


সোনাম ওয়াংচুকের এই দীর্ঘ অনশন, এবং তার ফলে তাঁর শরীরের অবস্থার অবনতি, সারা পৃথিবীর মানুষের মনে আশঙ্কার সঞ্চার করেছে– ইতিমধ্যেই যা খবর পাওয়া যাচ্ছে তা খুব সুখকর নয়– তাঁর স্বাস্থ্য দিনদিন অবনতির দিকে চলেছে। অনেকেরই ভাবনা, এভাবে চললে তিনি বিপদগ্রস্ত হতে পারেন। তবে, এই আশঙ্কার পাশাপাশি, কিছুটা আশার আলোও কি দেখা যাচ্ছে না?
বিশ্বসুদ্ধু মানুষের সঙ্গে ভারতের মানুষের এক বড় অংশও যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের নেশায় বুঁদ হয়ে রয়েছেন, ঠিক সেই সময়ে এ দেশের কেন্দ্রস্থলে– নতুন দিল্লির যন্তর-মন্তর প্রাঙ্গণে– আসন্ন মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন এক প্রবীণ ভারতীয়।
ব্যাপারটা বিস্তৃত ব্যাখ্যার দাবি রাখে। যিনি মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি কোনও সাধারণ মানুষ নন– তিনি একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৌশলী, পরিবেশবিদ, আন্দোলনকর্মী এবং শিক্ষাবিদ তথা শিক্ষা-সংস্কারক। যে-কারণে তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন, সেই কারণটাও খুব স্বাভাবিক নয়। তিনি মনে করেছেন, ভারত শিক্ষাক্ষেত্রে গভীর এক সংকট এসে উপস্থিত হয়েছে, এমনই এক সংকট– যার ফলে দেশের ছাত্রসমাজ ও যুবসমাজ নিজেদের সামনে নিশ্চিত ভবিষ্যতের কোনও দিশা দেখতে পারছে না, আর তাই তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে কয়েকটি দাবি সামনে রেখে অনশনে বসেছেন। এক্ষেত্রে স্বীকার করতেই হয়– তিনি নিজের কোনও স্বার্থসিদ্ধি করতে এ পথ বেছে নেননি, বরং দেশের ছাত্র ও যুবকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাত থেকে বাঁচানোর জন্যই নিজের জীবন বাজি রেখেছেন।

এতক্ষণে নিশ্চয়ই সকলেই বুঝতে পেরেছেন, আমরা যাঁর কথা বলছি, তিনি হলেন ‘রামন ম্যাগসাইসাই’ পুরস্কার-জয়ী পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক, আমাদের দেশের পার্বত্য অঞ্চল লাদাখের বাসিন্দা, যিনি গত প্রায় ২০ দিন ধরে যন্তর-মন্তরে অনশনে বসেছেন। এই দীর্ঘ অনশনকালে যাঁর স্বাস্থ্যের লক্ষণীয় অবনতি হয়েছে এবং দেশ-বিদেশের নানা মানুষ যাঁর স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে ভয়ানক উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। অনেকেই জানেন, প্রায় ৬০ বছর বয়সি সোনাম ওয়াংচুক এর আগেও একাধিকবার অনশনে বসেছিলেন, বা বসার চেষ্টা করেছিলেন (যে চেষ্টা সর্বদা সফল হয়নি যেহেতু তাঁর স্বাস্থ্য ও অন্যান্য কয়েকটি কারণে সরকারি হস্তক্ষেপ ঘটেছিল)। অতীতে নানা বিষয়ে তিনি সরকারি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন। সেই সুবাদে তিনি ভারতের জনপরিসরে এক সুপরিচিত নাম। তবে, যেহেতু তিনি দেশের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা, যেহেতু আমাদের দেশের অধিকাংশ সাধারণ মানুষ প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের জীবনের মান নিয়ে খুব একটা আগ্রহ দেখান না– শুধুমাত্র পর্যটনস্থল হিসেবেই সেসব অঞ্চলকে দেখেন (যা খুব দুর্ভাগ্যজনক), তাই সোনাম ওয়াংচুকের কাজের পরিধি ও ব্যাপকতা নিয়ে অনেকের ধারণাই পূর্ণাঙ্গ নয়। সোনাম ওয়াংচুক শুধু একজন সাধারণ প্রকৌশলী বা পরিবেশবিদ ও শিক্ষাবিদ নন, তিনি গত কয়েক দশক ধরে লাদাখ ও লাদাখ-সংলগ্ন অঞ্চলের উন্নতিকল্পে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছেন। একদিকে তিনি যেমন তাঁর পেশাগত বিদ্যা ও দক্ষতা দিয়ে সে অঞ্চলের উন্নতিসাধন ঘটাতে চেয়েছেন, ঠিক তেমনই লাদাখ অঞ্চলের পরিবেশ রক্ষায় স্থায়ী স্বাক্ষর রাখতে পেরেছেন। লাদাখ অঞ্চলের ছাত্র ও যুবসমাজের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের কাজেও তাঁর অবদান অসামান্য! এ বিষয়ে বোধহয় একটা কথা না বললেই নয়– আমরা পাশ্চাত্য থেকে যে-শিক্ষাকে ‘আধুনিক শিক্ষা’ ভেবে গ্রহণ করেছি, তা দেশ-কাল-নিরপেক্ষ নাও হতে পারে। বিশেষত, যেসব অঞ্চলের এক সুদীর্ঘ স্থানীয় সংস্কৃতি আছে, সে অঞ্চলের শিক্ষাকে সেই সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও আনুগত্য নিয়েই চলতে হয়। তা যদি না হয়, তাহলে সেই স্থানীয় সংস্কৃতি চিরতরে লোপ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে– যা কখনওই কাম্য হতে পারে না। একথা অনস্বীকার্য যে, ভারতের মতো বিশাল ও বৈচিত্রপূর্ণ দেশে সকলের জন্য একই ধাঁচে শিক্ষাব্যবস্থা চলতে পারে না। সোনাম ওয়াংচুক একথা সম্যকভাবে বুঝেছিলেন, আর তাই তিনি আধুনিক শিক্ষার নামে লাদাখের যুবসমাজের ওপর যে ‘ভিন্ন সংস্কৃতি’ চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়াস শুরু হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন সংগঠিত করে এক বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং তার রূপরেখা প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর এই প্রয়াস তাঁকে সারা বিশ্বে পরিচিত ও অভিনন্দিত করে তুলেছিল– অনেকেই স্মরণ করতে পারবেন যে, বেশ কিছুকাল আগে মূলধারার হিন্দি চলচ্চিত্র-জগতে তাঁর কর্মপ্রয়াস অনুকরণ করে– এবং তাঁকেই কেন্দ্রীয় চরিত্র করে– যে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল সেটি বিপুল সাড়া ফেলে দিয়েছিল এবং সেই সূত্রে সোনাম ওয়াংচুক দেশে ও বিদেশে বিপুল পরিচিতিও পেয়েছিলেন।

তাঁর কাজের পরিধি অবশ্য শুধু এটুকুই নয়। আরও অন্তত দু’টি ক্ষেত্রে তিনি অনন্য পরিচয় রেখেছেন। প্রথমত, হিমালয়ের লাদাখ অঞ্চলের ভঙ্গুর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য তিনি যে উদ্যোগ ও আন্দোলন চালিয়েছেন, তা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। দ্বিতীয়ত, যা বিশেষ করে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বিভিন্ন ব্যবসায়িক কর্পোরেট সংস্থা যেভাবে লাদাখ অঞ্চলের ভূসম্পদের প্রতি লালসার বিস্তার দেখিয়েছে, সোনাম ওয়াংচুক তা রোধ করার চেষ্টা করেছেন, যাতে লাদাখের অদ্বিতীয় পরিবেশ অক্ষুণ্ণ ও অবিকৃত থাকে। তাঁর এই উদ্যোগ একদিকে যেমন পরিবেশবিদদের প্রশংসা ও স্বীকৃতি অর্জন করেছে, ঠিক তেমনই দেশের কর্পোরেট লবির একাংশ ও কিছু কিছু রাজনৈতিক শক্তির অস্বস্তির কারণ হয়েছে।
বর্তমানে তিনি যে অনশন-আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন, তা অবশ্য অন্য কারণে। আগেই যেমন উল্লিখিত হয়েছে, দেশের ছাত্র-যুবর স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আমরা স্মরণ করতে পারি, সাম্প্রতিক অতীতে দেশের কিছু পরীক্ষা ব্যবস্থায় অসংগতি ও ব্যতিক্রমী অনিয়ম ধরা পড়েছে। এ বছরের ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা– ‘নিট’ নামে যা পরিচিত– তার এক ভয়াল উদাহরণ। পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই সে পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায় এবং সেকথা জানাজানি হয়ে যেতে পরীক্ষা বাতিল করে দেওয়া হয়। এর ফলে বিপাকে পড়ে অগণিত সাধারণ পরীক্ষার্থী। যারা সারা বছর প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিল, কলমের এক খোঁচায় তাদের পরীক্ষা ও সারা বছরের পরিশ্রম ব্যর্থ ও বিফল হয়ে গেল। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বেশ কয়েকজন তরুণ প্রাণ এর ফলে অকালে ঝরে গিয়েছে– তারা আবার নতুন করে পরীক্ষা-প্রস্তুতি নেওয়ার চাপ সহ্য করতে না-পেরে আত্মহনন করেছে। দেশের যুবসমাজের এই ক্ষতি অপূরণীয় এবং এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব অপরিসীম। এ কারণেই, সোনাম ওয়াংচুক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। এছাড়াও, আমাদের এ-ও মনে পড়বে যে, সিবিএসই পরীক্ষার অনলাইন মার্কিং পদ্ধতিতেও ব্যাপক অনিয়ম ও বিচ্যুতি ধরা পড়েছে, যা পড়ুয়াদের স্বার্থ বিঘ্নিত করেছে। বলা নিষ্প্রয়োজন, এর দায়িত্বও কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রক অস্বীকার করতে পারে না। এ কারণেও ওয়াংচুক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। মূলত, এই দাবিতেই তিনি এবারের অনশন আন্দোলন চালাচ্ছেন।

অনশন, আমাদের দেশে এবং অন্যত্রও, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম বড় হাতিয়ার। ভারতে ব্রিটিশ শাসন চলাকালীন মহাত্মা গান্ধি একাধিকবার এই হাতিয়ার ব্যবহার করেছিলেন– বিশেষত ১৯৩০-এর দশকে ব্রিটিশ-প্রস্তাবিত সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার সময়ে। শুধু ভারতেই নয়, বিভিন্ন সময়ে আয়ারল্যান্ডে, দক্ষিণ আফ্রিকায়, ব্রিটেনে (বিশেষত সাফ্রাগেট আন্দোলনের সময়ে) এই অনশন শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। অনতি অতীতে ভারতেরই মণিপুর রাজ্যে ইরম শর্মিলার দীর্ঘ ১৬ বছর ব্যাপী অনশনের কথাও নিশ্চয়ই অনেকের মনে পড়বে। অনশন কোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ন্যায্য উপায় হতে পারে কি না, তা নিয়ে বিশ্বের জনপরিসরে বিতর্ক আছে। কেউ কেউ মনে করেন, নিজের শরীরকে নিগ্রহের মধ্যে নিয়ে গিয়ে অনশনকারী বিপক্ষের ওপর অন্যায় চাপ সৃষ্টি করেন, ইংরেজিতে যাকে ‘ব্ল্যাকমেল’ বলা যেতে পারে। তবে অনশনের পক্ষের যুক্তিও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। বিশেষত, বিপক্ষ যখন মহাপরিক্রমশালী রাষ্ট্রশক্তি, এবং ক্ষমতার ভারসাম্য যখন নিশ্চিতভাবেই রাষ্ট্রের পক্ষে পাল্লা ভারী করে দেয়, তখন আন্দোলনকারী বাধ্য হয় যে দাবিকে সে ন্যায্য মনে করছে, সেই দাবির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে অনশনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে। আমরা বলতে পারি, সোনাম ওয়াংচুক হয়তো– অন্য কোনও পন্থা খুঁজে না পেয়ে– বাধ্য হয়েই অনশনকে তাঁর অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

সোনাম ওয়াংচুকের এই দীর্ঘ অনশন, এবং তার ফলে তাঁর শরীরের অবস্থার অবনতি, সারা পৃথিবীর মানুষের মনে আশঙ্কার সঞ্চার করেছে– ইতিমধ্যেই যা খবর পাওয়া যাচ্ছে তা খুব সুখকর নয়– তাঁর স্বাস্থ্য দিনদিন অবনতির দিকে চলেছে। অনেকেরই ভাবনা, এভাবে চললে তিনি বিপদগ্রস্ত হতে পারেন। তবে, এই আশঙ্কার পাশাপাশি, কিছুটা আশার আলোও কি দেখা যাচ্ছে না? তাঁর এই দীর্ঘ আন্দোলন এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার অসংগতি, অনিয়ম ও অমার্জনীয় শৈথিল্যের প্রতি মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, যার ফলে– আশা করা অন্যায্য হবে না– এসব বেনিয়ম বিষয়ে সরকারি কর্তৃপক্ষ সতর্ক হবেন।
স্মরণ করা যেতে পারে, আজ থেকে প্রায় এক শতাব্দী পূর্বে মহাত্মা গান্ধি মহারাষ্ট্রের ইয়েরওয়াড়া কারাগারে যে অনশন শুরু করেছিলেন, তা কাঙ্ক্ষিত ফল লাভ করেছিল, অনশন ভঙ্গ করে গান্ধি রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে শুনেছিলেন তাঁর প্রিয় গান ‘জীবন যখন শুকায়ে যায় করুণাধারায় এসো’।

সে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে কি না, তা আমাদের অজানা। তবে, সোনাম ওয়াংচুকের জীবন আমাদের কাছে অমূল্য– প্রতিটি ভারতীয়ের জীবন আমাদের কাছে অমূল্য। আমরা আশা করব, কোনও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটার আগেই কর্তৃপক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হবে– ওয়াংচুক সসম্মান তাঁর জীবন রক্ষা করতে পারবেন।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved