


জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শিল্পীর চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। হথর্ন গাছ তো আর খবরের কাগজ পড়ে না, ঠিক যেমন ড্যাফোডিল ফুলও লকডাউনের প্রতি উদাসীন। সেই সময় নিজের আঁকা উজ্জ্বল ছবির সঙ্গে অগুনতি বন্ধুকে মোবাইলে একটিমাত্র মেসেজ পাঠিয়েছিলেন ডেভিড হকনি– ‘ডু রিমেমবার, দে কান্ট ক্যানসেল দ্য স্প্রিং!’– মনে রেখো, বসন্তকে কেউ বাতিল করতে পারে না– বাক্যটি আশ্চর্য দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে।
পাহাড়ের গা বেয়ে যে রাস্তাটা সবেগে নেমেছে, খানিক ঢালু হয়ে সেটাই আবার বাঁক নিয়ে উঠেছে উপরের দিকে। চমকে ওঠা হলদে দুপুর, গাছপালা, পাথর, মাটি সব যেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বেগবান এই পথের দিকে। যেন কেউ মোটা তুলি দিয়ে আলগোছে এঁকে দিয়েছে তার দুরন্ত রেখা। দু’পাশে বিস্তৃত মাঠ– অসম্ভব জ্যামিতিক ছন্দে বিন্যস্ত। কোথাও পান্না-সবুজ আয়তক্ষেত্র গিয়ে আছড়ে পড়েছে মেটে লাল জমির ফালির গায়ে, কোথাও আবার গোলাপি বাগান পরম আহ্লাদে মিশে গেছে হলুদাভ শষ্য প্রান্তরে। কখনও পিঙ্গল, কখনও সবুজ! এরই মাঝে ছাইমাখা নীল ছায়ারা অতি দীর্ঘ হয়ে শুয়ে আছে এমন সব গাছের নিচে, যাদের ভঙ্গি দেখে মনে হয়, তারা হয় অবুঝ, নচেৎ ওখানেই পৃথিবীর কার্নিশ! আর ঠেলা দিলেই বুঝি তারা গড়িয়ে পড়ে যাবে! তাই বোধহয় ভয়ে তাদের গুঁড়ির রং হয়েছে বেগুনি!

পার্সপেক্টিভের নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখানো এই চোখ-ঝিলমিল চৌমাথায় বেমালুম পথ হারিয়েছেন দু’জন মানুষ। একজনের মাথায় খড়ের টুপি, পরনে ঢলঢলে জামা, প্যান্টুলুন। ফ্রান্সের রোদ ঝলসানো মুখে তামাটে দাড়ি। চিনতে ভুল হয় না। কয়েক কদম অন্তর থমকে দাঁড়িয়ে, তিনি আপনমনে বিড়বিড় করেন, ‘আশ্চর্য! ক্ষেতের গম যে এভাবে রং মনে রাখে, এ তো জানা ছিল না!’ আরেকজন ভদ্রলোক তখন সামান্য দূরে পায়চারি করছেন। খানিক অন্যমনস্ক। গরমের তোয়াক্কা না করেই তিনি পরে আছেন পরিপাটি কালো কোট-প্যান্ট! প্যারিসীয় ছাঁদে সযত্নে ছাঁটা দাড়ি। দু’চোখে এক আশ্চর্য দীপ্তি! চারপাশে চোখ বুলিয়ে এক সময় তিনি বললেন, ‘উঁহু! এ ঠিক আমার কাগজ-কাটা পৃথিবীর মতো নয়।’ তারপর খড়ের টুপি পরা বয়স্ক সতীর্থের দিকে চেয়ে বলেন, ‘আপনার জগতের মতোও নয়, ভিনসেন্ট!’ মনের মতো কথাটি শুনে ভিনসেন্ট মৃদু হেসে বললেন, “নাহ্, মাতিস। আমাদের দু’জনের থেকেই কিছু কিছু নিয়ে এ অঞ্চল পরিপুষ্ট। এ আমি দিব্যি টের পাচ্ছি!” এরপরই পথভুলে দুই শিল্পী এসে থামেন পাহাড়ি বাঁকের মুখে। সামনের রাস্তাটি দূরে মিলিয়ে গিয়েছে অনন্ত ফুলে ভরা বাগানের মধ্যে!

ইয়র্কশায়ারের ব্র্যাডফোর্ড অঞ্চলের ভুপ্রকৃতি তেমন রঙিন ছিল না। সারি সারি ইঁটের বাড়ি, কলকারখানার চিমনিই চোখে পড়ত একটেরে বাড়িটার জানলা থেকে। সময়টা গত শতাব্দীর তিনের দশক। এলাকার বাসিন্দা কেনেথ হকনি ছিলেন এক দৃঢ়চেতা মানুষ। পেশায় ক্লার্ক, নেশায় শখের মেকানিক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্য হিড়িক উঠলেও, তিনি যাননি। স্ত্রী লরা হকনির মধ্যেও ছিল শিল্পবোধ। এই মধ্যবিত্ত দম্পতি তাঁদের সন্তানদের মধ্যেও বুনে দিয়েছিলেন বোধের দ্যুতি, আত্মমর্যাদার বীজ। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ, ডেভিড, কথা কইতে শেখার আগেই ছবি আঁকতে শিখে নিয়েছিল আপন প্রতিভায়! ১৯৩৭ সালের ৯ জুলাই জন্মানো ডেভিড অতি শৈশবেই যুদ্ধবিধ্বস্ত ব্রিটেনের ধুলোবালির মধ্যে খুঁজে নিয়েছিল কল্পনার এক চিলতে পাহাড়ি পথ। নিজের মধ্যে প্রতিভার শোঁ-শোঁ শব্দ সেই একরত্তি ছেলে নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে একডাকে ডেভিড হকনিকে চিনেছিল বিশ্বের তাবৎ শিল্পপ্রেমী মানুষজন। রং তুলির টানে হকনি গড়ে তুলেছিলেন এক ‘সব পেয়েছির দেশ’।

ব্র্যাডফোর্ড স্কুল অফ আর্ট পেরিয়ে হকনি যখন লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অফ আর্টে পড়ার তোড়জোড় করছেন, তখন ব্রিটেনও যেন নিজেকে ধুয়েমুছে সাজাতে ব্যস্ত। যুদ্ধোত্তর ধূসরতা একটু একটু করে সরে যাচ্ছে। ছয়ের দশকের রঙিন উচ্ছ্বাসের ঢেউ এসে ভাঙছে, উজ্জ্বল ফ্যাশনের টানে আকৃষ্ট হচ্ছে মানুষ, নীতিপুলিশদের পালে তেমন হাওয়া নেই। হকনি যেন এই সময়ের অপেক্ষাতেই ছিলেন। মোটা সেলুলার ফ্রেমের চশমা, অবিন্যস্ত চুল, রঙিন পোশাকে সেজে যেন নিজের ভবিষ্যতের ক্যানভাস থেকেই সটান হাজির হলেন বর্তমান বাস্তবে। ‘পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং’ কথাটা জনপ্রিয় হওয়ার ঢের আগেই হকনি তার মর্মার্থ টের পেয়েছিলেন, ঠিক যেমন কয়েক শতাব্দী আগেই তা বুঝেছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি– শিল্পীর বাহ্যিক উপস্থাপনাও এক ধরনের শিল্পভাষা! লিওনার্দো সুন্দর ঝলমলে পোশাক পরতে ভালোবাসতেন, নাটকীয়তার প্রতি ছিল অনিঃশেষ আগ্রহ, ফ্লোরেন্সের আদালতে একসময় অভিযোগ পৌঁছেছিল লিওনার্দোর যৌনতা নিয়েও! কয়েকশো বছর পরে চেক-কাটা জ্যাকেট, আগুনরঙা চশমার ফ্রেম, ঝলমলে টাই, স্মিত হাসি আর হাতে ধরা সিগারেটের ধোঁয়ায় হকনি যেন মুছে দিলেন সময়ের ব্যবধান।

হকনি অকুতোভয়। তাঁর যৌবনের দিনগুলিতে ব্রিটেনে সমকামিতা ছিল আইনত অপরাধ। অনেকেই সে সময় নিজের প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে বাঁচতেন। কিন্তু ডেভিড হকনি নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন তুলির টানে, রঙের বিন্যাসে। সাংকেতিক নয়, একেবারে সরাসরি ঘোষণা! ওয়াল্ট উইটম্যানের কবিতার থেকে নেওয়া– ‘উই টু বয়জ টুগেদার ক্লিংগিং’ (১৯৬১) নামের ছবিটিতে দুই পুরুষের সমকামী প্রেমকে এমন অকপটভাবে এঁকেছিলেন যে, সেই সাহসের জন্য তাঁকে মহামান্য আদালতের কাঠগড়ায় হাজির হতে হলেও হতে পারত। কিন্তু এইসব হিজিবিজিকে তুড়ি মেরে জীবন কাটাতে, অকৃপণভাবে ভালোবাসতে শিখিয়ে গিয়েছেন হকনি। বন্ধু থেকে প্রেমিক, প্রেমিক থেকে প্রতিকৃতি, শেষমেশ সেই প্রতিকৃতিরা মাস্টারপিস হয়ে উঠেছে তাঁরই প্রতিভায়।

ছয়ের দশকের গোড়াতেই সমালোচকেরা ইয়র্কশায়ারের এই চশমাপরা তরুণকে ব্রিটিশ পপ আর্টের উজ্জ্বল মুখ বলে গণ্য করতে শুরু করল। কিন্তু ভোগবাদী সংস্কৃতির পাতা ফাঁদে হকনি আদৌ পা দেননি! তাঁর কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু থেকেছে পৃথিবীর চিরকালীন বিস্ময়– মানুষ এবং ভুপ্রকৃতি!
শিল্পের টেকনিক বা কায়দাকানুন সরিয়ে রেখে তিনি অবাক বিস্ময়ে দেখে চলেছেন মানুষের মুখ, গাছের ছায়া, বিকেলের আলো। প্রৌঢ় বয়সে তাঁরই অকপট স্বীকারোক্তি– ‘আই হ্যাভ অলওয়েজ বিন আ লুকার। দ্যাটস্ ওয়াট আর্টিস্টস্ ডু!’ বীরভূম জেলার এক কিংবদন্তি শিল্পীর মোনোলগ যেন অদূরে কোথাও একই সুরে গমগম করে ওঠে স্মৃতির খোপে– ‘মহাশয়, আমি চাক্ষিক। রূপকার মাত্র।’ হকনিও অতি অল্পবয়সেই টের পেয়েছিলেন এই অমোঘ সত্য। সমালোচক ও লেখক মার্টিন গেফার্ড তাই বলেছিলেন– হকনির কৌতূহল ছিল সীমাহীন। তাঁর সঙ্গে আলোচনা শুরু হলে পিকাসো থেকে চাইনিজ স্ক্রোল পেইন্টিং, অপেরা থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি পর্যন্ত গড়িয়ে যেত কথোপকথন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত কখনও বিস্মিত হতে ভোলেননি শিল্পী!

১৯৬৪ সালে হকনি যখন লস অ্যাঞ্জেলেসের উপর দিয়ে প্লেনে উড়ে চলেছেন, হঠাৎই তাঁর চোখে পড়ে বহু নিচে ছোট-বড় অসংখ্য ঝকঝকে নীল আয়তক্ষেত্র! ‘এদেশে এত সুইমিং পুল!’ ইংল্যান্ডের নদী, পুকুর দেখা চোখ ক্যালিফোর্নিয়ায় এসে প্রথম চেনে ‘ব্যক্তিগত’ আকাশ! ঐশ্বর্য আর প্রাচুর্যের জৌলুসে যেখানে মানুষের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, হকনি সেই অকুস্থলে খুঁজে পেলেন স্থাপত্যের শিল্পকলা! অন্যের চোখে যা রোদ, তাঁর কাছে তা নির্ভেজাল লাইট সোর্স! আলোর জ্যামিতিতে ভর করে ক্যালিফোর্নিয়া পর্বে ছবি হকনি আঁকলেন অগুনতি ছবি। বিশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবিগুলির মধ্যে এদের স্থান।

১৯৬৭ সালে আঁকা ‘আ বিগার স্প্ল্যাশ’ এই সময়েরই ফসল। একে আধুনিক শিল্পের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈপরীত্য বললে এতটুকুও বাড়িয়ে বলা হয় না। ছবিতে একটি বিলাসবহুল আধুনিক বাড়ি ও তার লাগোয়া সুইমিং পুল আঁকা হয়েছে। ডাইভিং বোর্ডে মৃদু স্পন্দন টের পাওয়া যাচ্ছে, পুলের জলে খানিক জলোচ্ছ্বাস! অথচ দূরে দুটি গাছ ব্যতীত একটি প্রাণীকেও দেখা যাচ্ছে না ত্রিসীমানায়! কে ঝাঁপ দিল জলে? সাঁতারু গায়েব! অনুপস্থিতিও যে কতখানি জোরালো বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এই ছবি! যেন দর্শকদের উদ্দেশে চিত্রশিল্পীর চ্যালেঞ্জ– এই রহস্য গল্পের চাবিকাঠি আপনারই হাতে! খুঁজে বের করুন দেখি!

হকনির অধিকাংশ ছবিতেই সুস্পষ্ট রঙিন দ্যোতনার নেপথ্যে এক ধরনের অব্যক্ত গল্প জাল বিস্তার করে চলে। শিল্পীর জীবনে যেসব তরুণ এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে পিটার শ্লেসিঙ্গারের প্রভাব ছিল সবচেয়ে গভীর। তাঁদের সম্পর্ক একই সঙ্গে ছিল প্রেমের, শিল্পের এবং পারস্পরিক বিকাশের। পিটার বারবার ফিরে এসেছেন হকনির ছবিতে– শুধু একজন মডেল হিসেবে নয়, বরং আত্মিক যোগসূত্রের এক আশ্চর্য অভিজ্ঞান হয়ে। ‘পিটার গেটিং আউট অফ নিকস্ পুল’ (১৯৬৬) ছবিতে যেমন হকনি এক আশ্চর্য মায়াময় নীল আলোয় এঁকেছেন নিজের প্রেমিক পিটারের নগ্ন ছবি, তেমনই ১৯৭২-এ আঁকা ‘পোর্ট্রেট অফ অ্যান আর্টিস্ট (পুল উইথ টু ফিগারস)’-এ আমরা দেখি একজন সুইমিং পুলের জলে ভেসে আছেন, আর একজন কোটপ্যান্ট-পরা ব্যক্তি (হয়তো হকনির নিজেরই অভিক্ষেপ) পাড়ে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে জলের দিকে চেয়ে! এ ছবির যত ব্যাখ্যা হয়েছে, আধুনিক শিল্পে তার তুলনা বিরল! যেন আশা, আকাঙ্ক্ষা, দূরত্ব, স্মৃতি, বিচ্ছেদ– ভেঙে যাওয়া সম্পর্কের এক সার্থক রঙিন অনুবাদ এই ছবি! দু’জন মানুষের ব্যবধান আদতে এক জলের প্রাচীর! রেকর্ড মূল্যে বিক্রি হওয়া এই ছবিটির আসল গুরুত্ব এর বাজারদর নয়, বরং ছবির বৌদ্ধিক দর্শনের খোলনলচে বদলে গিয়েছিল এই পেইন্টিংয়ের হাত ধরে।

‘মি. অ্যান্ড মিসেস ক্লার্ক অ্যান্ড পার্সি’ (১৯৭১) ছবিতে দেখা মেলে এক অভিজাত দম্পতির। ডিজাইনার ওজি ক্লার্ক শান্ত ভঙ্গিতে বসে, কোলে সাদা বেড়াল– পার্সি; অদূরেই দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী টেক্সটাইল ডিজাইনার সেলিয়া বার্টওয়েল (মিসেস ক্লার্ক)। বিবাহিত দম্পতির মধ্যে আবেগের অভাব যেন সাদাটে আলোতেই সুস্পষ্ট। পরিপাটি পরিবেশের মধ্যেও যেন কোথাও একটা ছন্দপতন ঘটে গিয়েছে। একই যুক্তির টানে ‘কার্বি (আফ্টার হোগার্থ) ইউজফুল নলেজ’ (১৯৭৫), ‘মুলহোল্যান্ড ড্রাইভ: দ্য রোড টু দ্য স্টুডিও’ (১৯৮০) ছবিগুলিও গল্প বলে চলে মনস্তত্ত্ব, রং অথবা দৃষ্টিনির্ভর পার্সপেক্টিভকে প্রশ্নের সামনে ঠেলে দিয়ে!

আকিরা কুরোসাওয়ার ‘ড্রিমস্’ (১৯৯০)-এর একটি গল্পে দেখা মেলে একজন চিত্রপ্রেমী দর্শকের। একটি ছবির প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে সে যেন আচমকাই সেঁধিয়ে যায় ক্যানভাসের মধ্যে। এক আঁকা থেকে অন্য আঁকার পথ ঘুরে, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে পৌঁছতে থাকে সে। শেষমেশ আঁকার চৌহদ্দি, নদী, মাঠ, গমক্ষেত পেরিয়ে হঠাৎই সে দেখা পায় স্বয়ং ভিনসেন্ট ভ্যান গখের। হকনির জীবন ও শিল্পসফরও যেন কতকটা সেই পথিকেরই মতো। মধ্যে মধ্যেই আঁকার দরজা ঠেলে যেন ঢুকে পড়েন গ্রেট মাস্টারদের স্টুডিওতে। রেনেসাঁ থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রাচীন ঐতিহ্য ও শিল্পকলা থেকে অহরহ খুঁজে বের করতেন ভবিষ্যতের শিল্পসৃষ্টির রসদ! ২০০১ সালে এই ভাবনা থেকেই ‘সিক্রেট নলেজ: রিডিসকভারিং ল্য লস্ট টেকনিকস্ অফ দ্য ওল্ড মাস্টার্স’ নামের দুর্দান্ত বইটি লেখেন হকনি। আজও যে কেতাবের পাতা উল্টোলে বিস্মিত হতে হয়!

রেনেসাঁর সার্থক উত্তরসূরি বলেই হয়তো এক মাধ্যমে বেশিদিন আটকে থাকা না-পসন্দ ছিল হকনির। সেকালের দা ভিঞ্চির রীতি মেনেই একালের হকনি তুমুল হইহল্লা বাধিয়ে দিলেন শিল্প মাধ্যমের ব্যবহারে। মানুষের চোখ যা দেখে, স্মৃতি সেই দৃশ্যেরই সম্পাদক। ছবি আঁকার মধ্যে সেই স্মৃতির সঞ্চয় একে একে সেলাই করে এক সুবিশাল দৃশ্যের অবতারণা করতে চাইলেন হকনি। প্রায়ই বলতেন– ‘পৃথিবী মোটেই আগের চেয়ে কিছু কম সুন্দর হয়ে যায়নি! মানুষই কেবল মন দিয়ে দেখতে ভুলে গিয়েছে।’ তাই বোধহয় ক্যানভাস ছেড়ে বেশ কিছুদিন ক্যামেরার চোখ দিয়ে নানান পার্সপেক্টিভকে জুড়ে দিলেন একরৈখিক পরিমিতিতে। পোলারয়েড ক্যামেরা, জয়েনার্স, পিকাসোর কিউবিজম মিলিয়ে মিশিয়ে এক নতুন দৃশ্যমাধ্যমের উদ্ভব ঘটালেন প্রায় একা হাতেই! শত শত আলাদা আলোকচিত্র জুড়ে তৈরি এক সুবিশাল ফোটোগ্রাফিক মোজাইক! ততদিনে আঁকা হয়ে গিয়েছে ‘পিয়ারব্লসম হাইওয়ে’ (১৯৮৬), ‘স্ট্যানলি অ্যান্ড বুজি’ (১৯৯৫)-র মতো আলোড়ন ফেলে দেওয়া ছবি! নিজভূমে (ইয়র্কশায়ারে) ফিরে আসার পরে প্রকৃতিই হয়ে উঠল সারাক্ষণের আগ্রহ! ‘বিগার ট্রিজ নিয়ার ওয়ার্টার’ (২০০৭), ‘উইন্টার টিম্বার’ (২০০৯) বা ‘মে ব্লসম অন দ্য রোমান রোড’ (২০০৯) ছবিগুলিতে দেখা গেল বাস্তব রঙের সীমা অতিক্রম করে হকনি প্রকৃতিকে যেন আরও প্রাণময়, আরও কাব্যিক করে তুলেছেন!

পুনরাবৃত্তিতে তাঁর আগ্রহ ছিল না। পরিণত বয়সে যখন অনেক শিল্পীই যখন প্রবল তর্কে ব্যস্ত– ডিজিটাল প্রযুক্তির আদৌ শিল্পীর স্টুডিওয় ঠাঁই হতে পারে কি না– হকনি তখন নিঃশব্দে হাতে তুলে নিলেন একটা আইফোন! অনেকেই বাঁকা চোখে দেখলেন বিষয়টি– পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ জীবিত চিত্রকর কি না ডিজিটাল মাধ্যমে আঁকিবুঁকি নিয়ে মত্ত! ছুঁৎমার্গ নিয়ে তোয়াক্কা নেই। হকনি অনড়– ‘একটি পেন্সিলের মর্যাদা কি তবে একটি পিক্সেলের চেয়ে বেশি?’ নতুন রঙের বাক্স খুলে শিশুরা যেমন আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়, আইফোন এবং পরে আইপ্যাড ব্যবহার করে ঠিক ততটাই আনন্দিত হয়েছিলেন ডেভিড! প্রত্যেকদিন জানলার বাইরে দেখা গাছগুলিকে তিনি আঁকতেন। একেক আঙ্গিকে। একেক ঋতুতে। প্রকৃতির পট পরিবর্তনের সাক্ষী তাঁর ডিজিটাল স্কেচবুক! আগাগোড়া আইপ্যাডে আঁকা ‘দ্য অ্যারাইভাল অফ স্প্রিং ইন ওয়াল্ডগেট, ইস্ট ইয়র্কশায়ার’ (২০১১) ছবিটিতে দীর্ঘ শীত থেকে বসন্তে প্রকৃতির রূপান্তরের উদযাপন এঁকেছিলেন হকনি। চিরাচরিত ল্যান্ডস্কেপ ছবির সঙ্গে প্রযুক্তির সার্থক গাঁটছড়া বেঁধে সমালোচকদের মুখ বন্ধ করেছিলেন শিল্পীর স্নিগ্ধতায়।

২০২০ সালে কোভিড-অতিমারী আঘাত হানল অপ্রত্যাশিতভাবে। রাস্তাঘাট ফাঁকা, জাদুঘরের দরজা বন্ধ, গ্যালারির কাচে পুরু ধুলোর আস্তরণ, মানুষ গৃহবন্দি। সংক্রমণের গ্রাফ আর টেলিভিশনের বুলেটিন আতঙ্কের বিস্তার করেছে সর্বত্র। হকনি সে সময় ছিলেন নরম্যান্ডির গ্রামাঞ্চলে। অভ্যাসে ছেদ নেই। বৃদ্ধ শিল্পীর হাত অক্লান্ত আঁচড় কেটে চলে পেন ট্যাবে। দেখতে দেখতে বসন্তের রং এসে জমা হল হকনির আইপ্যাডে।

জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শিল্পীর চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। বসন্তে কি শুধু কেবল ফোটা ফুলের মেলা? বটেই তো! হথর্ন গাছ তো আর খবরের কাগজ পড়ে না, ঠিক যেমন ড্যাফোডিল ফুলও লকডাউনের প্রতি উদাসীন। সেই সময় নিজের আঁকা উজ্জ্বল ছবির সঙ্গে অগুনতি বন্ধুকে মোবাইলে একটিমাত্র মেসেজ পাঠিয়েছিলেন হকনি– ‘ডু রিমেমবার, দে কান্ট ক্যানসেল দ্য স্প্রিং!’– মনে রেখো, বসন্তকে কেউ বাতিল করতে পারে না– বাক্যটি আশ্চর্য দ্রুততায় ছড়িয়ে পড়ল সারা পৃথিবীতে। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, টালমাটাল পরিস্থিতি, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মাঝে হকনি উচ্চারণ করেছিলেন এক শান্ত, গভীর সত্য। চরম বিপর্যয়ের দিনেও প্রকৃতি নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখে। বসন্ত তো কেবল একটি ঋতু নয়, বরং তা পৃথিবীর প্রাচীন প্রতিশ্রুতিগুলির একটি! চিরব্যথার বনে বসন্ত যে কখনও ফুরয় না! তেমনই প্রতিটি সংকটের পরে মানুষেরও পুনরুত্থান সম্ভব! শিল্পের ভাষা যেন নিমেষেই হয়ে উঠেছিল মানুষের সান্ত্বনা ও এক গভীর জীবনবোধ!

২০২৫ সাল। হকনি তখন বয়সের ভারে কিছুটা দুর্বল। হুইলচেয়ারের সঙ্গে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মানিয়ে নিতে হয়েছে। কিন্তু মনের বয়স বাড়েনি। এমনই সময়ে প্যারিসে আয়োজিত হল তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী– ল্যুই ভিতোঁ ফাউন্ডেশনের ‘ডেভিড হকনি ২৫: ডু রিমেম্বার দে কান্ট ক্যানসেল দ্য স্প্রিং’। এগারোটি গ্যালারি জুড়ে শিল্পীর সাত দশকের কাজের থেকে নির্বাচিত ৪০০-টি অরিজিনাল আর্টওয়ার্কের এক্সিবিশন! ক্যালিফোর্নিয়ার সুইমিং পুল থেকে ইয়র্কশায়ারের বনভূমি, অপেরার মঞ্চসজ্জা থেকে ডিজিটাল ইনস্টলেশন– কী নেই সেই বিরাট তালিকায়! প্রদর্শনীর বিন্যাসে অশক্ত শরীরেও হকনি নিবিড়ভাবে যুক্ত থেকেছেন। গ্যালারির প্রবেশদ্বারে দর্শকদের স্বাগত জানাচ্ছিল তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি– ‘মনে রেখো, বসন্তকে কেউ বাতিল করতে পারে না!’ সেই স্বাগত ভাষণ যে আদতে বিদায়ের ইঙ্গিত তা কেউ বুঝতে পারেনি। সত্যিই সুযোগ দেননি ডেভিড। মৃত্যু এল নিঃশব্দে। ১১ জুন, ২০২৬ সালে নিজের বাসভবনেই ঘুমের দেশে চলে গেলেন। বিশ্বের সব প্রান্ত থেকে এসেছিল অগণিত মানুষের শোকবার্তা। ভাবতে অবাক লাগে, মাত্র কয়েকমাস আগেই সারা পৃথিবী তোলপাড় করে দেওয়া প্রদর্শনী করেছিলেন যে শিল্পী, তাঁরই শেষকৃত্য হল লোকচক্ষুর আড়ালে। নিতান্তই অনাড়ম্বরভাবে। শিল্পীর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মাত্র দু’জন নিকটাত্মীয় হাজির ছিলেন সে অনুষ্ঠানে।

এদিকে সেই পথটি কিন্তু তখনও অপেক্ষায়। ভিনসেন্টের ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। অঁরি একবার ফুলে ঢাকা গাছের দিকে তাকাচ্ছেন, আরেকবার দেখছেন ট্যাঁকঘড়ি। ‘এত রং দেখতে গিয়ে আমরা বোধহয় ভুল পথেই চলে এসেছি’, বিড়বিড় করে বললেন ভ্যান গখ। মৃদু হেসে মাতিস বললেন, ‘হয়তো ঠিক, আবার হয়তো নয়। আসল ভুল পার্সপেক্টিভে।’ ঠিক তখনই পাশের বাগান থেকে ভেসে এল হাসির শব্দ– ‘গুড ইভনিং, জেন্টলমেন! আপনাদের আমার অভিবাদন।’ অঁরি এবং ভিনসেন্ট চমকে তাকিয়ে দেখলেন আরেকজন ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন তাঁদের দিকে। গায়ে চেক-কাটা জ্যাকেট, চোখে হলুদ রঙের চশমা, হাতে অন্যমনস্কভাবে ধরা একটি সিগারেট। একটা প্রত্যয়ের হাসি যেন খেলে গেল তিনজনের মুখে। পরিচয়ের আর যেন প্রয়োজনই রইল না। কোন শতাব্দী থেকে কে এসেছেন, সে প্রশ্নও গুরুত্ব হারাল অচিরেই। দুই পূর্বসূরির সঙ্গে একযোগে হকনি চেয়ে রইলেন আদিগন্ত বিস্তৃত মাঠগুলোর দিকে– সবুজ, হলুদ, বেগুনি, লাল– রঙের ঢেউ– যা একই সঙ্গে কারও নয়, আবার সকলের।

ভিনসেন্ট চিনলেন সাহস, অঁরি চিনলেন রং, ভেভিড চিনলেন আলো। কিছুক্ষণ সবাই চুপচাপ। তারপর তিনজন পথ চলতে শুরু করলেন। অন্তহীন ফুলের বাগানের মধ্যে দিয়ে। প্রতিটি মোড়ে নতুন নতুন পথ। কোথাও আকাশের চাঁদোয়ায় ইয়র্কশায়ারের নীল, কোনও পথ ধার নিয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ার জ্যামিতি– যেন একটি চিনা স্ক্রল সবেগে খুলে যাচ্ছে নরম্যান্ডির তৃণভূমিতে। নৈঃশব্দ্য ভেঙে ডেভিডই হঠাৎ বললেন, ‘জানেন, দেখার এখনও আরও অনেক কিছু বাকি!’ আবার সব চুপচাপ। তিন শিল্পী একযোগে হাঁটতে লাগলেন এমন এক অলৌকিক ভূদৃশ্যের মধ্যে দিয়ে, যা বিস্তৃত হয়ে আরও ঘন হয়ে আসে। আলোর পানে প্রাণের চলার মতো সেই সঞ্চারপথ। চিরব্যথার বন পেরিয়ে সবার অলক্ষে বসন্ত তখন আবারও নতুন করে সেজে উঠছিল। শেষ আলোর সোনায় তখন চরাচর ভেসে যাচ্ছে…
*ছবি সৌজন্য: দ্য ডেভিড হকনি ফাউন্ডেশন
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved