


ঘরানার সংঘাত যেহেতু লেগেই থাকে, তাই লাতিন আমেরিকার ফুটবলের খারাপ দিকগুলো বারবার উঠে আসে মিডিয়ায়। এ-কথা অনস্বীকার্য যে, বিগত বছরগুলোতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে সহজাত ড্রিবলারের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। তার কারণ কী? মূল উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে ফুটবলের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ায়।
‘কুৎসিত ফুটবল কি শুধু ওরাই খেলতে পারে? প্রয়োজন পড়লে আমরাও হাত নোংরা করতে যে পারি, সেটা বুঝিয়ে দিতে পেরেছি।’
খেলা শেষে ফ্রান্সের মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপের বক্তব্যে ঝরে পড়ছিল এক রাশ বিরক্তি। আক্রমণের নিশানায় রাউন্ড অফ ১৬-এ ফ্রান্সের কাছে ১ গোলে পরাজিত দক্ষিণ আমেরিকার প্যারাগুয়ে। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যে ম্যাচ মনে থাকবে মুহুর্মুহু ফাউল, ধাক্কাধাক্কি এবং খেলা থামার জন্য। যার অধিকাংশের দায়ই বর্তায় প্যারাগুয়ের ফুটবলারদের ওপর। যে ফ্রান্স এতদিন দুর্বার গতিতে ছুটছিল, তাদের তীব্র আক্রমণাত্মক ফুটবলের ফলায় চিরে ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছিল বিপক্ষের রক্ষণভাগ, এ হেন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একটা গোল পেতে তাদের যেন কালঘাম ছুটে গেল!
তবে ফ্রান্সের কষ্টার্জিত জয়ের দিনে বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ফিরে এসেছে সেই পুরনো প্রশ্ন। ‘লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানেই শিল্প’, ‘ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার ফুটবলের লড়াই মানেই শক্তি, গতি বনাম শিল্পের লড়াই’– গড়পড়তা বাঙালি ফুটবলমহলে এমন সব ধারণা প্রচলিত আছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ‘কোথায় গেল সেই শিল্প?’ লাতিন আমেরিকার ফুটবল মানে এখন পড়ে থাকা শিল্পের ছিটেফোঁটা, একজন মেসি, একজন নেইমার কিংবা ভিনিসিয়াস, বড়জোর ফুটবল জীবনের সায়াহ্নে আসা হামেস রডরিগেজ। উল্টোদিকে ইউরোপের ফুটবল পরিচ্ছন্ন, গোছানো। ইউরোপের ফুটবল আসলে ‘উন্নত’, বাকিরা ধারেকাছে আসে না। এমনটা মনে করেন ইউরোপের অনেক তারকা ফুটবলার, প্রশিক্ষকও। তাই নিয়ে বিতর্কও চলে। গত বিশ্বকাপের আগে ও পরে এই বিষয়েই এমবাপের মন্তব্য এবং এমিলিয়ানো মার্তিনেজের প্রত্যুত্তর ঘিরে সংবাদমাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনা চলে, সমাজমাধ্যমও ভাগ হয়ে যায়। এবারের বিশ্বকাপেও প্যারাগুয়ে কিংবা ইকুয়েডরের কাছে জার্মানির হারের পরে এ-ধরনের আলোচনা হচ্ছিল। ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে ম্যাচ নতুন করে উসকে দিল সেই তর্ককে।

বিশ্বফুটবলের মানচিত্র গুলে খেয়েছেন যে-সব ফুটবল গবেষক, তাঁরা এই ধরনের ‘বাইনারি’কে খুব একটা ভালো চোখে দেখেন না। অনেকের মতেই, ফুটবল দেখার ধারণা গভীরভাবে ইউরোপ-কেন্দ্রিক হয়ে ওঠায়, এ-রকম দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। কথাটা একেবারেই ফেলনা না।
বিশ্বফুটবল কালে কালে যে প্রবলভাবে ইউরোপমুখী থেকে ইউরোপ-প্রধান হয়ে উঠেছে, তার নেপথ্যে এক বিস্তৃত আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট তো রয়েছেই। এছাড়াও রয়েছে, এক একটা জায়গার নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতিকে জানা-বোঝার অভাব। বিশ্বায়নের চাকা সারা বিশ্বের ফুটবলকে একইরকম ‘গ্লোবাল গেম’ করে তুলতে চেয়েছে, বেশ খানিকটা সমর্থও যে হয়েছে, তা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। কাজেই ছিন্ন হয়েছে সংস্কৃতির শিকড়। আর ভৌগোলিক দূরত্বে বসে টেলিভিশন কিংবা আজকের সেকেন্ড স্ক্রিনে দর্শক চেখেছে সেই ফুটবলকে।
কোচের ট্যাকটিক্স থেকে ফুটবল দর্শন বা শৈলী– সমস্ত আলোচনাটাই জোরালো হয়েছে ইউরোপীয় কিংবা ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল নিয়ে চর্চা করা মিডিয়ার মাধ্যমে। জোনাথন উইলসনের মতো স্বল্প সংখ্যক ফুটবল লিখিয়ে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন অন্য ধারার কথা, সাংস্কৃতিক দিককে দেখার কথা। তবে কিছু বছর আগে অবধি সেই আলোচনা বেশি প্রাধান্য পায়নি। ইদানীং মূলধারার মিডিয়াতেও উঠে আসছে ফুটবল কৌশল কিংবা শৈলীতে সাংস্কৃতিক প্রভাবের আলোচনা– এক একটা দেশের ফুটবল সংস্কৃতি সেখানকার ফুটবল কৌশল কিংবা ফুটবল খেলার ধরনকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে গতবার আর্জেন্টিনা পুরুষদের বিশ্বকাপ জেতার পর থেকেই এই ঝোঁক বেড়েছে, কারণ স্কালোনি-সহ আর্জেন্টিনার কোচেরা বারবার বলেছেন– সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরার কথা।

‘লা গারা গুরানি’ (বা গুয়ারানি) অর্থাৎ, গুরানি উপজাতির থাবা। প্যারাগুয়ের ফুটবলের আত্মা। ব্রাজিলের ফুটবল চেনার উপায় যদি ‘জোগো বোনিতো’ হয়, আর্জেন্টিনার রয়েছে ‘লা নুয়েস্ত্রা’। তেমনই প্যারাগুয়ের গুরানি উপজাতির নামের ভিত্তিতে তাদের ফুটবল ঘরানাকে চেনা যায়। কঠোর প্রত্যয়, জমাট রক্ষণ আর দুর্নিবার সাহস। এই তিনে ভরসা করেই সময় বুঝে প্রতিআক্রমণ। ফলশ্রুতিতে ‘সেন্ট্রো’, ‘ক্যাবেজা’, ‘গোল’ অর্থাৎ, ক্রস (বা সেন্টার), হেড এবং গোল। বিপক্ষের আক্রমণ রুখতে জানকবুল লড়াই। সে লড়াইয়ে নান্দনিকতা কতটা সে-পণ্ডিতরা বিচার করতে পারেন। তবে প্রবল শক্তির প্রতিপক্ষকে আটকে রাখতে অনেকটাই সক্ষম তারা।
সম্প্রতি ‘দ্য অ্যাথলেটিক’-এ টম ডেভিসের আলোচনায় উঠে এসেছে প্যারাগুয়ের ফুটবল সংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্য। শুনতে আশ্চর্য হলেও এটা সত্যি, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্যারাগুয়ে নক আউট স্টেজে যতবার হেরেছে স্কোর লাইন ছিল ০-১। বিপক্ষে দু’বার ফ্রান্স, একবার জার্মানি আর একবার স্পেন। বর্তমান দলে হুলিও এনসিসো কিংবা আলমিরনের মতো সৃষ্টিশীল ফুটবলার থাকলেও প্যারাগুয়ে জাতীয় দল তাদের মূল পরিচিতি থেকে পিছু হটেনি।
উপনিবেশের ধাক্কা সামলে, একাধিক যুদ্ধ আর অসুখ পেরিয়েও গুরানি উপজাতি যেমনভাবে টিকে গিয়েছে, টিকে গিয়েছে তাদের ভাষা, সেই ইতিহাসকেই আত্মস্থ করে গড়ে উঠেছে ‘লা গারা গুরানি’। ফুটবলাররা লড়াই দিয়েছে শরীর দিয়ে, সেই ফুটবল দৃষ্টিনন্দন হয়নি অনেক সময়ই। ‘বডি কন্ট্যাক্ট গেম’কে তুঙ্গে নিয়ে গিয়ে বিরাগভাজন হয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের।

ফুটবলের গা-জুড়ে উপনিবেশের দীর্ঘ ক্ষত। উনিশ শতকে দক্ষিণ আমেরিকায় যখন ফুটবল খেলা এল, তখন তা ঔপনিবেশিকদেরই খেলা। ধীরে ধীরে সে খেলাকে আপন করে নিলেন স্থানীয় মানুষজন। ফুটবলের ‘ক্রিওলাইজেশন’ ঘটল। অর্থাৎ, ফুটবলের ঘরোয়া রূপ গড়ে উঠল। এদোয়ার্দো গ্যালিয়ানো তাঁর বিখ্যাত বই ‘সকার ইন সান অ্যান্ড শ্যাডো’-এ দেখালেন কীভাবে ব্রাজিলের রিও দি জেনেইরো বা সাও পাওলো বা আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস কিংবা উরুগুয়ের মন্টিভিডিও-তে ফুটবল এক একরকম ভাবে গ্রহণীয় হয়ে উঠল। আর্জেন্টিনায় বলে শুধু লাথি মারার পরিবর্তে তারা বলকে নিজেদের পায়ে বেশি করে রাখতে চাইল, অনেক যত্ন নিয়ে। তাতে মিশল স্থানীয় নাচের অনুষঙ্গ, যেন বলের গায়ে পা দেওয়া গিটারের সুর তোলার সমান। ব্রাজিলেও বল নিয়ে ছন্দময় দৌড় এল স্থানীয় নাচের তালে, কোমরের দোলায় সে দৌড়ে লাগল সৃষ্টির আলোড়ন। ট্যাঙ্গো বা মিলোঙ্গা, কাপেইরো কিংবা সাম্বা– এই সব নাচের মধ্যেই মিশে আছে মিশ্র সংস্কৃতি। যার মধ্যে রয়েছে আফ্রিকার অবদান। ক্রীতদাস প্রথার বলি হয়ে এইসব দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল যারা, তাদের পরের প্রজন্মের সমন্বয়ী পরিচিতির (আফ্রো-ব্রাজিলীয় কিংবা আফ্রো-আর্জেন্টিনীয়) সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছিল বিভিন্ন নাচ। ফুটবলে লাগল তারই ছোঁয়া। গড়ে উঠল শিল্পের এক নতুন প্রকাশ। ব্রাজিলে ‘জোগা বোনিতো’ বা সুন্দর ফুটবল প্রস্ফুটিত হল কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের হাত ধরেই। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য থেকে ফুটবল খেলায় এই অধিকারের লড়াই সহজ ছিল না। গ্যারিঞ্চা, পেলে থেকে শুরু করে রোনাল্ডিনহো পেরিয়ে নেইমার, ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত শৈল্পিক ফুটবলের উৎস লুকিয়ে রয়েছে এই সাংস্কৃতিক প্রেক্ষিতেই।

তবে আর্জেন্টিনায় ছবিটা অন্য। উনিশ শতকের শেষদিক থেকেই কৃষ্ণাঙ্গদের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার কাজ চলতে থাকে, বিবিধ রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ায়। তাই ফুটবল দলেও তার প্রতিফলন পড়ে। জায়গা নেয় স্পেন, ইতালির অভিবাসীরা। তবে খেলার ধরনে থেকে যায় মিশ্র, সমন্বয়ী সংস্কৃতির ছোঁয়া। আর্জেন্টিনার ফুটবলশৈলীর প্রকাশভঙ্গিও পালটায় বিভিন্ন সময়ে, কখনও কখনও তা রূপ নেয় প্রবল কঠোরতারও। মারাদোনা-মেসিরা উঠে আসেন এই দ্বান্দ্বিকতার মধ্য থেকেই। তবে এইসব দেশের ফুটবলের শিল্প প্রকাশভঙ্গির সঙ্গে ফরাসি তুলির টানের সুষমার পার্থক্য আছে। কারণ, এখানে মিশে আছে অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াই। ঔপনিবেশিক শাসনের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষত পেরিয়ে, প্রবল দারিদ্র থেকে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করার লড়াইয়ে ভিড় করে খিদে, জেদ। ফলে, খেলার মাঠে তার বহিঃপ্রকাশ হয় রুক্ষ, কুৎসিত।
শুধু তো ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা নয়, উরুগুয়ের ‘গারা চারুয়া’-র পিছনেও আছে একই রকম ইতিহাস। প্রাচীন চারুয়া জনজাতির ইউরোপীয়দের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস বুকে করে নিয়ে চলে সেখানের ফুটবল সংস্কৃতি। সেখানেও মিশে থাকে হার না মানা জেদ, রাস্তা থেকে উঠে আসা ফুটবলের শৈল্পিক অভিব্যক্তি। নয়ের দশকে কলম্বিয়ার ফুটবলকে বদলে দেওয়া ফ্রান্সিসকো মাতুরানা মনে করতেন, ফুটবল সংস্কৃতি প্রকাশেরই একটা মাধ্যম। তাঁর হাত ধরেই উঠে এসেছিল ‘toque toque’ বা টাচ-নির্ভর ফুটবল। ফুটবলের নিজস্ব ভাষা তৈরি করতে পেরেছিল লাতিন আমেরিকার দেশগুলো। চিলি, পেরু কিংবা পাশের মহাদেশের মেক্সিকোও।

লাতিন আমেরিকার ফুটবলে শিল্প এবং লড়াইয়ের সংমিশ্রণের ইতিহাস এভাবেই খুঁজত ফুটবলপ্রেমীরা। কিন্তু বহু বছর ধরেই ধীরে ধীরে অনেকটা বদলে গিয়েছে ছবিগুলো। ২০১৪-র বিশ্বকাপের ব্রাজিল-কলম্বিয়া খেলার কথাই ধরা যাক, যে-খেলায় জুনিগার সঙ্গে সংঘর্ষে নেইমারের ফুটবলজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়েছিল। ম্যাচে ফাউল হয়েছিল ৫৪টা! ব্রাজিল ফাউল করেছিল ৩১টা, বাকি অবদান কলম্বিয়ার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বাধিক ফাউল হওয়া ম্যাচগুলোর মধ্যে লাতিন আমেরিকার দলগুলোর নাম থাকেই। এ যেন এক অন্য ছবি। অবশ্য ২০০৬-এ নুরেমবার্গের কুৎসিত পর্তুগাল-নেদারল্যান্ডস ম্যাচে কার্ডসংখ্যা মোট ফাউলের সংখ্যার কাছাকাছিই ছিল।

তবে ঘরানার সংঘাত যেহেতু লেগেই থাকে, তাই লাতিন আমেরিকার ফুটবলের খারাপ দিকগুলো বারবার উঠে আসে মিডিয়ায়। একথা অনস্বীকার্য যে, বিগত বছরগুলোতে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো থেকে সহজাত ড্রিবলারের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। তার কারণ কী? মূল উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে ফুটবলের নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ায়। আর এর জন্য আঙুল তোলা যেতে পারে বিশ্ববন্দিত টোটাল ফুটবল কিংবা সোভিয়েত ঘরানার ফুটবলের পরম্পরার দিকে। তার মানে এই নয় যে, এই ফুটবল ঘরানাগুলো সংস্কৃতির অভিব্যক্তি ছিল না। তবে লাতিন আমেরিকার ব্যক্তিক অভিব্যক্তি নির্ভর (subjective expression) ফুটবলের যে ধারণা, তার বিপরীতে গিয়ে ফুটবলের ভাষা হয়ে উঠেছিল অনেক বেশি নৈর্ব্যক্তিক এবং সর্বজনীন। এর জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লে নিজস্ব সংস্কৃতিজাত ফুটবলের ভাষা আধুনিক ফুটবলের আঙিনায় জমি হারায়, ক্ষতি হয় লাতিন আমেরিকার ফুটবলের। আর এর নেপথ্যে রয়েছে অর্থনীতির বড় অবদান। লাতিন আমেরিকার খেলোয়াড়ের ভিড় বাড়তেই থাকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। বিশ্বায়নের হাত ধরে ইউরোপীয় ফুটবলের বাজার ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। খুব অল্প বয়সেই কার্যত জাহাজ বোঝাই হয়ে ‘রফতানি’ হতে থাকে কিশোর ফুটবলারেরা। ইউরোপীয় ফুটবলের তীব্র নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমের মধ্যে ফুটবল খেলতে খেলতে অনেক ক্ষেত্রেই শেষ হয়ে যায় ফাভেলা বা পোত্রেরো-তে খেলে আসা ফুটবলের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি।
২০২৬-এর সিআইইএস ফুটবল অবজারভেটরির তথ্য অনুযায়ী, ব্রাজিল রফতানিকারক দেশদের মধ্যে প্রথম এবং ব্রাজিল থেকে বেরিয়ে যাওয়া এই সব ফুটবলাররা পাড়ি জমায় পর্তুগালের দিকে। দেশজ ফুটবলের শিকড় থেকে কম বয়সেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং নতুন সিস্টেমে মানিয়ে নেওয়ার ফলেই হয়তো হারিয়ে যায় অনেক প্রতিভা। এছাড়া রয়েছে ফলাফল-কেন্দ্রিক পেশাদারি ফুটবলের দুনিয়া। কার্যকারিতাই সেখানে প্রাধান্য পায়। দরকারের অধিক ড্রিবলিং সেখানে বারণ। কেউ বেশি ড্রিবলিং করলে বলা হয় ‘শো বোটিং’ করছে!

হোসে মোরিনহোর মতো কিংবদন্তি প্রশিক্ষক মনে করেন– দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ যোগ্যতা অর্জন পর্বের খেলা ইউরোপের থেকে অনেক বেশি কঠিন। তবে সারা বছর ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলে মজে থাকা অনেকেই এমনটা মনে করেন না, তাদের মতে ইউরোপের ফুটবল অনেক বেশি পরিণত। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে এবার দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধি ছিল ৬ দেশ, আর ইউরোপের প্রতিনিধি ১৬। দুই মহাদেশ মিলিয়ে লাতিন আমেরিকার কথা ধরলে সংখ্যাটা ৯। বিশ্বকাপে শুরুর দিকে দুই ঘরানার মধ্যে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর চললেও শেষ আটে জায়গা হয়েছে মাত্র একটা লাতিন আমেরিকার দলের। ইতালীয় প্রশিক্ষক আনসেলোত্তির কোচিংয়ে ম্যাচ বের করে নিয়ে যাওয়ার মতো কার্যকরী ফুটবল খেললেও সে ফুটবল-শৈলীতে চটেছেন ব্রাজিলের দীর্ঘদিনের সমর্থকরা। সমাজমাধ্যমে অনেকেই লিখেছেন, ব্রাজিল দলের জার্সি গায়ে মনে হচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদের খেলা দেখছেন তারা, উধাও ব্রাজিলীয় ফুটবলের ছন্দ, ব্যতিক্রম শুধু ভিনিসিয়াস। নরওয়ের কাছে হারের পরে রোমারিও-র মতো প্রাক্তনরা কোচকে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে, উরুগুয়ে পরপর দু’বার গ্রুপের বাধা টপকাতে পারেনি, নিন্দিত হয়েছেন আর্জেন্টিনীয় কোচ বিয়েলসা। সাড়া জাগিয়ে শুরু করেও শেষরক্ষা হয়নি কলম্বিয়ার, সুইসদের বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে থেমে গিয়েছে তাদের স্বপ্নের দৌড়। এক ম্যাচে ঝলক দেখিয়ে হারিয়ে গিয়েছে ইকুয়েডরও। আর প্যারাগুয়ে জার্মানিকে হারালেও ‘খারাপ’ ফুটবল খেলার জন্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তারা। দুরন্ত মেক্সিকোর প্রাণপাত লড়াই থেমে গিয়েছে শক্তিশালী ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। আর গতবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা? শেষ আটে লাতিন ঘরানার একমাত্র প্রতিনিধি হলেও শেষ দুই ম্যাচে তাদের জয় হয়েছে কষ্টার্জিত। মিশরের বিরুদ্ধে লড়াকু প্রত্যাবর্তনের জয় ঢেকে গিয়েছে রেফারিং বিতর্কে। এদিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে এমবাপেদের ইউরোপ। ফুটবলের বিচারে তাঁদেরকেই ‘ফেভারিট’ তকমা দিচ্ছেন ফুটবল-বিশেষজ্ঞরা। পিছিয়ে নেই ইংল্যান্ড এবং স্পেনও।
ইউরোপ বনাম লাতিন আমেরিকার ঘরানার লড়াইয়ে কে জিতবে, তা নির্ধারণ হবে কিছুদিন বাদেই। তবে একথাও সত্যি, ইউরোপের দেশগুলোর ফুটবল ঘরানাও পালটে গিয়েছে। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বজয়ের পরে ধারাবাহিক তিন বিশ্বকাপে ব্যর্থতার নেপথ্যে অনেকেই দায়ী করছেন প্রথাগত ফুটবল সংস্কৃতি থেকে খানিক পিছু হটাকে। তবে ইউরোপের ক্ষেত্রে এটাই একমাত্র দিক নয়। তার উপনিবেশের ইতিহাস, অর্থনৈতিক শক্তি এবং অভিবাসন নীতির ইতিবাচক ফল এসেছে ঘরে, পুষ্ট হয়েছে বদলে চলা ফুটবল-সংস্কৃতি।

১৯৯৮ থেকেই মাল্টি কালচারালিজমের ধ্বজা তুলে ধরে বিশ্বকাপে এক নতুন শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে ফ্রান্স। শেষ তিন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ধারাবাহিকভাবে খেলার কৃতিত্ব অর্জন করেছে তারা। দলে প্রতিভার ছড়াছড়ি, দলের বাইরে অপেক্ষমাণ এক নতুন প্রজন্ম। স্পেন কিংবা ইংল্যান্ডেও তাই। আগামিদিনেও এই ছবি বদলানোর সম্ভাবনা কম। তাই আপাতত ঘরানার লড়াইয়ে শেষ হাসি হাসার জন্য এগিয়ে থাকবে তারাই।
একই কারণে ভবিষ্যতের বাঙালি ফুটবলপ্রেমীদের আকর্ষণ ইউরোপের দেশগুলোর ফুটবলের প্রতি ঘুরে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যদি না মেসি, নেইমারের উত্তরসূরি হিসেবে জলদি উঠে আসেন আরও কেউ। ঘরানার লড়াই কি সহজে ছেড়ে দেবেন লাতিন আমেরিকানরা?
…………………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন গোলগপ্পো-র অন্যান্য লেখা
…………………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved