


আজ যাকে আমরা স্রেফ একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে করি, হাজার বছর আগে আদিম কৃষকদের জন্য তা ছিল প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এক অমোঘ বিবর্তনীয় হাতিয়ার। গবেষকরা বলেছেন, জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে রেডহেডদের মস্তিষ্ক, ব্যথা বা তাপমাত্রার সংকেত একটু ভিন্নভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। এই কারণেই অস্ত্রোপচারের সময় তাদের বেশি অ্যানেস্থেসিয়ার প্রয়োজন হয় এবং তারা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়।
লাল রঙের চুল কি সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয়? কিংবা আভিজাত্য? তবে, বহু প্রচলিত একটি মিথ হচ্ছে ‘রেড হেড’ বা লাল চুলের মানুষেরা খুব রাগী বা উগ্র মেজাজের হয়। পশ্চিমের সংস্কৃতিতে লাল চুলের মানুষদের নিয়ে আজও ঠাট্টা-তামাশার শেষ নেই। যেহেতু এই চুলের রং একেবারেই বিরল, বিশ্বের মাত্র ১-২% শতাংশ মানুষ এই চুলের অধিকারী, তাই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ একে অলৌকিক বা অতিপ্রাকৃত কিছুর সাথে গুলিয়ে ফেলত। লাল চুলের মানুষদের নিয়ে বিস্ময়, ভয় এবং অদ্ভুত সব কাল্পনিক বিশ্বাস বা মিথ ছড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। রোমে লাল চুলের দাসদের অনেক চড়া দামে কেনা হত, কারণ তাদের সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হত। আবার, প্রাচীন গ্রিসের মানুষেরা বিশ্বাস করতেন, লাল চুলের মানুষরা মারা যাওয়ার পর রক্তখেকো ভ্যাম্পায়ার হয়ে ফিরে আসে । মিশরীয় মাইথোলজিতে বিশৃঙ্খলা ও ঝড়ের দেবতা ‘সেত’ ছিলেন লাল চুলের অধিকারী। কিছু ইতিহাসবিদের মতে, প্রাচীন মিশরে লাল চুলের মানুষদের দেবতা ওসাইরিসের সমাধিতে বলি দেওয়া হত যাতে অমঙ্গল দূর হয় । তবে ফারাও দ্বিতীয় রামসেস নিজেও একজন প্রাকৃতিকভাবে লাল চুলের অধিকারী ছিলেন বলে, তাঁর সময়ে লাল চুলকে রাজকীয় মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল।

ইতিহাস যাই বলুক, বিজ্ঞান কিন্ত বলছে লাল চুল আসলে মানুষের বিবর্তনের ধারাতেই এসেছিল। কিছু মানুষকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দিতে এবং অনেকটাই প্রয়োজনের তাগিদে চুলের রঙ বদলে গিয়ে লাল হয়েছিল, এবং এই বিবর্তন হয়েছিল মানুষ কৃষিকাজ শুরু করার পরে।
আসলে অনেকেই ধারণা করেন, মানুষ যখন থেকে ঘরবাড়ি বানানো শিখল বা কৃষিকাজ শুরু করল, কিংবা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান দিয়ে মৃত্যুকে জয় করতে চাইল– তখন থেকেই হয়তো প্রকৃতির সেই কঠোর ‘যোগ্যতমের জয়’ (survival of the fittest) নিয়মটি শিথিল হয়ে গেছে। অর্থাৎ, বিবর্তন বা ইভোলিউশন থমকে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। মানুষের বিবর্তন শুধু চলছেই না, বরং গত দশ হাজার বছরে তা আরও বেশি ত্বরান্বিত হয়েছে এবং সভ্যতার অগ্রগতির হাত ধরেই সেই বিবর্তন এগিয়েছে।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. আলি আকবরি এবং হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড রাইখের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই বিষয়টি নিয়ে একটি গবেষণা করেছিলেন। গবেষক দল অত্যাধুনিক কম্পিউটেশনাল প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে পশ্চিম ইউরেশিয়ার প্রায় ১৬০০০ প্রাচীন মানুষের কঙ্কাল এবং ৬০০০ জীবিত মানুষের ডিএনএ বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, কৃষিকাজ শুরুর পর থেকে মানবদেহের অন্তত ৪৭৯টি জেনেটিক ভ্যারিয়েন্ট প্রাকৃতিক নির্বাচনের (Natural Selection) মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ও আকর্ষণীয় অংশটি হচ্ছে লাল চুল আর ফর্সা ত্বক।

বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত হয়েছে সেই গবেষণার তথ্য। গবেষণাটির মূল নির্যাস হল– লাল চুল এবং ফর্সা ত্বক কেবল একটি বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, এটি প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য মানুষের একটি বিবর্তনীয় রণকৌশল।
হাজার হাজার বছর আগে আদিম মানুষ যখন আফ্রিকা ছেড়ে উত্তর ইউরোপের দিকে পাড়ি জমায়, তখন তারা এক মহাবিপদে পড়ে। সেখানে সূর্যের আলো ছিল খুব কম। কালো ত্বকের মেলানিন সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে আটকে দেয়, ফলে তাদের শরীরে ভিটামিন-ডি তৈরি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাদের খাবারে প্রাকৃতিকভাবে এই ঘাটতি পূরণ করার কোনও সুযোগ ছিল না। ফলে, কিছুকাল পরেই সেই মানুষদের দেহে ভিটামিন-ডি-রও মারাত্মক ঘাটতি দেখা দেয় এবং হাড়ের রোগ দেখা দেয়।
ঠিক এই সময়েই মানুষের শরীরে MC1R নামের একটি জিনে পরিবর্তন বা মিউটেশন ঘটে। এই পরিবর্তনের ফলে দুটি বড় ঘটনা ঘটে যায়।

শরীরে লাল ও হলুদ পিগমেন্ট (Pheomelanin) তৈরি হতে শুরু করে, যেটি চুলকে লালচে করে তোলে। অন্যদিকে ত্বক অত্যন্ত ফর্সা ও সাদা হয়ে ওঠে। বিবর্তনের ধারায় প্রকৃতি তখন এই ফর্সা ত্বক ও লাল চুলের অধিকারী ব্যক্তিদেরই টিকে থাকার জন্য উপযুক্ত মনে করে কারণ, এই লাল চুল ও ফর্সা ত্বকের অধিকারী মানুষরা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং খুব সামান্য আলো থেকেও প্রচুর ভিটামিন-ডি তৈরি করতে পারে। উত্তর ইউরোপের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোতে হাড়ের রোগ থেকে বাঁচতে এবং প্রজনন ক্ষমতা ধরে রাখতে এই বিবর্তন তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের শরীর সামান্য আলোতেই অত্যন্ত দ্রুত এবং প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-ডি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। অর্থাৎ আজ যাকে আমরা স্রেফ একটি শারীরিক বৈশিষ্ট্য বলে মনে করি, হাজার বছর আগে আদিম কৃষকদের জন্য তা ছিল প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার এক অমোঘ বিবর্তনীয় হাতিয়ার। লাল চুল হয়ে উঠেছিল প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রকৃতিরই দেওয়া এক দুর্দান্ত উপহার। ভিটামিন-ডি-এর অভাব মেটাতে এই শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোই তাদের বাঁচিয়ে রেখেছিল।

তবে বিবর্তনের এই বিস্ময়কর পথচলা কেবল এখানেই থেমে থাকেনি; এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে আরও বেশ কিছু অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর বাঁক। গবেষকরা বলেছেন, এই একই জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে রেডহেডদের মস্তিষ্ক, ব্যথা বা তাপমাত্রার সংকেত একটু ভিন্নভাবে গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। এই কারণেই অস্ত্রোপচারের সময় তাদের বেশি অ্যানেস্থেসিয়ার প্রয়োজন হয় এবং তারা অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা সহ্য করার বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয়।
লাল চুলের এই রহস্যময় বিজ্ঞান আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি আজও আমাদের ভেতর দিয়ে তার অদ্ভুত খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির এই গবেষণা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, আমাদের ডিএনএ কোনও স্থির বা অপরিবর্তনশীল বিষয় নয়, পরিবেশ ও পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ছে। আজকের আধুনিক মানুষ তাই কেবল ইতিহাসের অংশ নয়, বরং বিবর্তনের এক জীবন্ত দলিল– যা আজও প্রতিটি কোষে বয়ে বেড়াচ্ছে হাজার বছর আগের সেই টিকে থাকার গল্প।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved