


কমল বংচের ও যোমিং থাংগা বংচের সংকলিত ও সম্পাদিত বংচের লোকগল্প, গান, প্রবাদ ও প্রবচনের বইটির ইংরেজি অনুবাদ ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। যে বংচের কবি ও কথকেরা ত্রিপুরার সাহিত্যসভাতেও ডাক পেতেন না, তাঁরা সাহিত্য অকাদেমির মাধ্যমে ত্রিপুরা এবং রাজ্যের বাইরেও আমন্ত্রিত হয়ে যেতে লাগলেন।
৭.
২০১০ সালের প্রথমদিকের কথা। আগরতলা থেকে মীনাক্ষী সেনের একটা ফোন এল। মীনাক্ষী তখন অধ্যাপনার পাশাপাশি সাহিত্য অকাদেমির মৌখিক সাহিত্য কেন্দ্রের অধিকর্তা। মীনাক্ষী বলল, জোহন বংচের নামের একজন স্কুলশিক্ষক একটি বিশেষ অনুরোধ নিয়ে দফতরে দেখা করতে এসেছেন। অনুরোধটি হল– বংচেরভাষীরা তাঁদের ভাষার মৌখিক গান, গল্প, কবিতার একটি সংকলন করতে চান আর সেটি কীভাবে করা যায়, সে-বিষয়ে পরামর্শ চান। এটুকুই। কোনও অর্থ বা সংকলনটি ছাপার বিষয়ে কোনও সাহায্য চান না। মীনাক্ষী জানাল, একশো বিশ-তিরিশ ঘর মানুষ বংচের ভাষায় কথা বলেন। ভাষাভাষীর সংখ্যা ৬৫০ থেকে ৭০০।
জোহন বংচেরের এই অনুরোধের কারণ হল, সাহিত্য অকাদেমির মৌখিক সাহিত্য কেন্দ্র কয়েক বছর ধরে খাসি, গারো, ভিল, সাওরা, ককবরক ইত্যাদি ভাষার মৌখিক সাহিত্য সংকলন ও অনুবাদের কাজ করছিল। আলাদাভাবে পরামর্শ দেওয়ার কোনও রীতি সাহিত্য অকাদেমিতে ছিল না। তাই মীনাক্ষীকে জিজ্ঞেস করলাম একদিনের একটি গল্প ও কবিতা বলার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? মীনাক্ষীর বিশেষ ভালোবাসা ছিল প্রান্তিক মানুষজন ও তাঁদের ভাষা-সাহিত্য বিষয়ে। মীনাক্ষীর গল্প পড়লে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। আমার সঙ্গে কথাবার্তার কয়েকদিনের মধ্যে মীনাক্ষী বংচের ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে যাঁদের স্পষ্ট ধারণা আছে, এমন দু’জন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। এঁরা হলেন– কমল বংচের ও যোমিং থাংগা বংচের।

কমল বংচের পেশায় রাজস্ব পরিদর্শক আর সেই সঙ্গে বংচের ভাষা সংরক্ষণে একজন সক্রিয় সংগঠক। সে-সময়ে বংচেরদের মধ্যে যে চার-পাঁচজন স্নাতক ছিলেন, তিনি তাঁদের মধ্যে একজন। অন্যদিকে, যোহন স্কুলের শেষ পরীক্ষাও দিয়ে উঠতে পারেনি। তবে বংচের লোকগল্প, কবিতা, সংগীত, প্রবাদ, বাগধারার ইত্যাদির সে হল জ্ঞানভাণ্ডার! আমার চেয়ে বয়সে বেশ কিছুটা ছোট যোমিং, এটি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল ঠাকুমা নেলসি লক্ষ্মী বংচেরের কাছ থেকে। ঠাকুমার নামে অমরপুর মহকুমার ওম্পি অঞ্চলে নেলসিপাড়া নামে একটি জায়গা আছে। যোমিং একজন ভালো কবি, যদিও সে কবিতা লেখে না। মুখে মুখে বানায় ও বলে। জলের তরঙ্গের মতো তা ওঠে আবার মিলিয়েও যায়। কারও স্মৃতিতে কিছু অংশ থেকে যায়, কখনও কেউ পুরোটাই মনে রাখে। কখনও আবার পুরোটা হারিয়েও যায়।
২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সাগর মহলে বংচের সাহিত্য সম্মেলনের আয়োজন করা হল। সাগর মহল জায়গাটা পশ্চিম ত্রিপুরার মেলাঘর গ্রামে। আগরতলা থেকে দূরত্ব ৫৫ কিলোমিটারের মতো। সকালে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। মীনাক্ষী কথা বলে রেখেছিল ইংরেজি ভাষার প্রাক্তন অধ্যাপক সরোজ চৌধুরীর সঙ্গে। ইংরেজি সাহিত্যের পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব লোকসাহিত্য বিষয়ে তাঁর ধারণা বেশ স্বচ্ছ। বাংলা ভাষার কথাকার ও অনুবাদক শ্যামল ভট্টাচার্যও সঙ্গে ছিল। ভারতের বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য নিয়ে তার বিশেষ উৎসাহ আছে। মীনাক্ষীর ইচ্ছেয় আমার বড় মেয়ে অমৃতাও সঙ্গে গিয়েছিল। এক টাকার কয়েন দিয়ে তৈরি বংচের মেয়েদের হার এতই পছন্দ হয়েছিল যে, পরে একটি গড়িয়ে নিয়েছিল। পুরনো দিনে রুপোর কয়েন দিয়ে এই হার তৈরি হত। কোনও কোনও বংচের বাড়িতে রানি ভিক্টোরিয়ার মুখ দেওয়া হার এখনও মেলে।

আমাদের গাড়ি সকাল সাড়ে ন’টার মধ্যে ‘সাগর মহল’-এ পৌঁছে গেল। অন্যদিকে তেলিয়ামুড়া, কোলাই-গণ্ডছড়া ও ধনলেখা গ্রাম– তিনটি থেকে প্রায় ৪০ জন লোককথক ও গায়ককে সঙ্গে নিয়ে ককবরক কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং তার কিছুক্ষণ পরেই চলে এলেন। তাঁদের আসা অনেকখানি বন ও পাহাড়ি অঞ্চল পেরিয়ে। দূরত্ব প্রায় ৮০-৯০ কিলোমিটার। আগরতলাতেও অনুষ্ঠান করা যেত, কিন্তু সেখানের চেহারা নাগরিক আর মেলাঘর হল গ্রামীণ। লোককথকদের শহরে এনে ফেলা আর জলের মাছকে ডাঙায় তোলা একই ব্যাপার। মেলাঘর জায়গাটা সরোবর, পাখির ঝাঁক, বড় বড় গাছ, কলাবন ইত্যাদি মিলে খুবই সুন্দর। ‘সাগর মহল’-এর রসুইকার গরম লুচি ও আলুর তরকারি পরিবেশন করলেন। সঙ্গে স্থানীয় মিষ্টি। খেয়ে সবাই খুশি।
সভাঘরে ঢুকে দেখি মঞ্চের কাছে মাটির একটা বেশ বড় জালা বসানো আছে। সেটা চারপাশে গাছপালা দিয়ে সাজানো। পুরো বিষয়টাই বংচের উৎসবের রীতিতে। রয়েছে মাটির প্রদীপও। বংচের পুরুষ ও নারীরা নিজস্ব আনুষ্ঠানিক পোশাকে বেশ সেজেগুজে তৈরি হয়ে আছেন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে। এক ঝাঁক কিশোর-কিশোরীও আছে। দু’-তিনজন বৃদ্ধাকেও দেখলাম যাঁদের মুখের চামড়ায় অসংখ্য ভাঁজ। যাঁরা এসেছেন তাঁদের কারও হাতে বাঁশি ও সারিন্দা কারও আবার চামপ্রেং। অন্য বাদ্যযন্ত্রও দেখা গেল। সবাই তৈরি তাই অনুষ্ঠান শুরু করার কথা বলল মীনাক্ষী। জানা গেল, যাঁদের আসার কথা তাঁরা সবাই এসেছেন, কিন্তু গাঁওবুড়ো আসতে পারেননি। সমস্যা হল, তাঁর অনুমতি ছাড়া উৎসব শুরু করা যাবে না! শেষে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে আমাকেই গাঁওবুড়ো বানিয়ে দিল। তারপর জালার কাছাকাছি জায়গায় একটা চেয়ার টেনে আমাকে বসতে বলা হল। তারপর মাথার উপর ফুল, ঘাস ইত্যাদি পড়ল। মন্ত্রতন্ত্রের মতো কিছু পঙক্তি উচ্চারণ করা হল। বুঝলাম গাঁওবুড়োকে বরণ করা হচ্ছে। তারপর অনুমতি নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করা হল।

শুরুতে কমল বংচের প্রাথমিক ধারণা দিলেন বংচের জাতি ও ভাষা বিষয়ে। বংচের হল মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর কুকি-চিনের অন্তর্গত সালাম-কুকি উপপরিবারের ভাষা। বংচের জনজাতির আদি বাসস্থান দক্ষিণ চিনের চিংলাং অঞ্চল। ‘শিমলায়’ শব্দের অর্থ পাহাড়ের গুহার মুখঢাকা পাথর। সেখানের রাজার অত্যাচারে বংচের জনগোষ্ঠীর মানুষরা বর্মাতে চলে আসেন। সেখানে তখন মগ রাজা। সেখানের রি-লি সরোবরে ধারে বংচেররা জুম চাষের মাধ্যমে জীবনধারণ করতেন। জুম চাষের জমি একসময় উর্বরতা হারায় আর তাই বর্মা-সীমান্ত পেরিয়ে মিজোরামের চম্ফায়ে চলে আসা। সেখান থেকে একসময় মিজোরামের উত্তরভাগে। বংচের রাজা করপুইয়া মদ্যপ ছিলেন আর সাধারণ মানুষের ওপর প্রচুর কর চাপিয়েছিলেন। ফলে অ-বংচের প্রজারা বিদ্রোহ করেন আর প্রাণ যেতে থাকে সাধারণ বংচের মানুষের। বিরোধীরা এতই শক্তিশালী ছিল যে, অসংখ্য বংচের মানুষ মারা যান আর বাকিরা উদ্দাম পাহাড়ি নদী তুই-পুই পেরিয়ে অন্য পাড়ে পৌঁছনোর চেষ্টা করেন। কিন্তু স্রোত অসংখ্য মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়! ভাবা হয়েছিল, পুরো জাতিটাই অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে কিন্তু সামান্য কিছু মানুষ বেঁচে ছিলেন। কাটা গাছের পাশ দিয়ে অনেক সময় যেমন মঞ্জরী বের হয়, এ-ও তেমনই। ‘বংচের’ শব্দটিও এই ভাবনা থেকে তৈরি। ‘বং’ মানে কোনও কিছু কেটে ফেলা আর ‘চের’ মানে মঞ্জরী। কাটা জাতি আবার নতুন পাতার মতো গজিয়ে ওঠে। বংচের মানুষজন ত্রিপুরাতে আসার আগে একটি পর্ব চট্টগ্রামে থেকেছেন।
সাহিত্য উৎসব শুরু হল গান দিয়ে। তারপর নাচ ও গান এক সঙ্গে চলতে লাগল। বাজতে থাকল নানা বাজনা। বংচের সংস্কৃতি যে কত বৈচিত্রময়, তা ক্রমশ ফুটে উঠতে লাগল। এক সময় নতুন রকমের গান শুরু হল। তাতে কান্নার সুর শোনা গেল। জিজ্ঞেস করে জানলাম যে, সমস্ত বংচের মানুষ নদী পেরনোর আগে অস্ত্রের আঘাতে মারা যান, আর যাঁরা তুই-পুই নদীতে ভেসে যান, তাঁদের দূরস্মৃতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাহিত হয়ে আজও কাঁদায়। মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ অলিখিত কবিতা শোনালেন। তারপর শুরু হল কবির লড়াই। যে বৃদ্ধাকে অথর্ব বলে মনে হয়েছিল, তিনি দেখি কবির লড়াইয়ে সবাইকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন!
দুপুরে খাওয়ার জন্য কিছুক্ষণ অনুষ্ঠান স্থগিত থাকল। অনুষ্ঠান আবার শুরু হতে কথকেরা গল্প শোনাতে লাগলেন। তারপর আবার নাচ ও গান চলতে লাগল। বিকেল চারটেয় যে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার কথা, তা চলল রাত প্রায় আটটা পর্যন্ত। আসলে কেউ কোনওদিন তাঁদের ডাকেনি আর তাই নিজেদের উজাড় করে দিতে চাইছিলেন। রাত হওয়াতে গ্রামে ফেরা হল না। একদিকে ভালোই হল। রাতে খাওয়ার পর কিশোরীরা খোলা আকাশের নিচে আবার গান শুরু করল। পরের দিন সকালে লুচি-তরকারি খেয়ে যে যার জায়গায় ফিরে যাবে। ‘সাগর মহল’ বাড়িটার ঢোকার মুখে গিয়ে দেখি কিশোরীরা একসঙ্গে গলা ছেড়ে গান গাইছে। অত্যন্ত মিষ্টি সে সুর। বোধহয় প্রেমের গান। একটি বংচের প্রেমের গানে এই চারটি পঙক্তি ছিল–
‘আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
সন্ধে বেলায় চুল বেঁধেছি
এর পরেও, ও রামোই, বলবে
আমার মাথার চুল উড়ছে?’

সাগর মহলের অনুষ্ঠানের শেষে প্রত্যেক কথক, কবি ও শিল্পীকে ১০০০ টাকা করে সম্মানদক্ষিণা দেওয়া হয়েছিল। শুনেছিলাম একদিনে ওটাই ছিল ওঁদের সবচেয়ে বেশি প্রাপ্তি!
সাহিত্য উৎসব দেখে ও সবার সঙ্গে আলোচনা করে মনে হয়েছিল, সংকলন ও অনুবাদ করলে একটি ভালো বই হবে। সে কাজ বেশ তাড়াতাড়িই শুরু হয়ে গিয়েছিল কমল বংচের ও মীনাক্ষীর উদ্যোগে আর যোমিং থাংগা বংচেরের প্রবল উৎসাহে। আমি কলকাতায় ফেরার কয়েকদিনের মধ্যে ত্রিপুরা সরকারের মন্ত্রী ও কবি অনিল সরকারের কাছ থেকে একটি ফোন পেলাম। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ওঁর খুবই উৎসাহ। ফোনে বললেন, ‘আপনারা ত্রিপুরার সবচেয়ে ছোট জনজাতির সাহিত্য নিয়ে কাজ করে চলে গেলেন। আমিও একটা কাজ করব বলে ঠিক করেছি। এই সব ভাষার জন্যে একটা পুরস্কার চালু করব।’ তার কিছুদিন পরে সন্ধের দিকে মীনাক্ষীর একটা ফোন এল। আমি তখন যদুবাজারে ভালো আম বাছছি। ফোন ধরতে মীনাক্ষী বলল, যোমিং আমার সঙ্গে কথা বলতে চায়। যোমিং ফোন নিয়ে বলল, ‘স্যর, আমাকে ত্রিপুরা সরকার ভাষা সম্মান দেবে বলে ঘোষণা করেছে।’ আমি যোমিংকে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলাম। তারপর ফোন ছেড়ে আমের স্তুপে হাত দিয়েছি। আবার ফোন এল। মীনাক্ষী বলল যোহন আরও কিছু বলতে চায়। ‘ওকে দাও’ বলাতে যোহন ফোন হাতে নিয়ে বলল, ‘স্যর, পুরস্কারের টাকা কত জিজ্ঞেস করলেন না তো?’ টাকার কথা জিজ্ঞেস করতে মুখে বাধে, তবু সে-কথা না তুলে বলি, ‘বাজারে আছি বলে তাড়াহুড়োতে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি। কত টাকা?’ যোমিং একটা লম্বা টান দিয়ে বলল, ‘স্যর, পাঁচ–হাজার–টাকা!’
১৫ আগস্ট বা ২৩ জানুয়ারির কোনও একটা দিনে রাষ্ট্রপতি ভবনে গুণী লেখক-শিল্পীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভাষা সম্মান পাওয়ার কারণে সেবার ত্রিপুরা সরকার যোমিংকে প্রতিনিধিদলে যুক্ত করে। রাষ্ট্রপতিকে দেবে বলে একগুচ্ছ বড় বড় মাদুলি দিয়ে গাঁথা একটা হার নিয়ে গিয়েছিল। সিকিউরিটির প্রশ্নের মুখে পড়ে জানায় যে, তাদের জনজাতির রীতি হল রাজা বা দেশের প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কিছু একটা উপহার দেওয়া। সিকিউরিটির লোকজন জানায় যোমিং নিজে হাতে দিতে পারবে না, তবে রাষ্ট্রপতির কাছে সে হার পৌঁছে যাবে। তার কিছুদিনের মধ্যে ত্রিপুরার বেশকিছু সরকারি কর্মী বংচের গ্রামগুলোতে শশব্যস্ত হয়ে হাজির হন। রাষ্ট্রপতি ভবনের সিকিউরিটি পরে হারটা এক্স-রে মেশিনে ফেলে দেখে মাদুলির ভিতর নানা চিরকুট। বার করে দেখা গেল ছোট ছোট অক্ষরে বংচের গ্রামগুলোতে পানীয় জল, আলো, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যাঙ্ক ঋণ ইত্যাদি নানা সমস্যার কথা লেখা আছে। তাতেই দিল্লি থেকে আগরতলায় ফোন আর ব্যাঙ্ক-সহ নানা প্রতিষ্ঠানের ছোটাছুটি। মীনাক্ষী সেনের কাছে ঘটনাটা আমার শোনা। ওই ঘটনার পর যোমিং রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্টোন চিপস আর পিচ ঢালার তদারকির কাজ ছেড়ে বংচের গ্রামগুলোর অবস্থার ফেরানোর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ফলে সংসারে বেশ অভাব। শেষে কমল বংচের আর মীনাক্ষীর চেষ্টায় পূর্ত দফতরে ছেড়ে যাওয়া নিচুতলার কর্মীর কাজটি ফিরে পায়।

কমল বংচের ও যোমিং থাংগা বংচের সংকলিত ও সম্পাদিত বংচের লোকগল্প, গান, প্রবাদ ও প্রবচনের বইটির ইংরেজি অনুবাদ ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। যে বংচের কবি ও কথকেরা ত্রিপুরার সাহিত্য সভাতেও ডাক পেতেন না, তাঁরা সাহিত্য অকাদেমির মাধ্যমে ত্রিপুরা এবং রাজ্যের বাইরেও আমন্ত্রিত হয়ে যেতে লাগলেন।
২০১৪ সাল নাগাদ বাংলা অনুবাদে ভারতীয় কবিতার একটি সংকলন প্রকাশ করার পরিকল্পনা করি। এটি আমার ব্যক্তিগত কাজ। ২৫টি ভাষার ৬০ জন কবির ৩০০-র বেশি কবিতা অনুবাদ করা হয়। ৪৩ জন অনুবাদক সে-কাজে যুক্ত ছিলেন এবং অধিকাংশ অনুবাদক মূল ভাষা থেকে বাংলাতে অনুবাদ করেন। সেই অনুবাদ সম্পাদনা ছাড়াও একটি দীর্ঘ ভূমিকা লিখি আর কবি ও অনুবাদকদের বিস্তারিত পরিচয় দিই। ‘ভারতজোড়া কাব্যগাথা’ নামের সেই সংকলনের কাজ শেষ করে মনে হল এমন একজনকে উৎসর্গ করব, যিনি কবিতাকে প্রাণ থেকে ভালোবাসেন আর সেই সঙ্গে নিজের মাতৃভাষাকেও।

২০১৭ সালে প্রকাশিত সে সংকলনটি আমি উৎসর্গ করি যোমিং থাংগা বংচেরকে। তারপর সে খবরটি যোমিংকে ফোনে জানাতে গিয়ে শুনি, ইনকামিং কলের সুবিধে নেই। তার কিছুদিন পর থেকে আর কোনও রিং শোনা গেল না। তারপর ত্রিপুরার বেশ কয়েকজন পরিচিত মানুষকে নতুন নম্বর দিতে বলি, কিন্তু কেউ পারে না। আসলে যোমিং আগরতলা থেকে বহুদূরে থাকার কারণে আগরতলা এসে নিজে যোগাযোগ না করলে আর কোনও উপায় থাকে না। মাঝে একবার ত্রিপুরাতে গিয়েছিলাম আর বইটি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলাম দেব বলে, কিন্তু কোনও খোঁজ পাইনি।

গতকাল কমল বংচেরকে ফোন করেছিলাম এই লেখাটির জন্য দু’-একটি তথ্য যাচাই করে নিতে আর সে-সঙ্গে দু’-একটা ছবির জন্য। কথা শেষে যোমিংয়ের খোঁজ নিতে গিয়ে শুনি অকালে সবাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছে! প্রাণচঞ্চল যোমিংয়ের এই নিঃশব্দে চলে যাওয়া মন একেবারেই মানতে চায় না। সেই সঙ্গে এ দুঃখও থেকে যাবে যে, যোমিং থাংগা বংচেরকে উৎসর্গ করা বইটি ওর হাতে আর কোনওদিন পৌঁছে দিতে পারব না।
…………………………….
রোববার.ইন-এ পড়ুন মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য লেখা
…………………………….
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved