Robbar

বিজয়ের নেপথ্যে সোশাল মিডিয়া?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 14, 2026 9:24 pm
  • Updated:May 14, 2026 9:24 pm  

নিজের বহু চলচ্চিত্রে তিনি দুর্নীতি, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক ক্ষুব্ধ নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি নিজেকে অবহেলিত ও অধিকার-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই ভাবমূর্তিই তাঁকে সাধারণ ভোটার ও ভক্তদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলেছে। ২০২৪ সালে নিজের পেশার মধ্যগগনে থাকা অবস্থায়, যখন তিনি একটি সিনেমার জন্য ২০০ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিচ্ছেন, ঠিক তখনই বিজয় অভিনয় ছেড়ে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। অবশেষে চমকে দেওয়া নির্বাচনী জয়ে তো ইতিহাসের সদ্য সূচনা!

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

চমকে দিয়েছেন থলপতি বিজয়! ভোটে যাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ধরাই হয়নি, তিনিই কি না রাতারাতি রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী! তামিল রাজনীতিতে এ এক বিরাট বদল। সব হিসেব উল্টে রাজ্যের প্রায় ৬০ বছরের রাজনৈতিক ঐতিহ্যে এই প্রথম এক অ-দ্রাবিড় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে, ৫২ বছর বয়সি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বিজয় সত্যিই সৃষ্টি করলেন ইতিহাস। রাজ্যের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে বসলেন এই প্রথম এক ধর্মীয় সংখ্যালঘু। তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক চালচিত্রে চন্দ্রশেখরণ জোসেফ বিজয় (যিনি ‘থলপতি’ অর্থাৎ সেনাপতি হিসেবে বিশেষ পরিচিত) প্রতিষ্ঠিত তামিলগা ভেট্রি কাজাগামের (টিভিকে) ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব এবং অভাবনীয় নির্বাচনী সাফল্য এই মুহূর্তে রাজ্যের সীমানা ছাপিয়ে দেশের সর্বত্র আগ্রহী চর্চার বিষয়। এবারের বিধানসভা ভোটে বিজয়ের পক্ষে নিছক তাঁর ‘ক্যারিশমা’ বা চলচ্চিত্রের আকর্ষণই শুধু কাজ করেনি। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরেই জনতার এক বড় অংশ রাজ্যের প্রধান দুই শক্তি এআইএডিএমকে এবং ডিএমকে-র ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠেছিল এবং তারা এই দুইয়ের বাইরে কোনও একটা বিকল্প খুঁজছিল। সেই জমিতে বিজয়ের সমর্থনে ব্যাপক জনজোয়ারের এই প্রভাব দেখে যাবতীয় রাজনৈতিক নেতা ও নির্বাচনী বিশেষজ্ঞও একেবারে হতবাক। দুই প্রধান রাজনৈতিক দলকে বেমালুম কুপোকাত করে মাত্র বছর দুয়েক আগে গঠিত টিভিকে-র মতো এক নবীন সংগঠন কোন জাদুবলে এমন অসাধ্যসাধন করল? থলপতির এই সাফল্যের রহস্য এখন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বিশ্লেষণের বিষয়। অনেকেই একমত, এর উত্তরের বড় অংশ লুকিয়ে আছে সোশাল মিডিয়ায়। পর্দার আড়ালে থেকে টিভিকে-র হাজার হাজার ‘সোশাল মিডিয়া যোদ্ধা’ থলপতি বিজয় এবং তাঁর দলীয় প্রার্থীদের হয়ে অনলাইনে নিরলস প্রচার চালিয়েছেন। সারা দেশে এটিই সম্ভবত প্রথম নির্বাচন যার ফলাফল প্রায় পুরোপুরি নির্ধারিত হয়েছে সোশাল মিডিয়ার কৌশলী প্রচারে। চিরাচরিত জনসভা বা প্রচলিত নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে ওই দ্রুত, স্মার্ট, আধুনিক ও ফলপ্রসূ জনসংযোগের অভিঘাতের সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি। ফলে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কাজে লাগিয়ে বিজয়ের সমর্থকেরা অভূতপূর্ব এক ডিজিটাল বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছেন যার আগাম আঁচ পাননি কেউই। রাজ্যের রাজনৈতিক মঞ্চে বিজয়ের আবির্ভাবের ভালো-মন্দ নিয়ে বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশ যখন কাটাছেঁড়ায় ব্যস্ত, তার মধ্যেই কিন্তু প্রায় ১ কোটি ৭২ লাখ ভোটার মনস্থির করে ফেলেছিলেন– টিভিকে-র নির্বাচনী প্রতীক ‘হুইসল’ বা বাঁশির পাশেই তাঁরা ইভিএম-এর বোতামটিতে চাপ দেবেন। তাঁদের নিজেদের কেন্দ্রে টিভিকে-র প্রার্থী কে, তা নিয়ে তাঁরা ভাবেননি মোটেও! বরং দলীয় সমর্থকদের প্রতি থলপতির আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রে তাঁর হয়ে দাঁড়ানো প্রতিটি প্রার্থীর মধ্যে তাঁরা দেখতে পেয়েছিলেন খোদ বিজয়কেই।

চন্দ্রশেখরণ জোসেফ বিজয়

দ্বিতীয় চমক বিজয়ের শপথ গ্রহণে। তামিল রাজনীতিকদের চিরচেনা সাদা শার্ট (সাট্টাই) ও সোনালি জরির পাড় দেওয়া ধুতি (ভেস্টি) আর কাঁধে ফেলা একটি অঙ্গবস্ত্রমের পরিচিত ছক ভেঙে, চেন্নাইয়ের ভিড়ে ঠাসা জওহরলাল নেহেরু স্টেডিয়ামের মঞ্চে বিজয় উঠে এলেন কালো ট্রাউজার, সাদা শার্ট ও কালো ব্লেজার পরে। বুঝিয়ে দিলেন– রাজনীতির মাঠ নয়, সরকারি কাজের অলিন্দে তাঁর প্রবেশ গোটা রাজ্যের চিফ এগজিকিউটিভ অফিসারের (সিইও) ঢঙে। আরও চমকপ্রদ, বিজয়ের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন নির্দেশিকা মেনে জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-র আগে ‘বন্দে মাতরম’ গানের সম্পূর্ণ ছয়টি স্তবকের ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডের সংস্করণটি বাজানো হয়। অথচ চোখে পড়ার মতো ব্যাপার, কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং আরও বেশ কয়েকজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন প্রথম বিজেপি সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে বেজেছে শুধুই জাতীয় সংগীত। বন্দেমাতরম নয়। বিজয়ের শপথ অনুষ্ঠানে তামিল সরকারি প্রোটোকল ভেঙে প্রথমে বন্দেমাতরম, তারপরে জাতীয় সংগীত এবং সবশেষে রাজ্যের গান ‘তামিল থাই বাজথু’ বাজানো হয়। এতদিন যাবতীয় তামিল সরকারি অনুষ্ঠানে আগে বেজেছে রাজ্য সংগীত। অধিকাংশ নেতা কাগজ দেখে শপথ পড়লেও, বিজয় পুরো শপথটি মুখস্থ করেছিলেন এবং সরাসরি স্টেডিয়ামে উপস্থিত উদ্বেল সমর্থকদের দিকে তাকিয়ে তা পাঠ করেন। মাঝেমধ্যে সিনেমার স্টাইলে হাত নেড়ে সরকারি বয়ানের বাইরে গিয়ে জোরালো একটা ভাষণ দেওয়ার চেষ্টাও করেন। তবে পরিস্থিতি সামলাতে রাজ্যপাল রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকর তাঁকে মূল চিত্রনাট্য বা স্ক্রিপ্ট মেনে চলার অনুরোধ জানান। মঞ্চের সামনে উপস্থিত বিজয়ের বাবা চলচ্চিত্র নির্মাতা এস এ চন্দ্রশেখর এবং মা শোভা বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। আর থলপতি বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখে তখন স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজার হাজার সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েন।

‘মক্কল আতচি’ বা জনগণের শাসনের কথা তুলে ধরে থলপতি বিজয় ঘোষণা করেন, তাঁর সরকার কোনও বিশেষ গোষ্ঠী বা ধর্মের নয়, বরং হবে সবার সরকার। এদিকে বিজয়ের শপথ নেওয়ার দু’দিনের মধ্যে জ্যোতিষী রিকি রাধন পণ্ডিত ভেট্রিভেলকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ্যমন্ত্রীর অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি (ওএসডি) নিয়োগ করায় রাজনৈতিক মহলে তুমুল হৈচৈ পড়ে যাওয়ায়, বিজয়কে সেই জ্যোতিষী নিয়োগের নির্দেশ প্রত্যাহার করতে হয়েছে। তবে এই সুযোগে একটু জেনে রাখা ভালো সেই জ্যোতিষী সম্পর্কে। টিভিকে বেশ সচেতন ভাবেই তামিলনাড়ুর ক্ষমতা বৃত্তের রাজনৈতিক জ্যোতিষশাস্ত্র, সংখ্যাতত্ত্ব এবং হাই-প্রোফাইল ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত এক ব্যক্তিকে তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসেছিল। একসময় জয়ললিতা এই জ্যোতিষীর অন্যতম বিশিষ্ট মক্কেল ছিলেন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় একটি ভবিষ্যদ্বাণী নাটকীয়ভাবে ব্যর্থ হওয়ার পর জয়ললিতার সঙ্গে জ্যোতিষীর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। জয়ললিতাকে আশ্বস্ত করে ভেট্রিভেল বলেছিলেন যে, তিনি আয়বহির্ভূত সম্পত্তি মামলায় জেল এড়াতে পারবেন। কিন্তু ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে জয়ললিতাকে জেলে যেতে হয়। পরবর্তীকালে এই জ্যোতিষীই বিজয়ের রাজনৈতিক মহলে পরিচিত হন। ভোটের প্রচারপর্বে তিনি একাধিক ইউটিউব সাক্ষাৎকারে হাজির হয়ে বলেছিলেন, বিজয় এবং টিভিকে-র জন্য দারুণ সাফল্য অপেক্ষা করছে। কিন্তু ভাগ্যের এমনই পরিহাস যে, জ্যোতিষী নিজেই বুঝতে পারেননি তাঁর সরকারি পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে। সে যা-ই হোক, একবার ভাবুন তো আমাদের রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার যদি মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে এমন কোনও জ্যোতিষীকে বিশেষ সরকারি পদে বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে অবস্থাটা কেমন হবে!

রিকি রাধন পণ্ডিত ভেট্রিভেল ও থলপতি বিজয়

সরকারি পদে নিয়োগের নির্দেশ প্রত্যাহার করলেও নানা কাজে-কর্মে বা নীতি নির্ধারণে মুখ্যমন্ত্রী বিজয় জ্যোতিষীর পরামর্শ মেনে চলেন কি না তা সময়ই বলবে। তবে এই মুহূর্তে তাঁর চমকপ্রদ সাফল্যের সহযোগী টিভিকে-র একঝাঁক তরুণ ও প্রথমবার নির্বাচিত হওয়া বিধায়ক, আনকোরা নতুন রাজনৈতিক মুখ, বুথ-কর্মী, ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েটর, ফ্যান ক্লাব সংগঠক, মিম প্রস্তুতকারক এবং প্রাক্তন ইউটিউবাররা। তাঁদের অনেকেরই বয়স ৪০ বছরের নিচে। বিধানসভার রীতিনীতির সঙ্গে পরিচিতির তুলনায় ইনস্টাগ্রাম অ্যালগরিদম নিয়ে তাঁরা অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। বিজয়ের নেতৃত্বে তাঁরাই তো দ্রাবিড় দলগুলির দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের আধিপত্য ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।

পুরো সাফল্যের পিছনে রয়েছে সুপরিকল্পিত সোশাল মিডিয়া স্ট্র্যাটেজি। প্রথাগত বা বিপুল ব্যয়বহুল রাজনৈতিক প্রচারের ওপর নির্ভর না করে, বিজয় একটি সুনির্দিষ্ট এবং এআই-চালিত ডিজিটাল ব্লু-প্রিন্ট ব্যবহার করেছিলেন, যা তাঁর সিনেমার তারকা-খ্যাতিকে সরাসরি ভোটব্যাঙ্কে রূপান্তরিত করেছে। এর বেশ কিছু উদাহরণ দিলেই বিষয়টির অভিনবত্ব ও প্রভাবের গুরুত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যাবে।

‘অ্যালগরিদম অরা’ এবং শর্ট-ফর্ম কনটেন্টের আধিপত্য

রিলস-ফার্স্ট পদ্ধতি– প্রথাগত দলগুলির মতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর রাজনৈতিক ভাষণ দেওয়ার পথ এড়িয়ে যান বিজয়। তাঁর নানা রাজনৈতিক ভাষণ ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট। টিভিকে-র আইটি উইং সেইসব বক্তব্য কেটে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং উদ্দীপক ইনস্টাগ্রাম রিলস ও ইউটিউব শর্টস-এ রূপান্তরিত করে ছড়িয়ে দেয়।

‘জন নায়গন’ ছবির নায়ক বিজয়

অর্গানিক ভাইরাল স্ট্র্যাটেজি– মোটা অঙ্কের পেইড বিজ্ঞাপনের পিছনে টাকা খরচ না করে, টিভিকে ইনস্টাগ্রামের নিজস্ব অ্যালগরিদমকে কাজে লাগায়। বিজয়ের রাজনৈতিক ভিডিও ক্লিপগুলিতে তাঁর বিখ্যাত সিনেমা, যেমন ‘মাস্টার’ বা ‘জন নায়গন’-এর ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর ব্যবহার করা হত। এর ফলে এনগেজমেন্টের হার ২০.৬% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায় এবং প্রতিটি ক্লিপের অর্গানিক ভিউয়ের সংখ্যা পৌঁছে যায় কয়েক কোটিতে।

ভক্তদের নেটওয়ার্ককে বহুমুখী আইটি উইং-এ রূপান্তর

‘ভয়েস অব কমন্‌স’ টিম– বিজয় তাঁর দলের সোশাল মিডিয়া পরিচালনার জন্য ‘ভয়েস অব কমন্‌স’ নামে একটি অত্যন্ত দক্ষ এবং আধুনিক অভ্যন্তরীণ টিম গঠন করেন।

বিকেন্দ্রীভূত হোয়াটসঅ্যাপ কমান্ড– বিজয়ের পুরনো ফ্যানক্লাব নেটওয়ার্ককে (বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম) সরাসরি স্থানীয় রাজনৈতিক সেলে রূপান্তরিত করা হয়। এই নেটওয়ার্কগুলি হাজার হাজার সুসংগঠিত হোয়াটসঅ্যাপ ব্রডকাস্ট গ্রুপ পরিচালনা করত, যার মাধ্যমে মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে সরাসরি স্থানীয় মানুষের ফোনে প্রতিদিনের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া হত।

নতুন প্রজন্ম ও নারীদের লক্ষ্য করে নীতি-ভিত্তিক প্রচার

দুর্নীতিবিরোধী আধুনিক ভাবমূর্তি– পুরনো রাজনৈতিক দলগুলি যখন জাতিভেদ, পরিচয়বাদী রাজনীতি কিংবা নগদ টাকা বিলির টোপ দিতে ব্যস্ত, বিজয় তখন শিক্ষিত তরুণ ও নারী ভোটারদের টানতে পেশাদার ডিজিটাল প্রচারের পথ বেছে নেন।

বাস্তবধর্মী কনটেন্ট– দলের ভিস্যুয়াল গ্রাফিক্স এবং শর্ট-ফর্ম ভিডিওগুলিতে তুলে ধরা হয়েছে বর্তমান সময়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা: বেকার গ্র্যাজুয়েটদের স্টাইপেন্ড, শিক্ষা ঋণ মকুব, রাজ্যের ঋণের স্বচ্ছতা এবং নারীদের নিরাপত্তা।

নির্বাচনী প্রচারে বিজয়

‘নিয়ন্ত্রিত ও বাস্তবসম্মত’ জন-ভাবমূর্তি গড়ে তোলা

ক্যান্ডিড মুহূর্তের প্রচার– মাঠে-ময়দানে প্রচারের সময় তৈরি হওয়া ছোট-ছোট মানবিক মুহূর্তগুলি সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া। তার মধ্যে ভিড়ের মধ্য থেকে ভক্তের ছুড়ে দেওয়া চশমার বাক্স লুফে নেওয়া, কিংবা সাধারণ মানুষের দেওয়া ডাবের জল খাওয়ার মতো নানা ভিডিও নিমেষেই ভাইরাল হয়েছে। এগুলির মাধ্যমে বিজয়কে একজন মাটির মানুষ এবং সৎ বিকল্প নেতা হিসেবে জনগণের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যানারহীন সুশৃঙ্খল সংস্কৃতি– বিজয় তাঁর সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে কর্মীদের উদ্দেশে স্পষ্ট নির্দেশ দেন যে, সাধারণ মানুষের অসুবিধে হবে বা এলাকার স্বাভাবিক সৌন্দর্য নষ্ট হবে এমন কোনও বড় প্লাস্টিকের ব্যানার বা কাট-আউট লাগানো যাবে না। এই সিদ্ধান্তের ডিজিটাল প্রচার সাধারণ ও নিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে টিভিকে-র স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

রোবোটিক এবং হলোগ্রাফিক প্রচার– কোয়েম্বাটুরের মতো বড় বড় শহুরে এলাকায় দলের রঙিন প্রতীক ও রোবট রাস্তায় নামিয়ে টিভিকে বিরাট চাঞ্চল্য ফেলে দেয়। ওই রোবট সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলত। এই অভিনব কায়দাটি মূলত ডিজাইন করা হয়েছিল সোশাল মিডিয়ায় আলোড়ন তোলার জন্য, যা খুব সহজেই অন-গ্রাউন্ড প্রচারকে অন-লাইন ট্রেন্ডে বদলে দেয়। স্বাভাবিকভাবেই ওই রোবটের সঙ্গে সেলফি তোলা বা সেটির সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল।

রোবোটিক এবং হলোগ্রাফিক প্রচার

অর্থাৎ সব মিলিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিজয় ও তাঁর দলের এই নির্বাচনী প্রচার আমাদের দেশ আগে কখনও দেখেনি। ভারতের নির্বাচনী প্রেক্ষাপটকে প্রভাবিত করার পিছনে সাধারণত টাকা, জাতি এবং ধর্মের জোরদার ভূমিকা থাকে। কিন্তু এবারের তামিলনাড়ু নির্বাচনে সব হিসেবে-নিকেশ ওলটপালট হয়ে গিয়েছে। ভাবা যায়, রাজ্যের অন্যতম পরিচিত মুখ হওয়া সত্ত্বেও সব মিলিয়ে তিন সপ্তাহেরও কম সময় সশরীরে প্রচার চালিয়ে বিজয় এমন জয় ছিনিয়ে নিয়েছেন! আসলে বিজয়ের প্রতিটি উপস্থাপনা ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে আলোড়ন তৈরি করেছিল। তাঁর দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্য ও একক সংলাপগুলিকে ইন্সটাগ্রাম রিলস এবং ইউটিউব শর্টসে রূপান্তরিত করে বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্রভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে এমন বহু পুরনো ও নতুন সমর্থকের কাছে পৌঁছনো সম্ভব হয়েছিল, যাঁরা একজন নতুন নেতার হাত ধরে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশায় ‘হুইসল’ (বাঁশি) প্রতীকে ভোট দিয়েছিলেন। অবাক করার মতো, মাদুরাই শহরের একটি দলীয় সম্মেলন থেকে বিজয়ের একটি এডিট করা সেলফি ভিডিও মাত্র ২৪ ঘণ্টায় প্রায় নয় কোটি ভিউ বা দর্শক পেয়েছিল।

প্রচারের চিহ্ন হুইসল মুখে নিয়ে

চেন্নাইয়ের এক চলচ্চিত্র পরিবারে জন্ম নিলেও বিজয় ছিলেন অত্যন্ত লাজুক ও শান্ত। মাত্র দুই বছর বয়সে তাঁর আদরের ছোট বোন বিদ্যার মৃত্যু বিজয়ের জীবনকে ওলটপালট করে দেয়। এই শোক তাঁকে অন্তর্মুখী করে তোলে, যা পরবর্তী জীবনে তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা এনে দেয়। ১৯৯২ সালে ১৮ বছর বয়সে যখন তিনি তামিল ছবিতে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন, তখন সমালোচকরা তাঁকে নিয়ে নিষ্ঠুর তামাশা করেছিলেন। তাঁর চেহারা এবং অভিনয় নিয়ে কটাক্ষ করে বলা হয়েছিল তিনি ‘হিরো হওয়ার অযোগ্য’। কিন্তু ‘পাশের বাড়ির ছেলে’ হয়ে ওঠা বিজয়ের সাফল্যের প্রথম রহস্য ছিল তাঁর কৌশলী পরিবর্তন। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি অ্যাকশন ছেড়ে রোমান্টিক ড্রামায় মন দেন। ‘পুভে উনাকাগা’ (১৯৯৬) এবং ‘থুল্লাধা মানামুম থুল্লুম’-এর মতো সিনেমাগুলি তাঁকে তরুণ প্রজন্মের আইকন এবং মা-বোনেদের প্রিয় করে তোলে। এর মাধ্যমেই তিনি তাঁর দর্শকদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ভিত তৈরি করেন। ২০০৩ সালে বিজয় নিজস্ব অভিনয়-কৌশলে এক আমূল পরিবর্তন আনেন। ‘ঘিল্লি’ (২০০৪) সিনেমার মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন ‘মাস হিরো’ বা জনতার নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাঁর নাচের সাবলীলতা, স্টাইলিশ অ্যাকশন এবং সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরা সংলাপ তাঁকে ‘থলপতি’ (সেনাপতি) উপাধি এনে দেয়। তামিল চলচ্চিত্র জগতের বড় বড় তারকাদের মধ্যে বিজয় সবসময়ই কম কথা বলা মানুষ হিসেবে পরিচিত। ২০০৮ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে যখন তাঁর বেশ কিছু সিনেমা বক্স-অফিসে ব্যর্থ হয়, তখনও তিনি চুপ থেকেছেন। ২০১২ সালে ‘থুপ্পাক্কি’র মাধ্যমে তিনি ১০০ কোটির ক্লাবে প্রবেশ করে প্রমাণ করেন যে, দীর্ঘ নীরবতাই আসলে বড় সাফল্যের প্রস্তুতি। নিজের বহু চলচ্চিত্রে তিনি দুর্নীতি, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক ক্ষুব্ধ নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তিনি নিজেকে অবহেলিত ও অধিকার-বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। এই ভাবমূর্তিই তাঁকে সাধারণ ভোটার ও ভক্তদের মাঝে বিপুল জনপ্রিয় করে তুলেছে। ২০২৪ সালে নিজের পেশার মধ্যগগনে থাকা অবস্থায়, যখন তিনি একটি সিনেমার জন্য ২০০ কোটি টাকা পারিশ্রমিক নিচ্ছেন, ঠিক তখনই বিজয় অভিনয় ছেড়ে রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। অবশেষে চমকে দেওয়া নির্বাচনী জয়ে তো ইতিহাসের সদ্য সূচনা!

‘ঘিল্লি’ (২০০৪)

দুই দশক আগে, সোশাল মিডিয়া যুগের শুরুতে বিপণনকারীরা বলেছিল যে, এর মূল উদ্দেশ্য হল কণ্ঠহীনদের কণ্ঠ দেওয়া। যারা টিভি, রেডিও এবং সাধারণ খবরের কাগজের মতো চিরাচরিত দেওয়ালগুলি পেরিয়ে সামনে আসতে পারত না, তাদের একটি প্ল্যাটফর্ম বা মঞ্চ দেওয়া। স্মার্টফোন, এর ক্যামেরা এবং ইন্টারনেট মিলে সৃজনশীল প্রচেষ্টার এক নতুন জোয়ার নিয়ে আসবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, স্মার্টফোন দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুধু সেলফিই তোলা হয়। থলপতি বিজয়ের গৌরবময় জয়ের প্রেক্ষিতে দেশের প্রতিটি সংবাদমাধ্যম তাঁর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে। তবুও ঝাঁকে ঝাঁকে ক্যামেরার মাঝে বিজয় নিজের ক্যামেরাটি ঠিক নিয়ে এসেছিলেন এবং দলের নেতা, রাহুল গান্ধীর মতো সহযোগী এবং উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে বেশ কিছু সেলফি তুলেছিলেন। একটি গণতন্ত্রে, একজন রাজনীতিবিদকে জনগণের একজন হতে হয়, আবার তাদের শাসনও করতে হয়– সাধারণ মানুষ এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব দু’ভাবেই তাঁকে ধরা দিতে হয়। আর সাধারণ মানুষ প্রায়ই দেখেন কীভাবে একজন রাজনীতিবিদ নিজেই নিজের ছবি তুলছেন। এই পরিস্থিতিতে সেলফি কেবল একটা সাধারণ ছবি থাকে না, বরং নিজের মতো করে বার্তা ছড়ানোর একটা মাধ্যম হয়ে ওঠে। আসলে, ক্যামেরার ফ্রেমে যতটুকু দেখানো হয়, তার বাইরে অনেক কিছুই ঢাকা পড়ে যায়। যাঁর হাতে ক্যামেরা, আসল নিয়ন্ত্রণ তাঁরই হাতে। তিনিই ঠিক করে দেন সাধারণ মানুষ ঠিক কতটুকু দেখতে পাবে। এখন পর্যন্ত সাধারণ মানুষ ও দলীয় ভক্তদের কাছে এভাবেই গড়ে উঠেছে বিজয়ের সযত্নে রচিত ভাবমূর্তি।

দক্ষিণ বিজয়ের পর

তামিলনাড়ু এর আগে এমজিআর এবং জয়ললিতার মতো মহাতারকাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতন দেখেছে। টিভিকে নেতা বিজয় কি সেই গৌরবময় উত্তরাধিকার বহন করবেন, না কি শুধুই একটি ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষা হয়ে থেকে যাবেন? সেই উত্তর পেতে হলে আমাদের হয়তো আপাতত অপেক্ষা করতে হবে কিছুদিন।