


এমনিতে আমরা মেয়েদের হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দেওয়া, অর্থাৎ বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পক্ষে নাচলেও, কবিতা লেখার দায়ে কোনও মেয়েকে খুন হতে হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। হ্যাঁ, এমন হয়েছে যে সেই মেয়েকে হয়তো লিখতে বা লেখা ছাপাতে বারণ করা হয়েছে। মেয়েদের কবিতার বইয়ের সমালোচনা যদি লেখা হয় তা সাধারণত মেয়েরাই লিখে থাকেন। অথচ পুরুষের কবিতা যদি মেয়েরা সমালোচনা করেন, তাহলে সে পুং কবির হয়তো বা একটু মনোকষ্ট থেকে যায়। কিন্তু খুন? না।
বাংলা কবিতায় তরুণ কবির প্রথম বই নিয়ে আদিখ্যেতা চিরকালীন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্বভাব-কবিত্বে ডগমগ কবির প্রথম বই-ই তার শ্রেষ্ঠ বই হয়ে উঠেছে তা আমরা দেখেছি। কিন্তু বাংলা, বিশেষ করে আমাদের পশ্চিমবঙ্গ এমন কোনও ভূখণ্ড নয় যেখানে কবিতা লেখার দায়ে কবিকে খুন হতে হয়েছে। এমনিতে আমরা মেয়েদের হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দেওয়া, অর্থাৎ বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পক্ষে নাচলেও, কবিতা লেখার দায়ে কোনও মেয়েকে খুন হতে হয়েছে বলে মনে পড়ছে না। হ্যাঁ, এমন হয়েছে যে সেই মেয়েকে হয়তো লিখতে বা লেখা ছাপাতে বারণ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মাতাল জনগণমনঅধিনায়ক পুরুষ-কবি সভায় গিয়ে বলেছেন– মেয়েরা লিখতে পারে না, অতএব সাধারণ লেখক পরিচিতি পেতে কবিতা সিংহকে লিখে যেতে হয়েছে পাতার পর পাতা উপন্যাস। বহু প্রগতিশীল ছট কাগজের সভাতেও দেখা যায় মঞ্চ আলো করে বসে আছেন পুরুষ-কবিরা। মেয়েদের কবিতার বইয়ের সমালোচনা যদি লেখা হয় তা সাধারণত মেয়েরাই লিখে থাকেন। অথচ পুরুষের কবিতা যদি মেয়েরা সমালোচনা করেন, তাহলে সে পুং কবির হয়তো বা একটু মনোকষ্ট থেকে যায়। কিন্তু খুন? না।

কিন্তু এবার ভাবা যাক আফগানিস্তানের স্বর্গীয় সৌন্দর্যের শহর হেরাতে ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে জন্মানো একটি একটি মেয়ে, যে বড় হল যুদ্ধের আবহে, তালিবানি ফতোয়ায়, সে কি কবিতা লিখতে পারে? সে লিখতে শিখবে কী করে? কবিতা তো দূর অস্ত! এখানেই আসে সোনার ছুঁচ সূচিশিল্প বিদ্যালয়। ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে ফতোয়া ক্লিষ্ট মেয়েদের জন্য খোলা হয়েছিল এই সেলাই শেখার ইশকুল। কিন্তু সেখানে বাইরে থেকে দেখানো তালিবান অনুমোদিত সূচিশিল্পের বাইরে আসলে শেখানো হত লিখতে-পড়তে। আমাদের নায়িকা কবি নাদিয়া আঞ্জুমান (হিন্দি বানান অনুসারে অঞ্জুমন, যে শব্দের প্রয়োগ উত্তর ভারতীয় কবিতায় ও গানে অঢেল। অর্থ– সভা, মেহফিল, জমায়েত) এই গোপন পাঠশালাতেই শেখেন উচ্চতর পাঠ। হেরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহম্মদ নাসের রাহিয়াব গোপনে পড়াতেন এইসব ‘অবাধ্য মেয়েদের’। নাদিয়া এখানেই শেখেন সাহিত্য পাঠের কায়দা। এবং তাঁর কিশোরী মনের গভীরে ঢুকে পড়ে কবিতা। ফার্সি ভাষার কবিতা তাঁর মাতৃভাষা দারি-র কাছাকাছি হওয়ায় সে ভাষার কবিতাকল্প তাঁর মনে ছাপ ফেলেছিল। বিশেষ করে হাফিজ সিরাজি, বেদিল দেলহাভি (এই ‘দেলহাভি’ শব্দটি ফার্সি এবং উর্দু উভয় ভাষাতেই দিল্লি শহরের বিশেষণ। অর্থাৎ দিল্লিওয়ালা। এই বেদিল দেলহাভির মাতৃভাষা ছিল বাংলা– এমনটাই দাবি ফার্সির বিশ্বকোষের*) তাঁর প্রাত্যহিক চর্চা ও শিক্ষার অংশ হয়ে ওঠে; আর ওঠে গোটা পশ্চিম এশিয়া তথা যে কোনও নারী বিদ্রোহের এক প্রধান মুখ কবি ফারোক ফারখজাদের কবিতা। একটু পরেই আসব এই চিরবিদ্রোহিনীর প্রসঙ্গে। এইসব কবিতা নাদিয়াকে প্রেরিত করে তাঁর নিজের কাব্যদুনিয়া খুঁজে নিতে। নাদিয়ার ২১ বছর বয়সে ২০০১ সালে মার্কিন প্রহারে বিদায় নেয় তালিবান। তাঁর মেধার জোরে তিনি ভর্তি হন হেরাত বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে তিনি তাঁর ডিগ্রি শেষ করেন ২০০২ সালেই। কারণ গোটা পাঠ্যক্রম তাঁর আগে থেকে পড়া ছিল। প্রথম কবিতার বই ২০০৫ সালে। নাম ‘গুল-এ-দোদি’ বা ধোঁয়ার ফুল। সে বই আফগানিস্তানের গণ্ডি টপকে ইরান ও পাকিস্তানেও পৌঁছে যায়। তার আগের বছর হেরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান ফরিদ আহমেদ মাজিদ নেইয়াকে বিয়ে করেন নাদিয়া। বিয়ের পরে কবিতা মেয়েদের জন্য ‘না-পাক’ বলে ফরমান দেয় শ্বশুরবাড়ি। কিন্তু নাদিয়া লেখা ছাড়েন না। ৫ নভেম্বর ২০০৫ সালে রমাজান মাসের শেষে খুশির ইদ উপলক্ষে নাদিয়া তাঁর বোনের বাড়ি যেতে চাইলে ফরিদ তাঁকে মারতে শুরু করেন। শেষে অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে নিয়ে হাসপাতালে যান অটোরিক্সায় করে। রিক্সাচালকের বয়ান অনুসারে নাদিয়াকে মৃত অবস্থাতেই তাঁর গাড়িতে তোলা হয়। অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শী পরে জানান, নাদিয়া রক্তবমি করছিলেন মারের চোটে। গোপনে পাচার করা পাণ্ডুলিপি থেকে তৈরি করা হয় তাঁর দ্বিতীয় কবিতার বই ‘আশঙ্কার ভাণ্ডার’, ২০০৬ সালে প্রকাশিত হয়। খুনের দায়ে ফরিদের কারাবাস হলেও পরে বিচার-পঞ্চায়েত ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে তাকে ছেড়ে দেয়। নাদিয়ার এক পুত্র-সন্তান জন্মেছিল। সে বাবার কাছেই বড় হয়েছে বলে খবর। আরও জানা যায়– সে তার মাকে ‘ডাইনি’ বলেই চিনেছে।

আর ঠিক এখানেই আসে আরেক ‘ডাইনির’ স্মৃতি। কবি ফারোক ফারখজাদের। যাঁর জীবন মাত্র ৩২ বছরের (২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৪ – ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৭)। মিলিটারি কর্নেলের কন্যা। মোটামুটি উদার পরিবেশে, ইসলামিক বিপ্লবের আগে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মাত্র ১৬ বছর বয়সে উন্মাদ প্রেমে বিয়ে করেন ১০ বছরের বড় ব্যঙ্গ-লেখক পারভিজ শাপুরকে। ১৯৫২ সালে, বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ফারোক ফারখজাদের একমাত্র সন্তান কামিয়ারের জন্ম হয়। ১৯৫৪ সালে বিবাহ বিচ্ছেদ। পারভিজের সাথে বিচ্ছেদ এবং পরবর্তীতে বিবাহ বিচ্ছেদের (১৯৫৪) পর, একাধিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার কারণে তিনি তার ছেলের আইনি অভিভাবকত্ব হারান। তার ছেলে কামিয়ারকে, তাঁর আদরের ‘কামি’-কে তার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয় এবং পারভিজ ও তার পরিবারের কাছে বড় করা হয়। মাকে সন্তানের কাছে যাওয়ার ও দেখার সীমিত অধিকার দেওয়া হয়েছিল। এবং শিশুটিকে এই ধারণা দিয়ে বড় করা হয়েছিল যে, তার মা কবিতা এবং নিজের শারীরিক আনন্দের তাড়নায় তাকে স্বেচ্ছায় পরিত্যাগ করেছেন। তার সন্তান ভাবছে যে, তিনি তাকে স্বেচ্ছায় ফেলে চলে গেছেন– এই চিন্তা ছিল তাঁর এক গভীর দুঃখ এবং নিরন্তর মানসিক যন্ত্রণার উৎস। ১৯৫৫ সালের সেপ্টেম্বরে, মানসিক বিপর্যয়ের শিকার হওয়ার পর ফারখজাদকে এক মাসের জন্য একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

ফারখজাদের ঘটনার ৪০ বছর পরে আফগানিস্তানে হওয়া নাদিয়া আঞ্জুমানের হত্যা ইতিহাসের বহমান ভুল পুনরাবৃত্তি প্রবণতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। কবিতা লেখা চলছিল। ১৯৫৫ সালেই বেরয় তাঁর বিখ্যাত কবিতার বই ‘বন্দী’। পরপর প্রকাশ পেতে থাকে আরও কবিতার বই। ১৯৫৬-তে ‘দেওয়াল’, ১৯৫৮-তে ‘বিদ্রোহ’। ১৯৫৮ সালে তিনি কিছুদিন ইউরোপে কাটান। দেশে ফেরার পরে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় চিত্রপরিচালক ইব্রাহিম গোলেস্তানের। বিবাহিত গোলেস্তানের সঙ্গে আবার এক ঝোড়ো প্রেম। ১৯৬২ সালে তৈরি করেন কুষ্ঠরোগীদের নিয়ে নন-ফিকশান ছবি ‘বাড়িটার রং কালো’। যা আজও ইরানি নবতরঙ্গের মধ্যে এক উজ্জ্বল স্থান ধরে রেখেছে। যে মেয়েকে তার নিজের ভাই ছোটবেলায় বারান্দা থেকে পেচ্ছাপ করে বলেছিল– আমরা ছেলেরা যা পারি তোরা মেয়েরা কোনওদিন তা পারবি না। ফারখজাদকে সারাজীবন তাড়া করে বেরিয়েছে সেই কথা। অস্থির করে তুলেছে। লিখিয়ে নিয়েছে একের পর এক যন্ত্রণাময় কবিতার বিশ্ব। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবিতার বই ‘পুনর্জন্ম’। ১৯৬৭ সালে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান ফারখজাদ। যদিও সেই মৃত্যু নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। ইসলামিক বিপ্লবের পরে ইরানে নিষিদ্ধ হয় তাঁর কবিতা। কিন্তু ততদিনে তিনি কবিতা পাঠকের শিরায় প্রবাহিত। তাঁকে নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক চলচ্চিত্র। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে বহু ভাষায়।

নাদিয়া আঞ্জুমান ও ফারোক ফারখজাদ আসলে সতত পরাধীন মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের কবিতা।
*Pandari, Yadollah Jalali; Hirtenstein, Stephen; Negahban, Farzin (2013). “Bīdil (Bedil)”. In Madelung, Wilferd; Daftary, Farhad (eds.). Encyclopaedia Islamica Online. Brill Online. ISSN 1875-9831
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved