Robbar

পুরীর পেটপুজো

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 16, 2026 4:01 pm
  • Updated:July 16, 2026 4:01 pm  

বছর ১৫ আগে রথযাত্রার প্রাক্কালে পুরীর জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন মহাপাকশালা দর্শনের সময় শোনা কানু পাণ্ডার ধারাভাষ্য এখনও কানে বাজে। জগন্নাথের ভোগ রান্নার দায়িত্ব সামলান বেশ কয়েকজন পাচক, যাঁদের বলা হয় ‘সুয়ার’। তাঁদের কাজের তদারকি করেন মুষ্টিমেয় প্রধান পাচক বা ‘মহাসুয়ার’, যাঁদের একজন কানুর পিতৃদেব। সেই সুবাদে মাঝেমধ্যেই হলিডে হোমের ঘরে ঘিয়ের ভুরভুরে সুগন্ধমাখা খাজা, মালপোয়া, পায়েস, রসাবলি, খুরমা, ঝালনাড়ু বা মরিচ লাড্ডু জুটছে। আবার তাঁরই সৌজন্যে সেই পাকঘরের সুবিশাল কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়ে হাজির হয়ে দেখি, অগুনতি বিশাল উনুনের হাঁ-মুখে দাউদাউ জ্বলছে নিমকাঠের আগুন।

দামু মুখোপাধ্যায়

রাজা বা তাঁর আরাধ্য কূলদেবতা নন, সাধারণ ভক্তের হৃদয়ে পাতা জগন্নাথস্বামীর আসন। তাই তো দেবালয় ছেড়ে রাস্তায় অগণিত পুণ্যার্থীর মাঝে নেমে আসে তাঁর রথ। তাঁকে নিবেদন করা নিত্যভোগে এই জন্যই তেল-মশলার আতিশয্য অনুপস্থিত, সহজ পদ্ধতিতে রাঁধা নিরাভরণ সুস্বাদু মহাপ্রসাদেই তুষ্ট হন প্রভু। বছর ১৫ আগে রথযাত্রার প্রাক্কালে পুরীর জগন্নাথ মন্দির সংলগ্ন মহাপাকশালা দর্শনের সময় শোনা কানু পাণ্ডার ধারাভাষ্য এখনও কানে বাজে। জগন্নাথের ভোগ রান্নার দায়িত্ব সামলান বেশ কয়েকজন পাচক, যাঁদের বলা হয় ‘সুয়ার’। তাঁদের কাজের তদারকি করেন মুষ্টিমেয় প্রধান পাচক বা ‘মহাসুয়ার’, যাঁদের একজন কানুর পিতৃদেব। সেই সুবাদে মাঝেমধ্যেই হলিডে হোমের ঘরে ঘিয়ের ভুরভুরে সুগন্ধমাখা খাজা, মালপোয়া, পায়েস, রসাবলি, খুরমা, ঝালনাড়ু বা মরিচ লাড্ডু জুটছে। আবার তাঁরই সৌজন্যে সেই পাকঘরের সুবিশাল কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়ে হাজির হয়ে দেখি, অগুনতি বিশাল উনুনের হাঁ-মুখে দাউদাউ জ্বলছে নিমকাঠের আগুন। প্রতিটি চুলার ওপরে থরেথরে সাজানো সাতখানি মাটির মালসায় পরিপাক হচ্ছে দারুব্রহ্মের ভুবনবিখ্যাত ‘ছপ্পন ভোগ’, যার মধ্যে সবার আগে সবচেয়ে ওপরের মালসার রান্না তৈরি হয়ে যায়, আর সবশেষে পাক হয় একেবারে উনুনের ওপরেই বসানো মালসার ব্যঞ্জন। পাণ্ডাদের দাবি, রান্নার এই অভিনব প্রক্রিয়া অলৌকিক দৈবলীলা বই কিছু নয়। কিন্তু একদা উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কানু জানে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র ধরে উল্টো পথে তাপপ্রবাহ চালনা করার তত্ত্ব, যার জেরেই এমন কাণ্ড!

জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদ প্রস্তুতি

মহাপাকশালায় প্রতিদিন গুরুগম্ভীর চালে বিরাজ করলেও, হরচণ্ডী শাহির বাড়িতে দিব্যি হাসিখুশি মেজাজে দেখা পেলাম কানুর বাবা মহাসুয়ার নীলাম্বরবাবুর। ছপ্পন ভোগ সম্পর্কে আমাদের কৌতূহল মেটাতে আড্ডাপ্রাণ মানুষটি খোলসা করলেন, আনন্দ বাজারে পাওয়া দেবভোগ্য সব পদই আসলে প্রাচীন উৎকলী রসনাধারার সেরা মানের নমুনা। তাঁর ব্যাখ্যা, জগতের নাথ পুরুষোত্তমের মহাপ্রসাদে তাই রাজকীয় নয়, স্থান পেয়েছে প্রজার পাতে বেড়ে দেওয়া রকমারি ঘরোয়া রান্না।

অতি সাধারণ উপকরণ দিয়ে, কোনও জটিল কৌশল ছাড়াই অসাধারণ সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করার এই পরম্পরা শুধুমাত্র মন্দির চত্বরেই আটকে নেই, বরং রন্ধনশৈলীর এই বৈশিষ্ট খুঁজে পাওয়া যায় অন্যান্য উৎকলী রান্নাতেও। বাহ্যজ্ঞান লাভ করা ইস্তক অজস্রবার পুরী এসেছি। পাণ্ডার হাতযশে প্রায় প্রতিবারই মহাপ্রসাদ আস্বাদনের সৌভাগ্যও হয়েছে। কিন্তু এমন তত্ত্ব চিন্তা করা দূরস্থান, কখনও শুনিনি। তবে মহাসুয়ার দর্শনের পরের দিন রেলস্টেশনের কাছে ঘোড়াবাজারে ভুব ভাইয়ের পুরনো দোকানে দেখলাম, লুচির সঙ্গে ডালমা বেড়ে দেওয়া হচ্ছে। মহাপ্রসাদের কৃপায় ইতিমধ্যে সামান্য মিষ্টি-ঘেঁষা ডালমার স্বাদ পেয়েছি। কিন্তু দোকানের ডালমা নোনতা তো বটেই, মেজাজে বিলকুল অন্য। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, মন্দিরের মহাপ্রসাদে যে ডালমা পাওয়া যায়, সেখানে দেশি ঘি, জিরে-আদা আর আখি গুড়ের ব্যবহারই প্রধান। অন্যদিকে, বাজারি ডালমা সরষের তেলে রাঁধা হলেও খাস্তা লুচির সঙ্গে বেশ খেতে। তবে ওড়িয়া রসনা ঘরানা মেনে ডাল-আনাজের মিশেলে তৈরি দুই সংস্করণই বেশ সুস্বাদু ও সহজপাচ্য।

পুরীর বিখ্যাত লুচি ডালমা

ডালমা সম্পর্কে আমাদের আলোচনা নিশ্চয়ই কানে গিয়েছিল, দোকানের বাইরে পা রাখলে তাই একগাল হেসে যিনি ঝরঝরে বাংলায় যেচে আলাপ করলেন, জানা গেল তিনি শতবর্ষ পার করা পণ্ডিত হরিহর দাস গ্রন্থাগারের হিসাবরক্ষক প্রজ্ঞান মহাপাত্র। রান্না শুধুমাত্র তাঁর শখ নয়, তাই নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনাও করেন, বললেন। তাঁর মতে, ওড়িয়া রসনার বিশেষত্ব বুঝতে হলে ওলটাতে হবে ইতিহাসের পাতা। প্রাচীনকাল থেকেই উৎকল দেশে প্রায় ৬২টি জনজাতির সহাবস্থান। এই আদিবাসী সমাজের আহার্য ছিল মূলত স্থানীয় শস্য, ফল, কন্দ ও শাক-সবজি, যা রাঁধার সময় ন্যূনতম তেল ও মশলা ব্যবহার করাই ছিল দস্তুর। আসলে, গ্রীষ্মপ্রধান অঞ্চল হওয়ার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময় প্রখর রোদের তাপে তেতেপুড়ে যায় ওড়িশা। এক পরিখা বরাবর উন্মুক্ত সমুদ্রতট, অন্যদিকে ঊষর কালাহান্ডি। চূড়ান্ত উষ্ণ পরিবেশে শরীর ঠান্ডা রাখতে তাই গুরুপাক রান্না নয়, হালকা অথচ সুস্বাদু দেশীয় রসনাতেই আস্থা রাখে প্রকৃতিপাঠে দুরস্ত জনজাতীয় সমাজ। পাশাপাশি, রুক্ষ ধরিত্রীর বুকে লড়াই করে বেঁচে থাকতে খাদ্য সংরক্ষণের একাধিক তরিকারও প্রচলন হয়। স্রেফ লেকচার নয়, হাতেকলমে তার স্যাম্পল পেশ করতে সরাসরি পাখালা ভোজের প্রস্তাব দিয়ে ফেললেন শ্রীযুক্ত মহাপাত্র। সাবেক পুরী শহরের যে পাড়ায় তাঁর ভদ্রাসন, সেই হেরাগোহিরি শাহি এলাকায় মূলত মধ্যবিত্তের বসবাস। সামনেই রথযাত্রা, তাই আটপৌরে পাড়ার অধিকাংশ বাড়ির সামনে সুন্দর আলপনা দেওয়া হয়েছে তেলুগু স্টাইলে, সদর দরজার ফ্রেমে ঝুলছে ফুল-আমপাতার মালা। অকৃতদার প্রজ্ঞানবাবুর বাড়ি আড়েবহরে ছোট হলেও ছিমছাম সাজানো। সময় নষ্ট না করে একেবারে খাবার টেবিলেই বসালেন। কানাউঁচু স্টিলের থালায় পরিবেশিত হল সুশীতল পাখালা। সম্পর্কে বাঙালির চিরচেনা পান্তাভাতের জ্ঞাতি হলেও আভিজাত্য ও বৈচিত্রে সে যথেষ্ট উন্নাসিক, কারণ গ্রীষ্মে শরীর জুড়োতে স্বয়ং জগন্নাথদেবের ছপ্পন ভোগের তালিকায় থাকে টক দই, আদা কুচি, ভাজা জিরে গুঁড়ো লেবুপাতা দিয়ে মাখা দহি পাখালা আর জুঁই অর্থাৎ ‘মালি ফুল’ ও কর্পূরের সুবাসে আমোদিত মালি পাখালা। আবার, গৃহস্থের মধ্যাহ্নভোজেও তিন-চার রকম পাখালা খাওয়ার চল রয়েছে। অতিথিদের জন্য সেদিন সাজা পাখালা, অর্থাৎ টাটকা গরম ভাত একটু ঠান্ডা করে জল ঢেলে পরিবেশনের ব্যবস্থা হয়েছিল। গাঁজানো হয় না শুনে পান্তার মতো পাখালার এই ভ্যারাইটিতে টক ভাব আশা করিনি, কিন্তু ভাতে ঢালা জলে সুঘ্রাণ আনতে কাঁচা লঙ্কার সঙ্গে গন্ধরাজ লেবুর পাতা আর সেঁকে নেওয়া জিরেগুঁড়োর মিশেল নিঃসন্দেহে মুগ্ধ করেছিল। অনুষঙ্গ হিসেবে ছিল শাক ভাজা আর পেঁয়াজ-লঙ্কা দিয়ে মাখা অপূর্ব স্বাদের গুঁড়ো করা মুচমুচে ডালের বড়ি বা বড়ি চূরা।

পুরীর বিখ্যাত দহি-পাখালা

‘জানেন কি, বাঙালি রসনায় ডাল ও বড়ি ব্যবহারের সূত্রপাত করেন উৎকলবাসী রাঁধুনেরাই?’ আচমকা গৃহস্বামীর এমন প্রশ্নের কোনও জবাব খুঁজে পাই না। উত্তরের আশা যে করেননি, তা প্রশ্নকর্তার নিরুত্তাপ কণ্ঠস্বরেই স্পষ্ট হয়। বলেন, মহানদী অববাহিকায় খোর্দা জেলার গোলবাই শাসন এবং অনুগুল জেলার শঙ্করজঙ অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রায় তিন থেকে চার হাজার বছর আগে উৎকল দেশে শবর জনজাতির কলাই বা বিউলি এবং মুগডাল চাষের প্রমাণ মিলেছে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মহাপ্রসাদে বিউলি ডালের পিঠে এবং মুগডাল দিয়ে মিষ্টি স্বাদের ‘হাবিস ডালমা’ রাঁধার রীতিও অত্যন্ত প্রাচীন। তারপরেই ফের প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘সেই প্রাক-বৈদিক যুগে বঙ্গে ডালশস্য উৎপাদনের কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় কি?’ কী মুশকিল! এসব কঠিন সওয়ালের মোকাবিলা করা কি আমাদের কম্ম!

হাবিস ডালমা

অপ্রস্তুত অতিথিদের সংশয়ের ডালে বসিয়ে রেখে মহাপাত্র ফের খেই ধরেন– ওড়িশার উপকূলীয় অঞ্চলের জলবায়ু এবং গঞ্জাম জেলার বেলে-দোআঁশ মাটি ডাল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। শীতকালীন ফসল হিসেবে এই অঞ্চলে বিপুল পরিমাণে ডাল চাষের চল এখনও রয়েছে। কলিঙ্গ বা প্রাচীন ওড়িশার গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বন্দর গোপালপুর থেকে একদা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ভারতের অন্যান্য উপকূলে নিয়মিত ডাল ও চাল রফতানি হত। শুধু তাই নয়, এই ডাল বেটে বড়ি তৈরির প্রচলনও হয় গঞ্জাম জেলাতেই, দাবি মহাপাত্রবাবুর। আজও না কি গোপালপুর অঞ্চলের মহিলাদের হাতে তৈরি খাঁটি বিউলির ডালের নকশা ছাড়া ফুলবড়ি ও তিলবড়ির চাহিদা তুঙ্গে। তাঁর বিশ্বাস, উনিশ শতকে মূলত উৎকলবাসী রাঁধুনে ঠাকুরদের হাত ধরেই বাংলার রান্নাঘরে বড়ির ব্যবহার শুরু হয়। এবার আর চুপ করে থাকতে না-পেরে বলে উঠি, বাংলায় বড়ি তৈরির লিখিত প্রমাণ তো ১৬ শতকে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ কাব্যেই রয়েছে। নীলাচলে বসবাসকালীন মহাপ্রভুর জন্য তাঁর বোন দময়ন্তীর তৈরি যেসব খাদ্যদ্রব্য ঝালিতে ভরে পাঠাতেন পানিহাটির ভক্ত রাঘব পণ্ডিত, তার মধ্যে তৈল বড়ি, মুগ বড়ি ও কুষ্মাণ্ড বড়ির উল্লেখ রয়েছে। তাছাড়া মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্যগুলিতেও তো বড়ির কথা লেখা হয়েছে। দমে যাওয়ার পাত্র নন মহাপাত্র। বরং পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন, ‘বড়ি চূরার তো কোনও উল্লেখ নেই বাংলায়!’

বড়ি চূরা

ডাল আর বড়ি নিয়ে তাল ঠুকে জঙ্গ লড়লেও তখন জানতাম না, এরপর সরষেবাটার ঝাঁঝে চোখে ধাঁধা লাগবে। পুরীর গ্র্যান্ড রোডের কাছে মান্ধাতার আমলের ওড়িয়া হোটেলের রান্নার সুখ্যাতি রয়েছে। খাঁটি উৎকলী রসনা চাখার বাসনা শুনে সেখানে পাত পাড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন চক্রতীর্থের অভিজ্ঞ ট্যুরিস্ট-গাইড কুকিল সোঁয়াই। তেলচিটে বেঞ্চিতে বসে অর্ডার দিতে না-দিতেই টেবিলে ঠকাস করে পড়ল প্রায় রাজস্থানি ঢালের মাপের কাঁসার বিরাট থালায় বেড়ে দেওয়া ভাত, শাক ভাজা, ঘন ডাল আর আলু চটকা। প্রতিটি পদই অসাধারণ সুস্বাদু। এসব শেষ করার আগেই হাজির হল মচ্ছ বেসর– সোজা কথায়, রুই মাছের পাতলা সরষেবাটা ঝোল, বাট উইথ আ টুইস্ট। বাঙালির জিভে সড়গড় হয়ে যাওয়া এমন মাছের ঝোলে সরষের ঝাঁঝের পাশাপাশি বড় জোর কাঁচা লঙ্কা আর ধনেপাতার আভাস পাওয়া যায়। কিন্তু এই ওড়িয়া সংস্করণে ঝাঁঝালো সরষের সঙ্গে টম্যাটোর টানটান স্বাদ আর কাঁচা আমের টোকো উসকানিও পেলাম। এর আগে আনন্দ বাজার থেকে সংগ্রহ করা মহাপ্রসাদী নিরামিষ বেসরের স্বাদ পেয়েছি। বাড়িয়ে বলছি না, কাঁচকলা, ওল, ছাঁচি কুমড়ো ও কচুর সেই ব্যঞ্জনে বাটা সরষের কমনীয় স্পর্শ আর ‘আম্বুলা’ অর্থাৎ কাঁচা আমের উপস্থিতি স্বাদকোরকে এক অদ্ভূত সুখানুভূতি সৃষ্টি করেছিল। কুকিলদার কাছে চিংড়ি আর মাশরুমের বেসরের কথাও শুনলাম। সরষেবাটা নিয়ে তুলনা টানলে উত্তেজিত হয়ে টেবিল চাপড়ে বলে উঠলেন, ‘রসগোল্লা নিয়ে যতই বড়াই করো না কেন, বাঙালিকে সরষেবাটা ব্যবহার করার রীতি যে ওড়িয়া রাঁধুনে বামুনরাই শিখিয়েছে, তার হাতেগরম প্রমাণ রয়েছে।’

সরষেবাটা দিয়ে চিংড়ির বেসর

এ আবার কী রকম দাবি? ডাল, বড়ি, এবার সরষেও! দাবড়ে দিয়ে দাদা বলেন, ‘তোমাদের পাঁচফোড়নে তো প্রথমে রাঁধুনি রাখার প্রথা ছিল। কিন্তু ওড়িয়া পাচকরা বাঙালি রসুইঘরে ঢুকে তার বদলে সরষে জুড়ে দিলেন। এখনও বহু বাঙালি পরিবারে সেই রীতিই চালু রয়েছে।’ অস্বীকার করব না, পরে স্বনামধন্য রসনা বিশেষজ্ঞ চিত্রিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা প্রবন্ধেও পড়েছি, আদতে পাঁচফোড়ন বলতে মেথি, কালো জিরে, জিরে, মৌরি ও রাঁধুনির সমন্বয়ই বাংলায় প্রচলিত ছিল। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় নাগাদ কিছু কিছু পরিবারে এই সমাবেশ থেকে বাদ পড়ে রাঁধুনি, আর তার স্থলাভিষিক্ত হয় কালো সরষে। কে আগে আর কে-ই বা পরে তার ব্যবহার শুরু করেছিল– সেই তর্কে না গিয়ে বরঞ্চ এটুকু বলা যায় যে, প্রাচীন অঙ্গ, বঙ্গ ও কলিঙ্গের মধ্যে গভীর যোগসূত্র স্থাপন করেছিল সরষেদানা। এই তিন অঞ্চলের রান্নাতেই তাই সরষের তেলের রমরমাও লক্ষ্যণীয়। তবে স্থান বিশেষে পালটে যায় রসনায় বাটা সরষের প্রয়োগ কৌশল ও অনুপানের মাত্রা। আর তাতেই হেরফের ঘটে আঞ্চলিক রান্নার স্বাদ-গন্ধে।

সরষেবাটায় সমৃদ্ধ আম্বুলা রাঈ

ইতিহাস বলে, অসংখ্য জনজাতির সমষ্টিতে গড়ে ওঠা উৎকল দেশে সরষের ব্যবহার বেড়ে যায় কলিঙ্গ যুদ্ধের পরে সম্রাট অশোকের শাসনে বৌদ্ধ ধর্মের রমরমার যুগে। প্রধানত খাদ্য সংরক্ষণের তাগিদেই সরষেবাটা প্রয়োগ করার রীতি চালু হয়। পরবর্তীকালে শুক্তো বা মাছের ঝোলের মতো পদে সরষের বহুল জনপ্রিয়তা ওড়িশা না বাংলা, ঠিক কোথায় দেখা দেয়, সেই জটিল ধাঁধার সমাধান খুঁজতে বসা এখন অবান্তর। তবে সরষে নিয়ে উৎকলী পাচকদের মাতামাতি হয়তো বাঙালির তুলনায় সামান্য হলেও বেশি। বেসর ছাড়াও বিভিন্ন পদে সরষে দানার ব্যবহারে তাঁরা রীতিমতো মুক্তকচ্ছ। বলতে গেলে, সরষেবাটা হল ওড়িয়া পাচকদের রান্নায় তুরুপের তাস বিশেষ। তবে তা ব্যবহারের নিজস্ব ব্যাকরণও মেনে চলতে হয়। বেসরে যেমন সরষের ঝাঁঝালো দাপট থাকে তুঙ্গে, সেখানে আর এক সরষেজাত পদ রাঈ হাঁটে একদম উল্টো ছন্দে! আম্বুলা রাঈ, পুঁই রাঈ বা লাউ রাঈয়ের মতো ব্যঞ্জনে সরষাবাটার ব্যবহার খুবই মৃদু ও সংযত। ফলে এসব পদে ঝাঁঝের পরিমাণ বেশ হালকা, আর টকের প্রভাবও বাধ্যতামূলক নয়। তবে ওড়িয়া রান্নার ম্যাজিক এখানেই শেষ নয়। স্রেফ এক চিমটে বাটা সরষের টুসকি দিয়ে চমৎকার নানা অম্বল রাঁধতে পারেন উৎকলবাসী। এমনই মুখরোচক নমুনা ভিন্ডি সরিষা খাট্টার চমকে দেওয়া স্বাদে মজেছিলাম পুরীর মেরিন ড্রাইভের বিড়লা গেস্ট হাউসের খানা কামরায়। এখানকার পাচকের আর এক স্মরণীয় কীর্তি সরষাবাটা গোলায় চুবিয়ে সজনে ডাঁটার মুচমুচে প্যান-ফ্রাই। এছাড়া, গৌরবটা শাহির অনামা ভাতের হোটেলে সারুপত্র তরকারি অর্থাৎ, পুরভরা কচুপাতা মুড়ে ভাপিয়ে নেওয়ার পরে সরষেবাটা ক্কাথে ফুটিয়ে যে স্বাদু ইন্দ্রজাল রচনা করেছিলেন অজ্ঞাতকুলশীল উৎকলী রাঁধিয়ে, তার স্বাদমাহাত্ম্য বর্ণনা করার মতো এলেম অন্তত এই শর্মার সাধ্যে কুলোয়নি।