Robbar

মৃত্যুর সঙ্গে একদান

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 14, 2026 3:03 pm
  • Updated:July 14, 2026 3:03 pm  

মৃত্যু। তার সঙ্গে একদান। দাবায়। এ দৃশ্য তৈরি করেছিলেন বার্গম্যান। মৃত্যু কি এতই সহজ? এতই সহজ তার সঙ্গে সংলাপ? মৃত্যুর সৌন্দর্য ও ভয়াবহতার মিশেলে গড়ে উঠেছিল চলচ্ছবির এক নতুনতর ভাষ্য। বার্গম্যানের জন্মদিনে রইল তাঁর ছবির মৃত্যুর দর্শন।   

অনমিত্র বিশ্বাস

চতুর্দশ শতাব্দী। ‘বিশপ’ আর ‘নাইট’ সহ-অভিযাত্রিক। জেরুসালেমের পথ খ্রিস্টান তীর্থযাত্রীদের পক্ষে সুগম করার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশের যোদ্ধা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দিয়েছিল। তেমনই একজন অ্যন্টোনিয়াস। সে ফিরে এসে দেখে তার দেশ প্লেগে বিধ্বস্ত! এই পটভূমিই ইনগ্‌মার বার্গম্যানের ‘দে ক্ষুন্ দে ইনসিয়েগ্লেৎ’ বা ‘সপ্তম সিল’ ছবির পটভূমি।

মৃত্যু কালো উড়নি উঁচিয়ে তাকে আচ্ছাদিত করতে এগিয়ে আসে ডানা-মেলা গৃধ্রের মতো। সুমেরুবৃত্তের পাথুরে তটে যোদ্ধাটি দাবার ছক সাজিয়ে বসেছে। মৃত্যুকে সে বলে, ‘চলো, এক দান খেলা যাক।’ সাবিত্রী যেমন জটিল শাস্ত্রতর্কে মৃত্যুদেবতার মনোবিক্ষেপ ঘটিয়েছিলেন।

‘সপ্তম সীল’ ছবির সেই বিখ্যাত দৃশ্য

মৃত্যু বলে, ‘আমার সঙ্গে খেলতে চাও কেন?’

যুদ্ধব্যবসায়ী বলে, ‘সেটা আমার ব্যবসা।’

অতঃপর দু’টি ঋজু নর্ডিক দেহের সঞ্চালনা কেবল একটি করে ঘুঁটি এগিয়ে দেওয়ার জন্য। বেঙ্গট্ একেরট অভিনীত মৃত্যুর শীতল ক্রূর দৃষ্টিপাতে হত্যা ছাড়া কিচ্ছু নেই। আর হাই-কনট্রাস্ট সাদা-কালো ছবিতে ম্যাক্স ভন সিডোর অবয়ব-বৈশিষ্ট্য যেন ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে শ্বেতপাথরের ওপর খোদাই করা। পরের চালটার আভাসমাত্র দিয়ে ফেলবে, এই ভয়ে সে নিষ্পলক, প্রতিক্রিয়াহীন। গোটা দৃশ্যপটে প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।

ইনগ্‌মার বার্গম্যান

কিন্তু দৃশ্যের সম্পূর্ণ জুড়ে নিহিত প্রাণের দুর্দমনীয় আত্মঘোষণা। বিবেকানন্দ ‘চেতনের লক্ষণ’কে নির্দিষ্ট করেছিলেন– ‘যেখানে স্ট্রাগল্, যেখানে বিদ্রোহ, সেখানেই জীবনের চিহ্ন।’ উদ্যত মৃত্যুর সামনে বুক চিতিয়ে, হেরে-যাওয়া যুদ্ধের ফলাফল যতদূর সম্ভব ঠেকিয়ে রাখা, ‘জয়হীন চেষ্টার সংগীত, আশাহীন কর্মের উদ্যম’– এইটাই জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট অভিজ্ঞান। একরত্তি পিঁপড়ে থেকে ক্রুসেড-প্রত্যাগত ক্ষত্রিয় পর্যন্ত তার ব্যতিক্রম নেই।

‘শতবার করে মৃত্যু ডিঙায়ে’ জীবনের শুক্‌নো পারে টিকে থাকাই সভ্যতার আদর্শ। কোনও সন্দেহ নেই, প্রাচীনকাল থেকে সভ্যতার প্রবর্তকেরা মৃত্যুকেই প্রতিপক্ষ বলে জেনেছিলেন। ব্রহ্মাণ্ডের আদিম ব্যবস্থাপনার যে ভারসাম্য– “প্রাণের ’পরে ছিল তার অন্ধ ঈর্ষা”। তাই মানুষের শেষ প্রার্থনা ছিল, ‘মৃত্যোর্মা অমৃতম্ গময়।’

হ্যারি পটারের গল্পে ছিল ‘টেলস্ অব বিডল্ দ্য বার্ড’– হয়তো ব্রিটেনের কোনও পাড়াগেঁয়ে লোকগাথার অভিযোজন। খরস্রোতা নদীর ওপর তিন ভাই– অ্যান্টিওখ্, ক্যাডমাস আর ইগ্‌নোটাস্ পেভারেল্– সেতু বানিয়ে মৃত্যুকে ফাঁকি দিয়েছিল। শিকার হাতছাড়া হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যু মাথা ঠান্ডা রাখল, তাদেরকে একটা করে উপহার দিতে চাইল।

অ্যান্টিওখ্ চাইল সর্বজয়ী অস্ত্র, তার সাহায্যে মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখাবে, এই মানসে। বস্তুত অস্ত্রের লোভেই গুপ্তঘাতকের হাতে তার প্রাণ গেল।

ক্যাডমাস চাইল পরলোকগত আত্মার সঙ্গে যোগস্থাপন করার মৃতসঞ্জীবনী পাথর। তার মৃতা প্রেমিকাকে ফিরে পাবে, এই আশায়। তাকে দেখতে পেল বটে কিন্তু ছুঁতে পেল না, এই আক্ষেপে ক্যাডমাস্ আত্মহত্যা করল।

তৃতীয় ভাইটি চেয়েছিল অদৃশ্যকারী চাদর। মৃত্যু কোথাও তাকে খুঁজে পায়নি, যতদিন না সে ঐহিকের প্রারব্ধ মিটিয়ে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে।

আগ্রাসনী ক্ষমতা না কি আধ্যাত্মিকতার বাণপ্রস্থ মৃত্যুঞ্জয়ের উপায়– মোক্ষ প্রাপনীয় যন্ত্রের সাধনায় না কি মন্ত্রের সাধনায়? না কি ত্রিগুণাতীত যিনি, তাঁরই আয়ত্ত? অথবা কোনও উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছাড়া অলক্ষে যারা ‘চিরকাল টানে দাঁড়, ধরে থাকে হাল’, তারাই অবলুপ্তি-সম্পাদক মৃত্যুর যথার্থ প্রতিদ্বন্দ্বী– এ আলোচনা বহুবার নিষ্ফল বলে বিতর্কিত হয়ে গিয়েছে। উপাখ্যানটির মর্মার্থ এই, শিশুপাঠ্য রূপকথা কিংবা রূপকাশ্রিত উপন্যাসে মৃত্যুকে বুড়ো আঙুল দেখানোর অচিকিৎস্য ইচ্ছাটি স্পষ্ট।

রুশ সাহিত্যে পহোম নামে এক চাষির গল্প পড়েছিলাম। বাশ্‌কিরদের প্রধান তাকে বলেছিল, সকালে উঠে দৌড়াতে শুরু করুক। সূর্যাস্তের মধ্যে সে যতটুকু ভূমি প্রদক্ষিণ করে শুরুর বিন্দুতে ফিরে আসতে পারবে– সবটার মালিকানা তার। সামন্ততন্ত্রের যুগে এই প্রস্তাব কী ভীষণ লোভনীয় ছিল, তা অনুমেয়। পহোম দৌড় দেয়, সূর্যের দিকে চোখ। যতদূরে সে যায়, জমি ততই বেশি উৎকৃষ্ট। প্রতিবারই ভাবে, ‘আর একটু দূরে যাই, ফেরার সময়ে ঠিক ম্যানেজ করে নেব।’ পহোমের লোভ তার প্রাণশক্তিকে অতিক্রম করে যায়।

হাউ মাচ ল্যান্ড ডু আই নিড, ১৯১৪ সালের প্রকাশিত বইয়ের অলংকরণ

প্রলোভনের প্ররোচনায় পা দেওয়ার জন্য পহোম প্রাণ দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করে। সে তো বিধাতার সঙ্গে শুধু সাপলুডো খেলছিল না– ‘টাগ্ অব ওয়ার’-এর জুয়া খেলছিল। তেমন অসমশক্তি পরীক্ষায় সে পারবে কেন?

আফ্রিকা মহাদেশের হসা উপজাতির লোকগল্পে, কোন সত্যযুগের অতীতে মৃত্যু গ্রামবাসীদের প্রলুব্ধ করার মানসে একটি নাদুস্‌-নুদুস্ মোষের গলায় দড়ি বেঁধে নিয়ে হেঁটে চলেছিল। আমাদের ধর্মরাজের বাহনও মহিষ। সে যাক গে–

একটি অত্যন্ত গরিব লোক, নাম তার বুইবুই। বুইবুই মানে মাকড়শা। মৃত্যু তাকে বলল, ‘তুমি আমার মোষটা নিতে পারো, তবে একটা শর্তে। এক বছর পরে আমি তোমার দুয়ারে কড়া নাড়ব। তখন যদি তুমি আমার নাম ভুলে যাও, তবে তোমাকে আমার সঙ্গে যেতে হবে– তখন কোনও ওজর-আপত্তি চলবে না। আমার নাম ওয়ানাবেরি…’

বুইবুই কতদিন খেতে পায় না। স্ত্রী-সন্তানের ফ্যাকাসে করুণ মুখগুলো দেখে সে সকালে বাড়ি থেকে বেরয়। সে তো হাতে স্বর্গ পেল। ভাবল, একটা নাম মনে রাখা কী এমন আর শক্ত ব্যাপার?

মহিষ-মেধে ক’দিন দারুণ ভোজ হল। বুইবুই বাড়ির সবাইকে বলে রাখল, ‘রোজ তোমরা সুর করে করে এই গানটি গেয়ো– ওয়ানাবেরি, ওয়ানাকিরি। ভুলো না যেন!’

ঠিক এক বছর পরে দরজায় ঘা পড়ল। মেঘমন্দ্র স্বরে অমোঘ দাবি জানাল মৃত্যু। বুইবুই তার চেনাজানা সবক’টি শব্দ হাতড়েও পাণিনি-দুঃসাধ্য নামটা বের করতে পারল না। বউকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল। তার স্মৃতিতে যা বেরল, সেই অপভ্রংশের সঙ্গে মূল নামের কোনও মিল নেই। মৃত্যু তাচ্ছিল্য-সহকারে হেসে বলল, ‘তবে এসো ভায়া। দূরের পথ।’

বাড়ির সবাই ভেউ-ভেউ করে কাঁদে। এমন সময়ে বুইবুইয়ের ছোট ছেলেটা ছড়া কেটে বলে উঠল, ‘ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি! ওয়ানাবেরি! ওয়ানাকিরি!’

মৃত্যু, আফ্রিকান উপজাতীয় চিত্র

এ গল্প নিশ্চয়ই ভাষার সেই পর্যায়ের, যখন ব্যাসদেবের শিরঃপীড়ার নিরসনে একদন্ত অক্ষরমালার উদ্ভাবন করেননি। আমরা যে লোকসংস্কৃতি উত্তরাধিকার-সূত্রে পেয়েছি, তার কতটুকু পরবর্তী প্রজন্মকে শিখিয়ে ঋণমুক্ত হচ্ছি? কত ঐশ্বর্য– হয়তো অপভ্রংশেই– সহস্র বছর ধরে ছড়ায় পাঁচালিতে গানে আলপনায় এ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, এবং আমাদের হাতেই তার বিলুপ্তি ঘটল। এ শুধু একুশ শতাব্দীর যুগবৈশিষ্ট্য নয়। ঐতিহ্যকে দাফন করে প্রত্যক্ষ ব্যবহারিক বিদ্যা শেখার দিকে ঝোঁক চিরকালই। এই কাহিনি যেন ছোট ছেলেটাকে ছড়াটা শেখানোর উপকারিতা বোঝাচ্ছে– একটা কৃষ্টির অপমৃত্যু বুইবুইয়ের সঙ্গেই ঘটতে ঘটতে বেঁচে গেল।

পিতার চক্রব্যূহ ভাঙার বিদ্যার যে-আধখানা মাতৃগর্ভে আয়ত্ত্ব করেছিলেন, তাতেই অভিমন্যুর অবিস্মরণীয় কীর্তি। বাকি যে-আধখানা তাঁকে শেখানোর অর্জুন প্রয়োজন বোধ করেননি, সেইটাই তাঁর মর্টাল দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াল।

সেরেঙ্গেটির এই গল্পটির মধ্যেও বৃহত্তর মৃত্যুকে নাকাল করার পন্থা বাতলানো।

ইউরোপ-আফ্রিকার সর্বত্র মৃত্যুর অনতিক্রম্য সীমারেখা নিয়ে সন্ত্রস্ত মানবতার ভীষণ ছুৎমার্গ। মৃত্যু নাগাল পেলে ঠেলে পালানোর অবাস্তব স্বপ্নের তির্যক রূপায়ণ গল্পগাথায়।

ভারতে আমরা আর-একটি বালকের গল্প জানি, যে মৃত্যুদেবতার সাক্ষাৎ পেয়েছিল। বৈশ্বানরের মতো প্রোজ্জ্বল সেই বালক কিন্তু ওই দুর্লভ সুযোগের সদ্‌ব্যবহার করে জীবনের জয়গানের রহস্য শিখে নিতে চেয়েছিল অভিজ্ঞতম তত্ত্ববিদের কাছে– ‘বক্তা চাস্য তাদৃগন্যো ন লভ্যো।’ মৃত্যুদেবতার তাপবিমোচন করুণ ক্রোড়ে ব’সে কপোললগ্ন করে সে মনযোগী হয়ে শুনেছিল জীবনের উদ্দেশ্য, জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে এক অমোঘ অস্তিত্বের কথা– যা ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’। যে আত্মজ্ঞান ও অধ্যাত্ম নিছক প্রবচনের দ্বারা লভ্য নয়। নচিকেতার সেই প্রশ্নোত্তর কঠোপনিষদে সংকলিত।

যম ও নচিকেতা, বিশ শতকীয় চিত্র

আফ্রিকার মাসাই যোদ্ধাদের যুদ্ধসংগীত– ‘হে মহাকাল, গৃধ্রের রূপ ধরে আমার সঙ্গে চলো। আমি মরি বা শত্রু, তোমার খাদ্যের অভাব হবে না।’ এই গানটিও নির্মোহ নয়, কিন্তু সাভানার সন্তান বীরের জাত মাসাইরা– মৃত্যুভয়কে বলি দিয়ে তাদের শক্তিপূজা।

পশতুভাষী উপজাতিদের ইতিহাস জুড়ে মারামারি। খুঁজে পেলাম, সে ভাষার কাপলেটে মৃত্যু নিয়ে বড়াই– ‘সোরে সোরে পা গোলো রাশে, দা বে নাঙ্গাই আওয়াজ দে রা মা শা মায়েনা!’

‘যুদ্ধ হতে ফিরুক না-হয় শতচ্ছিন্ন দেহ–
ভীরুর ন্যায় পালিয়েছিলে, না বলে তাই কেহ!’

কবির মধ্যে ‘mystic faith’ অথবা ‘গৃধ্ররূপী ঈশ্বর’ সম্পর্কে সরল আন্তরিকতা নেই। মরণ সেখানে পণ্য, উৎসর্গ নয়।

বুদ্ধদেব বসুর ‘সংক্রান্তি’ নাটকের শেষ পর্যায়ে ভূপতিত দুর্যোধনের শিয়রে গান্ধারীর উপলব্ধি, ‘মৃত্যুও এক দেবতা, তাঁকে প্রণাম করো!’ এই স্বীকৃতি ভারতের একচেটিয়া।

শিল্পী: পিটার ব্রুগেল

গ্যারি গিডিন্সের মতে, ‘সম্ভবত ঈশ্বর-পরিত্যক্ত বিশ্বে ধর্মনৈতিক উদ্বেগ’ প্রকাশ করলেও, ‘দে ক্ষুন্ দে ইনসিয়েগ্লেৎ’-এর ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত চিত্রনাট্যের ভূমিকায় বার্গম্যান ব্যক্ত করেছেন তাঁর ‘যত বিত্ত যত বাণী’র সর্বস্ব দিয়ে গির্জা গ’ড়ে তোলার দর্শন– ‘আমার মত এই, যে মুহূর্তে উপাসনা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে, কারুশিল্প তার মৌলিক সৃষ্টিশীলতার তাগিদ হারিয়েছে।’ সত্য আর সুন্দরের থেকে শিবকে বিচ্ছিন্ন ক’রে দিলে, বার্গম্যানের কাছে উপলব্ধির এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশিই হারিয়ে গেল। আর ‘সুন্দর’কে নজরুল প্রত্যক্ষ করেছেন, ‘শ্মশানের পথে, গোরস্থানের পথে… ক্ষুধাদীর্ণ মূর্ত্তিতে ব্যথিত পায়ে চলে যেতে’।

বার্গম্যানকে ভাবিয়েছিল ট্যাবি গির্জার দেওয়ালে অ্যলবার্তো পিক্টাসের ফ্রেস্‌কো, একটা মানুষ আর একটা কঙ্কাল অবক্ষয়িত উৎসাহে দাবা খেলছে। প্রোটেস্ট্যান্ট দ্বৈতবাদের সেই আবহেও মৃত্যুই যদি উপজীব্য, তবে সে সত্যের রূঢ় বীভৎসতার আড়ালে ‘শিবে’রই রুদ্ররূপ। বুদ্ধদেব বসুর ‘রাবণ’ নাটকে ইন্দ্রজিতের মৃত্যুসংবাদের মধ্যে রাবণ দেখতে পেয়েছিলেন তাঁর প্রথম জীবনের আরাধ্যের ত্রিশূলের ছায়া– ‘তুমি তা হলে আমাকে একেবারে ত্যাগ করোনি?’

এই দর্শনের জোরেই হয়তো ‘শ্মশানের বুকে আমরা রোপণ করেছি পঞ্চবটী’, কারণ শ্মশানে যে ‘জাগিছে শ্যামা অন্তিমে সন্তানে নিতে কোলে’। বেদান্ত আঁচলে বেঁধে ভারতের কর্মযোগী বিশ্বাস করেছেন জীবাত্মার অচ্ছেদ্য অদাহ্য অক্লেদ্য অশোষ্য পূর্ণ স্বরূপে। অপরপ্রান্তে ভারতবর্ষের ভক্ত ভানুসিংহ নিশ্চিত জেনেছেন, ‘মাধব পহু মম, পিয় স মরণসে।’ এক সর্বাঙ্গীণ সংস্কৃতি, মৃত্যু যেখানে মানুষকে বিব্রত করেছে, কিন্তু “দু’দিকে উদ্যত মৃত্যু”র মাঝখান দিয়ে টল্‌তে টল্‌তে হেঁটে যাওয়া মানবতার মর্মবাণীকে প্রভাবিত করতে পারেনি।