Robbar

নন্দলালের ছাত্র বাছাই

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 26, 2026 3:36 pm
  • Updated:July 26, 2026 3:36 pm  

ভর্তির মুহূর্তে রামকিঙ্করের হাত ছিল যেমন তৈরি, তেমনই তাঁকে এনেছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি এ-ও সত্যি, রামকিঙ্করের কাজের মধ্যে নন্দলাল নিঃসন্দেহে আগামী দিনের এক মহা সম্ভাবনাময় প্রতিভার আলোকরেখা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তবে রামকিঙ্করকে ‘দু-তিন বছর থাকো’ বলে সুযোগ দিলেও শিল্পী চিত্তপ্রসাদকে নন্দলাল গ্রহণ করেননি। সে প্রায় একই কারণে। নন্দলালের হয়তো মনে হয়েছিল চিত্তপ্রসাদের পক্ষে কলাভবনে তেমন কিছু শেখার নেই।

সুশোভন অধিকারী

১৩.

কীভাবে তাঁর ছাত্রদের নির্বাচন করতেন অধ্যক্ষ নন্দলাল? তিনি কি কলাভবনে ভর্তি হতে আসা ছাত্রদের প্রত্যেককে গ্রহণ করতেন? না কি এ ব্যাপারে বিশেষ নিয়মকানুন বা কোনও নির্দিষ্ট মাপকাঠি ছিল? অথবা কি এখনকার মতো একটা অ্যাডমিশন টেস্টের মধ্যে দিয়ে কলাভবনে প্রবেশের অধিকার অর্জন করতে হত? তা যদি হয় তবে কেমন ছিল সেই ব্যবস্থা? এ প্রসঙ্গে একেবারে গোড়াকার কথা তেমন জানা যায় না। তবে স্মৃতিকথা থেকে কখনও জানতে পারি, ভর্তি হতে আসা ছাত্রদের পুরনো কাজ দেখানোর রেওয়াজ ছিল। মোটামুটি সেটা দেখেই গ্রহণ করা হত তাদের। আগত ছাত্রদের সঙ্গে কথাবার্তা বলে খানিকটা বুঝে নেওয়া হত, তারপর যাবতীয় ব্যবস্থা। বলাবাহুল্য ছাত্র নির্বাচনের প্রধান ভূমিকা ছিল নন্দলালের, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তিনিই নিতেন।

নন্দলাল বসু

যেমন রামকিঙ্কর বেইজের কথাই ধরা যাক। তাঁর কলাভবনে আসার নেপথ্যে ‘প্রবাসী’র সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কথা সুবিদিত। আদতে উভয়েই বাঁকুড়ার অধিবাসী। বাঁকুড়ার যুগীপাড়ায় রামকিঙ্কর তখন কৈশোরের প্রান্তে পৌঁছেছেন। বাংলার লোকশিল্পে অন্যতম জায়গা হিসেবে বাঁকুড়ার নাম উপরের দিকে। সেখানকার পোড়ামাটি, বিষ্ণুপুরী তাস, শঙ্খের কাজ তো বিখ্যাত। দরিদ্র পরিবারের ছেলে রামকিঙ্কর আপন মনে কাজ করে চলেন, নিজের চেষ্টায় ছোটখাটো তেলরঙের ছবিতে হাত পাকানোও শুরু হয় তাঁর। অন্যদিকে টাকাপয়সার তাগিদে নাটকের দৃশ্যপট তৈরি, সাদামাটা ভাষায় যাকে বলে ‘সিন’– তাও আঁকতে হয়। শখ করে আঁকেন আত্মীয়-পরিজনের প্রতিকৃতি– তবে সে সবই রিয়েলিস্টিক ঢঙে। এইভাবে নিজের অজান্তেই শিল্পের পথে অনেকটা এগিয়ে চলেছেন তিনি। অসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনিও ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। চরকা কাটা ইত্যাদি দেশাত্মবোধক কাজে জড়িয়ে নিয়েছেন নিজেকে। সেই পর্বে বাঁকুড়ার অনিলবরণ রায়ের আহ্বানে অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কিত ছবি এঁকে দেওয়াল ভরিয়ে দিচ্ছিলেন রামকিঙ্কর।

বৌদিদির প্রতিকৃতি, কলাভবনে আসার আগে রামকিঙ্করের কাজ

এমন সময় বাঁকুড়ায় আয়োজিত স্বদেশী মেলা ও প্রদর্শনী উপলক্ষে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে রামকিঙ্করের আলাপ। রামানন্দবাবু তরুণ রামকিঙ্করের ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে কলাভবনে নন্দলালের কাছে পাঠানো মনস্থ করেন। এক সাক্ষাৎকারে রামকিঙ্কর এমনটা বলেছেন– ‘রামানন্দবাবু আমাকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন। রামানন্দবাবু তো পরিচয় (নন্দলালের সঙ্গে) করিয়ে দিলেন, কিন্তু টাকাপয়সার কথাটা আছে। খাব কী? … ভাত কোথায় খাব? তা সত্যি কথা। তখন কমার্শিয়াল আর্ট করতুম। করে-করে খাওয়াটা চলে যেত। বেশি দিন না, এই এক বছরের মধ্যে কিছু ছবি বিক্রি হয়েছিল। আমার সুবিধা হয়ে গেল। তখনকার দিনে খাওয়াটা যে কম। মাসে দশ টাকায় তোমার হয়ে যাবে…’ ইত্যাদি। অবশ্য অন্যত্র বলেছেন কিছু ভিন্ন গল্প। সেখানে বলেছেন– ‘তখন নন কো-অপারেশনের সময়– ইংরেজি ১৯২৫ সাল। গভর্নমেন্টের ইস্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। খোলা হয়েছে ন্যাশনাল ইস্কুল। বড়-বড় অধ্যাপকেরা সেখানে পড়ান। আমিও সেই রকম একটি ইস্কুলের ছাত্র ছিলাম। … আমার যত না ছিল পড়াশুনা, তার চাইতে মিছিলের নেতাদের বড় করে ছবি আঁকার কাজই বেশি ছিল। কখনও বা উল্লেখযোগ্য উদ্ধৃতি ভালো করে লিখে কংগ্রেস অফিসের দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিতাম। স্কুলের পত্রিকাতে রঙিন ছবি দেওয়া আমার অন্যতম কাজ ছিল। সেই সময়ে প্রায় সমস্ত বড় নেতারাই বাঁকুড়া গিয়েছিলেন– বিপিন পাল, সি আর দাশ থেকে শুরু করে গান্ধীজী পর্যন্ত।’ এখানে অবশ্য রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে পরিচয়পর্ব একটু আলাদা রকম বলেছেন– ‘একদিন আমার সহপাঠী বললেন, “রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় এসেছেন– চলো দেখা করে আসি”। দেখা হল এবং কাজ কিছু দেখলেন। পরের দিন দেখি, আমার কুঁড়েতে স্বয়ং এসে আমাকে বলছেন, “কী করছ দেখি?” আমি তখনকার কাজ দেখালেম। পরে বললেন, “আমি আজ চলে যাচ্ছি, তোমাকে চিঠি লিখব, তুমি চলে এস”। … এর দু-এক দিন পরেই একটি চিঠি পেলেম– কোন রাস্তা এবং কী ট্রেন, ঠিকানা ইত্যাদি। চলে এলাম।’ আগের সাক্ষাৎকার থেকে এবারের গল্পে কিছু ফারাক থাকলেও ঘটনার ক্রম যেন এখানেই অনেকটা পরিষ্কার।

কলাভবনে আসার আগে রামকিঙ্করের আঁকা মায়ের প্রতিকৃতি

সাক্ষাৎকারে ছিল শিল্পীর অন্নচিন্তা, কিন্তু কলাভবনে প্রবেশের পাসপোর্ট কীভাবে পাওয়া গেল, সে রইল পরের গল্পে। রামকিঙ্কর চেয়েছিলেন কলকাতার আর্ট কলেজে পড়তে, পাকেচক্রে তিনি এসে পৌঁছলেন রবি ঠাকুরের আশ্রমে। শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয়ের কথা তিনি শুনেছিলেন। কিন্তু সেখানেই যে তাঁর ঠাই হবে, তা কখনও ভাবেননি। শান্তিনিকেতনে এসে তিনি হতবাক, মনে মনে খানিকটা চিন্তিত রামকিঙ্কর ভাবছেন– ‘ব্রহ্মচর্য বিদ্যালয়ে এসে কী হবে? আমার কি কৌপিন পরার পর্ব এখনও শেষ হয়নি?’ এদিকে কলাভবন তখন উঠে এসেছে পুরনো লাইব্রেরির দোতালায়। রামকিঙ্করকে নিয়ে গিয়ে আচার্য নন্দলালের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল। ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় মুদ্রিত নন্দলালের কয়েকটা ছবি দেখা ছাড়া আলাদা করে তাঁর সম্বন্ধে রামকিঙ্করের তেমন ধারণা ছিল না। নন্দলালকে সামনাসামনি দেখে রামকিঙ্করের প্রতিক্রিয়া তাঁর জবানিতেই শুনি। ‘আচার্যদেবের সঙ্গে দেখা হল। দেখলেম, বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ, গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি। আমার ছবি দেখতে চাইলেন। দেখালাম। বললেন, “তুমি সবই জানো, আবার এখানে কেন?” একটু ভেবে বললেন, “আচ্ছা, দু-তিন বছর থাকো তো”।’ রামকিঙ্কর পরে বলেছেন তাঁর সেই ‘দু-তিন বছর’ আর কখনওই শেষ হয়নি।

ছাত্র রামকিঙ্কর ও শিক্ষক নন্দলাল

এই হল ভারতীয় অন্যতম স্বর্ণস্তম্ভ রামকিঙ্করের কলাভবন অ্যাডমিশন টেস্টের গল্প। একটা কথা ভেবে দেখার, নন্দলালকে বরাবর খাদির নিতান্ত সাদামাটা পোশাকে দেখা গিয়েছে। রামকিঙ্করের কথা আনুসারে, সেদিন তিনি সিল্কের শৌখিন ধুতি-পাঞ্জাবিতে সজ্জিত ছিলেন। তবে কি আশ্রমের কোনও উৎসব ছিল? এখানে উল্লেখ্য, ভর্তির মুহূর্তে রামকিঙ্করের হাত ছিল যেমন তৈরি, তেমনই তাঁকে এনেছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব। পাশাপাশি এ-ও সত্যি, রামকিঙ্করের কাজের মধ্যে নন্দলাল নিঃসন্দেহে আগামী দিনের এক মহা সম্ভাবনাময় প্রতিভার আলোকরেখা প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

লাইব্রেরির দোতলায় কলাভবনের ক্লাস

রামকিঙ্করকে ‘দু-তিন বছর থাকো’ বলে সুযোগ দিলেও শিল্পী চিত্তপ্রসাদকে নন্দলাল গ্রহণ করেননি। সে প্রায় একই কারণে। নন্দলালের হয়তো মনে হয়েছিল চিত্তপ্রসাদের পক্ষে কলাভবনে তেমন কিছু শেখার নেই। ফলে ভয়ানক আঘাত পেয়েছিলেন তিনি, মনের মধ্যে দীর্ঘকাল জমিয়ে রেখেছিলেন তীব্র অভিমান। ছোট থেকেই পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বড় হয়েছেন চিত্তপ্রসাদ ও তাঁর ভাইবোনেরা। মা ইন্দুমতী দেবী ছিলেন সুলেখিকা, রবীন্দ্র-অনুরাগী। শান্তিনিকেতনের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে কবিতায় শ্রদ্ধার্ঘ পাঠাতেন তিনি। মায়ের লেখা সেই কবিতায় অলংকরণ করতেন পুত্র চিত্তপ্রসাদ। তাঁর বরাবরের ইচ্ছে রবীন্দ্রনাথের কলাভবনে শিক্ষক নন্দলালের কাছে শিল্পের পাঠগ্রহণ। কিন্তু সে সুযোগ তিনি পাননি। পরে কলকাতা আর্ট কলেজেও ভর্তির সুযোগ না-পেয়ে স্বশিক্ষিত শিল্পী হিসেবে তাঁর দুর্মর আত্মপ্রকাশ। মনের গভীরে জেগে ওঠা ভয়ংকর জেদ তাঁকে এক অসামান্য শিল্পীতে রূপান্তরিত করেছে।

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য

এর বহুদিন পরে ১৯৫২ সালের শেষে ভ্রাতৃপ্রতিম সোমনাথ হোরের মাধ্যমে তাঁর ছবির খাতা পাঠিয়েছিলেন আচার্য নন্দলালের কাছে। ছবি দেখে আচার্যের মতামতের জন্যে অপেক্ষারত ছিলেন চিত্তপ্রসাদ। খাতা দেখে নন্দলাল তাঁকে একটা চিঠি লেখেন। সেই ছোট্ট চিঠি চিত্তপ্রসাদের মনে দীর্ঘকাল জমে থাকা অভিমান যেন এক লহমায় ভাসিয়ে দিয়েছে শ্রদ্ধা আর আবেগের জোয়ারে। নন্দলালের চিঠি পেয়ে সোমনাথ হোরকে তিনি লিখছেন– ‘নন্দবাবুর আশীর্বাদী যে চিঠিখানি পাঠিয়েছ তা পেয়ে যেমন অসীম আনন্দ হোলো তেমনি অবাক হলাম। অতোটুকু কাজের অতো বড় পুরষ্কার আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।… অনেকের প্রশংসা স্নেহ পেয়েছি জীবনে কিন্তু নন্দবাবুর স্নেহ আশীর্বাদ যেন আমার কাছে স্বপ্নাতীত রকমের অপ্রত্যাশিত আর কতো বড়ো মূল্যবান আমার কাছে ঐ চিঠিটুকু তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না। … আমার জীবনের এক অমূল্য পুরষ্কার পাঠিয়েছো। … নন্দবাবুর হাতে খাতাটি সত্যি পৌঁছবে জানলে আরো যত্ন নিয়ে কাজটি করতাম। … নন্দবাবুর চিঠির খবরে সবচেয়ে খুশি হবেন আমার মা, কারণ তাঁর কাছে “সবার উপরে শান্তিনিকেতন সত্য তাহার উপরে নাই”। আর খুশি হবেন দাদা– যোশী– আর সমরদা। কিন্তু কেই বা খুশি হবেন না বলো।’ এরপর তিনি লিখেছেন ছবি সম্পর্কে নন্দলালের নিজস্ব দৃষ্টিকোণের প্রসঙ্গ– ‘নন্দবাবুর চিঠি পড়ে তাঁকে যেন নতুন করে দেখলাম এবার। তিনি “হাতের কায়দা”র চেয়ে “যাহা বলতে চাচ্ছি”কে “ভালোকাজের” মাপকাঠি করেছেন চিঠিতে, মানে ফর্মের ঊর্ধ্বে contentকে। তাঁর নিজের কাজ দেখে এটি আমি বুঝতে পারিনি কখনো।’ চিঠির এই অংশ চিত্তপ্রসাদের চোখ খুলে দিয়েছে, নন্দলালকে তিনি নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। উত্তরে চিত্তপ্রসাদ একটি চিঠি লেখেন বলে অনুমান করি, সেইরকম আভাস তাঁর লেখায় পাওয়া যাচ্ছে। তবে চিত্তপ্রসাদের সেই চিঠির কোনও হদিশ পাওয়া যায় না। এখানে এটুকু স্পষ্ট যে, কলাভবনে ভর্তির ব্যাপারে নন্দলাল ছাত্রদের কাজ যথেষ্ট রকমের যাচাই করে নিতেন। সম্ভবত তাঁর কাছে অগ্রাধিকার পেত সেইসব আনকোরা ছেলেমেয়ে– যারা একতাল কাঁচা মাটির মতো, সহজেই যাদের মনের মতো করে গড়েপিঠে নেওয়া যায়।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন গল্পকলা-র অন্যান্য পর্ব

………………………