Robbar

আলোকস্তনী রাধিকা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 7, 2026 4:53 pm
  • Updated:July 7, 2026 4:53 pm  

রাধার স্তনের আলোকধর্মী তারল‌্য নিয়ে মাত্র চারটি শব্দ লিখেছেন বিদ‌্যাপতি: পীন পয়োধর রোচি উজোরি। ‘রোচি’ শব্দটি একাধিক অনুষঙ্গের বাহক। ‘রোচি’ বহন করে আলো বা দীপ্তির অনুষঙ্গ। এবং রুচিযোগ‌্যতার অনুষঙ্গ। অর্থাৎ, রাধার খোলা স্তন কখনও বহন করে না অশালীনতার অনুষঙ্গ। সব থেকে অব‌্যর্থ এবং তারল‌্যের ইঙ্গিতবাহী শব্দটা হল ‘উজোরি’ শব্দটা বলছে, রাধার স্তনে আলোর জোয়ার।

রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়

১০১.

‘আজকের বিষয় স্তন। সাহিত‌্যে ও দর্শনে।’

ধাক্কাটা দিয়েই দাপটে হাসলেন দর্শনের প্রবল পণ্ডিত ডক্টর বিশ্বনাথ সেন। এই দু’টি বুলেট-বাংলা সেনটেন্সের ট্রিগার টিপেছিলেন আমার মাস্টারমশাই– বিশ্বনাথবাবু, মাথুর সেন্স গার্ডেন লেনে, তাঁর ভাঙাচোরা বাড়ির চৌকাঠে দাঁড়িয়ে!

তাঁর বাড়িতে ঢুকতেই সামনে পড়ার ঘরের দরজা। বুলেট-বাক‌্যদ্বয় মুহূর্তে ছিটকে দিল কাঁপডাঙা-ঘুড়ির মতো আমার আঁতলামির শিরদাঁড়া। আমার সামনে ততক্ষণে অবশ‌্য, সব রোববার সকালের মতো, সেদিনও পৌঁছে গিয়েছে ধূমায়িত দার্জিলিং এবং দুধ-সাদা প্লেটে উনুনে পোড়ানো দু’টি টোস্ট! যার দু’পিঠে অকৃপণ মমতায় লাগানো পলসন বাটার। উনুনে-পোড়ানো টোস্ট, উনুনে-পোড়ানো আলু আর উনুনে-পোড়ানো বেগুনের স্বাদবাহার, আজকের সায়েব বাঙালির জিভ কল্পনাও করতে পারবে না। এ-প্রশ্ন একদিন না করে পারিনি, আমার টোস্টের দু’পিঠে মাখন কেন? বাক‌্যের শার্পশুটার আমার মাস্টারমশাইয়ের উত্তর: “জীবন তোমার ব্রেডের দু’পিঠে মাখন মাখাবে না। তখন আমার কথা তোমার মনে পড়বে। এইটুকু নস্টালজিয়া আমার প্রাপণীয়।”

ইংরেজি, সংস্কৃত, বাংলা– তিন ভাষাতেই বিশ্বনাথ সেন ছিলেন সাবলীল সাঁতারু। এই শিক্ষকরা কোথায় গেল বলুন তো? শিক্ষাব‌্যবস্থার ধস কতদূর নামলে এঁরা সবাই ডোডোপাখির মতো হতে পারেন হাপিস!

মথুরার ভাস্কর্য, খ্রি.পূ. ২০০

বাঙালির শিক্ষাদীক্ষার সঙ্গে কালমাহাত্ম‌্যের সম্পর্ক বোধহয় আছেই। ১৯৫৯ সাল। আমি ১৮। আর আমার অধ‌্যাপক বিশ্বনাথ সেন আসমুদ্র ২৮! সেই সময়ে অধ‌্যাপক সেনের পড়ার ঘরে বসত প্রতি রোববার ব্রেনস্টরমিংয়ের ঘণ্টাদুয়েক। আমি নাম দিয়েছিলাম– ‘মনমন্থনের মধুচন্দ্রিমা’! বিশ্বনাথবাবু তেমন গা করেননি। তাঁর মনে হয়েছিল, ন‌্যাকা নাম। সেই সময়ের সেইসব বর্ষা, বসন্ত আর বিশেষ করে শীতের সকাল আর কোনওদিন ফিরে আসেনি। বিশেষ করে শীতের সকালগুলো হয়ে উঠেছিল শাল-ধুতি-শার্টের আর্ষপ্রয়োগে ব‌্যাকরণ-বিরোধী জেমস জয়েস! খুব মিস করি।

সবে তখন আমার ঠোঁটে উঠেছে হলুদবাক্সে পোড়া তামাকের চড়া-মেজাজের ফিল্টারহীন বোধদীপ্ত পৌরুষ– ‘চারমিনার’। এ-ঘটনা ফেলুদার জন্মের অনেক আগে। বাঙালি তখনও ফেলুদার ‘ফ’ জানত না। ‘চারমিনার’-এর একটি ব‌্যাখ‌্যা লিখে বিশ্বনাথ স‌্যরকে দেখিয়েছিলাম: একটি মিনার চেতনার। আর একটি মিনারে কবিতার ঈশ্বর শার্ল বোদলেয়রের অভিজাত আসবাব-বহুল বেশ‌্যাচর্চা থেকে উঠে-আসা অগম্যাগমনের তীব্র রিরংসা। আর একটি মিনারে রাইনের মারিয়া রিলকের প্রচারবিমুখ ধূসর বিষাদ। আর চতুর্থ মিনারে, কোনও অনির্ণেয় কারণে, ভার্জিনিয়া উলফের ‘লাইটহাউস’-এর দিশারি আলোর মতো, রাধিকার স্তনের আলো। লিখেছিলাম, এরই কাছাকাছি কিছু, আমার সেই সুদূর আন্ডারগ্রাজুয়েট যৌবনে: অন্ধকার সমুদ্রবক্ষে সোজা দণ্ডায়মান লাইটহাউস এক অব‌্যর্থ ইটারনাল ইরেকশান। উত্তাল সমুদ্র থেকে উঠে-আসা, চাড়া-দেওয়া রোহণ। এই লিকুইড সেক্সুয়ালিটি অস্বীকার করি কী করে?

এই ব‌্যাখ‌্যা ও ভাবনা, রঙিন পারভারশন, সব সম্পূর্ণ আমার। এক-অ‌্যাটম বিশ্বনাথ সেন নেই এখানে। স‌্যর প্রবিষ্ট হলেন আকস্মিক, তাঁর ক‌্যাপস্টান-এ গভীর টান দিতে-দিতে, ভার্জিনিয়া উলফের ‘দ্য লাইটহাউস’-এ অন্ধকার সমুদ্রে লিকুইড আলোর ব‌্যাখ‌্যায়। এবং সেই ব‌্যাখ‌্যাকে নিয়ে গেলেন এমন এক উচ্চতায়, যা ইথারস্তরের! ঝিম ধরিয়ে দিল আমার। স‌্যর বললেন, আলো কিন্তু একইসঙ্গে লিকুইড এবং সলিড। লিকুইড এবং সলিডের মেরুমিলন ঘটেছে আলোয়– ভার্জিনিয়া উলফের লাইটহাউসের আলোও কিন্তু একইসঙ্গে তরল এবং তরল নয়, সলিড!

আমি মুগ্ধ বিস্ময়ে স‌্যরের দিকে তাকিয়ে। দর্শনের অধ‌্যাপক কথা বলছেন বিজ্ঞানের ভাষায়: মনে রেখো, ‘ইন নরম‌্যাল কন্ডিশনস, লাইট ক‌্যাননট, অ‌্যান্ড ডাজনট এগজিস্ট অ‌্যাজ আ লিকুইড’। ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘দ্য লাইটহাউস’ উপন‌্যাসে আলোকে দেখছেন মিস্টিক ব‌্যাখ‌্যায়, সেই আলোই এক বিজ্ঞানীর চোখে ইলেট্রোম‌্যাগনেটিক এনার্জি! আলোই কিন্তু পৃথিবীর একমাত্র পদার্থ, যার শরীরে কোনও অ‌্যাটম নেই! আলো সম্পূর্ণ অ‌্যাটমহীন! লাইট ইজ নো ওয়ে মেড অফ অ্যাটমস্! লাইট ইজ সলিড। অথচ, লাইট হ‌্যাজ নো মাস্‌! ভাবতে পারো? এই যে ইন্টারনাল দ্বৈততা, আলোর অস্তিত্বের গূঢ়তা সেখানেই। এবং ভার্জিনিয়া তো সেইটাই ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর উপন‌্যাসে। অথচ আমরা বলি– ‘পাটিকেলস্‌ অফ লাইট’! বলি তো? এবং সেটা তো একেবারেই ভুল ইংরেজি নয়। দেখো, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। আমি বিশ্বনাথ সেন, সম্পূর্ণ অনীশ। আমি ঈশ্বরহীন। কিন্তু যখন ভাবি, আলো একইসঙ্গে তরল এবং পার্টিকেললেস, কোথায় যেন আমি আলোর কাছে নতজানু হয়ে পড়ি। আলো একইসঙ্গে তরল এবং কঠিন! আলোকে কঠিন বলে মেনে নিয়েও আমরা অনায়াসে লিখি, আলোর ঢেউ।

ভ্যান গখের ছবিতে আলোর ঢেউ

একটু থামেন বিশ্বনাথ। তারপর মৃদুস্বরে গেয়ে ওঠেন, আমাকে হতবাক করে, ‘আলোর স্রোতে পাল তুলেছে হাজার প্রজাপতি। আলোর ঢেউয়ে উঠল নেচে মল্লিকা মালতী।’ আলো সম্পূর্ণ তরল, এর বাইরে ভাবতে পারেন না রবীন্দ্রনাথ। হঠাৎ একই গানে আলো ওঠে ‘বেজে’। ‘বাজে আলো বাজে ও ভাই হৃদয়বীণার মাঝে’– গান থামিয়ে বলেন বিশ্বনাথ, এখানে আলো যেন কঠিনে-তরলে মিশে গিয়েছে! মিশিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। সরস্বতীর হাতে ওই যে বীণা, ওটা আলোর তৈরি, ‘কঠিন’ আলো দিয়ে বানানো। বিশ্বনাথবাবু থামলেন। তারপর বললেন, আমার মনে আছে, ভার্জিনিয়া উলফ তাঁর ‘দ্য লাইটহাউস’ থেকে যে বেরিয়ে আসা আলোর স্তম্ভের বর্ণনা করেছেন, তার তিনটে স্ট্রোক আছে, দুটো প্রথম ‘কুইক স্ট্রোকস্‌’। এবং শেষে একটা ‘স্টেডি স্ট্রোক’। এই বর্ণনায় কিন্তু লিকুইডিটির থেকে কাঠিন‌্যই বেশি। ভার্জিনিয়া ধরতে পেরেছিলেন তাঁর ‘দ‌্য লাইটহাউস’ উপন‌্যাসে আলোর অন্তর উভয়বলয়তা।

আলো একইসঙ্গে কঠিন ও তরল। পারটিকেলস এবং ঢেউ। নারী ও পুরুষ। কিছুক্ষণের জন‌্য থামলেন বিশ্বনাথ সেন। চুমুক দিলেন চায়ে। আমি ভেবেছিলাম, স‌্যরকে এই ট্রান্সের মধ‌্যে রেখে আজকের মতো উঠে পড়ব। ঠিক সেই সময়ে স‌্যর বললেন, ‘দ‌্য লাইটহাউস’ উপন‌্যাসে আলোর ‘বিম’-এর তিনটে স্ট্রোকের কথাটা একটু গভীরভাবে ভেবে দেখ। প্রথম দুটো ‘কুইক স্ট্রোকস্’। শেষটা দীর্ঘ এবং স্টেডি। সেক্সুয়াল ইন্টারকোর্স ছাড়া আর কী হতে পারে? তারপর বাঁকা হাসি হেসে বললেন, তোমরা অ‌্যালেন গিনসবার্গ-কে তোমাদের ইংরেজি ক্লাসে ডেকে এনে যা কাণ্ডটা ঘটিয়েছ, তা তো ইতিহাস!

অ্যালেন গিনসবার্গ

সত‌্যি, সে এক ঘটনা বটে। ১৯৬২ সাল। আমার জীবন পৌঁছেছে রঙিন পাপের ২১ বছরে। এবং স্বপ্ন না সত‌্যি! মার্কিন ‘বিট’ কবি, অ‌্যালেন গিনসবার্গ কলকাতায়! এটাও কিন্তু কালমাহাত্ম‌্যের গল্প। ইংরেজি সাহিত‌্যে অনার্স নিয়েছি বটে, পড়ি ইউরোপীয় সাহিত‌্য অনেক বেশি। বিশেষ করে স্ক‌্যান্ডেনেভিয়ার দর্শন ও সাহিত‌্য। এবং সর্বদা ওত পেতে থাকি আনসেন্‌সর্ড স্ক‌্যান্ডেনেভিয়ান সিনেমা দেখার জন‌্য। আহা, যদি ইউটিউবের যুগকে আমরা পেতাম আমাদের মুক্তো মুঠোফোনে! তবু এই আদি সত‌্য ২১ বছর বয়সে ক্রমশ ডাগর হয়ে উঠল মনের মধ‌্যে, শৈত‌্যই জাগায় শরীরবাসনার দৈত‌্য। স্ক‌্যান্ডেনেভিয়ান মনের ওই চাপা আগুন, প্রবল যৌনতা, গহন সব ইচ্ছে ও স্বপ্ন, এইসব সম্ভব হয়েছে ওদের সাহিত‌্যে জীবনদর্শনে, দিনের পর দিন। মাসের পর মাস, সেখানে সূর্য ওঠে না বলে। স্ক‌্যান্ডেনেভিয়ান মনের ধূসর পাণ্ডুলিপি আমাকে পেয়ে বসে। এবং সেই সঙ্গে আমাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শেক্সপিয়রের ‘রিচার্ড দ‌্য থার্ড’-এর প্রথম পঙ্‌ক্তি: ‘নাউ ইজ দ‌্য উইন্টার অফ আওয়ার ডিসকনটেন্ট!’ যাঁরা ‘রিচার্ড দ‌্য থার্ড’ খুব ভালো করে পড়েছেন, দেখেছেন স‌্যর লরেন্স অলিভিয়ের-এর ‘রিচার্ড দ‌্য থার্ড’, তাঁরা বুঝবেন এই আপাতশীতল উচ্চারণ কী গহন শরীরী আগুন ধারণ করছে– অবৈধ সম্পর্কের গহন বহ্নি! মার্কিন লেখক জন স্টাইনবেক এই আগুনই ছোঁ মেরে তুলে নিয়েছিলেন তাঁর শেষ উপন‌্যাসের নামে! এবং কী বিস্ময়কর কাকতালীয় ঘটল আমার পড়ুয়া-জীবনে!

স্টাইনবেকের স‌দ‌্য প্রকাশিত সেই মাস্টারপিস আমি পড়লাম ১৯৬২-তেই। সেই বছরেই স্কটিশ চার্চ কলেজে আমরা নিয়ে এলাম, ইংরেজি অনার্সের ছাত্রছাত্রীরা, পৃথিবী-বিখ‌্যাত কবি এবং গান-লেখক এবং গায়কও বটে, অ‌্যালেন গিনসবার্গকে, এক ‘স্বপ্নে’র সেমিনারে! ১৯৬২-তে আমি ২১। এবং অগ্নিগর্ভ!

অ‌্যালেন গিনসবার্গ এবং ১৯৬২-র স্কটিশ চার্চ কলেজে তাঁর একটি বেলার গল্প বলতে গেলে একটি গোড়াপত্তন করতেই হবে। বিশ্বনাথ সেন যদি আমার জীবনে, আমার ১৮ থেকে ২১-র মধ‌্যে না ঘটতেন, তাহলে আমি হয়তো সম্পূর্ণ অন‌্য আমি হয়ে যেতাম। বিশ্বনাথবাবু আজীবন ছিলেন অধ‌্যাপক। তাঁর অজস্র ছাত্রছাত্রী সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে। কিন্তু তাঁদের মধ‌্যে কেউ একজনও লিখে জানাননি, ওই মানুষটির কাছে মন খুলে মনের কথা বলতে পেরেছিলাম বলেই আজকের আমি ‘আমি’ হয়ে বেঁচে আছি। এবং ঠিকমতো নষ্ট হতে পেরেছিলাম বলেই আমি বাঁচতে এবং লিখতে এবং জীবন পোড়াতে এবং জীবন পান করতে শিখেছিলাম। বিশ্বনাথ সেনের প্রতি আমার এই শ্রদ্ধাঞ্জলি গভীর শ্রদ্ধার ও ভালোবাসার।

এবার আরও গভীর কথায় আসি। মাস্টারমশাই মহাপণ্ডিত বিশ্বনাথ সেনের সঙ্গে আমার অনন‌্য সম্পর্কের কথা জানাতে প্রথম বাক‌্যটি হল, বাবা-মাকে যে-কথা বলতে পারিনি, সব খুলে বলতে পেরেছিলাম প্রফেসর বি.এস.-কে! মা-বাবাকে এসব কথা বললে, তাঁরা অবশ‌্যই বলতেন, শুনলেও পাপ, দূর হয়ে যা! কী সহজ বাপ-মা হওয়া! এবার বলি: আমার অবাধ ১৮-র সমস্ত পাপেচ্ছা, সমস্ত অবদমন, আর আত্মরতি, আমার বিপুল বেদনা, বিষাদ, অন‌্যায়বোধ, আমার তীব্র সেক্সুয়াল তাড়না এবং বহ্নিত হতাশা এবং দীপিত তারল‌্যে আমার নিঃসঙ্গ মাস্টারবেশন, এইসব আমি বেহায়া আকুতিতে উজাড় করে বিশ্বনাথ স‌্যরকে বলতে পেরেছিলাম। কেননা একমাত্র তিনিই আমার যৌবনের আরাত্রিকে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এক অলৌকিক পঞ্চপ্রদীপ: দস্তয়েভস্কি, কাফকা, সার্ত্রে, সিমন, কামু! এই পঞ্চদীপন তৈরি করেছিল আমার আমিকে। তারপর বিশ্বনাথ সেনের হাত ধরে আমার জীবনে ঢুকলেন নিৎসে… (এখন উচ্চারণ ‘নিচ্চে’)। তিনি বই লিখে সারা পৃথিবীকে জানালেন এই সংবাদ: ঈশ্বর মারা গেছে! ২৮ বছরের বিশ্বনাথ সেন ততদিনে আমার প্লেটো! আমি তাঁর সামনে রোজ নতজানু হয়ে মনে মনে বলতে লাগলাম, প্রভু, আমাকে নষ্ট করো! না হলে বাঁচব না! নষ্ট হওয়াই বাঁচার একমাত্র পথ!

সক্রেটিস ও প্লেটো, রাফায়েলের ছবি

এতক্ষণে তৈরি হল ১৯৬২-র স্কটিশ চার্চ কলেজে গিনসবার্গের আবির্ভাবের পরম লগ্ন! কলেজের ইংরেজি অনার্সের সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের আয়োজনে আধুনিক কবিতার ঈশ্বরের উদয়ন, চাট্টিখানি কথা! প্রথম সারিতে বসে ইংরেজির হেড অফ দ‌্য ডিপার্টমেন্ট, মহীমোহন বোস, এরপর সমস্ত ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট, সুশীল মুখোপাধ‌্যায়, দেবীপ্রসাদ বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়, দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ‌্যায়, কল‌্যাণ দত্ত, প্রফেসর ঘোষাল এবং অক্সফোর্ডের স্কলার, আমাদের পড়ান জন ডান আর মারভেলের কবিতা, ডক্টর কিটি স্কুলার। এবং অতি রক্ষণশীল ক্রিশ্চান মিসেস মেরি জোসেফ। আর আমি ডেকে এনেছি দর্শন-বিভাগের ডক্টর বিশ্বনাথ সেনকে। আমাদের প্রিন্সিপাল, খাস ইংরেজ হ‌্যারল্ড জন টেলর, তিনি কী বুঝেছিলেন জানি না, উঠেই বললেন, আমি আমেরিকান ইংরেজি ভালো বুঝি না।

গিটার বাজাতে-বাজাতে উঠলেন সভা আলো করে গিনসবার্গ। এবং কবিতার প্রথম লাইনেই অ‌্যাটোমিক বিস্ফোরণ: “ম‌্যাস্টারবেশন, দ‌্যাট’স দ‌্য নেম অফ দ‌্য গেম!” বিশ্বনাথবাবু আমার হাত চেপে ধরলেন। আমি চোখের সামনে দেখলাম, হস্তমৈথুন সম্বন্ধে আমাদের সমস্ত পাপবোধ তাসের বাড়ির মতো উড়ে গেল একটি কবিতার প্রথম লাইনের ধাক্কায়!

এবার ফিরি এই লেখার প্রথম লাইনে: ‘আজকের বিষয় স্তন! সাহিত‌্যে ও দর্শনে’ বললেন প্রফেসর বিশ্বনাথ সেন, তাঁর বাড়ির পড়ার ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। এবং সেই সূত্রে গেলেন আলোর দর্শনে। বললেন, কী অবাক কাণ্ড, আলো একই সঙ্গে আলোর গুঁড়ো। আবার আলোর স্রোত! অর্থাৎ লাইট একই সঙ্গে পার্টিকেলস এবং লিকুইড। আমি ঈশ্বর মানি না। অথচ আলোর দর্শনের সামনে বা বিজ্ঞানের সামনে কেমন যেন নতজানু হয়ে পড়ি। আলোর এই বিরোধাভাস আমার কাছে ব‌্যাখ‌্যার অতীত, ঐশী মনে হয়।

কৃষ্ণের রাধিকা দরশন, মাণ্ডি, ১৭৮০-৯০

এরপর বিশ্বনাথ সেন বলেন, সো ইজ স্তন! একই সঙ্গে লিকুইড এবং কঠিন। নারীর স্তন ঠিক আলোর মতো। কথাটা বলে বিশ্বনাথ সেন তাকালেন আমার দিকে। আমি বললাম, কোথায় যেন পড়েছি নারীর স্তনের সঙ্গে আলোর তারল‌্যের তুলনা। অসাধারণ লেগেছিল। কিন্তু কোথায় পড়েছি বলুন তো?

বিদ‌্যাপতি, বললেন বিশ্বনাথ সেন। রাধার স্তনের আলোকধর্মী তারল‌্য নিয়ে মাত্র চারটি শব্দ লিখেছেন বিদ‌্যাপতি: পীন পয়োধর রোচি উজোরি। এবার চারটে শব্দকে আলাদা আলাদাভাবে বোঝবার চেষ্টা করা যাক। ‘পীন’ মানে উন্নত। অর্থাৎ রাধিকার খোলা স্তনদু’টি উন্নত। কোথাও নেই শৈথিল‌্য। ‘পয়োধর’ মানে তো স্তন। কিন্তু ‘রোচি’ শব্দটি বোঝাচ্ছে, রাধার দু’টি উন্নত স্তন আলোয় আলোকময়। ‘রোচি’ শব্দটি একাধিক অনুষঙ্গের বাহক। ‘রোচি’ বহন করে আলো বা দীপ্তির অনুষঙ্গ। এবং রুচিযোগ‌্যতার অনুষঙ্গ। অর্থাৎ, রাধার খোলা স্তন কখনও বহন করে না অশালীনতার অনুষঙ্গ। সব থেকে অব‌্যর্থ এবং তারল‌্যের ইঙ্গিতবাহী শব্দটা হল ‘উজোরি’ শব্দটা বলছে, রাধার স্তনে আলোর জোয়ার। এই তারল‌্য ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। পরক্ষণেই বিদ‌্যাপতি রাধার স্তনকে এই তারল‌্য থেকে উপড়ে ফেলে তাকে ‘সলিড’ করে তুললেন! বললেন রাধার স্তন মোটেও আলোর উজান নয়। রাধিকার স্তন বেলের মতো কঠিন ও গোল: ‘শ্রীফল ফলিনী’। তারপর পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর স্তন দু’টি নিয়ে এক অপূর্ব মধ‌্যপথ অবলম্বন করলেন বিদ‌্যাপতি। বললেন, ‘কনক মজোরি’। অর্থাৎ, রাধিকার স্তন আলোর মতো তরল নয়। কিন্তু সোনার মঞ্জরির মতো নরম! আলো আর নারীর স্তন, যা সত‌্যিই একইসঙ্গে তরল ও কঠিন। ঈশ্বরের মতো। ব‌্যাখ‌্যার অতীত। কথাগুলো সব বিশ্বনাথ সেনের। কত বছর আগে শোনা। ভুলিনি। ভুলতে পারিনি।

যুগলমিলন, দেবগড়, অষ্টাদশ শতক

আজকাল নিঃসঙ্গ ঘরে বসে ভাববার চেষ্টা করি, কেমন ছিল বিশ্বনাথ স‌্যরের ভাবনার টেবিল। তাঁর লেখার পরিসর!

…….. রোববার.ইন-এ পড়ুন কাঠখোদাই-এর অন্যান্য লেখা ……..