Robbar

শব্দ যখন শুশ্রূষা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 30, 2026 7:25 pm
  • Updated:May 30, 2026 10:24 pm  

বর্তমানে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার মোট প্রায় ২৫টি গ্রামে পেটাই ধ্বনিপাত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ কাজ হয় অবশ্য বাঁকুড়ায়। তবে মূল উৎপাদন-কেন্দ্র এখনও পুখুরিয়াই। এখান থেকেই এই শিল্প অন্যান্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই নদীপথ এই শিল্পের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দামোদর, কংসাবতী, শিলাবতী ও দ্বারকেশ্বর নদী ধরে এই ধ্বনিপাত্র বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল এবং ভারতের অন্যান্য মালভূমি এলাকায় পৌঁছে যেত। ফলে পুখুরিয়ার শিল্প ধীরে ধীরে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

দীপঙ্কর দাশগুপ্ত

ওড়িশার সিমলিপাল নয়। রাঢ়বঙ্গে শিলাবতী নদীতীরে বাঁকুড়ার সিমলাপাল ব্লক। সেখানকার পুখুরিয়া গ্রামের নামটি আমাদের অনেকের কাছে অচেনা ঠেকলেও, কাঁসার তৈরি অভিনব ‘পেটাই ধ্বনিপাত্র’র (Singing bowl) সন্ধানে সেখানেই একদা এসে হাজির হয়েছিলেন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার পিটার হেস।

‘ধ্বনিপাত্র’ শব্দটির উৎস সংস্কৃত। ভারতীয় দর্শন এবং সংগীত শাস্ত্রের সুগভীর ও আধ্যাত্মিক ধারণা– ‘নাদব্রহ্ম’ সম্পর্কে পিটারের বিশেষ আগ্রহ এবং শব্দ নিরাময় পদ্ধতি (Sound healing) নিয়ে চর্চার আকাঙ্ক্ষা, তাঁকে, তারও আগে প্রথম ১৯৮৪ সালে নেপাল থেকে টেনে নিয়ে এসেছিল ভারতে। ‘নাদ’ শব্দের অর্থ ধ্বনি বা আওয়াজ এবং ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ পরম সত্য বা ঈশ্বর। অর্থাৎ, শব্দই যেখানে ঈশ্বরের স্বরূপ। তান্ত্রিক ও বৈদিক ধারণা অনুযায়ী, সৃষ্টির আদি লগ্নে যে স্পন্দন তৈরি হয়েছিল, তা থেকেই মহাবিশ্বের উৎপত্তি। পবিত্র ‘ওঁ’ ধ্বনিকে নাদব্রহ্মের মূল প্রতীক বা শব্দব্রহ্ম মনে করা হয়। এই সুগভীর কম্পন বা ধ্বনি হল সৃষ্টির আদি ও অন্তহীন আওয়াজ।

জার্মান ইঞ্জিনিয়ার পিটার হেস

নাদব্রহ্ম সম্পর্কে পিটারের আগ্রহের সূচনা এবং বাঁকুড়ার গ্রামের সঙ্গে সেই বিদেশির চমকপ্রদ সংযোগ গড়ে ওঠার নেপথ্যে রয়েছে একটি কাহিনি। পিটারের এক পারিবারিক সদস্যের অসুস্থতার সময় যুক্তিবাদী এই প্রযুক্তিবিদ হঠাৎই বিকল্প চিকিৎসার প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই কারণে এক বছরের গবেষণার জন্য তিনি নেপালে যান এবং সেখান থেকে তাঁর পরবর্তী গন্তব্য হয়ে ওঠে ভারত ও তিব্বত। নেপালে থাকার সময় বিভিন্ন বৌদ্ধ মঠে কাঁসার পাত্রের গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য তাঁর নজরে আসে। ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশে নিত্য জল উৎসর্গ, ভিক্ষাপাত্র হিসেবে দান সংগ্রহ এবং ধ্যান অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ লামারা বিভিন্ন আকারের কাঁসার বাটি ব্যবহার করেন। প্রেয়ার বোল, বুদ্ধ বোল, হিমালয়ান বোল ইত্যাদি নামে সেগুলি পরিচিত। বৌদ্ধ লামাদের সান্নিধ্যে এসে ঐতিহ্যবাহী নিরাময় পদ্ধতি সম্পর্কে পিটার যেমন নতুন অনেক কিছু জানতে পারেন, তেমনই কাঠমান্ডু উপত্যকার প্রাচীনতম সমৃদ্ধ জাতিগোষ্ঠী ‘নেওয়ার’দের নিরাময় ও আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ধ্বনি ও সংগীতের গুরুত্ব কেমন, তাও তিনি শেখেন। সেই সূত্রেই কাঁসার ‘সিংগিং বোল’ বা ধ্বনি পাত্র থেকে সঞ্চারিত অপার্থিব সুরেলা স্পন্দনের প্রথম হদিশ পান তিনি। জানতে পারেন, মানুষের শরীর ও মনের ওপর ধ্বনির ইতিবাচক প্রভাবের সংকেত নিহিত রয়েছে পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রাচীন পূর্ব ভারতীয় আরোগ্য কলায়। প্রাচীন লোকগাথা অনুযায়ী, শব্দ থেকেই মানুষের সৃষ্টি এবং মানুষ নিজেই ধ্বনির প্রতিমূর্তি। মানুষের ওপর শব্দের এই প্রভাব নিয়ে বিস্তর গবেষণা এবং নেপাল ও তিব্বতে তাঁর বহুমুখী অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে, ১৯৮৪ সালে ধাতব সিংগিং বোল নিয়ে পিটার কাজ শুরু করেন। দীর্ঘ বছরের অনুশীলনে, প্রাচীন ভারতীয় জ্ঞানকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির উপযোগী করে তিনি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরেছেন ‘পিটার হেস সাউন্ড হিলিং থেরাপি’ পদ্ধতি। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে, পার্কিন্‌সন্‌স মোকাবিলায়, মানসিক উদ্বেগ কমাতে কিংবা মনঃসংযোগ বৃদ্ধি-সহ নানা ক্ষেত্রে সিংগিং বোলের সুরধ্বনির মনোরম প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে জার্মানি ছাড়াও আমেরিকা, ফ্রান্স, পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, গ্রিস ও তুরস্ক-সহ নানা দেশে।

বিভিন্ন আকারের সিঙ্গিং বোল বা ধ্বনিপাত্র

ভারত, নেপাল বা তিব্বতের বাইরেও সাউন্ড থেরাপির প্রাচীন ঐতিহ্যের হদিশ মেলে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী-সহ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ এটি নানা রূপে ব্যবহার করে আসছে। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী উপজাতিদের মধ্যে ৪০ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে শব্দ নিরাময়ের মাধ্যম হিসেবে ‘ডিজারিডু’ (didgeridoo) নামক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। আধুনিক গবেষণায় এখন জানা যাচ্ছে, সিংগিং বোল ব্যবহার করে সাউন্ড থেরাপি বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে মানসিক ও শারীরিক শুশ্রূষায় রীতিমতো উপকারী।

অস্ট্রেলিয়ার বাদ্যযন্ত্র ‘ডিজারিডু’ (didgeridoo)

সিংগিং বোলের শব্দের ইতিবাচক প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে এর গুণমানের ওপর। এর জন্য এমন একটি সিংগিং বোল প্রয়োজন, যার শব্দের বিস্তার হবে সুমধুর ও সুদূরপ্রসারী এবং যার প্রতিধ্বনি যেন মিলিয়ে যেতে থাকে মন্থর গতিতে ও দীর্ঘক্ষণ ধরে। পিটার যখন ‘রিল্যাক্সেশন’-এর জন্য অর্থাৎ, মানসিক ও শারীরিক চাপ কাটাতে পরিকল্পিতভাবে এই ধ্বনি ব্যবহার করা শুরু করেন, তখন তিনি নেপাল ও ভারত ভ্রমণের সময় এই কাজের উপযোগী কিছু বাটি পেয়েছিলেন। তবে ধীরে ধীরে এমন বাটি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই ১৯৮৯ সালে প্রাচীন ঐতিহ্য মেনে তিনি নিজস্ব মানদণ্ড (standardization) অনুযায়ী, সিংগিং বোল তৈরির কাজ শুরু করেন। নিখুঁতভাবে তৈরি বাটিগুলির নিজস্ব শব্দ ও কম্পনের বৈশিষ্ট্য শরীরের ভিন্ন ভিন্ন অংশে বিশেষভাবে কাজ করে। অবশেষে বছর ৩০ আগে বিশেষ ধরনের সেই কাঁসার বাটি তৈরি শুরু হল বাঁকুড়ার গ্রামে।

লালমাটির দেশ বাঁকুড়া বহু শতাব্দী ধরে তার শিল্প-ঐতিহ্যের জন্য পরিচিত। টেরাকোটা, কাঁসাশিল্প কিংবা লোকসংস্কৃতির পাশাপাশি সম্পূর্ণ হাতে পিটিয়ে তৈরি ‘পেটাই ধ্বনিপাত্র’ বা ‘বেঙ্গল সিংগিং বোল’ আজ আন্তর্জাতিক স্তরেও সমাদৃত। অভিনব এই হস্তশিল্পের অসাধারণ কারিগরি দক্ষতা ও পরম্পরাগত জ্ঞান সংরক্ষণে ‘বাংলার পেটাই ধ্বনিপাত্র’-কে জিওগ্রাফিকাল ইন্ডিকেশন (জি আই) ট্যাগ মঞ্জুর করার জন্য পুখুরিয়া কো-অপারেটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল সোসাইটি লিমিটেডের তরফে বছর চারেক আগে আবেদন পেশ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, শীঘ্রই বাংলার গ্রামে তৈরি সিংগিং বোল ‘জিআই’ ট্যাগ পেয়ে যাবে।

‘পেটাই’ বা হাতুড়ি দিয়ে পেটানোর কৌশলই এই শিল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্য। বাঁকুড়ার কাঁসারি ও কর্মকার সম্প্রদায়ের কারিগরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই শিল্পচর্চা করে আসছেন। তাঁদের দক্ষ হাতে তৈরি প্রতিটি ধ্বনিপাত্র যেন এক একটি জীবন্ত অনুনাদের ভাণ্ডার। ধাতব এই বাদ্যযন্ত্র কেবল একটি শিল্পপণ্য নয়; এটি একই সঙ্গে সুর, ধ্যান, চিকিৎসা ও ঐতিহ্যের এক বিস্ময়কর সমন্বয়। ছোটনাগপুর মালভূমির প্রান্তবর্তী এই অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই ধ্বনিপাত্র শিল্পের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে। খনিজ সম্পদ, কয়লার সহজলভ্যতা এবং ল্যাটেরাইট বা রাঙামাটির উপস্থিতি এই শিল্পকে প্রাকৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করেছে। এখানকার মাটির দৃঢ়তা এমন যে, উচ্চতাপ ও চাপ সহ্য করতে সক্ষম ছাঁচ তৈরিতে তা অত্যন্ত কার্যকর। ফলে ধাতু গলিয়ে প্রাথমিক আকৃতি নির্মাণের ক্ষেত্রে এই রাঙামাটি অপরিহার্য উপাদানে পরিণত হয়েছে।

ষোড়শ শতকে লেখা আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের ‘ভাবপ্রকাশ’ গ্রন্থের একটি পরিচিত শ্লোক হল– ‘কৌন্সেয়ং বুদ্ধিবর্ধকম্’। অর্থাৎ কাঁসার পাত্রে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে মানুষের মেধা, প্রজ্ঞা ও স্মৃতিশক্তি বাড়ে। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস গভীর ছিল বলেই, বহুকাল ধরে কাঁসার থালা-বাসনের কদর ছিল বাংলার ঘরে ঘরে। ঐতিহাসিকভাবে বাঁকুড়ার কাঁসাশিল্প অত্যন্ত সমৃদ্ধ। চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েনের বিবরণে গুপ্তযুগে বস্ত্র, চামড়া, হাতির দাঁতের কাজ এবং ধাতব শিল্পের উৎকর্ষের উল্লেখ রয়েছে। মুঘল সম্রাটরাও ‘কাঙ্কশানা’ (Kankshanas) রাজ্যে এই পণ্যগুলির উৎপাদনে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং সেখানে উচ্চমানের সামগ্রী তৈরি হত। ঐতিহ্যবাহী ‘কাঁসারি’ কারিগরেরা ধাতুর টুকরো বা স্ক্র্যাপ মেটাল ব্যবহার করে হাতে তৈরি ধাতব পণ্য এবং প্রাচীন নিদর্শন তৈরি করতেন। বাংলায় তৈজসপত্র বা বাসনপত্র তৈরির শিল্পটি মূলত একটি স্থানান্তরিত বা যাযাবর শিল্প (মাইগ্রেটরি ক্রাফট), যা এই প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলে বিকশিত হতে শুরু করেছিল। ওই এলাকায় অত্যন্ত দ্রুত ধাতুবিদ্যা সংক্রান্ত মেধার বিকাশ ঘটেছিল। তামা উৎপাদনকারী ধলভূম-সিংভূম অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান, এবং বাংলার কৃষিপ্রধান সমতল ভূমির সঙ্গে সহজ বাণিজ্যিক যোগাযোগের ফলে এই অঞ্চলে শিল্পের প্রসার আরও ত্বরান্বিত হয়েছিল। এবং ক্রমে বাংলায় এই যাযাবর শিল্পে জোয়ার আসে।

মল্লরাজাদের আমলে এই অঞ্চলে কাঁসা ও পিতলশিল্পের ব্যাপক বিকাশ ঘটে। বাঁকুড়ার কাঁসাশিল্প যে কতটা উন্নত ছিল– তার দৃষ্টান্ত রয়ে গিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত ‘বাঁকুড়া জেলার বিবরণ’ বইতে রামানুজ কর থালা-বাটির বিরাট সম্ভার ও নামের বৈচিত্র তুলে ধরেছেন। সেগুলি পরিচিত ছিল কাশীয়ান, মুঙ্গেরি, নেপালি, কটকি, গয়েশ্বরী, কংসেশ্বরী, বালেশ্বরী বগি, পদ্মরেকাব ইত্যাদি নামে। কেঞ্জাকুড়া, শুশুনিয়া, উখড়া, মুর্গাখোল, বেলিয়াতোড়, মলিয়ান, শ্যামনগর, লক্ষ্মীসাগর, পাত্রসায়র, রায়বাঘিনী ইত্যাদি গ্রাম ছিল কাঁসা শিল্পের জন্য বিখ্যাত। বেঙ্গল-নাগপুর রেলপথ চালু হওয়ার পর কাঁসার তৈরি অন্তত ৪০ রকম থালা, রেকাব, বাটি, গেলাস, করতাল, ঘণ্টা, কাঁসরঘণ্টা, পিতলের পিকদানি, গাড়ু, দেবদেবীর প্রতিমূর্তি ইত্যাদি ওয়াগন বোঝাই করে পাঠানো হত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ধর্মীয় আচার, গৃহস্থালির সামগ্রী এবং বাদ্যযন্ত্র তৈরিতে কাঁসার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেই ঐতিহ্যেরই এক জীবন্ত ধারাবাহিকতা হল পেটাই ধ্বনিপাত্র, যা মূলত কাঁসা বা বেল মেটাল দিয়ে তৈরি হয়। এটি তামা ও টিনের একটি বিশেষ মিশ্র ধাতু, যেখানে তামার পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ এবং টিনের পরিমাণ ২০ শতাংশ। বাঁকুড়া অঞ্চলে উৎকৃষ্ট মানের তামা সহজলভ্য হওয়ায় এই শিল্পের বিকাশ সহজ হয়েছে। অন্যদিকে টিনের জোগান আসে ছত্তিশগড় অঞ্চল থেকে। এই দুই ধাতুর সংমিশ্রণেই তৈরি হয় অনন্য কাঁসা, যা সুর ও অনুনাদের জন্য আদর্শ বলে বিবেচিত। ধাতু গলানোর জন্য ব্যবহৃত হয় কয়লা। এই কয়লা আসে রানিগঞ্জ কয়লাখনি অঞ্চল থেকে। ফলে কাঁচামাল সংগ্রহের সুবিধাও এই শিল্পকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে। তবে শুধু প্রাকৃতিক উপাদানই নয়, পেটাই ধ্বনিপাত্রের আসল শক্তি নিহিত রয়েছে কারিগরদের হাতে। সম্পূর্ণ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে ধাতুকে বারবার উত্তপ্ত করা, পেটানো এবং ঠান্ডা করার মাধ্যমে বাটির আকৃতি গড়ে তোলা হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘অ্যানিলিং’। এর মাধ্যমে ধাতুর আণবিক গঠন নিয়ন্ত্রিত হয় এবং শক্ত কাঁসাকে ধীরে ধীরে নমনীয় করে কাঙ্ক্ষিত রূপ দেওয়া সম্ভব হয়। কারিগরদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল সুরের কম্পাঙ্ক বা ‘টোনাল ফ্রিকোয়েন্সি’। এ, বি, সি, ডি– বিভিন্ন সুরের ‘নোট’ অনুযায়ী বাটির গভীরতা, প্রস্থ ও পুরুত্ব নির্ধারণ করা হয়। এই কৌশল সম্পূর্ণ গোপন এবং প্রজন্মান্তরে মৌখিকভাবে সংরক্ষিত। দক্ষ কারিগরেরা জানেন, কোন অনুপাতে ধাতু পেটালে কত দীর্ঘস্থায়ী অনুনাদ তৈরি হবে। এই দীর্ঘস্থায়ী কম্পনই ধ্বনিপাত্রকে সাধারণ বাদ্যযন্ত্রের বাইরে এনে থেরাপির উপযোগী করে তোলে।

পুখুরিয়ার কারিগরেরা বিশেষভাবে ধাতব পাত বা মেটাল শিট ব্যবহার এড়িয়ে চলেন। তাঁদের মতে, ধাতব পাত দিয়ে তৈরি বাটিতে শব্দের গভীরতা ও কম্পাঙ্ক কমে যায়। ফলে সেই বাটি ধ্যান, থেরাপি বা নিরাময়ের জন্য উপযুক্ত থাকে না। তাই প্রতিটি ধ্বনিপাত্রই তৈরি হয় কঠিন ধাতুর খণ্ডকে উত্তপ্ত করে এবং পিটিয়ে। এই শিল্পে ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলোর মধ্যেও রয়েছে বৈচিত্র। গোলাকার আকৃতি দেওয়ার জন্য রাউন্ডিং হ্যামার, ধাতু পেটানোর জন্য ফোর্জিং হ্যামার এবং মসৃণ করার জন্য পলিশিং হ্যামার ব্যবহৃত হয়। এছাড়া নেহাই, সাঁড়াশি, পরিমাপক যন্ত্র ও খোদাইয়ের সরঞ্জামও অপরিহার্য।

একটি পেটাই ধ্বনিপাত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল তার অনুনাদ। কাঠের মুগুর বা চামড়া অথবা ভেলভেট-মোড়া দণ্ড দিয়ে বাটির গায়ে মৃদু আঘাত করলে বা বাটির চারপাশে ঘষলে এক ধরনের গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সুর সৃষ্টি হয়। শুধু শব্দই নয়, বাটি থেকে নির্গত কম্পন কয়েক সেন্টিমিটার দূর থেকেও অনুভব করা যায়। এই কম্পনের মাত্রা নির্ভর করে বাটির আকার ও পুরুত্বের ওপর। বছর দুয়েক আগে এক শীতের সকালে পুখুরিয়ায় হাজির হয়ে দেখেছিলাম, ঘরে ঘরে কাঁসার শাল বা ধ্বনিপাত্র তৈরির কারখানা। গ্রাম জুড়ে অনুরণিত হচ্ছে যেন সুগম্ভীর ওঁকার ধ্বনি। স্থানীয় শিল্প-সমবায় সমিতির সম্পাদক হারাধন কর্মকার দেখালেন, গনগনে আগুনে উত্তপ্ত এক তাল ধাতু থেকে কীভাবে ধীরে ধীরে বাটি তৈরি হচ্ছে। তিনি বলছিলেন, এই কাজ চলে ভোরের আলো ফোটার পর থেকে দুপুর ১২টা অবধি। বাঁকুড়ার হস্তশিল্প-সংক্রান্ত গবেষক ও ওন্দা কলেজের ইতিহাসের অধ্যাপক ড. সোমনাথ কর জানালেন, ধ্বনিপাত্র তৈরি হয় মূলত আশ্বিন থেকে ফাল্গুন অবধি। বর্ষায় কাজ হয় না, কারণ সেই আর্দ্র আবহাওয়ায় বাটিতে ছোপ-ছোপ দাগ ধরে যায়। বাঁকুড়া-পুরুলিয়ার গ্রামে এই ধ্বনিপাত্র তৈরির বিপুল পরিশ্রমসাধ্য শিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন হাজার পাঁচেক কারিগর। বছরে ১০০-১৫০ টন ধাতু ব্যবহার করে অন্তত ২০-৩০ কোটি টাকার কারবার চলে। স্থানীয় মহাজন এবং বিদেশে ধ্বনিপাত্র রফতানিকারক কুমারেশ কর্মকারের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল ধ্বনিপাত্রের বিরাট সম্ভার। ৫০ গ্রাম থেকে শুরু করে ৫০ কেজি ওজনের নানা আকৃতির বাটি রয়েছে। মডেল ও ফিনিশিং অনুযায়ী, সেগুলির দাম কেজি প্রতি ২,৬০০ টাকা থেকে শুরু করে ২,৮০০ টাকা। বাংলার দুই জেলায় বাটি তৈরি হলেও কাঠের ‘ম্যালেট’ বা চামড়ায় মোড়া মুগুর আসে উত্তরপ্রদেশের মীরাট থেকে। জার্মান ইঞ্জিনিয়ার পিটার এসেছিলেন কুমারেশবাবুর বাড়িতেও। অধ্যাপক কর বলছিলেন, ৫০ কেজি ওজনের বাটিগুলি মূলত তৈরি হয় খাতরা ব্লকের বেনা গ্রামে।

প্রবল উত্তাপে ঝলসে যাওয়া থেকে বাঁচতে ধাতব মণ্ড পিটিয়ে বড় করে ওই মস্ত ‘বোল’ তৈরি করতে ভিজে চট গায়ে ও পায়ে বেঁধে বাটির ভেতরে নেমে কাজ করতে হয়। সেই বাটি ‘ফিনিশ’ করতে লেগে যায় অন্তত ২৫ দিন। বর্তমান সময়ে যন্ত্রনির্ভর উৎপাদনের ভিড়ে সম্পূর্ণ হাতে তৈরি এই শিল্পটি টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও পুখুরিয়ার কারিগরেরা তাঁদের পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার আজও আগলে রেখেছেন। প্রতিটি ধ্বনিপাত্র তাঁদের কাছে শুধু পণ্য নয়, বরং সাধনা ও শিল্পবোধের বহিঃপ্রকাশ। প্রচণ্ড ঝুঁকির এই কাজে ৫০ কেজির এক-একটি বাটির জন্য মজুরির পরিমাণ ২-৩ লাখ টাকা। সেই বাটিতে ধাতুও লাগে লাখ টাকার। নানা সাইজের ৫-৭টি বাটির সেটের চাহিদা বিদেশে প্রচুর। অনেক বাটি রফতানি হয় নেপাল থেকে। হেলনা-শুশুনিয়া, মলিয়ান, হীড়বাঁধ ইত্যাদি গ্রাম ফাঁকা করে বহু কাঁসা-শিল্পী তাই চলে গিয়েছেন নেপালের জনকপুর ও কাঠমান্ডুতে। বিশ্ব জুড়ে বর্তমানে ‘সাউন্ড হিলিং’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ফলে বাংলার ধ্বনিপাত্র বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ধ্যান, যোগব্যায়াম, মানসিক প্রশান্তি এবং শব্দ তরঙ্গের ‘মালিশ’-এ এই বাটির ব্যবহার ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৌদ্ধধর্ম, জৈনধর্ম ও আয়ুর্বেদের সঙ্গেও এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। শান্তিদায়ক সুর ও কম্পন মানবদেহের শক্তি প্রবাহ বা এনার্জি সিস্টেমের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে বিশ্বাস।

এই শিল্পের বিস্তার শুধু পুখুরিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার মোট প্রায় ২৫টি গ্রামে পেটাই ধ্বনিপাত্র তৈরি হয়। এর মধ্যে অধিকাংশ কাজ হয় অবশ্য বাঁকুড়ায়। তবে মূল উৎপাদন-কেন্দ্র এখনও পুখুরিয়াই। এখান থেকেই এই শিল্প অন্যান্য গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই নদীপথ এই শিল্পের বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। দামোদর, কংসাবতী, শিলাবতী ও দ্বারকেশ্বর নদী ধরে এই ধ্বনিপাত্র বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল এবং ভারতের অন্যান্য মালভূমি এলাকায় পৌঁছে যেত। ফলে পুখুরিয়ার শিল্প ধীরে ধীরে বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।

আধুনিক বিশ্বে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অস্থিরতার সময়ে ধ্যান ও সাউন্ড থেরাপির চাহিদা বাড়ছে। সেই প্রেক্ষাপটে বাঁকুড়ার পেটাই ধ্বনিপাত্র নতুন করে বিশ্ব জুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে। এই শিল্প কেবল বাংলার গৌরব নয়; এটি ভারতীয় ধাতুশিল্প, লোকঐতিহ্য ও মানবিক সৃজনশীলতার এক অসাধারণ নিদর্শন। লাল মাটির দেশ বাঁকুড়ার বুক থেকে উঠে আসা এই অনুনাদ তাই আজও মানুষকে মুগ্ধ করে, শান্তি দেয় এবং রচনা করে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন দীপঙ্কর দাশগুপ্তর অন্যান্য লেখা

……………………