Robbar

রে-লোকেশন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 31, 2026 12:35 pm
  • Updated:May 31, 2026 12:35 pm  

গর্জনরত একটি বাঘের ঠোঁট এবং দাঁত। তার হাঁ-করা মুখের মধ্যে বিশাল দু’টি শ্বদন্ত। এই বাঘটা তাঁর চিত্রনাট্যের খাতায় এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এই মুখটা নিশ্চয়ই আপনার মনে পড়ছে? কোথায় আমরা দেখেছি একে? একে আমরা দেখেছি হাল্লা রাজ্যের সর্বত্র। উন্মুক্ত প্রান্তরে। সিংহাসনের ঠিক পিছনের দেওয়ালে। সেনাবাহিনীর পতাকায়। উন্মুক্ত প্রান্তরে গাঁথা আছে ৬ ফুট উঁচু একটা মিনার। এই মিনারটা পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি। সেই সমস্ত ব্লক-এর গায়ে রিলিফ করে তৈরি করা হয়েছে গর্জনরত এই বাঘের পুরো মাথাটা। মুভি থেকে ওই বাঘের মুখের উপর এসে আমরা থামি। সেই মুহূর্তে ছবিটা ফ্রিজ হয়ে যায়।

সুদেষ্ণা গোস্বামী

কালো দোলনা আর সাদা ফোয়ারা। 

মাত্র এই দু’টি উপাদান দিয়ে সত্যজিৎ চিহ্নিত করেছিলেন দু’টি বাগানকে। চারুলতার বাগান আর পিকুর বাগান।

এই দু’টি ছোট্ট উদাহরণেই বোঝা যায়, অকিঞ্চিৎকর দৈনন্দিন উপাদান দিয়েই সত্যজিৎ আদর্শ লোকেশনকে চিহ্নিত করতেন।

সোজা কথায়, নির্বাচিত লোকেশনে এমন কোনও উপাদান উনি রাখতেন, যে রকম চেহারার উপাদান কাছাকাছি অন্য কোথাও নেই। 

আগেই বলেছি, ‘চারুলতা’-র বাগানে যেমন দোলনা। ওই রকম দোলনা ছবির অন্য কোনও দৃশ্যে, বা অন্য কোনও লোকেশনেই নেই। একই কথা বলা যায় ‘পিকু’-র বাগানের ফোয়ারার বিষয়ে। 

‘চারুলতা’-র বাগানের দোলনা

‘চারুলতা’-র বাগানের থেকে ‘পিকু’-র বাগান যে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেজাজের– দোলনা আর ফোয়ারার তফাতের মধ্যে দিয়েই সেটা বোঝা যায়। দোলনার রং কালো। আর ফোয়ারাটা সাদা।

চারু দোলার সময় দোলনাটা ক্যাঁচ কোঁচ শব্দ করে। আর ফোয়ারাটা ঘোরার সময় ঝির ঝির করে জলের শব্দ হয়।

দোলনাটা লোহার তৈরি আর ফোয়ারাটা শ্বেতপাথরের।

মনে হতে পারে, এ সবই তো বাহ্যিক রূপ। কিন্তু একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাহ্যিক রূপই বিশুদ্ধ সিনেমার মূল উপাদান। সত্যজিৎ রায় নিজেই বারবার বলেছেন একথা। মাত্র একটি উদাহরণ আমি দিচ্ছি। 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লিখন-শৈলীর বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে সত্যজিৎ লিখেছিলেন, সুনীলের গল্প উপন্যাসে ‘…Characters, incidents, relationships are all largely built up by the means of sensitivity observed external details– a fundamentally cinematic device.’ (‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকা, ১৯৭৪)

তাই উপযোগী লোকেশন বাছাই করার সময়, ওই জায়গার বিশিষ্ট দু’-একটি বাহ্যিক (external) বৈশিষ্ট্যের সন্ধান করতেন সত্যজিৎ। ‘অভিযান’-এ যেমন বেছে নিয়েছিলেন দুবরাজপুরের মামা-ভাগ্নে টিলা। মানে, ছোট একটা পাথরের উপর চেপে বসে আছে বিশাল আর একটি পাথরের চাঁই। কী নিখুঁত ব্যালেন্স। ঝড়-জল-ভূমিকম্পেও নড়ন-চড়ন‌ নেই। ওই জোড়া পাথরের জন্যই বাঙালির মনে আজও গেঁথে আছে ‘অভিযান’-এর লোকেশন।

কিন্তু পুরোটাই কি এক্সটার্নাল? পুরোটাই বাহ্যিক?

তা কিন্তু নয়। সত্যজিতের নির্বাচিত লোকেশনের স্বাতন্ত্র্য-সূচক চিহ্নগুলোর অন্তরালে আমরা কখনও দেখতে পাই পরিযায়ী বন্যপ্রাণীর ইতিহাস, কখনও পুরাণের ছায়া, কখনও বা নৃতত্ত্ব।

শুরু করি স্বৈরতন্ত্রী হাল্লা রাজ্যের সর্বত্র উৎকীর্ণ গর্জনরত বাঘের মাথার কথা বলে।

সত্যজিৎ রায়ের আঁকা গর্জনরত বাঘের স্কেচ

হাল্লার বাঘ

গর্জনরত একটি বাঘের ঠোঁট এবং দাঁত। তার হাঁ-করা মুখের মধ্যে বিশাল দু’টি শ্বদন্ত। এই বাঘটা তাঁর চিত্রনাট্যের খাতায় এঁকেছিলেন সত্যজিৎ রায়। এই মুখটা নিশ্চয়ই আপনার মনে পড়ছে? কোথায় আমরা দেখেছি একে?

একে আমরা দেখেছি হাল্লা রাজ্যের সর্বত্র। উন্মুক্ত প্রান্তরে। সিংহাসনের ঠিক পিছনের দেওয়ালে। সেনাবাহিনীর পতাকায়।

হাল্লা-রাজার সেনাবাহিনীর পতাকায় সেই একই ছাপ

উন্মুক্ত প্রান্তরে গাঁথা আছে ৬ ফুট উঁচু একটা মিনার। এই মিনারটা পাথরের ব্লক দিয়ে তৈরি। সেই সমস্ত ব্লক-এর গায়ে রিলিফ করে তৈরি করা হয়েছে গর্জনরত এই বাঘের পুরো মাথাটা। 

মুভি থেকে ওই বাঘের মুখের উপর এসে আমরা থামি। সেই মুহূর্তে ছবিটা ফ্রিজ হয়ে যায়।

আবার হাল্লা রাজার সিংহাসনের ঠিক পিছনেই একটা ডার্ট বোর্ড লাগানো আছে। আর সেই ডার্ট বোর্ডের ঠিক উপরেই দেওয়ালের গায়ে রিলিফ করে তৈরি করা হয়েছে বিশাল একটি গর্জনরত বাঘের মাথা। এটা হচ্ছে সেই একই বাঘ, যাকে আমরা দেখেছি ধূ-ধূ প্রান্তরে, পাথরের মিনারে তৈরি মূর্তি হিসেবে।

হাল্লা-রাজের সিংহাসনের পিছনে, দেওয়ালে উৎকীর্ণ সেই একই বাঘের মুখের ভাস্কর্য

বাঘের এই বিশাল মাথার থুতনির ঠিক নিচেই রিলিফ করে তৈরি হয়েছে একটি জ্যামিতিক সাপ। দেখেই বোঝা যায়, এটি হচ্ছে ভয়ংকর বিষাক্ত শাঁখামুঠি সাপের অলংকৃত একটি রূপ। এই একই রকম বাঘের মাথা আমরা দেখতে পাচ্ছি, হাল্লা রাজার সভায় প্রতিটি থামের মাথায়।

মার্চ করে শুণ্ডী রাজ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে হাল্লার সেনাবাহিনী। বাহিনীর একেবারে সামনে যে দু’জন সৈন্য আছে উটের পিঠে– তাদের হাতে দু’টি সাদা পতাকা উঁচিয়ে ধরা আছে। সেই সাদা পতাকার গায়েও কালো রঙের কাপড় সেলাই করে জুড়ে তৈরি হয়েছে সেই গর্জনরত বাঘের মাথা ও তার নিচে সাপ।

এগিয়ে চলা সেই সেনাবাহিনীর এক ধারে দাঁড়িয়ে আছেন মন্ত্রীমশাই। তাঁর পিঠকে ঢেকে রেখেছে সাদা কাপড়। তার রেশমি কাপড়ের গায়েও গর্জনরত সেই একই বাঘের মাথা ও সাপ। আবার, উটে-চড়ে-বসা সেনাপতির জামার বুকের উপরেও সেই একই বাঘের মাথা।

মন্ত্রীর পিঠবস্ত্রের উপর বাঘ ও সাপের ছাপ

হিংস্র শুণ্ডী রাজার বাড়িতে, পোশাকে– সর্বত্র দেখছি গর্জনরত সেই বাঘের ছবি।

এখন প্রশ্ন– সত্যজিৎ রায় এই বাঘের ছবিকে কেন ব্যবহার করেছিলেন? 

স্বাতন্ত্র্যের সুস্পষ্ট চিহ্নের সন্ধান করতেন সত্যজিৎ রায়। না পেলে, নিজের মনের মতো চিহ্ন তৈরি করে নিতেন। বাঘের এই স্কেচটাই হচ্ছে স্বাতন্ত্র্যের চিহ্ন। তিনি জানতেন ঠিক কোন বিশেষ চিহ্নটা ছবির লোকেশন-কে গোটা পারিপার্শ্বিক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেবে।

বাঘের চিহ্নকেই মরুভূমির মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। এই সামান্য স্পর্শেই হাল্লার মরুভূমি আর শুণ্ডীর মরুভূমি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গিয়েছিল।

মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে গুপী বাঘা। ওদের ঠিক পাশেই বালি ফুঁড়ে মাথা তুলেছে বাঘের মুখের ভাস্কর্য সম্বলিত সেই ছুঁচলো স্তম্ভ

দু’টি রাজ্যের মধ্যে বিরোধ নিয়ে গড়ে উঠেছিল ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ ছবিটি। দুই রাজ্যের দু’রকম মনোভাব। একটি স্বৈরতন্ত্রী। দ্বিতীয়টি উদারপন্থী। 

গুপী ও বাঘা এই দু’টি জায়গাতেই যাচ্ছে। এখানেই চ্যালেঞ্জ। চ্যালেঞ্জ-টা ঠিক কোথায়?

গুপী যে এইমাত্র নতুন কোনও জায়গায় এসে পৌঁছেছে– এটা চোখের পলকে দর্শকদের বুঝিয়ে দিতে হবে। যত দ্রুত বোঝানো যাবে, ফিল্মের গতি ততই বাড়বে।

দুটো দেশই প্রতিবেশী। তাই দুটো দেশেরই ভূপ্রকৃতি একইরকম। তাহলে ওরা যে নতুন দেশে এসে পৌঁছেছে– সেটা আমরা বুঝব কী দেখে?

এই প্রশ্নের একমাত্র উত্তর, দু’টি দেশের জন্য দুটি চিহ্ন তৈরি করতে হবে। আর এই দুটি চিহ্ন দেখতে সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া চাই।

স্বৈরতন্ত্রী দেশের চিহ্ন হল ক্রুদ্ধ বাঘ। উদারপন্থী দেশের চিহ্ন গ্রামীণ মেলা। যেখানেই গর্জনরত বাঘের মুখ, সেটাই স্বৈরতন্ত্রী দেশের অঙ্গ। আর যেখানেই মেলা, সেটা উদারপন্থী দেশ।

মেলার দৃশ্য শুরু হয়েছে অদ্ভুত একটি বাঁশি দেখিয়ে। এই বাঁশির দু’টি মুখ। পৃথিবীর অন্য কোথাও এই রকম দু’-মুখো বাঁশি দেখা যায় না। এই দু’-মুখো বাঁশিটাই পুরো ফিল্মের অন্যান্য সব লোকেশন থেকে উদারপন্থী দেশটিকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দিয়েছে।

এরই সঙ্গে আছে মেলার অন্যান্য উপাদান– ঘুড়ি-লাটাই, পাতলা কাগজের তৈরি তিনকোনা নিশান, ঘুরন্ত নাগরদোলা। পুরো ফিল্ম জুড়ে এই ক’টি উপাদান আর দেখা যায়নি। এইভাবে স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করেছে বলেই এটা সিনেমার পক্ষে আদর্শ একটি লোকেশন।

হাল্লা রাজ্যটাই দাঁড়িয়ে আছে ধূ-ধূ মরুভূমিতে। কোথাও জল নেই। জঙ্গলও নেই। তাই হাল্লায় বাঘও নেই। তা সত্ত্বেও, বিরাট একটা বাঘের মাথা হাল্লার প্রতিনিধিত্ব করছে কেন? 

আসলে হাল্লার প্রাচীন গৌরবকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বাঘের প্রতীকের মাধ্যমে। কীভাবে? 

পৃথিবীতে বাঘের উদ্ভব হয়েছিল মোটামুটি ২০ লক্ষ বছর আগে। আর পশ্চিম রাজস্থানে বাঘ এসেছিল মোটামুটি ১৪ হাজার বছর আগেই। সুতরাং, হাল্লায় বাঘ ছিল ১৪ হাজার বছর আগে থেকেই। 

কিন্তু গুপী আর বাঘা যে সময়ে হাল্লা অভিযানে গিয়েছিল, ততদিনে ওই অঞ্চল থেকে বাঘ লুপ্ত হয়ে গেছে। 

কিন্তু বাঘের গম্ভীর ব্যক্তিত্ব ও দুঃসাহসী বীরত্ব নিয়ে যে গৌরব, আজও তা ভুলতে পারেননি হাল্লার রাজা এবং মন্ত্রী। তাই সর্বত্র বাঘের মাথার ভাস্কর্য বসিয়ে সেই প্রাচীন গৌরবকে পুনর্জীবন দেবার চেষ্টা করা হয়েছে। 

দেশজুড়ে যে তীব্র অনাহার ও অনটন– তাকে ভুলিয়ে দেবার জন্যই লুপ্ত বাঘের এই কৃত্রিম পুনরুত্থান। কৃত্রিম পুনরুত্থান করার চেষ্টাই হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী মনোভাবের অন্যতম প্রধান চিহ্ন। এটাই প্রমাণ করে, হাল্লা স্বৈরতন্ত্রী রাজ্য।

‘সদগতি’-র রাবণ 

আমরা এতক্ষণে জেনে গেছি যে, সত্যজিৎ রায়ের লোকেশন বাছাইয়ের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ছিল তীব্র স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি।

‘সদগতি’ ছবির একটি দৃশ্য

‘সদগতি’ ছবিতে, একই গ্রামের মধ্যে দু’টি আলাদা পাড়া ছিল। একটি শ্রমজীবী মানুষের পাড়া। আর অন্যটি ব্রাহ্মণদের পাড়া। এই ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র দুখী পায়ে হেঁটে চলেছে নিজের পাড়া থেকে ব্রাহ্মণপাড়ায়। মুশকিল হচ্ছে, দু’টি পাড়ারই মাটির রং আর গাছপালা হুবহু একই রকম। এখানেই চ্যালেঞ্জ। কেন?

কারণ, ঠিক কোন মুহূর্তে দুখী ব্রাহ্মণপাড়ায় পা দিল– সেটা কী দেখিয়ে বোঝানো হবে? অদ্ভুত একটি সমাধান ঝিলিক দিয়ে উঠল সত্যজিৎ রায়ের মাথায়।

১৯৮১। সেকালের মধ্যপ্রদেশ। রায়পুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে ভ্রমণ করছেন সত্যজিৎ। উদ্দেশ্য, উপযোগী লোকেশনের সন্ধান। জেলার নানা স্থানে উনি অদ্ভুত একটি মূর্তি দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বিশাল রাবণের মূর্তি।

সত্যজিৎ দেখলেন– যেখানেই এই মূর্তি, সেই জায়গাটাই বিচ্ছিন্ন দেখাচ্ছে। স্বতন্ত্র। খাপছাড়া। তীব্র স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করতে এই মূর্তির কোনও জুড়ি নেই।

তাই হুবহু ওই রকম একটি বিশাল রাবণ সত্যজিৎ তৈরি করালেন। মূর্তি গড়লেন আর্ট ডিরেক্টর অশোক বোস ও তাঁর সহযোগীরা।

এবার, কোথায় বসানো হবে এটা?

নির্বাচিত লোকেশনে, একটি সম্পন্ন পাড়ায় ঢোকার মুখে। 

সেটাই করা হল। ফলে ব্রাহ্মণ-পাড়াটা অন্যান্য এলাকা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। 

ব্রাহ্মণপাড়ার মুখেই দাঁড়ানো রাবণের মূর্তি

এবার, দুখী যখন প্রবেশ করছে ব্রাহ্মণপাড়ায়, তখন আমাদের বিন্দুমাত্র বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না যে এটা অন্য পাড়া। 

এখানে লোকেশনের সন্ধান নিয়ে কথা বলতে গেলে একটা প্রশ্ন উঠবেই। রাবণের ওই বিশাল মূর্তিটা কি শুধুই ব্রাহ্মণপাড়া আর শ্রমজীবী-পাড়ার মধ্যে স্বাতন্ত্র্য বোঝানোর জন্য রাস্তায় বসানো হয়েছিল? আর কোনও গভীরতর সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক কারণ ছিল কি? 

অবশ্যই ছিল। গোণ্ড জনজাতির বিশাল একটি গোষ্ঠী সহস্রাধিক বছর ধরে বসবাস করেন এই রায়পুর জেলায়। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের গহীন অরণ্যের অধিকারী ছিলেন তাঁরাই। সেই অরণ্যের নাম ‘বারওয়ানাপাড়া’। ইতিহাস-ভিত্তিক দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এখনও গোণ্ড জনজাতিই এই অরণ্যের অধিকারী। তাঁদের আরও একটি গুরুত্ব আছে। তাঁরাই ভারতীয় উপমহাদেশের বৃহত্তম নৃ-গোষ্ঠী।

‘সদগতি’ ছবিতে দেখানো রাবণের মূর্তির সঙ্গে গোণ্ড-দের কী সম্পর্ক?

রাবণ হলেন গোণ্ড জনজাতির প্রধান উপাস্য দেবতা। তাই বিশাল বিশাল রাবণের মূর্তি গড়ে সারা বছর তাঁরা উপাসনা করেন। রাবণ তাঁদের কাছে অগাধ জ্ঞান ও অনন্ত প্রতিভার অধিকারী। একইসঙ্গে তিনি ছিলেন শিষ্টাচারে বিশ্বাসী এক শোভন শাসক।

১৯২০ সালে জলরঙে আঁকা রাবণের ছবি। প্রেমচন্দ যে দশকের পটভূমিতে গল্পটি লিখেছিলেন, সেই দশকেই আঁকা হয়েছিল এই ছবি

ঋষি-কবি বাল্মীকির দৃষ্টিতে রাবণ আর গোণ্ড জনজাতির দৃষ্টিতে রাবণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেই কারণেই দুর্গাপুজোর বিজয়া দশমীর বিকেলে যখন দুর্গা প্রতিমা নিরঞ্জনের আগে পথ পরিক্রমায় বেরয়, ঠিক সেই সময় গোণ্ড জনজাতির মানুষরা রাবণ রাজার পুজো করেন। তাই গোণ্ডরা ব্রাহ্মণের বিরোধী সংস্কৃতি।

তা-ই যদি হয়, তাহলে ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রবেশ পথের ঠিক মুখেই রাবণের মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কেন? আর সেই রাবণ কেন দু’ দিকে হাত ছড়িয়ে দুখীকে ব্রাহ্মণপাড়ায় ঢুকতে বাধা দিচ্ছে নীরবে? 

একেই বলা যায়, কাব্যিক পূর্বাভাস। ইংরেজি ভাষায় যাকে বলে পোয়েটিক প্রোফেসি।

সহস্র বছর ধরে সঞ্চিত জ্ঞানের জোরেই রাবণের এই মূর্তি জানত, এই ব্রাহ্মণপাড়া থেকে দুখী আর কোনওদিন জীবন্ত বেরিয়ে আসতে পারবে না। ওখানেই, শুকনো লাল ধুলোয় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকবে দুখীর মৃতদেহ।

রাবণের নীরব সতর্কবার্তা পড়তে পারেনি দুখী। 

রাবণের এই মূর্তি হচ্ছে একটি আর্কিটাইপ– গোণ্ড জনজাতির যৌথ অবচেতনে, সহস্র বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে উঠেছে এই আর্কিটাইপ।

‘সদগতি’ ছবিতে রাবণ আর্কিটাইপের গৌরবান্বিত উপস্থিতিই প্রমাণ করে, লোকেশনে বসানো স্বাতন্ত্র্য-চিহ্ন বা ল্যান্ডমার্ক কীভাবে সত্যজিৎ রায়ের ছবিকে সংযুক্ত করে সহস্র বছরের স্থানীয় ইতিহাসের সঙ্গে।

তবে শুধু রাবণের মূর্তিই কি ‘সদগতি’ ছবিতে গোণ্ড জনজাতির একমাত্র উপস্থিতি? 

প্রৌঢ় গোণ্ড

তা কিন্তু নয়। জীবন্ত একজন গোণ্ডকে দেখানো হয়েছে ছবিতে। দুখী যখন কুড়ুল দিয়ে লোহার মতো দুর্ভেদ্য সেই গুঁড়ি কাটার বিফল চেষ্টা করেই চলেছিল, তখন মধ্যবয়সী একজন গোণ্ড এসে তাকে বারণ করেন। মনে করিয়ে দেয়, দুখীর হাত ঘাস কেটে অভ্যস্ত। লোহার মতো গাছের গুঁড়িতে দাঁত ফোটানোর কোনও অভিজ্ঞতাই দুখীর নেই। 

সুতরাং রাবণের মূর্তি নীরবে যে-কথা বলতে চেয়েছিল দুখীকে, ছবির মধ্যভাগে আবির্ভূত গোণ্ড চরিত্রটি হুবহু সেই একই সাবধান-বাণী উচ্চারণ করেছেন। তবে এবার সরবে। সুস্পষ্ট সংলাপের ভাষায়। সুতরাং, ল্যান্ডমার্ক বা স্বাতন্ত্র্য চিহ্নের প্রতিধ্বনি হচ্ছে সেই ‘গোণ্ড’ চরিত্রটি। তবে এই প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয়েছে রক্তমাংস আর ঘাম দিয়ে।

একই ফ্রেমে গোণ্ড এবং দুখী

‘পথের পাঁচালী’র জোড়া মন্দির

নিশ্চিন্দিপুর গ্রাম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন হরিহর– এটা বোঝানোর জন্য একটি যতিচিহ্ন দরকার। একটা দাঁড়ি বা সেমিকোলন, যেটা গ্রামের সীমান্তকে চিহ্নিত করবে। এটাই হবে গ্রামে প্রবেশ ও গ্রাম থেকে প্রস্থানের ল্যান্ডমার্ক।

‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিতে এই ল্যান্ডমার্ক তৈরির কাজটটা ছিল খুবই সহজ‌। বিরাট বিরাট অক্ষরে ‘জয়তু হীরকরাজ’ আর ‘স্বাগতম’ লেখা বিশাল একটি তোরণের নিচ দিয়ে ঢুকে গেলেই, যে-কেউ বুঝতে পারবে সে হীরক রাজ্যে পা রাখল!

কিন্তু ‘পথের পাঁচালী’র বেলায় ল্যান্ডমার্ক তৈরির কাজটা আদৌ এত সহজ ছিল না। অনটনে ভরা এই গ্রামে ঢোকার মুখে তোরণ তৈরি করে দেবে কে?

অথচ ল্যান্ডমার্ক না দিলে দুর্বল হয়ে পড়বে ছবির ব্যঞ্জনা-শক্তি। কী করা যায় তাহলে?

সত্যজিৎ রায় বেছে নিলেন পাশাপাশি দাঁড়ানো ছোট্ট দু’টি মন্দির। যাকে বলে জোড়া মন্দির। ওরাই হল নিশ্চিন্দিপুর গ্রামের ল্যান্ডমার্ক। ওদের ছাড়িয়ে এগনো মানেই গ্রামের বাইরে পা দেওয়া।

পটে আঁকা শিব ও পার্বতী

হরিহর যেদিন আরও উপার্জনের স্বপ্ন নিয়ে নিজের গ্রাম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন, সেদিন সকালে, কয়েক মুহূর্তের জন্য তিনি দাঁড়ালেন ওই জোড়া মন্দিরের সামনে। দেখলেন, একটু দূরেই খেলা করছে তাঁর ছেলেমেয়েরা– অপু আর দুর্গা।

এই দেখাই ছিল দুর্গাকে তাঁর শেষ দেখা। এরপর তিনি আর মেয়ের মুখ দেখার সুযোগ পাননি। 

দুর্গাকে শেষবার দেখার সঙ্গে অবশ্য জোড়া-মন্দিরের বিশেষ এক ধরনের সম্পর্ক আছে, যার শিকড় প্রোথিত আমাদের পুরাণে। এই জোড়া-মন্দির হচ্ছে কন্যার মৃত্যুর বিরুদ্ধে সর্বজয়ার প্রাণপণ সংগ্রামের ইঙ্গিত। কীভাবে?

মহাদেব শিব ও মা কালীর মন্দির গড়া হয় পাশাপাশি। পুরুষ ও প্রকৃতি। পিতা ও মাতা। এই দুয়ের সম্মিলিত অবদানেই স্থায়ী হয় সংসার। গতিশীল হয় জীবনযাপন।

কিন্তু ছবিতে কী দেখছি আমরা? পুরুষ ও প্রকৃতির সম্মিলিত মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে, বিদায় নিচ্ছেন পুরুষ। প্রকৃতি– অর্থাৎ মা সর্বজয়া– একাই রয়ে গেলেন সংসার প্রতিপালনের দায়িত্ব নিয়ে। পথে পথে বিনা কাজে খেলে বেড়াচ্ছে দু’টি সন্তান।

রান্নাঘরে হরিহর ও সর্বজয়া, যেন মন্দিরে শিব ও পার্বতী

পুরুষের দীর্ঘ অন্তর্ধানের সূচনাকারী ছবিটি সত্যজিৎ রায় তুললেন মহাদেব ও মা কালীর জোড়া মন্দিরের সামনে। সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনুভব করি, বিপন্ন অবস্থায় রেখে যাওয়া হল মাকে।

পাশাপাশি দু’টি মন্দিরেই অধিষ্ঠান করেন শিব ও পার্বতী। আমরা দেখলাম, অপু-দুর্গার বাবা চলে যাচ্ছেন গ্রাম ছেড়ে। দর্শকদের মনের মধ্যে বাসা বাঁধে আছে আবহমান বাঙালি সত্তা। সেই সত্তা জানে, বাড়ি ছেড়ে বাবা চলে যাওয়া মানে, মহাদেব শিব চলে যাচ্ছেন তাঁর যাবতীয় রক্ষাকারী সত্তা সঙ্গে নিয়ে।

অথচ পুরাণে বর্ণিত আছে, শিব না কি ধ্বংসের দেবতা। তাহলে তিনি চলে গেলে পরিবারের সুরক্ষা ভেঙে পড়বে কেন ?

অথচ প্রাণের বহমানতার তত্ত্ব নিহিত আছে ‘শিব’ নামটির মধ্যেই। পুরাণে কথিত আছে, শিব হলেন মহামৃত্যুঞ্জয়। অর্থাৎ, যমকেও পরাজিত করার ক্ষমতা রাখেন তিনি। নেতিবাচক যে কোনও অনুভূতি, এমনকী অকালমৃত্যুর কবল থেকেও শিব অর্থাৎ মহাদেব রক্ষা করেন মানুষকে।

সুতরাং, জোড়া মন্দিরের সামনে থেকে যখন হরিহর চলে গেলেন, চিরাচরিত বাঙালি সত্তা তখনই অশুভ সংকেত অনুভব করল। শিবমন্দিরের সামনে থেকে হরিহরের চলে যাওয়া মানেই বড় কোনও অমঙ্গলের সংকেত। এ যেন স্বয়ং শিবের অন্তর্ধান। সেই সংকেত শেষ পর্যন্ত মূর্ত হল দুর্গার অকালমৃত্যুতে।

শিবমন্দিরের সামনে একাকী দাঁড়িয়ে হরিহর

এভাবেই ‘পথের পাঁচালী’তে, নিভৃত চরণে দেখা দিয়ে যায় বাংলার পুরাণ। এখনও কেউ কেউ আছেন, যাঁরা পৌরাণিক বুনিয়াদ খুঁজেই পান না সত্যজিতের ছবিতে। অথচ গোণ্ড জনজাতির পুরাণ কীভাবে আলোড়িত করেছিল সত্যজিৎ রায়কে– তার দৃষ্টান্ত আমরা দেখিয়েছি ‘সদগতি’ ছবিটি থেকে। এবার দেখালাম বাঙালি পুরাণের বুনিয়াদ।

জোড়া মন্দিরকে সত্যজিৎ রায় যে কত গভীর গুরুত্ব দিয়েছেন, তার প্রমাণ পাই অমোঘ একটি চিত্রকল্পে। সেই শটে আমরা দেখি– পর্দার পুরোভাগে রয়েছে অপু-দুর্গা। বায়োস্কোপের আতসকাচের মধ্যে দিয়ে ওরা দেখছে আগ্রা, দিল্লি, বোম্বাইয়ের ছবি। 

বায়োস্কোপের বাক্সের পটভূমিতে দূরে জোড়া মন্দির

দুই শিশুর পশ্চাৎপটে আমরা দেখি, পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে ছোট দু’টি জীর্ণ মন্দির। তার মধ্যে বাঁ-দিকের মন্দিরটি সদ্য পতি-হারা হয়েছে। শিব-হীন পার্বতী। দেখেই অপ্রত্যাশিত এক শূন্যতায় মথিত হয় আবহমান বাঙালির অন্তঃস্থল।