


ঘরকুনো ফকনারের একেবারেই প্রছন্দ হয়নি মার্কিন সরকার আয়োজিত পুরস্কার-পরবর্তী নানা দেশ ঘোরার ব্যবস্থা। তাঁকে বক্তৃতা দিতে বললে না কি তাঁর জ্বর আসত। সেই নোবেল পুরস্কার উপলক্ষে তাঁর ফরাসি প্রকাশক গালিমার আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেখা গিয়েছিল বারান্দায় ওয়াইনের গ্লাস হাতে দাঁড়ানো লেখককে একটা করে প্রশ্ন করা হচ্ছে আর তিনি এক পা করে পিছিয়ে যাচ্ছেন। শেষে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর সাংবাদিকরা তাঁকে ছেড়ে দেন।
শোনা যায়, উইলিয়াম ফকনার তাঁর জীবনের সবচেয়ে ‘বাণিজ্যিক’ উপন্যাস ‘স্যাংচুয়ারি’ লিখেছিলেন কেবলমাত্র টাকার জন্য। হ্যাঁ, তাঁর টাকার দরকার পড়েছিল একটি বিশেষ জাতের ঘোড়া কেনার জন্য। শুধু ঘোড়া নয়, তাঁর শখের মধ্যে ছিল দামি হুইস্কি, তামাক এবং অত্যন্ত মহার্ঘ্য জামাকাপড়। সংখ্যায় বেশি না হলেও, যা ছিল তা দিয়ে অনেকের বেশ কয়েক মাসের সংসার চলে যেত আমেরিকার বড় শহরে। তিনি ঘোড়ায় চড়তে এতই ভালোবাসতেন যে, তিনি কোনও বড় শহরে যেতে চাইতেন না– ঘোড়ায় চড়ে যাওয়া যাবে না বলে। নানা অসুস্থতার জন্য ডাক্তার তাঁকে ঘোড়ায় চড়তে বারণ করলেও তিনি শুনতেন না।

একজন নবীন সাহিত্য সাংবাদিক তাঁর সাক্ষাৎকার নিতে এসে দেখেছিল, তিনি তাঁর শিশু-কন্যাকে একটা গাধায় চড়া শেখাচ্ছেন। সাংবাদিককে বলেছিলেন– মেয়েদের তিনটে গুণ থাকা আবশ্যক। সত্যি কথা বলা, ঘোড়ায় চড়তে জানা আর চেক সই করতে জানা। ফকনারের স্ত্রী এস্টেল তাঁর দুই কন্যা-সন্তানের জন্ম দেন। প্রথম কন্যা মাত্র পাঁচ দিন বয়সে মারা যায়। যেহেতু সেই ১৯৩০-এর দশকে ফোটোগ্রাফি ইত্যাদি বেশ কঠিন ছিল, তাই তিনি কাউকে খবর না দিয়ে নিজেই সন্তানকে শিশুদের কফিনে পুরে নিজের কোলে করে কবর দিয়ে আসেন। তিনি বলেছিলেন পাঁচ দিনে কারওর স্মৃতি তৈরি হয় না। কেবল ঘটনা হতে পারে। মার্কিন দেশের ফকনার পুরাণ বেশ জনপ্রিয় ছিল লেখক মহলে। শোনা যায়, তাঁর উপন্যাস ‘অ্যাজ আই লে ডাইং’ তিনি লিখেছিলেন মাত্র ছ’ সপ্তাহে, একটা খনির গভীরে হেলমেটে ডেভিজ ল্যাম্প জ্বালিয়ে কয়লায় গুঁড়োর মধ্যে। যদিও ফকনার নিজে বলে গিয়েছেন যে, তিনি সত্যি কয়লা তোলার চাকরি করার সময় লিখেছিলেন সে উপন্যাস– তবে খনিতে বসে নয়, তাপবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুল্লিতে কাজ করার সময়। সেখানে তিনি কয়লা ঢালতেন। উপন্যাসটি লিখেছেন গ্রীষ্মকালে, ছ’ সপ্তাহ ছুটির সময়, যখন সেই অঞ্চলে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে কম। ফকনার জানিয়েছিলেন, সেই প্রকল্পের যান্ত্রিক আওয়াজ তাঁকে দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিত। লিখতে সুবিধে হত! তবে কেন তাঁকে অমন চাকরি নিতে হয়েছিল সেটাও বিস্ময়ের। ফকনারের বাবা ছেলেকে পাঠিয়ে দেন কঠিন শ্রমে ডুবে যেতে, যাতে মাথা থেকে লেখার ভূত নামে। কারণ তার আগে তিনি ছেলেকে এক সহজ চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন, সেটা সে করতে পারেনি। কী সেই চাকরি? মিসিসিপি বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টঅফিসে করণিকের চাকরি। সদ্য লেখক উইলিয়াম ফকনারের পছন্দ হয়নি বারবার উঠে স্ট্যাম্প দেওয়া বা চিঠিপত্র গুছিয়ে রাখা। তাতে তাঁর মনঃসংযোগ ভেঙে যেত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা তাঁদের নানা গুরুত্বপূর্ণ চিঠি বাতিল কাগজের স্তূপ থেকে খুঁজে বের করায়, তাঁরা কর্তৃপক্ষকে চিঠি লেখেন এবং রহস্যজনকভাবে সেই চিঠি উইলিয়ামের হাত এড়িয়ে যথাস্থানে পৌঁছে যায়। এবং উইলিয়াম চাকরিটি হারান। উইলিয়ামের নিজের ভাষায়– “যে কোনও অমুকের ছেলে হাতে দু’টি সিকি পেলেই স্ট্যাম্প কিনতে চলে আসে যেন চিঠি লিখে দুনিয়া ধন্য করে দেবে!”

হয়তো এখান থেকেই উইলিয়াম ফকনারের সারা জীবনব্যাপী চলা চিঠিপত্রে অনীহা তৈরি হয়। বাড়িতে চিঠি এলে তা যদি কোনও প্রকাশকের হত, তাহলে তিনি খামটি আলতো করে খুলে ঝাঁকাতেন যদি কোনও চেক লুকিয়ে থাকে। নইলে তা চলে যেত অনন্ত প্রতীক্ষালয়ে। টাকাপয়সার টানাটানি লেগেই থাকত। কারণ তাঁর জীবনযাত্রা। আগেই বলেছি তাঁর ঘোড়া, হুইস্কি ও পোশাকপ্রীতি। তাছাড়া ছিল ধার করার নেশা। একবার চেক এলে যে খরচ করার বেগ জাগত, তা শেষ হত ধারের খাতায়। এভাবেই পরের চেক এবং তার পরের চেক ইত্যাদি। তাঁর সমসাময়িক সমস্ত মার্কিন লেখক যখন ইউরোপে গিয়ে লেখক হবার চেষ্টা করছেন, তখন তিনি থেকে গিয়েছেন আমেরিকায়। নিউ অরলিয়ান্স-এর বোহেমিয়ান পাড়ায় নির্মাণ করেছেন তাঁর কাল্পনিক ইয়াকনাপটাফা কাউন্টি। যে জগতের অন্ধকার তাঁর নিজস্ব গদ্যের জটিল কাব্যিক বিস্তার দিয়েছে, সেই জগতের বীজ পোঁতা হয়েছিল তাঁর শৈশবে। নিউ অরলিয়ান্স তাকে দিল অবয়ব।

চাকরি হারানোর রেকর্ড অবশ্য তাঁর আরও আগে থেকেই ছিল। এবং নানা চাকরির নেশা তাঁর আকৈশোর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগ দিতে গেলেন মার্কিন এয়ার ফোর্সে। উচ্চতা খাটো হওয়ায় পেলেন না (যদিও তার কোনও প্রমাণ নেই)। কী এক অজ্ঞাত কারণে তিনি গিয়ে যোগ দিলেন কানাডার রয়্যাল এয়ার ফোর্সে। সেখান থেকেই সংগ্রহ করলেন জীবনের প্রথম গল্প বলার সরঞ্জাম। ধীরে ধীরে উপন্যাস ও লেখক মহলে স্বীকৃতি। কিন্তু সে লেখা পেটের দায় মেটায় না। দামি শখের কথা তো অবান্তর। তাই তাঁকে চেষ্টা করতে হল হলিউডে। প্রথম বেচার চেষ্টা নিজের উপন্যাস। অবশ্যম্ভাবী ব্যর্থতা। সেখানেই পান সিনেমার চিত্রনাট্য লেখার প্রস্তাব। তিনি রাজি হয়ে যান। তাঁর নিজের ইচ্ছে ছিল মিকি মাউসের গল্প লিখবেন। কিন্তু তাঁকে কাজ দিয়েছিল মেট্রো গোল্ডেন মেয়র স্টুডিও আর মিকি ডিজনির প্রকল্প। ফলে তাঁর স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। বদলে লিখতে পান তাঁর নিজেরই গল্পের চিত্রনাট্য। এভাবে তিনি পঞ্চাশটির উপর ছবিতে কাজ করেন। তার মধ্যে আরনেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘টু হ্যাভ অ্যান্ড হ্যাভ নট’ উপন্যাসটির চিত্ররূপ রয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র চলচ্চিত্র যেটি দু’জন সাহিত্যের নোবেল বিজয়ীর স্পর্শে তৈরি।

নোবেল প্রসঙ্গে মনে পড়ে গেল, ঘরকুনো ফকনারের একেবারেই প্রছন্দ হয়নি মার্কিন সরকার আয়োজিত পুরস্কার-পরবর্তী নানা দেশ ঘোরার ব্যবস্থা। তাঁকে বক্তৃতা দিতে বললে না কি তাঁর জ্বর আসত। সেই নোবেল পুরস্কার উপলক্ষে তাঁর ফরাসি প্রকাশক গালিমার আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে দেখা গিয়েছিল বারান্দায় ওয়াইনের গ্লাস হাতে দাঁড়ানো লেখককে একটা করে প্রশ্ন করা হচ্ছে আর তিনি এক পা করে পিছিয়ে যাচ্ছেন। শেষে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাবার পর সাংবাদিকরা তাঁকে ছেড়ে দেন। প্যারিসেরই আরেক সভায় তিনি সকল সাংবাদিককে বাড়ির উঠোনে আসতে বলে খানিক পরে ভিতরে চলে যান শীত করছে বলে! আসলে উইলিয়াম ফকনার ছিলেন একান্ত নিভৃতচারী। ভিড় কখনওই পছন্দ করেননি, কোনও পরিবেশে।

সিনেমার সঙ্গে এত জড়িয়ে থেকেও জীবনে মাত্র পাঁচবার নাটক দেখতে গিয়েছেন। তার মধ্যে তিনবার ‘হ্যামলেট’। একবার ‘মিড সামার নাইটস ড্রিম’ এবং একবার ‘বেন হুর’। জীবনে কখনও ফ্রয়েড পড়েননি। জিজ্ঞেস করলে বলেছেন ‘শেক্সপিয়ারও ফ্রয়েড পড়েননি। মেলভিল পড়েছেন বলে মনে হয় না। আমি নিশ্চিত মবি ডিক নিজে তা কখনও করবে না।’ তবে তিনি বলতেন, তিনি মিগেল দে সেরবান্তেস রচিত পৃথিবীর প্রথম আধুনিক আখ্যান ‘দোন কিহোতে’ পড়তেন প্রতি বছর। তবে এ-ও বলতেন যে, তাঁর সত্যকথনের কোনও দায় নেই কারণ তিনি মহিলা নন। যদিও তাঁর আদর্শ নারীর ধারণার সঙ্গে তাঁর নিজের মিল ছিল ঘোড়া চড়ায়। এই আসক্তি তাঁকে কখনওই ছেড়ে যায়নি। সমস্ত ডাক্তারি আপত্তি শিকেয় তুলে তিনি ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। সেই ঘোড়াই তাঁর প্রাণ নেয় প্রায়। একবার তাঁর স্ত্রী লক্ষ করেন উইলিয়ামের ঘোড়া একা বাড়ি ফিরে এসেছে। লাগাম ছেঁড়া। সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির ডাক্তার ফেলিক্স লিনডারকে ডেকে তাঁকে সঙ্গে নিয়েই খুঁজতে চলে যান উইলিয়ামকে। প্রায় মাইল খানেক যাবার পর দেখা যায় লেখক আসছেন পা ঘষে, খুঁড়িয়ে। এই দুর্ঘটনা তাঁকে বিছানায় ফেলে রাখে বেশ কয়েক মাস। কিন্তু মজা হল তিনি এই দুর্ঘটনায় মারা যাননি। যদিও তিনি তাই চেয়েছিলেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে বীরের মতো মৃত্যু।

ফকনার পুরাণ বলে তাঁকে ‘আমেরিকার শ্রেষ্ঠ ব্যর্থ লেখক কে?’ প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, এক নম্বরে টমাস উল্ফ আর দু’ নম্বরে উইলিয়াম ফকনার। এবং এই কথা তিনি বলে চলেছিলেন টমাস উল্ফের মৃত্যু থেকে অর্থাৎ ১৯৩৫ সাল থেকে। ফকনার নোবেল পান ১৯৪৯ সালে। তারপর দু’বার ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড এবং দু’বার কথাসাহিত্যের পুলিৎজার প্রাইজ। তিনি মারা যান ১৯৬২ সালে এক মামুলি হার্ট অ্যাটাকে। মাত্র ৬৪ বছর বয়সে।
তথ্যসূত্র: Las vidas escritas, Javier Marías, Editorial De Bolsillo (Penguin Random House), 1992
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved