


সোশাল মিডিয়া, ইন্টারনেট আমাদের বিশ্ব্যব্যাপী জুড়ে দিলেও আদতে গৃহবন্দি করেছে। ক্যাপিটালিজমের কাছে এ এক মারণাস্ত্র। ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ বাড়তে বাড়তে এখন আমরা প্রকৃতই একা। অবসাদ আমাদের গ্রাস করে। মনে হয়, বোঝার মতো, শোনার মতো, পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। ফলে সহজেই মেনে নিই সমাজের আরোপিত সমস্ত নিয়ম। প্রশ্ন করি না। ভিতরের চাপা আর্তনাদ হারিয়ে যায় সভ্যতার ‘ব্যাকরুমস’-এ।
শার্লক ব্রিটেনের প্রেসিডেন্টের নাম জানতেন না। অথচ ‘সয়েল সাইন্স’, ‘ফরেন্সিক’, ‘হিউম্যান বিহেবিয়র’-এর মতো বিষয়ে অনায়াস যাতায়াত। জটিল থেকে জটিলতম সমস্যার সমাধান গড়গড় করে বলে দিতেন। তাহলে একজন সভ্য দেশের দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে শার্লক কেন প্রেসিডেন্টের নাম জানবেন না? আসলে প্রেসিডেন্ট সংক্রান্ত তথ্যটি ওঁর কাছে অপ্রয়োজনীয় ছিল!
পাঠক, উত্তেজিত হবেন না। শার্লক-কে কেউ দেশদ্রোহিতার অভিযোগে কেস-টেস দেয়নি। শার্লকের মতে, মানুষের মস্তিষ্ক আদতে একটি বিরাট খালি ঘর। এবং সেখানে জমতে থাকা স্মৃতি, তথ্য এক একটি আসবাবের মতো। ফলে, অপ্রয়োজনীয় আসবাবে ঘর না ভরানোই বাঞ্ছনীয়। ২০২৬ সালে ‘ব্যাকরুমস’ ছবিতে এই তত্ত্বের চরমতম প্রতিফলন দেখলাম। বলাই বাহুল্য, ছবিটি নিয়ে গোটা বিশ্বের সিনেপ্রেমীদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ছবির প্রযোজক ‘A24 Films’ মাত্র ২০ বছর বয়সি কেন পারসন্স-কে এই ছবির পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিল। ‘ব্যাকরুমস’ কেনের প্রথম ছবি। এবং ‘A24 Films’-এর ব্যানারে কনিষ্ঠতম সফল পরিচালক।

ছবির বিষয় কী?
স্পয়লার না দিয়ে বলার চেষ্টা করি। ১৯৯০ সালের জুন মাস। ক্লার্ক একজন অসফল স্থপতি। পেটের দায়ে ফার্নিচারের দোকান চালায়। দোকানের বিজ্ঞাপনী ফিল্মে কাস্টমার টানতে নিজেই সাজে ‘পাইরেট ক্লার্ক’। দেয় আকর্ষণীয় সব অফার। এদিকে বৈবাহিক জীবনও তার বিপর্যস্ত। পারিপার্শ্বিক চাপে ক্রমাগত মদের নেশায় তলিয়ে যাচ্ছে বুঝে, দারস্থ হয় থেরাপিস্ট মেরি ক্লিনের।
দাম্পত্য কলহের জেরে রাতে বাড়ি ফেরা হয় না ক্লার্কের। নিজের দোকানেই রাত কাটায়। আচমকা দোকানের দেওয়ালে আবিষ্কার করে লম্বালম্বি সরু ফাটল। যেন কেউ চিড়ে দিয়েছে। আর সেই সরু ফাটল থেকে ঠিকরে বেরচ্ছে উজ্জ্বল আলোকরশ্মি! এখন ইতিহাস বলে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই আমাদের আরও বেশি করে যেতে হয়। ক্লার্কও এগিয়ে যায় দেওয়ালের দিকে। হাত ঠেকাতেই বুঝতে পারে দেওয়ালটি ভেদ করা সম্ভব। পিলে চমকে যায় প্রথমে। তারপর চারা দেয় অদম্য কৌতহল। দেওয়ালের ওপারে কী আছে? ভেদ করে অপরদিকে যেতেই, আবিষ্কার করে কয়েক হাজার বর্গফুটের ফাঁকা স্পেস, ল্যাবিরিন্থের মতো ছড়িয়ে। যেন বেশ কয়েকবছর ধরে ফেলে রাখা ফাঁকা একটা অফিস প্লেস হাঁ করে চেয়ে আছে ওর দিকে!

হলুদ দেওয়াল, সিলিংয়ে পরপর বসানো অগণিত ফ্লুরোসেন্ট আলো এবং নানা জায়গায় জড়ো করা বিভিন্ন রকমের আসবাব; একাংশ পড়ে থাকতে থাকতে স্পেসের ফ্লোরের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। এই সবকিছু ক্লার্কের চোখের সামনে এক কুহকের নির্মাণ করে। যাকে বলা হয়েছে ‘ব্যাকরুমস’। সাময়িক বিস্ময় কাটিয়ে ক্লার্ক ফিরে আসে নিজের ডাইমেনশনে; দোকানে। পরদিন দ্বারস্থ হয় মেরির। ক্লার্কের ব্যাখ্যা মেরির কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। আহত ক্লার্ক ঠিক করে, প্রমাণসমেত ফিরবে। তারপর একদিন মেরি ক্লার্কের তরফে একটি মেসেজ রিসিভ করে যে, সে আর ‘ব্যাকরুমস’ থেকে ফিরবে না! মেরি তার ক্লায়েন্টের খোঁজে চলে আসে ক্লার্কের দোকানে। প্রবেশ করে ‘ব্যাকরুমস’ নামক এই ল্যাবিরিন্থে…।
আলোচনা চালিয়ে যেতে এটুকু বিবরণ পাঠকের জন্য যথেষ্ট।
এখন প্রশ্ন হল, এই ‘ব্যাকরুমস’ এল কোথা থেকে?
সোশাল মিডিয়ায় প্রয়োজনীয়তা, আদতে বিকিকিনি, ট্রোলিং, হেট স্পিচ, শেমিং ছাড়া এ-কোনও কম্মে লাগে কি না– এসব নিয়ে নানা চর্চা রয়েছে। তবে, একটা গোটা প্রজন্মের কাছে এই সমাজমাধ্যম একটি অল্টারনেট সমাজব্যবস্থা। সমাজমাধ্যম দ্বারা বহু মানুষের চেতনা প্রভাবিত। এবং এর ব্যাপ্তি অসীম। এখানে প্রতিদিন নির্মাণ, বিনির্মাণের খেলা চলে। নতুন নতুন ট্রেন্ড আসে। মানুষ সেই ট্রেন্ডে গা ভাসায়। আমাদের অজান্তে অনেক গল্পের জন্ম হয়। এবং সেই গল্প ক্রমে মিথ হয়ে যায়। তেমনই এক মিথ এই ‘ব্যাকরুমস’।
জাপান ১৯৯৬ সাল নাগাদ ‘Imageboard’ নামে একটি ইন্টারনেট ফোরাম চালু করে। যেখানে প্রোফাইল খোলা, নিজের ইনফরমেশন দেওয়ার কোনও ঝামেলা নেই। আপনি চাইলেই এখানে ঢুকতে পারেন। তবে শর্ত একটাই। কনভারসেশন শুরু হবে আপনার পছন্দের একটি ইমেজ পোস্ট করার মাধ্যমে। ‘4chan’ এই ধরনের একটি ‘Imageboard’। ২০১৯ সালে এই প্ল্যাটফর্মে একজন ইউজার একটি ছবি পোস্ট করে– হলুদ দেওয়াল, ফ্লুরোসেন্ট আলোতে মোড়া একটি পরিত্যক্ত অফিসের ইন্টিরয়র– অসম্ভব ফাঁকা একটি স্পেস। ছবির নিচে অন্য একজন ইউজার কমেন্ট করেন– “If you’re not careful and you noclip out of reality in the wrong areas, you’ll end up in the Backrooms, where it’s nothing but the stink of old moist carpet, the madness of mono-yellow, the endless background noise of fluorescent lights at maximum hum-buzz, and approximately six hundred million square miles of randomly segmented empty rooms to be trapped in.”
এখান থেকেই একটি ট্রেন্ড তৈরি হয়। ইউজাররা প্রায় বাস্তবে দেখা নানা লোকেশনের ছবি দিতে শুরু করে, যা আপাতদৃষ্টিতে দেখলে গায়ে শিরশিরানি লাগে। ভয় করে। আপনার চেনা চৌহদ্দির মধ্যেই লুকিয়ে থাকা একটি স্পেস, হয়তো আপনার আড়ালে থেকে গিয়েছে। হঠাৎ করে একদিন আবিষ্কার করলেন। কোনও পরিত্যক্ত বাড়ি, ফাঁকা মাঠ, পুরনো গির্জা, চিলেকোঠার ঘর, কোনও নির্জন হাসপাতালের করিডোর– যেখানে আপনি একা যেতে মোটেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন না। এই জায়গাটিকে আপনি বলতে পারেন– ‘ব্যাকরুমস’, যা কি না ‘লিমিনাল স্পেস অ্যাস্থেটিকস’-এর একটি অংশ।

এবার প্রশ্ন আসে, ‘লিমিনাল স্পেস অ্যাস্থেটিকস’ কী?
সহজভাবে, কোনও খুব পরিচিত জায়গায়, অফিস করিডোর বা হোটেলের করিডোর কিংবা কোনও বাড়ির বারান্দা, ফাঁকা ঘর। কিন্তু দেখলেই গা ছমছম করবে। চট করে একা যেতে ইচ্ছে করবে না। একা দাঁড়িয়ে থাকতে ভয় করবে। আশেপাশের বাতার ভারী হয়ে আসবে। মনে হবে পরাবাস্তবে রয়েছেন আপনি। মনে হবে দুই পৃথক ডাইমেনশনের মধ্যবর্তী শূন্যতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। এ-ধরনের জায়গা আমরা অনেকেই দেখেছি। মনে করুন, স্ট্যানলি কুবরিক পরিচালিত ‘দ্য শাইনিং’ ছবির সেই ফাঁকা হোটেল, সিনেমায় লং শটে দেখা বিরাট করিডোর। তার এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আপনি অন্য প্রান্তে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আপনার একসময় মনে হতেই পারে– আপনি দুটো রিয়েলিটির মাঝামাঝি কোথাও একটা হারিয়ে গিয়েছেন বা বাচ্চা-ছেলেটি যখন করিডোর দিয়ে একটানা সাইকেল চালাতে থাকে, আর ক্যামেরা ওকে ফলো করে চলে, অচিরেই আমরাও বাচ্চাটির সঙ্গে এক গোলকধাঁধায় হারাতে থাকি। চেনা পরিচিত হোটেল করিডোর আমাদের মনে ভয় ধরায়।

‘Journal of Environmental Psychology’-তে ‘Uncanny Valley effect’ হাইপোথিস এই ‘লিমিনাল স্পেস’ বোঝাতে কিছুটা সাহায্য করতে পারে। রোবটিক্স নিয়ে রিসার্চ করতে গিয়ে বিজ্ঞানী মাসাহিরো মোরি লক্ষ করেন, কোনও রোবটকে কিছুটা মানুষ-সদৃশ দেখতে হলে, মানুষের মনে রোবটটির জন্য ইমোশন এবং এমপ্যাথি বাড়ে। আবার, এই সাদৃশ্য যদি একেবারে পারফেকশনের কাছাকাছি চলে আসে, তখন সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। এমপ্যাথি কমে। এখান থেকেই ‘Uncanny Valley effect’-এর জন্ম। ঠিক একইভাবে বলা হচ্ছে, কোনও স্থানের সঙ্গে কোনও মানুষ কতটা একাত্মবোধ করবেন, তার ওপর নির্ভর করছে– সেই মানুষটির ইমোশনাল রেসপন্স।
‘ব্যাকরুমস’ নিজের মতো করে বিবর্তিত হতে থাকে ইন্টারনেটের জগতে। নিত্য নতুন কল্পনা, নিত্য নতুন গল্প। কী কী হতে পারে এই ধরনের স্পেসে, যদি কোনও মানুষ দুম করে ঢুকে পড়েন। সেখানে কী কোনও ধরনের ভূত থাকার সম্ভবনা রয়েছে? ভাবলে অবাক হবেন, এই ‘ব্যাকরুমস’-কে ঘিরে এক বিরাট সংখ্যক মাল্টিপ্লেয়ার সার্ভাইভাল ভিডিও গেমস তৈরি হয়েছে। সে-সব গেমারদের মধ্যে রীতিমতো জনপ্রিয়। এসবের মধ্যেই মাইলফলক– ২০২২ সালে, কেন পারসন্স নির্মিত ‘Creepypasta’ জঁরের অন্তর্গত ওয়েব সিরিজ ‘ব্ল্যাকরুমস’।

এখন প্রশ্ন হল, ‘Creepypasta’ কী?
একটি বিশেষ হরর স্টোরির জঁর, যা তৈরি হয়েছে মূলত ‘Imageboard’ ওয়েবসাইটগুলোকে ভিত্তি করে। ট্রাডিশনাল হরর স্টোরি থেকে এই গল্পগুলো আলাদা হওয়ার কারণ, এগুলো কোনও নির্দিষ্ট লেখকের লেখা নয়। ইমেজবোর্ড ইউজাররা নিজের মতো করে এগুলো কপি এবং পেস্টের মাধ্যমে পোস্ট করেন এবং প্রয়োজনে এতে নিজেদের মতো করে প্লটের বদল ঘটান। আর্বান লেজেন্ডধর্মী এই গল্পগুলো বাস্তব এবং অবাস্তবের মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম পার্থক্য মুছে দেয়। এমনভাবে লেখা হয়, যেন বাস্তব জীবনে এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। যেমন, ‘ব্যাকরুমস’-এর ক্ষেত্রে সময় ধরে নেওয়া হয়েছে ১৯৯০ সালের জুন মাস। কারণ, ১৯৯০ সাল বা তার আগের সময়কালের সমস্ত ঘটনা ইন্টারনেটে আর্কাইভ করা নেই। রেকর্ড করা নেই। ফলে সেখানে একটি লোকগাথাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সহজ। একসময় স্রেফ ‘কপি পেস্ট’ পন্থায় এই গল্প নেটদুনিয়ায় ঘুরত বলে, এর নাম– ‘Copypasta’, তারই বিবর্তিতরূপ ‘Creepypasta’। ফলে এই গল্পগুলোকে বলাই যায় আন্তরজালের লোককথা। এই লোককথার অভ্যন্তরে বেশকিছু পপুলার চরিত্রও রয়েছে। যেমন– ‘Jeff The Killer’, ‘Slender man’, ‘Eyeless Jack’, ‘Ben Drowned’। নেট সার্চ করলেই খোঁজ মিলবে।
ফিরে আসি, ‘ব্যাকরুমস’ ওয়েব সিরিজটির কথায়।
২৪ এপিসোডের এই ‘Creepypasta’-ধর্মী সিরিজটি কেন নিজেই অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তৈরি করেন এবং ইউটিউবে রিলিজ করেন ২০২২ সালে। তুমুল জনপ্রিয় হয় সিরিজটি। বর্তমানের বুকে ভবিষ্যতের মিথের জন্ম হয়। এই জনপ্রিয়তার পর থেকেই কেন ধীরে ধীরে ছবি তৈরি করার কথা ভাবেন। যার ফলস্বরূপ, ২০২৬-এ ‘ব্যাকরুমস’-এর মতো একটি সফল সিনেমা উপস্থাপন।

‘ব্যাকরুমস’কে কোন জঁরে ফেলা যায়? ইদানীং কালে মানুষ এত বেশি সিনেমা, সিরিজ দেখছেন, জঁরের ছকগুলো তাদের একেবারেই চেনা হয়ে গিয়েছে। ফলে, গল্প শুরুর আগেই সিনেমা ফুরিয়ে যাচ্ছে। অনেক খেটেখুটে যত্ন নিয়ে বানানো সিরিজ, সিনেমা একঘেয়ে লাগছে। অনেক নির্মাতাই সেক্ষেত্রে জঁর ব্লেন্ড করে ছবি তৈরি করছেন। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
‘Creepypasta’ গল্পকে ভিত্তি করে ছবিটি একইসঙ্গে একটি অসাধারণ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, সাই-ফাই; ফাউন্ড ফুটেজ, অ্যানালগ হরর, লিমিনাল স্পেস হররের মতো হরর সাবজঁরগুলোর মিশেল। ছবিতে ভয় তৈরির ক্ষেত্রে কোথাও কোনও জাম্প স্কেয়ারের ব্যবহার নেই। ব্যবহার নেই মাত্রাতিরিক্ত ভায়োলেন্সের। কোনও রাক্ষস-খোক্কসও এক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হয় না। তবে ভয়ের ছবিতে ভয় পাবেন কী করে? পিটার ব্রুক তাঁর বিখ্যাত ‘The Empty Space’ গ্রন্থে বলেছেন, ভয়ের জন্য শুধু একটি ফাঁকা স্পেস প্রয়োজন। একজন অভিনেতা তার দক্ষতায় সেই স্পেসটিকে স্টেজে পরিণত করবে। ‘ব্যাকরুমস’-এর ক্ষেত্রে পরিচালক কেনের হাতিয়ার সেই ফাঁকা স্পেস। তা দিয়ে ভয় নির্মাণ করেছেন তিনি।

‘ব্যাকরুমস’ দৃশ্যত একটি বিরাট অন্তহীন ফাঁকা স্পেস হলেও, তা জনমানবশূন্য। এবং এই শূন্যতাই ভয়ের কারণ। রাতের বেলা, হঠাৎ করে নিজের অফিসের মধ্যেই একটি অচেনা অন্তহীন স্পেসের ভিতর ঢুকে পড়েন ক্লার্ক। ক্যামেরা যেদিকেই ঘোরে পানসে হলদেটে দেওয়াল। আর ফ্লুরোসেন্ট লাইট থেকে ভেসে আসা gain-এর শব্দে কান ধরে আসে। কোথাও কোথাও সারি সারি দরজা। দরজা দিয়ে ভিতরে ঢুকলে আবার একটা বিরাট ফাঁকা স্পেস। আবার দরজা! আবার স্পেস! কোথাও খামচে ধরা অন্ধকার। কোথাও দেওয়ালগুলো খুব কাছাকাছি এসে সরু গলির মতো একফালি পথ তৈরি করেছে। সেই পথে চলতে গেলে দমবন্ধ হয়ে মরে যাওয়ার সম্ভবনা ১০০ শতাংশ।

প্রায় ৩০,০০০ বর্গফুটের একটি সেট নির্মাণ করা হয়েছিল ‘ব্যাকরুমস’-এর জন্য। আর্ট ডিরেক্টরের কাজ কেন নিজেই সামলেছেন। ‘Blender’ নামক অ্যানিমেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করে এই বিরাট ল্যাবিরিন্থ নির্মাণ করেছেন তিনি। সঙ্গে করেছেন শট ডিজাইন। পাশে পেয়েছেন দক্ষ প্রোডাকশন ডিজাইনার ড্যানি ভারমেট-কে। প্রায় ২,৯০০ হাজার বর্গফুট ওয়ালপেপার ব্যবহার হয়েছে সেট ডেকরেশনের জন্যে। চৌকো দেওয়াল এবং দরজা ছাড়াও ক্লস্ট্রোফোবিয়া, ভয়, উত্তেজনা তৈরির জন্য এমন কিছু অংশ রয়েছে, যেখানে দেওয়াল বেয়ে ওঠা-নামা যায়। রয়েছে বেশ কিছু র্যাম্প ও চড়াই-উতরাই। অফিস স্পেস পেরিয়ে আরও গহিনে রয়েছে বিরাট বড় ফাঁকা সুইমিং পুল এরিয়া এবং চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নানা ধরনের স্তূপীকৃত আসবাব।

জ্যামিতির দিক থেকে দেখতে গেলে, গোটা সেট নির্মাণে চতুষ্কোণ ব্যবহার হয়েছে। কোথাও সার্কেল বা হাফ সার্কেল শেপ দেখা যায় না। এই চতুষ্কোণ রিপ্রেজেন্ট করে অর্ডার। স্টেবিলিটি। গোটা সেটে কোথাও কোনও কোমলতার ছাপ নেই। ফলে ভিজুয়াল রিলিফের জায়গা থাকে না। আমাদের অজান্তেই আমাদের মনের ভিতরে এই কঠোরতা ভয়ের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে আবার যখন ক্লার্কের খোঁজে মেরি ‘ব্যাকরুমস’-এ প্রবেশ করে সেটের স্ট্রাকচার জটিলতর ও লেয়ারড হতে শুরু করে।
ক্লার্কের ক্ষেত্রে ‘ব্যাকরুমস’ মোটামুটি একটি তলেই অবস্থিত। সেখানে নানা ধরনের চড়াই-উতরাই রয়েছে। রয়েছে গলিঘুঁজি। তবে মেরির ক্ষেত্রে আমরা দেখি ব্যাকরুমস বহুতলের আকার নিয়েছে। সেখানে সিঁড়ি তৈরি হচ্ছে এবং অবশেষে আমরা দেখতে পাই, পাইরেট ক্লার্কের একটি বিকৃত প্রায় আট থেকে দশ ফুট উঁচু অবয়ব, যা ক্লার্ক এবং মেরিকে মারতে বেরিয়ে আসে ‘ব্যাকরুমস’-এর জমাট অন্ধকার থেকে। তাকে দেখে যতটা না ভয়ের উদ্রেক হয়, তার থেকেও বেশি অস্বস্তি হয় মনে।
‘ব্যাকরুমস’-এ অবশ্যই দর্শক শেষ অবধি ঠোঁট কামড়ে বসে থাকবে, এই পাইরেট ক্লার্কের হাত থেকে মেরি আর ক্লার্ক বেঁচে ফিরতে পারে কি না, তা জানার জন্য। এছাড়াও কয়েকজন মানুষকে আমরা দেখতে পাব এই ল্যাবিরিন্থের ভিতর। এরা অনেকদিন আগে থেকেই এই ‘ব্যাকরুমস’-এর ভিতরে আটকে গিয়েছে। থাকতে থাকতে ফার্নিচারের মতোই দশা হয়েছে ওদের। কেউ কেউ চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে ফার্নিচারের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। খুব কাছ থেকে দেখলে দেখা যাবে, এই মানুষের মতো দেখতে এনটিটিগুলোর চোখ-নাক-মুখ, সবকিছুই ডিস্টর্টেড। এদের শরীরগুলো রক্তমাংসের মতো হলেও রক্তমাংসের নয়। মারুন, কাটুন রক্ত ঝড়বে না। এবং সব থেকে বড় ব্যাপার চাইলে এদের খাওয়া যায়! একটি বিশেষ দৃশ্যে, একজনেরর পেট খুবলে কিছু অংশ বের করে নেওয়া হয়, যা মাংস নয় বরং তুলো বা কেকের মতো কোনও পদার্থ।

আপনি যত দেখেন, ততই এই ‘ব্যাকরুমস’ আপনাকে টেনে নেয় গহ্বরের ভিতর। ভয় ও কৌতূহলে আপনি তলিয়ে যান অন্ধকারে। যেহেতু ‘ব্যাকরুমস’ আন্তর্জালের লোককথা। লেখার ক্ষেত্রে, উইল সোডিক যথার্থভাবেই লোককথাটিকে সিনেমার রূপ দিয়েছেন। মূল দুই চরিত্র এবং তাদের ইন্টারনাল কনফ্লিক্ট ‘ব্যাকরুমস’-এ ওতোপ্রোতভাবে মিশে যায়। মিউজিকের ক্ষেত্রে পরিচালক কেনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন কানাডিয়ান কম্পোজার এডো ভান ব্রিম্যান।
১৯৯০-এর প্রেক্ষাপটে তৈরি ‘ব্যাকরুমস’-এর ভিতরে যদিও স্থান-কালের কোনও ঠিক নেই। তবুও নয়ের দশকের সেই আমেজ ধরা থাকে ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে। ছবির বেশিরভাগ সময় আমরা মুখ্য চরিত্রদের সঙ্গে ‘ব্যাকরুমস’-এ। ফলে মিউজিকের ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক থিম ব্যবহার না-করে একক নিরবিচ্ছিন্ন আবহের নির্মাণ করা হয়েছে, যা যুক্তিযুক্ত মনে হয়।
‘ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি’– জেরেমি কক্স, এর আগে ‘Longlegs’ (২০২৪) নামে একটি সফল হরর ছবি ছাড়াও অন্যান্য ছবিতে কাজ করেছেন। এ-ছবিতেও ‘ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স’-এর ব্যবহারে গোটা সেটকে ক্যামেরাবন্দি করা ও সেই সঙ্গে ফ্লুরোসেন্ট আলোর ব্যবহারে একটি দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছেন। চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে ‘ওয়াইড অ্যাঙ্গেল’ ভেঙে যেখানে ‘ফাউন্ড ফুটেজ’ স্টাইলের মতো ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানে লাইট সোর্সের পরিমিত ব্যবহার দেখা গিয়েছে। ‘অ্যাস্পেক্ট রেসিও’ কমিয়ে এনে পরিবেশকে আরও বেশি করে ক্লস্ট্রোফোবিক করে তোলা হয়েছে।
Chiwetel Ejiofor ক্লার্কের চরিত্রে এবং Renate Reinsve, থেরাপিস্ট মেরি ক্লিনের চরিত্রে অসম্ভব ভালো। রেনেট এবং তাঁর ম্যানেজিং এজেন্সির চিত্রনাট্য নির্বাচনের দক্ষতাও প্রশংসনীয়।
![]()
‘ব্যাকরুমস’ দেখতে দেখতে আমার মনে পড়ে যায় তারকভস্কি-র কালজয়ী ছবি ‘সোলারিস’-এর কথা। সেখানে সোলারিস গ্রহের মধ্যে ছিল একটি সমুদ্র। এই সমুদ্র জল দিয়ে নয়, জেল জাতীয় কোনও পদার্থ দিয়ে তৈরি। এবং এই সমুদ্র ছিল জীবন্ত। তার নিজের ভাবার ক্ষমতা ছিল। সে চাইলে মানুষের মনের অবচেতনে লুকিয়ে থাকা নানা রকমের ইচ্ছেকে বাস্তবের অবয়বে নামিয়ে আনতে পারত। যেমন গল্পের নায়ক কেলভিনকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তার স্ত্রী। যদিও সেই স্ত্রী জ্যান্ত মানুষ নয়। সে কেলভিনের অবচেতনের প্রতিফলন।
এছাড়াও সেই সমুদ্রে মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল ঢেউ তৈরি হত। সেই ঢেউয়ের ওপর তৈরি হত শহর। কিছুক্ষণ স্থায়ী হয়ে আবার মিলিয়ে যেত গর্ভে। প্রথমত, তারকভস্কির ছবিতে আছে ব্যাপ্তি। সেখানে মহাকাশও ব্যাপ্তি বোঝায়, সমুদ্রও ব্যাপ্তি বোঝায়। কেলভিন যাত্রা করে সোলারিসে– অজানাকে জানতে। নতুন সম্ভবনার উদ্দেশ্যে। সমুদ্রের সঙ্গে ক্রমাগত যোগাযোগ স্থাপনের কাজ চালিয়ে যায় বৈজ্ঞানিকরা, স্পেস সেন্টার থেকে।

‘ব্যাকরুমস’-এর ক্ষেত্রে সেটের ব্যাপ্তি কেবলই অন্তহীন, অর্থহীন শূন্যতা বলে মনে হয়। মহাকাশ কেন, এক চিলতে সূর্যের আলো নেই। জল নেই। সবুজ নেই। দমবন্ধ অফিস, করিডোর, সুইমিং পুল। সোলারিসের স্পেস স্টেশনের সেট ডিজাইনের ক্ষেত্রে শুধু চতুষ্কোণ নয়, সার্কেল আছে। কোথাও কোথাও স্পেস স্টেশনের করিডোরগুলো বেঁকে একটা হাফ সার্কেলের শেপ নিয়েছে। ফলে দৃশ্যত আপনি একটি রিলিফ পাচ্ছেন। সার্কেল রিপ্রেজেন্ট করে ইনফিনিটি, একতা, পরিপূর্ণতা। ছবি শেষ অবধি দেখলে বোঝা যায়, এ-ছবি সম্পর্ককে বোঝার, পাশের মানুষকে বোঝার। উল্টোদিকে ‘ব্যাকরুমস’-এর চতুষ্কোণ তৈরি করে বিচ্ছিন্নতা। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের সেই পরিচিত গান– ‘পৃথিবীটা নাকি ছোটো হতে হতে/ স্যাটেলাইট আর কেবেলের হাতে/ ড্রয়িং রুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী’ অথবা Malvina Reynolds-এর লেখা, পিট সিগারের গলায় গান– ‘Little Boxes’-এর মতো। টপ শটে দেখলে বহুতলগুলোকে দেশলাই বাক্সের মতো দেখায়। আমরা যারা ভিতরে থাকি, অনেক সময় বলি– পায়রার খোপ।
সোশাল মিডিয়া, ইন্টারনেট আমাদের বিশ্ব্যব্যাপী জুড়ে দিলেও আদতে গৃহবন্দি করেছে। ক্যাপিটালিজমের কাছে এ এক মারণাস্ত্র। ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ বাড়তে বাড়তে এখন আমরা প্রকৃতই একা। অবসাদ আমাদের গ্রাস করে। মনে হয়, বোঝার মতো, শোনার মতো, পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। ফলে সহজেই মেনে নিই সমাজের আরোপিত সমস্ত নিয়ম। প্রশ্ন করি না। অন্যের বাড়ি ভাঙছে দেখতে দেখতে রোববার সকালে গরম গরম লুচি আর সাদা আলুর তরকারির সঙ্গে দু’পিস রসগোল্লাটা মিস হয়ে গেল ভেবে বিমর্ষ হয়ে পড়ি। নিজের বাড়ি ভাঙলে ভাবি, নিশ্চয়ই সামনে বড় কিছু হবে। শুভ কিছু হবে। ভিতরের চাপা আর্তনাদ হারিয়ে যায় সভ্যতার ‘ব্যাকরুমস’-এ।

আরেক দিক থেকে দেখতে গেলে, এই ‘ব্যাকরুমস’ আদতে আমাদের ব্রেন। এবং এর ভিতরে থরে থরে ছড়িয়ে থাকা আসবাবগুলো অবহেলায় পড়ে থাকা আমাদের স্মৃতিচিহ্ন। আমরা যখনই কোনও পুরনো স্মৃতিতে ফিরে যেতে চাই মনের ভিতরে, প্রথমত সেই স্মৃতিটি আনস্টেবল হয়ে যায় এবং ব্রেন প্রতিবার সেই স্মৃতি নতুন করে লেখে এবং নতুন নতুন ইনফরমেশন তাতে জুড়ে যেতে থাকে। অতএব বারবার একই স্মৃতি রিভিজিট করতে করতে একসময় আপনি আসল ঘটনা থেকে অনেকটাই দূরে সরে আসতে পারেন।
‘ব্যাকরুমস’-এ মুখ্য চরিত্র বাদ দিয়ে যে ক’জন মানুষের দেখা মেলে, তারা দীর্ঘদিন এখানে থাকতে থাকতে টাইম স্পেসের ধারণা হারিয়েছে। বাস্তবের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে তারা স্মৃতি হয়ে গিয়েছে। এবং তার ফলে এদের একটি ডিস্টরটেড অবয়ব তৈরি হয়েছে। শুরুতেই বলেছিলাম, শার্লক-তত্ত্বের কথা। এখানে মানুষগুলোও আসবাব হয়ে গিয়েছে। তাই ওদের রক্ত ঝড়ে না।

আমাদের মনের যেমন ভাগ আছে– কনশাস, সাবকনশাস এবং আনকনশাস। ‘ব্যাকরুমস’-এরও তেমন ভাগ রয়েছে। গল্প যত এগয়, তত আমরা কনশাস, সাবকনশাস পেরিয়ে আনকনশাসের দিকে এগিয়ে যাই। মেরি যখন ক্লার্ক-কে খুঁজতে আসে, ওরা মুখোমুখি হয় ক্লার্কের পারসোনা– পাইরেট ক্লার্কের। আসলে এই পাইরেট ক্লার্ক, ক্লার্কের আনকনশাসে জমে থাকা বিকৃত সেলফ ইমেজ। মেরির যে-মুহূর্তে ক্লার্কের মনের কনফ্লিক্টের রুটে পৌঁছয়, ডিফেন্স হিসেবে এই রাক্ষসটিকে ছুড়ে দেয় মন।
এ-হেন কয়েকশো পাতা লিখেও ‘ব্যাকরুমস’-কে ব্যাখা করা সম্ভব নয়। ক্লার্কের কথায় বলতে গেলে– “It’s like describing a dog to someone who’s never seen a dog before, and then asking them to draw it.” ফলে ‘ব্যাকরুমস’-কে জানতে হলে, ‘ব্যাকরুমস’ দেখে আসাই সব থেকে ভালো উপায়।
মনে রাখবেন, হল থেকে বেরিয়ে, মলের ফাঁকা করিডোর দরজাগুলো পেরতে পেরতে যে-কোনও সময় আপনিও আবিষ্কার করতে পারেন, নিজের ‘ব্যাকরুমস’!
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved