাষণে বলেছেন– ‘প্রাচ্য ভাবনায় যুক্তি দিয়ে স্লোগান জুড়ে জুড়ে শিক্ষাদানের একটি পরম্পরা আছে… আমার কবিতাকে সেই দিকেই নিয়ে যেতে চাই’। আরও লিখছেন– ‘বুদ্ধের মতোই শেক্সপিয়র জানান দেন আমাদের চেতনা আসলে খণ্ডিত। এই ফ্রাঙ্কফুটার সসেজের কথা ভাবছি তো পরক্ষণেই ভাবছি রেনাল্ডো অ্যান্ড ক্লারা, আবার তারপরেই ভাবছি হিসু করতে যাওয়ার কথা।… তাই মার্কসবাদী বা ক্যাথলিক অথবা হেগেলবাদী চিন্তার বাঁধাধরা ছকের বাইরে বেরিয়ে ভাবনা যেমন বইছে তাকে তেমন বইতে দেওয়া উচিত।’
এই ভাবনাটিই অ্যালেন গিনসবার্গের কবিতার সার। বলা যায়, প্রতি-কবিতারও প্রস্থানভূমি। অ্যালেন গিনসবার্গের শতবর্ষে ভারতীয় হিসেবে আমাদের গর্বের বিষয়, এই দৃশ্য-ধ্যানের কবিতার বীজ এসেছে আমাদেরই এক নিরীশ্বরবাদী দর্শন থেকে। আর এই উদ্যাপনে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা থেকে নির্বাচন করেছেন আমাদের প্রতি-কবিতার কবি সুবোধ সরকারকে, সেখানে তিনি ভাষণ দিয়েছেন, কবিতা পড়েছেন। যে অ্যালেন গিনসবার্গকে তিনি ১৯৯২ সালে প্রথম চাক্ষুষ চিনেছিলেন, তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। অমন নাক-উঁচু বিশ্ববিদ্যালয়, বিজ্ঞান নয় অর্থনীতি নয়, যেসব ক্ষেত্রে ভারতীয়দের অবদান দুনিয়া জানে, সেইসব ক্ষেত্রে নয়, বরং সমসাময়িক কবিতাজগৎ থেকে কাউকে ডাকা– এ-ও এক গর্বের বিষয়।
তথ্যসূত্র: Big Sky Mind, ‘Buddhism And The Beat Generation’, Harper Collins London, 1996
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved