Robbar

যে কুসুম ঝরে গেছে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 12, 2026 7:59 pm
  • Updated:July 12, 2026 7:59 pm  

‘স্নেহলতা’ ব্যতীত আরও যে তিনটি উপন্যাসের খোঁজ মেলে, ‘প্রেমলতা’ উপন্যাস তার অন্যতম। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র এই গ্রন্থ সম্বন্ধে লিখলেন– “আমার বিবেচনায় গ্রন্থখানি যত দূর উৎকৃষ্ট হইতে পারে, তাহার ত্রুটি হয় নাই।… প্রত্যেক পরিবারে একখানি ‘প্রেমলতা’ থাকা বাঞ্ছনীয়।” রাজনারায়ণ বসুর মতে, ‘এরূপ উপন্যাস অনেক কেতাদুরস্ত ধর্মোপদেশ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’

আলপনা ঘোষ

উনিশ শতকে নানা বিরূপ পরিস্থিতির মধ্যেও যে স্বল্পসংখ্যক মহিলা লেখক, কবি সাহিত্যচর্চা করে গিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে অন্যতম ছিলেন কুসুমকুমারী রায়চৌধুরী। যদিও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি কিন্তু চিরদিন প্রায় পরিচয়হীনা হয়ে রয়ে গিয়েছেন। 

কুসুমকুমারীর জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশ ভারতের অধুনা উত্তরপ্রদেশের মৌনপুরি অঞ্চলে। তাঁর জন্মতারিখ কিংবা সাল সবই অজ্ঞাত থেকে গিয়েছে। কুসুমকুমারীর বিবাহ হয়েছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বরিশাল জেলার অন্তর্গত লাকুটিয়া জমিদার পরিবারের শিক্ষিত, উদারমনস্ক পুরুষ রাখালচন্দ্র রায়চৌধুরীর সঙ্গে। স্বামীর উৎসাহ ও সহযোগিতায় কুসুমকুমারী দেবীর বিদ্যা অর্জন ও সংগীত-শিক্ষা শুরু হয়। কিছুকালের মধ্যেই তাঁর স্বামীর সঙ্গে তিনি ব্রাহ্মসমাজের অন্তর্ভুক্ত হন এবং সমাজে উপাসনা সভায় নিয়মিত ব্রহ্মসংগীত পরিবেশন করা শুরু করেন। এরই পাশাপাশি চলল সাংসারিক কর্মব্যস্ততার ফাঁকে সাহিত্যচর্চা, মাতৃভাষায় লেখালিখি ও গ্রন্থরচনা। সাহিত্যরচনার ক্ষেত্রে কুসুমকুমারী ছিলেন অসাধারণ সৃজনীশক্তির অধিকারিণী। তবে একথাও অনস্বীকার্য যে সে যুগের সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর সাহিত্যক্ষেত্রে এতদূর অগ্রসর হওয়া হয়তো সম্ভব হত না, যদি না তাঁর স্বামী রাখালচন্দ্র তাঁর সহায় হতেন। তবে স্বামীর হাত ধরে কুসুমকুমারীর এইভাবে ব্রাহ্মসমাজে যোগ দেওয়াকে অবশ্য রক্ষণশীল হিন্দুসমাজ মেনে নিতে পারেনি। রায়চৌধুরী দম্পতিকে হিন্দুদের তীব্র রোষানলে পড়তে হয়েছিল। একজন স্বাধীনচেতা ও প্রগতিশীল নারী হিসেবে, সমাজের নানাবিধ কুসংস্কার ও বিরোধিতার বিরুদ্ধাচরণ করা, আবার তারই পাশাপাশি পারিবারিক সামঞ্জস্য বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া খুব সহজ ছিল না কুসুমকুমারীর পক্ষে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাই তাঁকে নানা মানসিক ও সামাজিক দুঃখকষ্টের সম্মুখীন হতে হয়েছে।

কুসুমকুমারী দেবীর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘স্নেহলতা’। বাংলা সাহিত্যে কে প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক– তাই নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ আছে। সে যুগে সাহিত্যক্ষেত্রে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির পুত্রকন্যাদের অবদানের কথা ছিল সর্বজনবিদিত। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং সাহিত্যক্ষেত্রে ঠাকুরবাড়ির কন্যা ও বধূরা ছিলেন মহিলাদের মধ্যে নেত্রীস্থানীয়া। তাই স্বাভাবিকভাবেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকারেরা প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিকের শিরোপাটি অর্পণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের অগ্রজা সুসাহিত্যিকা স্বর্ণকুমারী দেবীকে, তাঁর রচিত ‘দীপনির্বাণ’ ঐতিহাসিক উপন্যাসের জন্য– যার প্রকাশকাল সম্ভবত ১৮৭৬ বলে জানা যায়। এই তথ্য বহুলপ্রচারিত শুধু নয়, এই তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তেমনভাবে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি কোনওদিন। আজ পর্যন্ত স্বর্ণকুমারী দেবীই প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিকের পদটি সসম্মানে অলংকৃত করে আছেন। 

উইকিপিডিয়াতে অবশ্য একাধিক উপন্যাসের লেখিকা কুসুমকুমারী রায়চৌধুরীর নাম ও তাঁর রচিত গ্রন্থাবলির উল্লেখ মেলে। ব্যস, এই পর্যন্তই। ভিন্ন সূত্রে জানা যায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কথা যাঁরা এই স্বল্পপরিচিত ঔপন্যাসিকের লেখা দু’টি গ্রন্থ সম্বন্ধে শুধু প্রশংসা নয়, তাঁদের মূল্যবান মতামত লিখিতভাবে প্রকাশ করেছেন। যদিও আমজনতা পাঠকের কাছে এই তথ্যটি প্রায় অজ্ঞাত রয়ে গিয়েছে, যেমন অজ্ঞাত রয়ে গিয়েছে ঔপন্যাসিক কুসুমকুমারীর সাহিত্যপ্রতিভার কথা। পরবর্তীকালে অবশ্য ‘সংসদ চরিতাভিধান’ গ্রন্থে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কুসুমকুমারী দেবীকে বাংলা ভাষায় প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকার করা হয়েছে। এই গ্রন্থে লেখা আছে “…কুসুমকুমারী রায়চৌধুরী, একজন খ্যাতনামা লেখিকা। তাঁর রচিত ‘স্নেহলতা’ গ্রন্থটি বঙ্গের সর্বপ্রথম মহিলা বিরচিত উপন্যাস। অন্যান্য উপন্যাস: ‘প্রেমলতা’, ‘শান্তিলতা’, ‘লুৎফ-উন্নেসা’ প্রভৃতি। এছাড়া ‘প্রসূনাঞ্জলি’ নামে ধর্মসন্দর্ভমূলক একখানি গ্রন্থও তিনি রচনা করেছিলেন। সাহিত্যিক দেবকুমার (১৮৮৪-১৯২৯) তাঁর পুত্র।” এই উল্লিখিত তথ্য ব্যতীত আর কোনও স্বীকৃতি কিন্তু কুসুমকুমারীর ভাগ্যে জোটেনি। যদিও কিছু অসমর্থিত সংবাদ সূত্রে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের ন’দি স্বর্ণকুমারী দেবীর লেখা ‘স্নেহলতা’ উপন্যাস প্রকাশ হবার আগেই কুসুমকুমারী দেবীর লেখা প্রথম উপন্যাস ‘স্নেহলতা’ প্রকাশ পেয়েছিল। এই সংবাদ স্বর্ণকুমারী দেবীর কর্ণগোচর হলে, তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁর উপন্যাসের ‘স্নেহলতা’ নামের কিছু পরিবর্তন সাধন করে ‘বা পালিতা’ শব্দ জুড়ে দিয়েছিলেন।

যৌথ পরিবারের সংসারধর্ম সুচারুরূপে পালন করার ফাঁকে কুসুমকুমারী রায়চৌধুরী যে সামান্য অবকাশটুকু পেতেন, সর্বতোভাবে তিনি তা ব্যয় করতেন মাতৃভাষার উন্নয়ন সাধনে ও সাহিত্য রচনার মতো মহৎ কাজে। যদিও তৎকালীন সমাজে নারীদের সাহিত্যচর্চাকে সুনজরে দেখা হত না। রক্ষণশীল সমাজের নানা বিধিনিষেধ, লোকলজ্জার ভয় এড়াতেই হয়তো কুসুমকুমারী তাঁর রচনা পাঠকের কাছে পেশ করেছেন স্বাক্ষরহীন অবস্থায়। বইয়ের মলাটে লেখকের নামের পরিবর্তে লেখা থাকত: ‘কোন মহিলা কর্তৃক প্রণীত’। তিনি মূলত উনিশ শতকের শেষভাগে ‘প্রেমলতা’ ও ‘স্নেহলতা’ উপন্যাস রচনা করেছিলেন।

স্বর্ণকুমারী দেবী

কুসুমকুমারীর প্রথম উপন্যাস ২৬টি পরিচ্ছেদ বিশিষ্ট ‘স্নেহলতা’ একটি সামাজিক উপন্যাস। দু’টি কাহিনি বিশিষ্ট এই উপন্যাসের প্রধান কাহিনি স্নেহলতা ও অমৃতলালকে নিয়ে। অপর কাহিনিটিও দু’টি প্রধান চরিত্র সুশীলকুমার ও মোহিনীকে কেন্দ্র করে। কাহিনিটি এরকম– স্নেহলতা তার বাবা-মায়ের সঙ্গে মাতুলালয়ে বাস করত। সেখানে তার আদর-যত্নের কোনও অভাব ছিল না। সমস্যা শুরু হল স্নেহলতার বিবাহকে কেন্দ্র করে। শেষ পর্যন্ত বাবার অন্যায় জেদের কাছে হার মেনে, মা ও মামাদের পছন্দ করা পাত্র অমৃতলালকে ছেড়ে স্নেহলতা পৈতৃক বাড়িতে ফিরে আসে এবং বাবার মনোনীত ২৩টি কন্যার পাণিগ্রহণকারী এক বৃদ্ধকে বিবাহ করতে বাধ্য হয়। এই ঘটনার পরে স্নেহলতা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং গুরুতর অসুস্থতার কারণে তার মৃত্যু ঘটে। ইতোমধ্যে কন্যাশোকে পর্যুদস্ত স্নেহলতার মায়ের অসুস্থতাও বৃদ্ধি পায়।পরিশেষে পরিবারে নানা দুর্যোগ ও অমৃতলালের সংসার ত্যাগ ও সন্ন্যাস গ্রহণের ঘটনা ইত্যাদির মধ্যে অন্য কাহিনির দুই চরিত্র সুশীল ও মোহিনীর সুখী জীবনযাপন দিয়ে কাহিনির পরিসমাপ্তি ঘটে।

কুসুমকুমারীর এই উপন্যাসে বহু বিদ্বজ্জন বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব লক্ষ করেছেন। কাহিনির কোনও কোনও অংশে আবার কেউ কেউ ‘কপালকুণ্ডলা’ উপন্যাসের ছায়া দেখতে পেয়েছেন। ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে কুসুমকুমারী দেবীকে পণ্ডিতেরা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুসারিণী বলে মনে করেছেন। পরবর্তী রচনাগুলিতে অবশ্য কুসুমকুমারী এই প্রভাব কাটিয়ে উঠেছিলেন এবং তাঁর লেখায় মৌলিকতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়েছিল। 

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কুসুমকুমারী রচিত ‘স্নেহলতা’ প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “যে পরিবারে ‘স্নেহলতা’র অনুকরণ হইবেক সে পরিবার যে চিরসুখী হইবেক তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই।… ভাষা সরল এবং রচনায় সুন্দর লালিত্য আছে। সমাজ চিত্র জানিবার পক্ষে ইহা একখানি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ। এই প্রতিভাশালিনী গ্রন্থকর্ত্রীর অসাধারণ শক্তির শতকণ্ঠে সাধুবাদ করিতে হয়। স্বাধীন রাজ্য হইলে এক বর্ষের মধ্যেই ইহার পঞ্চবিংশতি সংস্করণ হইত বলিলেও অত্যুক্তি হয় না।” বিদ্যাসাগর ব্যতীত সেই যুগের সাহিত্য জগতের দিকপাল সব রথী-মহারথীরাও ‘স্নেহলতা’ প্রসঙ্গে যেভাবে তাঁদের মুগ্ধতা, তাঁদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন এক কথায় তা প্রায় অকল্পনীয়। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী এই উপন্যাস সম্পর্কে তাঁর মূল্যবান মতামতে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন যে, এই গ্রন্থ নিঃসন্দেহে লেখিকার অসাধারণ প্রতিভার পরিচায়ক। তিনি লিখলেন, ‘স্নেহলতার মনের দৃঢ়তা ও পিতৃভক্তির জন্য নিজ জীবনের সুখের আশা বলিদান অতি সুন্দর।… উদ্দেশ্য মহান, রুচি সুমার্জিত এবং ভাষাও বিশেষ প্রশংসনীয়।… স্থানে স্থানে অশ্রুপাত করিয়াছি।’ সুখ্যাত প্রাবন্ধিক ঔপন্যাসিক ভূদেব মুখোপাধ্যায় শুধু যে ‘স্নেহলতা’র রচয়িতাকে প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক হওয়ার স্বীকৃতি দিয়েছেন তাই নয়, তিনি তাঁর মতামতে সেকথা দৃঢ়তার সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। ‘বঙ্গীয় মহিলাকুলের মধ্যে ইনিই প্রথম এবংবিধ উপন্যাস রচনায় সিদ্ধিলাভ করিয়াছেন। রচনা-নৈপুণ্যে, চরিত্রাঙ্কনে রচয়িত্রী অপূর্ব কৃতিত্ব দেখাইয়াছেন।’

কালীপ্রসন্ন ঘোষ

‘বান্ধব’ সম্পাদক কালীপ্রসন্ন ঘোষও প্রায় একই মনোভাব প্রকাশ করেছেন তাঁর মতামতে। তিনি লিখলেন, “ ‘স্নেহলতা’ উৎকৃষ্ট উপন্যাস সন্দেহ নাই।… বঙ্গের এই সর্বপ্রথম উপন্যাস লেখিকা সাহিত্যসেবী মাত্রেরই ধন্যবাদের পাত্রী।”

‘স্নেহলতা’ ব্যতীত আরও যে তিনটি উপন্যাসের খোঁজ মেলে, ‘প্রেমলতা’ উপন্যাস তার অন্যতম। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র এই গ্রন্থ সম্বন্ধে লিখলেন– “আমার বিবেচনায় গ্রন্থখানি যত দূর উৎকৃষ্ট হইতে পারে, তাহার ত্রুটি হয় নাই।… প্রত্যেক পরিবারে একখানি ‘প্রেমলতা’ থাকা বাঞ্ছনীয়।” রাজনারায়ণ বসুর মতে, ‘এরূপ উপন্যাস অনেক কেতাদুরস্ত ধর্মোপদেশ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।’ সে যুগে হিন্দু মহিলা হয়েও মুসলিম নারীচরিত্র ‘লুৎফ-উন্নেসা’কে নিয়ে যে উপন্যাস কুসুমকুমারী রচনা করেছিলেন তা তাঁর উদার ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবেরই পরিচায়ক। এই কাহিনির বিষয় সম্বন্ধে কোন সমালোচক লিখলেন: ‘ভাগ্যাহত বঙ্গের শেষ নবাব সিরাজের সাধ্বী মহিষীর প্রেমময় অপূর্ব কাহিনি।’ সাহিত্য জগতের দিকপালেরা কুসুমকুমারীর রচনার প্রশংসা করলেও তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ কিন্তু একজন নারীর সাহিত্যচর্চাকে ভালো চোখে দেখেনি। কুসুমকুমারীর জীবনের অনেকাংশই কেটেছে সমস্যা জর্জরিত অবস্থায়। অর্থবান জমিদার পরিবারে বিবাহ হওয়া সত্ত্বেও এক সময়ে পরিবারের আর্থিক অবস্থায় এমন অবনতি ঘটে যে, কুসুমকুমারীকে যথেষ্ট আর্থিক অনটনের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করতে হয়। স্বামী এবং সন্তানদের একের পর এক অকালমৃত্যুর শোক তাঁকে পর্যুদস্ত করে ফেলে। এই রকম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও কুসুমকুমারী কিন্তু তাঁর সাহিত্যচর্চা আমৃত্যু অব্যাহত রেখেছেন। 

কুসুমকুমারী দেবীর মৃত্যুর পরে তাঁর পুত্র– কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক দেবকুমার রায়চৌধুরীর উদ্যোগে প্রকাশিত হয় ‘স্নেহলতা’ উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণ। সেই গ্রন্থের ভূমিকাতে দেবকুমার লিখেছিলেন, ‘মা তাঁহার রচনা সম্বন্ধে চিরকালই অত্যন্ত উদাসীন ছিলেন… যশের প্রতি এই ঔদাসীন্য ও আন্তরিক বিরাগবশত… তিনি তাঁহার কোন পুস্তকে নিজের নামটি পর্যন্ত ছাপাইতে সম্মত হন নাই। কিন্তু, স্বাধীন আজ আমরা সম্পূর্ণই– এখন আর তিনি এ বিষয়ে প্রতিবাদ করিতে আসিবেন না। তাই এ গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে আজ এতকাল পরে আমাদের মনস্কামনা সিদ্ধ করিবার অবকাশ পাইলাম।’ কে জানে কুসুমকুমারীর এই প্রচারবিমুখতা, ঔদাসীন্যর কারণেই তিনি হয়তো চিরকাল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকারদের কাছে বিবেচনা-বিষয় বহির্ভূত হয়েই রয়ে গেলেন। 

দেবকুমার নিজেও বোধহয় স্বভাবগতভাবে মায়ের এই উদাসীন মনোভাবের ব্যতিক্রম ছিলেন না। তাই তাঁর স্বীয় উদ্যোগে প্রকাশিত ‘স্নেহলতা’ উপন্যাসের দ্বিতীয় সংস্করণেও প্রকাশকালের কোনও সময় বা তারিখের উল্লেখ পাই না। শুধু কাহিনির সমাজচিত্র বর্ণনাকালে এক স্থানে উল্লেখ মেলে যে, রচনাকার উনিশ শতকের কোনও এক সময়কার।

কুসুমকুমারীর লেখা ‘মর্মোচ্ছ্বাস’ নামক কাব্য ও ‘সাধনা’, ‘সেবার বিধান’ প্রভৃতি সন্দর্ভ এবং আরও বহু রসোত্তীর্ণ গল্প কালের অতল গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। বঙ্গ সাহিত্যে উপেক্ষিতা কুসুমকুমারী রায়চৌধুরীর প্রয়াণ ঘটে ১৯১৫ সালে (১৩২২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে)। 

তথ্যসূত্র:

১. কুসুমকুমারী রায়চৌধুরী– প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক, বেগম ফয়জু নাহার
২. স্নেহলতা, দ্বিতীয় সংস্করণ, কুসুমকুমারী রায়চৌধুরী