


মোদিয়ানোর উপন্যাসগুলিতে পাঠককে বারবার একইরকম নৈঃশব্দ্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। অনেকক্ষেত্রে এই শব্দহীনতা লিখিত শব্দকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। লিখিত শব্দ হয়ে ওঠে বলা এবং না-বলা কথার মধ্যেকার সাঁকো। হয়ে ওঠে সংকেত। মোদিয়ানো কম কথা বলে অনেক না-বলাকে সরব করে তুলতে পারেন।
প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: নিকোলাস হিদিরোগ্লোউ
‘And so a moment of the past gets encrusted in memory, like a flicker of light reaching you from a star that was thought long dead’
[লা ব্যালেরিনা, প্যাট্রিক মোদিয়ানো]
যতই আধুনিক সাহিত্যিক এবং সাহিত্যপ্রেমীদের অনেকেই ‘কার্পে ডিয়েম’ নিয়ে সোচ্চার হন না কেন, মানুষের বেঁচে থাকায় যে ভীষণভাবে বর্তমান হয়ে থাকে তার অতীত, একথা অনস্বীকার্য। ‘কার্পে ডিয়েম’ অর্থাৎ মুহূর্তে বাঁচা, বর্তমানকে সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করা। এই বাক্যাংশটি রোমান কবি হোরেসের ‘ওডস: বুক ওয়ান’-এর ১১ নম্বর ওডে পাওয়া যায়, যেখানে তিনি বলছেন, ‘আজকের দিনটিকে সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করো, ভবিষ্যতের উপর যতটা সম্ভব কম নির্ভরশীল হও।’ কিন্তু একথা মানতেই হবে বর্তমানকে আসলে নির্মাণ করে মানুষের অতীত অভিজ্ঞতা এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। অতীতকে বাদ দিয়ে বর্তমান কতখানি উপভোগ্য, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তাই মানুষের ফেলে আসা সময়, বয়স, প্রিয়জন, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শহর, দেশ এবং এই সমস্ত কিছুর স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে তার বর্তমানকে। ইংল্যান্ডের ‘দ্য গার্ডিয়ান’ দৈনিক সংবাদপত্রের একটি সাক্ষাৎকারে নোবেলজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক প্যাট্রিক মোদিয়ানো বলেছিলেন–
“One becomes a prisoner of one’s memories.”

মোদিয়ানোর সারা জীবনের সাহিত্য যেন তাঁর এই বক্তব্যকেই বাস্তবায়িত করতে করতে এগিয়েছে। উপন্যাসের পর উপন্যাসে তিনি হাতড়ে গিয়েছেন পূর্বস্মৃতি, অতীতের গর্ভ থেকে তুলে আনতে চেয়েছেন জীবনের অর্থ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রাজনৈতিক ও সামাজিক অরাজকতার আবহে ১৯৪৫ সালের ৩০ জুলাই ফ্রান্সের বুলোঞ্-বিয়াঁকুরে জন্ম হয় প্যাট্রিক মোদিয়ানোর। প্যাট্রিকের পিতা অ্যালবার্ট মোদিয়ানো ছিলেন ইতালীয়-ইহুদি বংশোদ্ভূত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎজিরা যখন ফ্রান্স অধিকার করে, ইহুদি হওয়ায় অ্যালবার্টকে ফ্রান্সে আত্মগোপন করে থাকতে হয়। প্যাট্রিকের সঙ্গে অ্যালবার্টের সম্পর্ক ছিল জটিল এবং দুর্বোধ্য। প্যাট্রিকের বিভিন্ন রচনায় পিতা-পুত্রের সম্পর্কের শীতলতা এবং টানাপোড়েন বারবার উঠে এসেছে। তাঁর মা লুইজা কোলপাঁ ছিলেন বেলজিয়ান। পেশায় তিনি ছিলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী। পেশাগত দায়িত্বের কারণে লুইজা অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন, ফলে প্যাট্রিকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার সুযোগ পায়নি। প্যাট্রিকের ছোট ভাই রুডির অকালমৃত্যু হয় মাত্র ১০ বছর বয়সে। ভাইকে হারানোর এই ক্ষত প্যাট্রিক সারাজীবন বহন করে নিয়ে চলেছেন। এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা তাঁর গোটা সাহিত্যজীবনকে বন্দি করে ফেলেছে এক স্মৃতির কারাগারে। প্যাট্রিক তাঁর প্রথম আটটি বই উৎসর্গ করেছেন রুডিকে। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই ‘পেডিগ্রি’ লেখা হয়েছে এক অদ্ভুত আবেগসংযম বজায় রেখে। এই বই পড়তে পড়তে যেন মনে হয় লেখক অন্য কারও জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে নথিভুক্ত করে চলেছেন– যেন তিনি এই সমস্ত বর্ণনা করে চলা পূর্ব-অভিজ্ঞতা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন রাখতে বদ্ধপরিকর। এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যখন তিনি লেখেন:
‘I am writing these pages the way one compiles a report or resume… to have done with a life that was not my own.’

এরপর পাঠক পাবেন,
“Apart from my brother, Rudy, his death, I don’t believe that anything I will relate here truly matters to me.”
এখানে বোঝা যায়, জীবনে অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চেষ্টা করলেও ভাইয়ের অকালে চলে যাওয়া প্যাট্রিক কোনওদিনই মেনে নিতে পারেননি। ছেড়ে আসতে পারেননি ছোটবেলার স্মৃতি, ভাইয়ের প্রতি মমত্ববোধ, তাকে হারিয়ে ফেলার নিবিড় শোক। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে জ্যাক দেরিদার ‘হন্টোলজি’র ধারণার কথা। এই বিষয়ে তিনি বিশদভাবে লিখেছিলেন ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত ‘স্পেকটার অফ মার্ক্স’ বইতে। ‘হন্টোলজি’-র মূল বক্তব্য হল, মানুষ কখনও তার অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে বা অস্বীকার করতে পারে না। অতীতের কোনও শোকের স্মৃতি বা অসমাপ্ত কোনও ঘটনা মানুষের বর্তমান জীবনে বারবার অশরীরী প্রেত হয়ে হানা দিতে থাকে। কখনও কখনও মানুষের মন হয়ে ওঠে অতীতের প্রেতাত্মা অধ্যুষিত একটি হানাবাড়ি। সেই হানাবাড়ি থেকে মুক্তি তীব্রভাবে কাঙ্ক্ষিত হলেও স্মৃতির অশরীরী সত্তারা সেই ইচ্ছে-পূরণের পথে বাদ সাধে। দেরিদা লিখছেন–
‘The Spectre of the past haunts the present.’
প্যাট্রিক মোদিয়ানোর গোটা জীবনের রচনায় সেই অতীতের প্রেতেরা নিরন্তর ঘুরে-ফিরে বেড়াচ্ছে। প্যাট্রিকের প্রতিটি বই বহন করে নিয়ে চলেছে কিছু অনুপস্থিতি, কিছু নৈঃশব্দ্য, কিছু হারিয়ে যাওয়া মানুষ, নষ্ট হয়ে যাওয়া ফোটোগ্রাফ, ভুলে যাওয়া ঠিকানা, বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্যাফে, নিভে যাওয়া পথবাতি, বদলে যাওয়া শহর, আধুনিকতার ভারে চাপা পড়ে যাওয়া ইতিহাসকে।

মোদিয়ানোর বইগুলি পরপর পড়লে মনে হয়, তিনি একটি গল্পকেই বিভিন্ন আঙ্গিকে খণ্ডে খণ্ডে ভাগ করে লিখে গিয়েছেন– যেন তাঁর বইগুলি একটি বিরাট উপন্যাসের এক একটি অধ্যায়। ২০১৫ সালে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সংবাদপত্রের একটি ইন্টারভিউতে তিনি বলেছিলেন তাঁর লেখায় একই চরিত্র, একই জায়গা বারবার ঘুরে ঘুরে এসেছে–
“I thought I’d written them in continuous fashion … the same faces, the same names, the same places reoccur from one to another.’
এই বারবার একই নাম, স্থান, নৈঃশব্দ্যকে ছুঁয়ে দেখার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে নিজের বর্তমানকে পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। স্মৃতি এবং বিস্তৃতির মধ্যবর্তী শব্দহীনতাকে স্পর্শ করার তাগিদ থেকেই তিনি মানব অভিজ্ঞতার স্পর্শকাতর দিকগুলোতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন দিক থেকে আলো ফেলেছেন। সামগ্রিকভাবে তাঁর সৃষ্টির দিকে চোখ ফেরালে তাই পাঠক দেখবেন এক অত্যাশ্চর্য নরম আলোর ক্যালাইডোস্কোপ।
মোদিয়ানোর প্রথম উপন্যাস ‘প্লাস দে লেতোয়াল’ যেটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৮ সালে, সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে নাৎজি শাসিত ফ্রান্সে ইহুদি-বিদ্বেষের ইতিহাস। ফ্রান্সে বসবাসকারী ইহুদি মানুষদের সেই সময়কার সংকট এবং জটিল জীবনধারা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অভিনব লিখনশৈলীর মধ্যে দিয়ে। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা মোদিয়ানোর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য নাইট ওয়াচ’। এই উপন্যাসে তিনি সমস্তরকম স্বাভাবিক যুগ্মতা বা বাইনারিকে ভাঙেন। নৈতিকতা-অনৈতিকতা, সত্যি-মিথ্যে, আনুগত্য-বিশ্বাসঘাতকতা, ভালো-মন্দ এই সমস্ত বাইনারির মধ্যবর্তী সীমারেখা ঝাপসা হয়ে আসে তাঁর লেখায়। যুদ্ধ কীভাবে মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে এবং নৈতিকতা সম্পর্কে তার স্বাভাবিক বোধকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে– এই উপন্যাসে সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। এই উপন্যাস অবধারিতভাবে তুলে ধরেছে লেখকের যুদ্ধকালীন নিজস্ব পারিবারিক অভিজ্ঞতাও। ১৯৭২ সালে প্রকাশ পায় ‘রিং রোডস’। এই রচনায় মোদিয়ানো পিতার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের দূরত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন এবং আত্মপরিচয় সন্ধানের তাগিদে অতীত অনুসন্ধানে লিপ্ত হয়েছেন। মোদিয়ানোর জনপ্রিয় বই ‘মিসিং পারসন’-এ তিনি আগের উপন্যাসগুলির তুলনায় ভিন্ন ধরনের বর্ণনারীতি ব্যবহার করলেও এই গল্পের স্মৃতিভ্রষ্ট মূল চরিত্র তাঁর অন্যান্য কাহিনির মতোই স্মৃতি-বিস্মৃতির মাঝখানে আত্মানুসন্ধানে নিমগ্ন। ১৯৯৭ সালে প্রকাশ পাওয়া ‘ডোরা ব্রুডার’ মোদিয়ানোর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম। এই গল্পে সংবাদপত্রের বিবৃতি, শহরে লুকিয়ে থাকা নানা পুরনো সংকেত, সরকারি কাগজপত্র এই সমস্ত ব্যবহার করে একজন হারিয়ে যাওয়া ইহুদি কিশোরীর জীবনকে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। বিস্মৃতির কোলে ঢলে পড়া মানুষদের, যাদের কেউ মনে রাখে না, সাহিত্য যে নানা উপায়ে তাদের জীবন্ত করে তুলতে পারে এই উপন্যাসে মোদিয়ানো তা দেখিয়েছেন।

এরপর ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় মোদিয়ানোর আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘পেডিগ্রি’। এই লেখায় তিনি দেখান ভাষাব্যবহারের ক্ষেত্রে এক আশ্চর্য সংযম। নিজের শৈশব-কৈশোর, এবং জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন একেবারে আবেগবর্জিত ভাষায়। মোদিয়ানো জানাচ্ছেন– তিনি অনবরত স্মৃতিসন্ধান করতে থাকলেও, স্মৃতির শরীর যত অস্পষ্ট এবং নিষ্প্রভ হতে থাকে, ততই তাদের রহস্যময়তা তাঁকে বেশি মাত্রায় আকর্ষণ করতে থাকে। যেহেতু অতীতকে কোনওভাবেই ফেরত পাওয়া যায় না, ছেড়ে আসা সময় হয়ে থাকে এক অন্ধকারাচ্ছন্ন দুর্গম দ্বীপ, তাই সেই রহস্যের প্রতি লেখকের আকর্ষণও কখনও শেষ হয় না। নিজেরই স্মৃতিকে তাঁর মনে হয় অন্য কারও জীবন এবং সেইদিকেই বারবার ধাবিত হন তিনি।
২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় ‘ইন দ্য ক্যাফে অফ লস্ট ইউথ’। এই উপন্যাস দেখায় প্রতিটি মানুষ কীভাবে স্মৃতির উপর ভর করে নিজের অন্তরে নির্মাণ করে নিজস্ব এক বাস্তব। এই গল্পের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে প্যারিস শহরের আনাচ-কানাচের স্মৃতি। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘ইনভিজিবল ইংক’ বইতেও রয়েছে একইরকম অতীতের পিছু নেওয়ার দৃষ্টান্ত। এই গল্পে মোদিয়ানো দেখিয়েছেন স্মৃতিকে মানুষ অস্বীকার করলেও, অতীতকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলা সম্ভব নয়। অতীত অনেকসময় আড়ালে থাকে, নিজেকে প্রচ্ছন্ন রাখে কিন্তু সময় বিশেষে ফেলে-আসা মুহূর্তেরা আবার সুস্পষ্ট চেহারা ধারণ করে। এছাড়াও মোদিয়ানো ‘হানিমুন’, ‘সাসপেন্ডেড সেনটেন্সেস’ ইত্যাদি আরও কিছু উপন্যাস লিখেছেন যেগুলো ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে তুলে আনে স্মৃতি ও বিস্মরণের আলো-ছায়া, আত্ম-আবিষ্কারের সংকট, ইতিহাসের নিঃশব্দ পদচারণা, শৈশবের অবদমিত শোক এবং না-পাওয়া স্নেহের আর্তি। পাঠকের হয়তো মনে হতে পারে মোদিয়ানোর রচনা বিষয়ে আমি বারবার একই কথার পুনরাবৃত্তি করে চলেছি, কিন্তু তার জন্য দায়ী লেখক নিজেই। তিনি নিজের সব সৃষ্টির ক্ষেত্রেই অতীতের রাস্তায় হেঁটেছেন। নিজেই নিজের রচনায় বারবার একই মানুষ, স্থান, মুহূর্তদের ফিরিয়ে আনার কথা স্বীকার করেছেন। তাই তাঁর মনের প্রগাঢ়তাকে স্পর্শ করতে পাঠককে ধৈর্য ধরে পরপর তাঁর উপন্যাসগুলি পড়ে যেতে হবে। সময় দিতে হবে লেখককে। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলে এক মহীরুহ সাহিত্যিকের অনবদ্য কিছু সাহিত্যসম্পদ থেকে রসাস্বাদনের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হবেন স্বয়ং পাঠকই। মোদিয়ানোর রচনার মধ্যে বাসা বেঁধে থাকা তুমুল বাঙ্ময় এক নীরবতা মনে করিয়ে দেয় জুলিয়ান বার্নস রচিত ‘দ্য সেন্স অফ অ্যান এন্ডিং’ বা জে. এম. কুটজি লিখিত ‘ডিসগ্রেস’-এর মতো কিছু উপন্যাসের কথা, যেগুলিতে নৈঃশব্দ্য হয়ে উঠেছে গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র।

সুজান সনটাগ ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘এস্থেটিকস অফ সাইলেন্স’ প্রবন্ধে জানিয়েছেন, নৈঃশব্দ্য আসলে একটি শৈল্পিক কৌশল। নীরবতা আসলে পাঠক বা দর্শককে শিল্পের গভীরতম প্রদেশে প্রবেশ করতে সাহায্য করে। মোদিয়ানোর অধিকাংশ উপন্যাসেই আমরা তাঁর আখ্যানরীতির মধ্যে লক্ষ করি এক গভীর স্তব্ধতা– যাকে তিনি কখনওই কোনওভাবে ব্যাখ্যা করেন না। লেখকের তরফ থেকে এই ব্যাখ্যাহীনতা পাঠককে বাধ্য করে গল্পের হৃদয়ে প্রবেশ করে সেই নৈঃশব্দ্যকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতে। ফরাসি সাহিত্যিক এবং দার্শনিক মরিস ব্ল্যানচোর মতে সমস্ত সাহিত্যিকই এমন কিছু অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, যা বর্ণনা করার ভাষা খুঁজে পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। অনেক কথা শব্দের দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভব হয়ে ওঠে না এবং তখনই তৈরি হয় ‘পজ’ বা ‘টেক্সচুয়াল সাইলেন্স’। অর্থাৎ থমকে যাওয়া। শব্দ-বাক্য-যতিচিহ্ন মধ্যবর্তী দীর্ঘশ্বাস।
মোদিয়ানোর উপন্যাসগুলিতে পাঠককে বারবার এইরকম নৈঃশব্দ্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। অনেকক্ষেত্রে এই শব্দহীনতা লিখিত শব্দকে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। লিখিত শব্দ হয়ে ওঠে বলা এবং না-বলা কথার মধ্যেকার সাঁকো। হয়ে ওঠে সংকেত। মোদিয়ানো কম কথা বলে অনেক না-বলাকে সরব করে তুলতে পারেন। সুইডিশ অ্যাকাডেমির প্রাক্তন সেক্রেটারি পিটার ইংল্যান্ড মোদিয়ানো সম্পর্কে বলেছিলেন–
‘He is a kind of Marcel Proust for our time.’

মোদিয়ানোর লিখনকৌশল বিষয়ে ‘দ্য গার্ডিয়ান’ সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল–
‘He cloaks his narratives in a fog that blurs fact and fiction.’
অর্থাৎ বাস্তব এবং কল্পনার মধ্যবর্তী দূরত্বকে ঝাপসা করে দিয়ে এগিয়ে চলে মোদিয়ানোর গল্প-বলা। এই অস্পষ্টতা, স্মৃতি এবং বিস্মৃতির মাঝের ধূসর, আবছায়া অঞ্চল, হারিয়ে যাওয়া অতীতের আধো-অন্ধকার অলিগলি তাঁর গল্পগুলিকে করে তোলে আরও রহস্যময় এবং অর্থবহ।
প্যাট্রিক মোদিয়ানো ২০১৪ সালে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হন। পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন–
‘Writing is a strange and solitary activity … It is a little like driving a car at night, in winter, on ice, with zero visibility. You have no choice, you cannot go into reverse, you must keep going forward while telling yourself that all will be well when the road becomes more stable and the fog lifts.’
অর্থাৎ, তিনি বলতে চেয়েছেন লেখার প্রক্রিয়াকে আসলে লেখক কখনওই সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। লেখকের আসলে না-লিখে কোনও উপায় থাকে না, এবং একবার সেই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেলে নিজের ইচ্ছেমতো তাকে থামানোর কোনও সুযোগও পান না তিনি। লেখক শুধু এই আশায় লিখে চলেন যে, একসময় সামনের কুয়াশা কাটবে এবং তিনি নিজের সৃষ্টির একটি স্পষ্ট অবয়ব দেখতে পাবেন। এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় কানাডিয়ান সাহিত্যিক মার্গারেট অ্যাটউডের লেখার বিষয়ে একইরকম মনোভাবের কথা। তাঁর কথায়–
‘Writing a novel is like walking through a dark room. You see a shape, you stumble against it, you turn on a small light.’

এই ছোট্ট আলো, সামান্য আলো, জোনাকি-আলো হল সেই ভাসমান, ঝাপসা, অস্পষ্ট শব্দগুলো যা সমুদ্রপৃষ্ঠে হিমশৈলের অগ্রভাগটুকুর মতো দৃশ্যমান হয়, কিন্তু সমুদ্রের ভিতরে অদৃশ্য বিশালকায় বরফের চাঙড়ের মতো এক অতিকায় গল্পের পাহাড়কে জাগিয়ে তোলে।
‘Yet it has to be the vocation of the novelist, when faced with this large blank page of oblivion, to make a few faded words visible again, like a lost Iceberg adrift on the surface of the ocean.’
[প্যাট্রিক মোদিয়ানো, নোবেল পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানের বক্তৃতা থেকে উদ্ধৃত]
সুতরাং ‘কার্পে ডিয়েম’ অর্থাৎ মুহূর্তে বাঁচার যে আনন্দ, তা ব্যক্তিবিশেষে এক অন্য অর্থস্তরে উপনীত হতেই পারে। যার বর্তমানকে অধিকার করে রাখে অতীতের স্মৃতি, তার কাছে এই মুহূর্তে বাঁচা তো একরকম টাইম-ট্রাভেল। ‘কার্পে ডিয়েম’-এর মূল কথা বর্তমান মুহূর্তকে উপভোগ করা। বর্তমান যদি কারও কাছে উপভোগ্য না হয়, সেই বর্তমানে বেঁচে তো কার্পে ডিয়েম তত্ত্ব প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। বরং বর্তমান মুহূর্ত যদি কোনও ব্যক্তির অতীতকে ধারণ করে থাকে, এবং কারও মন সেই ফেলে আসা মুহূর্তের মধ্যেই বসতি চায়, তবে বর্তমানে না বেঁচেও নিজের জীবনে তিনি ‘কার্পে ডিয়েম’ প্রয়োগ করছেন না কি? মূল কথা তো মুহূর্তটির সর্বার্থে আত্মীকরণ। মোদিয়ানো তাই করেছেন।
একে কি আমরা ‘রিভার্স কার্পে ডিয়েম’ বলতে পারি? জানা নেই…
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved