Robbar

আবার বছর চব্বিশ পরে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 15, 2026 7:49 pm
  • Updated:July 15, 2026 9:45 pm  

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই প্রথম খেলতে নামছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ‘লা আলবিসেলেস্তে’-র বিরুদ্ধে প্রথম নামবেন হ্যারি কেন কিংবা বেলিংহ্যামও। তিনজনেই রয়েছেন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে। যদিও ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের থেকে প্রত্যেকের পাখির চোখ ফাইনালে ওঠা। হ্যারি কেন মিডিয়াকে অকপটে জানিয়েছেন, ইতিহাস নিয়ে তাঁদের কারও মাথাব্যথা নেই একটুও। আর্জেন্টিনার প্রশিক্ষক লিওনেল স্ক্যালোনির তরফেও এসেছে সংযত প্রতিক্রিয়া। আধুনিক পেশাদারি ফুটবলে যা চেনা ছবি। তবে ইতিহাসের অনুষঙ্গ কি একেবারেই নেই?

শ্রুতায়ু ভট্টাচার্য

‘ফেস অফ আ লাফিং অ্যাসাসিন’। পাতা জুড়ে ছবি এক আর্জেন্টাইন ফুটবলারের। আলদো দুশের। কে তিনি? আর্জেন্টিনার দীর্ঘদিনের সমর্থকরাও কি মনে করতে পারেন এই নামের কোনও ফুটবলারকে? অথচ ২০০২ বিশ্বকাপের ঠিক আগে ইংল্যান্ডের পত্রপত্রিকায় প্রায় রোজই ছাপা হচ্ছিল তাঁর নাম। ইংল্যান্ডের স্বপ্নের হত্যাকারী। সে দেশের দক্ষিণপন্থী মিডিয়ার চোখে রাতারাতি ‘খলনায়ক’ হয়ে উঠেছিলেন এই অখ্যাত আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার। সৌজন্যে তাঁরই করা এক ট্যাকল। যে ট্যাকলে বাঁ পায়ের মেটাটার্সাল হাড় ভেঙে বিশ্বকাপে খেলা প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল ইংল্যান্ডের তারকা অধিনায়ক ডেভিড বেকহ্যামের। সে খেলা ছিল ক্লাবের। চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এবং স্পেনের দেপর্তিভো লা কোরুনা। সেই ম্যাচেই দুশেরের কড়া ট্যাকলের শিকার হন বেকহ্যাম। ফুটবল মাঠে এ খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতের জন্যই তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছিল ব্রিটিশ মিডিয়ার তরফে। অনেক ট্যাবলয়েডে দুশেরকে কার্যত খুনি বানিয়ে দেওয়া হয়। তবে শুধু ইংল্যান্ডই নয়, আর্জেন্টিনার দু’-একটি স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমেও না কি উল্লাস প্রকাশ করা হয়। সেবার জুন মাসে জাপান-দক্ষিণ কোরিয়ায় বিশ্বকাপের যে আসর বসবে, তাতে গ্রুপ পর্বেই দেখা হওয়ার কথা আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের। আর সেই ম্যাচের প্রেক্ষিতেই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় দুশেরের ট্যাকলকে ইচ্ছাকৃত বলে মনে করেছিল ইংলিশ মিডিয়ার একাংশ। বেকহ্যামের খেলা ঘিরে অনিশ্চয়তার খবর উদ্‌যাপন করেছিল আর্জেন্টিনার কিছু সংবাদ মাধ্যম। এই ঘটনার মাস দুয়েক পরে এমনই গনগনে উত্তাপে খেলা হয়েছিল। পেনাল্টি থেকে একমাত্র গোল করে ইংল্যান্ডকে জিতিয়ে জাতীয় নায়ক হয়েছিলেন বেকহ্যাম। বিশ্বকাপের মঞ্চে যুযুধান দুই দলের সেই শেষ দেখা। 

দুশেরের কড়া ট্যাকলের শিকার বেকহ্যাম

রেফারির পেছন থেকে তারস্বরে দুর্বোধ্য স্প্যানিশ ভাষায় চিৎকার করে যাচ্ছিলেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। খেলার প্রথম থেকেই দু’পক্ষের মুহুর্মুহু ফাউলে খেলা থামাতে হচ্ছিল। খেলোয়াড়দের একাধিকবার সতর্ক করছিলেন জার্মান রেফারি রুডলফ ক্রিটলিন। চিৎকার শুনে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বললেন দীর্ঘদেহী আর্জেন্টাইন অধিনায়ককে। রেফারি কী ভাষায় কী বলতে চাইছেন কিছুই কি মাথায় ঢুকছিল না আন্টন রাটিনের? দোভাষী চেয়ে বসলেন তিনি। খেলা থেমে রইল অনেকক্ষণ। এরপর? পুলিশ ঢুকল মাঠে, রাটিনকে নিয়ে বেরিয়ে গেল তারা। ম্যাচে ৫৬ ফাউলের মধ্যে ৩৬-টাই ইংল্যান্ডের। জিওফ হার্স্টের গোলে জিতল ইংল্যান্ড। ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড় জর্জ কোহেন যখন জার্সি বিনিময় করতে গেলেন বিপক্ষের খেলোয়াড়ের সঙ্গে, বাধা দিলেন প্রশিক্ষক আলফ র‍্যামসে। ‘পশু’দের সঙ্গে কোনও সৌজন্য নয়। ম্যাচ শেষেও তিনি অবিচল থাকলেন নিজের বক্তব্যে। নিন্দার ঝড় উঠল সারা বিশ্বের মিডিয়ায়। ফুটবলে জেনোফোবিয়ার কোনও জায়গা নেই। ১৯৬৬-এর বিশ্বকাপের সেই ম্যাচ আর্জেন্টিনার মিডিয়ায় ধিক্কৃত হল। অন্যদিকে এই ম্যাচকে কেন্দ্র করেই ভাবনা-চিন্তা শুরু হল হলুদ কার্ড আর লাল কার্ড চালু করার।  

জার্সি বিনিময়ে বাধা দিলেন প্রশিক্ষক আলফ র‍্যামসে

‘টেন হিরোয়িক লায়ন্স, ওয়ান স্টুপিড বয়’। বিপক্ষ খেলোয়াড়কে দিয়েগো সিমিওনের ধাক্কা। রেফারির বাঁশি। ফাউল। মুহূর্তের মধ্যে রেফারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আহত হওয়ার ভঙ্গিতে পড়ে গেলেন সিমিওনে। উঠে দাঁড়াতে হলুদ কার্ড দেখলেন তিনি। আর উল্টোদিকের খেলোয়াড়ের জন্য রেফারির প্যান্টের পকেট থেকে বেরিয়ে এল লাল কার্ড। মার্চিং অর্ডার। ঘাড় নাড়তে নাড়তে মাঠ ছাড়লেন ইংল্যান্ডের সেদিনের খলনায়ক ডেভিড বেকহ্যাম। ফাউলের পরে সিমিওনে উঠে দাঁড়ানোর সময়ে শুয়ে থাকা অবস্থাতেই রেফারির সামনে বুটের টোকা দিয়ে ‘প্রত্যাঘাত’ করেন বেকহ্যাম। আর ধূর্ততার সঙ্গে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ফের শুয়ে পড়েন সিমিওনে। ব্যস, ‘থ্রি লায়ন্স’কে খেলতে হয় দশ জনে। তবুও ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। ইংল্যান্ডকে হার মানতে হয়, ছুটি হয়ে যায় প্রতিযোগিতা থেকেই। দুটো সেভ করে ম্যাচের নায়ক আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক রোয়া। ইংল্যান্ডের রাস্তায় দেখা যায় বেকহ্যামের কুশপুতুল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল। 

‘টেন হিরোয়িক লায়ন্স, ওয়ান স্টুপিড বয়’

‘ইংরেজ সৈন্যরা বাচ্চা বাচ্চা ছেলেদের হত্যা করেছিল এটা সত্যি। তারা দোষী। তবে একইভাবে দোষী আর্জেন্টাইনরাও। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মিলিটারি শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করতে টেনিস শু-পরা কমবয়সি ছেলেদের তো তারাও পাঠিয়েছিল। কেউ কখনও দেশাত্মবোধ হারিয়ে ফেলে না। কিন্তু তাই বলে কেউ যুদ্ধ চাইবে!’ আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। ১৯৮২-এর ফকল্যান্ড যুদ্ধের বীভৎসতা দেখেছিলেন ছবিতে। তাই ১৯৮৬-র বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামার আগে কখনওই মনে হয়নি তাঁরা যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন। তাঁরা চেয়েছিলেন মৃতদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে। ইংল্যান্ডকে সেই ম্যাচে বিশ্বকাপের মানচিত্র থেকে মুছে ফেললেই চলবে। তবু তৈরি ছিল যুদ্ধক্ষেত্র। ম্যাচের আগে থেকেই তৈরি হচ্ছিল উত্তাপ। মিডিয়া বারবার জানতে চাইছিল গোল করলে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা কীভাবে উদ্‌যাপন করবে। মার্গারেট থ্যাচারের প্রতি কি কোনও ইঙ্গিত উঠে আসবে? 

‘মারাদোনার জীবনকে ওই দুই গোলের মাঝের সময়টা দিয়েই বুঝে নেওয়া যায়’। একদিকে নিন্দনীয় গোল, আর পরের গোলের মুহূর্তটা জাদুকরী সম্মোহনের। মারাদোনার মৃত্যুর পরে বলেছিলেন ইংল্যান্ডের হয়ে সেই ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা গ্যারি লিনেকার। তাঁর বহু সতীর্থ মারাদোনার হাত দিয়ে গোলের অসততাকে চিরজীবন ভুলতে না পারলেও, তিনি মনে রাখতে চাননি। তাঁর কাছে ভাস্বর দ্বিতীয় গোলটা। খেলোয়াড় জীবনে তিনি মাত্র একবারই মনে করেছিলেন মাঠের মধ্যে প্রতিপক্ষের গোলের পরে প্রাণ খুলে অভিবাদন জানাতে। তবে গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের কাছে বহু দিন বিস্বাদের মতো স্থায়ী হয়েছিল প্রথম গোলের স্মৃতি। এক অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে মারাদোনাকে লিনেকার জিগ্যেস করেছিলেন, এই প্রতারণার কারণ কী ছিল! মারাদোনা বলেছিলেন, এটা প্রতারণা নয়, বলা চলে ধূর্ততা!

প্রতারণা নয়, ধূর্ততা!

প্রথম ছবিতে শিলটনের উদ্যত হাত। গায়ের খুব কাছাকাছি হাত উঁচু করে শূন্যে উড্ডীন পাঁচ ফুট পাঁচের ‘এল পিবে দে ওরো’। দ্বিতীয় ছবিতে মাটিতে পড়ে শিল্টন। বল জালে ঠেলে দিচ্ছেন মারাদোনা, অসহায়ভাবে তাকিয়ে দেখছেন ডিফেন্ডাররা। দুই স্থিরচিত্রেই ধরা ম্যাচের গল্প। প্রথম গোল সম্বন্ধে মারাদোনা বলেছিলেন, কিছুটা ঈশ্বরের হাত আর কিছুটা মারাদোনার মাথার সমন্বয়ে এই গোল। নিন্দা, সমালোচনা কম হয়নি। তবে শিল্পের প্রলেপ দিয়ে গিয়েছিল পাঁচজনকে কাটিয়ে করা শতাব্দীর সেরা গোল। 

‘এই জয় ছিল আমাদের প্রতিশোধ’। ম্যাচের আগে ফুটবল এবং মালভিনাসের (ফকল্যান্ড) যুদ্ধকে মিশিয়ে না ফেলার যে ভাবনা মাথায় ছিল সেখান থেকে সরে এসে এই বক্তব্যই রেখেছিলেন মারাদোনা।  

১৯৯৮-এর ম্যাচে বেকহ্যামকে মাঠ ছাড়া করার কারিগর দিয়েগো সিমিওনে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মারাদোনার শতাব্দী-সেরা গোল যেন আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিকেই তুলে ধরে। যখন বাচ্চারা রাস্তার ধারে বল নিয়ে খেলে, তখন তারা ‘ফুটবল’ খেলে না। ফুটবল একটা পেশাদারি খেলা, তার দুনিয়া আলাদা। এই খেলা বরং ‘জুগার আ লা পেলোতা’। মারাদোনার গোলও মনে করায় ‘জুগার আ লা পেলোতা’কে। যার আক্ষরিক অর্থ বল নিয়ে খেলা। বিপক্ষের একের পর এক খেলোয়াড়কে ড্রিবল করে বেরিয়ে যাওয়ার নেশা লাগে যে খেলায়।

১৯৯৮-এর সেই গোলের পর বেকহ্যাম ও মাইকেল ওয়েন

ফিফার বিশ্বকাপের সেরা গোলের তালিকায় মারাদোনার গোলের খুব কাছেই থাকবে ১৯৯৮ আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ম্যাচে ইংল্যান্ডের গোল। সৌজন্যে ১৮ বছরের বিস্ময় প্রতিভা। বেকহ্যামের বাড়ানো বল ধরে চ্যামটকে গায়ে নিয়ে দৌড় দৌড় দৌড়। সেই দুর্বার গতির মধ্যেই অপেক্ষমান আয়ালাকে চকিতে পরাস্ত করেই ডান পায়ের শটে রোয়ার নাগালের বাইরে দিয়ে বল জড়িয়ে দেওয়া জালে। তারুণ্যের উদ্ভাস মাইকেল আওয়েন। হতভম্ব আর্জেন্টিনা। এই গোলের কোনও জবাব হয় না। 

স্কোরবোর্ডে জবাব না দিলে সেদিন ঘরে ফিরতে হত আর্জেন্টিনাকে। ইংল্যান্ডের বক্সের কাছে ফ্রি-কিক পেল আর্জেন্টিনা। মনযোগ দিয়ে ওয়াল পর্যবেক্ষণ করলেন গোলরক্ষক ডেভিড সিম্যান। ফ্রি-কিক নিতে বলকে কেন্দ্র করে দাঁড়িয়ে বাতিস্তুতা, ভেরন এবং সিমিওনে। ছুটতে শুরু করলেন বাতিস্তুতা। তিনিই বোধহয় শট নেবেন। বল না ছুঁয়ে বাতিস্তুতার ডামি রান। ইংল্যান্ডের ওয়াল যেন খানিকটা বিচলিত হয়ে গেল। ভেরন বল বাড়ালেন বক্সের মধ্যে জায়গা খুঁজে নেওয়া অরক্ষিত জানেত্তিকে। নিখুঁত বাঁ পায়ের প্লেসমেন্টে বল জড়িয়ে গেল সিম্যানের ডানদিক দিয়ে। ট্রেনিংয়ের ফসল। 

নিখুঁত বাঁ পায়ের প্লেসমেন্টে গোল করার পর জানেত্তি

সংবাদ মাধ্যমকে একান্তে সাক্ষাৎকার দিতে চাইতেন না মার্সেলো বিয়েলসা। নীতিনিষ্ঠ এই প্রশিক্ষক মনে করতেন এইসব ক্ষেত্রে শুধু বড় মিডিয়া হাউজগুলোই সুবিধা পাবে, বাকিদের বঞ্চিত করা হবে। তাই শুধুমাত্র প্রেস কনফারেন্সেই বক্তব্য রাখবেন তিনি। আর্জেন্টিনার সাংবাদিকরাও মোটামুটি বিরক্তই ছিলেন বিয়েলসার জন্য। সে দেশে একবারই এক সাংবাদিকের সঙ্গে বসেছিলেন বিয়েলসা, তবে সাক্ষাৎকার নয়। ট্যাকটিক্স নিয়ে আলোচনা এবং প্রতিপ্রশ্ন করে জেরবার করে তুলেছিলেন সেই সাংবাদিককে। ২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের আগে হঠাৎ শোনা গেল ইংল্যান্ডের এক ট্যাবলয়েডকে বিয়েলসা একান্তে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। ছবি-সহ লেখা ছেপে বের হয়েছে। রাগে ফুঁসছে আর্জেন্টিনার মিডিয়া। শেষে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সে সাক্ষাৎকার সম্পূর্ণ মনগড়া, কাল্পনিক। ম্যাচের উত্তাপ বাড়াতেই এই কাজ। 

‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় বিয়েলসাকে নিয়ে ম্যাচের আগে বিশ্লেষণমূলক এক লেখায় জন কার্লিন লিখলেন– বিয়েলসার মতো আদর্শবাদী প্রশিক্ষক খেলার মাঠে দিয়েগো সিমিওনের কোনও কূট আচরণকে প্রশ্রয় দেবেন না। যেনতেন মূল্যে তিনি জিততে চান না। 

প্রশিক্ষক মার্সেলো বিয়েলসা

সেই ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমে বেকহ্যামের গোল উদ্‌যাপনের ছবি যখন ঘুরতে লাগল, একদিকে ধরা পড়ল দিয়েগো সিমিওনের নত মুখ। 

 

‘Muchachos, Ahora Nos Volvimos a Ilusionar’। ২০২২ বিশ্বকাপ থেকেই আর্জেন্টিনা দলের অঘোষিত অ্যান্‌থেম। ২০২০-তে মারাদোনার প্রয়াণের পরে এবং ২০২১-এ কোপা আমেরিকা জয়ের পরে এক ব্যান্ডের এক গানের আদলে এই গান বেঁধেছিলেন আর্জেন্টিনা সমর্থক স্কুলশিক্ষক ফার্নান্দো রোমেরো। গানের ছত্রে ছত্রে ধরা পড়েছে ’৮৬ বিশ্বকাপ এবং ফকল্যান্ড যুদ্ধের শহিদদের স্মৃতি। মারাদোনা, মেসির যে দেশ সেই দেশ মালভিনাসের বীর সৈন্যদেরও। সেই ইতিহাসে ভর করেই আর্জেন্টিনা পেতে চেয়েছে তৃতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ। কাতারের বিশ্বকাপ সেই স্বপ্নকে পূর্ণ করেছে। আর এবারের বিশ্বকাপে সেই গানের লিরিক পালটে যুক্ত হয়েছে চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন। লা মালভিনাসের উল্লেখ কিন্তু মুছে যায়নি। 

১৯৬৬-এর পরে আর বিশ্বকাপ ঢোকেনি ইংল্যান্ডে। প্রতিবার বিশ্বকাপ আসে। নতুন সোনালি প্রজন্ম আসে, একের পর এক। আশায় বুক বাঁধেন ইংল্যান্ড সমর্থকেরা। ‘ইটস কামিং হোম’। কিন্তু বুক ভাঙেও প্রতিবার। এবার চিরশত্রু আর্জেন্টিনার সঙ্গে সেমিফাইনাল। পুরনো শত্রুতা ঝালিয়ে নেওয়ার পালা। তার থেকেও বেশি ফাইনালে ওঠার তাড়না। আবেগের থেকেও বেশি পেশাদারিত্ব। মাথার ওপরে জার্মান প্রশিক্ষক টুখেলের কড়া নজরদারি। 

মারাদোনার গোল, ১৯৮৬ বিশ্বকাপ

১৯৬৬-এর দুই দলের সদস্যদের অনেকেই বেঁচে নেই। ’৮৬-এর মারাদোনা প্রয়াত হয়েছেন ২০২০-তে। ’৬৬-এর স্মৃতি ফের জাগিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের আগেই চলে গিয়েছেন রাটিনও। ইতিহাসের ফিসফাস পেরিয়ে ১৯৬২-এর প্রথম বিশ্বকাপ সাক্ষাতের মতো নির্বিষ না হলেও মোটামুটি শান্তই রয়েছে মিডিয়া হাউজগুলো। বরং স্মৃতি খুঁচিয়ে পুরনো বৈরিতাকে জাগাতে চাইছেন না কেউই। 

দুই দলকে অতীতের সাক্ষাৎ নিয়ে প্রশ্ন করলেই পেশাদারি কায়দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁরা। ফকল্যান্ডের যুদ্ধ অতীত দিনের স্মৃতি। নিশ্চয়ই তার গুরুত্ব রয়েছে ইতিহাসে। কিন্তু এখন লক্ষ্য শুধুই ফুটবলে। 

পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বল পায়ে মাইকেল আওয়েনের ডান দিকে চকিতে বাঁক নেওয়া। বাড়িয়ে দেওয়া পচেতিনোর পা। পেনাল্টি। গোলকিপারের পাশ দিয়ে নিপুণতায় ঠেলে দেওয়া বল। বিশ্বকাপ না খেলার আশঙ্কা কাটিয়ে উঠে সেদিনের নায়ক ফ্যাশন আইকন ডেভিড বেকহ্যাম। পচেতিনো আজও মনে করেন ওটা ‘ডাইভ’ ছিল। আওয়েন মানেন না। মনে করেন চাইলেই তিনি পড়ে না গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারতেন, কিন্তু যে কোনও স্ট্রাইকার বক্সের মধ্যে ওই সুযোগ নেবেই।

পচেতিনোর ফাউল, মাইকেল ওয়েনকে

মাঝে পেরিয়ে গিয়েছে ২৪ বছর । পচেতিনো, সিমিওনে দুজনেই প্রতিষ্ঠিত কোচ। মাইকেল আওয়েন ফুটবল পণ্ডিত। ডেভিড বেকহ্যাম ইন্টার-মিয়ামি ফুটবল দলের মালিক। যে দলের স্বপ্নের কাণ্ডারি আবার লিওনেল মেসি। বেকহ্যাম ও সিমিওনেকে বিশ্বকাপের মাঝে দেখা যায় ভিআইপি গ্যালারিতে। বেকহ্যামের ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে আর্জেন্টিনা এবং সিমিওনের ইন্টার মিলানের জার্সিও। স্মৃতি হিসেবে রেখে দিতে চান তিনি। পচেতিনো আর আওয়েন দেখা হলেই পুরানো স্মৃতি নিয়ে খুনসুটি করেন। 

র‍্যামসের ঘৃণা, তারুণ্যের প্রতিশোধ, যুদ্ধের হিসেব, মারাদোনার স্মৃতি, রেড কার্ড, হার্স্ট, শিল্টন, রেফারি, দৃষ্টিনন্দন গোল। ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে এ সবই বহু দূরের স্মৃতি। ২৪ বছর পরের খেলায় কি তবে ইতিহাসের কোনও যোগসূত্রই নেই? 

আর্জেন্টিনার ডাগ আউটে সহকারী কোচের দায়িত্বে ওয়াল্টার স্যামুয়েল, রবার্তো আয়ালা এবং পাবলো আইমার। ১৯৯৮-র উত্তপ্ত ম্যাচে আওয়েনের গোলে বিস্মিত হলেও ম্যাচে জয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন আয়ালা। ২০০২-এ ইংল্যান্ড ম্যাচে চোটের জন্য খেলতে পারেননি তিনি। তবে স্যামুয়েল কিংবা আইমারকে খেলেও হার হজম করতে হয়েছিল। সেই হারের বিস্বাদ কাটাতে এর থেকে ভালো উপলক্ষ আর কীই বা হতে পারে? 

রবার্তো আয়ালা, ওয়াল্টার স্যামুয়েল, লিওনেল স্কালোনি ও পাবলো আইমার

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এই প্রথম খেলতে নামছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ‘লা আলবিসেলেস্তে’-র বিরুদ্ধে প্রথম নামবেন হ্যারি কেন কিংবা বেলিংহ্যামও। তিনজনেই রয়েছেন গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে। যদিও ব্যক্তিগত লক্ষ্য অর্জনের থেকে প্রত্যেকের পাখির চোখ ফাইনালে ওঠা। হ্যারি কেন মিডিয়াকে অকপটে জানিয়েছেন, ইতিহাস নিয়ে তাঁদের কারও মাথাব্যথা নেই একটুও। আর্জেন্টিনার প্রশিক্ষক লিওনেল স্ক্যালোনির তরফেও এসেছে সংযত প্রতিক্রিয়া। আধুনিক পেশাদারি ফুটবলে যা চেনা ছবি। তবে ইতিহাসের অনুষঙ্গ কি একেবারেই নেই? ১৯৮৬ এবং ১৯৯৮-এর বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় পেয়েছিল নিজেদের অ্যাওয়ে জার্সি পরে। শেষবার বিশ্বকাপ সাক্ষাতে তাদের পরাজয়ের সময় চেনা নীল-সাদা জার্সিতে খেলেছিল তারা। এবার ফিফার কাছে বিশেষ আবেদন করে আর্জেন্টিনা চেয়ে নিয়েছে অ্যাওয়ে জার্সি পরার অনুমোদন। ইতিহাস না কি কুসংস্কার? 

ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মহারণ মানেই নাটক, ঘটনার ঘনঘটা। ২৪ বছর পরে ফের মুখোমুখি তারা। হাইভোল্টেজ দ্বিতীয় সেমিফাইনাল। আর কিছুক্ষণ পরেই মঞ্চের পর্দা সরে যাবে… তারপর?