


স্বরক্ষেপণ, নাচ, গান, চলাচল সব মিলিয়ে তীজনবাই ছিলেন শক্তির আধার। অনুষ্ঠান চলাকালীন যে শিল্পীর সবচেয়ে ভালো অনুশীলন হয়, তাঁর স্বকীয়তা এক কথায় অননুকরণীয়। আর তাঁর অস্ত্র ছিল ‘নেগেটিভ কেপাবিলিটি’। চরিত্রের ভাবানুকীর্তনে তৈরি হওয়া নাট্য-মুহূর্তে কখনও মাতিয়ে রাখতেন তো কখনও কাঁদিয়ে ছাড়তেন। তাঁর বিশ্রুত তম্বুরাটি বিজন হল বটে কিন্তু যেন বিস্মৃত না হয়।
তিনি বলতেন তাঁর তম্বুরাটি ছাড়া এক লাইনও পাণ্ডবানী তিনি গাইতে পারবেন না। কী ছিল তাঁর সেই অতি সাধারণ তারের যন্ত্রটিতে? বাজাতেনও তো খুবই কম। তাহলে? সে শুধুই তো বাদ্যযন্ত্র না, সে ছিল ভীমের গদা বা কখনও অর্জুনের রথ বা কখনও তীর অথবা পাঞ্চালীর কেশদাম। আর তা হাতে তিনি হয়ে উঠতেন পাণ্ডবানীর গায়ক-সূত্রধর। ঊরুতে চাপড় মেরে পাশা খেলার অভিনয় দেখাতেন যখন, তখন তিনিই শক্তিশালী এক মহাকাব্যের ভরকেন্দ্র। তীজনবাই আর পাণ্ডবানী ছিল একে অন্যের সিনেকডকি। সে জোড় ভেঙে গেল আষাঢের এক ভোররাতে। আজ যখন ভেঙেই গেল তখনি সবাই কেমন ব্যস্ত হয়ে উঠলাম তাঁকে তথ্যে ঢেকে দিতে; কোথায় জন্ম, কী পুরস্কার, কেন মৃত্যু… তাতে শিল্পীর অন্তর্প্লাবী উন্মীলনের শিক্ষা কেমন যেন ধাক্কা পায়। পদ্মবিভূষণ ড. তীজনবাই ছত্তিসগড়ের লোকনাট্য পাণ্ডবানীর অমূল্য শিল্পী ছিলেন। শৈল্পিক চেতনাই তাঁর জীবনের সবথেকে বড় শিক্ষা। আর মৃত্যু? সে তো তার দেহের ঘটেছে। এ শিল্পী মহাকাব্যের মতো অমর। তিনি এক অপার বিষ্ময়।

রূপকথার আস্তাবলে এক্কেবারে কোনায়, অন্ধকারে, অবহেলায় পড়ে থাকা অপুষ্ট অশ্বশাবকটিই যেমন পক্ষীরাজ ঘোড়া প্রমাণিত হয়, তেমনই ছিল তীজনজির শৈশব। চূড়ান্ত অনাহারে থাকা এই শিশুটিকে কুকুর মুখে করে নিয়ে গিয়েছিল, অচেতন পড়েছিলেন রাস্তার পাশে ছ’ দিন। তারপর কেউ তাঁকে উদ্ধার করেন। তেরো বছর বয়সে সে পক্ষীরাজ ডানা মেললে আর তাকে থামানো যায়নি। তার দাদামশাইয়ের কাছে শোনা মহাভারতের কথা ‘পাণ্ডবানী’কে সম্বল করে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন নিজেকে। তাঁর যে পারধি সম্প্রদায় তাঁকে ত্যাগ করেছিল, তাদের জন্য খ্যাতি বয়ে এনেছেন। পথে যত বাধা-বিপত্তি এসেছে তিনি পেরিয়ে গিয়েছেন একের পর এক, শুধু মনের জোড়ে। তাঁর ছিল ওয়ান ম্যান আর্মি, তিনি নিজে। এক অমোঘ ‘পাগলপন’ তাঁর পাণ্ডবানীকেও তাঁরই মতো লড়াকু করে তুলেছিল। আগে পাণ্ডবানী অভিনয় করত শুধু ছেলেরা। সেখানে তিনি স্বচ্ছন্দে ঢুকে পড়লেন। বেছে নিলেন ‘কাপালিক’ জাতের পাণ্ডবানী, যেখানে স্মৃতিনির্ভর পুরো পারফরম্যান্সটি দাঁড়িয়ে, হেঁটে-চলে, নেচে-গেয়ে করতে হয়। একই গাথা তাঁর প্রতি অভিনয়ে আলাদা আলাদা হত। দ্রৌপদী ছিল তাঁর হৃদয় জুড়ে। তার অপমানে তিনি জ্বলে উঠতেন। দর্শকের গায়ে এসে লাগত তাঁর সেই ঝলসে দেওয়া আগুন। সমকালীন নারী-নিগ্রহও চলে আসত তাঁর মহাভারতে। সাজও ছিল তেমনই– যাকে চড়া বলাই যায়, কিন্তু তাঁর প্রান্তিক প্রেক্ষাপটে সে সাজ ছিল শক্তিশালী। তেল মাখা চুলে শক্ত বিনুনি দুলত টাসেল নিয়ে, সিঁথিতে কমলা সিঁদুর, কাজল আঁকা ভুরু-চোখ, উজ্জ্বল শাড়ি, মোটা মোটা দেহাতি রুপোর গয়না, তাম্বুলে রাঙানো ঠোঁট আর হাতে তম্বুরা– এক্কেবারে পাওয়ার-প্যাক্ড পারফরমার। তিনি তাঁর অশিক্ষাকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিতেন, বলতেন এই না কি ভালো হল; শিক্ষিত হলে হয়তো তিনি পাণ্ডবানী বাছতেন না। আর সেই অশিক্ষাকে সাজাতে এল পদ্মবিভূষণ, সঙ্গীত নাটক অকাদেমি, ডি.লিট, ফুকুওকা প্রাইজ।
তিনি থেকে গিয়েছিলেন মাটির কাছাকাছি। শ্রী মণীশ মিত্র শোনান তীজনজির মহাভারত; যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিশোধ নিয়ে “ভীম যখন নকুলকে পাঠালেন দ্রৌপদীকে ডাকতে, তখন নকুলকে দেখে দ্রৌপদী বলে উঠলেন ‘যুদ্ধ থেকে ফিরে এলে কেন? রুটি কম পড়েছিল নিশ্চয়ই। সকালেই বললাম আরও কটা রুটি করে দিই।” যতই রাজায় রাজায় যুদ্ধ হোক তীজনজি খিদের দিকে তাকিয়ে। আর সেই খিদেতে গৃহিণীর হাতে গড়া মোটা রুটির জন্য যুদ্ধ-বিরতি ঘোষিত হতেই পারে। মহাভারতের মতো গভীর, গম্ভীর মহাকাব্যকে তিনি তাঁর গল্প বলার স্নেহপাশে বেঁধে ফেলেছিলেন। তার তম্বুরাটিও মাটির থেকে দূরে যেত না। তাতে যে ময়ূরের পালক পরানো থাকত সে যেন-বা ‘গোধূলিধূম্রময়ূরপুচ্ছের চূড়া’। প্রান্তিক গ্রামীণ জীবনযাপনের স্বেদ-মাটি লেগে ছিল তাতে। মহাভারতের সব চরিত্রই তাঁর হাতে হয়ে উঠত লৌকিক, যেন গ্রামেরই চেনা মানুষ। ঢোল, হারমোনিয়াম, মঞ্জিরা আর সহ-গায়কদের নিয়ে সেইসব গ্রাম্য চরিত্রদের উল্টে মহাকাব্য-যাত্রা করাতেন তিনি।

তীজনজি ছিলেন আদ্যোপান্ত একজন ঈশ্বর-বিশ্বাসী মানুষ। শেলি পশ্চিমি বাতাসকে যেমন বলতেন–
‘Make me thy lyre, even as the forest is:
What if my leaves are falling like its own!
The tumult of thy mighty harmonies
Will take from both a deep, autumnal tone,
Sweet though in sadness. Be thou,
Spirit fierce,
My spirit! Be thou me, impetuous one!’
তিনিও যেন তাঁর ঈশ্বরকে একই আবেদন জানাতেন। আর মজার কথা হল, তাঁর তম্বুরাটিও বুঝি তাঁকে এই একই সুর শোনাত। ফলে কে বেশি ঐশ্বরিক বাদ্যযন্ত্র হয়ে উঠেছিল– তার পরিসংখ্যান সময়ের কাছে থেকে যাবে।
কলকাতার নাট্য-নির্মাণ দল ‘কসবা অর্ঘ্য’ তীজনজির খুব কাছে পৌঁছতে পেরেছিল স্বগুণে। সে দলের পরিচালক মণীশ মিত্র তীজনজির স্মৃতিতে বলেছেন–
“তাঁর বিষয়ে প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নে আমার আপত্তি আছে। এ প্রশ্ন উঠবে কেন? তাঁর নশ্বর শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু ভারতের মাটি তাঁকে ধারণ করবে। তিনি ছিলেন জীবন্ত কিংবদন্তি। আমাদের চেতনায়, বোধে, মাটিতে, হাওয়ায় এই মহাকাব্য যদিন প্রাসঙ্গিক, ততদিন তীজনবাই প্রাসঙ্গিক। আমরা একটা বিপন্নতার মধ্যে এসে পড়েছি। এক অদ্ভুত সাংস্কৃতিক আস্তরণ আমাদের ঘিরে তৈরি হয়েছে। তাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিমজ্জিত। যারা এসব পেরিয়ে শিকড়ের সন্ধানে যাবে তারা তীজনজিকে পাবে। তাঁর পারফরম্যান্সে আমরা যাকে নাটকের পরিভাষায় বলি ‘Brechtian alienation’, সেটি প্রখর। যুদ্ধের সময় নকুল ও দ্রৌপদীর রুটির কথালাপেই তিনি একাধারে ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন শিল্পী।”

কসবা অর্ঘ্য দলের অন্যতম শিল্পী শ্রীমতী সীমা ঘোষ। স্বয়ং তীজনবাইয়ের হাতে গড়া তিনি। তাঁর প্রিয় তম্বুরা তিনি এঁকে সঁপে গেছেন। তীজনজির চলে যাওয়ার দিনে বাংলার সেই পাণ্ডবানী শিল্পীর সঙ্গে কথা হয়েছিল। সেই কথালাপের কিছুটা অংশ এ লেখার মধ্যে রাখা উচিত, তীজনজিকে জানার জন্যেই মূলত…
–কতদিন ওঁর কাছে তালিম নিয়েছন?
–প্রথম যাই ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সেই থেকেই আসা-যাওয়া। উনিও আসতেন আমাদের এখানে। দেখা হলেই চলত শেখা আর গল্প শোনার পালা।
–প্রথম কোন পালা শুনেছিলেন?
–অভিমন্যুবধ কথা।
–আপনার প্রতিদিনের যাপনে আপনি ওঁকে কীভাবে পান?
–ওঁর সহজতায়। আমি দেখতাম তিনি কী সহজ মানুষ ছিলেন! অত বড় শিল্পী আচার বানাচ্ছেন, কুমড়ো কাটছেন, আমার মাথা টিপে দিচ্ছেন, আমার বিছানা গুছিয়ে দিচ্ছেন কী সাবলীলতায়– যেমন আর পাঁচজন সাধারণ মানুষ করে। কোথাও অহংকার নেই সেখানে। কিন্তু স্টেজে উঠলে অন্য ব্যক্তিত্ব। নিবিড় পারফরমার, যিনি বলতেন ‘খুদ ডুব যাও তভি তো সবকো ডুবা পাওগে’।
–তীজনজি আপনাকে ‘ছোটা তীজন’ নাম দিয়েছিলেন। আপনি কি সেই নামেই পাণ্ডবানী করেন?
–না। তবে নামটা আমার নামের সঙ্গে ব্যবহার করি। গুরুর আশীর্বাদের মতো।
–আপনাকে একটি পালা দান করেছিলেন তীজনজি…
–অভিমন্যুবধ কথা। শিখিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি এই পালাটি আর করবেন না।
–আপনার কাছে ওঁর তম্বুরার প্রতিশ্রুতি কী?
–আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি। তারপর মনে হল, পাণ্ডবানী না করে আমার আর উপায় রইল না।
–তম্বুরার আপনাকে কী কথা বলে?
–বলে, যেন না থেমে যাই।
![]()
স্বরক্ষেপণ, নাচ, গান, চলাচল সব মিলিয়ে তীজনবাই ছিলেন শক্তির আধার। অনুষ্ঠান চলাকালীন যে শিল্পীর সবচেয়ে ভালো অনুশীলন হয়, তাঁর স্বকীয়তা এক কথায় অননুকরণীয়। আর তাঁর অস্ত্র ছিল ‘নেগেটিভ কেপাবিলিটি’। চরিত্রের ভাবানুকীর্তনে তৈরি হওয়া নাট্য-মুহূর্তে কখনও মাতিয়ে রাখতেন তো কখনও কাঁদিয়ে ছাড়তেন। তাঁর বিশ্রুত তম্বুরাটি বিজন হল বটে কিন্তু যেন বিস্মৃত না হয়।
কৃতজ্ঞতা: মণীশ মিত্র ও সীমা ঘোষ
তথ্য-ঋণ: ‘Pandavani: The art of storytelling/ Teejan Bai’, Manish Mitra, Arghya Publication, Kolkata, January 2022
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved