


মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শ্রমের মূল্য এবং মূল্যায়ন, গৃহকাজের জিডিপিতে অবদান ইত্যাদি নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। মেয়েদের শ্রমের যথাযথ মূল্য মেয়েদের হাতে দিতে হলে, মেয়েদের অবৈতনিক শ্রমকে, শ্রমের বাজারে মেয়েদের কর্মনিযুক্তি হিসেবে না দেখিয়ে, কেবল খাতায়-কলমে পরিসংখ্যান-এ না রেখে, সদিচ্ছা নিয়ে বাস্তবে মেয়েদের কর্মসংস্থান-এর সুযোগ দিয়ে, কাজের বাজারের বিবিধ সমস্যাগুলি সমাধান করতে হবে। সঙ্গে পরিবর্তন করতে হবে মানসিকতার, ভাবনাচিন্তার।
দেখা যায় না, শোনা যায়– ভূত আর ভূতের বেগারখাটা। ঠিক যেমনটি মেয়েদের বাড়ির কাজ। অমূল্য, তবু মূল্যহীন। যার না-আছে কোনও পারিশ্রমিক, না-আছে সম্মান! কারওর কাছে বাইরের শ্রম চাষাড়ে আর গৃহশ্রম আষাঢ়ে।
‘শ্রম নামে কল্পতরু অতি চমৎকার
যাহা চাবে, তাহা পাবে নিকটে তাহার।’
কথায় আছে, ‘ভাত দেয় না ভাতারে, ভাত দেয় গতরে।’ আপাত শ্লেষ বা রাগের অন্তর্নিহিত সত্যিটি, আমাদের পরিচিত-অপরিচিতদের অতীত এবং বর্তমান-জুড়ে। আর উপার্জনক্ষম বা উপার্জনহীন নির্বিশেষে, বাড়ির কাজ যে মেয়েদের ‘মৌলিক কর্তব্য’ এবং একান্তই ‘স্বাভাবিক’ এই [কু]শিক্ষায় আজও বিশ্বাসী অনেকে। মেয়েদের বাড়ির কাজ, ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা– এগুলি দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষে কারওর কাছে কচলানো লেবু আবার কারওর জন্য বিশেষ দরকারি। যার যেমন রোদচশমা!

কিন্তু পর্দানশীন লাজুকলতা সময় থেকে, ‘আমি নারী আমিই পারি’ হ্যাশট্যাগের যাত্রায়– বদলেছে অনেক কিছু, কিন্তু বদলায়নি মেয়েদের বাড়ির কাজ। পদ্মকাটা শিলনোড়ার বদলে, জায়গা নিয়েছে মিক্সার গ্রাইন্ডার, কাঠের হেঁশেল থেকে মড্যুলার কিচেন– কিন্তু, বিশ্বায়নের যুগে, গৃ্হশ্রম নিয়ে ভাবনাচিন্তা প্রাগৈতিহাসিক। আজও অধিকাংশের কাছেই কালিনারি (culinary) বলতে ‘খালি-নারী’। ৮ মার্চ নারীদিবস আর পয়লা মে শ্রমিকদিবস। কিন্তু যেখানে দুই বৃত্ত পরস্পরকে ছেদ করে, সেই কমন এরিয়া অর্থাৎ ‘লেন্স’-এ নারী আর শ্রমমুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। যেই লেন্সে চোখ যায় না সচরাচর।
‘শ্রমিক’ শব্দটি শুনে, আমাদের মনে অনেক পেশার কথা আসলেও, বাড়ির কাজের কথা স্বেচ্ছায় বা উদাসীনতায় উপেক্ষিত থেকে যায়। যেই কারখানায় রাতদিন, সাত-দিন অদৃশ্য সাইরেন বাজতে থাকে অবিরত। যেখানে, আটঘণ্টা নেই, নেই নীতিনিয়ামক, নেই যুদ্ধবিরতি। পাশাপাশি শারীরিক শ্রমের সঙ্গে আছে, অষ্টপ্রহরের মানসিক শ্রম এবং অশান্তি। যেখানে কাজ থেকে মন চলে গেলেও, মন থেকে কাজ চলে যায় না। যে আতসকাচে কর্পোরেট চাকরি করা মেয়েটি আর বাড়িতে সবসময় কাজ করতে থাকা মেয়েটি– যেন এক। আসলে সব মেয়েরাই চাকরিজীবী, কিছু শুধু বেতনভুক।
‘যার যত ফরমাস সব তুমি করো,
তাতে তুমি বিমলাটি বাঁচো আরো মরো’
যেখানে মেয়েদের ভালোমন্দ বিচার করা হয় বাড়ির কাজের নিপুণতায়, খাটতে পারার ক্ষমতায় এবং নুন-মশলার পারদর্শিতায়। যেখানে সিসিফাসের পাথর ঠেলার মতো, রোজ চলতে থাকে সংসারের যাবতীয় থোড়-বড়ি-খাড়া, খাড়া-বড়ি-থোড়। ৮ মার্চ এবং ১ মে নিয়ে, ৩৬৫ দিনই ‘মেয়ে’ ডে। মেয়েদের প্রতিদিনই শ্রমিক-দিবস। কিন্তু যা চিরাচরিত, তাই কি অপ্রশ্নযোগ্য, অপরিবর্তনীয়? সর্বসম্মতিতে কি অন্যায় ন্যায় হয়? বাড়ির তথাকথিত ‘মেয়েলি’ কাজগুলির ঝুলিতে পরিশ্রমিক বা সম্মানের চেয়ে, অবজ্ঞা বা উদাসীনতাই বেশি। যেন– ‘এই কাজ আর এমন কী!’, ‘এটা মেয়েরা করবে না তো আর কে করবে’, ‘ওরকম কাজ সবাই করে।’

কিন্তু ‘কেন শুধু মেয়েরাই?’ এই প্রশ্নে সংসারের প্রতিষ্ঠানে কম্পন শুরু হয়ে যায়। তাই সুখী সংসারের মিথ আঁকড়ে রাখতে ভরসা মেয়েদের বাড়ির কাজই। রোজকার যেই রুটিন কাজে কাজে কোথাও বিচ্যুতি ঘটলেই, শুরু হয়ে যায় ঠান্ডা লড়াই। যার সঙ্গে মেয়েদের প্রতিনিয়ত যুঝতে হয়– ‘নিজের বাড়ি’, ‘পরের বাড়ি’– সবজায়গাতেই। আর সেই এগিয়ে যাওয়ার গল্পের পিছিয়ে যাওয়া অধ্যায়– ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান কিচেন।’ ভালো লাগা-খারাপ লাগা, সুস্থ-অসুস্থ, শোক-আনন্দ, শীত-গরম, দিন-রাত নির্বিশেষে ‘খাওয়ার পর রাঁধা, আর রাঁধার পর খাওয়া’-র পাকচক্র বা চক্রপাক চলতেই থাকে, ‘অভাগীর স্বর্গ’ হেঁশেলে।
পরিচিত একজনের কাছে শোনা যে, কাজ করতে করতে এমন হয়েছে যে, তার কাজ অন্য কেউ করে দিলে, বা কোনও কাজ সময়ে না-করলে, অস্বস্তি হয়। তাঁর কাছে কায়িক শ্রমের চেয়ে ক্লান্তির চেয়ে, চার দেওয়ালে চলা ঠান্ডা যুদ্ধের মানসিক শ্রম বেশি ক্লান্তির। ঘুম থেকে উঠে কাজ, ঘুমতে যাওয়ার আগে কাজ। বাইরে কোথাও গেলে কাজ, আবার ফিরে এসেও কাজ। এমনকী পরীক্ষা দিতে যাওয়ার আগেই, হেঁশেল গুছিয়ে তবেই নিশ্চিত। এই ঘটনার চরিত্রগুলি নয় কল্পনা, এটা গল্প না। এরা আছেন আমাদের আশপাশেই।

বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ির পছন্দের রান্নায় হারিয়ে যায়, মেয়েদের নিজস্ব পছন্দের খাবার। আজও অধিকাংশ বাড়িতেই, মেয়েদের রান্নায় প্রাধান্য পায় অন্যদের পছন্দের পদ। অন্যদের পাতে জায়গা হয়, পছন্দের মাংসের টুকরো থেকে ভালো মাছটি। সবাইকে বেড়ে দিয়ে, বাড়ির মেয়েটির শেষে খাওয়া, তাঁদের পাতে বাসি-উচ্ছিষ্ট ইত্যাদি রঙিন দুনিয়ার, বেরং ছবি। যে কাজ, ছুটির দিনে বেড়ে কয়েকগুণ। সঙ্গে ‘হাতের ছোঁয়া’ স্পেশাল নাড়ু-মোয়া-মুড়কি-পিঠে থেকে ঘণ্ট, চচ্চড়ি, ইত্যাদি। এই আপাত মূল্যহীন কাজগুলির মূল্য বোঝা যায়, এই জিনিসগুলির সুবিধা বাইরের হোটেলে বা দোকান থেকে নিতে চাইলে। সঙ্গে চাহিদা আছেই, রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী, অসূর্যস্পশ্যা, সংস্কৃতি সম্পন্ন-সতী সাবিত্রী সেই ‘ভালো মেয়েটি’ বাড়িতে ‘স্পিকটি নট’ হয়ে পঞ্চব্যঞ্জন থেকে মানভঞ্জন সব করবে। সে যদি প্রধানমন্ত্রী হয়, তাঁকে পার্লামেন্টের কিচেন ক্যাবিনেটের আগে, বাড়ির কিচেন সামলে যেতে হয়। আর এইসব দেখিয়ে দেয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘বিবাহ’ নামক প্রতিষ্ঠানটি নিপীড়নের কারখানা– যে কারখানার জ্বালানি মেয়েদের ৩৬৫ দিনের কায়িক শ্রম। তাঁদের ‘ছুটির দিন’ নেই। সব নির্যাতন চামড়ায় থাকে না, মনের খবর ক’জন রাখেন?
এই সাইলেন্ট মেজরিটিই চালিকাশক্তি। কিন্তু নেই কাজের মূল্য এবং কাজের মূল্যায়ন। কাজ না-করতে চাইলে, মেয়েদেরকে ‘শ্রেণিশত্রু’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়। অথচ মাস-মাইনে করা পরিচারিকাও কাজের চাপে কাজ ছেড়ে দেয়, কথা শোনায়। গৃহস্থ যাদের কথা শোনাতে বা কাজের চাপ দিতে, দু’বার ভাবে। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের কাজ ধর্তব্যে আসে না। পরিস্থিতি এমনই যেখানে কোর্টকে বলতে হয়– ‘ইউ আর নট ম্যারিং এ মেইড…!’

কিন্তু এই অমূল্য সময় ব্যয় করে এইসব মূল্যবান কাজের বিনিময়ে প্রাপ্তি জলের আলপনা– দু’বেলার ভাত, রান্নায় নুন কমবেশির পোস্টমর্টেমের মাঝেমধ্যে ‘সুগৃহিণী’ বা ‘সুরাঁধুনি’র সার্টিফিকেট। পাশাপাশি দশভুজারূপে মেয়েদের দেবীত্ব আরোপিত করে, সংসারের কাজ যে তাঁদেরই দায়িত্ব, ঘুরিয়ে সেই বার্তাই দেওয়া হয়। শুধু নেই সম্মান আর সাম্মানিক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বনফুলের ‘নিমগাছ’ গল্পটি– ‘কেউ ছালটা ছাড়িয়ে নিয়ে সিদ্ধ করছে। পাতাগুলো ছিঁড়ে শিলে পিষছে কেউ। কেউ বা ভাজছে গরম তেলে।… চর্মরোগের অব্যর্থ মহৌষধ। কচি পাতাগুলো খায়ও অনেকে।… যকৃতের পক্ষে ভারি উপকার। কচি ডালগুলো ভেঙে চিবোয় কত লোক…। দাঁত ভালো থাকে।… নিমের হাওয়া ভালো, থাক, কেটো না। কাটে না, কিন্তু যত্নও করে না। আবর্জনা জমে এসে চারিদিকে। শান দিয়ে বাধিয়েও দেয় কেউ– সে আর এক আবর্জনা।… ওদের বাড়ীর গৃহকর্ম-নিপুণা লক্ষ্ণী বউটার ঠিক এই দশা।’
কিছু সুবিধাভোগীরা মানসিক বা শারীরিক শ্রম ছাড়াই, ঘরের কাজকে ‘টেক্ন ফর গ্র্যান্টেড’ নিয়ে, অপরের শ্রমনির্ভর হয়ে দিব্যি থাকে। সমাজ-সভ্যতা-গণতন্ত্র-সাম্যবাদ ইত্যাদি যেন সব এসে থমকে যায় বাড়ির কাজের প্রসঙ্গে। পুরুষরাও কাজ করেন, কিন্তু অধিকাংশ সময়ে শ্রমের দাঁড়িপাল্লা ঝুঁকে থাকে মেয়েদের দিকেই। কিছু পুরুষ আত্মপক্ষ সমর্থনে দাবি করতে পারেন, টাকা কামানোর কথায়, কিন্তু সংসার শুধু টাকায় চলে না।

চাকরিজীবী পুরুষের ঘরে-বাইরে কাজ আড্ডা সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একটি চাকরিজীবী মেয়ে বাইরের কাজ থেকে এসেই বাড়ির কাজ। পরের বাড়ি, নিজের বাড়ি সব জায়গায় গিয়ে মেয়েরা কাজ করে, সেটা ঘুরতে গেলেও। আবার আড্ডা ছেড়ে, চা, ঠান্ডার, জলখাবারের ব্যবস্থা করতে হয় মেয়েদেরই।
ছেলেদের রান্নার কথা আসলে জুড়ে যায় ‘হাত পুড়িয়ে খাওয়া’র কষ্ট আর অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু রান্নায় মেয়েদের ফোসকার দাগ যেন খুব স্বাভাবিক আর অঙ্গ ভূষণ। বাড়িতে রান্নার কষ্ট দেখে, আমরা সাধারণত বলে থাকি, রান্নার পদ কম করতে। কিন্তু ‘রান্না আমিই করছি’– এই কথাটি যেন নিজেদের ঠোঁটেই লেগে থাকে, সেইভাবে পৌঁছয় না উল্টোদিকের মানুষটির কাছে। বারো আনা অনিচ্ছা আর চার চার আনা চক্ষু-লজ্জা মিশিয়ে আমাদের বলা কাজ করতে চাওয়ার কথাগুলি, উল্টোদিকের ‘না’ শুনেই তৎক্ষণাৎ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আর ছেলেদের রান্না করতে দেখা গেলেও, গুছিয়ে পরিবেশন কিন্তু মেয়েরাই করে থাকেন। উল্টো ছবিটা বিরল। কখনও কখনও গৃহকাজে সাহায্য করলে, পুরুষ শিবির থেকেই আসে পুরুষদের প্রতি আক্রমণ।

বিবিধ রিপোর্টেই, ভারতীয় মেয়েদের বেতনহীন গৃহকাজে দেওয়া সময় আর পুরুষদের গৃহকাজে দেওয়া সময়ের পার্থক্যের; এবং টাকা রোজগারে পুরুষদের দেওয়া সময় এবং টাকা রোজগারে মেয়েদের দেওয়া সময়ের পার্থক্যই ঘরে-বাইরে মেয়েদের কাজের খতিয়ান বুঝিয়ে দেয়।
আবার বাড়ির কাজের বিনিময়ে পারিশ্রমিক দাবির স্পর্ধায় যেন, সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে পড়ে। গৃহকর্ম ঐকান্তিক ভালোবাসার কাজ, যেখানে পণ্যায়ন ‘নৈব নৈব চ।’ অতএব অবৈতনিক গৃহশ্রম, মেয়েদের ক্ষমতায়নের পরিপন্থী। সঙ্গে পুরুষদের বাড়ির কাজে বিমুখতা সাম্যময় সমাজের পরিপন্থী।
এই চিরাচরিত অচলায়তন, প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা, দায়িত্ব-কর্তব্য, শোভন-অশোভনের এই চক্রব্যূহে নারীশ্রমের অধিকার যেন– সামন্তান্ত্রিক বামুনের ইউটোপিয়ান চাঁদ ছোঁয়ার স্বপ্ন। যেখানে সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে, পুরুষদের মতো মহিলারাও এই বিশ্বাসে স্বচ্ছন্দ। কারণ, এটি কেবল পুরুষতান্ত্রিক বনাম নারীবাদ নয়। আঙ্গিকটি প্রভু-ভৃত্যের। নির্যাতনকারী বনাম নির্যাতিতের। যেখানে নিয়ন্ত্রণকর্তা বা কর্ত্রী চায়, মেয়েরা নিজস্ব শরীর-মন-বুদ্ধি-শিক্ষা সবটুকু সংসারে আহুতি দিয়ে তাদের কথায় চলবে। যেখানে তাঁদের নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য থাকবে না, থাকবে না তাদের নিজস্ব সামাজিক পরিমণ্ডল। যেখানে আজও উচ্চশিক্ষা শুধু বিয়ের বিজ্ঞাপনের অংশ। যেখানে ঘরের কাজে ব্যয় করা হয় মেয়েদের মেধা। যাদের কাজের অধিকার, ভালো-মন্দ নির্ধারণ করে অন্যরা। অনেক সময় যেখানে কাজ করতে চাইলে প্রাণ নেওয়া বা হাত কেটে দেওয়া হয়, বা বাড়িতে আটকে রাখা হয়, সঙ্গে হয় বিবিধ অত্যাচার। এগুলি কোনওটাই বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী নয়।

যে অধিকার স্বাভাবিক নিয়মে পায় অধিকাংশ জন, সেই অধিকার মেয়েদের আদায় করে নিতে হয়। লড়ে নিতে হয়। যেই লড়াই ঘরে বাইরে সব জায়গায়। সম্মান এবং অধিকার– এই দুইটির আপসহীন প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজন মেয়েদের শ্রমের মর্যাদা।
না, বাড়ির কাজে, অন্যায় নেই। অন্যায় সেই কাজকে ‘নারীধর্ম’-এর বর্মে উপস্থাপনে। আপত্তি শ্রমবণ্টনের নিয়মে, আপত্তি শ্রমবণ্টনের অসাম্য চিন্তায়। বেতনহীন গৃহশ্রম, লিঙ্গবৈষম্য, বর্ণবৈষম্যকে ‘ঐতিহ্য’-র চোগায় মুড়ে, ভারতীয় সংস্কৃতির আছিলায় পেশ করার অপচেষ্টা নিন্দিত। কাজ, কাজই। লিঙ্গ-বৈষম্য এবং প্রভু-ভৃত্যের সমীকরণের বাইরে ‘গৃহশ্রম’ একটি যৌথ দায়িত্ব। তাই কাজে একে অপরের বিকল্প হিসাবে না-দেখে, পরস্পরের পরিপূরক হিসাবেই দেখতে হবে। শ্রমিককে তাঁর রক্ত-জল-এর শ্রমের মূল্য না-দেওয়াটা অন্যায়।
অনেকেই আছেন সংসারে উদয়াস্ত খেটে, টিউশন পড়ান, সেলাই করেন, পার্লারে ইত্যাদি কাজ করেন। যে উপার্জন বাকিদের কাছে উল্লেখযোগ্য না-হলেও, সেটা তাঁর নিজস্ব উপার্জন। একান্ত আপন। ভাগের আকাশ নয়।

অনেক পুরুষ হাতে টাকা দেয়, প্রশ্ন থেকে যায় সেটা দক্ষিণা নয়, দাক্ষিণ্য। হাতখরচ নাকি সাম্মানিক। দাম্পত্যে একের রোজগারে অন্যের ভাগ অবশ্যই আছে, যতক্ষণ সেই সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্য না-হয়।
‘যা ছিল খুব নির্ভরশীল/ সংসার তার চেরনোবিল।’
তাই অনেকেই পরনির্ভরশীলতার বদলে আত্মনির্ভরতায় বিশ্বাসী।
মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, শ্রমের মূল্য এবং মূল্যায়ন, গৃহকাজের জিডিপিতে অবদান ইত্যাদি নিয়ে অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। মেয়েদের শ্রমের যথাযথ মূল্য মেয়েদের হাতে দিতে হলে, মেয়েদের অবৈতনিক শ্রমকে, শ্রমের বাজারে মেয়েদের কর্মনিযুক্তি হিসেবে না দেখিয়ে, কেবল খাতায়-কলমে পরিসংখ্যান-এ না-রেখে, সদিচ্ছা নিয়ে বাস্তবে মেয়েদের কর্মসংস্থান-এর সুযোগ দিয়ে, কাজের বাজারের বিবিধ সমস্যাগুলি সমাধান করতে হবে। সঙ্গে পরিবর্তন করতে হবে মানসিকতার, ভাবনাচিন্তার। নচেৎ, এগুলি থেকে যাবে ক্যালেন্ডারের পাতায়, লেখায়, মুখে মুখে আর মনে মনে। আসল কথা হারিয়ে যাবে লাইক, ভিউজ এবং ইমোজির বন্যায়। মেয়েদের মেধাসম্পদকে ‘ঐতিহ্য’-এর আছিলায় কেবল দৈনন্দিন কায়িক শ্রমের জাঁতাকলে আটকে রেখে, রান্নাঘরের নালা দিয়ে বইয়ে দিলে, বা রান্নার আগুনে পুড়িয়ে দিলে, দেশের ক্ষতি, দশের ক্ষতি।
‘ৎ-এ ক্রান্তিকাল/ পার্সোনাল ইজ পলিটিকাল।’ মেয়েদের ওপর দেবীত্ব আরোপিত না করে, মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং সংবেদনশীলতার চোখে মানুষ ভাবলেই যথেষ্ট। আণুবীক্ষণিক হলেও, পালটাচ্ছে ভাবনাচিন্তা– আশা এটাই, এটাই আলো। মেয়েদের স্বাধীনসত্তায়, আশা-আকাঙ্ক্ষায়, জেদ, জিতে নেওয়ার মানসিকতায়, দেওয়াল ভাঙছে। ‘নারীবাদের একুশ শতক/ মেয়েরা চায় নিজস্ব হোক।’
…………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন রাজর্ষি সরকার-এর অন্যান্য লেখা
…………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved