


প্রবাল দাশগুপ্ত ভাষাতাত্ত্বিক, এস্পেরেন্তো বিশেষজ্ঞ, সারা ভারতে নাম। প্রবাল দাশগুপ্তের পরিচয়ের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হল আন্তর্জাতিক এসপেরান্তো (Esperanto) আন্দোলন। তিনি বিশ্ব এসপেরান্তো সমিতি বা ‘ইউনিভার্সাল এসপেরান্তো অ্যাসোসিয়েশন’ (UEA)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি নিরপেক্ষ ও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে এসপেরান্তোর প্রসারে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: অভ্র বসু
প্রবাল দাশগুপ্ত। গতকাল, ১ জুন, সমাজমাধ্যম থেকে জানলাম ৭২ বছর বয়সে ঘুমের মধ্যে চলে গিয়েছেন। সকালে আর ওঠেননি। গতকালও সমাজমাধ্যমে দেখেছি তাঁর শেয়ার করা পোস্ট। দু’দিন আগে লিখেছিলেন, বিপর্যয়ের বিপরীতার্থক শব্দ হিসেবে ‘সুপর্যয়’ কেমন লাগবে? ভাষা নিয়ে অবিরত চিন্তা করে যাওয়া এক মেধাবীর এই হঠাৎ অন্তর্ধান একেবারেই অবিশ্বাস্য বজ্রাঘাত। আমার ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি শুধু ভাগ করে নিতে পারি। তা বাদে, ভাষা নেই কিছু লেখার।

যে সময়টা সবচেয়ে বেশি করে বোধ করি যুক্তিবাদের বা মুক্তচিন্তার পক্ষে দুশ্চিন্তাজনক, যখন ভারতের বুকে সোচ্চারে ধর্মনিরপেক্ষতা কেউ প্রচার করলে হয় হাস্যাস্পদ হবেন, না হলে হোয়াটাবাউটারির তির্যকতা ধেয়ে আসবে তার দিকে, সে সময়টাই প্রবাল দাশগুপ্ত প্রতিদিন সমাজমাধ্যমে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে নানা ধরনের তথ্য, মতামত ভাগ করে নিচ্ছিলেন। প্রতিদিন। গতকালও করেছেন। সব মতের আপনি সমর্থক না-ই হতে পারেন, কিন্তু তাঁর সচেতনতা ও সক্রিয়তার বিষয়ে কোনও সন্দেহ থাকত না। প্রবালদা এক সদাজাগরূক, সদা মেধাচর্চাকারী মানুষ। অনিদ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকছিলেন আমাদের নানা ঘেঁটে যাওয়া চিন্তার পাশে। সেই মানুষটিই ঘুমের মধ্যে চলে গেলেন, ঘুম থেকে আর জেগে উঠলেন না। এ কেমন আয়রনি, জানা নেই।
প্রবাল দাশগুপ্ত ভাষাতাত্ত্বিক, এস্পেরেন্তো বিশেষজ্ঞ, সারা ভারতে নাম। তিনি কেবল একজন ভাষাবিজ্ঞানী বা ভাষাতাত্ত্বিক ছিলেন না, ছিলেন চিন্তক। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ পড়াতেন পুনেতে ডেকান কলেজে। ১৯৮৯ থেকে ২০০৬ অবধি পড়িয়েছেন হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটে। বিশ্বাস করতেন– ভাষা কেবল ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়, বরং তা মানুষের মুক্তির পথ। প্রবাল দাশগুপ্তের পরিচয়ের একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হল– আন্তর্জাতিক এসপেরান্তো (Esperanto) আন্দোলন। তিনি বিশ্ব এসপেরান্তো সমিতি বা ‘ইউনিভার্সাল এসপেরান্তো অ্যাসোসিয়েশন’ (UEA)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি নিরপেক্ষ ও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে এসপেরান্তোর প্রসারে তাঁর অবদান বিশ্বজুড়ে স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি মনে করতেন, ভাষাগত বৈষম্য দূর করার মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ একে অপরের আরও কাছাকাছি আসতে পারে, আর সেই সেতুবন্ধনের মাধ্যম হিসেবে তিনি এসপেরান্তোকে বেছে নিয়েছিলেন।

প্রবাল দাশগুপ্ত বই লিখেছেন ইংরেজি ও এস্পেরান্তো ভাষায়। লিখেছেন বাংলাতে। বাংলা বইগুলি আমার অল্পবিস্তর উল্টেপাল্টে দেখার সুযোগ ঘটেছে। ‘ছিন্ন কথায় সাজায়ে তরণী’, ‘ভাষার বিন্দুবির্সগ’, আর ‘মেরুর প্রার্থনা বিষুবের উত্তর’। অতি সম্প্রতি, ২০২৬-এ প্রকাশিত ‘সম্বোধনের সন্ধানে’ (বার্ণিক)।
প্রবালদার সঙ্গে আমার আলাপ ২০১৫ বা ’১৬ সালে। যদিও ফিরেছেন হায়দরাবাদ থেকে, রোহিত ভেমুলার বিশ্ববিদ্যালয়ের একদা শিক্ষক, ভেমুলার মৃত্যুর পর তার সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলে চলেছিলেন নিরন্তর। আমাদের কথায়, সেই প্রসঙ্গ বারবার আসত। সেই সময়ে প্রবালদা আমাকে মাদাম শুভা চক্রবর্তীর মাধ্যমে যোগাযোগ করে, দায়িত্ব দিয়েছিলেন ওঁর মা লেখক ও সমাজ-মনোবিদ মানসী দাশগুপ্তর গল্প-উপন্যাস খুঁটিয়ে পড়ে, তাঁকে নিয়ে চর্চা ও লেখার। সেইসব কাজের সূত্রেই যোগাযোগ। ‘দেশ’ পত্রিকায় একদা মানসী দাশগুপ্তর অনেক গল্প বেরত। সেগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। প্রবালদা তাঁর লেখক মা-কে পুনর্নির্মাণ করে চলেছিলেন এক অসামান্য দায় থেকে। আমাকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন সেই দায়ে, নিজেরই উৎসাহের সঙ্গে শামিল করেছিলেন। ফলত তখন আমার কাছে মানসী দাশগুপ্ত এক জীবিত চরিত্র, আর তাঁর সৃষ্ট গোয়েন্দা, মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতার ধারক ‘শমিতা’ চরিত্রও জীবন্ত। মানসীর গল্পবই ‘শমিতার ছক্কা’ বার্ণিক প্রকাশন থেকে বেরনোর ক্ষেত্রে আমি সামান্য কিছু ভূমিকা রেখেছিলাম, সে বহু পরে।

নভেম্বর ২০২২ সালে বার্ণিকের থেকে আমার ‘পীড়াসমূহ’ বইটির উদ্বোধনের দিন প্রবালদাকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলাম। তিনি এসেছিলেন। এক অসামান্য বক্তৃতা দিয়েছিলেন। স্মৃতির কন্দরে চিরদিন তা রাখা থাকবে। কী অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে তিনি নানা মহাদেশের পাঠবস্তুর চলাচল ঘটিয়েছিলেন সেদিন।
ভাষাবিদ প্রবাল দাশগুপ্ত কথিত ওই দিনের তিন আলাদা অ্যানেকডোট লিখে রেখেছিলাম। একটা কাব্যগ্রন্থের নাম কেন ‘পীড়াসমূহ’ হতে পারে, এই প্রশ্ন থেকে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন, এই তিন কাহিনির উল্লেখে। প্রথম, উইট্গেনস্টাইনের ব্যথা-সংক্রান্ত কূট প্রশ্ন। দার্শনিক যখন প্রশ্ন করেন, অন্যের ব্যথা আমি তো আমার শরীরে বুঝি না, কীভাবে প্রমাণ হয় অন্য মানুষ আদৌ আছে, তারা বিভ্রম বা স্বপ্ন নয়, বাস্তবে এগজিস্ট করে? অর্থাৎ প্রশ্নটি দেকার্তীয় সেই ‘আমি চিন্তা করি সুতরাং আমি অস্তিত্ববান’– এই ব্যাসবাক্যের থেকে আর এক ধাপ এগিয়ে যায়। আরও বেশি মানবিক স্তরে এই প্রশ্ন। উত্তরে উইট্গেনস্টাইন বলেছিলেন, সামনে আরেকজন মানুষ, যে কেউ, খুব ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে যখন, তখন কি তুমি সফলভাবে কল্পনা করতে পারো, লোকটার ব্যথা নেই? পারো না তো? তাহলে আর আলাদা প্রমাণ কেন চাই? এমপ্যাথি মানবিক গুণ। এবং মানুষমাত্রেই ব্যথা বুঝতে পারে, অন্যের ব্যথা। তা-ই প্রমাণ করে, আমি যেমন আছি, অন্যেরাও আছে। কী মারাত্মক এই গল্পটি!

দুই, প্রবালদা বলেছিলেন, এক ভারতীয় ভাষাবিদ নিজের চোখে দেখলেন প্রতিবেশীদের বাড়ি পোড়ার ঘটনা। পরের দিন অনুবাদ কর্মশালায় বলেছিলেন, অনুবাদকের কাজ হল নিজের বাড়ি পুড়ে গেলে অন্য ভাষার ভেতরে আরেকটা ঝুপড়ি গড়ে নেওয়া।
তিন, কোনও এক বিদেশিনীর লেখা বা বক্তৃতা থেকে যে গল্পটা তুলে এনেছিলেন প্রবালদা। ভূমিকম্পের পরদিন একটা নতুন ডায়েরি পেলে মানুষ কিছুই লিখতে পারে না। কারণ তার অতীত আর ভবিষ্যতের কোনও ইভেন্ট আর থাকে না লেখার মতো। ডায়েরিতে আমরা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা লিখি, অথবা আগের দিনের ঘটা দৈনন্দিনতা। একটা গৃহহারা করা ঝাঁকুনির পর আর ডায়েরি লেখা যায় কি?
এই তিন গল্প তো এক সুতোয় আছে। প্রবালদা তিনটিই ‘পীড়াসমূহ’ নামের রেফারেন্সে বলেছিলেন। সেদিনের ওই অনুষ্ঠানে যাঁরা ছিলেন, প্রত্যেকে অভিভূত হয়েছিলেন ওই বক্তব্যে।

প্রবাল দাশগুপ্তের বাংলা প্রবন্ধের বই থেকে সচরাচর উদ্ধৃত করেছি নিজের আলোচনায়। এত স্পষ্ট করে তিনি অধুনান্তিক এলাকা প্রবন্ধে বুঝিয়েছিলেন বিষয়টিকে, নিজের নারীবাদী এলাকা নিয়ে খোঁজ অনেক সহজ হয়েছিল তাঁর ওই ব্যাখ্যায়। নারীবাদ আলাদা কোন বাদ নয়, নারী অনেক মার্জিনাল বা প্রান্তিকের একটি, এবং অন্য অন্য ক্ষেত্রে এই একই প্রান্তিকতা ক্রিয়াশীল। প্রবালদা বলেছিলেন–
“জীবের সঙ্গে জীব মিলেমিশে যে ডাঙায় জীবনের যৌথতা চালায় সেই চলাচলের ক্ষেত্রই ‘অঞ্চল’। আলাদা এক খণ্ড ভিটেমাটি বলে সে ডাঙাকে যদি চাক্ষুষ চেনা না যায়, তাহলেও। যে কোনও অঞ্চলেরই ন্যূনতম একটা আত্মশক্তি চিহ্নিত সার্বভৌমতার দরকার থাকে।
যেমন ধরুন নারীবাদ যে সম্ভব হচ্ছে তার কারণ, মেয়েরা এই অর্থে একটা অঞ্চল। তাঁরা যে আলাদা কোনো ভূখণ্ডে থাকেন না, পুরুষদের সঙ্গে এক বাড়িতে এক পাড়ায় এক দেশেই থাকেন, সেটা নারী অঞ্চলের সংহতির অন্তরায় নয়। নারী অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য চাওয়া মানে ছেলেদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ভূমিতে থাকতে চাওয়ার অলীক কল্পনা নয়। মেয়েদের স্বাভাবিক স্বপ্নের পূরণ দাবিরই পরিস্ফুট রূপ। যে পরিস্ফুটনের ধরনটা অধুনান্তিক পর্বের আঞ্চলিকতার লক্ষণে চিহ্নিত।” (প্রবাল দাশগুপ্তের ‘অধুনান্তিক এলাকা’ প্রবন্ধ থেকে)

১৯৫৩-তে জন্ম, ঐতিহাসিক অরুণকুমার দাশগুপ্ত ও সমাজমনস্তত্ত্বের বিশেষজ্ঞ, শ্রীশিক্ষায়তন কলেজের একদা অধ্যক্ষ মানসী দাশগুপ্তের পুত্র প্রবাল দাশগুপ্তকে, বুধসমাজ, অধ্যাপকসমাজ যে গভীর বৈদগ্ধ্যের পরিচয়ে চেনেন, তার কিছুমাত্র আমার অধীত না হলেও, এটুকু বুঝি, আজকের এই ক্ষতি ও ক্ষয় আমাদের সবার। পরিশীলিত বাঙালি বলতে যে ক’জনকে চিনতাম, তাঁদের আরও একজন চলে গেলেন। ক্রমশ ছায়াহীন আমরা।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন যশোধরা রায়চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved