Robbar

আমরা যারা ভোট দিতে পারলাম না

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 1, 2026 9:06 pm
  • Updated:May 1, 2026 9:07 pm  

২৯ তারিখ, কলকাতায় ভোটের আগে দেখছিলাম, রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নাকা চেকিং চলছে। সবই নির্বিঘ্ন ভোটের কথা মাথায় রেখে। সেই ভোটপর্ব নানা বিতর্ক সঙ্গী করে মিটলেও তা সত্ত্বেও প্রশ্নটা বারবার করেই যেতেই হবে। এই দেশের একজন নাগরিককে কেন প্রত্যেকবার ভোটের আগে প্রমাণ করতে হবে যে, সে বৈধ? আধার, পাসপোর্ট, প্যানকার্ড, রেশন কার্ড, ইলেকট্রিক বিল, ড্রাইভিং লাইসেন্স– এসব সরকারি ডকুমেন্ট থাকা সত্ত্বেও কেন ভোটার-লিস্টে নাম ঢোকানোর জন্য এত ঝামেলা পোহাতে হবে তাকে? কীসের জন্য তবে এই এসআইআর?

মিতুল দত্ত

ভোটার লিস্টে আমার নাম নেই। শুধু এবার না, গত বেশ কয়েক বছর ধরেই নেই। ২০০২-এর লিস্টে ছিল, আমাদের পাড়ার এক মেয়ে, গভর্নমেন্টের সাইট থেকে উদ্ধার করে স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে। তখন আমি দেশের বাইরে যাব, ভিসা-টিসা নিয়ে জেরবার। সেই মেয়ে বলেছিল, ‘ফর্মটা ফিলআপ করে দিয়ে যাও মিতুলদি, পরে ঝামেলা হবে।’

শুনিনি! এমনকী, ফেরার পরেও। ফর্মের চেহারা দেখেই ঝটপট বন্ধ করেছি সাইট। তারপর সবাই ভয় দেখাল। বলল, সবকিছু থেকে তোমার নাম বাদ যাবে। আধার, পাসপোর্ট, প্যান, কাজ করবে না। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেবে। আরও নানারকম জুজুবুড়ির (পড়ুন, বুড়ো) ভয় দেখানোয়, আমি শেষমেশ ঝামেলা সালটাতে ব্যান্ডেল গিয়ে আমাদের পাড়ার শিবমন্দিরের সামনে একঘণ্টা মশার কামড় খেলাম। বিএলও (BLO) মহোদয়া বাড়ি বয়ে ৬ নম্বর ফর্ম দিয়ে যাবেন, বললেনও। সেই ফর্ম এল না। পরে অনলাইনেই করলাম যা করার। লিস্ট বেরল যখন, নাম নেই! ভোটার স্লিপ নেই! ভোট নেই!

এই জনগণমনতন্ত্রে কোথাও আমি নেই! অর্থাৎ কি না, আমি ভূত! ইনভিজিবল। অথবা, পি সি সরকারের হাতের খরগোশ, টুপির মধ্যে ভ্যানিশ হয়ে আছি আপাতত। যতক্ষণ না আমার নাম ডাকা হচ্ছে, ‘জো হুজুর’ বলার গণতান্ত্রিক অধিকারটুকু আমার নেই। কে তাহলে আমি? এই রাষ্ট্রের না-নাগরিক? এই রাজ্যের আরও প্রায় ৯১ লাখ না-নাগরিকের একজন?

এর নামই হচ্ছে– SIR (Special Intensive Revision)। প্রথম ধাক্কায় ৬৩, পরের ধাক্কায় ২৭ লক্ষের ওপর বাদ। রাজ্যের মোট ভোটারদের ১১ থেকে ১২ পার্সেন্ট। ভাড়াটে ভোটার, মাইগ্রেটেড, ডুপ্লিকেট, সংখ্যালঘু, মৃত, অবৈধ অনুপ্রেশকারী, কতরকমের অ্যালিগেশন! কাল দেখলাম একজন লিখেছেন, প্রচুর মেয়ের নাম বাদ এবারের ভোটে। বোঝো! সংখ্যালঘু আর মহিলাদের কেন যে সরকার এমন যমের মতো ভয় পায়, কে জানে!

আর আমাদের আমজনতা? এখনও অবধি ফর্মের বক্তব্য নিয়ে মাথার চুল ছিঁড়ে চলেছে। নির্বাচন কমিশন একরকম গল্প শোনাচ্ছে। ওদিকে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বহু বৈধ ভোটারের নামও বাদ। ভোটার লিস্ট ক্লিন করার নামে গণতন্ত্রের একটা অংশকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠছে। ৬ নম্বর ফর্ম আমি অনলাইনে ফিলআপ করে অ্যাপ্লাই করে দিয়েছিলাম। দরকার পড়লে কোর্টে যাব। আমি অনলাইনের ব্যাপারস্যাপার বুঝে গিয়েছি। আমার কাছে একটা সিস্টেম আছে, ইন্টারনেট আছে। কিন্তু এই বিন্দুবৎ প্রোগ্রেসিভ, টেক-স্যাভি সোসাইটির বাইরে যে বিপুল সংখ্যক বাদ পড়া, বিভ্রান্ত মানুষজন, তাদের কী হবে? কে তাদের আশ্বাস জোগাবে? কোর্ট বলছে, নাম বাদ গেলে ট্রাইব্যুনালে যান। আপিল করুন। কিন্তু এই অপেক্ষা, এই আতঙ্কের শেষ কোথায়? শুনছি, এবারে বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ-মালদা-নদিয়া, আর অন্যান্য জেলাতেও বহু পরিবারে এমন হয়েছে, একজনের নাম আছে, আরেকজনের নেই। কী সব ব্যাপারস্যাপার মাইরি! একই বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-ছেলে, মা-মেয়ে– একজন বৈধ ভোটার, অন্যজন অবৈধ এবং ভোটাধিকারহীন! এই করতে গিয়ে কিছু প্রার্থীর নামও বাদ গিয়েছে শুনলাম! যেন হরর ফিল্ম চলছে। একে আমি গণতন্ত্রের পতন বলব, না রাষ্ট্রের অধঃপতন!

এই ডামাডোলের মধ্যে ভোট হয়েও গেল। বিপুল ভোটও পড়ছে এবার। যত না-উৎসাহে, তার চাইতে বেশি ভয়ে। নির্বাচন কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, প্রথম দফার ভোটে ১৫২টা আসনে প্রায় ৯৩ পার্সেন্ট ভোট পড়েছে, দ্বিতীয় দফাতেও ছবিটা কমবেশি একই। যা এই রাজ্যের ইতিহাসে সম্ভবত রেকর্ড।

লিস্টে নাম নেই, কী আর করি! রাস্তাঘাটে, সোশাল মিডিয়ায়, ভোটের গল্প শুনি। কার্টুন, মিম, ট্রোল আর এআই প্রোডাক্টে ভরে আছে সোশাল মিডিয়া। দাদারা-দিদিরা সাজগোজ করে ভোট দিয়ে আঙুলের কালি-সমেত সেলফি পোস্টাচ্ছেন। ভোট তো বরাবরই উৎসব। ছোট থেকে দেখেছি, পাড়ার মা-কাকিমারা ফাঁকায় ফাঁকায় ভোট দিতে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে পিএনপিসি করে বাড়ি ফিরত। পাড়ার মোড়ে আলাদা আলাদা দলের টেবিলে বসা মামা আর কাকুরা চা-সিগারেট খেতে খেতে মাঝেমধ্যে দিব্যি আড্ডাও দিত।

এখন সোশাল মিডিয়া আমাদের ট্রোল শিখিয়েছে। কবিতা পছন্দ না-হলে ট্রোল। কাজ পছন্দ না-হলে ট্রোল। পছন্দের দলে না-দাঁড়ালে ট্রোল। অপছন্দের লোককে সাপোর্ট করলে ট্রোল। ভোটের রেজাল্ট বেরনোর আগেই, যার ফলে, আমাদের এখন ঘরে ঘরে ‘এক্সিট পোল’! যে-যার দু’চক্ষের বিষ দলের মুখে ডিজিটাল ঝামা ঘষে চলেছি। আর বিড়ম্বনায় সেই ক্রীড়নকদের, যাদের বুকের ওপর পা দিয়ে জিতে অথবা হেরে আসছে আমাদের সরকার এবং বিরোধী শিবির।

২৯ তারিখ, কলকাতায় ভোটের আগে দেখছিলাম, রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নাকা চেকিং চলছে। সবই নির্বিঘ্ন ভোটের কথা মাথায় রেখে। সেই ভোটপর্ব নানা বিতর্ক সঙ্গী করে মিটলেও, তা সত্ত্বেও প্রশ্নটা বারবার করেই যেতেই হবে। এই দেশের একজন নাগরিককে কেন প্রত্যেকবার ভোটের আগে প্রমাণ করতে হবে যে, সে বৈধ? আধার, পাসপোর্ট, প্যানকার্ড, রেশন কার্ড, ইলেকট্রিক বিল, ড্রাইভিং লাইসেন্স– এসব সরকারি ডকুমেন্ট থাকা সত্ত্বেও কেন ভোটার-লিস্টে নাম ঢোকানোর জন্য এত ঝামেলা পোহাতে হবে তাকে? কীসের জন্য তবে এই এসআইআর? এই ব্যবস্থায় যদি হাজার হাজার মানুষকে নাকানিচোবানি খেতে হয়, তাহলে এটা কি স্বচ্ছতা, না কি অস্বচ্ছতার অন্য কোনও নাম? যদি আপিলই করতে হয়, তাহলে তার পদ্ধতি কেন সাধারণ, নিম্নবিত্ত, খেটে-খাওয়া, মহিলা অথবা সংখ্যালঘুদের জন্য সহজ আর স্পষ্ট হবে না?

সুপ্রিম কোর্ট, নির্বাচন কমিশন, সরকারের কাছে এটাই আবেদন। একজন না-নাগরিক, ভূত কিংবা টুপিবদ্ধ খরগোশের।